একশ ছেচল্লিশ তম পর্ব (sahasra Ek Arabyarajani Part 146) পর্ব ১৪৬

এদিকে সে নওজোয়ান সওদাগর সিদি মুসিন আর খুবসুরৎ খাতুন পাশাপাশি। দু’ কামরায় বুড়ির ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে। 

সওদাগর সিদি মুসিন বিলকুল উলঙ্গ। বুড়ি বলি গেছে, ঝটপট ফিরে আসবে। লেকিন ফিরল না। ধৈর্যচ্যুত হয়ে সে এক পা দু’পা করে বাইরে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হল।

আর খাতুন? সে-ও তাে ধরতে গেলে বিবস্ত্রাই। একদম ফিনফিনে একটি সেমিজ গায়ে চাপিয়ে সে দীর্ঘ সময় বুড়ির পথ চেয়ে বসে। আর কতক্ষণই বা ধৈর্য ধরতে পারে। বুড়ি তাকে ভাওতা দিয়ে তার রত্নালঙ্কারাদি ও পােশাক আশাক সব নিয়ে চম্পট দিয়েছে। আর ধৈর্য ধরতে না পেরে সে কামরা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল।

খাতুন বাইরে বেরিয়েই সিদি মুসিন-এর মুখােমুখি হয়ে যায়। বিলকুল উলঙ্গ। সে ঝট করে ঘাড় ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকায়।

সিদি মুসিন বাজখাই গলায় বলে ওঠে-শরম টরম পরে দেখাবে। আগে বল, তােমার আম্মা কোথায়? তাকে তলব কর। আমি আর দেরী করতে নারাজ। এ-মুহুর্তেই আমাদের শাদীর বন্দোবস্ত করতে বল। কোথায় সে? তলব কর, আমার সামনে হাজির কর। শাদীর বন্দোবস্ত করুক।

খাতুন চোখ দুটো কপালে তুলে বল্ল-সে কী! কে আমার আম্মা? আমার আম্মা তাে কবেই বেহেস্তে গেছেন। তুমি কে? পীর সাহাবের চেলা তুমি? 

‘এ কোন্ কিসিমের বাৎ বলছ মেহেবুবা! তােমাকে শাদী করার জন্য আমার এ-হাল হয়েছে আর আমাকে কিনা পীরসাহাবের চেলা বানিয়ে ছাড়লে! তােমাদের ব্যাপার স্যাপার কি, কিছুই তাে আমার মালুম হচ্ছে না!'

‘সেই তখন থেকে পাগলের মাফিক শাদী শাদী’ করছ ব্যাপার কি বল তাে? আমার দিমাকে কিছুই আসছে না! খাতুন যেন বিলকুল আন্ধার দেখতে লাগল। সে বিলাপ পেড়ে কান্না জুড়ে দিল।

সিদি মুসিন এবার ঠাওরাল কারবার তাে সুবিধার নয়। এ পরিস্থিতিতে কি করবে, কি করা উচিত হঠাৎ করে সমঝে উঠতে পারল না। 

খাতুন-এর শিরে যেন আচমকা আশমান ভেঙে পড়ল। আতঙ্কে তার কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে যে প্রায় উলঙ্গ সে হুসও তার নেই। হুঁস থাকলেও কিছুই করার নেই। উন্মাদিনীর মাফিক চিল্লাতে চিল্লাতে সে সিড়ি বেয়ে উধ্বশ্বাসে নামতে লাগল। তার বিশ্বাস, নিচে নামলেই বুড়ির দেখা পেয়ে যাবে। 

সিদি মুসিনও কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলল । উলঙ্গ অবস্থাতেই দাঁড়াও-দাঁড়াও, যেয়াে না’, বলতে বলতে খাতুনকে অনুসরণ করল।

এদিকে সে-গাধার মালিক ছােকরা ও হজ মহম্মদের কাজিয়া চরম রূপ নিল। তারা বুড়িকে না পেয়ে তার লেড়কা-লেড়কির কাজিয়ার ফয়সালা করার জন্য সিঁড়ির দিকে এগােতে লাগল।

সিড়ির কাছাকাছি এসেই হজ মহম্মদ রীতিমত ভড়কে যায়। দেখে, লেড়কা- লেড়কি উভয়েই উলঙ্গ। লেড়কিটির গায়ে নামমাত্র সেমিজ একটি থাকলেও লেড়কাটি বিলকুল উলঙ্গ। সে নিজের অজান্তেই আর্তনাদ করে ওঠে-ইয়া আল্লাহ।শােভন আল্লাহ!

হজ মহম্মদ ও তার পিছনে পথচারী জনতাকে দেখে খাতুন হকচকিয়ে যায়। বাতাসে হাঁটুর ওপর উঠে আসা সেমিজটিকে টানাটানি করে নামানাের ব্যর্থ প্রয়াস চালাতে থাকে। সওদাগর সিদি মুসিন পড়ে আরও বেশী বেকায়দায়। সে- বেচারা দু হাত দিয়ে কোনরকমে শরম ঢাকার কোশিস করতে লাগল। হজ মহম্মদ তড়পাতে লাগল—‘বেশ্যার বেটি বেশ্যা কাঁহিকার! শরম টরম সিকেয় তুলে রেখে আগে বল, তাের বেশ্যা আম্মা কোথায় ? তাকে একবারটি পেলে দু’ ঠ্যাং ধরে টেনে একদম ফেড়ে ফেলে দেব। বল, হারামজাদী নচ্ছার বেশ্যা মাগী কোথায় গেছে? 

খাতুন ডুকরে ডুকরে কেঁদে বলল —“সে আমার আম্মা নয়। আমার আম্মা বহুৎ দিন হ’ল বেহেস্তে গেছেন। সে এখানকার পীর সাহাবের শিষ্যা। পীরের দরগায় নিয়ে যাওয়ার ভাঁওতা দিয়ে আমাকে মকান থেকে বের করে নিয়ে এসেছে। দেখছেনই তাে আপনারা, কী হালৎ করে বুড়ি ভেগেছে।

খাতুন-এর বাৎ শুনে সত্যই আদৎ ব্যাপারটি সম্বন্ধে কিছু কিছু আঁচ করতে পারল। গাধার মালিক ছােকরাটি গাধার শােক ভুলে সরবে হেসে উঠল। হজ মহম্মদও তার দোকান বরবাদ হওয়ার জ্বালা ভুলে না হেসে পারল না।

উপস্থিত পথচারীরাও বুঝল, তারা চার আদমিই শয়তানী বুড়ির পাল্লায় পড়ে নাজেহাল হচ্ছে।

এবার সওদাগর সিদি মুসিন, হজ মহম্মদ আর ছােকরাটি ব্যাপারটি সম্বন্ধে পর্যালােচনা করতে শুরু করল। যে করেই হােক তল্লাশী চালিয়ে বুড়িকে বের করতেই হবে। কড়া শাস্তি দিতে হবে তাকে।

ইতিমধ্যে পথচারীদের মধ্য থেকে একজন ছুটে গিয়ে সালােয়ার কামিজ খরিদ করে এনে খাতুন’কে দিল্। সে পােশাক গায়ে চাপিয়ে আর এক মুহূর্তও দেরী করল না। উর্ধ্বশ্বাসে নিজের মকানের দিকে ছুটতে লাগল। নসীবের খেল তাে এখনও শেষ হয়। নি। এর পরেও যে তার বরাতে কি জুটবে, আল্লাহ-ই জানেন।

এদিকে হজ মহম্মদ পুরানাে কোর্তা পাতলুন জোগাড় করে সিদি মসিনকে আগে শরম নিবারণের বন্দোবস্ত করে দিল।

এবার সে সিদি মুসিন ও ছােকরাটিকে নিয়ে সােজা কোতােয়াল খালিদ-এর দরবারে এজাহার দিতে চলল।

পর পর তিন আদমির অভিযােগ শুনে কোতােয়াল খালিদের চোখ একদম ছানাবড়া হয়ে গেল। মুহূর্ত কাল গুম হয়ে ভাবল, এক সময় মুখ খুলল  –এ তাে বড় তাজ্জব ব্যাপার দেখছি! খােদার নামে কসম খেয়ে বলছি, এমন তাজ্জব ব্যাপার আমার জিন্দেগীতে অন্ততঃ শুনি নি।

অভিযােগকারী তিন আদমিই নিজ নিজ ক্ষয়ক্ষতির উল্লেখ করে সমানে কপাল ও বুক চাপড়াতে লাগল।

কোতােয়াল ধমক দিয়ে উঠল—‘উন্মাদের মাফিক বুক চাপড়ে কোনই ফয়দা হবে না। আমার বাৎ শােন, হতচ্ছাড়ি বুড়িটিকে যদি পাকড়াও করে আমার সামনে হাজির করতে পার তবে সাজা কাকে বলে আমি দেখিয়ে দেব। তাকে নাগালের মধ্যে না পেলে আমি বিলকুল অসহায়।

কোতােয়ালের বাৎ শুনে তারা তিনজনই তখনকার মত কান্না থামায়। দিমাক ঠাণ্ডা করে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে-- যে করেই হােক শয়তানী বুড়িটির পাত্তা লাগাতেই হবে। পাতালের ভেতরে লুকিয়ে থাকলেও তাকে তাল্লাশী চালিয়ে বের করা চাই-ই চাই।

এদিকে নচ্ছার বুড়ি ডিলাইলাহ গাধার পিঠে বস্তাটি চাপিয়ে এক লহমায় বেপাত্তা হয়ে গেল। নির্বিবাদে নিজের মাকানে হাজির হয়।

বুড়ির লেড়কি জাইনাব খােলা-জানালায় দাঁড়িয়ে তার আম্মার পথে চেয়ে সময় গুজরান করছে। গাধা ও সামানপত্র নিয়ে তাকে মকানে ঢুকতে দেখে সে চিল্লিয়ে উঠল—“আম্মা, তােমার হিম্মৎ আছে বটে।

-“হিম্মৎ থাকবে না তাে কোতােয়ালের হাতে ধরা পড়ব নাকি রে? ওরকম দশটি কোতােয়ালকে আমি নাকানি চোবানি খাওয়াবার হিম্মৎ রাখি, জানিস? খলিফা আমার সঙ্গে যে-বেইমানী করল তার বদলা সবে তাে শুরু করলাম। তার খলিফাগিরি ছুটিয়ে ছাড়তে না পারলে আমার নাম ডিলাইলাহ-ই নয়, শুনে রাখ।

বুড়ি একটু দম নিয়ে বলতে শুরু করল বিলকুল বাজী মাৎ করেছি। এক নওজোয়ান সওদাগর আর আসিফের বিবিকে বিলকুল পঙ্গু করে ছেড়েছি। তাদের সাজ পােশাক, গহনাপত্র ও নগদ দিনার গাড়ি বেঁধে চম্পট দিয়েছি। উপরি মুনাফা এক দোকানের সমানপত্র আর একটি গাধা। বেটি, এবার মানছিস তাে আমার কায়দা কসরৎ কেমন কাজ হাসিল করতে পারে ?

লেকিন, আম্মা আজ না হােক কাল তাদের কেউ যদি তােমাকে পাকড়াও করে ফেলে তখন? যদি কোতােয়ালের কাছে হাজির করে?'

-“আমাকে ধরবে এমন আব্বার বেটা এখনও পয়দা হয় নি। আর কোতােয়াল? ধ্যৎ রেখে দে তাের কোতােয়াল। তার হিম্মৎ কি আমার পিছনে লাগে। তবে হ্যা, ওই গাধার মালিক ছােকরাটিকে নিয়ে একটু ডর আছে বটে। আমাকে চিনে রেখেছে। তার ওপর পথে পথে ঢুঁড়ে সামানপত্র বয়ে বেড়ায়। একটু-আধটু নজর রেখে চললেই সামাল দেয়া যাবে। আমি কারােরই পরােয়া করি না। এক ফুকারে উড়িয়ে দেব।

এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চারশ’ উনচল্লিশতম রজনী বেগম শাহরাজাদ বাদশাহ শারিয়ার-এর উপস্থিতিতে কিসসার পরবর্তী অংশ বলতে শুরু করলেন—“জাঁহাপনা, ধূর্ত বুড়ি ডিলাইলাহ এবার দরবেশের সাজ খুলে ফেলে আমীর আদমির হারেমের আয়ার পােশাক গায়ে চাপিয়ে নিল।

বুড়ি ফিন বাগদাদের পথে পথে ঢুঁড়তে ঢুঁড়তে মতলব ভাজতে লাগল, এবার কাকে কবজা করে কিছু ধন দৌলত কামিয়ে নেবে।

বুড়ি হাঁটতে হাঁটতে বাজারে হাজির হল। পথের দু ধারে হরেক কিসিম সামগ্রীর দোকান।

ডিলাইলাহ পথ চলতে চলতে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখল, এক আমীর আদমির দাসী খুবসুরৎ একটি লেড়কা কোলে নিয়ে পথ চলেছে। যেমন তার সুরৎ, তেমনি সাজ পােশাক। এক লহমায় তাকিয়েই নিঃসন্দেহ হওয়া যায় যে, খানদানি পরিবারের লেডকাই বটে। গলায় হীরা-মুক্তা খচিত বহুমূল্য একছড়া হার।

বুড়ি একটু আগেই দাসীটিকে ইয়া বড় প্রাসাদোপম এক মাকান থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছে। সওদাগর সমিতির সভাপতির মকান। বাগদাদের এমন কোন আদমি নাই যে, বাড়িটিকে চেনে না। আর লেড়কাটি যে সওদাগর সমিতির সভাপতির এরকম ধারণা করা অমূলক নয়।

দাসীটি লেড়কাটির সঙ্গে যেসব বাৎচিৎ করছে তাতে মালুম হচ্ছে, সওদাগর-মকানে আজ কোন উৎসব-অনুষ্ঠান রয়েছে। মেহমানে বাড়ি জমজমাট। লেড়কাটি যাতে হৈ-হুজ্জতি করে মেহমানদের বিরক্তির সঞ্চার না করে তারই জন্য দাসীটির জিম্মায় দিয়ে একটু-আধটু ঘুরিয়ে নিয়ে যেতে হুকুম করা হয়েছে।

লেড়কাটিকে এক লহমায় দেখেই ডিলাইলাহর কলিজা তড়াক করে লাফিয়ে ওঠে। সে বিড়বিড় করে বলে উঠল—যে করেই হােক লেড়কাটিকে হাতাতে হবে। চুরি করে একদম উধাও হয়ে যেতে হবে।

এক পা দু’পা করে ডিলাইলাহ দাসীটির দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে উঠল-আর বােলােনা বেটি, আজ বড্ড দেরী হয়ে গেছে। | দাসীটি ব্যাপার কিছু বুঝতে না পেরে এদিক-ওদিক তাকাল। , ধারে কাছে তাে সে ছাড়া দ্বিতীয় কোন প্রাণী নেই! তবে? বুড়িটি তবে কার সঙ্গে বাৎচিৎ করছে? কিছুই ঠাহর করতে পারল না । হতাশ দৃষ্টিতে বুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

বুড়ি দাসীটির দিকে একটি দিনার এগিয়ে দিয়ে বলল —এক কাজ কর, তােমার মালকিনকে গিয়ে বল, তার পুরনাে আয়া উম অল খায়ের তার সঙ্গে ভেট করতে এসেছে। দাসীটি অচল দিনারটি হাতে নিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

বুড়ি আবেগের সঙ্গে বলে উঠল—“আরে, তােমার মালকিনকে খবর দাও তবেই যথেষ্ট। আমি যে লেড়কিটিকে নিজের বেটির মাফিক কোলে পিঠে করে মানুষ করেছি। আজ তার শাদীর পাকা দেখা, আমার আনন্দ! তাই তাে আমার দোয়া জানাতে ছুটে আসতেই হল।

দাসীটি ফ্যাকাসে মুখে বলল—“আপনি যে মেহেরবানি করে ছুটে এসেছেন এ তাে খুশীর ব্যাপারই বটে। লেকিন, এ-লেড়কাকে নিয়ে কি করে মকানের ভেতরে যাই বলুন তাে। যা নটঘটে লেড়কা। এতক্ষণ অফাল করছিল, তার আম্মা এখন খানদানি পােশাকে সেজেগুজে মেহমানদের সঙ্গে বসে। তার কাছে লেড়কাকে নিয়ে হাজির হলে তার সাজ বিলকুল বরবাদ করে দেবে।

—“আরে ধৎ, আমার কোলে দাও তাে দেখি কেমন তােমার নটঘটে লেড়কা। তােমরা বালবাচ্চা রাখার কায়দা কৌশল জান না। বলেই না হয়রান হও।'

দাসীটি তিলমাত্র অবিশ্বাস ও দ্বিধা না করে লেড়কাটিকে বুড়ির কোলে দিয়ে মাকানের ভেতরে চলে গেল।

ব্যস, বুড়ি সহজেই মওকা পেয়ে গেল। সে লেড়কাটিকে নিয়ে এক দৌড়ে অদূরবর্তী এক অন্ধকার গলির মধ্যে ঢুকে গেল।

বুড়ি এবার হাত চালিয়ে লেড়কাটির গা থেকে হীরা-জহরৎ খচিত যত অলঙ্কারাদি ছিল বিলকুল খুলে নিল। আর লেড়কাটি ?

তাকেও হাতছাড়া করল না। তাকে দিয়ে কিছু রােজগার করার লােভ সামলাতে পারল না। বুড়ি লেড়কাটিকে নিয়ে বাজারের এক জহুরীর দোকানে গেল। ইহুদী খুবই ধনী। দিনারের কুমীর। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তার তেমন বনিবনা নেই । স্থানীয় সওদাগর সমিতির সভাপতির সঙ্গে ইহুদী জহুরীটির একদম আদায় কঁচকলায় সম্পর্ক। বুড়ি ডিলাইলাহ ব্যাপারটি অনেক আগেই শুনেছিল।

বুড়ি ডিলাইলাহ কে দোকানের সামনে সওদাগর সমিতির সভাপতির লেড়কাটিকে কোলে নিয়ে দাঁড়াতে দেখে বুড়াে জহুরী তার দিকে পিটপিট করে তাকায়। মধুঝরা কণ্ঠে বুড়িকে বলবলুন, আপনার জন্য কি করতে পারি ?

‘আপনিই তাে জহুরী আজারিয়াহ, তাই না?’ বুড়াে ইহুদী হেসে বলল–হ্যা, আপনার অনুমান অভ্রান্ত। আমিই ইহুদী জহুরী আজারিয়াহ। বুড়ি হাত কচলে বলল—এ-বাচ্চাটির বাড়িতে বহিনজীর শাদীর পাকা কথার উৎসব হচ্ছে। আরে, আমি কোন্ বাড়ি থেকে এসেছি, কোন্ বাড়ির বাচ্চা তা-ই বলি নি।

–তার আর দরকার হবে না। লেড়কাটিকে দেখেই আমি ধরে ফেলেছি। এবার বলুন তাে আপনার জন্য আমি কি করতে পারি ?

—এর আম্মার ইচ্ছা একজন শাহজাদার মাফিক একে সাজাবেন, তাই তিনি আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। আপনার দোকানের হীরা-জহরৎ দিয়ে আচ্ছা করে সাজিয়ে দিন। 

বুড়াে ইহুদী জহুরী বলল —এ তাে কোন সমস্যাই নয়, আমি এক্ষুণি একে একদম শাহজাদা সাজিয়ে দিচ্ছি। জহুরী এবার আলমারি খুলে একটি হীরা বসানোে চমৎকার মালা, তাগা, এক জোড়া মুক্তো বসানোে কানের পল, এক জোড়া হীরা-জহরৎ বসানাে হাতের বালা, সােনা ও মুক্তোর কোমরের বিছা, কয়েকটি ছােট ছােট হীরা বসানাে আংটি আর মুক্তা বসানাে কোর্তার বােম প্রভৃতি দিয়ে লেড়কাটিকে মনপছন্দ করে সাজিয়ে দিল, বুড়াে ইহুদী এবার সুসজ্জিত অবস্থায় লেড়কাটিকে সামনে দাঁড় করিয়ে দেখতে দেখতে উচ্ছাস প্রকাশ করে বলল —কী বাহার। খুবসুরৎ, বহুৎ আচ্ছা।

বডির মুখে হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল। সে বলল —“আপনি গহনার দাম কষে দিন। আমি মালকিনের কাছ থেকে দিনার নিয়ে এসে মিটিয়ে দিয়ে যাচ্ছি। 

বুড়াে মুচকি হেসে বলল —‘দামের জন্য ভাবতে হবে না। ওই পরিবারের দাম আজ হােক কাল পাবই। তবু তুমি যখন জানতে চাইছ তখন শুনেই যাও মােটামুটি এক হাজার দিনার।  

‘বহুৎ আচ্ছা, মেহেরবানি করে লেড়কাটিকে একটু ধরুন। আমি এক দৌড়ে দাম নিয়ে আসছি। বুড়ি গহনাগুলােকে পােটলা বেঁধে, লেড়কাটিকে জহুরীর কোলে বসিয়ে দিয়েই ব্যস্তপায়ে দোকান ছেড়ে যাবার উপক্রম করল। 

বুড়াে ইহুদী বল্ল—“আমি বুঝতে পারছি, আপনি গহনাগুলাে নিয়ে যেতে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছেন, তাই লেড়কাটিকে জামিন স্বরূপ রেখে যেতে চাইছেন। ছিঃ ছিঃ এমন কিছু ভাবলেন কি করে! আপনি একে সঙ্গে নিয়েই যান। আর যদি মনে করেন লেড়কাটিকে রেখে গেলে আপনার যাতায়াতের অসুবিধা হবে তবে আলাদা ব্যাপার। আমি কোলে নিয়ে বসে আদর-সােহাগ করছি।

বুড়ি ডিলাইলাহ লেড়কাটিকে বুড়াে ইহুদীর দোকানের গদিতে বসিয়ে লম্বা-লম্বা পায়ে রাস্তায় নামল। বুড়ি ডিলাইলাহ সােজা নিজের মকানে ফিরে গেল। তাকে সকাল সকাল ফিরতে দেখে তার লেড়কি জাইনাব বলল—‘আম্মা, কাকে পথে বসিয়ে এলে, বল তাে? চোখ-মুখ দেখে মালুম হচ্ছে, জব্বর দাও মেরে এসেছ।

বুড়ি মুচকি হেসে বলল—কামাই কিছু হ’ল বটে, তবে তেমন বড় রকমের কিছু নয়। শাহবানদের ছােট লেড়কাটির গায়ের কিছু হীরা-জহরতের গহনাপত্র, আর তাকে ইহুদী জহুরীর দোকানে জিম্মা রেখে তার কিছু দামী পাথরবসানাে গহনা, ব্যস।

জাইনাব-এর চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ ফুটে ওঠে। সে বলে আম্মা, তুমি যে এরকম বেপরােয়াভাবে ছিনতাই রাহাজানি চালাচ্ছ, একদিন হয়ত নগরের পথে তােমার বেরনােই দায় হয়ে উঠবে। একটু সমঝে টমঝে কাম কাজ করবে তাে। 

‘ধৎ, চুপ কর তাে, আমার গায়ে হাত তুলবে এমন বেটা এখনও দুনিয়ায় পয়দা হয় নি। বেগম শাহরাজাদ এবার বললেন—“জাহাপনা, এবার চলুন, আমরা একটু পিছিয়ে গিয়ে সওদাগর-সমিতির সভাপতির বাড়ি থেকে চক্কর মেরে আসি। সে-দাসীটি লেড়কাটিকে বুড়ি ডিলাইলাহর জিম্মায় রেখে প্রাসাদে ঢুকে গেল।

খানাপিনা পুরােদমে চালু হয়ে গেছে। সওদাগর ও তার বিবি

Post a Comment

0 Comments