রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগমের কোলে শির রেখে আধ-শােয়া অবস্থায় কিসসা শােনার জন্য প্রস্তুত হলেন। বেগম কিসসাটির পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন
–“জাহাপনা, রােশনকে চোখের সামনে খাড়া দেখে সুলতান তাে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবার জোগাড় হলেন। রোশন এবার নিভৃতে তার বিরহ-যন্ত্রণার বিলকুল কাহিনী এক এক করে সুলতানের কাছে ব্যক্ত করল।
সুলতান রােশন-এর মুখে তার মহব্বতের কাহিনী শুনে বললেন ‘বেটা, সাচ্চা মহব্বতের মৃত্যু নেই। তােমরা উভয়ে মহব্বৎ-কে যে আকুলতা দিয়ে আঁকড়ে ধরেছ তার নজীর নেই। আশমানের বুকে যতদিন চাঁদ-সূর্য অবস্থান করবে ততদিন তােমাদের মহব্বতের জন্য ত্যাগ স্বীকারের কাহিনী অত্যুজ্জ্বল থাকবে।
রােশন দ্বিধা-সঙ্কোচ কাটিয়ে আমতা আমতা করে বলল -জাহাপনা, গুলাবী কোথায়?—“তােমার গুলাবী এখন আমার প্রাসাদেই আছে। সুলতান তার কলিজার গুলাবীকে রােশনের হাতে তুলে দেয়ার মনস্থ করলেন। সুলতানের হুকুম পেয়ে কাজী ছুটে এলেন, শাদীর কবুলনামা বানানাে হ’ল। গণ্যমান্য সাক্ষীরা কবুলনামায় স্বাক্ষর করলেন। আড়ম্বরের মধ্য দিয়ে রােশন ও গুলাবীর শাদী হয়ে গেল। সুলতান দূত পাঠিয়ে বাদশাহ সামিম’কে রােশন ও গুলাবী-র শাদীর খবর জানালেন।
বাদশাহ সামিম লেড়কার শাদীর খবর পেয়ে খুবই খুশী হলেন। সুলতান দিরবাস জোরদার খানাপিনা ও উৎসব-অনুষ্ঠানের আয়ােজন করলেন। সাতদিন ধরে প্রাসাদে চলল নানা আনন্দ অনুষ্ঠান। তারপর সুলতান দিরবাস প্রচুর দান সামগ্রী ও বহুমূল্য উপহার সামগ্রী ও দাস-দাসী সহ কন্যা গুলাবী ও জামাতা রােশনকে বাদশাহ সামিম-এর রাজধানী ইস্পাহানে পাঠালেন।
রােশন ও গুলাবী সুখে বিবাহিত জীবন ভােগ করতে লাগলেন।
আজব ঘােড়ার কিস্সা
বেগম শাহরাজাদ জানালা দিয়ে বাইরের বাগিচার দিকে এক নজরে তাকিয়ে দেখে নিয়ে বললেন—‘জাহাপনা, রাত্রি শেষ হতে এখনও দেরী আছে। এ সুযােগে আপনাকে আজব ঘােড়ার কিসসা’ নামে নতুন একটি কিসসা শােনাচ্ছি। জাঁহাপনা, কোন এক সময়ে পারস্যে এক দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বাদশাহ রাজত্ব করতেন। বাদশাহের নাম ছিল সাবুর। বাদশাহ সাবুর-এর নাম-যশ সমসাময়িক কালে তামাম আরব দুনিয়ায় অগাধ প্রসার লাভ করেছিল। কেবল মাত্র ধন-দৌলতের দিক থেকেই নয়, বিদ্যা শিক্ষাতে তাঁর সমকক্ষ বাদশাহ কেউ-ই ছিলেন না, বহু বিষয়ে পাণ্ডিত্যের জন্যও তিনি তামাম আরব দুনিয়ায় বিশেষ খ্যাত ছিলেন। বাদশাহ সাবুর কারাে, এমন কি তার দরবারের কোন পার্ষদও কোন বে-আদপি করলে তাকে ক্ষমা করতেন না। অত্যাচারী কোন আদমি আর বিদ্রোহীকে তিনি কিছুতেই বরদাস্ত করতেন না। এর জন্য নিষ্ঠুরতা অবলম্বন করতেও তিনি কুণ্ঠিত হতেন না। বাদশাহ সাবুর-এর রাজ্যে যেমন শান্তি শৃঙ্খলা বাঁধা পড়ে থাকত। তার খুবসুরৎ তিনটি লেড়কি ছিল। তাদের সুরতের মাফিক গুণ ছিল অন্তহীন। কামার-অল আকমর নামে বাদশাহ সাবুর-এর একটি লেড়কা ছিল। বাদশাহ সাবুর হরসাল দু’বার প্রাসাদে উৎসব অনুষ্ঠান করতেন। শরৎকালে ‘মীরগান’ নামে উৎসব আর বসন্ত কালে বহুৎ জাঁকজমকের সঙ্গে করতেন নওরােজ উৎসব। কেবলমাত্র স্বদেশের প্রজারাই নয় বহু পরদেশী মেহমানও বাদশাহের আয়ােজিত উৎসব অনুষ্ঠানে যােগদান করত। উৎসব উপলক্ষ্যে বাদশাহ খুশী হয়ে কোন কয়েদীকে মুক্তি দিয়ে দিতেন, কারাে বা মেয়াদ কমিয়ে দিতেন, আবার কোন কোন জ্ঞানী গুণীকে খেতাব দানের মাধ্যমে সম্মানিত করতেন। কর্মচারীদের যােগ্যতা অনুযায়ী পদোন্নতি বা ইনাম দান করতেন। প্রজারাও বাদশাহকে নানা উপহার প্রদান করে নজরানা দিয়ে সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন। বসন্তকালে আয়ােজিত নওরােজ’ উৎসব ছিল একটু স্বতন্ত্র ধরনের। এতে কেবল মাত্র জ্ঞানী-গুণীজনের সম্বর্ধনার ব্যবস্থা হত। এতে রাজ্যের কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদদের সমাবেশ ঘটত। পক্ষকাল ধরে চলত বিভিন্ন অনুষ্ঠান। সবশেষে খেতাবদানের মাধ্যমে বাদশাহ তাদের বিশেষ বিশেষ সম্মানে ভূষিত করতেন। একবার বাদশাহ অন্যান্য সালের মাফিক বসন্তকালে নওরােজ উৎসবের আয়ােজন করলেন। বাদশাহ কর্তৃক নিমন্ত্রিত হলে অন্যান্য বহুৎ পরদেশী জ্ঞানী গুণীদের মধ্যে তিনজন বিশেষজ্ঞ হাজির হয়েছিলেন। তারা প্রত্যেকেই অলৌকিক বিদ্যায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি রয়েছে। তাদের প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা দেশের অধিবাসী। তাদের একজন পারসিক , একজন রােমান আর অন্যজন হিন্দুস্থানী। উৎসবের শুরুতে হিন্দুস্থানী প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটি নতজানু হয়ে বাদশাহ সাবুর’কে কুর্নিশ করে আজব একটি সামগ্রী নজরানা স্বরূপ দান করলেন। বস্তুটি একটি মনুষ্য মূর্তি। সােনার তৈরী। হীরা ও মণি-মুক্তা খচিত। আর তার হাতে সােনার একটি ছােট্ট শিঙা শােভাপাচ্ছে।মূর্তিটি বাদশাহের সামনে রেখে সে বলল
—'জাহাপনা, মুর্তিটি অলৌকিক গুণের অধিকারী। একে আপনার প্রাসাদের প্রবেশ দ্বারে স্থাপন করে দিলে নিষ্ঠার সঙ্গে আপনার নগর পাহারা দিয়ে সুরক্ষার বন্দোবস্ত করতে পারবে। কোন বহির্শর হিম্মত হবেনা আপনার। নগর আক্রমণ করে বা দূর থেকে কোন শত্রুকে অগ্রসর হতে দেখলেই তার শিঙাধ্বনির মাধ্যমে শিঙা বাজিয়ে নগরবাসীকে। সতর্ক করে দেবে। ফলে আপনার সৈন্যেরা তৈরী হয়ে শত্রুর। মােকাবেলা করে নগরটি রক্ষা করতে পারবে।বাদশাহ সবিস্ময়ে হিন্দুস্তানী পণ্ডিতের বাৎ শুনতে লাগলেন। পণ্ডিত প্রবর বলতে লাগলেন-“জাঁহাপনা, আমার মুখের বাৎ ) বিশ্বাস করার দরকার কি ? যথা সময়ে পরীক্ষার মাধ্যমেই আমার। মূর্তির অলৌকিক গুণের প্রমাণ মিলতে পারে। আপনার জ্ঞাতার্থে আরও নিবেদন করছি যে, আমার এ-অলৌকিক দৈবগুণের অধিকারী মূর্তিটির শিঙার ধ্বনি কানে যেতেই শত্রু সৈন্যের কলিজা টুকরাে টুকরাে হয়ে যাবে। সবাই পালিয়ে জান বাঁচাবার ধান্দা করবে। লেকিন পালাতে কেউ-ই পারবে না। শত্রু সৈন্যের কেউ কেউ আকস্মিক ভয় ডরে সংজ্ঞা হারিয়ে লুটিয়ে পড়বে, আবার কেউ বা সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে থাকবে দিনভর। হিন্দুস্থানী প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটির বাৎ শেষ হতে না হতেই বাদশাহ সাবুর উল্লসিত হয়ে বলে উঠলেন—“বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা! আপনি যে আজব মূর্তি আমাকে উপহার দিলেন তার বিনিময়ে আমি আপনার কোন আশাই অপূর্ণ রাখব না। আপনাকে উপযুক্ত ইনাম দিয়ে আমি সম্মানিত করব।পারস্য প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটি এবার এগিয়ে এসে যথােচিত ভঙ্গিতে বাদশাহ সাবুর'কে কুর্নিশ করল। দু’পা এগিয়ে গিয়ে ছােট্ট একটি ঘােড়ার মূর্তি তাঁর সামনে রেখে বলেন—“জাঁহাপনা, আমি এ আজব ঘােড়াটি আপনাকে নজরানা দেবার জন্য নিয়ে এসেছি। বাদশাহ কৌতূহল মিশ্রিত অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে পারস্য-প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটির উপহৃত ঘােড়াটিকে দেখতে লাগলেন।
পারস্য-প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটি ব’লে চললেন—‘জাহাপনা, আমার এ আজব ঘােড়াটি কোন ধাতুর তৈরি নয়, সম্পূর্ণ কাঠের। সাচ্চা আবলুশ কাঠ দিয়ে বানানাে হয়েছে। এটি অলৌকিক শক্তির আধার। বাদশাহ সাবুর ঘােড়াটির দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন আবলুশ কাঠের ওপরে হীরা ও মণি-মুক্তাগুলি রীতিমত ঝিল্লা দিচ্ছে।বাদশাহ ঘােড়াটির ওপর থেকে দৃষ্টি তুলে নিয়ে পারস ব্যক্তিটির দিকে তাকালেন।
তিনি এবার বলেন—“জাহাপনা, আমার ঘােড়ার অলৌকিক শক্তির ব্যাপারে দু-চার কথায় কিছু বলছি। ধৈর্য ধরে শুনুন—এর ওপর বসামাত্র সওয়ারকে নিয়ে সােজা শূন্যে উঠে যেতে পারে। জ্যান্ত কোন ঘােড়া এক সালে যে পথ পাড়ি দেয় সে-পথ এঅলৌকিক ক্ষমতাবলে এক মুহূর্তে অতিক্রম করে ফেলে। জাহাপনা, ঘােড়াটির পিঠে চাপলে আপনি আমার মুখের বাৎ মিলিয়ে নিতে পারবেন। বাদশাহ আবার ছােট্ট ঘােড়াটির দিকে বিস্ময় মাখানাে দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। এবার রােমান প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটি এগিয়ে এসে বাদশাহকে নতজানু হয়ে কুর্ণিশ করলেন। তারপর একটি খুব সুরৎ ময়ূরের মূর্তি বাদশাহের সামনে রেখে সশ্রদ্ধ নিবেদন করলেন-‘জাহাপনা, আমার এ ময়ূরটি অলৌকিক শক্তির অধিকারী। পাত্রটির কেন্দ্রস্থলে বড় যে মূর্তিটি দেখছেন এটি ময়ুর। আর চারদিক থেকে তাকে যারা পরিবেষ্টন করে রেখেছে সেগুলাে ময়রী। পাত্রটি রূপাের তৈরি। আর ময়ূর ও ময়ূরীগুলাে খাঁটি সােনা দিয়ে বানানাে। বাদশাহ সাবুর কৌতুহলাপন্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন —আপনার মূর্তিটি কোন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী, বলবেন জরুর। ময়ূরটি দিন ও রাত্রের চব্বিশ ঘন্টা ধরে প্রতি এক টা বাদে এক একটি ময়ূরীর সঙ্গে কামক্রীড়ায় লিপ্ত হয়। এক একটির সঙ্গে এক ঘণ্টা করে চব্বিশ ঘণ্টায় চব্বিশটি ময়ুরীর সঙ্গে সে কামক্রীড়ায় লিপ্ত থাকে। বাদশাহ সাবুর তিনটি অত্যাশ্চর্য বস্তুকে পাশাপাশি রেখে বিস্ময় মাখানাে দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করতে লাগলেন। তিনি একদম তাজ্জব বনে গেলেন। মুখ দিয়ে যেন তার রা সরছে না।
বাদশাই কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিলেন। এক সময় তিনি প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে বললেন-দেখুন আপনারা নিজ নিজ বস্তু সম্বন্ধে যা বাৎলালেন তাতে আমি বিলকুল তাজ্জব বনে গেছি। বাদশাহ এবার পরদেশী প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের সম্বন্ধে বললেন –“শুনুন, আপনারা নিজ নিজ বস্তু সম্বন্ধে যা কিছু বাতালেন তা যদি বিলকুল সাচ্চা হয় তবে আপনারা যে, যা আশা করছেন তা অবশ্যই পাবেন। 'বাদশাহ এবার রােজ একটি করে তিন দিনে তিনটি বস্তুর সত্যতা যাচাই করার জন্য পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখলেন।একদিন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বাদশাহ সাবুর দেখলেন, সােনার ময়ুর প্রতি ঘণ্টায় একটি করে ময়ুরীর সঙ্গে রতি-রঙ্গ করে সময় নির্দেশ করছে। পরদিন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সােনার মূর্তিটি সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হলেন। সেটি শিঙা ফুকে নিজ যােগ্যতার পরিচয় দিল। সবশেষের দিন হীরা মণি-মাণিক্য খচিত আবলুশ কাঠের ঘােড়াটি পারস্য-প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটিকে নিয়ে আশমানের দিকে উঠে গিয়ে বাদশাহ সাবুর'কে তাক লাগিয়ে দিল। সে কী তার শব্দ! সে কী তার গতিবেগ—সামলানােই যেন দায়।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
চারশ’ তেরােতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর শুরু হতে না হতেই বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন জাহাপনা, তিন প্রাজ্ঞ ব্যক্তির বস্তু তিনটির অলৌকিক ক্ষমতা দেখে বাদশাহ সাবুর একদম তাজ্জব বনে গেলেন। তিনি যেন বিলকুল হতবাক হয়ে পড়েছেন। খুশীতে তার দিল ডগমগ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ বাদে বাদশাহ নিজেকে একটু সামলে নিয়ে প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে বললেন—আপনাদের উপহৃত বস্তুগুলির অলৌকিক ক্ষমতা চাক্ষুষ করে আমি মুগ্ধ। আপনারা সবাই দিল খােলসা করে বলুন, আমার কাছ থেকে কে, কি প্রত্যাশা করেন।
তিন মেহমান সমস্বরে বললেন-জাহাপনা, আমরা তিনজনই একই বস্তু প্রত্যাশা করছি। আপনার তিনটি লেড়কি বর্তমান। আমরা তিনজন আপনার তিন লেড়কিকে শাদী করে বিবির মর্যাদা দিতে চাইছি। আপনার কাছে আমাদের এই প্রার্থনা। বাদশাহ সাবুর প্রাজ্ঞ ব্যক্তিদের বাঞ্ছা শুনে যার পর নাই খুশী হলেন। বাদশাহের প্রাসাদে কাজীকে তলব করা হ’ল। বাদশাহের তলব পেয়ে কাজী তার পুঁথিপত্র নিয়ে ছুটে এলেন। শাদীর কবুলনামা তৈরি হয়ে গেল। সাক্ষীরাও সােৎসাহে স্বাক্ষর করলেন। সবচেয়ে ছােট লেড়কির নসীবে জুটল এক বুড্ডা। তার উমর যে কত তা হয়ত তিনি নিজেই ওয়াকিবহাল নন। তার উমর খুব কম হলেও এক শ’ সাল তাে হবেই। মাথায় ইয়া পেল্লাই টাক। বেলমুণ্ডাও বলা চলে। ঘাড়ের কাছে পাটের ফেসাের মত দু’চারগাছি রােম বাতাসে দোল খেয়ে খেয়ে নিজেদের অস্তিত্ব ঘােষণা করছে। আর ভ্র-জোড়া বিলকুল ন্যাপাপপাছা। মাথার দু ধারে গাধার মাফিক ইয়া লম্বা দুটো কান ঝুলছে। লেকিন বুড্ডা হলে কি হবে শখ রয়েছে পুরােদস্তুর। আচ্ছা করে কলপ বুলিয়ে সফেদ দাড়ি গোঁফকে কালাে বানানাের ব্যর্থ প্রয়াস চালাতে ছাড়ে নি। বিড়ালের মাফিক ঘােলা চোখে ছানি পড়ে তাদের কর্মক্ষমতা অনেকাংশে হ্রাস করে দিয়েছে। আর দাঁত দুটোকে যেন শূয়ােরের মুখ থেকে খুলে এনে এর মুখে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। উটের অণ্ডকোষের মাফিক তার নিচের ঠোটটি বিশ্রী ভাবে ঝুলে পড়েছে। আচমকা এ প্রাজ্ঞ ব্যক্তিটিকে এক পলকে দেখলেই ডরে কলিজা পর্যন্ত শুকিয়ে যায়।
লেকিন ছােট লেড়কিটির সুরৎ? অনন্যা। এর মাফিক খুবসুরত, লেড়কি এক শ’ সালের মধ্যে তামাম আরব দুনিয়ায় কেউ-ই পয়দাহয়নি। চপল হরিণীর মাফিক ডাগর ডাগর চোখ দুটি তার সুরৎ অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের শাখা-প্রশাখা তাকে আলিঙ্গন করে ধন্য হতে চায়। আশমানের চাদ সালাম জানিয়ে নিজেকে ধন্য জ্ঞান করে। বাগিচার ফুল তার মাথায় স্থান পেয়ে দুনিয়ায় নিজেদের পয়দা হওয়া সার্থক জ্ঞান করে। ছােট লেড়কিটি তার জীবন সঙ্গীর সুরৎ দেখে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারল না। এক নজরে দেখেই ছুটে গিয়ে পালঙ্কে আছাড় খেয়ে পড়ল। ডুকরে কান্না জুড়ে দিল। বহিনের কান্না শুনে তার ভাইয়া কামার অল আকমর কাছে এগিয়ে এল। সমবেদনার স্বরে বলল বহিন, কি সমাচার? কি হয়েছে তাের? বল তাে, কেন এমন করে কাঁদছিস, বল তাে?'
–ভাইজান, তুমি কি কিছুই জান না কি হয়ে যাচ্ছে?’
-বহিন, বিশ্বাস কর, আমি কিছুই জানি না। মাত্র তাে একটিদিনের জন্য শিকারে গিয়েছিলাম। এরই মধ্যে এমন কি ঘটে গেল। যে, তােকে এমন আকুল হয়ে কাদতে হচ্ছে, তাের চোখে পানির ধারা ঝরছে। কি ব্যাপার আমাকে খােলসা করে বল বহিন।
–‘ভাইজান, তােমার কাছে ছিপবার কিছু নেই। বলব, সবই বলব। তবে সাফ বাৎ বলছি, এতবড় একটি জুলুম আমি কিছুতেই বরদাস্ত করে নিতে পারব না। আমার আচরণে নির্ঘাৎ আব্বাজী চরম গোসসা করবেন। লেকিন ভাইয়া, এভাবে আমার জিন্দেগী তাে হাসিমুখে বরদাস্ত করতে পারব না। অসম্ভব, কিছুতেই আমি তা হতে দিতে পারি না। আমি প্রাসাদ ছেড়ে গােপনে ভেগে যাব। একদম খালি হাতে, কোন ধনসম্পদ সঙ্গে নেব না, তােমাকে বলে রাখছি।' সবার অলক্ষ্যে আমি প্রাসাদ ছেড়ে ভেগে যাব।'
-কী ঝকমারিতেই না পড়া গেল! ব্যাপার কি তা তাে বলবি? আগে আমার কাছে সব কিছু খােলসা করে বল। কামার অল আকমর ধমকের স্বরে বলল।
ছােট বহিন ডুকরে ডুকরে কেঁদে এবার বলল—“তুমি আমার একমাত্র ভাই—ভাইজান। তােমার কাছে কিছু ছিপাব না। সব বলছি, পারসিক-প্রাজ্ঞটি আব্বাজীকে যাদুমন্ত্রে বশীভূত করে ফেলেছে। কালাে একটি আবলুস কাঠের ঘােড়া দিয়ে আব্বাজীকে বলেছে, এ-ঘােড়ার পিঠে বসলে সওয়ারকে নিয়ে আশমানে উঠে যাবে। হাজার মাইল পথ মুহুর্তে পাড়ি দিয়ে দেবে। তার বাৎ শুনে আব্বাজী কসম খেয়েছিলেন পারসিক প্রাজ্ঞ ব্যক্তির বাৎ সাচ্চা হলে তবে সে যা মাঙ্গবে তিনি তা-ই দেবেন। তিনি তাজ্জব করে দিলেন। ঘােড়াটি তাকে পিঠে নিয়ে দিব্যি শূন্যে উঠে গেল। বিশাল এলাকা নিয়ে কয়েক চক্কর মেরে ঘােড়াটি ফিন নেমে এল জমিনে।আব্বাজী খুশী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—তুমি কোন্ ইনাম আশা করছ?
পারসিক-প্রাজ্ঞ ব্যক্তি নির্দ্বিধায় আমাকে শাদী করার বাঞ্ছা প্রকাশ করে বসলেন। আব্বাজী জবান ঠিক রাখতে গিয়ে রাজী হয়ে গেলেন। ভাইজান, আদমিটি কী যে কদাকার দেখতে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যাও না, স্বচক্ষে চাক্ষুষ করে এসাে। তবে আমি যে সাচ্চা বলছি মালুম হয়ে যাবে।
‘কোই বাৎনেহি বহিনজী। আমি এখনই গিয়ে আব্বাজীর সঙ্গে আলােচনা করছি।| ভাইয়ার বাৎ শুনে ছােট বহিন যেন আশার আলাে দেখতে পেল।কামার অল ব্যস্ত পায়ে দরবারে তার আব্বাজীর সঙ্গে ভেট করল। তাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করল—আব্বাজী, কি ব্যাপার
( চলবে )

0 Comments