গল্পের পরবর্তী অংশঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে ১ লিখে সার্চ করুন ।
বাগদাদের আদমিরা আমাদের কায়রাে নগরের আদমির মাফিক পানি খরিদ করে পান করতে উৎসাহী নয়। পথের ধারের কোন মকানে বা দোকানে ঢুকে পানি চাইলেই মিলে যায়। তবে আর দিনার-দিরহাম খরচা করে খরিদ করবেই বা কেন? তাদের মতে একমাত্র কাফেররাই পয়সা দিয়ে পানি দেয়। তাই পানির ব্যবসা বাগদাদে তেমন চালু নয়।
পানি বেচতে চাইলে পথচারীরা বেশ ক'রে দু’ কথা শুনিয়ে দিয়ে উপদেশ দেয়, পানিটানির কারবার ছেড়ে রােজগারের অন্য কোন ফিকির খোঁজ। এ-ধান্দা এখানে অচল।
আবার কেউ বা গােসসা করে চিল্লিয়ে ওঠে—‘বেকুব কাহিকার আমাকে কি তুমি খানাটানা খাইয়েছ যে, পানি দিচ্ছ? খানা খাওয়াও তারপর না হয় পানির ধান্দা কোরাে।
কেউ বা গুনাহের প্রসঙ্গ পেড়ে বলল—‘বে-আক্কেল কাহিকার ! পানি তাে খােদ খােদাতাল্লা বানিয়েছেন। তার পানি তুমি বেচার ধান্দা করছ!’ দোজখে যাবে, ইয়াদ রেখাে। তবু, আমি দমলাম না। পথে পথে ভিস্তি কাঁধে ঢুঁড়তে লাগলাম। কেউ-ই আমার পানি খরিদ করল না।
দুপুর পর্যন্ত বেকার ঢুঁড়ে বেড়ালাম। বিকাল হ’ল। তবু দুটো রুটির জোগাড় হ’ল না। সারাদিন রুটি জোগাড়ের ধান্দায় পথে পথে কাটালাম। আমার কোশিস ব্যর্থ হ’ল। একটি কানাকড়িও রােজগার করতে পারলাম না । দিনভর দাঁতে কুটোটি পর্যন্ত কাটি নি। পেটের ভেতরে আগুন জ্বলতে লাগল। পথের ধারের এক আমীর আদমির বারান্দায় বসে নিজের নসীবের ব্যাপার স্যাপার নিয়ে ভাবতে লাগলাম। খােদাতাল্লার ওপর যাবতীয় কসুর চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে হাল্কা করার কোশিস করতে লাগলাম।
হঠাৎ লক্ষ্য করলাম বাজারের দিক থেকে কেমন একটি চাপা গুঞ্জন ভেসে আসছে। আদমিরাও বড়ই অস্থির হয়ে ছুটোছুটি করছে। সামনের বাঁকটির কাছেই আদমির ভিড় সবচেয়ে বেশী।
আমি কৌতুহল চেপে রাখতে পারলাম না। পানির ভিস্তিটি কাঁধে নিয়েই ব্যস্ত-পায়ে বাঁকের দিকে এগােতে লাগলাম।
মিছিল। মিছিল চলেছে দেখলাম। পােশাক আশাকে সজ্জিত হয়ে, কোমরে তরবারি ঝুলছে। সবার হাতেই একটি করে পাকা বাঁশের লাঠি। তারা রাস্তার এক ধার ধরে সারিবদ্ধভাবে মিছিল করে চলেছে।
মিছিলের আগে আগে চলেছে সিপাহীদের সেনাপতি। খুবসুরৎ ইয়া দশাসই চেহারা। মালুম হ’ল গায়ে-গতরে শক্তিও ধরে যথেষ্টই। পথের ধারে শহরবাসীরা দাঁড়িয়ে সেনাপতি গােছের আদমিটিকে নতজানু হয়ে সালাম জানিয়ে খুশী করার কোশিস করছে।
আমি কৌতুহল দমন করতে না পেরে ভিড়ের মাঝে একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম—“ভাইজান, ব্যাপার কি ? কিসের মিছিল? আর ওই বিশালদেহী আদমিটিই বা কে, বলুন তাে?'
আদমিটি কৌতুহলী চোখ মেলে আমার দিকে তাকাল।
বিদ্রুপাত্মক হাসির রেখা চোখে-মুখে ফুটিয়ে তুলে সে বলল —আরে ইয়ার, মিছিল দেখতে এসেছ, আর ওই লােকটি কে জান না?’ পরমুহূর্তেই বেটা আদমিটি নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল —“ওহাে, তুমি তাে পরদেশী! দু-চারদিনের জন্য এসেছ। তবে আর তােমার দোষই বা কি?
ওই যে, ইয়া দশাসই চেহারার আদমিটিকে বীরবিক্রমে পথ চলতে দেখছ, তার নাম আহমদ। সিপাহীদের সেনাপতি। খলিফার বহুৎ পেয়ারের আদমি। তামাম বাগদাদ নগরের শান্তি রক্ষার দায়িত্ব তার ওপরে বর্তেছে।
হাসান নামে খলিফার আর এক সেনাপতি রয়েছেন। তিনিও খলিফার পেয়ারের আদমি। এঁরা উভয়েই হাজার দিনার করে বেতন পান। আর এক শ’ দিনার বরাদ্দ প্রত্যেক সিপাহীর জন্য।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম-“তো এমন জমকালাে মিছিল করে সবাই চলেছে কোথায় ?!
পথে পথে ঢুঁড়ে নগরের হালচাল দেখতে বেরিয়েছে। আমি তড়াক করে লাফিয়ে রােয়াক থেকে পথে নেমে পড়লাম। পেয়ালা দুটো বাজিয়ে হাঁকতে লাগলাম—‘পানি চাই। পানি নেবে গাে?
আমার কণ্ঠস্বর শুনে সিপাহী-সেনাপতি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। এক পা-দু’পা করে আমার মুখােমুখি এসে দাঁড়ালেন। কোনরকম ভূমিকা না করেই এক পেয়ালা পানি মাঙলেন।
আমি মুচকি হেসে তার দিকে পেয়ালা ভরে পানি এগিয়ে দিলাম। পর পর তিন পেয়ালা পান করল। তাজ্জব ব্যাপার! আপনি যেমন পর পর দু’বার পানি পথে ছুঁড়ে ফেললেন তিনিও তা-ই করলেন। শেষ পেয়ালার পানি গলায় ঢেলে দিলেন। খালি-পেয়ালাটি আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন—“আমার কায়রাে ভাইয়ারা দীর্ঘায়ু লাভ করুক।
আমি সবিস্ময়ে তার মুখের পানে চেয়ে রইলাম।
তিনি এবার আমার দিকে প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিলেন-“নিজের মুলুক ছেড়ে এখানে বাগদাদ নগরে হঠাৎ পানি বেচতে এলে কেন। বল তাে? এখানকার আদমিরা একারবারটিকে সুনজরে দেখে না। আর এতে কামাই করাও সম্ভব নয়।
আমি অল্প কথায় আমার নসীবের ব্যাপার বললাম। তিনি দোয়া করে পাঁচটি সােনার মােহর আমাকে ইনাম স্বরূপ দিয়ে দিলেন।
সিপাহী-সেনাপতি এবার সিপাহীদের উদ্দেশ্যে বললেন-“এ ভিস্তিওয়ালা আমার দেশওয়ালি ভাই। বিপদে পড়ে বাগদাদ নগরের পথে পথে পানি নিয়ে ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছে। তােমরা সাধ্য মত একে একটু-আধটু সাহায্য কর।
সিপাহীরা একে তার নির্দেশ জ্ঞান করে এক-এক পেয়ালা পানি খরিদ করল। বিনিময়ে একটি করে দিনার আমার হাতে গুজে দিল। এক লহমায় আমার জেবে এক শ'রও বেশী দিনার জমে গেল।
বিদায়-মুহুর্তে সিপাহী-সেনাপতি আমাকে বললেন—শােন ভাইয়া, এ সময়ে রােজই এখান দিয়ে যাই। তুমি এখানে পানি নিয়ে খাড়া থাকলে বহুৎ দিনার কামাই করতে পারবে। আমরা সবাই তােমার পানি খরিদ করব। এক সময় নিজের মুলুকে ফিরে গিয়ে তােমার দেনা যা কিছু আছে শোধ করতে পারবে। এখন চলি, কাল ফিন দেখা হবে।
সেনাপতির নির্দেশে সিপাহীরা ফিন হাঁটা জুড়ল।
পানি বেচে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই আমি এক হাজারেরও বেশী দিনার কামিয়ে ফেললাম। এবার নিজের মুলুকে ফিরে গিয়ে দেনা শােধ করে দেয়ার পরিকল্পনা করলাম। একদিন নিজের মুলুকের দিকে পা বাড়ালাম।
কিসসাটির এ পর্যন্ত বলতে না বলতেই ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
চারশ’ একান্নতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাহাপনা, ভিস্তিওয়ালা আলীর কাছে তার কিসসা বলে চলেছে—“আমি পথে নামলাম। কায়রাের পথে কিছুদূর যেতেই কায়রােগামী একদল যাত্রীর সঙ্গে মােলাকাৎ হয়ে গেল, আমি তাদের পিছু নিলাম।
আপনাকে বলা হয়ে ওঠে নি। আমি কায়রাে ফিরব শুনে সিপাহী-সেনাপতি আহমদ আমাকে একটি খচ্চর বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন । আর একশ’ মােহর আমার হাতে গুজে দিয়ে বলেছিলেন-“ভাইসাব, একটি জরুরী ও একদম গােপন কাজ তােমাকে করে দিতে হবে। খবরদার কাকপক্ষীও যেন জানতে না পারে। এক বাৎ, কায়রাে নগরের বহুৎ আদমির সঙ্গে কি তােমার
জান পহচান আছে?
‘জী হুজুর। আমীর-ওমরাহ আর শেরিফ আদমিদের সঙ্গে - ‘
‘এতেই হবে। এ চিঠিটি কায়রাে নগরের চাদ আলীর হাতে পৌছে দিও। আমার জিগরী দোস্ত ছিল এক সময়। তার হাতে চিঠিটি দিয়ে বােল তােমাদের ওস্তাদ এখন বাগদাদের খলিফা হারুণ-অল রসিদ-এর বড়ই প্রিয়পাত্র বনে গেছে, সুখেই দিন গুজরান করছে। সে যেন চিঠি পাওয়ামাত্র বাগদাদ নগরে চলে আসে।
আমি তার হাত থেকে লিফাফাটি নিয়ে কায়রােগামী আদমিদের দলে ভিড়ে গিয়ে নিজের মুলুকের দিকে হাঁটতে লাগলাম।
বাগদাদ থেকে কায়রাে পুরাে পাঁচ দিনের পথ। পাঁচদিন এক এক ভাবে পয়দল হাঁটাহাঁটি করে কায়রাে পৌছানাে গেল।
নিজের মুলুকে ফিরে সবার আগে দেনাদারদের পাওনা গণ্ডা মিটিয়ে দিলাম। সিপাহী-সেনাপতি আহমদ-এর উদ্দেশ্যে মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানাতেই হ’ল। তাঁরই দৌলতেই তাে নিজের মুলুকে ফিরে আসা সম্ভব হয়েছে।
দেনা শােধের পর নিশ্চিন্ত হয়ে ফিন ভিস্তি কাঁধে তুলে নিলাম।। শুরু করলাম জাত ব্যবসা। পথে পথে ঢুঁড়ে পেয়ালায় ঠুন ঠুন আওয়াজ তুলে পানি বেচা শুরু করে দিলাম।
আমার জেবে সিপাহী-সেনাপতি আহমদ-এর চিঠিটি সর্বদা আমার পকেটেই থাকে। চাদ আলীর হাতে সেটি তুলে দেয়া আমার একান্ত কর্তব্য।
আমি চাঁদ আলীর খোঁজে তামাম বাগদাদ নগর চষে ফেললাম। লেকিন তার পাত্তা লাগাতে পারলাম না। আমার সব কোশিস ব্যর্থ হ’ল। আজও তার সঙ্গে ভেট করতে পারলাম না। ভিক্তিওয়ালা কিসসাটির এ পর্যন্ত বলে চুপ করল।
এদিকে চাদ আলী আচমকা ভিস্তিওয়ালাকে বুকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে লাগল। আবেগ-মধুর স্বরে বলল –ভাই আমিই তােমার সে-চাদ আলী। কোথায় আমার চিঠি? তাড়াতাড়ি আমার হাতে দাও। দেখি, তােমার ওস্তাদ আহমদ কি লিখেছে।
চাঁদ আলীর এরকম আকস্মিক বাৎ শুনে ভিস্তিওয়ালা তাজ্জব বনে যায়। পর মুহূর্তেই মুখে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। এবার কোর্তার জেব-এর পকেটে হাত গলিয়ে আহমদ-এর চিঠিটি বের করে এনে তার হাতে দেয়। চাদ আলী চিঠিটি হাতে নিতে নিতে বলল —“ভাইয়া, তােমার সঙ্গে একটু-আধটু রূঢ় আচরণ করে ফেলেছি। গােসসা কোরাে না। আহমদ সাহাবকে ওস্তাদ ব’লে মানতাম। তার সাকরেদদের মধ্যে আমাকে বহুৎ পেয়ার করতেন।
চাদ আলী লিফাফার ভেতর থেকে এক টুকরাে কাগজ বের করে চোখের সামনে ধরল। তাতে লেখা রয়েছে—সুপ্রিয় চাঁদ, তুমি আমার লেড়কার সমান পেয়ারের পাত্র। তােমার প্রতি আমার আন্তরিক অভিনন্দন রইল। আমার দিলের সমাচার যে তােমাকে দেব সে-হিম্মৎ আমার নেই। খােদাতাল্লা যে আমাকে দুটো ডানার বন্দোবস্ত করে দেন নি।
আমার আশমানের চাঁদ, তুমি হয়ত শুনে খুশীই হবে, আমি এখানে চল্লিশটি শয়তানের মাথায় ওপরে চেপে, তাদের শিরােমণি সেজে মৌজ করে দিন গুজরান করছি। আমার অধীনস্থ সিপাহীরা সবাই এক-একটি পুরনাে দাগী আসামী। এক সময় এরা সবাই হাজার কিসিমের চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও রাহাজানি প্রভৃতিতে বিশেষ পারদর্শী ছিল। আর আজ ? খলিফার দোয়ায় সবাই শাহী তকমা লাভ করে বহাল তবিয়তে রয়েছে। খলিফা আমাকে নগর রক্ষার দায়িত্ব দিয়েছেন। আমাকে খলিফা হাজার দিনার বেতন দেন। তার ওপর উপরি রােজগার, ইনাম, বকশিস তাে রয়েছেই।
চাদ, আমার লেড়কার সমান চাদ, যদি ভবিষ্যৎ গুছিয়ে নেবার ধান্দা করতে চাও তবে চিঠিটি পাওয়ামাত্র সােজা আমার কাছে চলে এসাে। তােমার মাথায় যে-সব দুর্বুদ্ধি গিজগিজ করছে এখানে এসে সেসব কাজে লাগালে একদম চমক লাগিয়ে দিতে সক্ষম হবে। একদম বাজী মাৎ। বাগদাদের বাতাসে অর্থকড়ি অনবরত উড়ছে। তােমার মাফিক সর্বগুণের আধার এক লেড়কা আমার পাশে থাকলে আমি কেল্লা ফতে করে দিতে সক্ষম হ’ব। তুমি আমার পছন্দ মাফিক চেলা। আমি যেসব কায়দা কসরৎ তােমাকে শিখিয়ে পড়িয়ে তৈরি করে ফেলেছি তার ছােট খাটো দু-একটি যদি ছাড় তবে সবাই তাজ্জব বনে যাবে। আর খলিফা ? তােমার সবকিছু দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে পরম যত্নে-আনন্দে তােমাকে মাথায় তুলে রাখবেন। আমি আজই খলিফার কাছে তােমার তদ্বির তদারকি আগেই করে রাখব। এর ফলে তিনি তােমাকে দরবারের এক উঁচু পদে নিযুক্ত করবেন।
সবশেষে ফিন বলছি, জলদি চলে এসাে, দেরী কোরাে না। আমি তােমার জন্য অধীর প্রতীক্ষায় থাকলাম। খােদাতাল্লা তােমার ভালই করুন।ইতি, তােমার শুভাকাঙক্ষী আহমদ।
আহমদ-এর চিঠিটি পড়ার পর চাদ আলী যেন খুশীতে বিলকুল আত্মহারা হয়ে পড়ে। আনন্দ সামলাতে না পেরে ধেই ধেই করে নাচতে লেগে গেল। ভিস্তিওয়ালা ওঠার উদ্যোগ নেয়।
চাদ নাচতে নাচতে তার গলা জড়িয়ে ধরে। কোর্তার জেব থেকে এক মুঠো দিনার ও দিরহাম বের করে তার হাতে গুঁজে দিল। এবার লাফাতে লাফাতে গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে তার ভূগর্ভস্থ গােপন আস্তানায় ঢুকে যায়। আস্তানায় তার সহকর্মীরা বিশ্রাম নিচ্ছে। সবাইকে ডেকে খুশীতে ডগমগ হয়ে বলল—“ভাইয়া, ওস্তাদ আহমদ-এর তলব এসেছে। আমি বাগদাদে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এতে তােমাদের বক্তব্য কি?
চোর-ডাকুরা বেঁকে বসল—এ কী ধান্দা, ওস্তাদ ? আমাদের সবার জেব বিলকুল ফাঁকা । আর তুমি কিনা সটকে পড়ার ধান্দা করছ!”
-“আমার কোন কসুর নেই। নসীব আমাকে টানছে। পুরনাে ওস্তাদের তলব এসেছে। আমাকে যে যেতেই হবে। সহকর্মীরা বিলকুল বেঁকে বসল। তাকে কিছুতেই ছাড়তে নারাজ। সবশেষে চাঁদ আলী তাদের সান্ত্বনা দিল—“তােমাদের একদম পথে বসিয়ে কেটে পড়ার ধান্দা আমার আদপেই নেই। পথে দামাস্কাস পড়বে। সেখানে ক’দিন থেকে কিছু কামাইয়ের ধান্দা করে তােমাদের জন্য পাঠিয়ে দেব।' চাঁদ আলী মুসাফিরের পােশাক গায়ে চাপিয়ে নিল। কোমরের দু’ ধারে দুটো ছুরি কোর্তার তলায় নিয়ে নিল। হাতে একটি পাকা বাঁশের লাঠি। আর মাথায় চাপাল একটি অদ্ভুত টুপি।
সাজ পােশাক পরে তেজী ঘােড়ায় চেপে সহকর্মীদের কাঁদিয়ে চাদ আলী বাগদাদের পথে রওনা হল। কায়রাে থেকে কিছুদূর যেতেই দামাস্কাসের পথে একদল হজযাত্রীদের সঙ্গে চাদ আলীর মােলাকাৎ হ’ল। দলের মাতব্বর দামাস্কাসের সওদাগর-সমিতির শাহবানদর। বহুৎ শেরিফ আদমি। মক্কা থেকে হজ সেরে নিজের মুলুকে ফিরছে।
চাদ আলী খুবসুরৎ এক নওজোয়ান। শক্ত সাবুদ চেহারা। দাড়ি গোঁফ পর্যন্ত গজায় নি। এরকম এক নওজোয়ানকে পেয়ে শাহবাদার-এর নজরে ধরে গেল। সে সহজেই দলের সবার দিল জয় করে নিল। তবে এর পিছনে কারণও ছিল যথেষ্টই। দামাস্কাসে যাবার পথ খুবই বন্ধুর, বিপদ সঙ্কুল। প্রায়ই ডাকাতি ছিনতাই হয়। বাদাবী ডাকাতদের একচেটিয়া দখলে এ-পথ। তীর্থ যাত্রীদের সর্বস্ব কেড়ে বিলকুল উলঙ্গ করে ছাড়ে। আর জঙ্গলী জন্তু-জানােয়ারের ডরও কম নেই। একবার এক পেল্লাই বড় সিংহের আক্রমণ ঠেকিয়ে তাকে একদম জব্দ করে দেয়। এসবের জন্য চাদ আলী শাহবান্দার-এর বড়ই প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠে।
হাজী শাহবান্দার দামাস্কাসে হাজির হওয়ার পর চাঁদ আলী’কে এক হাজার সােনার দিনার বকশিস দিল। আর দলের অন্যান্যদের সবাইকে দিল পাঁচ-পাঁচ দিনার।
চাদ পথ খরচা বাবদ সামান্য কিছু রেখে বাকী সবটুকু কায়রােয় দলের সহকর্মীদের জন্য পাঠিয়ে দিল। তীর্থযাত্রীদের দলের সঙ্গে চাদআলী দামাস্কাসে পৌছে আহমদ -এর তল্লাস করল। তার ঠিকানা বলল বহুৎ আদমীকে। লেকিন ভিনদেশী ভেবে বা অন্য কোন কারণে কেউ তাকে তার ওস্তাদ আহমদ-এর পাত্তা বলে সাহায্য করল না।।
ওস্তাদ আহমদ-এর তাল্লাস করতে করতে এক ফাঁকা মাঠের ধারে হাজির হ’ল। সেখানে কয়েকজন গুণ্ডা বদমায়েশের সঙ্গে মােলাকাৎ হ’ল। তাদের ওস্তাদ জাইনাব-এর বােনের লেড়কা মহম্মদ। একদম বাচ্চা। উমর খুবই কম।
চাঁদ আলীকে দেখে মহম্মদ গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকাল। অদূরে একটি মিঠাইয়ের দোকান। সেটি দেখিয়ে আলী মহম্মদকে বলল —তােমরা মিঠাই খাবে? ওস্তাদ মহম্মদ উঠে দাঁড়ায়। নীরবে দোকানের দিকে এগােতে থাকে। তার অনুগামীরা তাকে অনুসরণ করল।
0 Comments