গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
বুড়ির মতলব অনুযায়ী তারা পথ পাড়ি দিয়ে চলেছে। কিছুদূর যেতে এক দোকানের দিকে বুড়ির নজর গেল। দোকানিকে বুড়ি ভালই চেনে। দোকানি কিন্তু বুড়িকে আদৌ চেনে না ।
বুড়ি এ-সুযােগটিকে কাজে লাগাবার ধান্দায় আছে। তার নাম হজ মহম্মদ। লেড়কি-জেনানার রােগ আছে এর। যে কোন উমরের লেড়কি হলেই হল। নিত্য নতুন লেড়কি চাই। এতে দিনারও গােছা গােছা ওড়ায়! জেনানা দেখলে তার জিভ রসিয়ে ওঠে। লালা গড়ায়।
বুড়ি এগিয়ে গিয়ে দোকানটির সামনে দাঁড়াল। মুচকি হেসে বলল —“আপনার নাম তাে হজ মহম্মদ ?
দোকানি নড়ে চড়ে বসে বলল —জী হাঁ। লেকিন আপনি? আপনাকে তাে চিনতে পারছি না। কে, কোথায় থাকেন?’ ভ্ৰ কুঁচকে হজ মহম্মদ বলল ।
–বাছা, আমাকে না চেনারই বাৎ বটে। এ নগর থেকে দূরে আমাদের মকান। আমার বড় বিপদ। ওই যে নওজোয়ান আর লেড়কিটি দেখছেন—আমার বেটা আর বেটি। আমার শ্বশুরের ভিটায় যে বাড়ি রয়েছে তার অবস্থা সঙ্গীন হয়ে পড়েছে। এখনই মেরামত না করলে শীঘ্রই হুড়মুড় করে ঘাড়ে পড়বে। মিস্ত্রি লাগিয়েছি। মেরামতি কাজ চলছে। কিছুদিনের জন্য এদের আশ্রয় দিলে বড়ই উপকার হয়। বুড়ির প্রার্থনা শুনে হজ মহম্মদের মুখে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। শয়তানের হাসি। জেনানা ভােগের লালসার হাসি। উল্লাস গােপন রেখে বলল—“বিপদ তাে জিন্দেগীতে আসতেই পারে। আদমিই আদমির বিপদ থেকে উদ্ধার করে। তবে কারাে জন্য কিছু করতে গেলে অসুবিধা তাে কিছুটা ভােগ করতেই হবে। আল্লাহ সব মুশকিলেরই আশান করে দেন। লেকিন আমার ওপর তলায় যে-কামরা রয়েছে তাতে তাে গ্রামের ব্যবসায়ীরা আসে, রাত্রে থাকে। সওদা করে পরের দিন নিজের মকানে ফেরে।
–তুমিই তাে বললে বাছা কারাে উপকার করতে হলে নিজের মুশকিল কিছু না কিছু হয়-ই। আমার তাে মাত্র মাস খানেকের মামলা। ওপরের কামরাটিকে বেড়া দিয়ে দু’ভাগ করে এক ভাগ আমাদের—‘চাষীদের মাফিক আমরাও তাে তােমার মেহমান বাছা।
হজ মহম্মদ লােলুপ দৃষ্টিতে ফিন খাতুনের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল—“ঠিক আছে, তা-ই হবে। বিপদ তাে কারাে চিরদিন থাকে না ।
বুড়ি তাে ভালই জানে এমন খুবসুরৎ জেনানা দেখার পর হজ মহম্মদ-এর পক্ষে নারাজ হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। হজ মহম্মদ বুড়ির হাতে কামরাটির চাবি তুলে দিল।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
চারশ’ ছত্রিশতম রজনী
বেগম শাহরাজাদ রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে কিসসার পরবর্তী অংশে শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, কামরাটির চাৰি হাতে পাওয়ায় বুঝল এ-পর্যন্ত তার প্যাচ-পয়জার অনুযায়ীই কাজ হয়েছে। পরবর্তী অংশটুকুও ঠিকই বাস্তবায়িত করতে পারবে।
বুড়ি এবার খাতুনকে নিয়ে সিঁড়ি-বেয়ে ওপরের কামরায় গেল। নওজোয়ান সওদাগরটি রয়ে গেল বাইরে। কামরায় ঢুকে খাতুনকে বলল-“বেটি, পীর সাহেব নামাজ পড়ছেন, একটু বাদে আসবেন। তিনি এলে ফিন শরম টরম কিছু কোরাে না যেন। তিনি যা-যা করতে বলবেন নির্দ্বিধায় তা-ই করবে। ইয়াদ রাখবে, তােমার একমাত্র লক্ষ্য লেড়কা পয়দা করা, সংসারের সুখ বজায় রাখা। আমি গিয়ে পীর সাহাবকে নিয়ে আসছি।
বুড়ি কামরা ছেড়ে বেরিয়ে এল।
খাতুন বােরখা খুলে একটু হাল্কা হয়ে বসল। গায়ে হাওয়া বাতাস একটু লাগানাে দরকার।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বুড়ি নওজোয়ান সওদাগর সিদি মুসিনকে নিয়ে পাশের কামরায় ঢুকল। বুড়ি বলল—‘বেটি, ইনি এসে গেছেন, এবার তােমার অভীষ্ট সিদ্ধ হবে। পাশের কামরায় রয়েছেন লেকিন এক বাৎ, এসব জাঁকজমক–পােশাক আশাক বরদাস্ত করতে পারেন না।
খাতুন একটু নড়ে চড়ে বসল।
বুড়ি ব’লে চলল —“হ্যা, সাজ পােশাক, বিশেষ করে ধনদৌলত, অলঙ্কারাদি বরদাস্ত করতে পারেন না। ওসব বরং খুলে আমার কাছে দিয়ে দাও। পরে ফেরৎ পাবে।
খাতুন-এর দিলে তখন রঙ লেগেছে। লেড়কা পয়দা হওয়ার আনন্দে দিল ভরপুর। দিল উপছে পড়ছে। তিলমাত্র দ্বিধা না করে গায়ে হীরা-জহরতের যত আভরণাদি আছে বিলকুল খুলে বুড়ির জিম্মায় রেখে দিল। খাতুন এবার গায়ের যত পােশাক রয়েছে এক এক করে খুলে বুড়ির হাতে দিয়ে দিল। তার গায়ে কেবলমাত্র একটি একদম পাতলা সেমিজ রয়ে গেল। প্রায় বিবস্ত্র হয়ে বুড়ির সামনে খাড়া হ’ল।
বুড়ি গহনাপত্র ওড়না দিয়ে একটি পুটুলি বেঁধে নিজের কামিজের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। এবার পাশের কামরায় গিয়ে মুখ কাচুমাচু করে সওদাগর মুসিন’কে বলল—“বেটা, তুমি বিলকুল গড়বড় করে দিয়েছ। তােমাকে তাে বলেইছিলাম, আমাদের থেকে একটু তফাতে তফাতে থাকবে। লেকিন তুমি তা পার নি। মহল্লার লেড়কারা টের পেয়ে গেছে। আমি তােমাদের শাদীর বাৎ বললাম। শাদীর বাৎ শুনে তারা খুশীই হ’ল। লেকিন তারা বলল —যে নওজোয়ানের সঙ্গে তােমার লেড়কির শাদী দিচ্ছ, তার গায়ে দগদগে কুষ্ঠ ব্যাধি, জান? সাচ্চা বাৎ কি জান বেটা, কুষ্ঠ ব্যাধির ব্যাপারটি আমার বেটির দিল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আমি অবশ্য তাকে প্রবােধ দিয়েছি, মহল্লার লেড়কারা হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরছে। তাই ঝুটমুট— বুড়ির মুখের বাৎ শেষ হবার আগেই সিদি মুসিন ঝটপট কোর্তা-পাৎলুন খুলতে লেগে যায়। মুহূর্তে বিলকুল উলঙ্গ হয়ে পড়ে। বুড়ি বলল—বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা! এভাবেই আমার বেটির সামনে প্রমাণ দেবে, তােমার গায়ে একদম কুষ্ঠ ব্যাধি নেই। এ ভাবেই তার সামনে গিয়ে খাড়া হবে। তার ভুল এতে বিলকুল ভেঙে যাবে। মুহূর্তকাল নীরবে ভেবে বুড়ি বলল —“বেটা, বন্দোবস্ত পাকা লেকিন এক কাজ বাকী থেকে যাচ্ছে। তােমার পােশাক আশাক এখানে ফেলে চলে যাওয়া ঠিক নয়। আমি বরং আগে এগুলাের বন্দোবস্ত করে আসি। যাব আর ঝটপট ফিরে আসব।
বুড়ি সওদাগর সিদি মুসিন-এর কোর্তা-পাতলুন ও খাতুনের যাবতীয় সাজ পােশাক বগলে নিয়ে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেল। সে সােজা হজ মহম্মদ এর দোকানে গিয়ে বলল —“বেটা, আমার লেড়কা আর লেড়কিকে কামরায় বসিয়ে দিয়ে এলাম।
হজ মহম্মদ বলল —বহুৎ আচ্ছা। লেকিন আপনি এমন হন্তদন্ত হয়ে চললেন কোথায় ?
—“আমাদের সামানপত্র কিছুটা তাে আনা হয় নি। দেখি একটি গাধার ব্যবস্থা করি। কথা বলতে কয়েকটি দিনার তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল —এগুলাে দিয়ে রুটি-মাংস খরিদ করে তুমিও খেয়াে আর ওদেরও দিয়াে। দুপুরে ওদের খাওয়া জোটে নি।
হজ মহম্মদ বলল –লেকিন আমার দোকানে তাে আমি ছাড়া দ্বিতীয় কেউ-ই নেই। দোকান ফেলে কি করে যাই, বলুন তাে?
—“ঠিক আছে, তুমি ফিরে না আসা পর্যন্ত আমি-ই না হয় তােমার দোকান পাহারা দিচ্ছি। তুমি ওদের নিয়ে খানাপিনা সেরে ঝটপট ফিরে আসবে।
খুবসুরৎ জেনানা খাতুনকে একবারটি কাছ থেকে ভালভাবে দেখার জন্য হজ মহম্মদ-এর কলিজা সেই তখন থেকে ছটফট করছিল। ভাবল, ভালই হ’ল বুড়িই মওকা করে দিয়েছে। সে আর এক লহমাও দেরী করল না। বুড়িকে দোকানে বসিয়ে লম্বা-লম্বা পায়ে রেস্তোরার দিকে হাঁটতে লাগল।
বুড়িও মওকার সদ্ব্যবহারে মেতে গেল। দোকানের দামী দামী সামানপত্র হাত চালিয়ে একটি বস্তায় পুরে একদম মুখ বেঁধে ফেলল ।
এমন সময় এক ছােকরাকে খালি গাধা নিয়ে হজ মহম্মদ-এর দোকানের সামনের পথ দিয়ে যেতে দেখে বুড়ি তাকে দাঁড় করাল।
বুড়ি বলল —“এ-দোকানের মালিক হজ মহম্মদকে চেন?
গাধার মালিক ছােকরাটি হেসে বল্ল-“সে কী, এ-পথে রােজ যাতায়াত করি। রঙের কারবার তার খুব ভালই চিনি। লেকিন এসব বাৎ কেন বলছেন? হজ সাহাব কোথায় ? বুড়ি কপাল চাপড়ে বলল —দুঃখের কিসসা আর কি বলব বেটা! হজ আমার বেটা। দেনার দায়ে তার দোকান নিলামে উঠতে চলেছে। বেটা তাে আমার শোকে-তাপে বিছানা নিয়েছে। তাই আমি দামী সামানপত্র আগেভাগেই সরিয়ে ফেলছি।
–হ্যা, ঠিকই করছেন বটে।
–‘কোতােয়ালের ষণ্ডামাকা আদমিরা এসে সামানপত্র নিয়ে যাবে। তা বেটা, তােমার গায়ে তাে তাগত আছে। আমি জোর হারিয়ে ফেলেছি তুমি এক কাজ করতে পার—মজুরি পাবে।
–কি ? কি কাজ? এ কাঠটি দিয়ে রঙের জালাগুলােকে ভেঙে গুড়িয়ে দিতে হবে। সব জালা—একদম গুঁড়া গুড়া করে দেবে। আমার বেটার মুখের গ্রাস কোতােয়ালের সাকরেদদের ভােগ করতে দেয়ার দিল নাই। এই নাও আগাম পাঁচ দিনার, পরে আরও পাবে।
গাধার মালিক ছােকরাটি দেখল, বুড়ির কথায় যুক্তি আছে বটে। মুখের গ্রাস কোতােয়ালের সিপাহীরা ভােগ করবে, সহ্য না হবারই বাৎ বটে।
গাধার মালিক ছােকরাটি একটি কাঠের টুকরাে দিয়ে দমাদম আঘাত করে ভেঙে গুড়িয়ে দিতে লাগল। " বুডি ছােকরাটিকে বলল—“তুমি নিশ্চিন্তে কাজ কর বেটা। আমি তােমার গাধার পিঠে বস্তাটি চাপিয়ে একটু তফাতে, নিরাপদ স্থানে রেখে আসি গে।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিস্সা বন্ধ করলেন।
চারশ’ সাঁইত্রিশতম রজনী
বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, বুড়ি গাধার পিঠে হজ মহম্মদ-এর দোকানের সামানপত্রের বস্তাটি চাপিয়ে সােজা চম্পট দিল।
গাধার মালিক ছােকরাটি পাঁচ দিনার নগদ পেয়ে এবং পরে আরও মজুরি পাবার প্রত্যাশায় কাঠের আঘাতে রঙের জালাগুলিকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে লাগল। দোকান জুড়ে রঙের ছড়াছড়ি।
এমন সময় হজ মহম্মদ দোকানে ফিরে এল। সে তাে ছােকরাটির কারবার দেখেএকদম হতভম্ব হয়ে গেল। কি বলবে, কি করবে হঠাৎ করে কিছুই সে বুঝে উঠতে পারল না। ছােকরাটি রঙের জালা ভাঙার কাজ অব্যাহত রেখেই বলল -
‘আপনি একদম ভাববেন না হুজুর। আমি একাই পারব। আপনি দূরে খাড়া হয়ে দেখুন, আমি সব কাজ ঠিকঠাক করছি কিনা। হজ মহম্মদ উন্মাদের মাফিক গর্জে উঠল—‘বেকুব, বেতমিস, শয়তান কাঁহিকার! কার হুকুমে আমার দোকানে ঢুকে পাগলামি শুরু করেছিস, শুনি। তােকে আমি কোতােয়ালের হাতে দেব, গর্দান নেবার বন্দোবস্ত করব!' একলাফে দোকানে ঢুকে সে ছােকরাটির হাত থেকে কাঠের টুকরােটি ছিনিয়ে নিয়ে তার মাথায় আঘাত হানার জন্য উদ্যত হল।
ছােকরাটি তার পায়ে লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল —“হুজুর, মেহেরবানি করে আমাকে মারবেন না। আমার কি কসুর বলুন?
–‘বেতমিস কঁাহিকার! আমার দোকানের সামানপত্র ভেঙে গুডিয়ে দিলি, সর্বনাশ করে দিলি ফিন বলছিস, কি কসুর করেছিস?”
–হ্যা,আমার কি কসুর ? আপনার আম্মা বীতিমত মজুরি দিয়ে আমাকে -
‘আম্মা? আমার আম্মা? মারব এক ডাণ্ডা! আমার আম্মার গােরে ঘাস গজিয়ে গেছে। আর তিনি তােকে মজুরি দিয়ে আমার দোকান ছাড়খাড় করতে লাগিয়ে গেছেন, তাই না। এক ডাণ্ডা মেরে জান একদম খতম করে দেব।
–লেকিন তিনি যে আমাকে কাজে লাগিয়ে আমার গাধার পিঠে দোকানের সামানপত্র চাপিয়ে বলে গেল ঝটপট ফিরে আসবেন।
—বহুৎ আচ্ছা কাজ করেছ। হাঁ করে তাকিয়ে থাক পথের দিকে চেয়ে। ইয়া আল্লা! আমাকেও একদম পথে বসিয়ে দিয়ে গেছে দেখছি!’ দোকানের দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে হজ মহম্মদ এবার বুঝল, তার দোকানের দামী দামী সামানপত্র গায়েব করে বুড়ি চম্পট দিয়েছে।
হজ মহম্মদ-এর চিৎকার চেঁচামেচিতে পথচারীরা ভিড় করে দাঁড়িয়ে পড়ল। চারদিক থেকে নানা কিসিমের প্রশ্ন ভেসে আসতে লাগল। হজ মহম্মদ সাধ্য মত এর-ওর প্রশ্নের জবাব দেয়ার কোশিস করল।
ভিড়ের মাঝখান থেকে একজন বলে উঠল—“বুড়ির লেড়কা আর লেড়কি যখন আপনার ঘরভাড়া নিয়েছে। আর তারা ওপরের কামরাতেই এখনও আছে তবে আর সমস্যার কি আছে, বুঝছি না ।
–হ্যা, তারা ওপরের কামরা ভাড়া নিয়েছে। আমি তাদের জন্যই রেস্তোরায় খানা আনতে গিয়েছিলাম। খানার ঠোঙাটি দেখাল।
হজ মহম্মদ-এর বাৎ চিৎ আর বুক চাপড়ানোে দেখে ছােকরাটি নিঃসন্দেহ হ’ল, তার কপাল পুড়েছে। নসীবের ফের। গাধাটি ফেরৎ পাবার তিলমাত্র সম্ভাবনাও নেই। সে কান্নায় বিলকুল ভেঙে পড়ল।.
ছােকরাটি কাদতে কাদতে হজ মহম্মদকে বলল —আপনার জন্যই আমাকে গাধাটি খােয়াতে হয়েছে।
হজ মহম্মদ তাকে ধমক দিয়ে ওঠে—‘শয়তান কাহিকার ! ফেরেফবাজ, ধান্দাবাজি করার আর জায়গা পাওনি! আমার জন্য তােকে গাধা খােয়াতে হয়েছে—মারব এক ডাণ্ডা মাথা একদম চৌচিড়–
—“আপনার জন্য নয়, বলতে চান? আপনার দোকানের বুড়িই তাে আমার গাধা নিয়ে ভেগেছে। আপনার ভাড়াটে—আপনার দোকানের আদমি–ফেরৎ দিন আমার গাধা।
—“শয়তান কাহিকার! চুপ কর! ডাণ্ডা দিয়ে মাথা ফাটিয়ে ছাড়ব! আমার দোকানের সর্বনাশ করে বলে কিনা গাধা ফেরৎ দিন! ভাগ এখান থেকে।
ব্যস, দু'জনে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল। ছােকরাটি বলে,আমার গাধা ফেরৎ দিন আর হজ মহম্মদ বলে, আমার দোকানে ঢুকে কেন সব কিছু ভেঙে একসার করলি?
হজ মহম্মদ ছােকরাটিকে ঘা কতক দিয়ে বসে -তােকে আমি কোতােয়ালের সামনে হাজির করব। কয়েদ খাটিয়ে ছাড়ব। আমার দোকানের সর্বনাশ করে এত সহজে রেহাই পাবি ভেবেছিস?”
ছােকরাটি তবু বলে—“আমার গাধা ফেরৎ দাও। বাজে ধান্দা ছাড়। আমার গাধা ফেরৎ না দিলে তােমাকে আমি কাজীর দরবারে হাজির করে বিচার চাইব। তােমার গর্দান নেয়ার বন্দোবস্ত করব, বলে দিচ্ছি।
পথচারীরা এতক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে মজা লুটছিল। এবার আর চুপ করে থাকতে পারল না। ভিড়ের মধ্য থেকে এক প্রবীণ বলল-“হজ মহম্মদ, তুমি তাে বললে, বুড়িটি তােমার ভাড়াটে, ঠিক কিনা?
–হ্যা, আজই তার কাছে এক মহিলার জন্য একটি কামরা ভাড়া দিয়েছি।
‘বহুৎ আচ্ছা, তােমার ভাড়াটে ছােকরাটির গাধা নিয়ে ভেগেছে তখন তার গাধা তােমাকেই ফেরৎ দিতে হবে। তুমি কিছুতেই দায়িত্ব এড়াতে পারবে না।
এমন সময় পূব আকাশে রক্তিম ছােপ ফুটে উঠল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
চারশ’ আটত্রিশতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ আবার কিসসা শুরু করলেন—“জাহাপনা, হজ মহম্মদ আর গাধার মালিক ছােকরাটি তাে জোর বিবাদ জুড়ে দিল। কেউ কমতি নয়। এদিকে সে নওজোয়ান সওদাগর সিদি মুসিন আর খুবসুরৎ খাতুন পাশাপাশি। দু’ কামরায় বুড়ির ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে।
( চলবে )

0 Comments