সহস্র এক আরব্য রজনী পার্ট ১৪০ (Sahasra ek arabya rajani part 140)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।

দুনিয়ায় পয়দা হলে ইন্তেকাল তাে একদিন হবেই। আমার কাছে এটাও তাে লড়াই-ই। মহব্বতের লড়াই, তােমাকে বুকে পাবার লড়াই।

শাহজাদী সামস অল মুহুর্তে ঘাড় ঘুরিয়ে তার মেহেবুবার দিকে তাকায়। সে যেন জেগে খােয়াব দেখছে।

দাসী-বাঁদীরা হুড়মুড় করে কামরা ছেড়ে ভেগে গেল। শাহজাদী সামস অল নাহার বিলকুল তাজ্জব বনে গেল। এমনটি তাে হওয়াই স্বাভাবিক। তার আব্বার মরণফাদ থেকে একবার সে সবার চোখে ধূলাে দিয়ে ভেগেছে সে-ই ফিন স্বেচ্ছায় হাড়িকাঠে মাথা গলিয়ে দেবে এ যে খােয়াবের মধ্যেও ভাবা যায় না।

সামস অল তার মেহেবুবের বুকে আছাড় খেয়ে পড়ে ডুকরে ডুকরে কাদতে লাগল। চোখের পানি ঝরিয়ে বুকের বােঝা হাল্কা করার কোশিস করে।


কামার অল আকমর বলতে লাগল—“তােমার বিরহে আমি যে কী দর্বিষহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে ফিন কাটিয়েছি, আমার কলিজায় আগুন সারাক্ষণ দাউ দাউ করে জ্বলেছে সেসব তােমাকে আমি বঝাতে পারব না মেহেবুবা। আজ তােমাকে ফিরে পাওয়ামাত্র আমার বুকে যেন বরফ বুলিয়ে দেয়া হয়েছে। কলিজা বিলকুল ঠাণ্ডা বনে গেছে। শাহজাদী সামস অল আবেগে-উচ্ছ্বাসে অভিভূত। মাত্রাতিরিক্ত খুশীতে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে। সে উন্মাদিনীর মাফিক তার মেহেবুবের ঠোটে, গালে ও কপালে হরদম চুমু খেতে লাগল।

সে মেহেবুবের বুকে মুখ গুঁজে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে বলতে লাগল--মেহেবুব আমার, তােমার অদর্শনে আমার হালৎ কি হয়েছিল, বুঝতে পারছ না? আর কিছুদিন তুমি চোখের আড়ালে থাকলে তােমার মেহেবুবাকে আর দেখতে পেতে না। সে জমিনে, গােরে আশ্রয় নিত। তােমাকে ছাড়া আমি জিন্দা থাকতে চাই না, পারবও না। মহব্বতকে যদি জিন্দাই রাখতে না পারলাম তবে আর নিজেকে জিন্দা রেখে ফয়দা কি? আমি নিয়ত করেছিলাম, তােমাকে নেহাৎ-ই যদি বুকে ফিরে না পাই তবে বিষ খেয়ে এজান খতম করে দেব।

মেহেবুবার বাৎ শুনে কামার অল আতঙ্কিত হয়ে তার মুখ চেপে ধরে বলে উঠল—এ সব অলুক্ষণে ভাবনা বিলকুল দিল থেকে ঝেড়ে ফেলে দাও মেহেবুবা। আমি দূরে থাকি, যেখানেই থাকি না কেন তােমার হয়েই থাকব। আমাদের মহব্বতে কোনদিনই ভাটা পড়বে না। আজ যেমন তুমি আমার, ভবিষ্যতেও বিলকুল আমারই থাকবে।'  

শাহজাদীর হুকুমে দু'জন দাসী খানা আর সরাব দিয়ে গেল। |সামস অল দুটি রেকাবিতে হরেক কিসিমের খানা সাজিয়ে একটি কামার অল আকমরকে দিল এবং নিজে নিল একটি রেকাবি। সরাব দিল পেয়ালা ভরে।

খানাপিনা সেরে তারা ফিন মহব্বতের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিল। উভয়ের দিল খুশীতে ডগমগ। প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় পাখিদের চাঞ্চল্য লক্ষ্য করে কামার অল আকমর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—‘মেহেবুবা, খুশীর রাত। কেমন তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায় দেখ! এর মধ্যে পাখিরা আমাদের হুঁশিয়ার করে দিচ্ছে, ভাের হয়ে এল বলে।

তবে কি তুমি— -“হ্যা মেহেবুবা, এবার আমাকে বিদায় নিতেই হবে। তােমার আব্বা কেমন বদ মেজাজ মর্জির লােক তা-তাে তুমি জানই। হতচ্ছাড়া খােজাটির নিদ টুটে গেলে কেলেঙ্কারীর চূড়ান্ত হয়ে যাবে। আমি তােমার কাছে কসম খাচ্ছি প্রতি হপ্তায় একবার করে এসে তােমার সাথে মিলিত হব। সামস অল নাহার তাকে দু হাতে লতার মাফিক বুকে জাপটে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল—“অসম্ভব! বিলকুল অসম্ভব! তােমাকে বিনা আমি জানই রাখতে পারব না। এক হপ্তা তাে দূরের কথা, একদিন—এক মুহূর্তও তােমাকে চোখের আড়ালে করতে পারব না মেহবুব আমার। তুমি এখানেই থাকবে।

কামার অল সচকিত হয়ে ওঠে। এক লহমায় তার কলিজার বিলকুল পানি শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। সামস অল-এর গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে ক্ষীণকণ্ঠে কোনরকমে উচ্চারণ করে—মেহেবুবা, তােমার আব্বাকে তাে চেনই কেমন জেদী। আমাকে তােমার কামরায় দেখলে একদম গর্দান নিয়ে ছাড়বেন। ‘জানি মেহেবুব, আমার কামরায় তােমাকে রাখলে জিন্দেগীর জন্য তােমাকে হারাতে হবে। ভুলেও আমি এরকম প্রস্তাব দেব না। লেকিন তােমাকে দূরে রেখে আমার জান রাখাও কঠিন সমস্যা।

—“তবে? তবে এমন কোন ফন্দি-ফিকিরের তার মুখের বাৎ ছিনিয়ে নিয়ে সামস অল বলল—“ফিকির একটিই করা যেতে পারে—আমাকে তােমার সঙ্গে করে

—“আমার সঙ্গে?

–হ্যা, তােমার আব্বা পারস্যের মহামান্য বাদশাহ। তার মান ইজ্জৎ আমি পথের ধুলায় লুটিয়ে দিতে উৎসাহী নই। তিনি যদি আমাকে তােমার সঙ্গে শাদী দিয়ে প্রাসাদে তুলতে আপত্তি করেন তবে অন্য কোথাও আমাকে রেখে দেবে। তােমার মুখ চেয়ে, মহব্বতের খাতিরে দুনিয়ার বিলকুল তকলিফ হাসিমুখে বরদাস্ত করে নেব।'

উচ্ছ্বসিত আবেগে কামার অল লাফিয়ে উঠল। সােল্লাসে বলল—বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ বড়িয়া মতলব। তােমার আব্বার এমন ধন দৌলত, এত সুখ-সুবিধা বিলকুল ছেড়ে আমার সহগামিনী হতে পারবে?

‘পারব। জরুর পারব। মেহবুব তােমাকে বুকে পাবার জন্য দুনিয়ার বিলকুল তকলিফ সহ্য করতে পারব।

—“তবে আর দেরী কোরাে না। ভাের হয়ে এল বলে। নিগ্রো খোঁজাটির নিদ টুটে গেলে ঝকমারিতে পড়তে হবে। এ-মুহূর্তেই আমাদের খােদাতাল্লার নাম নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হয়।

কামার অল তার মেহেবুবা সামস অল’কে নিয়ে ব্যস্ত পায়ে ছাদে উঠে এল। তার হাতে সামস অল-এর কিছু পােশাক-পরিচ্ছদ আর বহুমূল্য গহনাপত্র।

সামস অল’কে ঘােড়াটির পিঠে বসিয়ে দিয়ে নিজে তার পিছনে বসল। হাতের পােটলাটি ঘােড়ার জিনের সঙ্গে লটকে দিল।

ঘােড়াটির গায়ের ডানদিকের চাবিটিতে মােচড় দেয়ামাত্র সে তার কেরামতি শুরু করে দিল। শোঁ শোঁ শব্দে আশমানের দিকে উঠতে লাগল। যাদু-ঘােড়া উদ্ধার বেগে ধেয়ে চলল বাদশাহ সাবুর-এর রাজ্য পারস্যের দিকে। এদিকে নিগ্রো-খােজা বিছানা ছেড়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে পড়ল। তার আতঙ্কের কারণ তরবারিটি জায়গা মাফিক নেই। মেঝেতে পড়ে। সে ভাবল, নির্ঘাৎ সে নওজোয়ানটি শাহজাদীর কামরায় হামলা চালিয়েছে।

দরওয়াজার সামনে গিয়েই সে দেখল, কামরা ফাঁকা। শাহজাদী উধাও। ভয়ে ডরে সে আঁৎকে উঠে চিল্লাতে লাগল।

নিগ্রো-খোজাটির চিল্লাচিল্লি শুনে সুলতান পালঙ্ক থেকে লাফিয়ে নেমে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে শাহজাদীর কামরায় এলেন। কামরা খালি।

সুলতান ব্যস্ত পায়ে ছাদে উঠে দেখেন, বহু দূরে কালাে মাফিক একটি বিন্দু যেন ক্রমে দূরে চলে যাচ্ছে। বুঝতে অসুবিধা হল না ব্যাপার কি।

সুলতান যেন মুহুর্তে উন্মাদদশা প্রাপ্ত হলেন। চিল্লিয়ে বলতে লাগলেন-“কামার অল, খােদার কসম, আমার একমাত্র বেটি সামস অল’কে ফিরিয়ে দিয়ে যাও। তাকে আমার বুক থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যেয়াে না। আমার জান, আমার কলিজা সামস অল’কে ফিরিয়ে দিয়ে যাও। সুলতান উন্মাদের মাফিক দু' হাতে বুক চাপড়াতে লাগলেন।

লেকিন হায়, সুলতানের ডাকে কেউ-ই সাড়া দিল না। আদতে তার কণ্ঠস্বর তাদের কানে পৌঁছনাের তাে প্রশ্নই ওঠে না, এমন কি ধারে কাছেও যায় নি।

তবু সুলতান সাধ্যাতীত গলা চড়িয়ে ফিন চিল্লাচিল্লি করতে লাগলেন—“সামস অল, ফিরে আয় ! আমার বুকে ফিরে আয় বেটি ! আমি খােদার নামে কসম খাচ্ছি, তাের মর্জি মাফিকই কাজ হবে। যা চাস, যাকে চাস পাবি।

ব্যর্থ প্রয়াস। কেউ-ই ফিরল না।

এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চারশ’ পঁচিশতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—জাহাপনা, জাদু-ঘােড়াটি বাদশাহ সাবুর-এর প্রাসাদে নামল। কামার অল বলল -মেহবুবা, আমাদের প্রাসাদ এটি। আব্বার সামনে তােমাকে নিয়ে যেতে ডর লাগছে, যদি গােসসা করে তােমাকে কিছু বলে ফেলেন সে আমার বা তােমার কারােই কাম্য নয়। তােমাকে এখন কোথায় যে রাখি ভেবে পাচ্ছি না।

–“দেখ ভেবে কি করা যায়। লেকিন একটি বাৎ তােমাকে ছাড়া আমার পক্ষে কোথাও থাকা সম্ভব নয়।

তার তুলতুলে রক্তিম গালে আলতাে করে একটি টোকা দিয়ে বলল –“কি যে বল মেহেবুবা, তােমাকে দূরে রেখে আমার পক্ষেই কি আর থাকা সম্ভব, বল? তার চেয়ে বরং চল আমরা বাগিচা প্রাসাদে গিয়েই মাথা গুজি।

কামার অল ফিন যাদু-ঘােড়ার পিঠে চেপে বাগিচা-প্রাসাদে গিয়ে হাজির হল।

খুবসুরৎ জায়গা বটে। চারদিকে ফুল আর ফলের গাছ। তারই কেন্দ্রস্থলে ছােট একটি পটে আঁকা ছবির মাফিক প্রাসাদ। তারই এক পাশে নীল-পানির ফোয়ারা।

কামার অল তার মেহেবুবার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বলল —এমন নিরিবিলি এক প্রাসাদে থাকতে তােমার একটু-আধটু অসুবিধা হতে পারে ঠিকই। লেকিন দু'-চারদিনের মামলা। ব্যস, তারপরই মওকা বুঝে আব্বার কাছে তােমার প্রসঙ্গ পাড়ব। আমি তার একমাত্র লেড়কা। তার বহুৎ আশা ছিল জাক করে আমার শাদী দেবেন। তামাম আরব দুনিয়া থেকে নিমন্ত্রিত মেহমানরা আসবেন। তুমি এখানেই থাক আমি আব্বার সঙ্গে ভেট করে আসছি। কাল রাত্রে আমি একদম চুপিচুপি প্রাসাদ ছেড়েছি। 

ঘােড়াটি সামস অল-এর জিম্মায় রেখে কামার অল তার আব্বার সঙ্গে ভেট করতে চলে গেল।

লেড়কাকে ফিরে পেয়ে বাদশাহ সাবুর যেন নয়া জনম লাভ করলেন। খুশিতে তার দিল্ ভরে উঠল। লেড়কাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বহুৎ আদর সােহাগ করলেন।

কামার অল বলল —“আব্বা, আপনার জন্য বহুৎ বড়িয়া এক ভেট নিয়ে এসেছি। সানার সুলতানের লেড়কি। খুবসুরৎ। তামাম আরব দুনিয়া ঢুঁড়ে এলেও এমন সুরৎ দ্বিতীয় কোন লেড়কির মধ্যে মিলবে না।

–‘সুলতানের লেড়কি! সানার সুলতানের লেড়কি? সানার সুলতান ভেট পাঠিয়েছেন?

–হ্যা, আব্বা। সে আপনার একমাত্র লেড়কার বিবি হবে। বাদশাহ সােল্লাসে চিল্লিয়ে উঠলেন—“আমার লেড়কার বিবি হবে? কোথায় সে? কোথায় তাকে রেখে এসেছ বেটা?’

—আপনার বাগিচা-প্রাসাদে।

‘আমার লেড়কার বিবি যে হবে তাকে বাগিচা প্রাসাদে কেন প্রাসাদে এনে তুললে না? এ কী তাজ্জব বাৎ!

-“আব্বা, আপনি তাকে বাজি পুড়িয়ে বাজনা বাজিয়ে, বাতির বন্যা বইয়ে জাঁক করে প্রাসাদে নিয়ে আসবেন। তাই সরাসরি প্রাসাদে না তুলে বাগিচা-প্রাসাদে রেখেছি।'

বাদশাহ খুশীতে ডগমগ হয়ে উজিরকে তলব করলেন। বৃদ্ধ উজির পডি কি মরি করে এসে হাজির হলেন। কুর্ণিশ সেরে কুমের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইলেন।

বাদশাহ হুকুম জারি করলেন—“দাস-দাসী, নফর-ননাকরদের বলুন প্রাসাদ সাজাতে। কামরায় কামরায় ঝাড়বাতি জ্বালিয়ে দিতে। চেঁড়া পিটিয়ে নগরবাসীদের খবর দিন তৈরি হতে। আমার বেটার বিবিকে জাঁকজমকের সঙ্গে বাগিচা প্রাসাদ থেকে এ-প্রাসাদে নিয়ে আসতে হবে। বাতি জ্বালুন, বাজি পােড়ান-খুশীর বন্যা বইয়ে দিন তামাম মুলুকে।

বাদশাহ ব্যস্ত হয়ে ধনাগারে প্রবেশ করলেন। ইয়া পেল্লাই সিন্দুক প্রাসাদের বহু মূল্য অলঙ্কারাদি রক্ষিত আছে। সবচেয়ে মূল্যবান পাথর ব্যবহৃত অলঙ্কার তিনি নিজে পসন্দ করে বের করলেন। লেড়কার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন-“আমার খানদানের সেরা অলঙ্কার। বংশ পরম্পরায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যাও বেটা, তুমি নিজে হাতে তাকে পরিয়ে সাজিয়ে প্রাসাদে নিয়ে আসবে। বৃদ্ধ উজিরের নেতৃত্বে বিশাল শােভাযাত্রা বাগিচা প্রাসাদের সদর-দরওয়াজায় এসে থামল।

উজির বাগিচা-প্রাসাদের অন্দর মহলের কাছাকাছি পৌছেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাঁর চোখে-মুখে ফুটে উঠল আতঙ্ক মিশ্রিত বিস্ময়। পাথরের মূর্তির মাফিক নিশ্চল নিথর ভাবে, অপলক চোখে তিনি শাহজাদা কামার অল-এর দিকে তাকিয়ে।

এদিকে কামার অল বাগিচা-প্রাসাদে সামস অল-এর জন্য সােনার জরির কাজ করা ঝলমলে বিবির পােশাকও রত্নাভরণ নিয়ে পৌছেই বিলকুল তাজ্জব বনে যায়। কামরা শূন্য, সামস অল নেই। যাদু-ঘােড়াটিও বেপাত্তা। তবে? তবে কি-না, আর ভাববার শক্তি তার নেই। মাথা চক্কর মারতে থাকে। হাতের পােশাক ও অলঙ্কারাদি পড়ে যায়। নিজেও আছাড় খেয়ে পড়ে কামরার মেঝেতে। ব্যস বিলকুল বেহুস।

বৃদ্ধ উজির কামার অলকে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে সবিস্ময়ে আর্তনাদ করে ওঠেন—“ইয়া আল্লা! শাহজাদার এ কী হাল হয়েছে ?

উজির কামরায় ঢুকে পেয়ালা ভরে পানি নিয়ে সামস অল-এর চোখে-মুখে হরদম ছিটা দিতে থাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার সংজ্ঞা ফিরে এল।

কামার অল ভাবতেই পারছে না সামস অল যাদু-ঘােড়ায় চড়ে বেমালুম উধাও হয়ে যেতে পারে। এ তাে সাচমুচ যাদু-ঘােড়া তাে কলকব্জার ব্যাপার। প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা আলাদা চাবির বন্দোবস্ত। এর আট ঘাট না জানলে সামস অল-এর পক্ষে কি করে উধাও হওয়া সম্ভব হতে পারে?

পারসিক-প্রান্ত ব্যক্তি ছাড়া ঘােড়াটির নাড়ি নক্ষত্রের হদিস তাে অন্য কারাে জানা নেই। বুদ্ধি-কৌশল প্রয়ােগ করে কামার অল এর সামান্যই জানতে পেরেছে। ব্যস, আর কেউ-ই তাে ঘােড়াটির ব্যাপারে অভিজ্ঞ নয়। তবে কি এটি সে-পারসিক-প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরই কাজ?

কামার অল উন্মাদের মাফিক ছুটতে ছুটতে বাগিচার মালীর কাছে হাজির হল।

এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শহরজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চারশ' ছাকিবশতম রজনী

রাএির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শহরাঞ্জাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাহাপনা, কামার অল বাগিচার মালীর কাছে গিয়ে বললেন-“যা বলছি, সাচা জবাব দেবে। কোন আদমি বাগিচায় ঢুকেছিল?'

কোরবানির ফাসির মাফিক কাপতে কাপতে বেচারা বাগিচার বুড়াে মালী বল‘জুর, আপনি ছাড়া তাে বাগিচায় কেউ-ই ঢােকে নি, বেরিয়ে যেতে দেখি নি কাউকেই। তবে হ্যাঁ, ইয়াদ হয়েছে, সে পারসিক-প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটি এক দফে বাগিচায় ঢুকেছিল বটে। ভেতরেই রয়েছে তাকে বেরােতে দেখিনি।

কামার অল-এর দ্বিধা-সংশয় কেটে যায়। নিঃসন্দেহ হল, তারই এ কাজ। তিনিই গােপনে সামস অল’কে ঘােড়ার পিঠে চাপিয়ে চম্পট দিয়েছেন।

মিছিলের সঙ্গে বাদশাহ স্বয়ং উপস্থিত। কামার অল ছুটে গিয়ে তাকে বলল —“আব্বাজী, আপনি মিছিল নিয়ে ফিরে যান। আমি, তার তালাসে যাচ্ছি। পাত্তা না মেলা পর্যন্ত আমি ফিরছি না।

বাদশাহ তাকে বাধা দেবার কোশিস করলেন। লেকিন তাকে কিছু বলার সুযােগ না দিয়েই সে এক লাফে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল। ঘােড়াটি বাতাসের বেগে ধেয়ে চলল ।

পারসিক ব্যক্তি বাগিচায় ফুল সংগ্রহ করতে ঢুকে তার সে অমূল্য সম্পদ যাদু-ঘােড়াটির হদিস পেয়ে যান। আর প্রাসাদ ঢুঁড়ে দেখতে গিয়ে পালঙ্কের  ওপর এক খুব সুরৎ যুবতীকে নিদে বিভাের অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। খুশিতে তার দিল ডগমগিয়ে ওঠে। কলিজা নাচানাচি শুরু করে দেয়। তিনি কামরার ভেতরে ঢুকে যান। তার পায়ের শব্দে সামস অল-এর নিদ টুটে যায়।

পারসিক-প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটি ঝট করে তাকে কুর্ণিশ করে বলে ওঠে-শাহজাদী, আমি শাহজাদা কামার অল-এর বান্দা। তিনি এ-নগরেই বিশাল এক প্রাসাদে আপনার থাকার বন্দোবস্ত করেছেন। আমাকে পাঠিয়েছেন আপনাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

একেই বলে নসীব। নসীবে যা লেখা আছে তা সে ঘটবেই, সামস অল তবু বলল –লেকিন তিনি নিজে এলেন না কেন?'

-“ইয়া আল্লা। আপনি বুঝি জানেন না? তার আম্মার তবিয়ৎ বহুৎ খারাপ।

‘আম্মার তবিয়ৎ খারাপ, বিমারি—আগে কিছু বলেন নি।

( চলবে )

Post a Comment

0 Comments