একশো উনপঞ্চাশ তম রজনী । আরব্য রজনী পর্ব ১৪৯ (Part 149 ) Sahasra ek arabya rajani

 গল্পের পরবর্তী অংশঃ  গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে ১ লিখে সার্চ করুন । 

বেগম শাহরাজাদ প্রায় মাঝরাত্রে বাদশাহ শারিয়ার-এর উপস্থিতিতে কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—জাহাপনা, কোতােয়াল প্রতারিতদের নিয়ে খলিফার দরবারে উপস্থিত হলেন।

খলিফাকে যথােচিত ভঙ্গীতে কুর্ণিশ করে অবনতঅবনত শিরে দাঁড়িয়ে রইলেন।

খলিফা প্রতারিতদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন। খলিফার প্রশ্নের উত্তরে গাধার মালিক ছােকরাটি প্রথমে তার গাধা যাওয়ার কিসসা শােনাল। তারপর এক এক করে সবাই নিজ নিজ দুর্দশার ব্যাপার খলিফার দরবারে পেশ করল। সব শেষে কোতােয়াল তার বিবির এক হাজার দিনার খােয়াবার কিসসা শােনাল।

খলিফা হারুণ-অল-রসিদ বুড়িটির ব্যাপার স্যাপারে একদম তাজ্জব বনে গেলেন। তার মুখ দিয়ে যেন রা সরছে না। দরবারে অখণ্ড নীরবতা নেমে এল। সবার চোখে-মুখে বিস্ময়ের ছাপ।

এক সময় খলিফাই নীরবতা ভঙ্গ করলেন—এতাে দেখছি, তাজ্জব ব্যাপার। এক জেনানা এতগুলাে বুদ্ধিমান বিচক্ষণ আদমিকে বিলকুল ভেড়া বানিয়ে ছাড়ল! | খলিফা তার সুলতানিয়তে এরকম তাজ্জব কাণ্ড ঘটার জন্য যারপরনাই মর্মাহত হলেন। তিনি মেনে নিলেন, তার শাসন ব্যবস্থায় গলতি থাকার জন্যই বুড়ির পক্ষে এমন দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হ’ল। প্রতারিতদের যার যা খােয়া গেছে রাজকোষ থেকে অর্থের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ করে দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন আর ডাকাতটিকে দশ থালা পিঠা-মধু খাইয়ে তৃপ্ত করবেন, এও সাফ সাফ জানালেন। লেকিন খলিফা বললেন—সবার আগে আমার হুকুম, যে-ধূর্ত বুড়িটিকে আমার সামনে দেখতে চাই। যেখানে, যতদূরে, পাতালের ভেতরে লুকিয়ে থাকলেও তাকে আমার সামনে হাজির করতে হবে।'

খলিফা এবার তার দেহরক্ষী মুস্তাফা এবং কোতােয়াল খালিদকে লক্ষ্য করে বললেন—ধূর্ত বুড়িটির তাল্লাস চালাও। খবরদার শুধুহাতে যেন ফিরে এসাে না। যাও, আমার হুকুম তামিল

করো ।  

খলিফার হুকুম শুনে কোতােয়াল খালিদ-এর মাথায় যেন আশমান ভেঙ্গে পড়ার জোগাড় হ’ল। খলিফার হুকুমের অর্থ তাে তার জানাই আছে। তিনি কাঁদো কাঁদো স্বরে বললেন—জাহাপনা, মেহেরবানি করে আমাকে ছাড়ান দিন। বুড়ি যেন কখন, কোন্ রূপ ধরে আক্রমণ চালায় তার হদিস পাওয়া আমার হিম্মতে কুলােবে না। আপনি বরং অন্য কাউকে - 

খলিফা সরবে হেসে বললেন—“তবে কোতােয়ালের পদটিও অন্য কাউকেই দিয়ে দেয়া যাক, তােমার কি মত?

জাহাপনা, যদি তাই হয় তবে আপনার সিপাহী আহমদ এর ওপরই এ-পদের দায়িত্ব দিন। বুড়ি তার চোখে ধূলাে দিতে পারবে না। এতেই তার হিম্মৎ বুঝতে পারা যাবে।

খলিফা উল্লসিত হয়ে আহমদ-এর ওপর ধূর্ত বুডিটিকে পাকড়াও করার দায়িত্ব দিলেন।

আহমদ খলিফার হুকুম মাথায় নিয়ে চল্লিশজন অশ্বারােহী সিপাহী নিয়ে বাগদাদের পথে পথে বুড়ির তল্লাশ চালাতে লাগল। আহমদ এক সময় নিজেই চুরি, ডাকাতি ও রাহাজানি প্রভৃতি সমাজবিরােধী কাজে লিপ্ত ছিল। সে ছিল পাণ্ডা।

বাগদাদের পথে পথে বুড়ির তল্লাশ করতে গিয়ে কয়েক চক্কর মারার পর আহমদ-এর প্রধান সাকরেদটি বলল-“হুজুর, বুড়িটি মহা ধড়িবাজ, আদমির সঙ্গে দিনের পর দিন প্রতারণা করে তার বুদ্ধি-কায়দা বিলকুল পাকা হয়ে গেছে। এক কাজ করুন, আপনি বরং বুড়িকে পাকড়াও করার দায়িত্ব হাসান-এর ওপর দিন। তিনি এর একটি হিল্লা করতে পারবেন, আমার বিশ্বাস।।

আহমদ সাকরেদটির বাৎ শুনে রীতিমত খেকিয়ে ওঠে—‘ধ্যৎ, তুমি একটি আস্ত আহাম্মক। নাম-যশ কেনার এতবড় একটি সুযােগ আমি স্বেচ্ছায় হতচ্ছাড়া হাসানকে ছেড়ে দেব! আহমদ কখন যে হাসান-এর বাড়ির সামনের রাস্তায় এসে পড়েছে তার মালুমই ছিল না।

আহমদ হাসান বাড়ির দরওয়াজার কাছাকাছি ঘােড়া দাঁড় কলিয়ে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে তার সাকরেদকে বলতে লাগল—“তােমার কি দিমাক খারাপ হয়ে গেছে! বুড়িটি যতই ধূর্ত হােক না কেন তাকে পাকড়াও করা এমন কি কঠিন সমস্যা! আর আমি যদি না-ই পারি তবে তার দায়িত্ব হাসানকে দিয়ে নিজে আঙুল চুষব নাকি! বুড়িকে খলিফার সামনে হাজির করতে পারলে আমার ওপর খলিফার আস্থা একদম তুঙ্গে উঠে যাবে, ভেবেছ। আর ইজ্জতও কম বাড়বে না। আর তুমি বলছ কি না হাসানকে স্বেচ্ছায় তা ছেড়ে দেব, তােমার দিমাকে কিছু নেই দেখছি।

হাসান তার মকানে জানালায় দাঁড়িয়ে আহমদ-এর বিলকুল বাৎ শুনল, সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল —“বহুৎ আচ্ছা! দেখা যাবে কার হিম্মৎ বেশী। আমার নাম হাসান। তােমার হিম্মৎ আমি দেখে ছাড়ব।'

আহমদ তার সিপাহীদের বলল —-“তােমরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়। মকানে মকানে জোর তল্লাশী চালাও। একদম চিরুণী তাল্লাশি চালাবে। সবাই গিয়ে মুস্তাফার মকানের সামনে আমার সঙ্গে মােলাকাৎ করবে। এদিকে মকানে মকানে ঢুকে তাল্লাশী চালাবার খবরটি বাতাসের কাধে ভর করে তামাম বাগদাদ নগরে ছড়িয়ে পড়ল। খবরটি ধূর্ত বুড়ি ডিলাইলাহ এবং তার লেড়কি জাইনাব এর কানে যেতেও দেরী হ’ল না।

ধূর্ত বুড়ি আহমদ-এর বুদ্ধি ও কায়দা-কসরৎ-এর দৌড় সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল আছে। তাকে বাগে পায়, ও আহমদ-এর কম্ম নয়। তবে হাসান খুবই পারদর্শী। তার উপস্থিত বুদ্ধি ও ক্ষিপ্রতার ওপর বুড়ির ভয়-ডর যথেষ্ট। তাই বুড়ি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরেই রয়ে গেল। বুড়ি তার লেড়কি জাইনাব’কে বলল —“বেটি, আজ আমার তবিয়ৎ আচ্ছা নেই। আজ আর হিম্মৎ দেখাতে পথে নামব না। আজকের দিনটি তাের ওপর ছেড়ে দিলাম। যা, এক চক্কর মেরে আয়। তাের কায়দা-কসরৎ-ও যে আমার চেয়ে কোন অংশে কমতি নয় তা আহমদ আর তার উড়ু চল্লিশটি সিপাহীকে হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দিয়ে আয় তাে।

জাইনাব মুচকি হেসে বলল —“আম্মা, তােমার দোয়া থাকলে আমাকে রুখবে কার সাধ্য ? আমি এক তুড়ি দিয়ে বাজী মাৎ করে। তােমার কোলে ফিরে আসব।' এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চার শ’ ছেচল্লিশতম রজনী

বেগম শাহরাজাদ বাদশাহ শারিয়ার-এর উপস্থিতিতে কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—“জাঁহাপনা, ধূর্ত বুড়ির লেড়কি জাইনাব অভিযানের প্রস্তুতি নিতে লাগল। জাইনাব খুবসুরৎ লেড়কি। তাকে এক লহমায় দেখলেই যে কোন নওজোয়ানের দিলে কামনার সঞ্চার হতে বাধ্য। সে পূর্ণ যৌবনা। বক্ষ সমুন্নত নিতম্ব সুপ্রশস্ত। আর কোমর ? হাতের মুঠোয় ধরা যায়। আর ডাগর ডাগর চোখ দুটোর দিকে তাকালে যে কোন নওজোয়ানের কলিজার নাচানাচি শুরু হয়ে যায়।

জাইনাব তার আম্মাকে বলল—“আমি আমার কুমারীত্বের নামে কসম খেয়ে বলছি, চল্লিশ সিপাহীকে আমি আজ নাস্তানাবুদ করবােই করবাে। জাইনাব আম্মার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পথে নামল। মুস্তাফার মকানের গায়ে হজ করিম-এর সরাবের দোকানে হাজির হ’ল। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চোখের বাণ ছুঁড়ল।

ব্যস করিম সঙ্গে সঙ্গে একদম কাৎ। জাইনাব আচমকা করিম এর দিকে পাঁচটি দিনার এগিয়ে ধরে বলল—“আমার একটি ঘরের খুব দরকার। মাত্র একটি দিনের জন্য আমাকে একটি ঘর ভাড়া দিতেই হবে। আমার কিছু ইয়ার-দোস্ত আসবে একটু-আধটু মজা করতে।'

করিম এক কথাতেই রাজী হয়ে গেল। ঘরের পাকা বন্দোবস্ত করে জাইনাব ফিন নিজের মকানে ফিরে এলাে। কারণ, সে-গাধা ও ঘােড়াটি তাদের মকানে বাঁধা রয়েছে। গালিচা ও বিছানাপত্র গাট্টি বেঁধে তাদের পিঠে চাপিয়ে করিম-এর সরাবখানায় ফিরে এল।

জাইনাব এবার বহুৎ কায়দা কসরৎ করে সরাবখানার কামরাটিকে সাজিয়ে ফেলে। হঠাৎ করে দেখলে মালুম হবে এটি নির্ঘাৎ কোন আমীর-বাদশাহের কামরা।

জাইনাব সবে কামরাটি সাজানাের কাজ মিটিয়েছে ঠিক তখনই আহমদ-এর প্রধান সহকারী আলীর নেতৃত্বে নয়জন অশ্বারােহী, সিপাহী সেখানে হাজির হল।

আলী জিজ্ঞাসা করল—“তুমি কে? এখানে কি করছ, বল তাে? জাইনাব তার দিকে ফিরে আচমকা চোখের বাণ ছুঁড়ে দিল। ব্যস, খেল শুরু। তার কলিজাটি এক লহমায় যেন দরকচা মেরে গেল।

জাইনাব জিজ্ঞাসা করল—“আপনিই কি সেনাপতি আহমদ ?

—“ইয়া আল্লা! আমি সেনাপতি আহমদ হতে যাব কেন? আমি তারই অধীনস্থ কর্মচারী। আলী আমার নাম। আহমদ’কে তােমার কোন্ দরকার? যদি কিছু বলার থাকে আমাকেও বলতে পার। তিনি যা পারবেন তা হয়ত আমিও পেরে যেতে পারি।'

জাইনাব ফিন চোখের বাণ মেরে ফিক করে হেসে বলল—‘পারবেন, জরুর পারবেন। ইস, আপনাকে খাড়া করিয়ে রেখে চলুন, কামরার ভেতরে চলুন। | জাইনাব এবার এক সিপাহীকে দিয়ে বিরাট একটি সরাবের জালা আনাল। তাতে আগে ভাগেই আফিং মিশিয়ে রেখেছিল।

সরাব পাওয়ামাত্র সিপাহীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ল। গলা পর্যন্ত গিলল। ব্যস, সরাব এবং আফিং একযােগে কাজ শুরু করে দিল। দেখতে দেখতে তারা নেশায় বুদ হয়ে গেল। লুটিয়ে পড়ল। মেঝেতে। জাইনাব এবার এক এক করে সব ক’টিকে পায়ে ধরে টানতে টানতে সরাবখানার পিছনে জঙ্গলে রেখে এল। কাজ সেরে জাইনাব ফিন কামরাটিতে গােছগাছ করে ফেলল ।  এবার সে তাদের সর্দার আহমদ-এর জন্য অধীর প্রতীক্ষায় সে নিঃসন্দেহ, যখনই হােক আসতে তাকে হবেই।

জাইনাব-এর ধারণা অভ্রান্ত। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘােডা হাঁকিয়ে আহমদ সরাবখানায় দরওয়াজায় হাজির হল। সেখানে মুখেই জাইনাব’কে দেখেই থমকে গেল। হাড় গিলা পাখির মাফিক লােলুপ দৃষ্টিতে তার সুরৎ নিরীক্ষণ করতে লাগল। 

জাইনাব সঙ্গে সঙ্গে সুযােগের সদ্ব্যবহার করল। আচমক চোখের বাণ ছুঁড়ে দিল আহমদ-এর দিকে। অব্যর্থ তার বাণ। এতে জাঁদরেল সেনাপতি আহমদ বিলকুল কুপােকাৎ হয়ে গেল। ঠোটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে জাইনাব বলল—আপনি যে আসবেন আমি আগেই জানতাম। তাই তাে নিজে বাহারী সাজ গায়ে চাপিয়েছি। কামরাটিকেও সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছি।

আহমদ তার বাৎ শুনে একদম তাজ্জব বনে গেল। আমি যে আসব, জানতে? আমি নিজেই তাে জানতাম না, লেকিন তুমি—

–কেন, আপনার সহকারী আলী সাহাব একটু আগেই তাে বলে গেছেন, আপনি এখানে বিশ্রাম করবেন।

“বিশ্রাম’ শব্দটি কানে যেতেই আহমদ-এর কলিজাটি নতুন করে দাপাদাপি জুড়ে দেয়। লালসা মাখানাে নজরে জাইনাব-এর যৌবনের জোয়ারলাগা শরীরটিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। তার সমুন্নত স্তনদ্বয় থেকে যেন তার চোখ ফেরানােই দায় হয়ে পড়েছে, তার ওপর নিতম্বের নাচানাচি তাে রইলই। 

জাইনাব বলল —“হুজুর, আলী সাহাব যাবার সময় আমাকে বার বার বলে গেছেন ডিলাইলাহ নামে বুড়িটির জন্য আপনি যেন  একদম চিন্তা না করেন। তার হদিস মােটামুটি পেয়েই গেছেন। যে করেই হােক তাকে আপনার সামনে হাজির করবেনই।

জাইনাব আচমকা আহমদ-এর একটি হাত ধরে ছােট্ট করে একটি টিপস দিয়ে বলল—কী শরমের ব্যাপার বলুন তাে! আপনাকে দাঁড় করিয়ে রেখে—চলুন, ভেতরে গিয়ে বিশ্রাম করবেন।

জাইনাব-এর হাতের ছোঁয়া পাওয়া মাত্র জাদরেল সেনাপতি আহমদ-এর দিমাক বিলকুল গড়বড় হয়ে যাবার জোগাড় হ’ল। শরীরের সব ক'টি স্নায়ু যেন এক সঙ্গে ঝনঝনিয়ে উঠল। খুনে লেগে গেল মাতন। ব্যস,কম্ম ফতে। ক্ষুধার্ত নেকড়ের মাফিক জাইনাব-এর পিছন পিছন কামরার ভেতরে ঢুকে গেল।

জাইনাব আহমদ’কে বসতে দিয়ে আফিং মিশ্রিত সরাব এগিয়ে দিল। আহমদ ঢকঢক করে গলা পর্যন্ত সরাব গিলে ফেলল। ব্যস, এক লহমার মধ্যেই সরাবের কাজ শুরু হয়ে গেল। চোখ বন্ধ হয়ে  আসতে লাগল।

আহমদ টলতে টলতে জাইনাব-এর দিকে হাত দুটো বাড়িয়ে দিয়ে তাকে ধরার কোশিস করল।

জাইনাব সতর্কতার সঙ্গে সামান্য সরে গেল। আহমদ গিয়ে পড়ল দেয়ালে হুমড়ি খেয়ে। বিকট আর্তনাদ করে সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।

কয়েক লহমার মধ্যেই আহমদ বেচারা বিলকুল বেহুঁস হয়ে এলিয়ে পড়ল। জাইনাব-এর মুখে শয়তানীর হাসি ফুটে উঠল। সে এবার ব্যস্ত হাতে আহমদ-এর গা থেকে হীরা-জহরতের বােতাম, তাগা, অঙ্গুঠি ও গলার মুক্তার হার প্রভৃতি খুলে নিল। এমন কি একটিমাত্র খাটো জাঙ্গিয়া রেখে তার বিলকুল পােশাকও খুলে নিল। জাইনাব এবার তার পায়ে ধরে টানতে টানতে দোকানের পিছনে তার সংজ্ঞাহীন সহকর্মীদের ওপর ফেলে দিয়ে এল।

ভাের হবার আগেই জাইনাব নিজের মকান থেকে নিয়ে আসা সামানপত্র গাধা আর ঘােড়াটির পিঠে চাপিয়ে আম্মার কাছে ফিরে এল । 

লেড়কীর মুখে তার এক রাত্রির কাণ্ডকারখানার বাৎ শুনে বুড়ি ডিলাইলাহ তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল। আবেগের সঙ্গে বলল - বহুৎ আচ্ছা! আমার বেটির মাফিক কাজই করেছিস বটে।

এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চার শ’ সাতচল্লিশতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাঁহাপনা, জাইনাব তাে কাজ হাসিল করে নিজের মকানে ফিরে গেল। এদিকে আহমদ ও তার চেলাচামুণ্ডারা বেহুঁস হয়ে দু’দিন-দু'রাত্রি সরাবের দোকানের পিছনে ঝােপের মধ্যে পড়ে রইল।

তৃতীয় দিন সকাল থেকে তারা এক এক করে চোখ খুলতে লাগল। চারদিকে ঝােপঝাড় দেখে তারা মালুমই করতে পারল না কোথায় পড়ে রয়েছে। কেন, কিভাবেই বা এখানে এল। আর তাদের পােশাক আশাক খুলে কে-ই বা প্রায় উলঙ্গ করে এখানে ফেলে রেখে গেছে।

সে-মুহূর্তে তাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা হয়ে দাঁড়াল প্রায় বিবস্ত্র অবস্থায় কি করে লােকালয়ে বেরােবে? কোন ফন্দিফিকির করতে না পেরে আহমদ সে-অবস্থায় সদলবলে জঙ্গল ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পথে নামল।

একেই বলে নসীবের ফের। পথে পা দিতে না দিতেই তারা এখানে একদম হাসানের মুখােমুখি হয়ে গেল।

হাসান সুচতুর ও বিচক্ষণ আদমি। এক লহমাতেই সে ব্যাপারটি সম্বন্ধে মােটামুটি আঁচ করে নিল। হাসান চোখে-মুখে কৃত্রিম বিস্ময়ের ছাপ এঁকে ব’লে উঠল—এ কী তাজ্জব ব্যাপার আহমদ সাহাব! আপনাদের এরকম হালৎ কে করল? আপনার নসীবে এ-ও ছিল ? এরকম দৃশ্য দেখব খােয়াবের মধ্যেও আমি কিন্তু কোনদিন ভাবিনি।

আহমদ শরম ভুলে গিয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল -হাসান ভাইয়া, সামান্য একটি লেড়কি যে এমন ফেরেফবাজী করতে পারে তা আমার সহকর্মীরা তাে কোন্ ছার আমিও ভাবতে পারি নি। এতগুলাে আদমিকে লেড়কিটি একদম বেকুব, মুরগী বানিয়ে ছাড়ল!

—কে সে-লেড়কি আমি ধরতে পেরেছি আহমদ ভায়া।। —“কে? কে সে, চেন?’

–‘চিনি। আলবৎ চিনি, তাকে চিনি। এমনকি তার বুড়ি আম্মাটিকেও চিনি। তাদের তােমার সামনে হাজিরও করতে পারি।

-“তাদের একদম হাজিরও করতে পার?'

–‘জরুর পারি। আলবৎ পারি। তবে তােমাকে একটি শর্ত মানতে হবে। শর্তটি হচ্ছে, খলিফার সামনে দাঁড়িয়ে তােমাকে স্বীকার করতে হবে তােমার মুরােদে কুলায় নি। আর বলবে,

Post a Comment

0 Comments