একশো আটচল্লিশ তম রজনী । আরব্য রজনী পর্ব ১৪৮ (Part 148 )

 গল্পের পরবর্তী অংশঃ  গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে ১ লিখে সার্চ করুন । 

এদিকে কোতােয়াল দিবা-নিদ্রা সেরে কামরা থেকে বেরিয়ে এলেন। বিবির মুখে বান্দা খরিদের ব্যাপার শুনে যেন একদম আশমান থেকে জমিনে পড়লেন। চোখ দুটো কপালে তুলে বললেন–বান্দা ? কিসের বান্দা? কে বান্দা খরিদ করতে চেয়েছিল?

এক হাজার দিনার খােয়া যাওয়ার চেয়ে ইজ্জতের ব্যাপারটিই কোতােয়ালের কাছে এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। খােদ কোতােয়ালের বিবির কাছ থেকে এক বুড়ি এক হাজার দিনার…  কোতােয়াল মুখ দেখাতে পারবে?

কোতােয়াল উন্মাদের মাফিক ছুটতে ছুটতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে বৈঠকখানায় এলেন। সেখানে পাঁচটি প্রতারিত বেচারা ছাড়া আর কাউকেই চোখে পড়ল না। কোতােয়াল খােজা প্রহরীকে জিজ্ঞাসা করল—“শয়তানী ধূর্ত বুড়িটি কোথায়?

খােজাটি হাত কচলে জবাব দিল—‘জী হুজুর, আমি তাে তাকে ওপর তলায় মালকিনের হাতে জিম্মা রেখে এসেছিলাম। ব্যস, আর তো কিছুই জানি না।

—“তাের মালকিন এক হাজার দিনার দিয়ে যে পাঁচ-পাঁচটি বান্দা কিনেছে, কোথায় তারা?

খােজাটি সবিস্ময়ে বলল–বান্দা? মালকিন খরিদ করেছেন? কই, আমি তাে এসব কিছুই জানি না।'

কোতােয়াল গর্জে উঠলেন—“জানিস না? কেন জানবি না? পাঁচ-পাঁচটি আদমি তাের চোখে ধূলাে দিয়ে কপূরের মাফিক একদম উড়ে গেল। তাই যদি হয় তবে আর তােকে পাহারায় রেখেছি কেন হতচ্ছাড়া নচ্ছাড় কহিকার।

কোতােয়াল এবার বসে থাকা পাঁচ প্রতারিত বেচারাদের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন‘তােমাদের সঙ্গে কি কোন বুড়ি ছিল? তারা সমস্বরে জবাব দিল—‘জী হুজুর।

তবে আর সুলতান বাদশার মাফিক চেয়ারে বসে পা নাচাচ্ছ কেন? তােমরাই তবে আমার বিবির খরিদ করা বান্দা? যাও, কাজে লেগে পড়গে।'

বেচারা প্রতারিতরা কেঁদে কেটে বলল—এ কী বাৎ বলছেন হুজুর! আমরা বান্দা হতে যাব কেন। আমরা খলিফার একান্ত অনুগত প্রজা।

—বাতেলা রেখে কাজে লেগে পড়। রীতিমত এক হাজার দিনার দিয়ে খরিদ করা হয়েছে। নক্কারবাজি রেখে যা বলছি কর। নইলে বান্দাকে দিয়ে কিভাবে কাজ করাতে হয় সে কায়দা কসরৎ আমার ভালই জানা আছে।

—“আপনি এসব কি বলছেন, মালুম হচ্ছে না। আমরা এসেছি আপনার কাছে বিচার…… 

‘ধানাই পানাই রেখে কাজে লেগে যাও, এখনও বলছি।

‘আমরা নিয়ম মাফিক খলিফাকে কর দেই, তার আইন কানুন মেনে চলি, আমাদের ওপর এরকম জুলুম চালালে আমরা খলিফার দরবারে আপনার নামে আর্জি জানাতে বাধ্য হব। খলিফার দরবারে চলুন, তিনিই আমাদের বিচার করবেন।

এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চারশ’ তেতাল্লিশতম রজনী

বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—‘জাঁহাপনা, প্রতারিত পাঁচ বেচারার বাৎ শুনে কোতােয়াল খালিদ রীতিমত তড়পাতে লাগলেন। তােমরা বান্দা না হলে নির্ঘাৎ ফেরেফবাজ। আমার বিবিকে ধোঁকা দিতে এসেছ। আমার বিশ্রামের মওকা বুঝে বুড়ির সঙ্গে জোট বেঁধে আমার বিবির কাছ থেকে এক হাজার দিনার চোট করে নিয়েছ। ‘এ কী তাজ্জব ব্যাপার শুরু করলেন। আপনার বাৎ আমাদের ইজ্জৎ হানি করছে কোতােয়াল সাহাব।

–‘ধোঁকাবাজ, ফেরেফবাজ শয়তানদের ইজ্জৎ! ধান্দা ছাড়। বেশী বেগড়বাই করলে পরদেশী বান্দা কারবারীদের কাছে তােমাদের বেচে দেব, বলে রাখছি।

কোতােয়াল যখন পাঁচ প্রতারিতকে নিয়ে নাজেহাল হচ্ছেন। ঠিক তখনই খলিফার দেহরক্ষী মুস্তফা সেখানে হাজির হল।

মুস্তাফা দু'দিন আগে সে বুড়ির দ্বারা তার বিবি খাতুন-এর প্রতারিত হওয়ার বিবরণ দিয়ে আর্জি জানিয়ে গিয়েছিল। বুড়িকে ধরতে পেরেছেন কিনা, খোঁজ নিতে এসেছেন।

মুস্তাফার বিবি এখন তাকেই দোষারােপ করছে, সে শাদী করে নয়া বিবি ঘরে আনার ডর দেখিয়েছে বলেই তাে ঠগবাজ শয়তানী বুড়ির শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়েছিল। তাকে নির্মম ভাবে আঘাত না করলে জরুর বুড়িটির খপ্পরে পড়ত না, কেলেঙ্কারীর ফাঁদে পা দিত না। 

খলিফার দেহরক্ষী খালিদ কোতােয়ালকে দেখেই গজে উঠল—“তুমি একটি অপদার্থ কোতােয়াল। কোতােয়াল হওয়ার কোন মুরােদই তােমার নেই। তােমার অপদার্থতার জন্যই আজ তামাম বাগদাদ নগর চোর-ডাকাত আর ফেরেফবাজে ছেয়ে গেছে। দিনে দুপুরে খলিফার দেহরক্ষীর বাড়ি ঢুকে তার বিবিকে বের করে নিয়ে যায়—অরাজকতা!

তার মুখের বাৎ শেষ হবার আগেই পাঁচ প্রতারিত বেচারা সমস্বরে বলে উঠল-‘মুস্তাফা ভাইয়া, আমাদের হালৎ-ও আপনার মাফিকই। ধাপ্পাবাজ সে-বুড়িটির খপ্পরে পড়ে আমরাও নাজেহাল হয়ে কোতােয়াল সাহাবের শরণাপন্ন হয়েছিলাম।'

এবার পাঁচজন নসীব-বিড়ম্বিত প্রতারক তাদের নিজ নিজ নাজেহালের বিবরণ দিল।

মুস্তাফা সবকিছু শুনে মুহূর্তকাল গুম হয়ে রইল। এক সময় সে মুখ খুলল —‘হ্যা, আমার বাৎ-ই দেখছি সাচ্চা। কোতােয়ালের অকর্মণ্যতার জন্যই আমরা, এতগুলাে আদমিকে নাজেহাল হতে হয়েছে, লােকসানের বােঝা বয়ে নিয়ে বেড়াতে হচ্ছে।

কোতােয়াল খালিদ বললেন-‘মুস্তাফা, তােমার বিবির কাছে তােমাকে খাটো হতে হচ্ছে, আমার মালুম আছে। তুমি নিশ্চিন্ত হতে পার। হতচ্ছাড়ি বুড়িকে আমি পাকড়াও করবই করব।

‘খুব হয়েছে। আপনার মুরােদ আমার জানা হয়ে গেছে। মুস্তাফা এবার পাঁচ প্রতারিতের দিকে গিয়ে বলল—“তােমরা কি ঠগী বুড়িটিকে দেখলে সনাক্ত করতে পারবে?

গাধার মালিক ছােকরাটি বল্ল-‘আমরা সবাই পারব। আর আমি তাে হাজারটি বুড়ির মাঝখান থেকে তাকে ঠিক বের করে ফেলতে পারব। আমার সঙ্গে দশটি সিপাহী দিলে তাকে পাকড়াও করে আপনার সামনে হাজির করতে পারব।' 

গাধার মালিক ছােকরাটি মুস্তাফার কাছ থেকে দশটি সিপাহীকে সাহায্যকারী হিসাবে নিয়ে পথে পথে ঢুঁড়ে, তাল্লাশী চালিয়ে বুড়িকে ধরে ফেলল । তাকে বেঁধে হাজির করল কোতােয়ালের এজলাসে।

কোতােয়াল পাঁচ প্রতারকের জিম্মায় বুড়িকে রেখে দিলেন। সকালে আদালতে হাজির করা হবে। বিচার হবে। শাস্তি দেওয়া হবে।

বুড়ি মুখ কাচুমাচু করে বাৎ বলল— কী তাজ্জব ব্যাপার! আমার তাে কিছুই মালুম হচ্ছে না। জিন্দেগীতে কারাে সামানপত্র গায়েব করা তাে দূরের ব্যাপার কারাে একটি কানাকড়িও গায়েব করিনি। আর আমাকে ধরেই কি নাজেহাল না করা হচ্ছে।

বুড়ির ন্যাকামিতে কেউ কান দিল না।

পাঁচ প্রতারকের জিম্মায় বুড়িকে রাখা হ’ল। তারা নগরের সীমানায় একটি প্রাচীরের ধারে ইয়া মােটা একটি খুঁটি পুঁতে তার সঙ্গে বুড়িটিকে আচ্ছা করে বেঁধে ফেলল। তারপর তারা তাকে ঘিরে পাহারায় নিযুক্ত রইল।

রাত্রি গভীর হলে পাঁচ প্রতারক বুড়িকে ঘিরে নিদ দিতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিদে একদম বিভাের হয়ে পড়ল।

কিছুক্ষণ বাদে বুড়ি দেখল, দু’জন ঘােড়সওয়ার সেখানে হাজির হয়েছে। তারা বুড়ির কাছাকাছি এসে কি যেন ভেবে ঘােড়া দাঁড় করাল। একজন তার সঙ্গীকে বলল —“ভাইয়া, বাগদাদ নগরে সবচেয়ে মজার কাজ কি করেছ, বলতে পার?’ 

—“মজার কাজ? —“হ্যা ভাইয়া, কোন্ কিসিমের মজার কাজ করেছ? এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চারশ’ চুয়াল্লিশতম রজনী

শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাঁহাপনা, ঘােড়সওয়ারটি তার সঙ্গীর জবাবে বলল—‘খােদাতাল্লার মর্জিতে আমার সবচেয়ে মজার খানা গলা পর্যন্ত ঠেসে খেয়েছি।

–‘কোন কিসিমের খানা তুমি সবচেয়ে বেশী পছন্দ কর ?

–‘খাঁটি মধু মাখিয়ে মাখিয়ে পিঠে খেতে আমি সবচেয়ে পছন্দ করি।

বাৎচিৎ করতে করতে হঠাৎ ঘাড় ঘােরাতেই এক ঘােড়সওয়ার বুড়ীকে দেখতে পেল । ব্যাস্ত পায়ে তার কাছে গেল । 

বুড়ি সিপাহীদের দেখেই কেঁদে কেটে বলল-বাছা, আমার জান বাঁচাও। মেহেরবানি করে এ-জল্লাদদের কবল থেকে আমাকে , রক্ষা কর।

ঘােড়সওয়ারদের একজন বলল—কে তুমি? তােমার এ-দশা কেন করল? তাজ্জব ব্যাপার, এক জেনানাকে পাষণ্ডরা এমন করে বেঁধে রেখেছে! তােমার কসুর কি ছিল যার জন্য এ-হালৎ করেছে?

বুড়ি বলল-“আমার দুঃখের কিসসা বললে তােমাদেরও চোখের পানি ঝরবে বেটা । আমার এক দুশমন আছে। সে বহুত আচ্ছা পিঠা বানাতে পারে। মধু মাখিয়ে খেতে খুব স্বােয়াদ লাগে।

নগরে তার পিঠের বহুৎ নাম। সে-আদমি একদিন আমাকে বিনা কারণে বেদম মারধাের করল। তাই আমি তার ওপর ঈর্ষায় জর্জরিত হচ্ছি। একদিন আমি গােসসা করে তার পিঠার থালায় থুথু ছিটিয়ে দিয়েছিলাম। আমার নামে সে-আদমি কোতোয়ালের কাছে নালিশ করল। ব্যস, তারপরই আমাকে এখানে পিঠমােড়া করে বেঁধে রেখে যায়।

কোতােয়াল আমাকে বল্ল-“তােমাকে খালাস দিতে পারি, লেকিন তােমাকে এক থালা পিঠা মধু মাখিয়ে মাখিয়ে খেতে হবে। যতদিন আমি তার আদেশ মাফিক এক থালা পিঠা খেতে না পারব ততদিন আমাকে এখানে বন্দী থাকতে হবে। আদতে আমি পিঠা, মিঠাই খেতেই পারি না। উল্টি আসে। কাল ভােরেই দশ-থালা পিঠা আর মধু নিয়ে হাজির হবে। খাওয়ার জন্য আমার ওপরে জলম করবে। সে-দৃশ্যের ব্যাপার ভাবলেই আমার কলিজা শুকিয়ে যায়। 

দস্যুরা বুড়ির সমাচার শুনে বুড়ির জন্য দুঃখ প্রকাশ করল। তারপর তারা বল্ল-“দেখ বুড়ি, আমরা দু'জনই পিঠা-মধু বহুৎ পছন্দ করি। তুমি চাইলে আমরা তােমার জন্য বরাদ্দ পিঠা-মধু খেয়ে সাহায্য করতে পারি। 

‘সে যে এমনিতে হবার নয়। এ-খুঁটিতে বাঁধা না থাকলে পিঠা-মধু দেবে কেন? কারণ, হুকুম আছে, যে আদমি খুঁটিতে বাঁধা তাকে দশ-থালা পিঠা-মধু খাওয়াতে হবে। দস্যুদের একজন অন্যজনকে বলল—“ভাইয়া, আমি তাে গলা পর্যন্ত ঠেসে পিঠা-মধু খেয়েই এসেছি, পেট একদম ভর্তি। তুমি বরং থেকে যাও। ভােরে পিঠা-মধু সাধ মিটিয়ে খেয়ে নিও। সে ঘােড়া হাঁকিয়ে বিদায় নিল।

এবার অন্য দস্যুটি বুড়ির বাঁধন খুলে খালাস করে দিল। বুড়ির পােশাক আশাক নিজে পরে নিল। আর নিজের পােশাক দিল বুড়িকে। বুড়ি তাকে খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে বাঁধল। কে বলবে বুড়িটিই খুঁটির সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় নেই। বুড়ি এবার মােওকা বুঝে একলাফে ঘােড়ার পিঠে চেপে বসল। ঘােড়া তাকে নিয়ে উধ্বশ্বাসে ছুটে চল্ল। ভাের হ’ল। পাঁচ প্রতারিতের নিদ টুটল।

ঘােড়সওয়ারটি বলল—“কি হে, পিঠা-মধু কোথায়?’ গাধার মালিক ছােকরাটি তার কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করল। এ যে পুরুষের কণ্ঠস্বর! সে বলল —“তুমি কে হে? তুমি এখানে কি করে এলে ? বুড়িটি কোথায়?

–ও সব বাৎ ছাড় ইয়ার, জলদি পিঠা নিয়ে এসাে।

– “কিসের পিঠা ? পাগলের মাফিক কি সব বকছ! আগে জবাব দাও বুড়িটি গেল কোথায়?

-“বুড়ি ভেগেছে। আমার ঘােড়া নিয়ে ভেগেছে। সে তাে আর | পিঠা-মধু খেতে পারবে না। তাকে বেঁধে রেখে তবে আর ফয়দা কি? তাই খালাস করে ভাগিয়ে দিয়েছি।' 

প্রতারিত সমঝাল, বুড়ি কায়দা কসরৎ করে ঘােড়সওয়ার ডাকাতটির সঙ্গে প্রতারণা করে, নিজের জায়গায় তাকে বেঁধে ভেগে গেছে।

একটু বেলা হতে কোতােয়াল ঘােড়ায় চেপে সেখানে হাজির হলেন। খুঁটিতে বাঁধা ডাকাতটি কোতােয়ালকে দেখে চিল্লিয়ে ওঠে—‘খালি হাতে এলে কেন? আমার পিঠা-মধু, দশ-থালা পিঠামধু কোথায় ?

কোতােয়াল তাে একদম আশমান থেকে পড়লেন। চোখ দুটো কপালে তুলে বললে—এ কী তাজ্জব ব্যাপার! বুড়ি কোথায় ? এ যে দেখছি এক খােদার ষাঁড় । বুড়িটি গেল কোথায়?' 

পাঁচ প্রতারিত আমতা আমতা করে বলল —জী হুজুর, একেই তাে বলে নসীব। নইলে দুপুর রাত্রে হতচ্ছাড়াটি কেন বুড়িকে খালাস করে দিয়ে নিজে খুঁটিতে বাঁধা পড়বে? আপনার দোষেই বুড়ি ভাগল।

কোতােয়াল সবিস্ময়ে বলল—এ কী তাজ্জব বাৎ! তােমরা বুড়িকে পাহারা না দিয়ে পাঁচ-পাঁচ জনই নাক ডাকিয়ে নিদ দিলে। বুড়ি গেল ভেগে। এদিকে কসুর হ’ল আমার, তাই না?”

–‘কসুর আপনার নয়, বলতে চান? আমরা জনা দশেক সিপাহী চেয়েছিলাম, দিলেন না। তবে কসুর আপনার হ’ল না?

-তােমরা রয়েছিলে কি করতে?

–‘আমরা কি আপনার নােকরি করি, নাকি কেনা গােলাম যে রাত্রি জেগে বুড়িকে পাহারা দেব। আপনার বিবিরও তাে এক হাজার দিনার বুড়ি হাতিয়েছে। আপনার জ্বালা নেই?'

কোতােয়াল খালিদ এবার দস্যুটির কাছে তার বাঁধা পড়ার কাহিনী জানতে চাইলেন।

দস্যুটি বলল —“হুজুর, বুড়ি আমাকে বলল, এ-খুঁটিতে বাঁধা থাকলে ভাের হতে না হতেই দশ-থালা পিঠা-মধু মিলবে। লেকিন আপনি এলেন খালি হাতে। এতবেলা হয়ে গেল, কেউ পিঠা-মধু নিয়ে এল না। কারবার তাে কিছু মালুম হচ্ছে না। জলদি আমার পিঠা-মধুর বন্দোবস্ত করুন। 

দস্যুটির বাৎ শুনে কাজী খালিদসহ পাঁচ প্রতারিত এত দুঃখের মধ্যেও হাে হাে করে হেসে উঠল।

দস্যুটি গােসসায় গসগস করতে করতে বল্ল—“আচ্ছা ধান্দায় পড়া গেল তাে! পিঠা-মধু আনার কোশিস না করে দাঁত বের করে হাসছে! দেখুন, আপনারা কে আমি জানি না বটে। লেকিন বুড়িটির সঙ্গে আপনাদের সাঁট আছে, সাচ্চা বাৎ। ফেরেফবাজি করলে আমি নগরে গিয়ে কোতােয়ালের কাছে আপনাদের বিরুদ্ধে আর্জি জানাব, ইয়াদ রাখবেন।

দস্যুটি এবার বুঝতে পারল, পিঠা-মধুর ব্যাপার স্যাপার বিলকুল ঝুটা। বুড়িটি তাকে ধোঁকা দিয়ে সটকে পড়েছে।

এদিকে কোতােয়াল দেখল, মামলা ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হতে চলেছে ধোঁকাবাজ বুড়িটি দুঃসাহসের সঙ্গে একের পর এক আদমিকে মুরগী বানিয়ে নির্বিবাদে সটকে পড়েছে। কোতােয়ালের কোন কায়দা কসরৎ-ই বুড়ির কাছে পাত্তা পাচ্ছে না দেখে অনন্যোপায় হয়ে কোতােয়াল প্রতারিতদের নিয়ে খলিফার শরণাপন্ন হতে বাধ্য হলেন। . এমন সময় ভাের হয়ে আসছে দেখে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চার শ’ পঁয়তাল্লিশতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ প্রায় মাঝরাত্রে বাদশাহ শারিয়ার-এর উপস্থিতিতে কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—জাহাপনা, কোতােয়াল প্রতারিতদের নিয়ে খলিফার দরবারে উপস্থিত হলেন।

Post a Comment

0 Comments