গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
বালবাচ্চা পয়দা করার উপাদানের নিতান্তই অভাব। মুস্তাফা গর্জে উঠল--কী, এতবড় বাৎ! আমার বীর্য পাতলা। লেড়কা পয়দা করার হিম্মৎ আমার নেই। আমার কসুরেই বালবাচ্চা পয়দা করতে পারছ না। শরীরের সব খুন তার মাথায় গিয়ে আশ্রয় নিল—দুঃখ, হতাশা, অপমান আর গােসসায় থরথরিয়ে কাপতে কাঁপতে এবার বলল—বহুৎ আচ্ছা, আমার বীর্যের দোষেই যদি তােমার গর্ভে বালবাচ্চা পয়দা না হয়ে থাকে তবে বিলকুল কসুর আমি মেনে নেব। তবে প্রমাণ চাই।'
–‘প্রমাণ?
--হ্যা, প্রমাণ, প্রমাণ আমিই দেব। হাতে নাতে তােকে প্রমাণ দেব আমার বীর্যের জন্য নয়, তােরই বালবাচ্চা বিয়ােবার শক্তিহীনতার জন্য তুই বাঁজা হয়ে আছিস। আমি ফিন এক যুবতী লেড়কিকে শাদী করে লেড়কা পয়দা করে প্রমাণ দেব, চোখে আঙুল দিয়ে দেখাব, আমার বীর্য কত জোরদার।
মুস্তাফার বিবি খেকিয়ে ওঠে—‘ভয় দেখাচ্ছিস নাকি? নসীবে যদি বুড়া বয়সে সতীনের ঘর করার ব্যাপার লেখা থাকে তবে তা-ই করতে হবে। কাপড়ে মুখ ঢেকে ফোপাতে ফেঁপাতে সে কামরা ছেড়ে গেল।
মুস্তাফা যেন এবার সম্বিৎ ফিরে পেল। সে ভাবল, এমন কড়া কড়া বাৎ তাকে না শুনলেই ভাল হ'ত। একে সন্তানহীনতার জ্বালা তার ওপর এসব বাৎ তার কলিজাটি বুঝি টুকরাে টুকরাে হয়ে যাচ্ছে।
ঝুড়ি ডিলাইলাহ সে মঞ্জিলটির সামনে দাঁড়িয়ে তার বসবাসকারীদের সুখ-দুঃখের কিসসা তাে শােনা গেল। এবার তাদের বাইরের আচার আচরণের ব্যাপারে কিছু বলা যাক, আর সে সঙ্গে ধূর্ত বুড়ি ডিলাইলাহর কিছু শয়তানীর চালও জানা যাবে। বুড়ি ডিলাইলাহ গলির মােড়ে দাঁড়িয়ে বার কয়েক ‘ইয়া আল্লাহ! ইয়া আল্লাহ!’ বলে লম্ফঝম্ফ করল। তারপর এগিয়ে গিয়ে মুস্তাফার মকানের জানালা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিল। দেখল, তার বিবি গালে হাত দিয়ে বসে গভীর চিন্তায় ডুবে রয়েছে। খুশীতে বুড়ির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বুকের ভেতরে কলিজাটি নাচানাচি শুরু করে দিল। বুড়ি আবেগ ভরে স্বগতােক্তি করল এবার আমার খেল শুরু হবে। শয়তানী কাকে বলে দেখিয়ে ছাড়ব। খলিফার দেহরক্ষী মুস্তাফার বিবির দিলে কোন না কোন হতাশা দানা বেঁধেছে। এ-ই মওকা। একেই বিলকুল কাজে লাগাতে হবে। এর গায়ের বহুমূল্য সাজ পােশাক আর সােনা ও মণিমুক্তার আভরণাদি খুলে নিয়ে নিজের ঝােলায় পুরতেই হবে।
জানালা থেকে সরে এসে ডিলাইলাহ গলা ছেড়ে চিল্লাতে থাকে—ইয়া আল্লাহ! ইয়া আল্লাহ! ব্যস, পথের দু'ধারের মকানগুলাের জানালা এক এক করে খুলে গেল। সবাই দেখল, এক বুড়াে ফকির দরবেশ হাজির হয়েছে।
দরওয়াজা খুলে অনেকে বাইরে বেরিয়ে এসে ফকিররূপী বুড়ির দোয়া মাঙতে লাগল।
মুস্তাফার বিবি ভাবল, আল্লাহ, সত্যই সর্বশক্তিমান। সর্বজ্ঞ দুনিয়ার কিছুই তার অজানা নয়। তাই তাে তিনি দোয়া করে ফকির সাহাবকে ঠিক সময় মাফিক পাঠিয়ে দিয়েছেন। চোখ মুছতে মুছতে মুস্তাফার বিবি উঠে এসে এক দাসীকে সদর-দরওয়াজার প্রহরীর কাছে পাঠাল, হাতে-পায়ে ধরে পীর সাহাবকে যেন তার কাছে নিয়ে আসে।
প্রহরী আবু আলী বুড়ির কাছে গিয়ে তার পায়ে ধরে অনুরােধ জানাতে যাবে অমনি বুড়ি ছাৎ করে উঠল—“ইয়া আল্লাহ! খবরদার আমাকে স্পর্শ করবি না! সরে যা! সরে যা! রুজুনামাজ কিছু করার নাম নেই—সরে যা! আমাকে ছুঁবি না।' বুড়ি কৃত্রিম গােসসা করে খেঁকিয়ে উঠল। পরমুহুর্তেই নিজেকে যেন একটু সামলে নিয়ে বলল —“আবু আলী। আল্লাহর কাছে তাের হয়ে দোয়া মাঙছি, গােলামি থেকে তােকে যেন রেহাই দেন। পরের গােলামি করে তােকে যেন আর দিন গুজরান করতে না হয়। নসীবের জোরেই তােকে এমন জঘন্য কাজ করতে হচ্ছে। তাের দিলে শান্তি আসবে হরদম আল্লাহর নাম কর দুঃখ-দুর্দশা ঘুচবে, শান্তি আসবে। বুড়ি তার পাঁচ পয়জার কাজে লাগাতে শুরু করে দিল ।
আবু আলী পথের ওপর সটান হয়ে শুয়ে বুড়ির দোয়া মাঙলো । আবেগমিশ্রিত স্বরে বললন —‘পীর সাহাব, দোয়া করুন, আমার দিকে মুখ তুলে তাকান। আপনার ওই বদনাটি থেকে একটু পবিত্র পানি দিন।
বুড়ি বহুৎ আচ্ছা বলে বদনাটি কাৎ করতেই সােনার দিনার তিনটি হঠাৎ পথের ওপর পড়ে যায়।
আবু আলী ব্যাপার দেখে তাজ্জব বনে গেল। আল্লাহর দোয়া না থাকলে তাে তার আশীর্বাদ তাে এমন হাতে নাতে পাওয়া সম্ভব নয়। আবু আলী ব্যস্ত-হাতে দিনারগুলাে কুড়ােতে কুড়ােতে ভাবল, এতাে সামান্য পীর নয়, সাক্ষাৎ পয়গম্বর পীর সাহাবের বেশ ধরে তাকে দর্শন দিয়েছেন। অলৌকিক ঐশ্বরিক ক্ষমতার ব্যাপার।
আবু আলী সােনার দিনার তিনটি বুড়ির দিকে বাড়িয়ে দিল। বুড়ি চোখ-মুখ বিকৃত করে চরম বিতৃষ্ণার ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল—“দিনার-দিরহামে আমার কোন আকর্ষণই নেই। সােনার দিনার আর মাটির ঢেলা—দু’-ই সমান, আমার কাছে বিলকুল তুচ্ছ। পার্থিব ধনদৌলতে মন নেই বেটা। আল্লাহর মহব্বৎ-ই আমার একমাত্র কাম্য। আর যা কিছু বিলকুল মূল্যহীন, তুচ্ছ।
বুড়ির বাৎচিৎ শুনে আবু আলীর দিমাক কেমন যেন ঘুলিয়ে যায়। হকচকিয়ে ওঠে।
আবু আলী বিস্ময় মাখানাে দৃষ্টিতে, নীরব চাহনি মেলে বুড়ির দিকে তাকিয়ে রইল।
বাঁদীটি এগিয়ে এসে বুড়িকে নিয়ে ভেতরে নিয়ে যায়। বুড়ি ভেতরে ঢুকে গলা ছেড়ে বার দু-তিন –“ইয়া আল্লাহ! ইয়া আল্লাহ!’ বলে চিল্লিয়ে উঠল।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
চারশ’ চৌত্রিশতম রজনী
বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন ‘জাঁহাপনা, পীর পয়গম্বরের পােশাকে সজ্জিতা বুড়ি মকানটির ভেতরে ঢুকে বজ্রগম্ভীর স্বরে চিল্লাচিল্লি জুড়ে দিল।
বাঁদীটি বুড়িকে নিয়ে কামরার ভেতরে গেল। চোখের পানি মুছতে মুছতে মুস্তাফার বিবি খাতুন বুড়ির পায়ে আছাড় খেয়ে পড়ে বলতে লাগল—দোয়া করুন! দোয়া করুন। আমার দিকে মুখ তুলে তাকান। বুড়ি হাত বাড়িয়ে তাকে তুলতে তুলতে বলল—‘বেটি, ওঠো। আল্লাহর নির্দেশেই আমি তােমার কাছে এসেছি। তিনিই আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তুমি কি আমাকে কিছু বলবে বেটি ?
খাতুন ব্যস্ত হয়ে বুড়ির জন্য ফল ও পিস্তার সরবৎ নিয়ে এল। বুড়ি পরম বিতৃষ্ণায় বলে উঠল—‘খানাপিনা বা ধনদৌলত কোন কিছুতে আমার মতি নেই বেটি। তা ছাড়া আমার রােজা চলছে। সালভরই আমার রােজা চলে। মাত্র পাঁচ দিন আমি খানা গ্রহণ করি। এখন বল বেটি, তােমার কি তকলিফ?’
খাতুন বুড়ি পায়ের কাছে বসে চোখের পানি ঝরাতে ঝরাতে বল্ল—‘পীর সাহাব, শাদীর রাতেই আমি স্বামীকে দিয়ে কসম খাইয়েছিলাম, জিন্দেগীতে সে আর শাদী করবে না। সে কথার খেলাপ করে নি। আমার সঙ্গে প্রতিরাত্রে সহবাস করেছে। আমাদের কামপিপাসা নিবৃত্ত হচ্ছে। লেকিন আল্লাহ মুখ ফিরিয়ে রইলেন। আজও আমাদের বালবাচ্চা পয়দা হ’ল না। আমার স্বামীর দিলে বহুৎ দুঃখ। এখন তার উমর হয়েছে। গােরে যাওয়ার দেরী নেই। এখন সে শাদী করে নয়া বিবির গর্ভে সন্তান পয়দা করার জন্য একদম ক্ষেপে গেছে। বুড়ি জুলজুল করে তাকিয়ে ভেতরে ভেতরে হাসতে লাগল। খাতুন বলে চলল —“হ্যা, আজ সে আমাকে সাফ বাৎ জানিয়ে দিয়েছে, শাদী সে করবেই। লেকিন আমার কি কসুর, বলুন ? এ বয়সে সতীন নিয়ে ঘর করা তাে আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এর চেয়ে নিজের জান খতম করে দেয়া ঢের ভাল।
বুড়ি গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে—“হ্যা বেটি। এসবই আমার মালুম আছে।
–‘শুধু কি এ-ই? আমার স্বামী ঘর ছাড়ার আগে আমাকে শাসিয়ে গেছে, আজই শাদী করে নয়া বিবিকে নিয়ে তবে ফিরবে। আমার স্বামী বলে আমার কসুরেই বালবাচ্চা হয় নি। আমি বাঁজা। বীর্যধারণ করে বালবাচ্চা পয়দা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু আমি বলব, গলতি যদি থাকে তবে তা আমার নয়। তারই বীর্যের গলতি। তার বীর্য কমজোরী। একদম তেজ নাই। লেকিন সে বাৎ সে মানতেই রাজী নয়। তাই জেদ ধরেছে, শাদী করে নয়া বিবির গর্ভে লেড়কা পয়দা করে আমাকে দেখিয়ে দেবে। মেহেরবানি করে আপনি এমন এক ফন্দি ফিকির বাৎলে দিন যাতে আমরা এ-বিপদ থেকে রক্ষা পেতে পারি।
চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুড়ি বলল—‘বেটি, ঘাবড়াও মাৎ! আমি কে, কি-ই বা হিম্মৎ আমার আছে আমি নিজে কিছুই জানি না। লেকিন, আমি যে আল্লাহর দূত এতে কোনই দ্বিধার কারণ নেই। তাঁরই নির্দেশে আমি তােমার কাছে হাজির হয়েছি। আমি তােমার মুশকিল আশান করে দেব। তবে হ্যা, আমার বাৎ শুনতে হবে, যা বলব, করতে হবে, রাজী?’
-“রাজী। বলুন, আমার প্রতি আপনার হুকুম
–‘বেটি, এ-নগরেই একপ্রান্তে একটি পীরের দরগা আছে, জান তাে। আমার সঙ্গে সেখানে যাবে। তােমার কামনা বাসনা সেখানে জানাবে। তবেই তােমার মনস্কামনা পূর্ণ হবে।
‘পীর সাহাব, সমস্যা হচ্ছে, শাদীর দিন আমি যে সদর দরওয়াজা দিয়ে এ-মকানে এসেছি তারপর আর কোনদিন মকানের বাইরে যাইনি। বহু কড়াকড়ি। জেনানাদের মকানের বাইরে যাবার হুকুম নেই।
–লেকিন কম সে কম একটিবারের জন্য তােমাকে সে পীরের দরগায় যেতেই হবে বেটি। পীরের কাছে তােমাকেই যেতে হবে, পীর তােমার দুয়ারে আসবেন না। ঘাবড়াও মাৎ। যাবে আর আসবে। কাক পক্ষীও টের পাবে না।
–লেকিন আমার স্বামী।
-এর মধ্যে আর লেকিন টেকিনের ব্যাপার নেই। আর এক বাৎ, এসব ব্যাপার বাড়ির পুরুষদের অলক্ষ্যেই সারতে হয়, ইয়াদ রেখাে। সেখানে গিয়ে শুদ্ধ-পবিত্র দিল নিয়ে তুমি লেড়কা বা লেড়কি যা চাইবে তা-ই পাবে।'
উল্লসিত হয়ে খাতুন বলে উঠল—যা চাইব তা-ই পাব? লেড়কা চাইলে লেড়কাই পাব?
-“হ্যা বেটি, লেড়কা চাইলে জরুর লেড়কা পাবে। তবে স্বামীর সঙ্গে মিলনের সময় যে বাচ্চা তােমার কোলে আসবে তার আদল তােমাকে মনে মনে কল্পনা করতে হবে। ব্যস, কাজ হাসিল।
খাতুন খুশীতে একদম ডগমগ হয়ে উঠল। বাক্স-পেটরা খুঁজে সবচেয়ে আচ্ছা সালােয়ার-কামিজ বের করে পরে তৈরী হয়ে নিল।
আবু আলী সদর-দরওয়াজায় টুল পেতে বসে। সে জিজ্ঞাসা করল—‘মালকিন, কোথায় যাচ্ছেন?
‘পীরের দরগায়। তাঁর দোয়ায় বাজা-জেনানার কোলে বালবাচ্চা লাভ করে। বুড়িকে দেখিয়ে বলল —ইনি মেহেরবানি করে সব বন্দোবস্ত করে দিচ্ছেন।'
আবু সােল্লাসে বলল —বহুৎ আচ্ছা, বহুৎ আচ্ছা! ওনার সঙ্গে নির্দ্বিধায় যেতে পারেন। আল্লাহর দূত ইনি। আদমির আদল নিয়ে আমাদের কাছে হাজির হয়েছেন। আপনার বাঞ্ছা পূরণের জন্যই ওনার আসা। আমার ওপর আল্লাহর অসীম দোয়া। এ সােনার তিনটে দিনার আমাকে দিয়েছেন।
পথে যেতে যেতে বুড়ি বলল—‘পীরের মহিমা এমনই যে, তুমি কেবলমাত্র লেড়কাই লাভ করবে না, স্বামীর সঙ্গেও সম্পর্ক দৃঢ় হবে। স্বামী তােমাকে চোখের আড়ালই করতে চাইবে না। তার মাথার মণি হয়ে থাকবে। ধূর্ত বুড়ি ভাবে। পথে বের করে তাে এনেছি, লেকিন এর গহনাপত্র হাতানাের ফিকির কি করা যাবে? পথে আদমির মেলা। গিসগিস করছে। এর মধ্যে সম্ভব নয়, উপায়? বুড়ি ভেবে চলেছে, অন্য কোন ফন্দি ফিকির খুঁজতে হবে। সামান্য এগিয়ে বুড়ি বলল —‘বেটি, তুমি আমার থেকে বেশ তফাতে হাঁট। নইলে পথচারীরা দেখলে কোনরকম সন্দেহ করতে পারে।'
কয়েক লহমা পরে তারা বাজারে এল। পথে সওদাগর সিদি মুসিন খাতুনকে দেখে মুগ্ধ হয়। সে অনুচ্চ কণ্ঠে বলে ওঠে—ইয়া। আল্লাহ, কী সুরৎ! বেহেস্তের হুরী-পরীদের যে হার মানায়! সওদাগরের মন্তব্য বুড়ির কানে পৌছায়। বুড়ি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। সওদাগর সিদির দিকে তাকায়। এবার খাতুনকে বলল —‘বেটি, একটু অপেক্ষা কর। আমি আসছি। এখানে আমার এক শিষ্য রয়েছে। তার সঙ্গে একটু জরুরী বাৎ সেরে আসি।
বুড়ি এগিয়ে গিয়ে বলে—“বেটা, তুমিই তাে সওদাগর সিদি মুসিন, ঠিক কিনা?
–হ্যা, ঠিকই বটে। লেকিন আপনি কি করে আমার নাম জানলেন? আমি তাে আপনাকে ঠিক
—“ঠিক ইয়াদ করতে পারছ না, তাই না? —সাচ্চা বাৎ বটে। আপনি কে, বলুন তাে?
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
চার শ’ পঁয়ত্রিশতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাহাপনা, বুড়ি তখন সওদাগর সিদি মুসিনকে বলল —'বেটা, তােমার পরিচিত এক সওদাগর আমাকে তােমার কাছে পাঠিয়েছে। আড়চোখে খাতুনকে দেখিয়ে বলল' ওই যে দেখছ খুবসুরৎ জেনানাটিকে দেখছ, আমার লেড়কি। ওর আব্বা বহুৎ দিন হ’ল বেহেস্তে চলে গেছেন। আমার সাজ পােশাক দেখে নির্ঘাৎ তােমার মালুম হচ্ছে, আমি মায়ামোহ কাটিয়ে আল্লাহর নামে জান কবুল করেছি। এখন এ-লেড়কিটিই আমার বােঝা, পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শাদীর উমরও পেরিয়ে যাচ্ছে। তােমার মাফিক কোন যােগ্য পাত্র পেলে আমি বর্তে যাই।
সওদাগর সিদি মুসিন খাতুন-এর দিকে তাকায়। স্থির তার দৃষ্টি, দৃষ্টিতে লালসা মাখানাে পুরােদস্তুর। বুড়ি আশান্বিত হয়। এবার মােক্ষম অস্ত্রটি ছুঁড়ে দিল—“হ্যা বেটা, আমি তােমাকেই খোঁজ করছি। আল্লাহর দরবারে আমার বাঞ্ছা নিবেদন করেছিলাম। তিনি আমাকে তােমার নামধাম বাৎলে দিলেন। ধনদৌলত কোন কিছুরই ঘাটতি নেই আমার। আমি তাে তারই চরণ আঁকড়ে পড়ে থাকব। বিলকুল সম্পত্তি তাে তুমিই ভােগ করবে বেটা। এক নওজোয়ান কি চায় ? ধনদৌলত, সুখ, বিবি আর শান্তি। আমার বেটিকে শাদী করলে তুমি এক সঙ্গে সবকিছুরই অধিকারী হবে। ‘দেখুন, ধনদৌলত আর আরামের কোন অভাব আমারও নেই। শাদী-নিকা করি নি। তাই বিবি কি জিনিস জানি না। বিবির সঙ্গে শান্তিলাভ হয় কিনা তাও আমার জানা নেই। আমার আম্মা অবশ্য গােরে যাবার আগে আমাকে বলে গিয়েছিলেন, শাদী করে সংসার কোরাে, সুখে-শান্তিতে দিন গুজরান কোরাে বেটা।
–হ্যা বেটা, তা-ই কর।
‘আম্মা গােরে যাবার সময় তাে আমার দিমাকে কেবল পয়সা বাড়াবার ধান্দা। শাদীর ব্যাপার স্যাপার নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার ফুরসৎ কোথায়? তাই আম্মার সাধ অপূর্ণই রয়ে গেছে।
—‘বহুৎ আচ্ছা! আল্লাহর দোয়ায় আজ সে-সুযােগ পেয়ে গেলে বেটা। রাজী হয়ে যাও। জলদি কাজ মিটিয়ে আমাকে মুক্তি দাও। আল্লাহর কাজে নিজেকে—এক কাজ কর বেটা, আমাদের সাথেই চল। তােমার ভাবী বিবির পিছন পিছন হাঁট, নজর ঢাল। তার চলাফেরার কোন খুঁত আছে কিনা, যাচাই করে নাও।
সওদাগর সিদি মুসিন-এর মুখে হাসির ঝিলিক ফুটে ওঠে। সে সােল্লাসে বলে উঠল—বহুৎ আচ্ছা! তা-ই হােক। লেকিন এক কাজ করবে কিন্তু বেটা। আমাদের থেকে একটু তফাতে থেকো। পথচারীদের যাতে মালুম না হয়, তুমি আমাদের সঙ্গেই চলেছ, ইয়াদ থাকবে?
বুড়ির মতলব অনুযায়ী তারা পথ পাড়ি দিয়ে চলেছে। কিছুদূর যেতে এক দোকানের দিকে বুড়ির নজর গেল।
0 Comments