গল্পের পরবর্তী অংশঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে ১ লিখে সার্চ করুন ।
খানাপিনা পুরােদমে চালু হয়ে গেছে। সওদাগর ও তার বিবি ঘুরে ঘুরে মেহমানদের সঙ্গে বাৎচিৎ করছে, কুশলবার্তাদি নিচ্ছে। দাসীটি ধীর পায়ে সওদাগরের বিবির কানে কানে বলল--মালকিন, আপনার বহু পুরনাে আয়া উম অল খুইর সদর দরওয়াজার কাছে দাঁড়িয়ে। আজ পাকা দেখার খবর পেয়ে লেড়কিকে দোয়া জানাতে ছুটে এসেছে। দাসীটির বাৎ শােনামাত্র সওদাগরের বিবি রীতিমত আর্তনাদ করে ওঠে লেড়কা? আমার লেড়কা? আমার লেড়কাকে কোথায় রেখে এসেছিস ? দাসী বলল-“কেন? সে বুড়ি আয়ার জিম্মায়, পথে, সদরদরওয়াজার কাছে। লেড়কা আপনাকে দেখে কাদবে, কোলে যেতে চাইবে, আপনার সাজ পােশাক বরবাদ করে দেবে তাই অন্দরে আনিনি, এবার বুড়ির দেওয়া দিনারটি দেখিয়ে বলল —“আয়াটি এ দিনারটি আমাকে ইনাম দিয়েছে।
দিনারটির দিকে এক লহমায় তাকিয়েই বুঝে নিল, মেকী, পিতলের। ব্যস, চিল্লিয়ে উঠলেন- ‘বে আক্কেল বেতমিস কাহিকার ! যা, আমার লেড়কা কোথায়, শিগগির নিয়ে আয়।
দাসীটি দৌড়ে বাইরে এসে দেখে, ভো-ভা, কোথায় আয়া, কোথায়ই বা লেড়কা? সওদাগর-সমিতির সভাপতি ও তার বিবি বুক চাপড়াতে চাপড়াতে রাস্তায় নেমে এলেন।
সওদাগর-সমিতির সভাপতির নির্দেশে চারদিকে সবাই ছুটোছুটি করে লেড়কার খোঁজ করতে লাগল। ব্যর্থ প্রয়াস। বুড়ি লেড়কাটিকে নিয়ে একদম বেপাত্তা হয়ে গেছে। কোন হদিসই কেউ করতে পারল না।
শেষ পর্যন্ত গহনাপত্রের দোকানগুলােতে তাল্লাসী করতে করতে লেড়কার হদিস মিলল । তার গায়ে গহনাপত্রের চিহ্নমাত্রও নেই।
ক্রোধান্মত্ত সওদাগর-সমিতির সভাপতি শাহবাদার ইহুদী জহুরী আজারিয়াহকে আক্রমণ করে বসলেন। রাগে গসগস্ করতে করতে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালমন্দ করে তার কাছে লেড়কার গায়ের হীরা-জহরতের গহনা-পত্র দাবী করতে লাগল।
শাহবানদার প্রতাপশালী আদমি। তাঁর হিম্মৎ বহুৎ। তিনি চাইলে ইহুদী জহুরী আজারিয়াহ'কে একদম মুলুক ছাড়া করে দেয়ার হিম্মৎ রাখেন। ফলে আজারিয়াহ নিজের এক হাজার দিনার গায়েব হওয়ার শােক ভুলে আত্মরক্ষার চিন্তায় অধীর হয়ে পড়ল। ইহুদী জহুরী আজারিয়াহ বার বার বলতে লাগল—“আমি সাচমুচ লেড়কা চুরির ব্যাপার স্যাপার কিছুই জানি না। এক ধূর্ত ধাপ্পাবাজ বুড়ি আয়া কোলে করে নিয়ে এসেছিল আমার দোকানে। আজ আপনার লেড়কির শাদীর পাকা কথা। আপনার বিবির হুকুমে লেড়কাটির জন্য এক হাজার দিনারের গহনাপত্র তাকে পছন্দ
করাতে নিয়ে গেল। আর বাচ্চাটিকে রেখে গেল আমার জিম্মায়। আমি লেড়কাকে জামানত রাখতে আপত্তি করেছিলাম। জোর করে রেখে আপনার প্রাসাদে যাওয়ার নাম করে হাঁটা জুড়ল।
—“শয়তান ইহুদী কাহিকার! বাজে ধান্দা রাখ। আমার লেড়কার হীরা-জহরৎ কোথায় রেখেছিস, বল ? নইলে তােকে ফাটকে আটক করব। শাহবান্দার আর আজারিয়াহর বিবাদ যখন তুঙ্গে উঠেছে ঠিক তখনই গাধার মালিক ছােকরা ও হজ মহম্মদ সেখানে হাজির হ’ল। তারাও তাদের কিসসা তাদের শােনাল। এবার শাহবান্দার বুঝলেন, ইহুদী আজারিয়াহর কোন কসুর নেই। অজ্ঞাত সে শয়তানী বুড়িই এতগুলাে আদমির সর্বনাশ সাধন করে নির্বিবাদে গায়ে বাতাস লাগিয়ে নগরের বুকে ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছে। শাহবান্দার তর্জন গর্জন করতে থাকেন, বুড়িকে ফাটকে দেবেন, শূলে চড়াবার বন্দোবস্ত করবেন, কোতােয়ালকে দিয়ে তার গর্দান নেবেন। রাগে, অপমানে আর গহনা গায়েব হবার জ্বালায় তর্জন গর্জন করতে করতে শাহবান্দার লেড়কাকে কোলে নিয়ে প্রাসাদের দিকে হাঁটা জুড়লেন।
শাহবানন্দার বিদায় নিলে ইহুদী জহুরী আজারিয়াহ এবার গাধার মালিক ছােকরা ও সওদাগর সিদি মুসিন এবং হজ মহম্মদকে লক্ষ্য করে বলল -শয়তানী প্রতারক বুড়িকে শাস্তিদানের ব্যাপারে আপনারা কি চিন্তা করছেন ?
তারা সমস্বরে বলল-“আমরা তাে কোতােয়াল খালিদ-এর দরবার থেকে এলাম। বুড়িটির নামে এজাহার দিতেই গিয়েছিলাম। তেমন কোন ফয়দা হবে বলে মালুম হল না। ইহুদী আজারিয়াহ সবিনয়ে বলল —“কেন? কোতােয়াল কি বললেন?
—বললেন, দোষী বুড়িটিকে ধরে নিয়ে গিয়ে তার হাতে তুলে দিলে তিনি কড়া সাজার বন্দোবস্ত করবেন।
—“তবে তাে আমাদের দায়িত্ব বেড়ে গেল। চলুন, আমরা নগরের পথে পথে ঢুঁড়ে ধূর্ত বুড়িটির তল্লাশ করি।
সওদাগর সিদি মুসিন বলল —“চমৎকার ধান্দা! আমরা কাম কাজ ছেড়ে দিয়ে বুড়িটির তল্লাসে লেগে যাই, তাই না? আর কোতােয়াল মৌজ করে দাড়ি হাতাবেন আর আমাদের ধরে দেওয়া আসামীর বিচার করবেন! এমন বন্দোবস্ত আর হয় না।
ইহুদী জহুরী বলল—“এক বাৎ, আপনাদের মধ্যে কেউ কি এর আগে এ ফেরেফবাজ বুড়িটিকে চিনতেন?’
গাধার মালিক ছােকরাটি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, –‘আমি—আমি একে আগে থেকেই চিনতাম।
তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে চারজন চারদিকে বুড়িটির খোঁজে বেরিয়ে পড়ল। আর ঠিক করল, পথে যত জেনানা চোখে পড়বে সবাইকে কড়া নজরে দেখবে। তবে খুবই সতর্কতার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে। কেউ বুঝতে পারলে তার যে কি হালৎ করবে তা-তাে অনুমানই করা যাচ্ছে। এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
চারশ’ একচল্লিশতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাহাপনা, তারা চারজন নগরের চারদিকে বুড়ির তাল্লাস করতে লাগল। শেষ পর্যন্ত গাধার মালিক ছােকরাটিই প্রথম বুড়ি ডিলাইলাহ-র হদিস করতে পারল।
বুডি সেদিন অন্য এক বেশভুষা গায়ে চড়িয়ে পথ চলেছে। গাধার মালিক ছােকরাটি তার পথ আগলে চিল্লাচিল্লি শুরু করে দিল। বুড়ি বেগতিক দেখে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে অনুচ্চকণ্ঠে বলল—“কি গাে, এমন ষাঁড়ের মাফিক চিল্লাচিল্লি জুড়ে দিয়েছ যে, ব্যাপার কি হে?
‘ধান্দাবাজী ছাড়! আমার গাধা কোথায় ? ভাল চাও তাে ফিরিয়ে দাও আমার গাধাটিকে।
‘গাধা? বহুৎ আচ্ছা, পাবে গাধা। বেটা তোমার গাধা(পলেই কি ব্যাপারটির ফয়সালা হয়ে যাবে?
আমার গাধা আমাকে ফেরৎ দাও। ব্যস, আমার মামলা খতম হয়ে যাবে। তারপর অন্য সবার সামানপত্রের জন্য আমার' মাথাব্যাথা নেই। আমার গাধা কোথায়, জলদি ফেরৎ দাও।'
বেটা, তুমি গরীব। আমীর-ওমরাহ নও। তােমার কিছুর ধান্দা আমার নেই। গাধা ফেরৎ দিয়ে দেব। আমীর বাদশাহদের ধন-সম্পত্তি গায়েব করার ফিকিরই আমি করে থাকি। যাও ওই নাপিতের দোকানের ধারে গাছের সঙ্গে তােমার গাধাটি বাধা আছে, নিয়ে যাও। এ নিয়ে অন্য কারাে সঙ্গে কোন বাৎচিৎ কোরাে না যেন। এখানেই অপেক্ষা কর। আমি গাধাটিকে নিয়ে এখনই ফিরছি। তুমি যেন আবার ফিরে যেয়াে না।
গাধার মালিক ছােকরাটিকে দাঁড় করিয়ে সে নাপিতের দোকানে ঢুকে কাদতে কাদতে বলল —“আমার লেড়কা গাধাটির জন্য কেঁদে আকুল হচ্ছে। সে এটিকে ভাড়া খাটিয়ে রােজগার পাতি করত। এক সময় দারুন খরার জন্য তার মাথা বিগড়ে গিয়েছিল। হেকিম ডেকে বহুৎ ইলাজ করিয়েছি। কোনই ফল হয় নি। এখন দিন দিনই তার পাগলামি বেড়েই চলেছে। কেবল হাতপা ছােড়ে, আর চিল্লিয়ে বলে আমার গাধা ফেরৎ দাও। গাধা না পেলে আমি খুন করে ফেলব। মারধােরও করতে আসে। শহরের সব চেয়ে বড় হেকিমের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। নাপিত হজ মাসুদ বলল —“দাওয়াই কিছু দিয়েছেন? —“জব্বর এক দাওয়াই বাৎলে দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, ওর দু’পাশের দন্ত দুটো তুলে ফেলতে পারলেই কাজ হাসিল হয়ে যাবে।”
—“তারপর ? —“তারপর সেখানে দু’টো লােহার গজাল পুঁতে দিতে হবে।
মাসুদ দুটো গজাল চুল্লিতে গরম করতে দিয়ে বুড়িকে বলল —এক কাজ কর, তােমার লেড়কাকে এখানে হাজির কর। ঠিক আছে, আমিই ডাকছি। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে নাপিত লেড়কাটিকে ডাকল–কই হে, তােমার গাধা নিয়ে যাও। লেড়কাটি দোকানে ঢুকতেই নাপিত মাসুদ হঠাৎ তার তলপেটে মােক্ষম এক ঘুষি মেরে তাকে মেঝেতে ফেলে দিল। মাসুদ তার বুকের ওপর গেট হয়ে বসে গলা টিপে ধরে লেড়কাটির জান খতম হয়ে যাওয়ার জোগাড় হ’ল। এবার একটি সাঁড়াশী দিয়ে চেপে ধরে তার শ্বদন্ত দুটো পট পট করে উপড়ে ফেলল । যমদুতের মাফিক নির্মম হাতে টকটকে লাল গজাল দুটো শ্বদন্ত দুটোর জায়গায় দিল গেঁথে। নাপিত এবার তার দুই সহকারীর জিম্মায় ছােকরাটিকে রেখে বুড়িকে ডাকতে গেল।
দরওয়াজা দিয়ে এগিয়ে দেখে বুড়ি নেই। একদম উধাও চিল্লাচিল্লি করে বুড়িকে ডাকল। না বুড়ি একদম বেপাত্তা। নাপিত এবার তার দোকানের দিকে তাকিয়েই আর্তনাদ করে উঠল। তার দোকানের ক্ষুর, কাচি, গামলা, বদনা যা কিছু ছিল সব নিয়ে বুড়ি ভেগেছে।
নাপিত এবার গাধার মালিক ছােকরাটির কাছে ফিরে এসে তাকে চেপে ধরল—“কুত্তার বাচ্চা, তাের আম্মা কোথায় বল? তােকে একদম খুন করে ফেলব। বল, তাের আম্মা কোথায় ?
ছােকরাটি একে দাঁতের যন্ত্রণায় ভুগছে তার ওপর বেদম প্রহার খেয়ে তার জান খতম হয়ে যাওয়ার জোগাড় হল।
ছােকরাটিকে নাপিত যখন মােক্ষম দাওয়াই দিয়ে চলেছে ঠিক তখনই সওদাগর সিদি মুসিন, জহুরী ইহুদী বুড়াে আর হজ মহম্মদ পথে পথে বুড়িটির তল্লাসী চালাতে চালাতে সেখানে হাজির হল। লেড়কাটির মুখ থেকে তখন গল গল করে খুন ঝরছে। সে সঙ্গে নাপিত দুমদাম করে তাকে পিটে চলেছে।
গাধার মালিক ছােকরাটি কেঁদে কেটে তাদের বলতে লাগল--“শয়তান নাপিতটি আমার জান খতম করে দিচ্ছে ! আপনারা আমার জান বাঁচান।
তারা নাপিত হজ মাসুদ-এর ওপর চড়াও হ'ল। হজ মাসুদ তখন তাদের কাছে ঘটনাটির আদ্যোপান্ত বলল ।
সব শুনে তারা বুঝল। নির্ঘাৎ সে বুড়িটির কাজ। নাপিত হজ মাসুদ সহ সবাই ফিন কসম খেল, যে করেই হােক বুড়িটিকে শায়েস্তা করবেই। নইলে সে এভাবে তামাম বাগদাদ নগর জুড়ে শয়তানী চালিয়ে যাবে।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিস্সা বন্ধ করলেন।
চারশ’ বিয়াল্লিশতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, প্রতারিত আদমিরা হলফ করল, বুড়িকে তারা শায়েস্তা করবেই।
তারা বুড়ি ডিলাইলাহর তাল্লাশী চালাতে গিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে বাগদাদ নগর চষে ফেলতে লাগল। বুড়িকে বের করার জন্য যে কসম খেয়েছে তাকে বাস্তবায়িত করার জন্য উঠে পড়ে লেগে গেল।
বহুৎ কায়দা কসরৎ করে শেষ পর্যন্ত বুড়িকে কবজা করতে পারল। তাদের কোশিস সার্থক হ’ল।
বুড়িকে পিঠমােড়া করে বেঁধে প্রতারিত আদমিরা মিছিল করে বুড়িকে নিয়ে কোতােয়াল আমির খালিদ-এর দরবারে হাজির হল।
কোতােয়াল তখন অন্দর মহলে বিশ্রামরত। এক খােজা প্রহরী কোতােয়াল খালিদ-এর নির্দেশে বুড়িকে নিয়ে অন্দরমহলে তার সামনে হাজির করলেন।
প্রতারিত পাঁচ আদমি কোতােয়ালের বাইরের ঘরে অপেক্ষা করতে লাগল।
এদিকে খােজা প্রহরী বুডিটিকে নিয়ে কোতােয়ালের কামরায় যাবার সময় তার বিবির মুখােমুখি হ’ল।
কোতােয়ালের বিবি বুড়িকে জিজ্ঞাসা করল—“তােমার আবার কিসের মামলা? এত উমর হ’ল তবু মামলার শখ মিটল না?”
বুড়ি সঙ্গে সঙ্গে নির্দ্বিধায় জবাব দিল—‘মামলা? কই, মামলার ব্যাপার স্যাপার তাে নয়। কোতােয়াল সাহাবের সঙ্গে আমার বাৎচিৎ সব মিটে গেছে। আমার স্বামী আদতে বান্দা কেনা বেচার কারবার করে। কোতােয়াল সাহাব খুবসুরৎ এক বান্দা খরিদ করতে চেয়েছেন।
কোতােয়াল খালিদ-এর বিবি সচকিত হয়ে, দ্রু কুঁচকে বললেন-“কি, কি বললে? বান্দা খরিদ করতে চেয়েছেন?
তবে আর বলছি কি? আমার স্বামী ভিন দেশে বান্দা তাল্লাস করতে যাওয়ার সময় ঘরে পাঁচটি বান্দা রেখে গেছেন, আমাকে বলে গেছেন, আমার ফিরে আসতে দেরী হলে এদের বেচে সংসার চালিয়াে। পাঁচ-পাঁচটিই খুব কাজের, আমি কোতােয়াল সাহাবকে বান্দা পাঁচটির ব্যাপারে বলতেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে নিজেই পাঁচটিকে খরিদ করতে চেয়েছেন।
কোতােয়ালের বিবি বললেন—‘পাঁচ-পাঁচটি বান্দাই খরিদ করতে চেয়েছেন?
‘তবে আর বলছি কি। বান্দা পাঁচটিকেই আমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। আপনার বৈঠকখানায় আছে। সিঁড়ির কাছে গিয়ে উঁকি দিলেই দেখতে পাবেন। কোতােয়ালের বিবি উঁকি দিয়ে দেখল—‘পাঁচটিই বেশ সভ্যভব্য।
–‘দামও খুব কম। মাত্র বারাে শ দিনারে পাঁচ-পাঁচটি বান্দা—একদম সস্তা, পানির দামে বান্দা মিলছে।
কোতােয়ালের বিবি দেখলেন, বুড়ি একদম সাচ্চা বলেছে। এত কম দামে পাঁচ-পাঁচটি বান্দা—অসম্ভব। তিনি বললেন‘কোতােয়াল সাহাব তাে এখন বিশ্রাম করছেন। সন্ধ্যার আগে কামরা ছেড়ে বেরােবেন না। সন্ধ্যা হতে এখনও অনেক দেরী। তুমি যদি সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পার তবে তাে বহুৎ আচ্ছা। নইলে আমি তােমার প্রাপ্য বারাে শ’ দিনার দিয়ে বান্দা পাঁচটিকে খরিদ করে নিতে পারি। লেকিন বটুয়া খুঁজে এক হাজার দিনার পেলেন।
বুড়িকে বললেন—'এখন এক হাজার দিনার নিয়ে যাও। পরে এক সময় দু'শ নিয়ে যেয়াে। আপত্তি আছে?'
বুড়ি যেন এরকম প্রভাবে একদম হাতের মুঠোয় পুরাে বেহেস্তটিকে পেয়ে গেল। আর দেরী নয়। কোতােয়ালের বিবির কাছ থেকে এক হাজার দিনার বুঝে পেয়ে সােজা পথে নামার উদ্যোগ নিল। কিন্তু উপায়? তাদের সামনে দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই মুখ কাচু মাচু করে বলল —এক সমস্যা, তাদের সামনে দিয়ে যেতে আমার কলিজা ফেঁটে যাবে। আদতে দীর্ঘদিন আমার মকানে ছিল। মায়া পড়ে গেছে। আপনি আমাকে খিড়কি দরওয়াজা দিয়ে বের করে দিলে—'
—“তাতে কি আছে, চল আমার সঙ্গে। কোতােয়ালের বিবি বুড়িকে খিড়কি দরওয়াজা দিয়ে পথে বের করে দিয়ে এলেন।
ধূর্ত বুড়ি এক হাজার দিনারের পুঁটুলিটি কামিজের ভেতরে নিয়ে নিজের মকানে ফিরে গেল। বুড়িকে দরওয়াজা দিয়ে ঢুকতে দেখেই তার লেড়কি জাইনাব ছুটে এসে বলল —‘আম্মা, আজ কাকে মুরগী বানিয়ে এলে? কামাই বা করলে কত ?
—“আজ একদম কিস্তি মাৎ করে এসেছি। জব্বর কাজ। রঙের কারবারী হজ মহম্মদ, ইহুদী জহুরী, নওজোয়ান সওদাগর সিদি মুসিন, গাধার মালিক ছােকরাটি আর নাপিতকে কোতােয়ালের বিবির কাছে এক হাজার দিনারে বেচে দিয়ে এলাম।
‘বেচে দিয়ে এসেছ? এক হাজার দিনারের বিনিময়ে ? তাও আবার একদম কোতােয়ালের বিবির কাছে?
‘তবে আর বলছি কি, বেটি। আমাকে ধরে কোতােয়ালের দরবারে হাজির করেছিল। ভেবেছিল, কোতােয়ালকে দিয়ে আমাকে কঠিন সাজার বন্দোবস্ত করবে। উল্টে আমি কোতােয়ালের বিবিকে ঘােল খাইয়ে এক হাজার দিনার কামাই করে ভেগে এলাম।
–লেকিন কোতােয়াল ঘুম থেকে উঠে তােমার ব্যাপারে বিলকুল শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবেন। তখনই তার যত রাগ গিয়ে পড়বে নিজের বিবি আর ওই পাঁচ-পাঁচটি কুত্তার বাচ্চার ওপর।
জাইনাব বলল—‘আম্মা, ঢের করেছ। এবার রেহাই দাও। নইলে ধরা পড়লে বে-ইজ্জতি তাে হবেই উপরন্তু জান খতম হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত কোতােয়ালের বিবির সঙ্গে ফেরেফবাজী-গর্দান যাবে তােমার! জাইনাব তার আম্মাকে নানা ভাবে নিরস্ত করার কোশিস করতে থাকে।
এদিকে কোতােয়াল দিবা-নিদ্রা সেরে কামরা থেকে বেরিয়ে ( চলতে থাকবে )
0 Comments