সহস্র এক আরব্য রজনী পার্ট ১৩২ ( Arabya rajani part 132)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।

আমার হালৎ দেখে তার হালৎ সম্বন্ধে ধারণা করা কঠিন নয়। তার কলিজার দাপাদাপি আমার কানে হাতুড়ির মাফিক হরদম আঘাত হেনে চলেছে। তার মুখে আমি ভাষা খুঁজে পেলাম। সে যেন বলছে- আমি তােমার, একান্ত ভাবেই তোমার। দলন, পেষণ আর সম্ভোগে সম্ভোগে আমাকে একদম খতম করে ফেল। আমি আর পারছি না। আমার যা আছে বিলকুল নিয়ে ফেল। আমি আর পারছি না। আমার যা কিছু সম্পদ আছে আমাকে দিয়ে কলিজার জ্বালা জুড়াও। আমার যা কিছু সম্পদ বিলকুল তােমারই জন্য এত কাল আগলে আগলে রেখেছি। আজ ই তােমাক দিয়ে বিলকুল দিবানা হতে চাই। তুমি কি কিছু বােঝ না মেহবুব আমার? 


আমি ভাবলাম, তার বুকের ভেতরে উত্তাল-উদ্দাম সাগরের ঢেউ বয়ে চলেছে। দেহ আর দিল সম্ভোগের কামনায় আকুল। এ অবস্থায় নিজেকে সংযত রাখার অর্থই হচ্ছে তাকেও নির্মম ভাবে বঞ্চিত করা। এ কাজ মােটেই সঙ্গত নয়। কামজ্বালায় জর্জরিতা লেড়কিটিকে আমি এক ঝটকায় পালঙ্কের ওপর ফেলে দিলাম। আমরা উন্মাদের মাফিক ধস্তাধস্তি করতে করতে ক্রমে যেন এক অন্ধকার স্বপ্নাচ্ছন্ন লােকে তলিয়ে গেলাম। ব্যস, বিলকুল খতম। লেড়কিটি চার হাত-পা ছড়িয়ে পালঙ্কের ওপর চিৎ হয়ে পড়ে রইল। আমার মধ্যেও কেমন অবসন্ন ভাব ক্রিয়া করতে শুরু করল।

কারাে মুখেই রা নেই। কামরার মধ্যে অখণ্ড নীরবতা বিরাজ করতে লাগল, আর উভয়ের ফুসফুস নিঙড়ে বেরিয়ে আসা হাঁসফাসানি থেকে থেকে নীরবতা ভঙ্গ করতে লাগল। সকাল হ’ল। চোখ মেলে তাকালাম। আমরা উভয়েই বিবস্ত্র। লেড়কি লতার মাফিক আমাকে জড়িয়ে, একদম লেপ্টে রয়েছে। তার চোখে মুখে রাত্রের সেকাম তৃষ্ণা অস্তৰ্হিত। সে-জায়গা দখল করেছে অনাবিল প্রশান্তি আর পরিপূর্ণ তৃপ্তির ছাপ।

লেড়কিটি তার ডাগর ডাগর চোখ দুটো মেলে তাকাল।

সে আমাকে চুম্বন করে ভাবাপ্লুত কণ্ঠে বলে উঠল--মহম্মদ আলী, তােমার শরীরে তাগদ আছে বটে! রাতভর লদকালদকি করে আমার গায়ে গতরে বিষের মাফিক ব্যথা ধরিয়ে দিয়েছ, মালুম হচ্ছে, শরীরের হাড়গােড় গুঁড়াগুড়া হয়ে গেছে!

আমি তাকে ফিন জড়িয়ে ধরলাম। সে এবার আমার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে লাগল।

মেহেবুব আমার, আমার কুমারীত্ব আজ তােমাকে সঁপে দিয়ে সার্থকতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। ইতি পূর্বে আমি ভুলেও কোন পুরুষের সংস্রবে যাই নি। তুমি আমার জিন্দেগীর প্রথম মেহেবুব, প্রথম মহব্বৎ।

‘আমার জিন্দেগীরও তুমিই প্রথম লেড়কী, প্রথম মেহেবুবা।

তােমার কাছেই আমি মহব্বতের প্রথম পাঠ নিলাম।

–লেকিন আমি কে? আমার পরিচয়ই বা কি, কিছুই তাে জানতে চাওনি? আমাকে কি তুমি ভেবে নিয়েছ, বাজারের এক বােরখাপরা গণিকা? হাত বাড়ালেই আমাকে মিলতে পারে ? দিনার ঢাললেই বুকে পাওয়া যায়? নইলে পর্দার আড়ালে যে সব বিবি তার মরদের অনুপস্থিতির সুযােগে জোয়ান মরদকে দিয়ে কামজ্বালা নেভায়—তাদেরই কোন জেনানা ? আল্লাহর কসম, আমাকে সেরকম কিছু ভাবলে কিন্তু আমার প্রতি অবিচারই করা হবে। স্বেচ্ছায় তােমাকে কামরায়, পালঙ্কে ডেকে আনলাম বলে কিন্তু আমাকে ছােট করে দেখােনা মেহেবুব। আমার আব্বার নাম ইয়াহিয়া ইবন খলিদ আল-বারসাকী। খলিফার উজির জাফর এর ছােটা বহিন আমি। কোন দিক থেকেই আমি ফেলনা নই।

লেড়কিটির পরিচয় পাওয়া মাত্র আমার কলিজা শুকিয়ে আসতে থাকে। বুকের ভেতরে কামারের হাফরের দাপাদাপি শুরু হয়ে যায়। সদ্যকৃত কর্মের জন্য অনুতাপ জ্বালায় দগ্ধ হতে থাকি।

আমার ফুসফুস নিঙড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল, ইয়া খােদা! এ কী ভয়ঙ্কর কাজে আমাকে লিপ্ত করলে ! তার ডাকে কেন এমন হন্যে হয়ে ছুটে আসতে গেলাম! এক লহমায় আমি এমন খানদানি পরিবারের ইজ্জৎ ধুলিস্যাৎ করে দিলাম! এ গুস্তাকীর কি মাফ আছে? এ-গুনাহ কোথায় রাখি! আমাকে দিয়ে তুমি এ কী করালে খােদা!

আমি উন্মাদের মাফিক চিল্লিয়ে উঠলাম--‘তুমি কেন আমাকে এখানে আসার জন্য প্রলােভন দেখালে? কেন আমাকে ডেকে আনলে? আমি তাে নিজে থেকে আসতে চাই নি। আমার তাে কোন দোষ নেই—কোনই গলতি নেই। তুমিই আমাকে এ-পথে নিয়ে এসেছ। তােমার ইচ্ছাতেই—'

লেড়কিটি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হেসে বলল—“কই, আমি তাে তােমাকে দোষারােপ করছি না। আমি তােমাকে পেয়ার করি। তােমাকে শাদী করব--সাফ বাৎ। এবার তুমি বরং বল, আমাকে শাদী করে ঘরে তুলতে তােমার আপত্তি আছে?

আমি যেন একদম আসমান থেকে জমিনে পড়লাম। ছানাবড়া হয়ে যাওয়া চোখ দুটো মেলে তার দিকে তাকিয়ে বললাম -শাদী? তােমাকে শাদী না, আপত্তি থাকবে কেন? লেকিন তুমি কি নিজে তােমার শাদীর বন্দোবস্ত করতে পার ?

—“আলবাৎ পারি। আমিই আমার মালিক। শুধু তুমি বল, আমাকে শাদী করতে রাজী কি, না?

—“আমি তাে বললামই রাজী। আলবৎ রাজী।

সব বন্দোবস্ত পাক্কা। কাজী হাজির হ’ল। শাদীর কবুলনামা তৈরী হয়ে গেল। সাক্ষীরা দস্তখৎ করল। আমাদের শাদীর পাট চুকে গেল। আমরা সেদিন সে-কামরায় আশ্রয় নিলাম। দলন, পেষণ, চুম্বন ও সম্ভোগ পুরােদমে চলতে লাগল। আমার চোখের সামনে দুনিয়াটি হরেক কিসিমের বাহারী ফুলে ভরে উঠল।

আমরা বাসর-শয্যা দিল ভরে উপভােগ করতে লাগলাম।

এমন সময় প্রাসাদ সংলগ্ন উদ্যানে পাখিদের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

তিন শ’ আটানব্বইতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ বললেন, জাহাপনা, নকল খলিফা মহম্মদ আলী তার কিসসা বলে চলেছে—সে-রাত্রির স্মৃতি আজও আমার চোখের সামনে যেন পটে আঁকা তসবীরের মাফিক ভাসছে।

শাদীর পর আমরা এক সঙ্গে খুশী-আনন্দে পুরাে একটি মাস গুজরান করে দিলাম। মুহূর্তের জন্যও আমরা উভয়ে উভয়কে চোখের আড়াল করতে পারি নি। কেবল রাত্রেই নয়, দিনেও আমরা পরস্পরের আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে পড়ে থাকতাম। আমার দোকান পাট বিলকুল শিকেয় উঠেছে। খদ্দের পত্র আর মহাজনের সঙ্গে পুরােপুরি সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেললাম। আমার একমাত্র সম্বল হয়ে দাঁড়াল আমার বিবি, শাদী করা বিবি।

এক সকালে, আমার বিবি আমাকে বলল—“আমি হামামে যাচ্ছি। গােসল করতে দিল চাইছে। লেকিন মেহেবুব, এতক্ষণ তাে তােমাকে চোখের আড়ালে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

আমি তাকে চুম্বন করে বললাম—‘আমার হালৎ-ও একই রকম, তুমি হামামে যাবে আর আসবে। একদম দেরী করবে না। আমি তােমার অধীর প্রতীক্ষায় থাকব।

আমার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে সে বলল--মেহেবুব, আমি যাব আর আসব। হামাম থেকে ফিরে এসে তােমাকে যেন ঠিক এখানটিতেই দেখতে পাই।

আমি ঘাড় কাৎ করে সম্মতি জানালাম।

আমার বিবি গােসল করতে হামামে চলে গেল। পরমুহুর্তেই এক বুড়ি কামরায় ঢুকে এল।

বুড়ি আমাকে সালাম জানিয়ে বলল-“হুজুর, খলিফার প্রধান বেগম জুবেদা আপনাকে তলব করেছেন। জরুরী তলব। আপনি এখনই আমার সঙ্গে চলুন। 

‘আমার বিবি হামামে গেছে। সে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমার এক পাও এখান থেকে নড়ার উপায় নেই।

বুড়ি চোখ দুটো কপালে তুলে বলে উঠল—সে কী হুজুর, আপনি তবে যাচ্ছেন না! কী ভয়ঙ্কর বাৎ! বেগম জুবেদার কানে এবাৎ উঠলে আপনার গর্দান যাবে, জানেন?

—“জানি। কেবল আমিই নই, তামাম দুনিয়ার সবাই জুবেদার জেদের খবর রাখে। একবার জবান দিয়ে কোন বাৎ উচ্চারণ করলে তা তিনি পালন করে তবে ছাড়বেন। লেকিন, আমি আমার বিবির কাছে কসম খেয়েছি, সে হামাম থেকে ফিরে না আশা পর্যন্ত আমি এখানেই থাকব।

—“হুজুর, নিজের বিবির দিমাক যে করেই হােক ঠাণ্ডা করতে পারবেন। লেকিন বেগম জুবেদা ক্ষুব্ধ হলে জিন্দেগী বরবাদ করে ছাড়বেন। আমার যা বলার, বললাম, এবার আপনার মর্জি মাফিক কাম করুন। আপনি গেলে সঙ্গে করে প্রাসাদে নিয়ে যাব। নইলে একা ফিরে গিয়ে আপনার মতামত বেগমের কাছে পেশ করব।

বুড়ির বাৎ শুনে আমার কলিজা পর্যন্ত শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবার জোগাড় হ’ল। হাঁটু কাঁপতে লাগল। কাপা কাঁপা গলায় বললাম ঠিক আছে, তবে যাওয়াই যাক।

বুড়ি আমাকে নিয়ে খলিফার প্রাসাদের অন্দর মহলে গেল। বেগম জুবেদা আমাকে মুচকি হেসে সাদর সম্ভাষণ জানালেন। কুরশি। দেখিয়ে বসতে বললেন।

আমি কাঠের পুতুলের মাফিক জড়ােসড়াে হয়ে বসে রইলাম।

বেগম জুবেদার কণ্ঠস্বর কানে যেতেই সচকিত হয়ে তাকালাম। তিনি বললেন-“কি গাে ভালমানুষ, তুমিই তাে উজিরের বহিনের পিয়ারের আদমি, ঠিক কিনা?

-“আমি আপনার গােলামের গােলাম বেগম সাহেবা।

-“বহুৎ আচ্ছা! ওরা তবে তােমার ব্যাপারে যা সাচ্চা তা-ই বলেছে ,যেমন তােমার সুরৎ তেমনি মধুর কণ্ঠস্বর। চলাফেরা কথা বলার ঢঙ-ও তাে মনলােভাই দেখছি। তােমাকে দেখে, বাৎচিৎ বলে বহুৎ খুব খুশী হয়েছি। একটি গান শােনালে আমি আরও খুশী হ'ব।

বেগম সাহেবার হুকুম। গানা সেরকমই জানি, গাইতেই হ’ল। গর্দানটি বাঁচাতে হবে তাে। বেগম জুবেদা আমার সুরৎ, আদব কায়দা ও গানার বহুৎ তারিফ করলেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন-“যাও, এবার তােমার ছুটি। তােমার জান, তােমার কলিজার সমান বিবি হয়ত হামাম থেকে ফিরে তােমাকে না দেখে বেহুঁস হয়ে পড়েছে। হয়ত ভাবছে, আমি তার নাগরকে ছিনিয়ে এনেছি।  

আমি প্রাসাদে ফিরে দেখি, আমার বিবি মুখ ভার করে বসে। আমার ডাকে সাড়া দিল না। আমি এগিয়ে গিয়ে তাকে আদর সােহাগ করার কোশিস করলাম।

সে তড়াক করে এমন এক লাথি মারল যে, আমি ছিটকে গিয়ে দেয়ালে আছাড় খেয়ে পড়লাম।

সে গর্জে ওঠে—‘বেহায়া, বেশরম, বেতমিস কঁহিকার! তুমি প্রবঞ্চক! মহব্বৎ তােমার জন্য নয়। মহব্বতের মর্যাদা তােমার বিলকুল জানা নেই। তুমি আমার কসম ভুলে জুবেদার কলিজা ঠাণ্ডা করতে গিয়েছিলে, তাই না? খােদার কসম তােমার মাফিক বেইমানের সঙ্গে আমি আর ঘর করতে নারাজ। জুবেদাকে গিয়ে খুব করে শুনিয়ে দিয়ে আসব, অন্য জেনানার নাগরের দিকে তার এত নজর কেন!'

কথা বলতে বলতে সে করতালি দেয়। ব্যস, চোখের পলকে উন্মুক্ত তরবারি হাতে নিগ্রো সাবাব কামরায় এল। আমার বিবি গর্জে উঠল—এই বেইমানের গর্দান চাই। যাও, হুকুম তামিল কর।'

নিগ্রো সাবাব এগিয়ে এসে ঝট করে আমাকে ধরে ফেলল।| কালাে কাপড় দিয়ে আমার চোখ বেঁধে দিল।।

আমি তখন কি করব। কি-ই বা বলব, ভেবে পাচ্ছিলাম না।

এমন সময় পূব আকাশে রক্তিম ছােপ প্রকাশ পেল। ভােরের পূর্বাভাষ, বেগম কিসসা বন্ধ করলেন।

তিন শ’ নিরানব্বইতম রজনী 

খুবসুর নওজোয়ান নকল খলিফা তার কিসসা বলে চলেছেন—আমার বিবির হুকুমের ব্যাপারটি প্রাসাদের সর্বত্র বাতাসে চাউর হয়ে গেল। ব্যস, প্রাসাদের যত দাস দাসী, নােকর নােকরাণী যত ছিল সবাই এসে আমার বিবির পায়ে পড়ে আমার জান রক্ষার জন্য অনুরােধ করতে লাগল। কারণ, গত এক মাহিনায় তারা সবাই আমার আচরণে মুগ্ধ হয়েছিল।

-“আমার বিবির দিল কিছুটা গলল। বলল-“তােমাদের অনুরােধে একে জানে খতম করব না। লেকিন এমন শাস্তি দেব যাতে জিন্দেগীতে ভুলতে না পারে। জুবেদার ডাকে যেন আর নেড়ি কুত্তার মাফিক ছুটে না যায় সে বন্দোবস্ত করে দেব।

আমার বিবির হুকুম তামিল করতে নিগ্রো -সাবাৰ তরবারি ফেলে চাবুক তুলে নেয়। সপাংসেপাং শব্দে আমার ওপর চাবুকের ঘা পড়তে লাগল। কম-সেকম পাঁচ শ’ চাবুকের ঘা পড়ল আমার গায়ে। চামড়া কেটে খুন ঝরল বহু জায়গায়।

এবার আমাকে কাঁধে তুলে পথের ধারের জঞ্জালের চৌবাচ্চায় ছুড়ে ফেলে দিল।

রাতভর সেখানে পচা গন্ধের মধ্যে পড়ে কাৎরালাম। ভােরের আগে, পথে আদমি চলাচল শুরু হবার আগে কাৎরাতে কাৎরাতে কোন রকমে হামাগুড়ি দিয়ে, কখনও বা বুকে হেঁটে আমার নিজের প্রাসাদে ফিরে এলাম।

কদিন বেহুঁস হয়ে খােদার ওপর ভরসা করে পড়ে রইলাম বিছানা আঁকড়ে। কোন রকমে জান রক্ষা পেল। একমাত্র তারই দোয়াতে কোনরকমে টিকে গেলাম।

আমি ফিন দোকানে গিয়ে বসলাম। লেকিন আমার বিবির ভুল বােঝাবুঝির ব্যাপারটিকে দিল থেকে মুছে ফেলতে পারছিলাম না। হরবখত একই চিন্তা আমার মাথার চারদিকে চক্কর মারতে লাগল। ব্যাপারটিকে দিল্ থেকে মুছে ফেলার ফিকির খুঁজতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত দোকান বেচে দিয়ে চারশ’ নফর-নােকর খরিদ করে ফেললাম, তাদের নিয়ে হররাত্রে টাইগ্রীসে নৌকা বিহার করতে লাগলাম। দিল হাল্কা হ’ল। আর নকল খলিফা সেজে এ-প্রাসাদে আসর জমিয়ে নিজেকে চাঙা করতে লাগলাম। আমার বিবির সে আচরণ দিল থেকে বিলকুল উধাও হয়ে গেল।

আজ রাত্রে আপনারা সঙ্গদান করায় নতুন খুশীতে দিল্ চাঙা হয়ে উঠেছে।

নকল খলিফার কিসসা শুনে খলিফা হারুণ-অল-রসিদ চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—“খােদাতাল্লাই একমাত্র ভরসা। তার মর্জি মাফিকই আদমির নসিব নির্ধারিত হয়। আমাদের কার নসিবে যে কি লেখা আছে তা একমাত্র তিনিই জানেন।

খলিফা এবার উজির জাফর আর দেহরক্ষী মাসরুর’কে নিয়ে প্রাসাদে ফিরে এলেন।

পথে আসতে খলিফা বললেন—“জাফর, ওই নওজোয়ানের নসিবের ফেরের জন্য কোন্ জেনানাটি দায়ী, বল তাে?”

—জাঁহাপনা, আমার কাহিনীই এর জন্য একমাত্র দায়ী। তার ভুল বােঝার জন্যই নওজোয়ানটির জিন্দেগী বরবাদ হতে চলেছে উজীর জাফর বললেন।

সকাল হ’ল। খলিফা দরবারে হাজির হলেন। জাফর’কে তিনি বললেন-“কাল রাত্রের সে নওজোয়ানটিকে দরবারে হাজির কর।

নওজোয়ান নকল খলিফা দরবারে এলেন।

খলিফা নিজের তখতের পাশের এক কুর্শিতে তাকে বসালেন। এবার জিজ্ঞাসা করলেন-তােমাকে কেন তলব করেছি, শুনেছ বা অনুমান করতে পারছ? গত রাত্রে তিনজন ভিনদেশী সওদাগরকে তােমার জিন্দেগীর করুণতম কিসসা নাকি শুনিয়েছিলে, ইয়াদ আছে তাে? আজ আমি তােমার মুখ থেকে সে-করুণতম কাহিনী শুনতে চাই, নাও, শুরু কর। নওজোয়ানটি আমতা আমতা করে বললেন—“জাঁহাপনা, আমি কিস্সাটি বলার আগে আপনার কাছ থেকে অভয় প্রার্থনা করছি।

খলিফা তার দিকে একটি অভয়-রুমাল ছুঁড়ে দিলেন, এবার তিনি গত রাত্রের কিসসাটি সবিস্তারে তার কাছে ব্যক্ত করলেন।

কিসসা শেষ হলে খলিফা বললেন সাচ্চা বাৎ বলবে, তােমার বিবির জন্য এখনও কি তুমি আগ্রহী? তাকে ফিরে পেতে তােমার দিল্ চায়? সে তােমার প্রতি যে নিষ্ঠুর আচরণ করেছে তাকে দিল থেকে মুছে ফেলে ফিন কাছে টেনে নিতে পারবে?

—“জাহাপনা, এ ব্যাপারে আপনি যে বন্দোবস্ত করবেন তাই আমি সানন্দে মেনে নেব।

খলিফার নির্দেশে জাফর তার বহিনকে হাজির করলেন।

খলিফা তাকে বললেন—‘আমার সম্মানীয় আমীর ইয়াহিয়ার লেড়কি তুমি, এ নওজোয়ানকে চেন কি ?

লেড়কিটি এক নজরে নওজোয়ানটিকে দেখে শরমে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

খলিফা বললেন—“শােন, ভুলচুক যা ঘটে গেছে তাকে আর ফেরানাে যাবে না। আমার ইচ্ছা তােমরা ফিন ঘর বাঁধ। আমি ঘটা করে তােমাদের শাদী দেব। তুমি রাজী তাে ?

–‘জাঁহাপনা, আপনার হুকুম শিরােধার্য। আপনার বিচার অনুযায়ী কাজ হবে।

কাজী এলেন। শাদীর কবুলনামা বানানাে হ’ল। সাক্ষীরা দস্তখৎ করল। শাদীর পর্ব মিটে গেল ।

খলিফা নওজোয়ান মহম্মদ আলীকে নিজের আমীরের পদে বহাল করলেন। কিসসা টি শেষ করে বেগম শাহরাজাদ চুপ করলেন।

রােশন আর গুলাবীর কিসসা

বেগম শাহরাজাদ নতুন একটি কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাহাপনা, ভাের হতে এখনও ঢের দেরী। আমি এবার আপনাকে ‘রােশন আর গুলাবীর কিসসা' নামে আর একটি ছােট্ট অথচ চটকদার কিসসা শোনাচ্ছি

কোন এক সময়ে এক দোর্দণ্ড প্রতাপশালী বাদশাহ রাজত্ব

( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments