কোন এক সময়ে এক দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বাদশাহ রাজত্ব করতেন। তার ইব্রাহিম নামে এক উজির ছিল। উজির ইব্রাহিম-এর একটি খুবসুরৎ যুবতী লেড়কি ছিল। তার নাম ছিল গুলাৰী। সে কেবল সুরতের দিক থেকেই অনন্যা ছিল না। তার গুণও ছিল বহুৎ। প্রচুর বিদ্যাশিক্ষা সে গ্রহণ করেছিল। সে নিজে কবিতা লিখতে পারত। আবার প্রচুর সংখ্যক শায়েরও তার কণ্ঠস্থ ছিল। আর বয়েৎ-ও কম জানত না।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিস্সা বন্ধ করলেন।
চার শ'তম রজনী
বেগম শাহরাজাদ বললেন—“জাহাপনা, বাদশাহের প্রাসাদে যখনই কোন উৎসব-অনুষ্ঠান হত তখন গুলাবীর ডাক পড়ত-ই। গুলাবীর রসবােধও ছিল প্রচুর। তাই বাদশাহ তাকে নিজের পাশাপাশি কাছাকাছি রাখতে উৎসাহী হতেন।
এক বিকালে বাদশাহের কিছু মেহমান প্রাসাদ সংলগ্ন প্রাঙ্গণে বল খেলছেন। গুলাবী জানালার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে তাদের খেলা দেখতে লাগল। আদতে নজর তার এক সুদেহী নওজোয়ানের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গুলাবীর মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দেয়। তাকে যত দেখছে, ততই যেন দেখার ইচ্ছা প্রবলতর হয়ে উঠছে।
নওজোয়ানটিকে আরও কাছে পাওয়ার জন্য তার দিল চনমনিয়ে উঠতে লাগল।
গুলাবী আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। বুড়ি ধাইমাকে তলব করল।
বুড়ি ধাই তলব পেয়ে ছুটে এল। গুলাবী তাকে বলল-“ধাইমা, ওই যে নওজোয়ানটিকে দেখছ, চেন ওকে? ওর নাম ধাম কিছু জানা আছে?
বুড়ি ধাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে গুলাবীর দিকে তাকায়। আদতে সবাই নওজোয়ান। সবাই খুবসুরৎ। তার মধ্য থেকে একটিকে বেছে নেওয়া ওর নিস্তেজ চোখের মণি দুটোর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
গুলাবী এবার বলল—“আচ্ছা, আমি তােমাকে ভাল করে বুঝিয়ে দিচ্ছি।
গুলাবী এবার জানালা দিয়ে একটি আপেল ছুঁড়ে দিল। নওজোয়াটির গায়ে গিয়ে সেটি আঘাত হানল, সে ঝট করে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের দিকে তাকাল। গুলাবী এবার বুড়ি ধাইকে জিজ্ঞাসা করল-“কি গাে ধাইমা, এবার বুঝতে পেরেছ কি? ওর কি নাম, ধাম?'
‘তা আবার জানব না কেন বাছা। ওর নাম তাে রােশন।
–‘রােশন? হ্যা, ধাইমা রােশনই বটে। যথার্থ নাম! সার্থক নামা নওজোয়ান!
কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে ঠোঁট দুটো নাড়িয়ে কি যেন বলতে লাগল। এক সময় ব্যস্ততা প্রকাশ করে বলল- ধাইমা, একটা কাগজ কলম নিয়ে এসাে তাে। বুড়ি ধাই ছুটে গিয়ে কাগজ-কলম নিয়ে এল।
গুলাবী এবার একটি কবিতা লিখল, যার মর্মার্থ হল -
“ তুমি বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ আব্বার আদরের লেড়কা। তিনি তোমার নামকরন করেছেন রোশন। রেশন অর্থাৎ দুনিয়ার আলো । নামটি সার্থকই বটে। তোমার সুরতের রোশনাইয়ে তামাম দুনিয়া আলোতে ঝলসিয়ে ওঠে। তোমার আলোকচ্ছটা পূর্ণিমার চাঁদের আলোর মতো স্নিগ্ধ, বড়ই কোমল। তােমার আলোকরশ্মি আমার ভেতরের আন্ধার বিলকুল কেড়ে নিয়েছে। তোমাকে প্রথম দর্শনের মুহূর্ত থেকেই আমি বাতাসে তোমার নিশ্বাস আঘ্রাণ করছি, যাতে তােমার দেহের খুসবু মিশে রয়েছে। তুমি এসাে, আমার কাছে এসাে।
গুলাবী কাগজটিকে সুন্দর একটি বটুয়ায় ভরে বালিশের তলায় রেখে দিল । গুলাবীর কাণ্ড কারখানা বুড়ি ধাই আড়াল থেকে সৰ লক্ষ্য করল। গুলাবী ঘুমিয়ে পড়লে বুড়ি বালিশের তলা থেকে সন্তর্পণে বটুয়াটি বের করে নিল। বুড়ি ধাই কবিতাটি পাঠ করে বুঝতে পারল তার গুলাবীর দিল মহব্বতে হাবুডুবু খাচ্ছে। চিঠিটি মুখখােলা অবস্থাতেই ফিন বটুয়াটির মধ্যে রেখে সেটি বালিশের তলায় গুজে দিল।
সকালে ঘুম ভাঙার পর বুড়ি ধাই এসে গুলাবীর শিয়রে বসল, তার গালে-মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল—বেটি, জন্মের পর থেকেই আমি তােমাকে কোলে পিঠে করে এত বড় করে তুলেছি, এখন তােমার শরীরে যৌবন ভিড়তে শুরু করেছে। এ অবস্থায় যা স্বাভাবিক তাই তােমার মধ্যে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে।
গুলাবী নীরবে ধাইমার বাৎ শুনতে লাগল।
বুড়ি ধাই বলে চলল—‘যৌবনের উন্মাদনার আগুন কেউ সহ্য করতে না পেরে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আর কেউ বা নিজেকে সংযত রাখতে সক্ষম হয়। কেউ আচমকা তলিয়ে যায়। আবার কেউ আগুনে পুড়ে পুড়ে সােনার মাফিক খাটি হয়ে ওঠে। প্রেমের চিন্তা বিষময়। আবার প্রতিনিয়ত প্রেম প্রার্থীকে দগ্ধে মারে। তবে এর হাত থেকে কিছুটা অন্ততঃ রেহাই পাওয়া যায় যদি প্রেমের চিন্তা-ভাগ অন্য কাউকে দেয়। গুলাবী আশান্বিত হয়। বলে—‘ধাইমা, মহব্বতের জ্বালায় কোন্ দাওয়াইয়ের প্রলেপ দিলে শান্তি পাওয়া যায়, বলতে পার ?
‘পারি। সে-দাওয়াইয়ের খোঁজ আমার কাছে আছে।
আছে? দাওয়াই তােমার জানা আছে? বলতাে, কোন দাওয়াই আমার কলিজার জ্বালা নেভাতে পারে ?
—এক কাজ কর বেটি' একটি চিঠি লিখে তােমার দিলের খবর, তােমার প্রেমের আকুলতার কথা তাকে জানাও। দেখবে, সে তােমাকে মহব্বতে মহব্বতে বিলকুল মাতােয়ারা করে দেবে।
খবরদার , তার কাছে কিছুই গােপন রাখবে না। তবেই দেখবে সে-ও তােমার কাছে তার দিলের দরওয়াজা খুলে দেবে। লেকিন এতে কোন ফাঁক ফোকর, কোন ছল চাতুরির আশ্রয় নিলে আখেরে হিতে বিপরীত হতে বাধ্য।
এমন সময় বেগম শাহরাজাদ দেখলেন ভাের হয়ে এল বলে। তিনি কিসসা বন্ধ করলেন।
চার শ’ একতম রজনী
বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ বলতে শুরু করলেন-“জাঁহাপনা, বুড়ি ধাইয়ের পরামর্শ গুলাবীর দিলে খুব ধরল। লেকিন গুলাবী কিছুতেই নিজের দিলের কথা, সে যে নওজোয়ানটির মহব্বতে একদম হাবুডুবু খাচ্ছে সে-বিবরণ তার মেহেবুব নওজোয়ানটির কাছে খােলসা করে বলতে তার বাঁধল। গুলাবী মনস্থ করল নওজোয়ানটির কাছ থেকে আগে তার দিলের খবর জানতে হবে। সে যদি বুঝে নওজোয়ানটি তাকে পিয়ার করে তবেই সে ধীরে ধীরে তার কাছে নিজেকে মেলে ধরবে।
গুলাবীর দিলের ধান্দা বুড়ি অনুমান করে নিয়ে বুড়ি বলে-“বেটি, গত রাত্রে আমি এক বিচিত্র খােয়াব দেখেছি। এক খুসুরৎ লেড়কা এসে আমাকে বলল-'তােমার মালকিন গুলাবী আর খুবসুরৎ নওজোয়ান রােশন মহব্বতের জালে জড়িয়ে পড়েছে। তুমি শীঘ্র গুলাবীর মহব্বতের চিঠি রােশন-এর কাছে পৌছে দাও। লেকিন রােশনের জবাব তােমাকেই গুলাৰী-র কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তুমি এমন এক পবিত্রকর্ম থেকে দূরে সরে থাকলে তােমার সর্বনাশ হবে।
বেটি আমার স্বপ্নের ব্যাপার তােমাকে বাতালাম। এখন তুমি যা ভাল বােঝ কর।
গুলাবী উল্লাসিতা হয়ে বালিশের তলা থেকে বটুয়াটি বের করে আগে ভাগে লিখে রাখা মহব্বতের চিঠিটা বুড়ি ধাইয়ের হাতে দিয়ে বলল—“তবে এক কাজ কর ধাইমা, এ-চিঠিটি আমার মেহেবুবের হাতে পৌছে দাও ! সে যে জবাব দেবে আমাকে পৌছে দেবে। আমার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে, যাও, শীঘ্র যাও।
বুড়ি ধাই দৌড়ে গিয়ে গুলাবীর চিঠিটি রােশন-এর হাতে পৌছে দিল। রােশন ব্যস্ত হাতে লিফাফাটির চিঠিটি পাঠ করল। ব্যস, তার বুকে খুশীর জোয়ার বয়ে চলল।
রােশন এবার কাগজ-কলম নিয়ে খসখস করে লিখে ফেলল গুলাবীর মহব্বতের জবাব। সে লিখল-
‘আমার দিল আজ পাখি হয়ে সুদূর নীল আশমানের গায়ে ডানা মেলে হারিয়ে যেতে উন্মুখ। আমি তাকে কি করে বাঁধা দেব, সে যে আজ খাচা ছাড়া? তার মুখে আজ কেবল মুক্তির গানা। ওগাে আমার মেহবুবা, আজ আমি নতুন সাজে নিজেকে সাজিয়ে দিলের দরওয়াজা খুলে দিয়েছি। এসাে, তুমি এসাে।
চিঠি লেখা শেষ করে রােশন সেটি বুড়ি ধাইয়ের হাতে তুলে দেয়। বুড়ি ধাই মুহূর্ত মাত্র সময় নষ্ট না করে চিঠি নিয়ে গুলাবীর কাছে ছুটে আসে।
উৎকণ্ঠিতা গুলাবী চিঠিটি হাতে পেয়ে যারপরনাই উল্লসিতা হয়ে পড়ে। মেহেবুবার চিঠিটি পরম তৃপ্তিতে বার বার চুম্বন করে, বুকে জড়িয়ে ধরে এক অনাস্বাদিত অনাবিল আনন্দ অনুভব করে। | গুলাবী মেহেবুব রােশন-এর চিঠির জবাবে লিখল—“ওগাে, আমার দিল, আমার জান, আমার কলিজা মেহেবুব, ধৈর্যে বুক বাঁধ। আমরা উভয়ে একই জালে জড়িয়ে পড়েছি, সাচ্চা বটে। লেকিন তবু কি করে মালুম হবে আমারই মাফিক তােমার দিলও টুকরাে টুকরাে হয়ে গেছে। আমার দৃষ্টিপথ থেকে রাত্রির কালাে ছায়া তােমাকে আড়াল করে রেখেছে। আমাদের উভয়ের বুকেই যে তুষের আগুন ধিক ধিক্ করে জ্বলছে তা সে আমার ভালই জানা আছে। তােমার ইয়ার দোস্তদের সামনে আমার নাকাব না-ই বা খুলে ফেলা হােল। তবু ওগাে আমার মেহেবুব, তবু আমি যে তােমার, একান্ত ভাবে তােমারই।
গুলাবী চিঠি লেখা শেষ করে সেটিকে একটি লিফাফার মধে রেখে তার মুখ বন্ধ করল। _ এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
চারশ’ দুইতম রজনী
বেগম শাহরাজাদ কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন —জাহাপনা, গুলাবী তার মেহবুবার মহব্বতের চিঠিটির জবাব লিখে বুড়ি ধাইটির হাতে দিয়ে বলল—“শীঘ্র এটি আমার মেহেবুবার কাছে পৌছে দাও। আমার আর তর সইছে না। জবাব নিয়ে যত শীঘ্র পার ফিন আমার কাছে ফিরে আসবে। নসীব মন্দ। রােশন-এর দেখা মিলল না। ফিরে আসতে গিয়েই কেলেঙ্কারীর চূড়ান্ত ঘটে গেল। সে একদম উজিরের প্রধান সচিবের খপ্পরে পড়ে গেল।
উজিরের প্রধান সচিব বাজখাই গলায় বলে উঠলেন—এই যে বুড়ি, এত রাত্রে এখানে কেন ? কাকে চাই ? কোথায় যাচ্ছ ?
বুড়ি আমতা আমতা করে জবাব দিল-হামামে। হামামে যাচ্ছি হুজুর।
তার জবাব দিতে দিতেই বুড়ি ব্যস্ত-পায়ে এগিয়ে যায়। হঠাৎ পায়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। অগােছাল কাপড় চোপড় সামলাতে গিয়ে কামিজের ভেতর থেকে চিঠিটি বেরিয়ে পড়ে। এক খােজা সেটি কুড়িয়ে নেয়। খােজাটি কুড়িয়ে পাওয়া চিঠিটি উজিরের হাতে তুলে দিল। লিফাফাটি খুলে চিঠিটি চোখের সামনে ধরেই উজির চমকে ওঠেন। আর্তনাদ করে ওঠেন—“ইয়া আল্লাহ! এ যে আমারই লেড়কি গুলাবীর হাতের লেখা!
উজীরের আর্তনাদ শুনে তার বেগম পড়ি কি মরি করে ছুটে এলেন। উজির তার দিকে চিঠিটি এগিয়ে দিলেন।
উজিরের বেগম চিঠিটির দিকে এক নজরে তাকিয়েই চমকে ওঠেন—“ইয়া আল্লাহঃ এ যে আমার বেটি গুলাবী-র হাতের লেখা।
উজিরের বেগম স্বামীর দিকে এগিয়ে গেলেন। বললেন-এ দিমাক গরম করার কাজ নয়। দিমাক ঠাণ্ডা রেখে ভাবতে হবে, কি করে এ-সমস্যা থেকে উড়ানাে সম্ভব। লােক জানাজানি হলে কেলেঙ্কারীর চুড়ান্ত। সমাজে মুখ দেখানাে দায় হয়ে পড়বে।
উজির বললেন—“বিবিজান, লেড়কির ব্যাপারে আমার বহুৎ ডর লাগছে, বাৎ সাচ্চা বটে। বাদশাহ তাকে কত পেয়ার করে তােমার তাে আর অজানা নয়। দুদিক থেকে আমার ডর লাগছে।
সে বাদশাহের খুবই পেয়ারের পাত্র। তার ওপর সে আমার লেড়কা। এতে তুমি কি ভাবছ?’
তাই তাে। কি বলি ভেবে পাচ্ছি না। সবার আগে আল্লাতালার কাছে প্রার্থনা করে নিচ্ছি। তারপর আমার মতামত ব্যক্ত করব।
বেগম প্রার্থনা সেরে বললেন-“শােন, বাহার অল কুনুজ সমদ্রে একটি পর্বত রয়েছে। সেখানে সচরাচর কারাে যাওয়া সম্ভব নয়। সেখানে একটি মঞ্জিল তৈরী করে লেড়কিকে বাস করার বন্দোবস্ত করে দিন। এতে বাদশাহের ক্রোধ আর লেড়কির ইজ্জৎ উভয়ই রক্ষিত হতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।
উজির বেগমের মতলবটিকে বাস্তবায়িত করতে সে-পাহাড়ের গায়ে একটি বহুৎ আচ্ছা মঞ্জিল বানিয়ে ফেললেন।
এবার উজির এক মাঝ রাত্রে লেড়কি গুলাবীকে নিয়ে বজরায় চেপে পাহাড়-মঞ্জিলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন।
উজির এতদিন যা কিছু বন্দোবস্ত করেছেন সবই খুবই গােপনে ও সন্তর্পণে যাতে কাক পক্ষীও টের না পায়। এমন কি গুলাবীকেও কিছু জানতে দেন নি।
গুলাবী যখন বুঝল, তার আব্বা তাকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার ধান্দা করছে তখন সে আসন্ন বিরহের সম্ভাবনায় কাতর হয়ে পড়ল।
গুলাবী নির্বাসন-জীবনের পথে পা বাড়াবার আগে নিজের কামরার দরওয়াজার গায়ে একটি কবিতা লিখে রেখে গেল যার মর্মার্থ—‘মেহেবুব আমার, তােমার জন্য আমার দিল পাগল করা চুম্বন রয়ে গেল। আমি কোথায় যাচ্ছি কিছুই জানি না। পাখিরা গাছের ডালে বসে চোখের পানি ফেলে চলেছে। লেকিন আমার নসীব তাে আমাকে রেহাই দেবে না।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
চার শ’ চারতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসাটির পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাঁহাপনা, গুলাবী আঁখির পানি দিয়ে সুর্মা গুলে দরওয়াজার গায়ে নিজের বিরহ-জ্বালার স্বাক্ষর রেখে আব্বার সঙ্গে প্রাসাদ ছাড়ল। একের পর এক গ্রাম-গঞ্জ, নগর, পাহাড়-পর্বত আর বনজঙ্গল পাড়ি দিয়ে উজির তার লেড়কি গুলাবীকে নিয়ে এগিয়ে চললেন গন্তব্যস্থলের উদ্দেশে।
এক সময় উজির তার লেড়কিকে নিয়ে কুনুজ সাগরের পাড়ে হাজির হলেন।
একটি বড়সড় বজরা বানিয়ে তাতে দাসী ও নকর প্রভৃতি সহ উজির লেড়কি গুলাবীকে রওনা করিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি নিলেন
সঙ্গে কয়েকজন সশস্ত্র প্রহরীও দিয়ে দিলেন।
বজরা ছাড়ার আগে প্রহরীদের নির্দেশ দিলেন, পাহাড়-মঞ্জিলে গুলাবীকে পৌঁছে দিয়ে তারা যেন ফিরে আসে।
বজরা ছাড়ল। পালে হাওয়া পেয়ে বজরাটি তরতর করে এগিয়ে চলল।
রােশন ভােরে বিছানা ছেড়ে উঠে নামাজ সারল। নাস্তা সেরে ঘােড়ার পিঠে চাপল। উজিরের প্রাসাদের উদ্দেশে রওনা হল।
উজিরের প্রাসাদের সদর-দরওয়াজায় রােশন ঘােড়া থেকে নামল। প্রাসাদ ফাকা। কারাে কোন সাড়া শব্দ নেই। সে একদম তাজ্জব বনল।
রােশন এবার গুটিগুটি প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে গেল। গুলাবীর কামরার কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। দরওয়াজার গায়ের লেখাটির দিকে চোখ পড়ল।
দরওয়াজার লেখাটি পড়ে সে বুঝতে পারল, তার মেহেবুব, তার চোখের মণি গুলাবী প্রাসাদ ছেড়ে গেছে। স্বেচ্ছায় সে মােটেই যায় নি। তাকে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। তার মাথা হঠাৎ যেন কেমন চক্কর মেরে উঠল। বিলকুল আন্ধার দেখতে লাগল। রােশন গুলাবীর বিরহ-যন্ত্রণা সামলে উঠতে পারল না. চাপা আর্তনাদ করে উঠল—“ইয়া আল্লাহ! একী করলে তুমি! কপালে হাত দিয়ে সে গুলাবীর কামরার দরওয়াজার সামনেই বসে পড়ল।
রােশন কতক্ষণ গুলাবীর কামরার সামনে হতাশা আর হাহাকার সম্বল করে বসেছিল তার মালুম নেই। এক সময় উঠে বুকভরা যন্ত্রণা নিয়ে কঁপা কাঁপা পায়ে বাড়ির দিকে রওনা হল।
রােশন কোথায় যাবে, কার কাছে গেলে গুলাবীর পাত্তা জানতে পারবে, কিছুই তার জানা নেই। গুলাবীর বিরহ ব্যথায় রােশন পাগলের মাফিক হয়ে গেল। এক সকালে অস্থিরচিত্ত রােশন এক কাপড়ায় মকান ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। পাগলের মাফিক পথে পথে ঢুঁড়ে বেড়াতে লাগল।
রােশন বিলকুল হারা উদ্দেশ্যে হাঁটতে হাঁটতে মরুভূমিতে পৌছে গেল। তবু তার হাঁটার বিরাম নেই। এক সময় মরুভূমিও সে পেরিয়ে যায়। এবার এক নদীর পাড়ে এসে সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। গণ্ডুষ ভরে পানি তুলে কলিজাটিকে একটু ভিজিয়ে নিল। নদীর পানিতে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে চমকে ওঠে। ইয়া আল্লা! কী চেহারা হয়েছে। সে একদম হাড্ডি সার হয়ে গেছে।
রােশন নিজের দিলকে প্রবােধ দেয়। মেহেবুবা গুলাবীই যদি পাশে না রইল তবে কি হবে ছাই সুরৎ দিয়ে ? রােশন ফিন পথ চলা শুরু করল। গ্রাম-গঞ্জ ও পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে চলেছে তাে চলেছেই। কোথায় চলেছে, জানা নেই। সে শুধু জানে তাকে চলতে হবে। যে ভাবেই হােক রােশনকে পেতেই

0 Comments