সহস্র এক আরব্য রজনী পার্ট ১৩০ ( Sahasra Ek Arabya Rajani Part 130)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।

খুবসুরৎ লেড়কিটি মিষ্টি-মধুর স্বরে জবাব দিল—“লহরা। জাহাপনা, লহরা নামে সবাই আমাকে ডাকে। ‘বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা নাম তাে। তােমার গান শুনতে আমার দিল আকুল। তুমি একদম একা গাইবে?’

লহরা গানা ধরল।

তার গানার সারমর্ম আমার এই যে কোমলতা আর চপল চাপল চাহনি, আমার এই ক্ষীণ কটিদেশ, যারা এসবের জন্য লব্ধ হয়ে ছুটে আসে আমি তাদের একদম বিশ্বাস করিনা। তিলমাত্র বিশ্বাসও আমি তাদের করি না। কিন্তু মহব্বত যদি বিদায় নেয় তবে যে আমি মােমের মাফিক গলে যাব। ধূপ-ধূনার খুসবুতে দিলকে মাৎ করে দেব। আমি শুকতারার মাফিক, আশমানের শুকতারার মাফিক জ্বলব। মহব্বতে দিল ভরপুর করে দেব। আর কেবলমাত্র মহব্বতের গানই গাইব।

গানা শেষ হলে খলিফা অল-মামুন উচ্ছসিত আবেগের সঙ্গে বলে উঠলেন—বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা তােমার কণ্ঠের কাজ। একটি বাৎ তােমাকে জিজ্ঞেস করছি লহরা । 


-বলুন, কি আপনার জিজ্ঞাস্য? আমি সাধ্যমত আপনার প্রশ্নের জবাব দেব জাঁহাপনা।

-যে-গানাটি তুমি এই মাত্র গাইলে সেটি কার লেখা, বল তাে?

–‘গানাটি অমর ইবন মাদি করিব অল-জুবাইদীর। আর গানটির সুর দিয়েছেন বিখ্যাত গায়ক মাবিদ।

লেড়কিটি এবার যথােচিত ভঙ্গিতে খলিফাকে কুর্নিশ করে কামরা ছেড়ে চলে যায়।

খলিফা এবার ঘাড় ঘুরিয়ে অন্য একটি লেড়কির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন। তার সুরৎ সবচেয়ে বেশী আকর্ষণীয়। এক নজর দেখলেই দিল কেড়ে নেয়। খলিফার আগ্রহে সে-ও একটি গানা গাওয়ার জন্য তৈরী হয়ে বসল। এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

তিন শ’ নব্বইতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ আবার কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা খলিফা অল-মামুন-এর হুকুমে লেড়কিটি গানা শুরু করল। তার গানার মর্মার্থ হ’ল—আমি নির্ভীক, উত্তাল, উদ্দাম, উচ্ছল মক্কার বনবালা। কোন শিকারীই আমাকে তীরবিদ্ধ করতে সক্ষম হয় না। যারা আমাকে পাবার জন্য আগ্রহান্বিত হয়ে ছুটে আসে, বিফলকাম হয়, তারাই আমার কসুর খোজায় লিপ্ত হয়। কিন্তু তারা মুখে যা-ই বলুক না কেন, মনে মনে অবশ্যই স্বীকার করে নেয় আমার মাফিক কে-ই বা কালাে আর চপল চোখের অধিকারী?

কণ্ঠস্বরে অত্যুগ্র আগ্রহ আর কৌতূহল প্রকাশ করে খলিফা লেড়কিটিকে জিজ্ঞাসা করলেন—বল তাে গানাটির রচয়িতা কে? আর সুরই বা কে দিয়েছেন?

‘গানাটির রচয়িতা জাবির। আর এতে সুরারােপ করেছেন বিখ্যাত গায়ক সুরেজ।

—বহুৎ আচ্ছা!' লেড়কিরা নতজানু হয়ে খলিফাকে কুর্নিশ করে বিদায় নিল।

এবার আরও দশটি খুবসুরৎ লেড়কি নিজ নিজ বাদ্যযন্ত্র হাতে কামরায় প্রবেশ করল। তাদের প্রত্যেকের পরনে গাঢ় লাল মখমলের-কামিজ।

খলিফা তাদের মধ্যে যার সুরৎ সবচেয়ে বেশী চোখে ধরার মাফিক তাকে জিজ্ঞাসা করলেন—“তােমার কি নাম বল তাে?

—জাঁহাপনা, আমার নাম রসজানি। –তােমার কণ্ঠের একটি গান শুনতে আমার দিল্ চাইছে।

লেড়কিটি সুললিতকণ্ঠে গানা ধরল। তার কণ্ঠ আর গানার সুর দিলকে একদম পাগলা করে দেবার মতই বটে। লেড়কিটির গানার মর্মার্থ হ’ল—“আভরণের রঙে কি আসে যায় ? তার রঙ লাল, নীল, সাদা বা হলুদ যা-ই হােক না কেন তা দিয়ে মাথা ঘামাবার জরুরতই বা কি? সব লেড়কি তাদের সমান দাম দিয়ে থাকে। হর রাত্রির শেষে বিছানার ধারে যদি সে এমন কিছু পড়ে থাকতে দেখে তবে তাে তার কাছে এর চেয়ে বেশীকরে চাওয়ার আর কিছুই থাকে না।

খলিফা অত্যুগ্র আগ্রহ প্রকাশ করে বললেন—কে গানটি রচনা করেছেন, জান? সুরই বা কে দিয়েছেন, বল তাে?

–‘গানাটির রচয়িতা আদি ইবন্ জাইদ। আর সুরকার ? সুপ্রাচীন গানা। সুরকারের নাম জানা সম্ভব হয় নি।

খলিফার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লেড়কির দল কামরা ছেড়ে গেল।

এবার ফিন আর একদল লেড়কি বাদ্যযন্ত্র নিয়ে কামরায় হাজির হ’ল। এদের সবার সােনালী মখমলের সালােয়ার-কামিজ গায়ে। আর সবার সুরও একদম বুকে ধাক্কা মারে। চোখ দুটিকে বিলকুল চঞ্চল করে তােলে।

এবারের দলের মধ্যে সবচেয়ে সুরৎ যার বেশী সে লেড়কিকে উদ্দেশ্য করে খলিফা বললেন—“তােমার কণ্ঠের একটি গানা শুনতে চাই। গাও তাে শুনি, তােমার গান আমার দিলে কেমন দাগ কাটতে পারে?

লেড়কিটি যে গানটি গাইল তার মর্মার্থ হল—“রক্তিম গুলাবের সরাব আমি। নির্লিপ্ত নেশার ঘােরে আমি বেহুশ হয়ে পড়ে থাকি। এতে কী যে সুখানুভূতি কি দিয়ে আমি বুঝাব? আমি মহব্বতের ভিখমাঙ্গা। উদাস-ব্যাকুল দিল নিয়ে আমি হরদম সাথে সাথে ঢুঁড়ে বেড়াই।

লেড়কিটি গান শেষ করলে খলিফা উচ্ছসিত আবেগের সঙ্গে বলে ওঠেন—বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা! এবার লেড়কিটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলে উঠলেন—এবার বল তাে গানটির রচয়িতা কে? কে ই বা এতে সুরারােপ করেছেন, জান নিশ্চয় ?

–‘জী জাঁহাপনা, গানটি রচনা করেছেন কবিবর আবুনবাস। আর এতে সুরারােপ করেছেন ওস্তাদ ইশাক। খলিফার নির্দেশে লেড়কিরা কুর্নিশ সেরে বিদায় নিল। খলিফা এবার গৃহকর্তা আলী’কে তলব করে বললেন—‘আলী’এবার যে আমাকে বিদায় নিতেই হয়। তােমার এখানে এসে এমন আচ্ছা একটি সন্ধ্যায় দিলকে গানার সাগরে ডুবিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। বহুৎ দিন এমন সুযােগ আসে না। খলিফা এবার সরাবের পেয়ালাটি হাত থেকে নামিয়ে রেখে ওঠার উদ্যোগ নিলেন। আলী এগিয়ে এসে বললেন—“সে কী জাঁহাপনা, এখনই উঠেছেন আর একটি লেড়কিকে আপনার সামনে হাজির না করলে আমার দিল ভরবে না, দুঃখ থেকে যাবে। আমার মকানের বাঁদীদের মধ্যে তার সুরৎ-ই যে সবচেয়ে বেশী। সুশিক্ষিতা, মার্জিত স্বভাবও বটে। নগদ দশ হাজার সােনার মােহর দিয়ে তাকে খরিদ করেছিলাম। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস, তার সুরৎ আপনার দিলকে নাড়া দেবে। যদি আমার বাৎ সাচ্চা না হয় তবে আমি তাকে আমার মকান থেকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেব।'

খলিফা গাত্রোখান করতে গিয়েও ফিন বসে পড়লেন। ঠোটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বললেন—“বহুৎ আচ্ছা তবে তাকে হাজির কর, এক নজর দেখেই যাই।

গৃহকর্তার ইঙ্গিত পেয়ে চাদের টুকরা পূর্ণ উদ্ভিন্ন যৌবনা লেড়কি কামরায় প্রবেশ করল। তার সুরতের জৌলুসে আচমকা ফেন কামরাটি অত্যুজ্জ্বল আলােকচ্ছটায় ঝলমলিয়ে উঠল।

লেড়কিটি কামরায় পা দেয়ামাত্র খলিফার চোখ দুটো যেন হঠাৎ স্থির হয়ে গেল। লেড়কিটির মুখ থেকে চোখের মণি দুটোকে যেন সরানােই তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ল।

খলিফার ভাইয়া আবু ইসার আকস্মিক চাঞ্চল্যটুকু তার নজর এড়াল না। তিনি সরাবের পেয়ালায় ঘন ঘন চুমুক দিয়ে চলেছেন। আর তার শ্বাসক্রিয়া ঘনতর হয়ে উঠেছে, কপালে দেখা দিয়েছে স্বেদবিন্দু। দেহের খুন বুঝি নিঃশেষে মুখে এসে জমা হয়েছে। তার হালৎ দেখে খলিফার মধ্যে গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ পেল। তিনি ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন--“কি? কি হয়েছে আবু?

আবু ইসা-র গলা দিয়ে রা সরছে না, কোন্ অদৃশ্য হাত যেন সজোরে তার কণ্ঠ চেপে ধরেছে। আর চোখ দুটো? লেড়কিটির সুরতের ফাঁদে আটকা পড়ে গেছে।

খলিফা সবিস্ময়ে বললেন,—“কি ব্যাপার আবু, লেড়কিটির সঙ্গে কি তােমার আগেই জান পরিচয়—আলাপ টালাপ ছিল?

আবু আমতা আমতা করে জবাব দেয়—না, আলাপ ছিল না। কিন্তু আশমানের চাঁদ কার না চেনা জাহাপনা!’ 

খলিফা এবার খুবসুরৎ লেড়কিটির দিকে চোখ ফেরালেন। তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কি নাম তােমার, বল তাে?

-“জাহাপনা, আমার নাম সুরমা। কুর্ণিশ করে লেড়কিটি জবাব দিল।

-তােমার একটি গান শােনার জন্য আমার দিল চঞ্চল। একটি গান গাও তাে সুরমা। খলিফার নির্দেশে সুরমা গানা ধরল। তার গানার মর্মার্থ হ’ল—ওগাে আমার দিলের মালিক, ওগাে আমার মেহবুব, তুমি কী নির্মম নিষ্ঠর! তােমার কলিজাটি কি পাথর দিয়ে বানানাে হয়েছে? লেকিন আমি ভালই জানি, তােমার দিল প্রস্ফুটিত কুসুমের মাফিক খুসবুতে ভরপুর। 

গানা শেষ হলে খলিফা করতালি দিয়ে উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে বলে উঠলেন—বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা! এবার বলতো গানাটির রচয়িতা কে? কে-ই বা এতে সুরারােপ করেছেন?

জাঁহাপনা গানাটির রচয়িতা থুজাই। আর সুরদান করেছেন বিখ্যাত গায়ক জুরজুর।

আলি গােড়া থেকেই আবুর মুখের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে তার ব্যাপার স্যাপার লক্ষ্য করছিল। সে সুরমা’কে দেখা ইস্তক অব্যক্ত যন্ত্রণায় ছটফট করে চলেছে।

খলিফা নীরব হলে আলী বলল—“ভাইয়া আবু, তুমি আজ আমার সামনে মেহমান হয়ে এসেছ। তুমি খুশী না হলে আমার গুনাহ হবে, সন্দেহ নেই। সুরমার জন্য তুমি মর্মপীড়া বােধ করছ, আমার মালুম হচ্ছে। আমি সুরমা’কে তােমাকেই অর্পণ করছি। আশা করি, একে নিয়ে ঘরবেঁধে তুমি খুশী-আনন্দে ভবিষ্যৎ জীবন গুজরান করতে পারবে। তুমি একে গ্রহণ কর ভাইজান।

খলিফা মামুনও সানন্দে অনুমতি দিলেন।

আবু তার বহু আকাঙিক্ষত খুবসুরৎ লেড়কিটিকে নিয়ে খুশীতে ডগমগ হয়ে প্রাসাদে ফিরলেন। কিসসাটি শেষ করে বেগম শাহরাজাদ খলিফার আজব কীর্তি নামক আর একটি কিসসা শুরু করলেন।

নকল ও আজব খলিফার কিসসা

বেগম শাহরাজাদ বললেন—‘জাহাপনা, এক রাত্রে খলিফা হারুণ অল রসিদ নিদারুণ অস্বস্তির মধ্যে রাত্রি গুজরান করছিলেন। নিদ আসা তাে দূরের কথা কিছুতেই দু’চোখের পাতা এক করতে পারছিলেন না।

প্রায় মাঝ রাত্রি পর্যন্ত পালঙ্কে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করে অস্থিরচিত্ত খলিফা এক সময় বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন। উজির জাফর’কে নিয়ে রাস্তায় পায়চারি করে সময় কাটাবার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। খলিফার পরনে সওদাগরের ছদ্মবেশ। আর বৃদ্ধ উজিরও বণিকের ছদ্মবেশে নিজেকে সাজিয়ে নিয়েছেন।

উজির জাফর খলিফাকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে টাইগ্রীস নদীর তীরে হাজির হলেন।

এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসা বন্ধ করলেন।

তিন শ’ বিরানব্বইতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ কিস্সাটির পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন, ‘জাহাপনা, খলিফা হারুণ-অল-রসিদ জাফর’কে নিয়ে নদীর ঘাটে এসে দেখেন ঘাটে একটি ছােট্ট নৌকা বাঁধা।

নৌকার বুড়াে মাঝি খানাপিনা সেরে বিছানা গােছগাছ করছে। খলিফা ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি করে মাঝিকে তুললেন। নৌকায় করে নদীতে একটু হাওয়া খাইয়ে আনার জন্য অনুরােধ করলেন।

বুড়াে মাঝি ঘাড় কাৎ করে খলিফার দিকে তাকিয়ে সবিনয়ে বলল, এ কী তাজ্জব শখ হয়েছে আপনার। বেছে বেছে আজ রাত্রেই টাইগ্রীসে হাওয়া খেতে দিল চাইছে হুজুর।'

-কেন? কোন অসুবিধা আছে?'

-অসুবিধা নেই আবার। আপনি কি কিছু জানেন না, আজ রাত্রে স্বয়ং খলিফা হারুণ-অল-রসিদ নৌকা বিহারে বেরিয়েছেন? কার গর্দানে কয়টি মাথা আছে যে, আজ রাত্রে টাইগ্রীসে নৌকা ভাসাবে।

খলিফা হারুন-অল-রসিদ বললেন—“খলিফা এখন নৌকা বিহার করছেন, তুমি নিশ্চিত জান কি?

—“তামাম বাগদাদ নগরের কে না জানে সাহাৰ, খলিফা নৌকা বিহার করছেন? তার সঙ্গে রয়েছে উজির জাফর, দেহরক্ষী মাসরুর আর দাসী-বাঁদী। গাইয়ে বাজিয়েরাও সঙ্গে রয়েছেন। ওই শুনুন সাহাব, খলিফার সহসচিব ফরমান জারি করছেন, কেউ যেন নদীতে নৌকা না ভাসায়। যে হুকুম অমান্য করবে তাকেই নৌকার মাস্তলে বেঁধে ফাঁসির দড়িতে ঝােলানাে হবে।'

মাঝির বাৎ শুনেই খলিফা চোখ দুটো কপালে তুলে বললেন—“জাফর, এ কেমন তাজ্জব বাৎ শুনছি! এরকম কোন ফরমান তাে আমি আদৌ জারি করিনি। আর গত এক মাসের মধ্যে ভুলেও আমি কোনদিন নৌকা বিহারে বেরােয় নি। এ তাে তাজ্জব ব্যাপার দেখছি!

বৃদ্ধ উজির জাফরও এরকম তাজ্জব ব্যাপারটি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়েন। তাজ্জব বলার মাফিক ব্যাপারই বটে। মাঝির হাতে দশটি দিনার দিয়ে বললেন, নৌকা খােল। ঝামেলা যদি হয় আমি দায়ী থাকব। নৌকাটি এমন এক আবডালে নিয়ে চল যেখানে থেকে তামাম নদীটি নজরে আসে লেকিন আমরা কারাে নজরে পড়ব না।' 

বুড়াে মাঝি দিনার দশটি ট্যাকে গুঁজে নৌকা ছাড়ল। তীর বেগে নৌকা চালিয়ে এক আবডালে নিয়ে নৌকাটি দাঁড় করাল।

এমন সময় বিশালায়তন একটি বজরা খলিফার নৌকার কাছে চলে এল। বজরাটির ভেতরে যেন হাজার বাতির রােশনাই। খলিফা ও জাফর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থেকে বুঝতে পারলেন, দাসী, বাঁদী ও নফর পরিবেষ্টিত হয়ে এক খুবসুরৎ নওজোয়ান সিংহাসনে বসে। পােশাক পরিচ্ছদ ও আদব কায়দা বিলকুল খলিফারই মাফিক। আর তার পাশে বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মরদটির সঙ্গে মাসরুর এর হুবহু সাদৃশ্য রয়েছে। খলিফা হারুণ-অল রসিদ-এর মধ্যে উত্তেজনা উত্তরােতর বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি চাপা অথচ উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলেন—“জাফর, আমার দিল বলছে, আমাদের খানদানেরই কোন নওজোয়ান। সম্ভবত হয় আল-মামুন নতুবা অলআমিন নির্ঘাৎ দুজনের একজন। আর পাশের আদমিটি কিন্তু বিলকুল তােমার মতই দেখতে। আর ওই যে বর্শা হাতে আদমিটি, ঠিক যেন আমার দেহরক্ষী মাসরুর। তাজ্জব ব্যাপার তাে?” 

বৃদ্ধ উজির বার বার এদিক ওদিক কাৎ হয়ে ব্যাপারটি ভাল ভাবে দেখে নিয়ে সবিনয়ে বলে উঠলেন—ইয়া খােদা! এযে বিলকুল একই রকম দেখতে! কোন ফারাকই তাে আমার নজরে পড়ছে না জাঁহাপনা।

আলাের রােশনাই নিয়ে ইয়া পেল্লাই বজরাটি ধীরে ধীরে খলিফার নৌকাটিকে পিছে ফেলে এগিয়ে যেতে লাগল। বুড়াে মাঝি যেন এবার ধড়ে প্রাণ ফিরে পেল। খােদা ভরসা, কেউ যে দেখতে পায়নি।

খলিফার হুকুমে মাঝি নৌকাটিকে ফিন ঘাটে নিয়ে দাঁড় করাল। খলিফা তীরে দাঁড়িয়ে বুড়াে মাঝিকে বললেন—ওহে, এরকম দৃশ্য কি তােমরা রােজ দেখতে পাও ? খলিফা কি রােজ রাত্রেই এদিকে নৌকা বিহার করতে আসেন, বল তাে?

—জী হুজুর। আপনার ধারণা বিলকুল সাচ্চা। খলিফা রােজরাত্রেই টাইগ্রীসে হাওয়া খেতে আসেন। তাই টাইগ্রীসের বুকে এরাত্রে নৌকা চালানাে বন্ধ। খলিফার ফরমান গত এক মাস যাবৎ জারি হচ্ছে।

এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

তিন শ’ চুরানব্বইতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ কিস্সাটির পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাহাপনা, খলিফা এবার বুড়াে মাঝিকে বললেন—আমরা ভিনদেশী মুসাফির। এসব ব্যাপার তাে মালুম ছিল না। তােমার কল্যাণে এ এক নয়া দৃশ্য দেখা বরাতে জুটল। আমরা কাল ফিন আসব। দশ দিনার বকশিস পাবে। আজকের মত একটু তকলিফ করে ব্যাপারটি দেখাবে কি?

–‘হুজুর, কাল ঘাটে নৌকা থাকবে। সময় মত চলে আসবেন।

খলিফা প্রাসাদে ফিরে গিয়ে অজ্ঞাত নকল খলিফার তাজ্জব ব্যাপারটি নিয়ে বাৎচিতের মাধ্যমে বাকি রাত্রিটুকু গুজরান করে দিলেন।

পরের রাত্রে খলিফা বৃদ্ধ উজির জাফর এবং দেহরক্ষী মাসরুরকে সঙ্গে নিয়ে অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে টাইগ্রীসের সে-ঘাটে আগের দিনের মত হাজির হলেন। বুড়াে মাঝি পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক ঘাটে নৌকা বেঁধে তীরে প্রতীক্ষায় বসে।

খলিফা উজির ও দেহরক্ষীকে নিয়ে নৌকায় উঠলেন। মাঝি বাতাসের বেগে নৌকা চালিয়ে আগের রাত্রের সে-নিরালা আবডালে হাজির হল। লগি পুতে নৌকাটি বেঁধে দিল। এবার চলল বাঞ্ছিত সে-বজরাটির জন্য অধীর প্রতীক্ষা।

আবছা অন্ধকারে, ফুরফুরে বাতাস বাহিত মিষ্টি মধুর সঙ্গীত লহরী আর নুপুরের রিনিঝিনি আওয়াজ তাদের কানে এল। দিলকে একদম উদাস-ব্যাকুল করে তুলল। অল্প সময় বাদেই নদীর একটি বিশাল ভগ্নাংশ আলােকরশ্মিতে ঝলমলিয়ে উঠল। বজরাটির হালৎ গত রাত্রের মতই। দাসী-বাঁদী পরিবেষ্টিত হয়ে তখতে বসে সুসজ্জিত এক খুবসুরৎ নওজোয়ান। গানাবাজনার মজলিস বসেছে।

খলিফা চোখ দুটোকে কপালে তুলে বললেন—“জাফর, এমন তাজ্জব দৃশ্য আমি নিজের চোখে না দেখলে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারতাম না। এমন কি নিজের চোখ দুটোর ওপরও যেন পুরােপুরি আস্থা রাখতে পারছি না।

খলিফা এবার নীরবে উঠে গিয়ে বুড়াে মাঝির হাতে আচমকা দশটি দিনার গুজে দিলেন।

বুড়াে মাঝি সবিনয়ে খলিফার মুখের দিকে তাকাল। তার চোখে মুখে জিজ্ঞাসার ছাপ।

খলিফা বললেন—মাঝি, দিনারগুলাে তােমাকে বকশিস স্বরূপ দিলাম। বিনিময়ে নৌকাটিকে ওই বজরাটির কাছাকাছি নিয়ে চল। তােমার কোন ভয় নেই। আমাদের নৌকা তাে অন্ধকারে রয়েছে। বজরার অত্যুজ্জ্বল আলােয় বসে কেউ আমাদের দেখতেই পাবে না। আরও কাছ থেকে ব্যাপারটি চাক্ষুষ করতে দিল চাইছে।

বুড়াে মাঝি নৌকা নিয়ে বজরার কাছাকাছি যেতে আপত্তিই করল। কিন্তু হাতের দিনারগুলাে তার দিলে উৎসাহের সঞ্চার করল। আন্ধারের বুক চিরে সাধ্যমত কম আওয়াজ করে নৌকাটিকে বজরার কাছাকাছি নিয়ে গেল। তারপর নিরাপদ দূরত্ব রেখে তাকে অনুসরণ করতে লাগল। কিছু সময় ধরে বজরাটি উত্তাল উদ্দাম টাইগ্রীসের বুক চিরে এগিয়ে গিয়ে বাগিচার ধারের ঘাটে নিয়ে ভিড়ল।

অজ্ঞাত পরিচয় খলিফা তার সঙ্গীদের নিয়ে বজরা থেকে নামলেন। এদিকে বুড়াে মাঝিও খলিফার নির্দেশে নৌকা থেকে কিছুদুরে আন্ধারে দাঁড় করিয়ে দেহরক্ষী মাসরুর-এর হাত ধরে অতি সন্তর্পণে খলিফা নৌকা থেকে নেমে এলেন।

এদিকে বজরাটি ঝলমলে আলােয় চারদিক উদ্ভাসিত করে এগিয়ে চলল বাগিচার দিকে।

খলিফাও তাঁর সঙ্গী উজির জাফর ও দেহরক্ষী মাসরুর’কে সঙ্গে নিয়ে তাদের অনুসরণ করতে লাগলেন।

এমন সময় পিছন দিক থেকে গম্ভীর কণ্ঠস্বর গর্জে উঠল—“হেই, খাড়া হাে যাও!’

( চলবে )

Post a Comment

0 Comments