খানাপিনা সারা হলে প্রহরীটি কামার অল’কে কয়েদখানায় ঢুকিয়ে দিল।
কয়েদখানার দরওয়াজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে না ঢুকতেই কামার অল কার যেন চাপা গােঙানি শুনতে পেল। দুরু দুরু বুকে কাছে এগিয়ে গেল। দেখল, এক বুড়া পাশ ফিরে শুয়ে অস্পষ্ট স্বরে হরদম কি যেন বলে চলেছে। হ্যা, শয়তান যাদুকরটি-ই বটে। কামার অল উৎকর্ণ হয়ে তার মুখের বাৎ শােনার কোশিস করল।
সে বলছে-‘হায় খােদা, কেন যে নদীটির ধারে ঘােড়া নামালাম। নইলে তাে আমাকে এরকম এক হতচ্ছাড়া বাদশাহের কবলে পড়তে হত না। এমন একটি টসটসে পূর্ণ যৌবনা লেড়কিকে দিল ভরে উপভােগ করার লােভ সামলাতে না পেরে চুরি করে নিয়ে ভেগেছিলাম। লেকিন আশ মিটল না। নচ্ছার বাদশাহের, শকুনের নজর পড়ল আমার খাবারের ওপর। ছিনিয়ে নিল। ইয়া খােদা! চালে একটু ভুল করলাম আর বিলকুল গড়বড় হয়ে গেল!
কামার অল বুড়ােটির কিসসা শুনতে শুনতে রাত্রি গুজরান করে দিল। জানলা দিয়ে ভােরের আলাে উঁকি দিতেই কামার অল-এর দিলে আশার সঞ্চার হ’ল। এবার কয়েদখানা থেকে খালাস পেয়ে বাদশাহের দরবারে হাজির হওয়ার অনুমতি পাবে।
একটু বাদে কয়েদখানার রক্ষী কামার অল’কে কয়েদখানা থেকে বের করে দরবারে যাওয়ার বন্দোবস্ত করে দিল।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
চারশ’ উনত্রিশতম রজনী
বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাঁহাপনা, কয়েদখানার রক্ষী কামার অলকে কয়েদখানা থেকে বের করে বাদশাহের দরবারে পৌছে দেবার জন্য এক প্রহরীকে সঙ্গে দিল।
কামার অল বাদশাহের দরবারে পৌছে নতজানু হয়ে কুর্ণিশ করল।
বাদশাহ প্রশ্ন করলেন—“কে তুমি? কি নাম তােমার? কোন মুলুক থেকে আসছ? আমার মুলুকেই বা তােমার কোন দরকার ?
সামস অল বাদশাহকে ফিন কুর্ণিশ করে বলল- জাহাপনা, আমার নাম হরজা। পারস্য আমার নিজের মুলুক। হেকিমী করে দিন গুজরান করি। কঠিন বিমারির ইলাজ করি। কারাে দিমাক গড়বড় হয়ে গেলে ইলাজ করে সারিয়ে তুলতে পারি। সবাই বলে, আমার ওপর নাকি খােদাতাল্লার দোয়া রয়েছে।
–তুমি কঠিন বিমারি, দিমাক গড়বড় হয়ে গেলে ইলাজ করে সারিয়ে তুলতে পার?
–‘জাহাপনা, আমার হাতে বিমারি সারে নি এরকম কোন ঘটনা আজ অধধি ঘটে নি। তবে তামাম আরব দুনিয়ার সুলতান বাদশাহরা আমার গুণের পরিচয় পেয়ে যেসব পদক-তকমা দান করেছেন তা যদি গলায় ঝুলিয়ে চলাফেরা করার কোশিস করি তবে বিলকুল অসম্ভব হয়ে উঠবে। তাছাড়া নিজের বিদ্যাবুদ্ধির জাহির করতে ঢাক-ঢােল পিটানােকে আমি ঘৃণা করি।
—তুমি কি কোন দাওয়াই দিয়ে, নাকি ঝাড়ফুক মন্ত্র দিয়ে বিমারির ইলাজ কর?”
—“নিয়মিত দাওয়াই দিয়েই আমি বিমারি সারাই। ঝাড় ফুকের কারবার আমার কাছে নেই। রােগী দেখব, তার তকলিফের ব্যাপারে পুছতাছ করব, রােগের পরিমাণ বিচার করব। ব্যস, এবার দরকার মাফিক দাওয়াই ব্যবহার করব।
‘লেকিন তােমার দাওয়াই যদি রােগ সারাতে না পারে তবে?”
—আপনার দরবারে সবার সামনে নাকে খৎ দিয়ে ফিরে যাব। একটি কানাকড়িও দাবী করব না।
—বহুৎ আচ্ছা! তােমার বাৎ শুনে আমি বহুৎ খুশী হয়েছি। বাদশাহ এবার নদীর ধারে বেড়াতে গিয়ে সামস অল এবং বুড্ডা ফেরেফবাজ যাদুকরের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে দরবারে কামার অল-এর উপস্থিতি পর্যন্ত বিলকুল ঘটনা কিছুমাত্রও গােপন না করে এক এক করে ব্যক্ত করলেন।
—জাহাপনা, আমি নিঃসন্দেহ, আপনার রােগীর বিমারি আমার দাওয়াই সারিয়ে তুলতে পারবেই।
—“তুমি যদি সাচমুচ লেড়কিটিকে সারিয়ে তুলতে সমর্থ হও তবে আমি তােমার কোন আশাই অপূর্ণ রাখব না। শােন নওজোয়ান, আমার দিল বলছে, কোন আফ্রিদি বা জিন পরীটরী লেড়কিটির কাঁধে ভর করেছে। তুমি অবশ্য আমার চেয়ে ভাল বুঝবে।
—জাহাপনা, মেহেরবানি করে রােগের লক্ষণগুলাে এক এক করে বলুন তাে শুনি? কোন কোন উপসর্গের জন্য তার দিমাক এরকম ঘটেছে বলে আপনি ধারণা করছেন?
–‘আমি যেদিন থেকে তাকে প্রাসাদে নিয়ে এসেছি, বুড়োটিকে কয়েদখানায় ঢুকিয়ে দিয়েছি আর আবলুশ কাঠের ঘােড়াটিকে আটক করেছি সেদিন থেকেই তার দিমাক কেমন যেন বিগড়ে যায়।
কামার অল মনস্থ করল, কাজ শুরু করার আগে নিজের চোখে তার প্রিয় যাদু-ঘােড়াটিকে একবারটি দেখে নেবে। হতচ্ছাড়া বুড়োটিকে দিয়ে ভরসা নেই, কলকজা বিগড়ে রাখতে পারে। বিলকুল ঠিক ঠাক থাকলে অনায়াসে কাজ হাসিল করে ফেলতে পারবে। তারপর সামস অল’কে এখান থেকে নিয়ে কেটে পড়ার ফিকির বের করতে হবে।
কামার অল বাদশাহকে বলল —“জাহাপনা, আমার দিল বলছে, ওই ঘােড়াটিই যত নষ্টের মূল। ওটার মধ্যেই রােগ জীবাণু ছিল। আমি একবার ঘােড়াটিকে দেখতে চাই। অবশ্য আপনার যদি কোন আপত্তি না থাকে।
‘এতে আর আপত্তির কি থাকতে পারে ? চল, আমি নিজেই তােমাকে নিয়ে গিয়ে দেখাচ্ছি।' কামার অল এবার অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে ঘােড়াটিকে উল্টেপাল্টে দেখে নিল। না, গড়বড় কিছুই নেই। কলকজা ও চাবি প্রভৃতি বিলকুল ঠিকঠাকই রয়েছে।
কামার অল এবার বাদশাহের দিকে ফিরে বলল—জাহাপনা, আমার ধারণাই ঠিক। মালুম হচ্ছে, রােগীর বিমারি সম্বন্ধে আমি ধারণা করতে পেরেছি। ঘােড়াটিই বিমারির কারণ।
‘তবে উপায় ? বিমারির ইলাজ ?
‘বিমারির ইলাজের ব্যাপারেও আমি অনেকখানিই এগিয়ে গেছি। আমি নিজে হাতেই দাওয়াই বানাব।'
‘বহুৎ আচ্ছা! তবে তুমি কাজে লেগে যাও।
‘জাহাপনা, এবার আমাকে যেতে হবে রােগীর কাছে। তার হালৎ নিজের চোখে দেখতে হবে। তার তকলিফের ব্যাপারে পুছতাছ করা দরকার। আর এক বাৎ, পরে হয়ত ইলাজের ব্যাপারে এ-ঘােড়াটিরও রােগীর কামরায় নিয়ে যাওয়ার দরকার হতে পারে।
বাদশাহ এবার কামার অল’কে সঙ্গে নিয়ে সামস অল-এর কামরায় গেলেন।
সামস অল এক লহমায় কামার অল’কে দেখেই চিনতে পারল। সে বাদশাহকে দেখেই নিজের কামিজ ছিড়তে শুরু করল। বার বার মাথা ঝাকিয়ে মাথার উসকো খুসকো চুলগুলােকে আরও আলুথালু করে নিল। ইয়া বড় বড় চোখ করে একবার বাদশাহের দিকে, পরমুহুর্তেই ফিন কামার অল-এর দিকে তাকাতে লাগল। কে বলবে, বদ্ধ পাগল নয়। কামার অল কিন্তু বুঝে নিল এসবই তার বাহানা। বাদশাহের সামনে নিজেকে উন্মাদিনী প্রতিপন্ন করার প্রয়াসমাত্র। তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়ার ফিকির।
কামার অল এবার ধীর-পায়ে সামস অল-এর দিকে এগিয়ে গেল। বেশ গলা চড়িয়েই বলল—“আপনার ওপর খােদাতাল্লার দোয়া বর্ষিত হােক! তার কৃপায় আপনি সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে উঠুন! তারই দোয়ায় আপনার বিমারি সেরে যাবে। ফিরে পাবেন আগের সে-স্বাভাবিক জীবন।
সামস অল-এর বুকে তখন খুশীর জোয়ার বয়ে চলেছে।
সাগরের ঢেউ যেন আছড়ে পড়ছে। কিন্তু অফুরন্ত আনন্দ-উচ্ছ্বাস মুখ ফুটে প্রকাশ করতে না পেরে বিকট আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ল। সংজ্ঞা একদম লােপ পেয়ে গেল।
কামার অল দৌড়ে গিয়ে তাকে তুলে বসাবার কোশিস করে। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে—“সামস, মেহেবুবা আমার, ওঠ, চোখ মেলে তাকাও। ধৈর্য ধর। খুবই কৌশলে ও সতর্কতার সঙ্গে আমাদের ধাপে ধাপে এগােতে হবে। এখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার ফিকির খুঁজতে হবে।
বাদশাহ ভাবলেন, নওজোয়ান হেকিমটি কাজ শুরু করে দিয়েছে। দাওয়াইয়ের সঙ্গে কিছু ঝাড়ফুঁকও তার চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে। তারই কাজ চলেছে।
কামার অল বলে চলে—“মেহেবুবা, খুবই হুঁশিয়ার হয়ে আমাদের প্রতিটি পা ফেলতে হবে। একটু এদিক-ওদিক হলেই বিলকুল বরবাদ হয়ে যাবে, ইয়াদ রেখাে। তবে কিন্তু বাদশাহ আমার জান খতম করে দেবেন। নারী-খাদক বাদশাহের দিলে একবার বিশ্বাস আনতে পারলে আমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার ব্যাপারে ভাবনা অনেক কমে যাবে। তােমার সক্রিয় সাহায্য ছাড়া আমি কিন্তু কাজ হাসিল করতে পারব না মেহেবুবা।
এবার কামার অল ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিল, বাদশাহ কামরা ছেড়ে চলে গেছেন।
সে ফিন একই রকম অনুচ্চ কণ্ঠে বলতে লাগল—‘শােন সামস অল, বাদশাহ কামরা ছেড়ে গেছেন। আমি তাকে বলব, তােমার কাধে জিন ভর করেছে। তাই তােমার এরকম পাগলীর মাফিক হাল হয়েছে। আমি তাকে ভরসা দেব, আমি ইলাজ করলে তুমি বিলকুল সেরে উঠবে। ফিন স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে। তােমার কাজ হবে, ধীরে ধীরে সাধারণ আদমির মাফিক বাৎচিৎ করা। তবেই আমার ইলাজের ওপর তার ভরােসা হবে।
সামস অল মুচকি হাসল। তারপর ঠিক তেমনি ফিসফিসিয়ে বলল —“আমার ওপর, আমার অভিনয়ের ওপর ভরসা রাখতে পার। এতদিন যে পাগলীর অভিনয় করেছি, কেউ বুঝল কিছু ? এবারও ঠিক তােমার মতলব মাফিক কাজ করে যাব। ঘাবড়িয়ো না ।
কামার অল এবার বাদশাহের কাছে ফিরে এল। তাকে কুর্নিশ করে বলল -“জাহাপনা, আপনার রােগীর বিমারি ধরা পড়েছে। তার কাধে জিন ভর করেছে। আপনার ওপর খােদাতাল্লার অশেষ দোয়া তাই তাে তিনি আমাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আর ক’দিন এভাবে কাটলে আর দেখতে হত না, রােগীর জান নিয়ে নিত। নয়ত বিলকুল পাগল বনে যেত। লেকিন এখন আর কোন ডর নেই। আমি তাে আছিই।
–“দেখ, কোশিস করাে। আমি চাই সে একদম সুস্থ-স্বাভাবিক হয়ে উঠুক।
—“আমি ইতিমধ্যেই একটি দাওয়াই দিয়ে দিয়েছি। কিছুটা ফল হচ্ছে তা শীঘ্রই মালুম হবে। এখনই যান, কিছু অন্ততঃ ধারণা করতে পারবেন।'
–‘সে কী হা! সবে দাওয়াই দিয়ে এলে এরই মধ্যে—এত জোরদার দাওয়াই তােমার!
বাদশাহ কৌতুহলী দিল নিয়ে ব্যস্ত-পায়ে সামস অল-এর কামরায় দরওয়াজায় গিয়ে দাঁড়ালেন।
সামস অল মুচকি হেসে তাকে কুর্ণিশ করল। সামস অল বলল—“জাহাপনা, মেহেরবানি করে যে বাঁদীকে স্মরণ করেছেন তাতে আমি নিজেকে ধন্য জ্ঞান করছি।
বাদশাহের মুখে হাসির ঝিলিক দেখা দিল।
এমন সময় প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় পাখিদের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। ভােরের পূর্বাভাষ। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
চারশ’ ত্রিশতম রজনী
বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন –‘জাঁহাপনা, সামস অল-এর মধ্যে আশাতীত পরিবর্তন ঘটেছে দেখে বাদশাহের দিল খুশীতে নেচে উঠল।
প্রথম পদক্ষেপেই কামার অল এতখানি সাফল্যলাভ করবে এ যেন বাদশাহ খােয়াবের মধ্যে কোনদিন ভাবতে পারেন নি।
বাদশাহ প্রাসাদের দাসীদের হুকুম দিলেন—“সামস অল’কে হামামে নিয়ে গিয়ে আচ্ছা করে ঘষে মেজে গােসল করিয়ে জড়িদার ঝলমলে পােশাক পরিয়ে দাও। আর মণি-মুক্তা খচিত অলঙ্কারাদি দিয়ে সাজিয়ে নিয়ে এসাে।
দাসীরা সামস অল’কে নিয়ে গিয়ে বাদশাহের হুকুম মাফিক সাজিয়ে গুজিয়ে নিয়ে এল।
বাদশাহ হেকিমকে বলেন-“তােমাকে সুকরিয়া জানাবার ভাষা আমার নেই। তােমার ইলাজের অলৌকিক ক্ষমতা দেখে আমি বাস্তবিকই তাজ্জব বনছি। তােমার অলৌকিক ক্ষমতার তুলনা একমাত্র পয়গম্বরের সঙ্গেই চলতে পারে। খােদাতাল্লা তােমাকে চিরজীবি করুন। তােমার দৌলতেই আজ আমার চোখে-মুখে হাসির ছােপ দেখা দিয়েছে।
---“জাহাপনা, শাহজাদীকে সম্পূর্ণ সুস্থ করতে হলে কোন এক স্বাস্থ্যকর স্থানে বায়ু পরিবর্তনের জন্য নিয়ে যাওয়া দরকার। আজই তাকে নিয়ে চলুন, চিকিৎসার পরবর্তী ধাপ সেখানেই শুরু করব। তবে হ্যা, ঘােড়াটিকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। ঘােড়াটি কাঠের হলেও রােগটির জন্মদাতা, এটি ভুললে চলবে না। বাদশাহ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে কামার অল-এর দিকে তাকান। কামার অল বলে চলে—“হ্যা জাঁহাপনা, কাঠের ঘােড়াটিই জিনের বাহন। প্রাসাদে জিনকে তাড়াতে গেলে সাময়িকভাবে হয়ত সে শাহজাদীর ঘাড় থেকে নেমে প্রাসাদেরই কোন আনাচে কানাচে গা-ঢাকা দিয়ে থাকবে। আমি প্রাসাদ ছেড়ে যাওয়ামাত্রই ফিন তার কাঁধে চেপে বসবে। তাই ঘােড়াটিকে সঙ্গে নিয়ে যেতে বলছি। আমি শাহজাদীর কাঁধ থেকে হতচ্ছাড়ি জিনকে নামিয়ে বিশালায়তন এক কামরায় পুরে ফেলব। ব্যস, জালা সমেত তাকে দরিয়ার পানিতে ফেলে দেব। এর আগে পর্যন্ত আমাদের উল্লসিত হবার কিছু নেই। কামার অল-এর পরামর্শে কাজ হ’ল। বাদশাহ শাহজাদী সামস অল, কাঠের ঘােড়াটি এবং কামার অলকে নিয়ে হৈ হৈ করে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে পড়লেন। আর দাসীবাদী, নােকর-নফরও কম যায় নি। নগর থেকে দূরবর্তী এক পাহাড়ের পাদদেশে বাদশাহের হুকুমে তাবু ফেলা হল। বাদশাহ তাবুর সামনে আরাম কেদারা পেতে বিশ্রাম করছেন। এমন সময় কামার অল তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কৃর্ণিশ করে বলে—“জাহাপনা, কাল ভােরে আমি শাহজাদীকে নিয়ে ঘােড়াটিতে চাপতে চাইছি। তখনই জীনের সঙ্গে আমার আদৎ মােলাকাৎ, বােঝাপড়া। সে অবশ্য আমাকে জব্দ করার কোশিস করবে। কিন্তু বহু কোশিস করেও খতম করতে সক্ষম হবে না। আমি তাকে একদম জাপ্টে ধরে ফেলব। ভাগতে পারবে না।
বাদশাহ বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে কামার অল-এর বক্তব্য শুনতে লাগল।
কামার অল বলে চললেন-“জাহাপনা, আমার অনুরােধ, মেহেরবানি করে আপনি বা আপনার সেনাপতিরা জীনের নজরের ধারে কাছে ঘেঁষবেন না। সে সুযােগ পেলে শাহজাদীর হয়ত ঘাড় থেকে নেমে আপনাদের কারাে ঘাড়ে চেপে বসবে। আমি তাকে বিলকুল বাগে ফেলে তবে আপনাদের তলব করব। এর আগে পর্যন্ত আপনারা দূরে দূরেই থাকবেন। খবরদার কৌতূহলের শিকার হয়ে এগগাবার কোশিস করবেন না।
বাদশাহ বললেন—“তুমিই বলে দিও আমরা কোথায়, কতদূরে থাকব।
ভাের হতে না হতেই কামার অল রােগীর বিমারির ইলাজ শুরু করে দিল। বাদশাহের দূরবর্তী একটি জায়গা দেখিয়ে সঙ্গী সাথীদের নিয়ে অপেক্ষা করতে বলল। বলল —“খবরদার কেউ জীনটির নজরবন্দীর আওতায় থাকলে শাহজাদীকে দেখে সে অস্থির হয়ে উঠে তার দিকেই ধাওয়া করবে। যা করার আমিই করব। বােঝাপড়া করে ঠিক কজা করে নেব।'
কামার অল-এর বাৎ শুনে বাদশাহের কলিজা শুকিয়ে যাওয়ার জোগাড় হ’ল। বলা তাে যায় না, শয়তান জীনটি যদি ক্ষেপে গিয়ে হেকিমকে ছেড়ে ধাওয়া করে, অন্য কারাে ঘাড়ে চাপে তবেই জান খতম করে ছাড়বে। তবে ভরসা, হেকিম জবরদস্ত। তার সঙ্গে জীনটি ফেরেফবাজী করে সুবিধা করতে পারবে না। সে তাকে খতম করে ছাড়বে। বাপের বেটা না হলে, পুরােদস্তুর হিম্মৎ না থাকলে কেউ এমন ভয়ঙ্কর একটি কাজে হাত দেয়।
কামার অল এবার সামস অল’কে নিয়ে কালাে যাদু-ঘােড়াটিতে চেপে বসল। ডান দিকের বােতাম টিপতেই ঘােড়াটি এক ঝাকুনি দিয়ে ওপরের দিকে উঠতে লাগল। বাদশাহ ও তার সঙ্গী সাথীরা দূর থেকে ধন্বন্তরী হেকিম কামার অল-এর অত্যাশ্চর্য ইলাজের পদ্ধতি দেখতে লাগলেন। তারা লক্ষ্য করলেন, ঘােড়াটি দ্রুত আশমানের দিকে উঠে যাচ্ছে। বাদশাহ ভাবলেন, হয়ত জীনের সঙ্গে হেকিমের জোর লড়াই শুরু হয়ে গেছে। হেকিম জীনটিকে কায়দা কসরৎ করতে লেগে গেছে। হেকিম নির্ঘাৎ অচিরেই তাকে কজা করে আশমান থেকে জমিনে আছাড় মেরে ফেলবে। জব্বর হেকিম। অসীম তার হিম্মৎ বটে। বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। সেনাপতি ও সৈন্যদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ভর করল। সেনাপতি ফ্যাকাশে মুখে বলল—‘জাঁহাপনা, তাজ্জব ব্যাপার তাে। হেকিমের তাে ফেরার কোন ভাবই মালুম হচ্ছে না। হেকিমের ওপর বাদশাহের অগাধ বিশ্বাস। তিনি বিরক্তি প্রকাশ

0 Comments