একশো বাহান্ন তম রজনী । আরব্য রজনী পর্ব ১৫২ (Part 1৫2 ) Sahasra ek arabya rajani

 গল্পের পরবর্তী অংশঃ  গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে ১ লিখে সার্চ করুন । 

চাঁদ আলীকে দেখে মহম্মদ গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকাল। অদূরে একটি মিঠাইয়ের দোকান। সেটি দেখিয়ে আলী মহম্মদকে বলল  —তােমরা মিঠাই খাবে? ওস্তাদ মহম্মদ উঠে দাঁড়ায়। নীরবে দোকানের দিকে এগােতে থাকে। তার অনুগামীরা তাকে অনুসরণ করল।

মাইম খাইয়ে চাদ আলী ওস্তাদ মহম্মদ-এর হাতে একটি সোনার দিনার খুঁজে দিয়ে বলল -"ভাইয়া, আমাকে একটি বাড়ির ঠিকানা বাৎলে দিলে বড়ই উপকার হয়। দেখতেই তাে পাচ্ছ, আমি পরদেশী। রাস্তা ঘাট কিছুই চিনি না।'

মহম্মদ বলে-কার মকানে যাবে? কার মানের নিশানা তল্লাশ করছ, বল তাে?'

‘খলিফার সিপাহী-সেনাপতি আহমদ সাহাবের মকান।' 

-“বহুৎ আচ্ছা। আমার সাথে এসাে, পাত্তা লাগিয়ে দিচ্ছি।

কয়েক পা গিয়ে পথ থেকে একটি ঢিল কুড়িয়ে নিল। দুম করে সামনের একটি মকানের দেয়ালে ছুঁড়ে মেরে বলল —“ওই যে, ওই মকান।'

আওয়াজ শুনে আহমদ দরওয়াজা খুলে বেরিয়ে এল। গােসসায় রীতিমত কাঁপছে।

লেকিন দরওয়াজা খােলার আগেই ওস্তাদ মহম্মদ এক দৌড়ে পথের বাঁক ঘুরে একদম বেপাত্তা হয়ে গেল। আহমদ তার হদিস পেল না।

পথে চাদ আলীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উচ্ছাস প্রকাশ করে আহমদ ব'লে উঠল—“চাদ আলী যে! আরে এসাে এসাে।' ঢিল মারার ব্যাপারটি চাপা পড়ে গেল।

কামরার ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে চাদ আলী বলল —কী। ঝকমারিতেই না পড়েছিলাম ওস্তাদ। একদম হয়রানের চূড়ান্ত। যে হতচ্ছাড়াকেই তােমার ঠিকানা জিজ্ঞাসা করি সে-ই মুখ কালাে করে বলে—মালুম নেই। কি ব্যাপার ওস্তাদ ?’

-“কি আবার, ডরে। বিলকুল ডরে কেউ আমার নাম করে না, মকানের নিশানা বলা তাে বহু দূরের ব্যাপার। বলা তাে যায় না যদি কারাে মুখ ফসকে কিছু বেরিয়ে পড়ে গর্দান যাবে। তার চেয়ে মালুম নেই বলাই একদম নিরাপদ, ঠিক না? 

দরওয়াজা দিয়ে কামরার ভেতরে ঢুকতে গিয়েও আহমদ থমকে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে বলল—“চাদ ভাইয়া, আগে তােমাকে আমার মকানটি ঘুরে ঘুরে দেখিয়ে নিচ্ছি, কি বল ?

-বহুৎ আচ্ছা। তােমার মকান তাে দেখছি একদম খােলাই। আমীর-বাদশার প্রাসাদও এমন খুবসুরৎ হয় না।' 

সিপাহী-সেনাপতি ম্লান হেসে বলল–হ্যা, মকানটি একটু বড়ই বটে। তবে আমার সঙ্গে আমার চল্লিশজন সিপাহী-সাকরেদও থাকে কিনা তাই মকানটি একটু বড়সড় না হলে কুলােবে কেন?'

আহমদ ঢুঁড়ে ঢুঁড়ে চাদ আলীকে মকানটি দেখাল। চাদ আলী পঞ্চমুখে তার তারিফ করল।

আহমদ এবার চাদ আলীকে তার সিপাহীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বলল —এ সবে আমার মুলুক কায়রাে থেকে এসেছে। আমার পুরনাে সাকরেদ। তার সমান মস্তান ও সাহসী ধান্দাবাজ তামাম কায়রােতে দ্বিতীয়টি নেই।

আহমদ এবার তাকে নিজের কামরায় নিয়ে গেল। নিজের পােশাক পরিচ্ছদ দেখিয়ে বলল—“খলিফা যেদিন আমাকে সিপাহী-সেনাপতির পদে বহাল করল সেদিন এগুলাে ইনাম স্বরূপ দিয়েছেন। এবার চাদ আলীর কাধে মৃদু চাপ দিয়ে বল্ল—“আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তােমার সঙ্গে আমার ফিন মােলাকাৎ হবেই। খলিফা আমাকে বহুৎ পেয়ার করেন। আমার হুকুমে চল্লিশজন সিপাহী জান কবুল করতেও পিছপাও নয়। বহাল তবিয়তেই আছি ভাইয়া। 

আহমদ সন্ধ্যায় দেশওয়ালি পুরনাে সাকরেদ চাদ আলীর খাতিরে এক ভােজ-সভার আয়ােজন করল। চল্লিশজন সিপাহীও কব্জি ডুবিয়ে এক সঙ্গে খানাপিনা করল। দিল খুলে নাচা-গানা করল। চাদ আলী বহুৎ আনন্দ পেল নয়া পরিবেশে এসে।

আহমদ পরদিন ভােরে খলিফার দরবারে যাওয়ার সময় চাঁদ আলীকে বলে গেল—একদম মকানের বাইরে যাবে না। কারাে সঙ্গে বাৎচিৎ করবে না। নয়া মুলুক। রাস্তাঘাট অজানা। একা কোথাও গেলে ঝুটঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে পার। কামরায় বিশ্রাম কর। দু-চারদিন অপেক্ষা কর। তারপর সব বন্দোবস্ত করে দেব। আমার শত্রুরা চারদিকে ঘুরঘুর করছে। মওকা পেলেই গাড্ডায় ফেলে দেবে। তুমি নতুন। তােমাকে হাতের কাছে পেলেই তারা ধান্দায় মেতে উঠবে। হুঁশিয়ার, ইয়াদ রাখবে কায়রাে আর বাগদাদের মধ্যে আশমান-জমিন ফারাক। খলিফার গুপ্তচর মশামাছির মাফিক ঘুরঘুর করছে চারদিকে। আবার চোর, জোচ্চোর, গুণ্ডা, মস্তান ছারপােকার মাফিক নগরের পথে ঘাটে পিল পিল করছে। 

আহমদএর পরামর্শ চাদ আলীর মনঃপুত হ’ল না। ভেতরে ভেতরে গােমড়াতে লাগল। শেষ পর্যন্ত একটু-আধটু গােসসা প্রকাশ করেই বলল — এ কেমন হুকুম ওস্তাদ। কামরার দরওয়াজা বন্ধ করে বসে থাকা তাে বােরখা পরে থাকারই সামিল। আমি কি এরই জন্য মুলুক ছেড়ে বাগদাদে এসেছি?

আহমদ চাদ আলীর পিঠ চাপড়ে, মুচকি হেসে বলল - ‘গােসসা করছ কেন ভাইয়া? দু-চারটে দিন একটু ঝিম মেরে এখানকার হাওয়া সমঝে নাও। তারপর যেখানে দিল চায় ঢুঁড়ে বেড়াবে। আমি তােমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে এক-এক করে সব ঘাঁটি চিনিয়ে দেব। তখন তাে তুমি বিলকুল শের বনে যাবে। চাদ আলী গুম হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আহমদ আর দেরী না করে মকান ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল।

এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চারশ' তিপ্পান্নতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-‘জাঁহাপনা, চাদ আলী’কে কামরায় রেখে আহমদ খলিফার দরবারে চলে গেল। চাদ আলী পুরাে তিনটি দিন কামরা বন্দী হয়ে রইল। দিনভর সে কুঁড়ে কুঁড়ে দিন গুজরান করত তার পক্ষে এ হালৎ তাে দম বন্ধ হয়ে আসার ফিকির।

চতুর্থ দিন ভােরে আহমদ মকান ছেড়ে যাবার সময় চাদ আলী মুখ কাচুমাচু করে বলল —‘ওস্তাদ এ যে দম বন্ধ হয়ে আসছে। কলিজা ছটফট করছে। এবার হুকুম দাও এমন এক কেরামতি দেখাই যাতে স্বয়ং খলিফাও চোখে সর্ষেফুল দেখেন।

‘সবুর কর ভাইয়া। আর দু’-চারদিন নিজেকে সামলে সুমলে রাখ। এত ব্যস্ত হলে সবকিছু ভেস্তে যাবে। তােমার ব্যাপারটি নিয়ে আমাকেই ভাবতে দাও তাে। দিমাক ঠাণ্ডা করে তুমি মুখে কুলুপ এঁটে কামরার মধ্যে বসে থাক।

বুঝছ না কেন? ঝােপ বুঝে তাে কোপ মারতে হবে। খলিফার মেজাজ মর্জি বুঝে তােমার প্রসঙ্গ তার কাছে পাড়ব। যাতে এক কথাতেই তােমাকে দরবারের কাজে বহাল করে নেন। হবেও তা-ই, সেদিন আহমদ দরবারে চলে গেলে চাদ আলী কয়েদখানার সামিল কামরা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। নসীব ঠুকে, খােদাতাল্লার নাম নিয়ে একদম পথে হাজির হল। চাদ আলী এপথ-ওপথ পেরিয়ে একটি রেস্তোরার সামনে হাজির হ’ল। লম্বা-লম্বা পায়ে ভেতরে গিয়ে কয়েক কিসিমের খানা নিয়ে গলা পর্যন্ত ঠেসে খেল।

রেস্তোরা থেকে বেরােবার সময় দেখল, কুচকুচে কালাে পােশাক গায়ে দিয়ে কয়েকটি নিগ্রো নওজোয়ান যাচ্ছে। তাদের মাথায় টুপি, কোমরে চামড়ার কোমরবন্ধ, হাতে চকচকে খড়গ। তাদের সঙ্গে এক জেনানা। কোন হারেমের বৃদ্ধা। আরও চারজন সশস্ত্র নিগ্রো বীরদর্পে চলেছে। বৃদ্ধা জেনানাটির মাথায় একটি তাজ। সােনার তাজ। তাজটির মাথায় একটি রূপাের কবুতর শােভা পাচ্ছে।

এ-বৃদ্ধাটি সে-শয়তানী ডিলাইলাহ। খলিফার চিড়িয়াখানার কাজকর্ম সেরে ফিরছে। তার সঙ্গে তার লেড়কি জাইনাবও রয়েছে। বৃদ্ধা ডিলাইলাহ চাদ আলীর দিকে এক ঝলক তাকাল। সে তাকে চেনে না। দেখেও নি কোনদিন। এমন খুবসুর নওজোয়ান দেখে তার কলিজাটি নড়েচড়ে ওঠে।

ডিলাইলাহ অনুচ্চ কণ্ঠে এক নিগ্রোকে বলল-নওজোয়ানটি কে হে? চেন? ডাক তাে একবারটি। থাক, রেস্তোরার মালিককে জিজ্ঞাসা কর।

নিগ্রোটি রেস্তোরা থেকে ফিরে বিষমুখে বলল মালিক বলল , সে-ও চেনে না। আজই প্রথম দেখছে। মাল ভিন দেশী কেউ হবে।

ডিলাইলাহ এবার এক নিগ্রোকে দিয়ে এক মুঠো বালি আনাল, উদ্দেশ্য, মন্ত্র পড়ে চাদ আলীর পরিচয় জেনে নেবে। আমার দিল বলছে, এর ধান্দা সুবিধের নয়। কোন না কোন বাজে কাজ হাসিল করতেই একে এখানে আনা হয়েছে।

নিগ্রোটি বালি নিয়ে এল। জাইনাব তার হাতে যাদুসেজ তুলে দিল। বুড়ি আঁকা বাঁকা কিছু আঁক কষে বিড়বিড় করে কি যেন সব মন্ত্র আওড়াল। এক সময় ডিলাইলাহ লেড়কির দিকে তাকিয়ে বলল-নওজোয়ানটির নাম চাদ আলী। কায়রাে তার মুলুক। সিপাহী-সেনাপতি আহমদ-এর জিগরী দোস্ত। সাকরেদ।

জাইনাব স্তম্ভিত হয়। সবিস্ময়ে বলে, সেই যে সেই আহমদ, যার কোর্তা-কামিজ খুলে প্রায় বিবস্ত্র করে ছেড়েছিলাম! ‘বিলকুল সাচ্চা বাৎ। আমাদের ঢিট করার জন্য সে এবার কায়রাে থেকে এ-শয়তানটিকে আমদানি করেছে। কায়রাের সেরা মস্তান, পাক্কা ধড়িবাজ। 

‘আম্মা তুমি ঝুটমুট ভেবে মরছ। এতে একদম বাচ্চা! ভাল করে গোঁফ-দাড়িও গজায় নি। এর দ্বারা আমাদের কি-ই বা সর্বনাশ'- 

–আহমদ নিজের মকানে একে তুলেছে, বুঝছিস না ধান্দা আছে কিনা? ফিকির খুঁজছে।

–‘আম্মা, তুমি দিমাক ঠাণ্ডা কর। আমি ওর সঙ্গে ভেট ক'রে আদৎ ব্যাপারটি সম্বন্ধে আঁচ নিয়ে আসছি।

জাইনাব তার উন্নত স্তন দুটো নাচিয়ে, নিতম্ব দুলিয়ে দুলিয়ে চাদ আলীর দিকে এগিয়ে গেল। তার আম্মাকে মকানে পাঠিয়ে দিল।

জাইনাব কাছে গিয়ে চাদ আলীর আপাদমস্তক এক লহমায় নিরীক্ষণ করে নিল। দেখল, তার মায়ের দেয়া বিবরণের সঙ্গে চাদ আলীর চেহারা বিলকুল মিলে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে চাদ আলী রেস্তোরা ছেড়ে পথে নেমে অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে লেগে গেছে। জাইনাব তাকে অনুসরণ করে। সামান্য গিয়েই তাকে আচমকা এক ধাক্কা মারে। চাদ আলী থমকে দাঁড়ায়। ঘাড় ঘুরিয়ে জাইনাব-এর দিকে তাকায়। জাইনাব চোখের বাণ মেরে বসল। একে খুবসুরৎ এক লেড়কির তুল তুলে হাতের ধাক্কা তার ওপর চোখের বাণ মারায় চাদ আলী একদম ভড়কে গেল। তার কলিজা নাচানাচি দাপাদাপি জুড়ে দিল। শিরায় শিরায় খুনের গতি গেল বেড়ে। চাদ আলী বিলকুল কুপােকাৎ। আচমকা বলে উঠল—“কী সুরৎ তােমার!

অনন্যা কে তুমি? কি তােমার পরিচয় বলবে কি ?

জাইনাব খিল খিল করে হেসে ওঠে।

চাদ আলী এবার বলল —বল না, কে তুমি? পথে পথে ঢুঁড়ে কার তাল্লাস করছ?'

‘যদি বলি তােমার মাফিক এক নওজোয়ানেরই তাল্লাস করছি, নওজোয়ান।' বলেই ফিন সরবে হেসে উঠল। তার বাৎ শুনে আলীর মুখমণ্ডল লাল হয়ে উঠল। 

বেশ একটু গম্ভীর স্বরেই বলল — শাদী-নিকা হয় নি?'

—হয়েছে। স্থানীয় এক সওদাগরের বেটি। আমার স্বামীও এক সওদাগর। কারবারের তাগিদে তিনি প্রায়ই ভিন্ দেশে ঢুঁড়ে বেড়ান। এখন ভিন দেশে আছেন। তাই তােমার মাফিক এক শক্ত সাবুত নওজোয়ানের খোঁজে বাইরে বেরিয়েছি। দিল ভরে এক সঙ্গে খানাপিনা সারব। তারপর দু’ জনে— জাইনাব-এর বাৎ শুনে আলীর কলিজা নাচানাচি শুরু করে দিল। শিরা-উপশিরার খুনে গতি গেল বেড়ে। কান দুটো দিয়ে যেন আগুনের হলকা বেরােতে লাগল। জাইনাব আচমকা চোখের বাণ মেরে বলল-“তােমার মাফিক এক শক্ত সাবুত নওজোয়ানকে নিয়ে রাত্রি কাটাতে পারব ভেবে খুশীতে আমার কলিজা চঞ্চল হয়ে উঠেছে। মকান থেকে বেরিয়ে পথে আসার সময় লেড়কারা পিছনে লাগে, উস্কানি দেয়, পাত্তা দেই নি। আদতে কাউকেই দিল থেকে মেনে নিতে পারি নি। তােমাকে এক লহমায় দেখেই দিল নেচে ওঠে, কলিজা অস্থির হয়ে পড়ে। তুমি যদি আজকের রাত্রিটি আমাকে সঙ্গ দান কর তবে আমি খুশীতে ডগমগ হয়ে উঠতে পারব। যাবে তাে? চল, পা-বাড়াও।

চাদ আলী এর কি জবাব দেবে সহসা ভেবে উঠতে পারল না।

জাইনাব তার একটি হাত খপ করে চেপে ধরতে গিয়েও থমকে গেল। আহ্লাদে গদগদ হয়ে বলল—“তুমি কেমন নাগর হে? লেড়কিদের চেয়েও শরম—চল, পা বাড়াও। 

চাদ আলীর মাথাটি যেন আচমকা চক্কর মেরে উঠল। মুহুর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল —“তােমার মাফিক খুবসুরৎ উদ্ভিন্ন। যৌবনার সাদর আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করতে পারব তেমন শক্ত কলিজা আমার নয়। চল, কোথায় নিয়ে যাবে, যাচ্ছি। চাদ আলী জাইনাবকে অনুসরণ করে চলল। পথ পাড়ি দিতে দিতে সে ভাবল—এ-নগরে আমি একদমই নবাগত। এখানকার আদমি বা পথ কিছুর সঙ্গেই আমার জান পরিচয় নেই। কথা নেই বার্তা নেই আচমকা এক খুবসুরৎ লেড়কির ডাকে হাঁটা দেয়া কি উচিত হচ্ছে ? তার ওপর অন্যের বিবি। এ-মুহর্তে সে মকানে নাও থাকতে পারে। লেকিন যে কোন সময় ফিরে আসতে পারে। ফিরে এসে যদি দেখে আমি তার বিবিকে জড়িয়ে পড়ে রয়েছি।

এক লহমায় তার মাথায় খুন চেপে যাবে। আর এই স্বাভাবিক। তখন তার মােউত কেউ ঠেকাতে পারবে না। জ্ঞানীরা তাে বলেই গেছেন পরদেশে অচেনা জেনানার সাথে অবৈধ মিলন এড়িয়ে চলবে।

চাদ আলী থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে আর যেতে নারাজ। ভাবল, অজানা-অচেনা এ-লেড়কি তাকে কোন্ চক্করে নিয়ে ফেলবে, কে বলতে পারে। আলী দু পা এগিয়ে জাইনাব’কে আমতা আমতা করে বলল—“শুনছ, আজকের দিনটির জন্য। আমাকে রেহাই দাও। তামাম বাগদাদ নগরে খুবসুরৎ নওজোয়ান ঢের মিলবে। তুমি অন্য কাউকে পাকড়াও করে নিয়ে যাও। আমি এখানে বিলকুল নবাগত। একজনের মেহমান হয়ে দিন গুজরান করছি। তার অজান্তে বাইরে রাত্রি কাটানাে কিছুতেই সঙ্গত নয়। কসম খাচ্ছি, পরে একদিন তােমার সাধ মেটাব, শুধুমাত্র আজকের রাত্রিটি । 

জাইনাব আহ্বাদে অভিমানে-আবেগে গদগদ হয়ে বলে -  সে কী! না, সেটি হচ্ছে না। তােমাকে দেখেই আমার কলিজা নাচানাচি করছে, খুনে মাতন লেগেছে। ওঃ হুঃ সেটি হচ্ছে না। আজই—এখনই তােমাকে পেতে চাই। একবার তােমাকে বুকে ঠাই দিয়ে ফেলেছি—না, সেটি হচ্ছে না। আমার জান তবে একদম বরবাদ হয়ে যাবে।

আবার চাঁদ আলীর কলিজাটি ভিজে একদম জবজবে হয়ে গেল। যন্ত্রচালিতের মাফিক তাকে অনুসরণ করে চলল ।

জাইনাব মকানে পৌছে কামিজের পকেট হাতাতে থাকে। চাবি বেপাত্তা। বলল —‘চাবি বেপাত্তা। হারিয়েছি বােধ হয়। এবার চাদ আলীর দিকে তাকিয়ে বল্ল—“কি গাে, একদম চুপ মেরে গেলে যে, চাবি হারিয়ে গেছে। কামরায় ঢােকার কৌশিস তাে কিছু করতে হবে? তালাটি ভাঙা ছাড়া গত্যন্তর নেই। তালা ভেঙে ফেল।

চাদ আলী বলল —“তালা ভাঙা গুনাহ। আমি তা করতে নারাজ।

জাইনাব এবার নাকাবটি সামান্য সরিয়ে তার দিকে আচমকা চোখের বাণ মেরে বলল—“গুনাহ বলে কি কামরার ভেতরে যাব না? রাতভর এখানে কাটাব?’

চোখের এক বাণেই আলী মূচ্ছা যাবার জোগাড়। মােহমুগ্ধের মত প্রায় তালাটি দু'হাতে জড়িয়ে ধরে শরীরের সবটুকু তাগদ নিঙড়ে দিয়ে মােচড় মারতে শুরু করে। তার যৌবনের উন্মাদনা তালাটি বেশীক্ষণ সহ্য করতে পারল না। দুম করে খুলে গেল। ' জাইনাব কামরার ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বল্ল-এসাে, ভেতরে এসাে।

Post a Comment

0 Comments