সহস্র এক আরব্য রজনী পার্ট ১৪৩ (Sahasra ek arabya rajani part 143)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।

হেকিমের ওপর বাদশাহের অগাধ বিশ্বাস। তিনি বিরক্তি প্রকাশ করে বললেন—এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন, বল তাে? একটি জীনকে ঘায়েল করা কি সামান্য ব্যাপার নাকি! সময় তাে কিছু লাগবেই। ধৈর্য ধর জীনের দুর্গতি চোখের সামনেই প্রত্যক্ষ করতে পারবে। ওই জালায় তাকে কয়েদ করে দরিয়ার পানিতে চালান দেয়া হবে।


ক্রমে দুপুর হ’ল। ঘােড়া ফিরল না। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হ’ল তবু ঘােড়াটির ফেরার নাম নেই। ক্রমে সন্ধ্যার আন্ধার নেমে আসতে লাগল। এবার বাদশাহের মুখে একটু একটু করে হতাশার ছাপ প্রকাশ পেতে লাগল।

বাদশাহ ফ্যাকাশে বিবর্ণমুখে বলল—‘সেনাপতি, হেকিমের ধান্দা তত সুবিধের মালুম হচ্ছে না। এখন উপায়?

—“জাঁহাপনা, পঞ্জী পিঞ্জর ভেঙ্গে ভেগেছে। এখন বুক চাপড়ে হাপিত্যেশ করা ছাড়া উপায় নেই। বাদশাহের শরীরের বিলকুল খুন শিরে চেপে গেল। ক্রোধে কাপতে কাপতে বললেন—‘এখন মালুম হচ্ছে, সবই বুড়ােটির ফন্দি ফিকির। কয়েদখানায় বসে সে কলকাঠি নাড়ছে। ফেরেফবাজকে আমার সামনে হাজির কর। শয়তানটিকে সবার আগে ঢিট করতে হবে। রাগে গসগস করতে করতে বাদশাহ ঘােড়ার পিঠে চেপে প্রাসাদের দিকে রওনা হলেন।

বুড়াে যাদুকরকে রশি দিয়ে পিঠমােড়া করে বেঁধে বাদশাহের সামনে হাজির করা হল।

বাদশাহ বাজখাই গলায় গর্জে উঠলেন-“বদমায়েস, শয়তান, ফেরেফবাজ কাহিকার। কালাে ঘোড়াটি যে আদতে একটি জীন তা আমার কাছে ছিপালি কেন? তাের গর্দান নেব আমি! নিজের হিম্মতে হেকিমটি শাহজাদীর বিমারির ইলাজ করে সারিয়ে তুলল আর তাের ঘােড়ার দৌলতে তাকে খােয়াতে হ’ল। আমার নসীবের ফেরে--তাের জন্য মণি মাণিক্য খচিত গহনাগুলােও হাতছাড়া হয়ে গেল!

বেতমিস কহিকার, তাের গর্দান নিয়ে আমার গায়ের ঝাল মিটাব।

এদিকে কামার অল ঘােড়াটির ডানদিকের বােতামে সামান্য চাপ দিতে ঘােড়া তার কাজ শুরু করে দিল। শো শো শব্দে আশমানের দিকে ধেয়ে চলল ।

ঘােড়াটি পারস্যে পৌছে বাদশাহের প্রাসাদের ছাদের ওপর নামল। বাদশাহ সাবুর লেড়কাকে ফিরে পেয়ে সােল্লাসে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আবেগে-উচ্ছাসে অভিভূত হয়ে বার বার গালে মাথায় চুম্বন করতে লাগলেন।

বাদশাহ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সৈন্য তলব করে আবলুস কাঠের কালাে যাদু-ঘােড়াটিকে গুঁড়িয়ে দেবার বন্দোবস্ত করলেন। নইলে ভবিষ্যতে হয়ত ফিন লেড়কাকে খােয়াতে হবে।

যাদু-ঘােড়াটির ভাঙা অংশগুলিকে একদম দরিয়ায় ফেলে দিয়ে ঝামেলা চুকিয়ে দেয়া হল।

বাদশাহ সােল্লাসে পুত্রবধূ সামস অল নাহারকে সাড়ম্বরে বেটার বিবি হিসাবে বরণ করে নিলেন।

এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চার শ’ বত্রিশতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাহাপনা, বাদশাহ সাবুর তার বেটার বিবিকে সযত্নে প্রাসাদে রাখলেন। এবার কামার অল জামান এক চিঠিতে সানার সুলতানকে তার অসীম সাহসের ব্যাপার স্যাপার জানাল। সে সঙ্গে এ-ও জানাল, তার একমাত্র লেড়কি সামস অল নাহার’কে শাদী করে সসম্মানে প্রাসাদে রেখেছে। চিঠির সঙ্গে বহুমূল্য উপহার সামগ্রীও পাঠাল।

কামার অল-এর চিঠিতে লেড়কির খবর পেয়ে সানার সুলতান উৎকণ্ঠা মুক্ত হলেন। খুশী হয়ে তিনিও হীরা-জহরৎ খচিত অলঙ্কারাদি ও বহুৎ মূল্যবান উপঢৌকন পাঠিয়ে দিলেন। এতে প্রমাণ হ’ল তিনি জামাতাকে সানন্দে গ্রহণ করে নিয়েছেন।

তারপর থেকে যতদিন জীবিত ছিলেন সানার সুলতান লেড়কি ও জামাতাকে বহুমূল্য উপঢৌকন পাঠাতেন।

বাদশাহ সাবুর একদিন দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে বেহেস্তে যাত্রা করলেন। এবার পারস্যের তখতে বসল কামার অল আকমর। সে হ’ল তামাম পারস্য মুলুকের বাদশাহ। তারপর থেকে কামার অল প্রজা হিতৈষী বাদশাহ হিসাবে দেশ শাসন করে একদিন দুনিয়া ছেড়ে গেল। একদিন তার প্রিয়তমা বেগম সামস অলও চিরবিদায় নিল। তাকে কামার অল-এর পাশেই গাের দেয়া হল। বেগম শাহরাজাদ কিসসাটি শেষ করে থামলেন। কিছুক্ষণ নীরবতার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে বেগম শাহরাজাদ বললেন‘জাহাপনা, রাত্রি এখন ঢের বাকি। এবার আর একটি চিত্তাকর্ষক কিসসা আপনাকে শােনাচ্ছি। 

ডিলাইলাহ আর ঠগ জাইনাবের কিসসা

বেগম শাহরাজাদ কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন ‘জাহাপনা, বাগদাদের খলিফা হারুণ-অল-রসিদের সময়ে হাসান এবং আহমদ নামে দুই মহাধূর্ত চোর বাস করত। তাদের বসতি ছিল বাগদাদ নগরের কেন্দ্রস্থলে। আজব কায়দা কসরৎ করে তারা চুরি করত। হাসান ও আহমদ চুরি করার আজব সব ফন্দি ফিকির আবিষ্কার করতে সিদ্ধহস্ত ছিল।

চোর দুটোকে নিয়ে খলিফা হারুণ-অল-রসিদ খুবই ভাবিত হয়ে পড়লেন। তিনি তাদের হিম্মৎ দেখে তাজ্জব বনে গেলেন। এত সব অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ কোতােয়াল ও সৈন্য সামন্ত থাকতেও তারা মহাদাপটের সঙ্গে নিত্য নতুন পথে নগরবাসীদের মকানে চুরি করে চলেছে। আইন সম্বন্ধেও তারা যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। ফলে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, ফাঁক ফোকর দিয়ে সময় মাফিক তারা ঠিক পিছলে যায়। শেষ পর্যন্ত খলিফা এক মতলব আঁটলেন। তিনি হাসান ও আহমদ’কে কোতােয়ালের দুই প্রধানের পদে বহাল করে দিলেন। চোর দিয়ে চোরকে শায়েস্তা করার ফন্দি ফিকির যাকে বলে। খলিফার কাণ্ড দেখে প্রজারা তাে স্তম্ভিত। দুই চোর-সম্রাটের ওপর নগর রক্ষার দায়িত্ব অর্পিত হলে তাজ্জব হবার ব্যাপারই বটে।

হাসান ও আহমদ-এর প্রত্যেকের সাহায্যকারী রূপে চল্লিশজন। ঘােড়সওয়ার সিপাই নিযুক্ত করা হ’ল। আর বরাদ্দ করা হল। তাদের পােশাক, অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য অত্যাবশ্যক সামানপত্র। আর প্রতি মাসে এক হাজার সােনার মােহর বেতন হিসাবে নির্ধারণ করা হ’ল।

হাসান ও আহমদ চাকুরি গ্রহণ করে প্রথম রাত্রেই কোতােয়াল খালিদকে নিয়ে বাগদাদ নগরে টহল দিতে বেরল। তাদের পিছন পিছন কুচকাওয়াজ করতে করতে চল্লিশজন করে আশিজন সশস্ত্র সিপাই চলল নগর কাপিয়ে। কোতােয়াল ঘােষণা করল আজ থেকে হাসানকে জল ও আহমদকে স্থল বিভাগের কোতােয়ালের প্রধানের পদে বহাল করা হল। এরা আপনাদের জান এবং ধন সম্পদ রক্ষার জন্য জান দিতেও রাজী থাকবে। নগরবাসীদের কোন দরকার হলে তাদের সঙ্গে মােলাকাৎ করে জানাতে পারবেন।

বাগদাদ নগরে এক মহা ধড়িবাজ বুড়ি ডিলাইলাহ আর জাইনাব নামে তার এক ফেরেফবাজ লেড়কি বাস করে।

বুড়ি ডিলাইলাহ-র দুই লেড়কি। বড়টির শাদী হয়েছে। লেকিন ছােটটির শাদী-নিকা হয় নি। নানা ফিকির করে আদমির সঙ্গে প্রতারণা করাই তার একমাত্র কাজ। ফলে তাদের দু'জনের সুখ্যাতি নগরবাসীর মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়।

ডিলাইলাহ-র স্বামী তামাম বাগদাদে চিড়িয়া সরবরাহ করত। আজ সে বেহেস্তে। খলিফা হারুণ অল রসিদ চিড়িয়া প্রিয়। তাই ডিলাইলাহর স্বামী যতদিন জীবিত ছিল খলিফা তাকে বড়ই পেয়ার করতেন। সে গােরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সুখ্যাতি নগরবাসীর দিল থেকে মুছে যেতে থাকে।

আজ ডিলাইলাহ-র বিবি ও লেড়কি আদমিদের সঙ্গে জালজোচ্চরি ও প্রতারণা করে বহাল তবিয়তে দিন গুজরান করছে। তারা যার পিছনে লাগে নানা কায়দা কসরৎ করে তার খুন- মাস পর্যন্ত খেয়ে ছাড়ে।

এদিকে কোতােয়াল যখন মহল্লায় মহল্লায় ঢুঁড়ে খলিফার নির্দেশ জারি করতে ব্যস্ত তখন বুড়ি ডিলাইলাহ আর তার লেড়কি নিজ নিজ কামরার জানলা দিয়ে সে-দৃশ্য চাক্ষুষ করতে লাগল। লেড়কিটি তার আম্মার কামরায় গিয়ে বলল –“আম্মা আহমদ কে, জান? জাদরেল এক চোর। দাগী আসামী ভিন মুলুক থেকে পালিয়ে বাগদাদ নগরে এসে গা-ঢাকা দিয়ে জান বাঁচাচ্ছে। মিশর তার নিজের মুলুক। গ্রেপ্তারি পরােয়ানা নিয়ে সেখানকার কোতােয়াল পথে পথে তার তল্লাসী চালাচ্ছে। এখানে পা দিয়ে সে যেভাবে জাল জুয়াচ্ছরি ও ঠগবাজি শুরু করেছিল তা দেখে খলিফাও কম সমস্যায় পড়েন নি। কিছুতেই তাদের কুকীর্তি বন্ধ করতে না পেরে, অনন্যোপায় হয়ে চুরি ডাকাতি ও জুয়াচ্চরি বন্ধ করার দায়িত্ব চোরের ওপরই দিয়ে দিলেন। এখন তারা খলিফার বিশেষ অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চল্লিশজন করে সাহায্যকারী তাদের পিছন পিছন ঘােরে। হাসান ও আহমদ হাজার দিনার করে প্রত্যেকে মাসােহারা পায়। আর বকশিস ও উপঢৌকনের তাে রীতিমত ছড়াছড়ি।

জাইনাব এবার চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-“আম্মা, আমরা কী দুঃখ-দুর্দশার মধ্যেই না দিন গুজরান করছি! আমাদের ব্যাপারে খলিফা নিতান্তই নির্মম-নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিচ্ছেন। কোন হুঁশই তার নেই!

-হ্যা, তাইতাে দেখছি বেটি। আমাদের ব্যাপারে তিনি বিলকুল উদাসীন।

‘তাজ্জব ব্যাপার। আজব এ-দুনিয়া।

–‘বেটি, মাথার ওপরে আল্লাতাল্লা রয়েছেন। কিছুই তার নজর এড়ায় না। সবই দেখছেন। সবই বুঝছেন তিনি। দুনিয়াতে কৃতজ্ঞ লােকের চেয়ে অকৃতজ্ঞ আদমিই বেশী। এসব দিল থেকে মুছে ফেল। নইলে দিল সর্বদা ভারাক্রান্তই হয়ে থাকবে।

–সহ্য আর কত করা যায়। তার তাে একটি সীমা-পরিসীমা আছে? আম্মা, তুমি একটি বার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলেই সব এক ফুঙ্কারে উড়িয়ে দিতে পার। তােমার প্রবঞ্চনা আর ঠগবাজীর কায়দা কৌশল প্রয়ােগ করলে অনায়াসেই উচিত শিক্ষা দিতে পারবে। তখন ঠেলায় পড়ে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে বাধ্য হবেন। উপায়ান্তর না দেখে খলিফা তােমাকে দরবারে নােকরি দিয়ে জান বাঁচাতে পথ পাবেন না। আমি বলছি, তুমি একবারটি জেগে ওঠ, সক্রিয় হও।

—“জরুর! একদম সাচ্চা বাৎ বলেছিস জাইনাব। বুড়ি ডিলাইলাহ দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড় করে বলে উঠল।

এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চারশ’ তেত্রিশতম রজনী

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার-এর উপস্থিতিতে বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাহাপনা, জাইনাব তার আম্মাকে ক্ষেপিয়ে দিল। আর তার আম্মা ডিলাইলাহও লেড়কির বাৎ শুনে রেগেমেগে একদম কাঁই হয়ে গেল। সে উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে বলল—“ঠিক, একদম ঠিক বাৎ বলেছিস জাইনাব। আমি এর বদলা নেবই নেব। কসম খেয়ে বলছি, এমন প্রতারণা ঠকবাজি শুরু করে দেব যাতে খলিফার নাভিশ্বাস উঠে যায়। এক চালেই কেল্লা ফতে। হাসান আর আহমদ চোখে একদম সর্ষে ফুল দেখবে।

ব্যস, আর দেরী নয়। বুড়ি ডিলাইলাহ গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ল। কাজ শুরু করে দিল। ফকিরের মাফিক ইয়া লম্বা এক আল্লখাল্লা পড়ল। একটি বােরখা চাপিয়ে সেটিকে দিল ঢেকে। হরেক রঙের পুঁতির মালা গলায় ঝুলিয়ে দিল। জলভর্তি একটি বদনা গলায় ঝুলিয়ে নিল। হরেক কিসিমের বস্তু দিয়ে কিছু চাকতি তৈরী করে, মড়ার খুলি জোগাড় করে আজব একটি মালা সে বানিয়ে নিল। সেটি গলায় পরে যখন সে দাঁড়াল দেখলে গায়ে ঝাকুনি দিয়ে ওঠে। তার ওপর লাল-হলুদ একটি নিশান হাতে নিয়ে নিল।

গায়ে কাপুনি ধরানাে এরকম বিদঘুটে পােশাকে নিজেকে সাজিয়ে নিয়ে ডিলাইলাহ পথে বেরলাে। সে থপ্ থপ্ করে পথ চলতে চলতে একটু বাদ বাদ ‘ইয়া আল্লাহ! শােভন আল্লাহ!’ প্রভৃতি চিল্লিয়ে বলতে লাগল। আর মাঝে মধ্যে হরেক কিসিমের প্রার্থনার বুলি আওড়ানাে আছেই।

চলাফেরা ও চিল্লাচিল্লি করে এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করে তুলল যা কলিজা শুকিয়ে দেয়। গায়ের খুন হিম হয়ে যায়। তাকে দেখা মাত্রই শরীরের সব কটি স্নায়ু এক সঙ্গে সচকিত হয়ে ওঠে।

এভাবে তামাম নগর চক্কর মেরে মেরে বুড়ি ডিলাইলাহ এক সময় এক গলির মােড়ে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

গলির ঠিক মােড়ের ওপর এক পেল্লাই মঞ্জিল। আগাগােড়া শ্বেতপাথর দিয়ে মােড়া। তার সদর দরওয়াজায় এক দশাসই চেহারার এর পুর-রক্ষী। মঞ্জিলটির মালিক মুস্তাফা। খলিফার দেহরক্ষী। এ আদমি দুর্ধর্ষ প্রকৃতির। তামাম বাগদাদবাসী এর ডরে কাপে। মুস্তাফা এক খুব সুরৎ লেড়কিকে শাদী করে সুখে দিন গুজরান করছে। সচ্চরিত্র নিজের বিবি ছাড়া অন্য কোন লেড়কির দিকে ভুলেও নজর দেয় না।

আল্লাহ কিন্তু মুস্তাফার ওপর একদম বিমুখ। ঘরে একটিও বালবাচ্চা নেই। আজ পর্যন্ত তার বিবি একটিও লেড়কা পয়দা করতে পারল না। একেই বলে নসীব। একটি লেড়কার অভাবে তার দিল সর্বক্ষণ বিষিয়ে থাকে।

মুস্তাফার উমর বেড়েই চলেছে। চুল সফেদ হচ্ছে। দাঁত এক এক করে বিদায় নিচ্ছে। চোখের জ্যোতিও বিদায় নিচ্ছে। কিন্তু তবু সন্তানহীনতার দুঃখ তার দিল থেকে ঘুচল না।

একদিন যে-বিবি তার চোখের মণি ছিল আজ সে-ই তার সবচেয়ে অবজ্ঞা ও ঘৃণার পাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। দু’চোখ পেতে দেখতে পারে না। সামনে এসে দাঁড়ালেই তার মাথায় যেন খুন চেপে যায়। বাঁজা জেনানার মুখ দেখলেও নাকি গুনাহ।

মুস্তাফার নিশ্চিত বিশ্বাস তার বিবির জন্যই সে সন্তানহীন। তাকে দেখলে, তার মুখের বাৎ শুনলেই সে রীতিমত খেকিয়ে ওঠে। চিল্লিয়ে একদম বাড়ি মাৎ করে দেয়। অশ্রাব্য ভাষায় তাকে গালমন্দ করতেও ছাড়ে নাঁ। স্বামীর দ্বারা বার বার নির্যাতিত জেনানাটি প্রতিবাদ করে ওঠে—‘আমার কসুর কি? কেন মিছে আমাকে দেখলেই তুমি খেকিয়ে ওঠ?'

—‘উঠব না? হাজারবার খেকিয়ে উঠব। আলবৎ বিলকুল কসুর তাের। তাের জন্যই বুড়াে বয়সে আমাকে নিজের হাত কামড়াতে হচ্ছে, নিজের চুল ছিড়তে হচ্ছে আর দিনভর বুক চাপড়াতে হচ্ছে। কসুর সব কসুর তোরই।

'বলবে তো, আমার এমন কোন কসুর দেখলে যার জন্য আমাকে এমন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারছ।'

‘ইয়াদ নেই, শাদীর রাতেই আমাকে দিয়ে কসম খাইয়ে নিয়েছিলি আমি যেন অন্য কোন জেনানাকে ঘরে না আনি? আমি করলামও তা-ই। লেকিন ফয়দা কি হ'ল? বুড়া হতে তাে চললি | একটি বাচ্চা বিয়োবার হিম্মৎ হ'ল, বল? দরবারের সবার ঘর বালবাচ্চায় ঝলমল করে। আর আমার ঘর চির আন্ধার। আমার বংশ রক্ষার ফিকির পর্যন্ত হ'ল না। ইয়ার দোস্তরা অবজ্ঞা ও ঘৃণার চোখে আমার দিকে তাকায়। এক বাঁজা জেনানাকে নিয়ে জিন্দেগী কাটালাম। বিলকুল বরবাদ হয়ে গেল। জিন্দেগীভর যত বীর্য ঢাললাম, বিলকুল বিফলে গেল। কোন ফায়দাই'

--চুপ যাও! আমার কসুর খুঁজে না বেরিয়ে নিজের বীর্যের বিচার কর। নিজের দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকাও, বিলকুল ফয়সালা হয়ে যাবে। আদতে তােমার বীর্য পানির মাফিক পাতলা। বালবাচ্চা পয়দা করার উপাদানের নিতান্তই অভাব। মুস্তাফা গর্জে উঠল--কী, এতবড় বাৎ! আমার বীর্য পাতলা। লেড়কা পয়দা করার হিম্মৎ আমার নেই। আমার কসুরেই

( চলবে )

Post a Comment

0 Comments