সহস্র এক আরব্য রজনীর গল্প পার্ট ১৩৯ ( Arabyarajaani Bangla Part 139)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।

তবু মান-ইজ্জৎ রক্ষা করতে দাঁতে দাঁত চেপে লড়তে হবেই। এদিকে নওজোয়ান কামার অল তার কাঠের ঘােড়ার ভেল্কি দেখাতে লেগে গেল। তড়াক করে লাফিয়ে ঘােড়ার পিঠে উঠে বসেই সে আচমকা ঘােড়াটির ডানদিকের বােতামে হাল্কা চাপ দিল। ব্যস, সেটি মৃদু ঝাকুনি দিয়ে উদ্ধার বেগে আশমানের দিকে উঠে যেতে লাগল। সুলতান উজির, নাজির সহ হাজার হাজার সৈন্য হাঁ করে তাজ্জব ব্যাপারটি প্রত্যক্ষ করতে লাগল। অনেকেই বিলকুল সংজ্ঞা হারিয়ে জমিনে লুটিয়ে পড়ল। সুলতান সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে উন্মাদের মাফিক চিল্লিয়ে উঠল—‘ভেগে গেল! ওই যে ভাগছে! পাকড়াও—পাকড়াও।


আশমানের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই সৈন্যাধ্যক্ষ বলল —এ কী করে সম্ভব! নিজের চোখেই তাে দেখছেন, মুহূর্তে কেমন চো-চো ছুট দিয়ে আশমানেই সেই কোথায় উঠে গেল। চোখের পলকে ঘােড়াটি এসেই ঊর্ধ্বাকাশে উঠতে উঠতে একদম বেপাত্তা হয়ে গেল।

উজির মুখ কাচুমাচু করে বলল —‘জাঁহাপনা, এতাে আর নিছকই কোন কাঠের ঘােড়া নয়। যাদুটাদুর ব্যাপার আছে। আর এ নওজোয়ানটিও আমাদের মাফিক আদমিটাদমি নয়। নির্ঘাৎ কোন না কোন জিন বা আফ্রিদি দৈত্যটৈত্যই হবে। খােদাতাল্লার দোয়ায় যখন সে ভেগে গেছে তখন অন্ততঃ বেঘােরে জান দিতে হচ্ছে না। 

সুলতান বিস্ময়ের ঘাের একটু কাটিয়ে প্রাসাদের অন্দরমহলে গেলেন। লেড়কি সামস অল নাহারকে বুঝালেন—“বেটি, নওজোয়ান কামার অল আকসর আদতে কোন মানব সন্তান নয়। সে হয় জিন বা আফ্রিদি দৈত্য ; নয়ত কোন যাদুকর। নইলে এমন আজব কাণ্ড করতে পারে কখনও ?

সামস অল নাহার আব্বাজীর বাৎ বিশ্বাস করতে পারল না। সে ডুকরে ডুকরে কেঁদে চোখের পানি ঝরাতে লাগল।

সুলতান তাকে বহুভাবে বুঝাতে লাগলেন। 

খােদাতাল্লার ওপর ভরসা রাখ বেটি। তাকে সর্বান্তঃকরণে সুকরিয়া জানাও। তিনি আমাদের ভয়ঙ্কর এক বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। লেড়কাটি জব্বর ধাপ্পাবাজ। চোখের পলকে হয়ত আমাদের বিশাল ও সুদক্ষ সেনাবাহিনীকে বিলকুল খতম করে দিত।

সামস অল আব্বাজীর বাৎ শুনে ঠাণ্ডা তাে হলই না উপরন্তু কান্নার বেগ অনেকাংশে বাড়িয়ে দিল। এক সময় সে চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল —“আব্বাজী, সে যদি আর না ফেরে তবে আমি খানাপিনা ছেড়ে দেব। ফিরে এসে আমাকে বুকে টেনে না নেওয়া পর্যন্ত আমি খানা পিনা না খেয়ে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাব। জিন্দেগী খতম করে ছাড়ব। সুলতান প্রমাদ গুণলেন। বুঝলেন, একে প্রবােধবাক্যে শান্ত করার কোশিস বৃথা। হতাশা আর হাহাকারে জর্জরিত হতে লাগলেন। কেবল ঠোট দুটো নেড়ে অনুচ্চ কণ্ঠে কি সব বলতে বলতে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে এলেন।

এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চারশ’ তেইশতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ কিসসাটির পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, শাহজাদী সামস অল তার মেহেবুব কামার অল আকমর-এর বিরহে গােসল ও খানাপিনা একদম ছেড়ে দিল।

এদিকে কামার অল আকমর শূন্যে উঠে নিজের মুলুকের দিকে ধেয়ে চলল । পথ পাড়ি দিতে দিতে সে ভাবল, তার মেহবুবা তাে তার আব্বার প্রাসাদে রয়ে গেছে। তাকে যেভাবেই হােক উদ্ধার করতেই হবে। সে জেনে নিয়েছে তার মেহেবুবার নাম সামস অল নাহার। তার আব্বার সুলতানিয়তের নাম ইয়ামান। রাজধানী শহরটির নাম সানা।

ঘােড়াটি উল্কার বেগে ধেয়ে কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই শাহজাদা কামার অল-এর প্রাসাদের ছাদের ওপর নামল। তারপর সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নিচে নেমে এল।

কামার অল প্রাসাদে ঢুকেই তাজ্জব বনে গেল। সারা প্রাসাদটি যেন মৃত্যুপুরী বনে গেছে। চারদিকে অখণ্ড নীরবতা বিরাজ করছে। ব্যাপার কিছুই তার মালুম হ’ল না। সামান্যতম সাড়া শব্দও হচ্ছে।

লম্বা লম্বা পায়ে তার আব্বার কামরায় ঢুকে যেন ধড়ে জান ফিরে পেল। তার আব্বা জীবিত। শােক তাপে পাথর বনে গেছে। কামরার অন্য দিকে তার আম্মা ও বহিন শোকে মুহ্যমান। উভয়েরই দু’ চোখে পানির ধারা। চোখে মুখে অবিশ্বাস মাখানাে বিস্ময়ের ছাপ। নির্বাক-নিস্তব্ধ নিস্পলক চোখে লেড়কার দিকে তাকিয়ে ভাবছেন—সত্যিই কি তার বেটা জিন্দা আছে, নাকি—না, আর ভাবতে পারছেন না। মাথা ঝিম ঝিম করছে। তিনি কি জেগে, নাকি নিদের মাঝে খােয়াব দেখছেন?

কামার অল তাদের দিলের হাল আন্দাজ করে বলে উঠল—“আব্বাজী, আম্মা, আমি তােমাদের বেটা কামার ; আমি ফিরে এসেছি। আমি তােমাদের কোলে ফিরে এসেছি। আমার দিকে নজর দিয়ে দেখ, এই যে, আমি কামার। 

বাদশাহ সাবুর যেন বেটার বাৎ শুনে আচমকা সচকিত হয়ে তড়াক করে লাফিয়ে পালঙ্ক থেকে নেমে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে ডুকরে কাদতে লাগলেন। কামার অল-এর আম্মা ও বহিনও নিজেদের সংযত রাখতে না পেরে ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে অধিকতর রব করে কাঁদতে লাগল। তার আম্মা উন্মাদিনীর মাফিক তার গালে, চিবুকে ও কপালে ঘন ঘন চুম্বন করতে লাগলেন।

একমাত্র লেড়কাকে বুকে ফিরে পেয়ে বাদশাহ সাবুর খুশীতে একদম ডগমগ হয়ে উঠলেন।

ঢেরা পিটিয়ে রাজ্যের সর্বত্র প্রচার করে দেয়া হ’ল শাহজাদা ফিরে আসার আনন্দে বাদশাহের প্রাসাদে জোর খানাপিনার বন্দোবস্ত করা হচ্ছে। সর্বশ্রেণীর প্রজাদের নিমন্ত্রণ।

প্রজারা প্রাসাদে এসে কবজী ডুবিয়ে হরেক কিসিমের খানা খেল, সরাব পান করল। সাতদিন ভরে নাচা-গানা দেখে খুশী হয়ে নিজ নিজ মাকানে ফিরল। .... উৎসব-আনন্দের জোয়ার স্তিমিত হলে শাহজাদা কামার অল বাদশাহকে জিজ্ঞাসা করল—“আব্বাজী, সে-পারসিয়ান প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটি কোথায় গেলেন, দেখছি না যে? আপনাকে যে আদমি ঘােড়াটি ইনাম দিয়েছিলেন তার বাৎ বলছি।

পারসিয়ান প্রাজ্ঞটির প্রসঙ্গ উঠতেই বাদশাহ সাবুর একদম চটে ব্যোম হয়ে গেলেন।

কামার অল তার আব্বার ক্ষোভ দেখে যার পর নাই বিস্মিত।

বাদশাহ সাবুর পরম বিতৃষ্ণায় বলতে লাগলেন আর বোলো না হারামজাদা একটি সাক্ষাৎ বদমায়েশ। তাকে উত্তম মধ্যম দিয়ে ঘাড় ধরে প্রাসাদ থেকে বের করে দিয়েছি। কয়েদখানায় পুরে  দিয়েছি। তার ধাপ্পায় না মজলে আমাকে এমন দুঃখ দুর্দশায় ভুগতে হত না।

‘আব্বাজী, আমি তাে তােমার বুকে ফিরেই এসেছি। আর তার দোষই বা কি? তাকে পুরাে দোষ না দিয়ে আমার দোষও তাে] দেখতে হবে। ঘােড়াটিকে চালাবার কায়দা শিখেই আমি আশমানে উড়ে ছিলাম। নেমে আসার কায়দা মােটেই শিখে যাই নি। দোষ তাে বিলকুল আমারই ছিল। আমার অনুরােধ, সে-আদমিটিকে যেন জানে খতম করবেন না।

বাদশাহ লেড়কার ঐকান্তিক আগ্রহে পারসিক-প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটিকে জানে খতম না করে সসম্মানে কারাগার থেকে বের করে এনে মুক্তি দিলেন। আর প্রচুর নগদ অর্থ ও পােশাক পরিচ্ছদ ইনাম দিয়ে সম্মানিত করলেন। তার নিজের মুলুকে ফেরার রাহা খরচও দিয়ে দিলেন। 

বাদশাহ সাবুর তার ছােট লেড়কির সঙ্গে পারসিক-প্রাজ্ঞ ব্যক্তির শাদীর ব্যাপারে কিছুই বলেন না। পারসিক-প্রাজ্ঞটিও আর কিছু বলে নতুনতর বিপদ ঘাড়ে তুলে নিলেন না। বাদশাহ মনস্থ করেই রেখেছিলেন—কিছুতেই তার হাতে লেড়কিকে তুলে দেবেন না। এতে তার কথার খেলাপ যদি হয়ই, হবে। শাহজাদা কামার অল আকমর যতই বলুক, পারসিক-প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটির কোন কসুরই নেই, বিলকুল কসুর তার নিজের। আশমান থেকে নেমে আসার উপায় না জেনেই সে আশমানে উড়ে গিয়েছিল। বাদশাহ নিঃসন্দেহ, তার লেড়কাকে মেরে ফেলার জন্যই শয়তানটি তাকে নেমে আসার বােতমটির হদিস দেন নি। কারণ, শাহজাদা তার সঙ্গে বহিনের শাদী দেয়ার ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতা করেছিল। সে রাগে, বদলা নেবার জন্যই সে এ ধান্দা করে। একমাত্র খােদাতাল্লার দোয়ায় সে আশমান থেকে জমিনে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছে। সে কায়দা করে ঘােড়ার গায়ের বােতামটি বের করে না ফেললে জ্বলন্ত সূর্যের মধ্যে ঢুকে পুড়ে একদম ছাই হয়ে যেত। ইয়া খােদা, এমন সাক্ষাৎ মােউতের হাতে লেড়কিকে তুলে দেবেন বাদশাহ সাবুর! অসম্ভব! বাদশাহ এবার ঘােড়াটির দিকে নজর দিলেন। এর গতি কি করা যায়? কোন মতলবই বের করতে পারলেন না। অনন্যোপায় হয়ে লেড়কাকে তলব করলেন।

কামার অল আকমর এলে বাদশাহ বললেন—“বেটা, এক কাজ করা যাক, অলুক্ষণে ঘােড়াটিকে ভেঙেচুরে একদম খতম করে দেয়া যাক। 

শাহজাদা কামার অল আকমর প্রতিবাদ করল। সে তখন শাহজাদী সামস অল নাহার-এর সঙ্গে তার মহব্বৎ ও এক রাত্রের সহবাসের কাহিনী সংক্ষেপে ব্যক্ত করল। সবশেষে ক্রোধােন্মত্ত ছােট্ট-কালাে ঘােড়াটির দৌলতে কি করে জান নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছে বিলকুল খুলে বলল । সব কিছু শুনে বাদশাহ মুহূর্তকাল গম্ভীর মুখে ভেবে বললেন—সবই তাে মালুম হ’ল বেটা। লেকিন এক বাৎ, ঘােড়াটির সব কায়দা কৌশল এখনও তােমার ভালভাবে রপ্ত হয় নি। তাই এটি একদম নিরাপদ নয়। আর কোনদিন চড়বে না।

এদিকে কামার অল শাহজাদী সামস অল নাহার’কে কিছুতেই মন থেকে ঠেলে ফেলতে পারল না। হবেই তাে। হাজার রাত্রের স্বাদ যে সে এক রাত্রের সহবাসের মাধ্যমেই উপভােগ করে ফেলেছে। তাকে ছেড়ে জিন্দা থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। জিন্দেগী একদম বরবাদ হয়ে যাবে। ঝামেলা ঝকমারি করেও তাকে বুকে ফিরে পেতেই হবে। লেকিন কি করে তা সম্ভব হবে? তার আব্বা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সে যেন কিছুতেই ওই কালাে ঘােড়াটির পিঠে না চাপে। তবে কি করে সে ওই প্রাসাদে তার মেহেবুবার কাছে যাবে। তাকে বুকে পেতে হলে যে করেই হােক তাকে সবার অলক্ষ্যে চুরি করে আনতে হবে। একে তার আব্বা সুলতান প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী। তার ওপর সৈন্যসামন্ত থেকে শুরু করে প্রতিটি নগরবাসী তার ওপর চটে রয়েছে। হাতের নাগালের মধ্যে কোনক্রমে পেলে ধড় থেকে মুণ্ড নামিয়ে ছাড়বে।

বাদশাহ সাবুর এক সন্ধ্যায় প্রাসাদে নাচা-গানার মজলিস বসালেন। নগরের নামজাদা সব গায়িকা ও নাচনেওয়ালি এসেছে মজলিসে। তখন এক বিরহ-সঙ্গীত শুনে কামার অল-এর দিলে যেন আগুন ধরে গেল। বহুৎ কোশিস করল দিলকে ঠাণ্ডা করতে। লেকিন সব কোশিস তার ব্যর্থ হ'ল।

উপায়ান্তর না দেখে কামার অল গােপনে কালাে ঘােড়াটির পিঠে চেপে বসল। ঘােড়াটির ডানদিকের বােতামে টিপ দিতেই এক লহমায় ঘােড়া আসমানের দিকে উড়ে চলল। নামল সানা নগরে বাদশাহের প্রাসাদের ছাদে।

রাত্রি তখন গভীর। কাম কাজ সব মিটে গেলে প্রাসাদের সবাই খানাপিনা সেরে গভীর নিদে তলিয়ে রয়েছে।

কামার অল ছাদ থেকে নেমে সন্তর্পণে নিগ্রো খােজাটির পাশে এল। সে নিদে আচ্ছন্ন। তার শিয়রে শিকেয় ঝুলছে খানার পােটলাটি আর ইয়া পেল্লাই একটি তরবারি। এবার আর খানার দরকার নেই তার। এক ঝটকায় তরবারিটি হাতে নিয়ে নিল।

কামার অল পর্দা সরিয়ে তার মেহেবুবা সামস অল নাহার-এর কামরায় ঢুকল।

দরওয়াজায় দাঁড়িয়ে কামার অল দেখল, কয়েকজন দাসী-বাদী সামস অল নাহারকে তার কলিজার বিরহ-জ্বালা নেভাতে সান্ত্বনা দিচ্ছে

  —এভাবে খানাপিনা ছেড়ে, রাত্রি জেগে জেগে শরীর তাে কাহিল হয়ে পড়বে। তার মেহেবুব একবার তার দেহসুখ যখন লাভ করেছে আজ না হােক কাল ফিরে আসবেই। মহব্বতের জন্যই তাকে জিন্দা থাকতে হবে। এভাবে নানা প্রবােধবাক্যে তারা তাকে বিছানা থেকে তুলে খানাপিনা করাবার কোশিস করে চলেছে। আর ওড়না দিয়ে চোখের পানির ধারা বার বার মুছিয়ে দিচ্ছে।।

কামার অল আকমর দরওয়াজায় দাঁড়িয়ে অভূতপূর্ব সে-দৃশ্যটি উপভােগ করতে লাগল।

এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চারশ’ চব্বিশতম রজনী 

বাদশাহ শারিয়ার এলে বেগম শাহরাজাদ কিস্সাটির পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাহাপনা, দাসীবাদীরা সামস অলনাহারকে বহুভাবে সান্ত্বনা দিয়ে তাকে উঠিয়ে খানাখাওয়ানাের কোশিস করতে লাগল। লেকিন শাহজাদী দাঁতে দাঁত চেপে শুয়ে রইল। কুটোটিও দাঁতে কাটল না।

শাহজাদী সামস অল ফুপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে বলল —“তােরা আমাকে মিথ্যা প্রবােধ দিচ্ছিস। আমার মেহবুব, আমার কলিজা কিছুতেই ফিরবে না।

এদিকে ভাের হতে না হতেই বাদশাহ সাবুর-এর প্রাসাদে তুমুল কাণ্ড শুরু হয়ে গেল। সাবুর খবর পান শাহজাদা কামার অল প্রাসাদে নেই। তার কামরা ফাঁকা। খাঁচা ছেড়ে পাখি ভেগেছে। চারদিকে তল্লাশীর ধুম পড়ে গেল। বাদশাহ সাবুর-এর হঠাৎ কালাে-ঘােড়াটির বাৎ স্মরণে এল। এক ছুটে ছাদে উঠে এলেন। এ-ও বিলকুল ভোঁ ভো। ঘােড়া নেই। বাদশাহের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে শাহজাদা ফিন ঘােড়ায় চেপে উধাও হয়েছে। ক্রোধে জ্বলে উঠলেন তিনি। শিরায় শিরায় আগুন জ্বলে উঠল।

বাদশাহ সাবুর নিঃসন্দেহ, শাহজাদা নির্ঘাৎ সানা নগরে। সুলতানের প্রাসাদে তার মেহেবুবার সাথে মােলাকাৎ করতে গেছে। বিপদাশঙ্কায় তার কলিজায় ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল। সেখানকার সুলতান তার ওপর এমনিতেই চটে রয়েছেন। কোনরকমে ঘােড়ায় চেপে তার খপ্পর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। ফিন তিনি তাকে হাতের নাগালের মধ্যে পেলে একদম খুন না করে ছাড়বেন না। ক্রোধােন্মত্ত বাদশাহ সাবুর প্রতিজ্ঞা করলেন। সর্বনাশের মূল কালাে ঘােড়াটিকে এবার হাতে পেলে বিলকুল গুড়াে করে ছাড়বেন। নইলে লেড়কাকে জিন্দা রাখা যাবে না। তার গায়ের ঝালও মিটবে না।

এদিকে শাহজাদা কামার অল দরওয়াজায় দাঁড়িয়ে দাসীবাদীদের প্রবােধবাক্যগুলাে শুনতে লাগল।

তাদের মিথ্যা প্রবােধের প্রতিবাদ করতে গিয়ে শাহজাদী কান্নার ফাকে বলতে লাগল ঝুটমুট আমাকে জ্বালাতন করিস নে তােরা। ভাগ এখান থেকে। আমাকে একটু একেলা থাকতে দে। তােরা যা-ই বলে আমাকে প্রবােধ দিস না কেন। আমার আব্বা একবার তাকে কব্জা করতে পারলে একদম জিন্দা কবর দিয়ে ছাড়বে।

ইতিমধ্যে কামার অল অতি সন্তর্পণে সবার অলক্ষ্যে পা টিপে টিপে তার মেহেবুবার বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। সে পিছন থেকে তার মেহেবুবার কানের কাছে মুখ নিয়ে অনুচ্চ কণ্ঠে বলে উঠল-মেহেবুবা, আমি তাে তােমার পাশেই রয়েছি। এদিকে তাকিয়ে দেখ—তােমার আব্বার ডরে আমি ফিন আসব না ভেবেছিলে?

মেহেবুবা আমার, আমার কলিজা আসলি মহব্বৎ কোন কিছুর, এমন কি ইন্তেকালেরও পরােয়া করে না। মােউতের ডরে কি কেউ কুকড়ে গিয়ে লড়াই না করে হাত-পা গুটিয়ে কামরার কোণে বসে থাকে, তুমিই বল। দুনিয়ায় পয়দা হলে ইন্তেকাল তাে একদিন হবেই। আমার কাছে এটাও তাে লড়াই-ই। মহব্বতের লড়াই,

( চলবে )

Post a Comment

0 Comments