সহস্র এক আরব্য রজনী পার্ট ১৩৪ (Arabya Rajani part 134)

গল্পের পরবর্তী অংশঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।

কোথায় চলেছে, জানা নেই। সে শুধু জানে তাকে চলতে হবে। যে ভাবেই হােক রােশনকে পেতেই হবে তার মেহবুবার খোঁজ । 

দিনের পর দিন অজানা-অচেনা পথ পাড়ি দিয়ে রােশন একদিন এসে হাজির হল এক সমুদ্রের পাড়ে। ক'দিন পেটে দানাপানি পড়ে নি। দাঁতে কুটোটি পর্যন্ত কাটে নি। আর সে চলতে পারছে না। পা দুটো যেন বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাইছে। বাধ্য হয়ে সমুদ্রের পাড়ের বালির ওপর শুয়ে পড়ল।

রােশন বালির ওপর প্রায় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এমন সময় এক ফকির সে-পথ দিয়ে যাবার সময় তাকে দেখতে পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। রােশনকে দেখে ভাবল, এভাবে এখানে পড়ে থাকলে নওজোয়ানটির জান খতম হয়ে যাবে। ইন্তেকাল হয়ে যাবে।


রােশনকে দেখে ফকিরের মায়া হ’ল। তাকে ধরে তুলল কোন রকমে নিজের গুহায় নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিল।

ফকির ফলমূল দিয়ে খানা সাজিয়ে রােশন’কে খেতে দিল।  লােটা ভরে ঝর্ণার পানি দিল।

খানাপিনা সেরে রােশন গুহার দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে অপলক চোখে ফকিরকে দেখতে লাগল। রােশন ফকিরকে জিজ্ঞাসা করল—ফকির সাহাব, আমি এখন কোথায় আছি?

–‘এটা আমার দরগা। তােমার কোন ডর নেই বেটা। তুমি নিশ্চিন্তে এখানে থাকতে পার।

‘আমাকে এখানে, এ-গুহায় কেন নিয়ে এসেছেন সাহাব?’

—“আমি তােমাকে না আনলে সমুদ্রের পাড়ে পড়ে তাে জান খতম হয়ে যেত। এরই মধ্যে তােমার ইন্তেকাল হয়ে যেত বেটা। জন্তু জানােয়ার তােমাকে ছিড়ে ছিড়ে খেয়ে ফেলত। বাধ্য হয়ে তােমাকে আমার দরগায় নিয়ে এসেছি।'

মুহর্তকাল নীরবতার মধ্যে কাটিয়ে ফকির এবার প্রশ্ন করল-বেটা, এবার তােমার ব্যাপার কিছু জানার জন্য আমার দিল উতলা হচ্ছে।

–বলুন, কি জানতে চাইছেন আমার কাছে?

—“তুমি কোথায় যেতে চাইছ? আর কেনই বা এত কষ্ট স্বীকার করে পথ পাড়ি দিচ্ছ?”

এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চারশ’ পাঁচতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ কিসসা বলে চলেছেন—জাহাপনা, ফকির এবার জিজ্ঞাসা করল, বেটা তােমার নামটি তাে শােনা হ’ল না। কি নাম তােমার ?

‘রােশন। 

–‘রােশন, তুমি কোথায় চলেছ, কেন চলেছ, বললে না তাে? রােশন এবার তার মহব্বতের কাহিনী ফকির সাহেবের কাছে এক এক করে বিলকুল ব্যক্ত করল।

ফকির সাহেব ধৈর্য ধরে সবকিছু শুনল। তারপর চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—“বেটা, সবই নসীবের ফের। আল্লাল্লার মর্জিতেই দুনিয়ার বিলকুল কাম কাজ চলে। বিশ সাল হয়ে গেল আমি এ গুহায় বসতি গেড়েছি। আল্লাতাল্লারর নাম করে দিন গুজরান করি। আদমিটাদমির মুখ এখানে দেখাই যায় না। তবে ক’দিন আগে একদল পুরুষ ও জেনানাকে এপথে যেতে দেখেছিলাম।

ফকিরের বাৎ কানে যেতেই রােশন অকস্মাৎ সােজা হয়ে বসে পড়ল। কৌতুহলী দৃষ্টিমেলে ফকিরের দিকে তাকিয়ে রইল।

ফকির বলে চলল—“পুরুষ ও জেনানার সে-দলটি সমুদ্রের ধারে বিশ্রাম করল পুরাে একটি বেলা। তারপর একটি বজরা চেপে এক মাঝবয়সী আদমী বাদে সবাই বিশাল এক বজরা চেপে চলে গেল সমুদ্রের বুক ছিড়ে খাড়া হয়ে থাকা ওই পাহাড়টির দিকে।

ফকিরের মুখের বাৎ শুনে রােশন-এর বুকে আশার সঞ্চার হ’ল। 

ফকির এবার বলল—“বেটা, আমি গুহায় বসে তাদের কাণ্ডকুল দেখতে পেলাম। আমার মধ্যে একটি ব্যাপারে কেমন যেন সন্দেহ হ’ল। বজরা ছেড়ে যাবার সময় একটি লেড়কি গলা ছেড়ে বিলাপ করে কাদছিল, ইয়াদ আছে।' বজরাটি সমুদ্রের বুক, ছিড়ে এগিয়ে পাহাড়ের গায়ে গিয়ে ভিডল। আর একটি ব্যাপারে আমার বুকে কৌতুহলের সঞ্চার করল। বজরার যাত্রীরা বজরা থেকে নেমে সেটির গায়ে আগুন জেলে দিল। তাজ্জব ব্যাপার!

বেটা, আমি বহুৎ কোশিস করেছি বজরার আগুন দেয়ার ব্যাপারটির কিনারা করতে। লেকিন কোন মতলবই বের করতে পারি নি। ব্যাপারটি বিলকুল রহস্যজনকই রয়ে গেল।

ফকির এবার রােশন-এর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে সহানুভূতির স্বরে বলল-বেটা, আমার দিল বলছে, তারা তােমার মেহেবুবাকে ওই পাহাড়ের গুহায় বন্দী করে রেখেছে।'

তারপর শােন বেটা, বজরাটি আগুনে পুড়িয়ে একদম ছাই করে দিয়ে আদমিগুলাে মরুভূমির দিকে চলে গেল। ব্যস, এ পর্যন্ত। রােশন-এর দুচোখ বেয়ে পানির ধারা নেমে এল।

রােশন-এর হালৎ দেখে ফকিরের দিল করুণায় ভরে গেল। সে বলল-“বেটা, আজ রাত্রে আমি তােমার হয়ে আল্লাতাল্লার কাছে তােমার নামে প্রার্থনা করব। তার যা আর্জি হবে। তিনি যেভাবে নির্দেশ দেবেন তুমি তা-ই করবে।

এদিকে গুলাবী পাহাড়ের গায়ে সে-মঞ্জিলে বাস করতে লাগল। তার চোখের পানি আর শুকায় না। মঞ্জিলের ভেতরে বিলাস-ব্যসনের ঘাটতি নেই। আর দাসী, বাদী, চাকর-বাকর সবই রয়েছে। হুকুম হওয়া মাত্র তা তার হাতের সামনে হাজির হয়। ভােগের এমন এলাহী ব্যাপার স্যাপার পেয়েও গুলাবীর বুকে শান্তি নেই।

এদিকে রােশন ফকির সাহেবের মেহমান হয়ে দিন গুজরান । করে চলেছে।

পরদিন সকালে ফকির রােশনকে কাছে তলব করে বলল-বেটা কাল রাতভর আমি তােমার জন্য আল্লাতাল্লার কাছে প্রার্থনা করেছি। বেটা, তােমাকে এবার এক কাম করতে হবে। সামনে কয়েক লহমা গেলে কিছু মড়া খেজুর গাছ দেখতে পাবে। যত তকলিফই হােক না কেন কয়েকটি খেজুর গাছের গুড়ি জোড়া দিয়ে দিয়ে ছােট্ট একটি নৌকা বানিয়ে দেব। ফকির সাহেবের বানানাে নৌকাটি চেপে রােশন পাহাড়টির দিকে এগিয়ে চলল ।

তাজ্জব ব্যাপার তাে! সাগর এতক্ষণ ছিল তলাও-এর মাফিক সৌম্য ঢেউ বলতে কিছুই ছিল না। লেকিন রােশন নৌকা নিয়ে সামান্য এগােতে না এগােতেই সাগর উত্তাল-উদ্দাম রূপ। ধারণ করল। মালুম হচ্ছে, সাগর যেন বিলকুল ক্ষেপে গেছে। - আচমকা মাথাসমান উঁচু ঢেউয়ের তাণ্ডবে পড়ে রােশন বিলকুল কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলল। একদম বেসামাল হয়ে পড়ল। তার নৌকাটি বার বার আছাড় খেতে খেতে উল্কার বেগে ধেয়ে চলল।

রােশন সংজ্ঞা হারিয়ে নৌকার ওপর পড়ল। যখন তার হুঁশ হল তখন চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে এক পাহাড়ের পাদদেশে এলিয়ে পড়ে রয়েছে, উঠে দাঁড়াবার হিম্মৎ পর্যন্ত নেই।

এমন সময় এক খােজা এসে রােশনের এর মাথার কাছে এসে দাঁড়াল। জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে খােজাটি বলল -“হুজুর, কে আপনি? এখানে এলেনই বা কিভাবে?'

রােশন ক্ষীণ কণ্ঠে উচ্চারণ করল—“আমি এক বণিক। সমুদ্রের তাণ্ডবে আমার বজরা গেছে। '

ইস্পাহানের বণিক আমি।' রােশন-এর নসীবের বাৎ শুনে খােজাটির চোখে পানির ধারা নেমে এল। সে চোখের পানি মুছতে মুছতে বলল-“হুজুর, খােদাতালার দোয়াতেই আপনার জান রক্ষা পেয়েছে। আমার মুলুকও ইস্পাহান। আমার মহব্বত, আমার চাচার লেড়কির সাথে আমার মহব্বৎ। বহুৎ পেয়ার করে আমাকে। আমার জাতভাইরা একসময় আমাকে চুরি করে নিয়ে ভেগে যায়। তখন আমার উমর কম ছিল।

আমার জাতভাইরা চুরি করে নিয়ে গিয়ে আমার অণ্ডকোষ দুটো কেটে ফেলে খােজা বানিয়ে দেয়। তারপর বাজারে নিয়ে গিয়ে বেচে দিল। খােজা বান্দার দর বেশী। তাই আমাকে খােজা বানিয়ে বেচে বহুৎ দিনার তারা হাতিয়ে নিল।

খােজাটি আমাকে নিয়ে পাহাড়ের ধারে এক বিশাল ইমারতে নিয়ে যায়। বাইরের মহলে তার থাকার বন্দোবস্ত। সদরদরওয়াজা আগলানাে তার কাজ, ব্যস, আর কিছুই করতে হয় না।

খােজাটি বলল –“ধরতে গেলে আমার কোন কাজই নেই। সদর-দরওয়াজা আগলানাে—তাও এক সালে একবার মাত্র এটি খুলতে হয়। এক সালে একবার’ শব্দটি শুনে যেতেই রােশন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকাল।

তার কৌতূহল নিবৃত্ত করতে গিয়ে বলল –শােন, তামাম সাল ভর যা কিছু ব্যবহার করা হয় বিলকুল সামানপত্র প্রাসাদের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এক সাল বাদ ফিন বজরা বােঝাই করে সামানপত্র নিয়ে আসা হয়। দরওয়াজা খুলে সামানপাত্র ভেতরে ঢুকিয়ে খিল বন্ধ করা হয়। ব্যস, পুরাে একটি সালের জন্য নিশ্চিন্ত। 

এমন সময় অন্দরমহল থেকে কার যেন কান্নার শব্দ রােশন এর কানে এসে লাগল। জেনানার কান্নার স্বর।

কৌতুহলী দৃষ্টি মেলে রােশন খােজাটির দিকে তাকিয়ে বলল কার কান্নার স্বর? কে কাঁদছে, বল তাে?

এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চারশ’ সাততম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বলল -জাহাপনা, রােশন উৎকর্ণ হয়ে কান্নার স্বরটি লক্ষ্য করতে লাগল।

রােশন-এর জিজ্ঞাসা নিরসন করতে গিয়ে খোঁজাটি বল্ল 

—“হুজুর, এ-মহলটি উজিরের বেটির নির্বাসন জীবন যাপনের জন্য বানানাে হয়েছে। কিছুদিন আগে তাঁকে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তারপর থেকেই হারেমে বসে তার মেহবুবের বিরহে কেঁদে কেঁদে আকুল হচ্ছেন। কতদিন যে তাকে এভাবে চোখের পানি ঝরাতে হবে তার জানা নেই।

খােজা প্রহরীটির বাৎ শুনে রােশন-এর কলিজাটি বিলকুল নেচে ওঠে। আশায় তার বুক ভরে যায়। চোখের পলকে তার পথশ্রমে ক্লান্তি অবসাদ কেটে গিয়ে একদম তরতাজা হয়ে ওঠে।

খােজাটি বলে চলল—‘হুজুর, গুলাবীকে যে কতকাল এভাবে চোখের পানিতে বুক ভাসাতে হবে আল্লাহ ভিন্ন কেউ জানে না। নসীববিড়ম্বিতা গুলাবী মাঝে মাঝে ভাবে মহলটির ছাদের ওপর থেকে পালিয়ে পড়ে জান খতম করে দেবে। অবসান ঘটবে যাবতীয় জ্বালা যন্ত্রণার। মুক্তি পাবে এ-বন্দীদশা থেকে। মহব্বতের বিরহ-যন্ত্রণা আর কতকাল বরদাস্ত করা যায়।

পাহাড়-মন্দিরটির ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে যন্ত্রণাদগ্ধ দিল নিয়ে গুলাবী আশমান-জমিন ভেবে চলেছে হঠাৎ তার চোখের সামনে ভেসে উঠল একটি গাছের ডাল একদম ছাদ পর্যন্ত নেমে এসেছে। এটিকে সম্বল করে কোনক্রমে নিচে নেমে যেতে পারবে। তবে ছাদের একদম ধারে গিয়ে ডালটিকে ধরার কোশিস করতে হবে। হাতফসকে গেলে একদম পাতালে চালান হয়ে যাবে। লেকিন জানের মায়া তাে তার নেই। এ-জান যত তাড়াতাড়ি খতম হয় তত তাড়াতাড়ি শান্তি।।

শেষ পর্যন্ত বহুৎ কসরত করে হাত বাড়িয়ে ডালটিকে ধরতে পারল। খােদাতাল্লার নাম করে পড়ল ঝুলে।

গুলাবী এবার এ ডাল সে ডাল পাকড়ে কোন রকমে নিচে নেমে আসতে পারল।

গাছ থেকে সে নামল বটে। লেকিন সমতল ভূমিতে যেতে গেলে এমন বহুৎ কসরৎ করতে হবে। ঘন ঘন খাড়াই উত্রাই ডিঙিয়ে সে সমুদ্র তটে পৌছতে পারল।

গুলাবীর পরনে সােনার জরির নকসা করা কামিজ। আর গায়ে হীরা-জহরতের গহনা।

উজির লেড়কিকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে বটে, লেকিন ভিখারী সাজে তাে আর পাঠান নি, সম্ভবও নয়। অপত্য স্নেহ তাে তাই বলে দিল থেকে মুছে ফেলেন নি।

এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

চারশ’ নয়তম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ কিসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—“জাঁহাপনা, গুলাবী সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখল, জেলেরা নৌকা নিয়ে সমুদ্রে মছলি ধরছে। জাল ফেলার ফাঁকে জেলেদের একজন গুলাবীকে দেখতে পায়। নির্জন নিরালা সমুদ্রের পাড়ে এক খুবসুরৎ লেড়কিকে দেখলে তাজ্জব বনার ব্যাপারই বটে। লেকিন এ-লেড়কি কে? এলই বা কি করে ? জেলেটি তার নৌকাটিকে সাধ্যমত ব্যস্ত-হাতে দাঁড় বেয়ে তীরে এনে ঠেকাল।

জেলেটি নৌকা থেকে নামতে নামতে বলল—“আমাকে ডর করার কোন কারণ নেই। আমি দৈত্য বা জিন-পরীটরী কিছু নই। কিংবা সাগরের পানির তলায় আমার বসতি নয়। আদমি—বিলকুল আদমি। আমার দিলেও মহব্বৎ ছিল। এক লেড়কিকে পেয়ার করতাম।

গুলাবী বলল—“আমার কাছ থেকেও তােমার কোন ডর নেই।

আমিও জিন-পরী নই। এক লেড়কি। আমি এক নওজোয়ানকে পেয়ার করতাম। আমাদের মহব্বৎ গড়ে উঠেছিল। খােদাতাল্লার মর্জিতে আমরা একে-অন্যের কাছ থেকে দূরে সরে এসেছি। আজ আমি নির্বাসিতা। আমার সব থেকেও আজ কেউ-ই নেই।

ছেলেটি সবিনয়ে গুলাবীর দিকে তাকিয়ে থাকে।

গুলাবী এবার ছেলেটির কাছে কাতর মিনতি রাখে—মেহের বানি করে তােমার নৌকায় আমাকে একটু ঠাই দেবে? তােমাকে আমি খুশী করে দেব। তােমাকে সােনা, হীরা, মুক্তা ইনাম দেব। সাগরের পানির তলায় ঝিনুকে যে মুক্তা থাকে সেই মুক্তা দেব।

ছেলেটি কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় নীরব চাহনি মেলে গুলাবীর দিকে তাকিয়ে রইল। গুলাবী এবার বলল—মেহেরবানি করে আমাকে একটু ঠাঁই দাও। দেরী কোরাে না। তােমার নৌকাটিকে কাছে নিয়ে এসাে, ঝট করে উঠে পড়ি। দেরী করলে ওরা আমাকে পাকড়াও করে ফের কয়েদখানায় পুরে দেবে। খােদার কসম, দেরী কোরাে না। নৌকাটি এগিয়ে পাড়ের সঙ্গে লাগাও। গুলাবীর চোখের পানিতে জেলেটির দিল গলে একদম পানি হয়ে গেল। তার ইয়াদ হ’ল—সে যখন নওজোয়ান ছিল তখন সেও মহব্বতের জালে জড়িয়ে পড়ে বিরহ জ্বালা কম সহ্য করে নি। তিলে তিলে দগ্ধ হতে হয়েছে। এরকম পুরনাে স্মৃতি তার দিলের কোণে ভেসে উঠতে লাগল। 

জেলেটি এবার তার নৌকাটি পাড়ে নিয়ে গিয়ে বলল—‘এসাে নৌকায় উঠে এসাে কোথায় যাবে বল, আমি পৌছে দেব।” গুলাবী সন্তর্পণে নৌকায় উঠে গেল। অভিজ্ঞ মাঝি চোখের পলকে নৌকাটিকে পাড় থেকে বহু দূরে নিয়ে চলে গেল।

নসীব মন্দ। আচমকা তুফান উঠল। সমুদ্র গেল ক্ষেপে। উত্তালউদ্দাম রূপ ধারণ করল মুহূর্তের মধ্যে। একদম প্রলয়ঙ্করী রূপ। পাকা মাঝি শক্ত হাতে হাল ধরল। নৌকা বাঁচাতে সাধ্যাতীত কোশিস করল। লেকিন তার মেহনত বৃথা গেল। নৌকাটিকে বাঁচাতে পারল না। পর্বত সমান ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌকাটি তলিয়ে কোথায় যে হদিস হারা হয়ে গেল ঠাহরই করা গেল না। সেদিন বিকালে সে-মুলুকের সুলতান তার কয়েক জন সভাসদকে সঙ্গে করে সমুদ্রের মুক্ত বায়ু সেবন করতে বেরােলেন।

সুলতান সদলবলে হাঁটতে হাঁটতে এক জায়গায় গিয়ে থমকে দাড়িয়ে পড়লেন। দেখলেন এক নৌকার গলুইয়ের ওপর এক খুবসুরৎ লেড়কি শুয়ে। লেড়কিটি সংজ্ঞাহীন। কাপড় চোপড় অগােছাল। প্রায় বিবস্ত্রা।

সুলতান লেড়কিটির দিকে বিস্ময় মাখানাে দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভাবতে লাগলেন—এ নির্ঘাৎ মানবী নয়, সাগর কন্যা। কোন

( চলবে )

Post a Comment

0 Comments