একশো পঞ্চাশ তম রজনী । আরব্য রজনী পর্ব ১৫০ (Part 1৫০ ) Sahasra ek arabya rajani

 গল্পের পরবর্তী অংশঃ  গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে ১ লিখে সার্চ করুন । 

–‘জরুর পারি। আলবৎ পারি। তবে তােমাকে একটি শর্ত মানতে হবে। শর্তটি হচ্ছে, খলিফার সামনে দাঁড়িয়ে তােমাকে স্বীকার করতে হবে তােমার মুরােদে কুলায় নি। আর বলবে, জাহাপনা, এ-গুরুদায়িত্বটি হাসানকে দিন। আহম্মদ ইদুরের মাফিক খাঁচাকলে আটক হয়ে গেছে। সে ঘাড় কাৎ করে বলল—বলব, জরুর বলব।  

হাসান এবার আহমদকে কোর্তা-পাৎলুন পরিয়ে খলিফার সামনে হাজির করল।

আহমদ খলিফাকে কুর্ণিশ করে বলল—“জাঁহাপনা, আমার কসুর নেবেন না। বুড়িকে ঢিট করা আমার কম্ম নয়, মেহেরবানি করে হাসান-এর ওপর ধূর্ত বুড়িটিকে পাকড়াও করার দায়িত্ব দিন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সে কাজটি হাসিল করতে পারবেই। কেবলমাত্র শয়তানী বুড়িকেই নয়, তামাম বাগদাদ নগরে যত ফেরেফবাজ আছে সবাইকে ঠাণ্ডা করার হিম্মৎ তার আছে। 

খলিফা হাসানকে লক্ষ্য করে বললেন—“পারবে ধূর্ত বুড়িটিকে ঢিট করতে?

হাসান ঘাড় কাৎ করে খলিফার প্রশ্নের জবাব দিল। 

বহুৎ আচ্ছা! এক বাৎ, বুড়িটি কি কেবলমাত্র আমার নজর কাড়ার জন্যই এরকম সব তাজ্জব কাণ্ড করে তামাম বাগদাদে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ?

‘জাহাপনা, আপনি বিচক্ষণ আদমি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনার অনুমান অভ্রান্ত। আপনার নজর কাড়াই ধূর্ত বুড়িটির একমাত্র লক্ষ্য।

-হাসান, তােমার বাৎ যদি সাচ্চা হয়, আর যদি অন্য কোন ধান্দা না থাকে, প্রবঞ্চনা করে যার কাছ থেকে যা কিছু সে হাতিয়েছে বিলকুল ফেরৎ দিয়ে দিলে বুড়ির কসুর আমি মাফ করে দেব। আল্লাহর নামে এ কসম খাচ্ছি হাসান।

খলিফা এবার একটি রুমাল হাসান-এর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল—“আমার জবান যে সাচ্চা তার প্রমাণস্বরূপ আমি এটি তােমাকে দিলাম।

হাসান খলিফাকে কুর্নিশ জানিয়ে বিদায় নিল। সে এবার সােজা সে-ধূর্ত বুড়ির মকানে হাজির হল।

হাসান জাইনাব’কে বলল —“তােমার আম্মাকে গিয়ে বল, সে আজ পর্যন্ত যার কাছ থেকে, যা কিছু হাতিয়েছে তা যদি স্বেচ্ছায় ফেরৎ দিয়ে দেয় তবে খলিফা তার বিলকুল কসুর মাফ করে দেবেন। অপূর্ব সুযােগ। এমন সুযােগ জিন্দেগীতে আর মিলবে না। তা যদি না কর তবে আমি আইন অনুযায়ী তােমাকে ফাটকে না ঢুকিয়ে পারব না। এখন তুমি বল, কোন্ পথ ধরবে?’ 

বুড়ি নীরবে কামরার মধ্যে ঢুকে গেল। এবার সে যা কিছ সামানপত্র হাতিয়েছে বিলকুল হাসান-এর সামনে হাজির করল।

হাসান এক লহমায় সামানপত্র দেখে নিয়ে বলল - লেকিন আহমদ আর তার সৈন্যদের সাজ পােশাক ও আহমদ-এর হীরাজহরৎ ?

‘হুজুর, সেসবের হদিস তাে আমার জানা নেই। তাদের কিছুই আমি গায়েব করি নি।

-“হ্যা, এবার মালুম হচ্ছে, তােমার বেটি জাইনাব হয়ত। আহমদ ও তার সিপাহীদের সামানপত্র গায়েব করেছে। আচ্ছা, ওসব নিয়ে এখন আর মাথা ঘামিয়ে দরকার নেই।

হাসান এবার খলিফার দেয়া রুমালটি বুড়ি ডিলাইলাহ-র দিকে বাড়িয়ে দিল। সেটি গলায় বেঁধে সে হাসান-এর সঙ্গে খলিফার দরবারের উদ্দেশে যাত্রা করল।

হাসান খলিফার দরবারে হাজির হয়ে খলিফাকে কুর্ণিশ জানিয়ে বলল-“জাহাপনা, আপনার বাঞ্ছিতা বুড়ি আপনার সামনে হাজির।

এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চারশ’ আটচল্লিশতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—“জাঁহাপনা, হাসান সে-ধূর্ত ফেরেফবাজ বুড়িকে খলিফার সামনে হাজির করে তাকে তার পরিচয় দিল। খলিফা রীতিমত রাগত স্বরেই বলে উঠলেন—“তুমিই তবে সে ফেরেফবাজ বুড়ি ? তােমার বুকের পাটা তাে কম চওড়া নয়। আমার মুলুকে বাস করে ফেরেফবাজী চালাচ্ছ! তােমার জান নিয়ে ছাড়ব আমি। 

বুড়ি হাসান-এর দিকে ফিরে মুখ কাচুমাচু করে বলে উঠল—‘একী তাজ্জব ব্যাপার হাসান সাহাব। আপনি তাে আমাকে এ-রুমালটি দিয়ে বলেছিলেন, জাহাপনা এটি দিয়ে কসম খেয়ে অভয় দিয়েছেন। 

হাসান খলিফাকে তার কসমের ব্যাপারে ইয়াদ করিয়ে দেয়। 

খলিফা ডিলাইলাহ-র নাম শােনার পর কসমের ব্যাপারে তার ইয়াদে আসে। তিনি তাকে মাফ করে দিলেন। 

খলিফা বললেন—“আমি তােমাকে মাফ করে দেব কসম যখন খেয়েছি মাফ করে দিলাম। লেকিন সাচ্চাবাৎ বলবে। তুমি কতদিন ধরে তামাম বাগদাদ নগরে এরকম আতঙ্ক ছড়িয়ে চলেছ? কেনই বা তুমি এপথ বেছে নিয়েছিলে? 

ডিলাইলাহ খলিফার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলল—“জাহাপনা, আমি লােভ-লালসার বশবর্তী হয়ে এপথে নামিনি। আমীর বাদশাহ বনার লােভ আমার কোনদিনই ছিল না। তবে মান ইজ্জতের লালচ আমার বহুদিনের। আমার স্বামী একদিন আপনার দরবারে উঁচু পদে বহাল ছিলেন। ইজ্জত খ্যাতিও তার যথেষ্টই ছিল। তিনি বেহেস্তে যাবার পর আপনি আর আমাদের দিকে ফিরে তাকানােরও জরুরৎ মনে করলেন না। আমি শুধুমাত্র একটু বাদশাহী স্বীকৃতি প্রত্যাশী। আপনার দরবারে আমাকে একটু স্থান দিলেই জিন্দেগী সার্থক জ্ঞান করব।

এবার ডাকাত থেকে শুরু করে গাধার মালিক ছােকরাটি পর্যন্ত প্রত্যেকেই নিজ নিজ দুর্ভোগ ও খােয়া-যাওয়া সম্পত্তির ব্যাপার খলিফার গােচরে আনল।

খলিফা অভিযােক্তাদের বক্তব্য শােনার পর পূর্ব-প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যার যা কিছু খােয়া গেছে প্রত্যেককে সে ক্ষতিপূরণ দিয়ে খুশী করলেন। সে সঙ্গে প্রত্যেককে নিজ নিজ যােগ্যতা অনুযায়ী ইনামও দিলেন।

অভিযােক্তারা খলিফাকে সুকরিয়া জানিয়ে নিজ নিজ মকানে ফিরে গেল। 

খলিফা এবার ডিলাইলাহ’কে লক্ষ্য করে বললেন—‘এবার তুমি বল। আমার কাছ থেকে কি পেলে তুমিও খুশী হয়ে নিজের মকানে ফিরে যাবে? 

ডিলাইলাহ নতজানু হয়ে বলল—“জাঁহাপনা, আপনি যদি আমাকে খুশীই করতে চান তবে মেহেরবানি করে আমাকে আমার স্বামীর পদে বহাল করুন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার স্বামী যেমন তার কৃতজ্ঞতা ও সেবার মাধ্যমে খুশী করেছিলেন তেমনি আমার সেবাও আপনার দিলে খুশী উৎপাদন করতে পারব।

—বহুৎ আচ্ছা, তবে আজ, এ-মুহূর্ত থেকেই তােমাকে আমি তােমার বাঞ্ছিত পদে বহাল করলাম।

—“জাঁহাপনা, আমার আর একটি আর্জি রয়েছে। —“আর্জি? বল, কি সে আর্জি?

‘আমার লেড়কি জাইনাব’কে আমার সহকারীরূপে নিতে চাই। মেহেরবানি করে আপনি আমার এ-অনুরােধটিও রক্ষা। করুন।

—“বহুৎ আচ্ছা! তােমাকে সাহায্য-সহযােগিতা করার জন্য তােমার লেড়কিকেও দরবারের কাজে নিযুক্ত করলাম।

বুড়ি খলিফাকে সুকরিয়া জানিয়ে, নতজানু হয়ে কুর্ণিশ করে দরবার ত্যাগ করল।

ডিলাইলাহ চাকুরিতে বহাল হবার পর তার মর্জি মাফিক খলিফার চিড়িয়াখানাটিকে সাজিয়ে তুলল। তার লেড়কি জাইনাব সর্বক্ষণ তার পাশাপাশি কাছাকাছি থেকে সর্বতােভাবে সাহায্য করল।

এক সময়ে যে-ডিলাইলাহ সমাজে ধূর্ত ও ঠগী বলে চিহ্নিত হয়েছিল আজ সে-ই নিজ যােগ্যতার পরিচয় দিয়ে বহু যশ-খ্যাতি অর্জন করল। আর সে সঙ্গে খলিফার কাছ থেকে আশাতীত ইনামও

লাভ করল।

কিসসাটি শেষ করে বেগম শাহরাজাদ ক্ষণিকের জন্য চুপ করলেন।

কয়েক লহমা নীরবতার মাধ্যমে কাটিয়ে বেগম শাহরাজাদই নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন--জাহাপনা, ধূর্ত ডিলাইলাহ আর তার ছলনাময়ী ও লাস্যময়ী লেড়কি জাইনাব-এর কাণ্ডকারখানার কিসসা তাে শুনলেন। এবার আপনাকে ইহুদী জহুরী মছলি ব্যবসায়ী জুরেম ও যাদুকর আজারিয়াহর কিসসা শোনাচ্ছি। 

জুরেম আজারিয়াহ ও ইহুদী জহুরীর কিসসা 

বাদশাহ শারিয়ার ভাবলেন, তাজ্জব ব্যাপার তাে! আমি যতবারই লেড়কিটিকে খুন করার কোশিস করছি ততবারই সে এক একটি মজাদার কিসসা বলে আমার দিল কেড়ে নিচ্ছে!’ 

বেগম শাহরাজাদ বললেন—জাঁহাপনা, আপনার অনুমতি পেলে আমি নতুন কিস্সাটি শুরু করি। 

বাদশাহ শারিয়ার উল্লসিত হয়ে বললেন—“তােমার কিসসা সাচমুচ আমার দিল কেড়ে নিয়েছে। এমন সব কিসসা তুমি একের পর এক বলে চলেছ যা শুনলে নয়া কোন কিসসা শুনতে চাই না এরকম বাৎ আমার পক্ষে কিছুতেই বলা সম্ভব নয়। তুমি নয়া কিস্সাটি শুরু কর।

বেগম শাহরাজাদ কিসাটি শুরু করলেন—জাহাপনা, আহমদ যখন বাগদাদ নগরে একের পর এক বিস্ময়কর চুরির মাধ্যমে তামাম বাগদাদ নগরে ত্রাসের সঞ্চার করেছিল তখন সে নগরেই আর এক চোর দোর্দণ্ড প্রতাপের সঙ্গে তার পেশা চালিয়ে যাচ্ছিল। তার নাম ছিল আলী—আলীচাদ। তার নিজের মুলুক ছিল কায়রাে নগর।

আলী চাদ বাগদাদে ঘাঁটি গাড়ার আগে কায়রাে নগরে সে প্রবল প্রতাপশালী চোর ছিল।

আলী চাঁদ কেন বাগদাদে এসে মাথা গুজল সে কিসসাই আপনার দরবারে এখন পেশ করছি।

এক রাত্রের ব্যাপার। আলীচাদ ইয়ার দোস্তদের নিয়ে বসেছিল। তার দিল ছিল বড়ই বিষগ্ন। সে গুম হয়ে বসে আশমান-জমিন ভাবছিল। তার ইয়ার দোস্তরা হরেক কিসিমের ফিরিস্তি দিয়ে দিয়ে নিজেদের মধ্যে বাৎচিতে ব্যস্ত। আলী চাদ-এর সেদিকে হুঁস ছিল না। সে যেন তখন দুসরা কোন দুনিয়ায় বাস করছে। আলীচাদ-এর এক সাকরেদ প্রস্তাব দিল, বাগদাদের বাজারে গিয়ে ধান্দা করলে দু-চার দিনার কামিয়ে নেয়া সম্ভব।

আলী ইয়ার দোস্তদের বসিয়ে রেখে একাই চলে গেল। আলী হাঁটতে হাঁটতে একটি সরাবখানার সামনে হাজির হ’ল। এক ভিস্তিওয়ালার সঙ্গে তার দেখা হল। তার কাঁধে পানিভর্তি ভিস্তি । হাতে দু'টি তামার পেয়ালা। নগরের পথে পথে ঢুঁড়ে পানি বেচা তার কাজ। সে অন্যদিনের মাফিকই পেয়ালা দু’টি ঠুকে বাজনা বাজিয়ে হরেক কিসিমের গানা গেয়ে গেয়ে পানি বেচছিল। 

আলীচাদ এক পেয়ালা পানি কিনে হাতে নিল। কি ভেবে পানিটুকু পান না করে পথের ওপর ছুঁড়ে ফেলে দিল। 

তার কাজে ভিস্তিওয়ালা তাজ্জব বনে যায়। বলল—‘সাহাব এমন বড়িয়া পানি ফেলে দিলেন?”

আলীচাদ বলল —“ঠিক আছে, আর এক পেয়ালা লাগাও।

ভিস্তিওয়ালা তা-ই করল। এবারও পেয়ালার পানির একই হালৎ করল। তার কাজ দেখে ভিস্তিওয়ালা বলল-“সাহাব পানি যদি না-ই খান, পিয়াস যদি না-ই লাগে তবে বেকার পানি খরিদ করে কেন ফেলে দিচ্ছেন।

আলীচাদ তার বক্তব্যে কান না দিয়ে বলল —আর এক পেয়ালা ভরে দাও।' ভিস্তিওয়ালা ভরা পেয়ালাটি হাতে দিলে আলী এবার তা পথে না ফেলে সােজা গলায় ঢেলে দিল। তার হাতে একটি সােনার দিনার গুজে দিল।

আলীর বিশ্বাস ছিল সােনার দিনারটি পেয়েই ভিস্তিওয়ালা ফিন-গানার সুর ভঁজতে ভাজতে নিজের ধান্দায় এগিয়ে যাবে। আদতে সে কিন্তু এক কদমও নড়ল না।

ভিস্তিওয়ালা এক লহমায় আলীচাদ’কে দেখে নিয়ে বলল -‘সাহাব খানদান একদম দুসরা চিজ। দিনার-দিরহাম ছিটালেই খানদানি মেজাজকে তুলে ধরা যায় না।

আলীচাদ গােসসায় একদম কাই হয়ে যায়। চিল্লিয়ে ওঠে—“হারামী কঁহিকার। তিন পেয়ালা পানির দাম তিন দিরহামও হবে না। আমি তােক একটি সােনার দিনার দিলাম। বিনিময়ে এসব বাৎ আমাকে শোনাচ্ছিস শয়তান ফেরেফবাজ বুড্ডা কাহিকার। মেরে একদম তক্তা বানিয়ে দেব। চিনিস আমাকে হারামী?

আলীচাদ-এর মেজাজ হঠাৎ বিগড়ে গেল। দুম করে এক ঘুষি বুটির চোয়ালে বসিয়ে দিল। সে সঙ্গে চৌদ্দপুরুষের উল্লেখ করে হাজারখানা কাচা খিস্তি খেউর তার দিকে ছুঁড়ে দিল।

ভিস্তিওয়ালা ঘুষির ঘায়ে দেয়ালে আছাড় খেয়ে পড়ল। মুখে হাত দিয়ে দেখল, খুন ঝরছে কিনা। না, অল্পের ওপর দিয়েই গেছে। খােদা ভরসা।

আলী এবার দিমাক ঠাণ্ডা করে বলল—“ খানদানের প্রশ্ন তুলে আমার ইজ্জতে ঘা দেবার তােমার দরকার কি ছিল ?

ভিস্তিওয়ালা বলল –সাহাব। খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে বলছি, আমি এমন এক দিলদরিয়া আদমি দেখেছি তামাম দুনিয়ায় যার জুড়ি মিলবে না।

আলীচাদ তার বাৎ শুনে তাজ্জব বনে গেল। অত্যুগ্র আগ্রহ প্রকাশ করে বল—কে? কে সে? কোথায় থাকে?

ভিস্তিওয়ালা এবার বলল—‘সাহাব, আপনি দিমাক ঠাণ্ডা করে যদি একটু নিরালায় গিয়ে বসেন তবে আমি সে-কিসসা আপনাকে শােনাতে পারি। যাবেন সাহাব?’

আলীচাদ মুচকি হাসল।

এমন সময় ভাের হয়ে আসছে দেখে বেগম শাহরাজাদ কিত্সা বন্ধ করলেন।

চারশ’ পঞ্চাশতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—‘জাহাপনা, ভিস্তিওয়ালা এবং আলী বাগিচায় গিয়ে ফোয়ারার ধারে একটি পাথরের ওপর বসল।

ভিস্তিওয়ালা তার কিসসা শুরু করল-“হুজুর, আমার আব্বা ছিলেন ভিস্তিওয়ালাদের দলপতি। কেউ নগরের মকানে মকানে পানি দিত, কেউ বা আমার মাফিক পথে পথে পানি ফেরি করত। আমার আব্বা সবারই দলপতি ছিলেন। তিনি বেহেস্তে গেলে আমি তার মকান, একটি বড় ও চালু দোকান, পাঁচটি উট, একটি খচ্চর আর কিছু জমির মালিক বনে গেলাম। আমার মাফিক আদমির পক্ষে এ-ই বহুৎ জাদা, গরীব তাে কোনদিনই বিলকুল খুশী হতে পারে না। খুশী হলেও ভােগ-দখল করতে সক্ষম হয় না। খুশীতেই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যায়। আমি আবার দোকানটিকে আরও বড় করে তােলার জন্য উঠে পড়ে লেগে গেলাম। মত বদলে ফেললাম। ভাবলাম, মক্কায় হজে গিয়ে আমার উটগুলি আর খচ্চরটিকে ভাড়া খাটিয়ে একদম আমীর বনে যাব।

লেকিন একটু আগে বল্লামই গরীবের নসীবে খুশী লেখা থাকে না। বেশী অর্থকড়ি দেখার বরাত তার হয় না। হলেও ভােগে আসে না। তার আগেই মােউৎ এসে হাজির হয়।

সে সালে আমার নসীব একদম খারাপ ছিল। আমি মক্কায় যাবার পরিকল্পনা করার আগে হজযাত্রীরা রওনা হয়ে গিয়েছিল। আমি পরিকল্পনা থেকে তবু সরে গেলাম না। একাই উটগুলি আর খচ্চরটি নিয়ে মক্কার পথে বেরিয়ে পড়লাম। এক পথ পাড়ি দিতে গিয়ে মরু ডাকু আমার সর্বস্ব ছিনিয়ে নিয়ে বিলকুল নিঃস্ব করে দিল।

মক্কার উদ্দেশ্যে পা বাড়াবার আগে বেশ কিছু দিনার কর্জ নিয়েছিলাম। পাওনাদারের দেনা শােধ করতেই হবে। অনন্যোপায় হয়ে উটগুলি ও খচ্চরটিকে দিলাম বেচে। নইলে তারা আমাকে কারাগারে ঢুকিয়ে দিত। পাওনাদার আরও কিছু রয়েই গেল। উট আর খচ্চর বিক্রির অর্থে সবার দেনা শােধ হ’ল না।

ভাবলাম, খালি হাতে মুলুকে ফিরলে পাওনাদাররা আমাকে ছেড়ে দেবে না। নির্ঘাত কারাগারে ঢুকিয়ে দেবে। পথে সিরিয়ার এক হজযাত্রী দলের সঙ্গে মােলাকাৎ হয়ে গেল। বরাত ঠুকে গেলাম তাদের সঙ্গে মিশে। তারপর যথাক্রমে দামাস্কাস, আলেপ্পো নগর পেরিয়ে হাজির হলাম বাগদাদ নগরে। পথে পথে ঢুঁড়ে বাগদাদের ভিস্তিওয়ালা সমিতির সভাপতির সঙ্গে ভেট করলাম। আমার হালতের বাৎ তার কাছে ব্যক্ত করলাম। তাকে খুশী করার জন্য কোরাণ পাঠ করে শােনালাম। ব্যস, শেখ সাহাবের দিল গলে গেল। তিনি মেহেরবানি করে নিজের জেবের দিনার ব্যয় করে আমাকে একটি বড়সড় ভিস্তি, আর দুটো পেয়ালা খরিদ করে আমার হাতে দিয়ে বললেন—‘পানি বেচে রােজগার করতে লেগে যাও। অনায়াসে পেটের বন্দোবস্ত হয়ে যাবে।'

নসীব। সবই নসীবের খেল। তামাম নগরে ঢুঁড়ে কুঁড়েও দুটো রুটির ধান্দা হ’ল না। ব্যাপারটি আমার কাছে খােলসা হ'ল। বাগদাদের আদমিরা আমাদের কায়রাে নগরের আদমির মাফিক পানি খরিদ করে পান করতে উৎসাহী নয়। পথের ধারের কোন মকানে বা দোকানে ঢুকে পানি চাইলেই মিলে যায়। তবে আর ( to be continued )

Post a Comment

0 Comments