আলিফ লায়লা পর্ব ১৩৮ (Alif laila part 138)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।

এমন সময় প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় পাখিদের কিচির মিচির শুরু হয়ে গেছে। বেগম শাহরাজাদ বুঝলেন, ভাের হয়ে এল বলে। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।

চার শ' কুড়িতম রজনী 


বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন-  জাহাপনা, নিগ্রো খােজাটি গলা ছেড়ে চিল্লিয়ে ওঠে, জাহাপনা, আর এক মুহূর্তও দেরী করবেন না। আপনার লেড়কির কামরায় ঝটপট চলুন। এক আফ্রিদি জিন শাহজাদার সুরৎ ধারণ করে শাহজাদীর সঙ্গে শুয়ে—আমি আর বলতে পারছি না। জলদি চলুন, নিজের চোখেই দেখবেন।

সুলতান রেগে একদম অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন—“তাের এত বড় বুকের পাটা! আমার লেড়কির কামরায় নজর রাখতে গাফিলতি করিস! পাহারা না দিয়ে নিদে বিভাের হয়ে থাকিস। তাের গর্দান নিয়ে ছাড়ব শয়তান বেতমিস কহিকার!

সুলতান তড়পাতে তড়পাতে গিয়ে শাহজাদীর কামরার দরওয়াজার সামনে গিয়ে থমকে খাড়া হয়ে পড়লেন। বাদীদের একজন গলা নামিয়ে ভয়ে ডরে কাঁপতে কাঁপতে বলল —“জাহাপনা, আমরা নিদে বিভাের হয়েছিলাম। আচমকা নিদ টুটে গেল। চোখ মেলে দেখি শাহজাদীর পালঙ্কে এক খুবসুরৎ নওজোয়ান শাহজাদীর সঙ্গে জড়াজড়ি করে শুয়ে। জব্বর এক শাহজাদা!

সুলতানের চোখে বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠল। বাঁদীটি বলে চলল —“জাহাপনা, তবে ধন্দ কিছু হয়-ই। সাচ্চা শাহজাদা, নাকি জিন বা আফ্রিদি দৈত্য! এ-ও একদম সাচ্চা তার সুরৎ দেখলে দিল ঠাণ্ডা হয়ে যায়।

বাঁদীটির বাৎ শুনে সুলতানের ক্রোধ কিছুটা ঠাণ্ডা হ’ল। তিনি পর্দা সরিয়ে ভেতরে উঁকি দিলেন। দেখলেন, এক অকল্পনীয় খুবসুরৎ লেড়কা তার বেটির পাশে, জড়াজড়ি করে শুয়ে। নিদে বিভাের।

সুলতান চোখে-মুখ বিস্ময়ের ছাপ এঁকে অপলক চোখে তাকিয়ে দেখলেন, শাহজাদী ঘুমের ঘােরেই নওজোয়ানটিকে আদর সােহাগ করছে। গালের সঙ্গে গাল লাগিয়ে তৃপ্তি পেতে চায়। ব্যাপার দেখে সুলতানের মাথায় ক্রোধে খুন চড়ে যাওয়ার জোগাড় হ’ল। হাতের তরবারিটি শক্ত করে বাগিয়ে ধরে এক লাফে কামরার মধ্যে ঢুকে গেলেন।

সুলতানের পদচারণায় উভয়েরই নিদ টুটে গেল। কামার অল আকমর সবিস্ময়ে শাহজাদীকে জিজ্ঞাসা করল—কে? তােমার আব্বা?”

শাহজাদী সামস অল বলল –হ্যা, আমার আব্বাজী। সামস অল-এর বাৎ কানে যেতেই কামার অল আকসার তরবারিটি মুঠো করে তড়াক করে লাফিয়ে পালঙ্কের ওপর বসে পড়ল।

নওজোয়ানটি আত্মরক্ষার প্রয়াসের মাধ্যমেই সুলতান সমঝে গেলেন তার পৌরুষ আছে বটে। হাতের তরবারিটি নামিয়ে নিয়ে ক্ষীণকণ্ঠে বললেন—“বেটা, তুমি আদমি, নাকি জিন বা আফ্রিদি দৈত্যটৈত্য কিছু ঠিক ঠাহর করতে পারছি না। কি তুমি ?

‘ইয়া খােদা! জাঁহাপনা, আপনি শাহজাদীর আব্বা না হলে আমি তরবারির এক কোপে আপনার ধড় থেকে শিরটি নামিয়ে ফেলতাম। আমি পারস্য সম্রাটের লেড়কা। আর আপনি কিনা

আমাকে জিন বা আফ্রিদি দৈত্য ঠাওরেছেন! আপনার হাত ধরে মসনদ থেকে টেনে আমি নামিয়ে দিতে পারি। মালুম আছে?

আপনার মঞ্জিল, আপনার ইজ্জত মুহুর্তে ধূলিসাৎ করে দেয়ার হিম্মত আমি রাখি।

শাহজাদার বাৎ শুনে সুলতান নিঃসন্দেহ হলেন, এনওজোয়ান নির্ঘাৎ জিন বা আফ্রিদি দৈত্যটৈত্য কেউ নয়, সাচ্চা শাহজাদাই বটে। সুলতান এবার বুকে সাহস সঞ্চার করে বললেন—মানছি, তুমি শাহজাদাই বটে। লেকিন তােমার সাহস দেখে আমি তাজ্জব বনছি। এক শাহজাদা হয়ে তুমি কি করে এক শাহজাদীর ইজ্জৎ হানি করছ। তােমার কি মালুম আছে, আমার এ-লেড়কির জন্য আমি কত সুলতান, বাদশাহ আর শাহজাদার জান নিয়েছি। তারা আমার লেড়কিকে ছিনিয়ে নিতে এসেছিল। আর তুই কি না তস্করের মাফিক তার কামরায় ঢুকে—দুঃসাহস তাের। গােপনে তাকে শাদি করেছিস। তার ইজ্জৎ হানি করেছিস। আমি যদি এখন তাের- 

-আমার গর্দান গেলে আপনার গর্দানেও মাথা থাকবে না। জাহাপনা বুকে হাত দিয়ে বলুন তাে, আমার চেয়ে খুবসুরৎ শাহজাদা কোন মুলুকে পাবেন, যার হাতে আপনার আদরের দুলালীকে তুলে দেবেন?

–এ বাৎ বিলকুল সাচ্চা বটে। আমার বেটির পাত্র হিসাবে তুমি খুবই যােগ্য। লেকিন তােমরা নিজেরা নিজেরা গােপনে যে শাদী চুকিয়ে নিয়েছ আমি তা দিল থেকে মেনে নিতে পারছি না। কাজীকে তলব করে নিয়ম মাফিক শাদীর বন্দোবস্ত করতে হবে। নইলে আমি সিপাহী তলব করব।”

–আপনার পরামর্শ আমি মেনে নিচ্ছি। এখন দিমাক গরম করে সিপাহী টিপাহী ডেকে জবরদস্তি কোন কাজ করে ফেললে। আখেরে কিন্তু আপনাকেই পস্তাতে হবে। আপনার মসনদের মান ইজ্জৎ আছে। এযে বিলকুল ধূলায় গড়াগড়ি যাবে। বিষধর সাপের মাথায় তাবিজ রাখলে যেমন কাজ হয় ঠিক তেমনি কামার অল এর আকমর-এর যুক্তিতে কাজ হ’ল। মালুম হ’ল, সুলতান কিছুটা ঠাণ্ডা হয়েছেন।

কামার অল বলে চলল —‘জাহাপনা, দিমাক গরম করে ক্রোধের বশবর্তী হয়ে কিছু না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম কিসসা বন্ধ করলেন।

চার শ’ একুশতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ কিসসাটি বলে চললেন—‘জাহাপনা, কামার অল আকসর-এর বাৎ শুনে সুলতান হঠাৎ কেমন থমকে গেলেন।

কামার অল থামল না সে তার বক্তব্য অব্যাহত রাখল—জাহাপনা, আমি দেখছি, দুটো পথ আপনার সামনে এখন খােলা।

—দুটো পথ? কোন্ পথের ইঙ্গিত তুমি করতে চাইছ?”

—“পহেলা পথ হচ্ছে, আমার সঙ্গে অসি-যুদ্ধে নামা। আর দুসরা পথ—আমি যেমন আপনার লেড়কির সঙ্গে সহবাস করছি তাতে গররাজী না হয়ে চেপে যাওয়া। আমি সকাল পর্যন্ত একামরাতেই আপনার বেটির সঙ্গে কাটাই, আপত্তি করবেন না। চমকে উঠে সুলতান বলে উঠলেন—“অ্যাঃ! ক্যা বাৎ!

-হ্যা, ভাের হলে আপনার অধীনে যত সৈন্য আছে তাদের আমার সঙ্গে যুদ্ধে ভিড়িয়ে দেবেন। আপনার সৈন্য সংখ্যা কত?

-চল্লিশ হাজার তাে বটেই। অবশ্য আমার নফর-নােকর ক্রীতদাস প্রভৃতিকে বাদ দেয়া হয়েছে।

-বহুৎ আচ্ছা, ভাের হতেই তাদের আমার বিরুদ্ধে লড়াইইয়ে ভিড়িয়ে দিন। তারা আমাকে লড়াইয়ে হারাতে পারলে তবেই আপনার মান ইজ্জৎ রক্ষা পেতে পারে।

—“আর যদি তুমি লড়াইয়ে হেরে যাও?

–লেকিন জিতে গেলেই বা আপনি কোন্ বন্দোবস্ত করবেন ? আমি কিন্তু আপনাকে তখন বলব, আমার সঙ্গে আপনার লেড়কির শাদী দিতে। আপনার কোন ধানাইপানাই শুনতে রাজী থাকব না।

কামার অল-এর বাৎ শুনে সুলতান ফন্দি আঁটতে থাকেন, নওজোয়ানটির যুক্তি মানাই বুদ্ধিমানের কাজ। অসি-যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলে বে-আক্কেলের কাজই হবে। আমার তাগদ এখন পশ্চিম আশমানের গায়ে বিলকুল ঝুঁকে পড়েছে। এরকম এক নওজোয়ানের সঙ্গে লড়াই করতে যাওয়ার অর্থই হচ্ছে নিজের নাক নিজের হাতে কাটা। আগ বাড়িয়ে ইজ্জৎ খােয়ান। কামার অল নীরব চাহনি মেলে সুলতানের মুখের ভাব ভঙ্গির প্রতিটি মুহূর্তের পরিবর্তনটুকু লক্ষ্য করতে লাগল। সুলতান ভেবে চললেন-“লেকিন, নওজোয়ানটি কি বিলকুল পাগল হয়ে গেছে। নইলে বলছে কি, সে আমার তামাম সৈন্যের সঙ্গে একলা লড়াই করবে। যাক গে, আমার কি আর করার আছে। যে মউতের জন্য মাথা বাড়িয়ে দিয়েছে তার জান কে বাঁচাতে পারে? ভােরেই এ একদম খতম হয়ে যাবে। এর গর্দান থেকে শির নেমে পথের ধূলায়।

আমার মান-ইজ্জৎ খােয়া যাওয়ার তাে কোন সম্ভাবনাই নেই। তাই পাক্কা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন, ভােরে তার তামাম সৈন্যদলকে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামিয়ে দেবেন। কামার অল বল্ল-জাহাপনা, তবে কোন্ পথ ধরেছেন, বলুন? 

 ‘বহুৎ আচ্ছা, তুমি আমার বেটির সঙ্গে যেমন রাত্রি কাটাচ্ছ তেমনি বাকি রাত্রিটুকু কাটাও। লেকিন ভােরে তােমার মােউৎ অবশ্যম্ভাবী জেনে রাখাে। সুলতান কামরাটির দরওয়াজা থেকে গটমট করে চলে এলেন। নিগ্রো খােজাকে দিয়ে বৃদ্ধ উজিরকে তলব করে পাঠালেন।

বৃদ্ধ উজির হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন।

সুলতান তার কাছে ঘটনাটির আগাগােড়া খুলে বললেন। শাহজাদাকে সমুচিত শিক্ষা দেবার জন্য সৈন্যবাহিনীকে তৈরী করার নির্দেশ দিলেন। ভাের হতে না হতেই তুমুল যুদ্ধ শুরু করতে হবে।

উজির সুলতানকে প্রবােধ দিলেন, নওজোয়ান শাহজাদাকে সেনাবাহিনীর জাদরেল সেনাপতি এক খুঁয়ে উড়িয়ে দেবে।

সুলতানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উজির ব্যস্ত-পায়ে ফৌজী ছাউনিতে হাজির হলেন। সেনাপতিদের কড়া হুকুম দিলেন, যত শীঘ্র সম্ভব গােটা সৈন্যদলকে তৈরী করে নিতে।

এদিকে অস্থির সুলতান বিছানায় শুয়ে ভাবতে লাগলেন, নওজোয়ানটির সুরৎ-ই কেবল আকর্ষণীয় নয় তার দেহও পেশীবহুল-সুঠাম। বীরযােদ্ধাদের দেহ ঠিক যেমনটি হওয়া উচিত, আর বাচনভঙ্গীও দিল কেড়ে নেবার মাফিকই বটে। এমন চাদের টুকরা নওজোয়ানকে জামাতা করে নিতে পারলে দেখনাই হত। তার লেড়কির সঙ্গে মানাতও চমৎকার। একেই বলে বরাত। ধন হাতে পেয়েও হারাতে হচ্ছে। ভাের হলেই সৈন্যদের তরবারির ঘায়ে ওর জান খতম হয়ে যাবে।

সুলতান বার বার এপাশ ওপাশ করতে করতে ভেবে চললেন-নওজোয়ানটি ওই একটি মাত্র দোষের জন্য জান খােয়াচ্ছে। একরােখা, একদম একরােখা। আমার কাছে মাত্র একটিবার মাফ চেয়ে নিলেই বিলকুল ল্যাটা চুকে যেত। লেকিন কি করেই বা সে মাফ চাইবে? সে যে বাদশাহের লেড়কা। ক্ষমা কি করে চাইতে হয় সে কায়দা কানুন তাে তার জানা থাকা সম্ভবও নয়।

ভাের হতে না হতেই এমন এক লেড়কার জান খতম, ইন্তেকাল হয়ে যাবে ভেবে সুলতানের কলিজাটি মােচড় মেরে উঠল। তিনি ফিন নওজোয়ানটির কাছে গিয়ে শেষবারের মত কোশিস করার জন্য চঞ্চল হয়ে পড়েন। ভাবলেন, সে মাথা নােয়ালে নােয়াতেও পারে।

পরমুহূর্তেই তিনি ভাবলেন, এতে তার নিজের মাথাই বিলকুল নুয়ে যাবে। জোর করে নিজেকে সংযত রাখলেন।

পাখির ডাকে ভাের হ’ল। যুদ্ধের দামামা বেজে উঠল। সুলতানের সৈন্যদল তৈরী। সুলতান কামার অল আকমর-এর জন্য একটি তেজী ঘােড়া এনে দেয়ার নির্দেশ দিলেন।

কামার অল আকমর ঘােড়া প্রত্যাখ্যান করে বলল —“আমার জন্য ঘােড়ার বন্দোবস্ত করার দরকার নাই। ঘােড়া আমি সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছি। তাতে চেপেই তাে আমি আপনার প্রাসাদে এসেছি জাঁহাপনা। আমার ঘােড়া ছাদের ওপর রেখে দিয়েছি।'

ছাদের ওপর ঘােড়া রক্ষিত আছে কথাটি শোনামাত্র কামরার সবার চোখ বিলকুল ট্যারা হয়ে যাবার জোগাড়। মুখে কারাে রা সরল না। নিজেদের মধ্যে চোখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগল। নওজোয়ানটি বলে কি! তবে কি ওর দিমাক বিলকুল খারাপ হয়ে গেছে। সুলতান ভাবলেন, তবে কি একটি বিকৃত মস্তিষ্ককে হত্যা করে গুনাহ করতে যাব! তবে যে দোজখেও স্থান হবে না।

সুলতান এবার নওজোয়ানটিকে নিয়ে এলেন প্রাসাদ-সংলগ্ন পােলাে খেলার ময়দানে যেখানে হাজার হাজার সশস্ত্র সৈন্য যুদ্ধের সাজে তৈরী। সুলতান বললেন—তবে কি তুমি একলাই এদের সঙ্গে লড়াই করবে মনস্থ করেছ? তােমার আত্মম্ভরিতা দেখে তাজ্জব বনছি। যাক গে, লড়াই যখন করবেই তখন তৈরী হয়ে নাও। সুলতান এবার সৈন্যাধ্যক্ষকে ডেকে বললেন—এ নওজোয়ান আমার বেটিকে শাদী করতে চায়। সবদিক থেকে যােগ্য পাত্রই বটে। লেকিন কিছুতেই এ আমার কাছে নত হতে রাজী নয়। ফিন বলে কিনা স্বেচ্ছায় না দিলে জবরদস্তি ছিনিয়ে নেবে। এর বিশ্বাস, আমার বিশাল সুদক্ষ সেনাবাহিনীকে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে পারবে। অতএব লড়াই অবশ্যম্ভাবী। খেয়াল রাখবে, তােমাদের লক্ষ্য থাকবে জব্দ করা, বন্দী করা, লেকিন হত্যা কোরাে না যেন।

সুলতান এবার কামার অল আকমর-এর কাছে ফিরে এসে বললেন-বেটা, মনকে দৃঢ় কর। লড়াইয়ে তােমার জিৎ অবশ্যম্ভাবী। একদম ঘাবড়াবে না। তুমি জিতলে সবচেয়ে আনন্দিত হব আমি, ইয়াদ রেখাে।

সুলতানের হুকুমে সৈন্যাধ্যক্ষরা দৌড়ে ছাদে গেল কামার অল এর বক্তব্য অনুযায়ী তার ঘােড়াটিকে দেখতে। লেকিন পুচকে এক কাঠের ঘােড়া দেখে তারা সমস্বরে হেসে উঠল। নেহাৎই পাগল না হলে এরকম এক মতলব ভাঁজে!’ 

সৈন্যাধ্যক্ষদের একজন তাে বলেই ফেলল —‘পাগল, বদ্ধ উন্মাদ! নইলে এমন বাৎ কারাে কাছে বলা তাে দূরের কথা ভাবতে পারে কখনও।

সৈন্যাধ্যক্ষরা ঘােড়াটিকে কাঁধে নিয়ে হাসাহাসি করতে করতে সিড়ি বেয়ে নিচে এসে সুলতানের সামনে হাজির করল।

সুলতান সবিস্ময়ে ঘােড়াটির দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইলেন।

এমন সময় ভাের হয়ে আসছে দেখে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চার শ’ বাইশতম রজনী রাত্রির 

দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ কিস্সাটির পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—জাহাপনা, সৈন্যাধ্যক্ষদের একজন বললেন, আমার.দিল বলছে এনওজোয়ানটি কোন বাদশাহ বা সুলতানের লেড়কা। যে কোন কারণেই হােক দিমাক গড়বড় হয়ে গেছে। তা নইলে কাঠের ঘােড়ায় চড়ে লড়াই করার মতলব ভাজতে পারত? 

আমার সুদক্ষ সৈন্যরা এক ঝটকায় একে কুপােকাৎ করে ফেলবে। উক্তিটি ছুঁড়ে দিয়েই সে সরবে হেসে উঠল।

–“দেখ, এত বড়াই করা ভাল না। শত্রুকে দুর্বল ভাবা উচিত নয়।

 এবার কাঠের খেলনা-ঘােড়াটির দিকে অঙ্গুলি-নির্দেশ করে বললেন—এ কী আজব বাৎ! তুমি এর পিঠে চড়ে আমার বিশাল সেনাবাহিনীর সাথে লড়াই করতে চাইছ?’

–হ্যা, জাহাপনা, আজব ঘােড়াই বটে। এর হিম্মৎ দেখলে আপনি তাজ্জব বনে যাবেন, মূচ্ছাও যেতে পারেন। বহুৎ আচ্ছা, কিছু নমুনা দেখাচ্ছি। কামার অল ঘােড়াটির কান পাকড়ে কাছে নিয়ে এল। এক ঝটকায় তার পিঠে চেপে বসল।

স্বয়ং সুলতান, কয়েক হাজার সশস্ত্র সৈন্য, প্রাসাদের নফর - নােকর, দাসী-বাঁদী প্রভৃতি হাঁ করে নওজোয়ানটির কারবার দেখতে লাগল। সবার মধ্যেই একই কৌতূহল কাঠের ঘােড়া কি করে প্রাণবন্ত হয়ে লড়াই করে দেখবে। সৈন্যরা যে যার হাতের তরবারি, বর্শা, বল্লম, তীর-ধনুক দৃঢ়ভাবে পাকড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। নেহাৎ যদি সে ঘােড়া নিয়ে তাদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে তবে যাতে মুহূর্তে তাকে হত্যা না করে অন্ততঃ আত্মরক্ষা তাে করতে পারবে।' 

লেকিন কেউ কেউ বিরুদ্ধ মন্তব্যও করল—ব্যাপারটি এমন পানির মাফিক সহজ-সরল না-ও হতে পারে। যাকে আমরা উন্মাদ ঠাহরাচ্ছি, তার কায়দা কৌশল দেখে তেমন কিছু মালুম হচ্ছে না। কিছু একটি ভরসা না থাকলে আমাদের বিশাল সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ি করতে যাবেই বা কেন? এত সহজে তাকে ঘায়েল করে আমরা জিততে পারব বলে বিশ্বাস হয় না। তবু মান-ইজ্জৎ রক্ষা করতে দাঁতে দাঁত চেপে লড়তে হবেই।

( চলবে )

Post a Comment

0 Comments