কামার অল ব্যস্ত পায়ে দরবারে তার আব্বাজীর সঙ্গে ভেট করল। তাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করল—আব্বাজী, কি ব্যাপার বলুন তাে? আপনি নাকি যাদুকরের মায়া জালের ফাঁদে আটকা পড়ে গেছেন? সে বুড়া আদমিটির সাথে নাকি বহিনের শাদী দেয়ার মতলব করেছেন, সাচ্চা কি? আপনি জেনে শুনে তার জিন্দেগী বরবাদ করে দিতে উঠে পড়ে লেগে গেছেন? এরকম কাণ্ড তাে হতে দেয়া যায় না।
পারসিক-প্রাজ্ঞটি পাশে দাড়িয়ে সবকিছু শুনে রেগে একদম কাই হয়ে গেলেন।
বাদশাহ সাবুর মুখ খুললেন—কামার অল আকমর, তুমি যদি অলৌকিক দৈবশক্তি সম্পন্ন ঘােড়াটির কেরামতি তুমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে তবে বুঝতে পারতে সে কী অত্যাশ্চর্য ক্ষমতার অধিকারী। আর কী অমূল্য দ্রব্য তিনি আমাকে ইনাম দিয়েছেন। বিনিময়ে তিনি আমার একটি লেড়কিকে শাদী করতে চেয়েছেন।
‘লেড়কিকে শাদী করতে চেয়েছেন ?
—“হ্যা বেটা, তিনি তাে খুব সামান্যই আশা করেছেন।
এমন সময় ভাের হয়ে আসছে দেখে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
চারশ’ পনেরতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাহাপনা, লেড়কার দিলে আস্থা আনার জন্য বাদশাহ সাবুর তাকে নিয়ে প্রাসাদের সম্মুখস্থ প্রাঙ্গণে এলেন। এক ক্রীতদাস বাদশাহের হুকুমে আবলুশ কাঠের কালাে ঘােড়াটিকে নিয়ে এল। সেটিকে এক নজর দেখেই শাহজাদা বিস্ময় বিমূঢ় চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। শাহজাদা কামার অল এক দুঃসাহসী ও কৃতী ঘােড়সওয়ার। সে এক লাফে অলৌকিক যাদুশক্তি সম্পন্ন কাঠের ঘােড়াটির পিঠে চেপে বসল। লেকিন তাজ্জব ব্যাপার, ঘােড়াটি শূন্যে ওঠা তাে দূরের কথা সে বস্তু সামান্য নড়ল চড়লও না। পুতুলের মাফিক ঠায় দাঁড়িয়ে রইল।
বাদশাহ কুঁচকে প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটির দিকে তাকিয়ে বললেন—কি ব্যাপার বলুন তাে, ঘােড়া যে ঠায় দাঁড়িয়ে! আমার লেড়কার দিলের দ্বিধা দূর করুন। নইলে যে আমি মিথ্যার দায়ে জড়িয়ে পড়ব। যা হােক, বন্দোবস্ত তাে কিছু করুন।
পারসিক-প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটি এগিয়ে এসে বললেন শাহজাদা, ঘােড়ার গায়ে এই যে বােতামটি দেখছেন, এর গায়ে সামান্য চাপ দিলেই ঘােড়াটি আশমানে উঠে যাবে। দেখবেন, উল্কার বেগে ধেয়ে চলবে।
শাহজাদা কামার অল বােতামের গায়ে চাপ দিতে ঘােড়াটি শো শো শব্দে আশমানের দিকে উঠতে লাগল। এক সময় এত ওপরে উঠে গেল যে, তাকে ছােট্ট একটি বিন্দু ছাড়া অন্য কিছু মালুম হ'ল না। এক এক করে কয়েক ঘণ্টা কেটে গেল। লেকিন ঘােড়া আর নামে না। শূন্যে হরদম চক্কর খেতে থাকে। বাদশাহ চিল্লিয়ে উঠলেন—“আমার বেটা নামছে না কেন? আপনি তাকে নামিয়ে আনার ফিকির করুন। চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ এঁকে তিনি বলে উঠলেন।
পারসিক-প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটি বললেন—“জাহাপনা মূর্তিটির গায়ে বা-দিকে একটি সােনার বােতাম লাগানাে রয়েছে। সেটিতে টিপ দিলে নিচে নামা যায়। লেকিন আপনার বেটা তাে আমার সব বাৎ
না শুনেই বােতাম টিপে ঘােড়াকে ওপরে নিয়ে চলে গেল। আমার কসুর কোথায়, আপনিই বলুন জাঁহাপনা?’
ক্রোধােন্মত্ত বাদশাহ সাবুর এবার এক নিগ্রো ক্রীতদাসকে ডেকে পারসিক-প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটিকে কয়েদখানায় পুরে দিলেন।
এবার বাদশাহ উন্মাদের মাফিক ছুটতে ছুটতে নিজের কামরায় ঢুকে দরওয়াজা বন্ধ করে দিলেন। কোর্তা-পাৎলুন ছিড়তে লাগলেন। দাড়ি-গোঁফ ছেড়া শুরু করলেন। মেঝেতে শুয়ে রীতিমত দাবড়াদাবড়ি করতে লেগে গেলেন। এদিকে শাহজাদার ব্যাপারটির খবর বেগম সাহেবার কাছেও পৌছে গেল। তিনিও উন্মাদদশা প্রাপ্ত হলেন। বাদশাহের দরবারের আমির-ওমরাহ, উজির-নাজির নফর বাঁদী, দাস-দাসী সবাই কেঁদে আকুল হতে লাগল। প্রজারাও জটলা করে কান্নাকাটি জুড়ে দিল। তামাম রাজ্য শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ল।
অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন আজব ঘােড়াটি শূন্যে চক্কর মারতে মারতে আশমানের দিকে উঠতে উঠতে একদম সূর্যের কাছাকাছি চলে গেল। ঘােড়াটির কারবার দেখে কামার অল বুঝতে পারে অল্প সময়ের মধ্যেই জ্বলন্ত সূর্যের অগ্নিদাহে ঘােড়াটিসহ সে ভস্মীভূত হয়ে যাবে। মৃত্যু সুনিশ্চিত। কিছুতেই জান বাঁচানাে যাবে না। সে ভাবল, পারসিক-প্রাজ্ঞ তার ওপর বদলা নিতে পেরেছে বটে। তার আশা-আকাঙক্ষায় আমি প্রতিবন্ধকতা করেছিলাম। বিনিময়ে যােগ্য বদলাই সে নিল। বিলকুল ভুল তাে আমিই করেছি। তার যাদুঘােড়ায় চাপা আমার ঠিক হয়নি। এখন সে কথা ভাবতে বসা নিরর্থক। আমার এ-চরমতম সঙ্কট থেকে একমাত্র খােদাতাল্লা ছাড়া কেউ-ই উদ্ধার করতে পারবে না।
শাহজাদা কামার অল-এর দিলে আচমকা একটি বাৎ বার বার খোঁচা মারতে লাগল—‘বােতাম টিপে আমি যেমন ঘােড়া নিয়ে শূন্যে উঠেছি, পারসিক-প্রজ্ঞাটিও তাে একই উপায়ে উঠে এসেছিলেন। লেকিন তিনি ফিন নেমে জমিনে ফিরে গেলেন কি করে। এরকম ভাবতে ভাবতে শাহজাদা ঘােড়াটির গায়ে হাত বােলাতে লাগল। আচমকা বাঁ-দিকে এক জায়গায় উঁচু মাফিক কি যেন হাতে ঠেকল। আঙুল দিয়ে সেটির গায়ে চেপে ধরল। ব্যস, কাজ হাসিল। ঘােড়াটি এবার জমিনের দিকে নামতে লাগল। উল্কার বেগে নেমে এক সময় জমিনে এসে দাঁড়াল।
কামার অল এবার খােদাতাল্লা’কে সুকরিয়া জানাল। সে ঘােড়াটির ওঠা-নামার কায়দা কৌশল রপ্ত করে নিয়েছে। তল্লাশী চালিয়ে সে ঘােড়াটির ডান বা বাঁ দিকে ঘােরার কৌশলও আয়ত্ব করতে পারল। এবার কামার অল অলৌকিক শক্তি সম্পন্ন যাদু ঘােড়াটিকে নিয়ে এমুলুক সে-মুলুক ঢুঁড়ে বেড়াতে লাগল। কত সব নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত, বন-জঙ্গল ও মরু প্রান্তর পেরিয়ে তামাম দুনিয়া ঢুঁড়তে লাগল।
এমন সময় বেগম শাহরাজাদ প্রাসাদের জানলা দিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বুঝলেন, ভাের হয়ে এল বলে। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।
চারশ’ আঠারতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ কিসসা শুরু করলেন—জাহাপনা, শাহজাদা কামার অল অলৌকিক শক্তির আধার ঘােড়াটির পিঠে চেপে তামাম দুনিয়া ঢুঁড়ে বেড়াতে লাগল। শাহজাদা এক সময় পায়ের তলায় খুবসুরৎ এক নগর দেখে সেখানে থেকে ঘুরে ফিরে দেখার লােভ হ'ল। ঘােড়ার বােতাম টিপে নামল।
গােধূলি বিদায়ী সূর্য পশ্চিম-আশমানে শেষ রক্তিম আভাটুকু নিঃশেষে বিলিয়ে দিয়ে বিদায় নেবার জন্য উন্মুখ। সাজানাে গােছানাে নগর। বিলকুল ছবির মাফিক। কামার অল আকমর ঘুরে নগরটি দেখতে লাগল। দিল ভরে গেল খুশীতে। ভাবল, নিজের মুলুকে গিয়ে চমৎকার এ-নগরটির সৌন্দর্যের বর্ণনা আব্বা, আম্মা ও বহিনের কাছে ফলাও করে বলবে।
কামার অল ফিন ঘােড়ার পিঠে উঠল। পর মুহুর্তেই একটি বিশালায়তন মঞ্জিল দেখে থমকে গেল। নিচের দিক এক দৃষ্টে তাকিয়ে দেখল, মঞ্জিলটি নগরের ঠিক কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। তার ছাদে চল্লিশ জন নিগ্রো পাহারা দিচ্ছে। সবাই সশস্ত্র। তীর-ধনুক, বর্শা বল্লম আর তরবারি হাতে।
কামার অল ছাদের এক প্রান্তে ঘােড়া নামিয়ে চুপটি করে বসে রইল। উদ্দেশ্য, পরিস্থিতিটি সম্বন্ধে সামান্য আঁচ নিয়ে নেবে।
রাত্রি ক্রমে গভীর হ’ল। চারদিক নিঝুম-নিস্তব্ধ হয়ে এল। সবাই নিশ্চিন্তে নিদে বিভাের হয়ে পড়ল। এবার ঘােড়ার পিঠ থেকে নামল। ছাদে দু-চার কদম হাঁটাহাঁটি করল। খিদে পেয়েছে খুবই। নিদেনপক্ষে সামান্য পানি হলেও পেটের জ্বালা কিছুটা কমানো যেত।
শেষ পর্যন্ত সে নিরুপায় হয়ে সিঁড়ি বেয়ে এক পা দু পা করে নিচে নামতে লাগল। সে বিলকুল তাজ্জব বনে গেল। এতবড় একটি মঞ্জিল। লেকিন কোন আদমি টাদমির দেখা নেই। বহুৎ তালাশ করল। কারােরই দেখা মিল না।।
কামার অল ফিন সিড়ির দিকে পা বাড়াল। তাকে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তেই হ’ল। মৃদু এক আলােকরশ্মি তার চোখে পড়ল। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে তাকাল। তার মালুম হ’ল মঞ্জিলটির একদম শেষের দিক থেকে আলােটি আসছে। আলােকরশ্মির নিশানা ধরে সে গুটি গুটি এগােতে লাগল। এক সময় অন্দরমহলে, হারেমের দিকে এগােতে থাকে।
হারেমের দরওয়াজা একটি চৌপায়ায় এক নিগ্রো খােজা বেহুস হয়ে শুয়ে নিদ যাচ্ছে। তার শিয়রে একটি বাতি জ্বলছে। নিগ্রো খােজাটি একদম দরওয়াজা আগলে শুয়ে। তাকে ডিঙিয়ে হারেমে ঢাকা বিলকুল অসম্ভব ব্যাপার। পাশে একটি পেল্লাই তরবারি। মাথার কাছে দেয়ালে একখানা পােটলা ঝুলছে।
আফ্রিদি দৈত্যের মাফিক লম্বা-চওড়া নিগ্রোটির লাশ। তাকে এক নজর দেখেই ডরে কামার অল আকমর-এর কলিজা শুকিয়ে যাবার জোগাড় হ’ল। তার মুখ দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে এল—“ইয়া খােদা, এ আমাকে কোথায় এনে ফেললে? তুমি মেহেরবানি করে এক দফে আমাকে মােউতের হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছিলে। লেকিন এবার দোজখের এ দূতের হাতেই জান খতম হবে।
আমার পেটে আগুন জ্বলছে। যা কিছু দিয়ে আগে সে আগুন চাপা দেয়া দরকার। দেয়ালে সিকেয় বাঁধা খানা তাে কাজে লাগাব। তারপর জান থাকে থাকবে আর যায় যাবে।
সে খুবই সাবধানে এগিয়ে খানার পােটলাটি শিকে থেকে নামিয়ে নিয়ে সটকে পড়ে। হরেক কিসিমে আচ্ছা আচ্ছা খানা পােটলায় বাঁধা। আর দেরী নয় একদম গােগ্রাসে খানাগুলি গিলতে লাগল। অদূরে একটি ফোয়ারা দেখে এগিয়ে যায়। ফোয়ারা থেকে গণ্ডুষ ভরে পানি নিয়ে সে পান করল।
কামার অল ফিন নিগ্রো খােজাটির কাছে ফিরে এল। তার পাশ থেকে তরবারিটি তুলে নিল। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল। না, কাউকেই নজরে পড়ল না। ফিন নিঃশব্দে সরে এল।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
চারশ’ উনিশতম রজনী
বেগম শাহরাজাদ কিসসা বলে চললেন-“জাহাপনা, কামার অল হাঁটতে হাঁটতে এক সময় অন্য একটি দরওয়াজার সামনে এসে খাড়া হয়ে পড়ল। তাতে একটি পর্দা। পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। শয্যাকক্ষ সুবিশাল। দৃষ্টিনন্দন একটি হাতির দাঁতের পালঙ্ক।
ঘরের মেঝেতে চারটি যুবতী শুয়ে নিদ যাচ্ছে। সবাই খুবসুরৎ লেড়কি। সুরৎ যেন উপচে পড়ছে। কামার অল আকমর-এর চোখ ধাধিয়ে গেল। ভাবল বেহেস্তের হুরীরাও হয়ত এমন নয়নাভিরাম নয়। এক ঝলক দেখেই তার সর্বাঙ্গে বিদ্যুতের শিহরণ খেলে গেল। সে এগিয়ে গিয়ে নসীব সম্বল করে একটি লেড়কির ঠোটে ছােট্ট করে একটি চুম্বন করল।
লেড়কিটির নিদ টুটে গেল। চপল চাপল হরিণীর মাফিক চোখ দুটি মেলে সবিস্ময়ে চাইল।
কণ্ঠস্বরে বিস্ময় ফুটিয়ে তুলে লেড়কিটি বলল কে? কে তুমি? কেন এখানে এসেছ? কি করেই বা এসেছ?
‘ইয়া খােদা! এক সঙ্গে এতগুলাের প্রশ্নের জবাব কি করে দেব?
–‘এখানে কে তােমাকে নিয়ে এসেছে?
-নসীব। আমার নসীবই আমাকে এখানে টেনে এনেছে। ‘আমার নাম সামস অল নাহার। তুমি কি হিন্দুস্থানের কোন বাদশাহের লেড়কা—শাহজাদা?
কামার অল কি বলবে ভাবছে। সে কিছু বলার আগেই লেড়কিটি ফিন প্রশ্ন করল—“সে গতকাল আমার আব্বার কাছে আমাকে শাদী করার প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল। লেকিন আমার আব্বা রাজী হননি।
-“রাজী হন নি? কেন রাজী হন নি, বলবে কি?
-“তার সুরৎ নাকি খুবই খারাপ। লেকিন তােমাকে তাে খুবসুরৎ-ই দেখা যাচ্ছে। আমি তাে তােমাকে এক ঝলক দেখেই বিলকুল মুগ্ধ হয়েছি।
কামার অল নিজের সুরতের প্রশংসা শুনে আহ্বাদে একদম গদগদ হয়ে যায় ।
খুবসুরৎ লেড়কিটি তাকে এক ঝটকায় বুকে টেনে নিল। ব্যস, উভয়ে লতার মত জড়াজড়ি করে দীর্ঘ সময় পড়ে রইল।
রাত্রি ক্রমে বাড়তে লাগল। তাদের দেহে কামনার দাবদাহ শুরু হয়ে যায়। কলিজা বার বার নেচে নেচে ওঠে। শ্বাসক্রিয়া দ্রুত থেকে দ্রুততর হতে থাকে। শিরা উপশিরায় খুনের মাতন লাগে। একে অপরকে আদরে সােহাগে অভিভূত করে দিতে লাগল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই মেঝেতে শুয়ে পড়ে থাকা বাঁদীদের একজনের আচমকা নিদ টুটে গেল।
বাঁদীটি অজ্ঞাত পরিচয় এক নওজোয়ানকে দেখে আঁৎকে উঠে বলে—“শাহজাদী, আপনার পালঙ্কে ও কে শুয়ে ?
‘আমি চিনি না। নিদ টুটলে দেখি পালঙ্কের পাশে দাঁড়িয়ে। আমার মালুম হয়েছিল, কাল আব্বাজী এক নওজোয়ানকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। হয়ত সে-ই হাজির হয়েছে। লেকিন এর সঙ্গে বাৎচিৎ করে মালুম হ’ল আমারই ভুল। সে নয়।
‘সে-তাে নয়-ই। সে তাে বিলকুল কুৎসিৎ দেখতে। আমি নিজের চোখে তার সুরৎ দেখেছি। দেখলেই উল্টি আসে। আর এ তাে চাদের টুকরাে। নির্ঘাৎ কোন সুলতান বাদশার লেড়কা। কাল যে এসেছিল সে-তাে নফর নােকর হওয়ার যােগ্যতাও তার নেই।
বাঁদীটি এক লাফে খোঁজাটির কাছে গিয়ে ধাক্কাধাক্কি করে তার নিদ টুটিয়ে দিল। বাজখাই গলায় চিল্লিয়ে উঠল—বহুৎ আচ্ছা! তুমি হারেমের নজরদার হয়ে নাক ডাকিয়ে নিদ যাচ্ছে। আর এ সুযােগে এক শাহজাদা তােমাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শাহজাদীর কামরায় ঢুকে কম্ম ফতে করে দিল। জান কিছু?'
-কী এতবড় সাহস! শাহজাদীর কামরায় নওজোয়ান ? পরপুরুষ!’ হাত বাড়িয়ে তরবারি ধরতে যায়। পেল না। ডরে আঁৎকে ওঠে। এক দৌড়ে শাহজাদীর কামরায় দরওয়াজার পাশে গিয়ে দেখে তারা মহব্বতের বাৎচিৎ করছে। বিলকুল জড়াজড়ি করে শুয়ে।
এরই মধ্যে তাদের মহব্বৎ গড়ে উঠেছে দেখে নিগ্রো খােজাটির তাে আক্কেল গুড়ুম হয়ে যাওয়ার জোগাড়। কিছুক্ষণ মুখ দিয়ে রা সরল না। তারপর আতঙ্কিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল
—“হুজুর, আপনি কি আদমি, না কি জীন বা’ আফ্রিদি দৈত্যটৈত্য?’
তার বাৎ শুনে কামার অল তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল—এত বড় স্পর্ধা তাের ! আমার আব্বা বাদশাহ সাবুর। আর আমাকে বলছিস কিনা জিন নাকি আফ্রিদি দৈত্য! তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বলল—“আমি তাের মালিক সুলতানের জামাতা।” বলেই হাতের তরবারিটি বার দুই ঘােরাল। তাের এ-মালকিনের সঙ্গে আজ রাত্রে আমার শাদী হয়েছে। তাই তাকে নিয়ে বাসরশয্যায়—
নিগ্রো খােজাটি এবার থমকে গিয়ে বার কয়েক ঢােক গিলল । তারপর নিজেকে একটু সামলে সুমলে বল্ল -হুজুর, আপনি যদি সামুচ শাহজাদা হয়েই থাকেন তবে বলব জরুর শাহজাদীর উপযুক্ত বরই হয়েছেন। মানিয়েছেও বহুৎ। বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা!
নিগ্রো খােজাটি এবার সুলতানের কামরায় গিয়ে উন্মাদের মাফিক কপাল চাপড়ে চিল্লিয়ে বলতে লাগল—“জাহাপনা, সর্বনাশ হয়ে গেছে, কেলেঙ্কারী হয়ে গেছে। সুলতান একদম তাজ্জব বনে যান। আতঙ্কিত হয়ে বলতে থাকেন—কী সর্বনাশ হয়েছে! কেলেঙ্কারী—খােলসা করে বল! ঝটপট বল কি হয়েছে? আমার কলিজা অস্থির হয়ে উঠেছে। কি হয়েছে সংক্ষেপে বল!
-জাহাপনা, এক নওজোয়ান—একদম সর্বনাশ হয়ে গেছে! এমন সময় প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় পাখিদের কিচির মিচির শুরু

0 Comments