আরব্য রজনী পার্ট ১২৮ ( Arabya Rajani Part 128)

গল্পের পরবর্তী অংশঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।

ভােরে আমি খুবসুরৎ লেড়কিটির কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় আমার বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস্ করতে লাগল। ভাবলাম আমার অনুপস্থিতির গুস্তাকী খলিফা নির্ঘাৎ মাফ করবেন না। কিন্তু খুবসুরৎ অতুলনীয় প্রতিভাসম্পন্ন লেড়কিটির ব্যাপারে বললে হয়ত এদফা কোনরকমে ব্যাপারটিকে সামাল দেয়া যাবে।।

আমি লম্বা লম্বা পায়ে ফিন লেড়কিটির কামরায় ফিরে গেলাম।

আমাকে ফিরতে দেখে লেড়কিটি চোখ দুটো কপালে তুলে ব’লে উঠল—“কি সাহাব, ঘুরে এলে যে?

আপনি তাে আমার কণ্ঠের গান শােনার জন্য বহুৎ উৎসাহ প্রকাশ করছিলেন। আপনার সাধ আমি পূর্ণ করতে পারি নি। হঠাৎ আমার এক ভাইয়ার কথা মনে পড়ে গেল। সে বহুৎ আচ্ছা গান গাইতে পারে। আপনি যদি অনুমতি করেন তবে আজ রাত্রে তাকে নিয়ে আসতে পারি। লেড়কিটি কৌতূহলী দৃষ্টি মেলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।


আমি এবার বললাম-“আজকেই শেষ। ভবিষ্যতে আর কোনদিনই আপনাকে বিরক্ত করতে আসব না। এমন সময়ে ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

তিনশ’ ছিয়াশিতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ বললেন—“জাঁহাপনা, গায়ক ইশাক কিসসা বলে চলেছেন—“আপনার দিমাক খারাপ হয়ে গেছে নাকি? আপনার ভাইয়াকে নিয়ে আসতে চাইছেন সে তাে খুশীর কথা। এতে আপত্তির তাে কিছুই থাকতে পারে না। নিয়ে আসবেন। তার গানা শুনে দিল ভরপুর করে নেয়া যাবে।

আমি লেড়কিটির সম্মতি পেয়ে কাঠের বাক্সটিতে বসলাম।

আমার মকানে ফিরে দেখি,খলিফার দূত দরওয়াজায় দাঁড়িয়ে। খলিফার জরুরী তলব। দরবারে হাজির হতেই খলিফার বিষাদপূর্ণ মুখ নজরে পড়ল। বাজখাই গলায় গর্জে উঠলেন—জানােয়ার কাহিকার। তােমার এত বড় বুকের পাটা! আমার হুকুম অগ্রাহ্য কর কোন্ সাহসে।

–‘জাঁহাপনা, গুস্তাকী মাফ করবেন। মেহেরবানি করে আগে আমার সব বাৎ শুনুন। তারপর যদি আমাকে কোতলও করেন, আপত্তি করব না।

–বাৎ? কি সে বাৎ? বল শুনি, কি বলতে চাও তুমি।

—“জাঁহাপনা, দরবারে, সবার সামনে বলার মত ব্যাপার নয়। একটু আড়ালে আবডালে বলতে চাই। " খলিফার নির্দেশে সঙ্গে সঙ্গে দরবার কক্ষ খালি হয়ে গেল। আমি দু'রাত্রের ঘটনা সবই খােলসা করে তাকে বল্লাম। আজ রাত্রে সে যে আমাদের পথ চেয়ে বসে থাকবে তা-ও বলতে ভুললাম না।

খলিফার মুখে হাসির ঝিলিক দেখা দিল। আমি শুধু বেকসুর খালাসই পেলাম না, তিনি নানাভাবে আমার কাজের তারিফ করতে লাগলেন।

সন্ধ্যার আন্ধার নামতে না নামতেই আমি খলিফার প্রাসাদে হাজির হলাম। দেখি, তিনি এক বণিকের ছদ্মবেশে নিজেকে সাজিয়ে নিয়ে আমার অপেক্ষায় বসে।

আমরা প্রাসাদ ছেড়ে বেরােলাম। পথে যেতে যেতে বললাম, ‘জাঁহাপনা, সেখানে গিয়ে লেড়কিটির কাছে কিন্তু ভুলেও আমার পরিচয় দেবেন না। তবে কিন্তু আমার ইজ্জৎ একদমচিলা হয়ে যাবে।

‘বহুৎ আচ্ছা। তােমার খুশী মাফিকই কাজ হবে। আমরা প্রাসাদটির সে প্রাচীরের কাছে পৌছােতে না পৌছাতেই কাঠের বাক্সটি নেমে এল। হাজির হলাম খুবসুরৎ সে লেড়কিটির কামরায়।

খলিফা বিস্ময় মাখানাে দৃষ্টিতে লেড়কিটির সুরতের সুধা পান করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। নিষ্পলক তার চাহনি। ব্যাপারটি আমার নজর এড়াল না।

খুবসুরৎ লেড়কিটি যখন তার কিন্নর কণ্ঠে গানা ধরল তখন তাে| খলিফার হালৎ একদম বে-সামাল হয়ে পড়ল। তিনি যেন দরিয়ায় পড়ে গেছেন। আমার অনুরােধ ভুলে গিয়ে অকস্মাৎ বলে উঠলেন

“করছ কী ইশাক। এমন সুন্দর চাদনী রাত, এমন মনলােভা পরিবেশ বিলকুল বরবাদ করে দিচ্ছ ইশাক। গানা ধর, এমন মধুঝরা রাত কী বার বার আসবে।

আমার সব কৌশল ফাঁস হয়ে গেল। লেড়কিটির কাছে আমি প্রবঞ্চক বনে গেলাম।

উপায় নেই। খলিফার নির্দেশে গানা ধরতেই হ’ল। লেড়কিটি এক সময় তার চোখের মণি দুটোকে বার বার খলিফা ও আমার মুখের ওপর চক্কর মারাল। ব্যস, পরমূহুর্তেই ঝট করে পর্দার আড়ালে গিয়ে আত্মগােপন করল। তার চোখ মুখের ভীতি ও আতঙ্কটুকু আমার নজর এড়াল না।

লেড়কিটির চোখ মুখের ভাষা বলে দিল সে ধরতে পেরে গেছে, স্বয়ং খলিফাই বণিকের ছদ্মবেশে হাজির হয়েছেন। আমার পরিচয় তাে আবেগের বশে খলিফাই দিয়ে দিলেন। সঙ্গীতজ্ঞ ইশাক খলিফা ছাড়া আর কাউকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারে

আর খলিফার সামনে বে-আব্রু? অসম্ভব। তাই পর্দার আড়ালে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। খলিফা ব্যাপারটির অন্য রকম অর্থ করলেন। তিনি ক্ষোভের সঙ্গেই বলে উঠলেন—“ইশাক, লেড়কিটির কি আমাকে পছন্দ হয় নি? নইলে এমন ঝট করে চলে গেল যে বড়। এক কাজ কর, এর খোঁজ নাও কার মকান এটি। লেড়কিটির অভিভাবকই বা কে? আর লুকোচুরি করে ফয়দা নেই। চিনেই যখন ফেলেছে তখন এ মকানের মালিককে তলব কর।

পাত্তা লাগিয়ে জানা গেল, খলিফারই দরবারের উজির শাহাল মকানটির মালিক। আর খুবসুরৎ লেড়কিটি তাঁরই।

খলিফার তলব পেয়ে উজির হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। কুর্নিশ করে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।

উজির বললেন-এ-লেড়কি আমারই বটে। কাদীজা এর নাম।

‘তােমার লেড়কির শাদী-নিকা কিছু হয়েছে কি? -না, জাঁহাপনা। এখনও শাদী দেয়া হয় নি।

-তােমার লেড়কিকে আমি শাস্ত্রমতে শাদী করে বেগমের মর্যাদা দিতে চাই। তােমার কোন আপত্তি? 

-জাহাপনা, আমি তাে আপনার গােলাম। আপনার মতই আমার মত, আমার লেড়কির মতও বটে।

আমি তােমার লেড়কিকে এক লাখ দেন মােহর দেব। তুমি লেড়কিকে বুঝিয়ে রাজী করাও। আর সে সঙ্গে তােমার লেড়কির আত্মীয় পরিজনদের জন্য এক হাজার গ্রাম আর এক হাজার খামার যৌতুকস্বরূপ দান করব।

খলিফা আসন ত্যাগ করলেন। এবার আর তার বাক্সের মধ্যে বসে মকানটি থেকে বেরােবার দরকার নেই। সদর-দরওয়াজা দিয়েই বেরিয়ে বাদশাহের প্রাসাদের দিকে এগিয়ে গেলাম।

খলিফা পথ চলতে চলতে অনুচ্চ কণ্ঠে বললেন-“ইশাক, এব্যাপারটি ঘুণাক্ষরেও কারাে কাছে ফাস কোরাে না। কাদীজার জীবদ্দশায় কারাে কাছেই মুখফুটে কারাে কাছেই বলিও নি।'

আমার এত উমর হ’ল কিন্তু কাদীজার মাফিক রূপ সৌন্দর্যের আকর দুনিয়ার কোন লেড়কিকেই দেখিনি। বেহেস্তের হুরী ছাড়া খােদাতাল্লা তামাম দুনিয়ায় আর কারাে শরীরে এমন রূপ ঢেলে দিয়েছেন কিনা আমার অন্ততঃ জানা নেই।

বেগম শাহরাজাদ কিস্সাটি শেষ করে কয়েক মুহুর্তের জন্যে চুপ করলেন।

সূচী-অসূচীর কিসসা 

বেগম শাহরাজাদ অন্য আর একটি কিসসা শুরু করলেন ‘জাহাপনা, বছরের এক পবিত্র তিথিতে মক্কায় বহু ধর্মভীরু আদমিদের ভিড় জমে। পুণ্যার্থীরা কাবাহ মসজিদকে প্রদক্ষিণের মাধ্যমে আল্লাহর কৃপা ভিক্ষা করে।

এক সকালে একদল পুণ্যার্থী কাবা মসজিদকে প্রদক্ষিণ করে প্রত্যেকে আল্লাহর কাছে নিজ নিজ কামনার কথা নিবেদন করছিল। তাদের একজনের মুখ দিয়ে অদ্ভুত এক বাসনার কথা প্রকাশ পায়। তা শুনে অন্যান্যরা তাে ক্ষেপে একদম লাল হয়ে গেল।

আদমিটি অনুচ্চ কণ্ঠে বললেও অনেকেই শুনতে পেল, সে বলছে-‘খােদা মেহেরবান, লেড়কিটি যেন তার স্বামীকে ঘৃণা করে। তবে আমার নসীব ফিরবে। আমি জিন্দেগীভর তাকে নিয়ে শুতে পারব।

তীর্থক্ষেত্রে এরকম বাৎ কারাে মুখ দিয়ে বেরােলে কার না শিরে খুন চেপে যায়! এমন জঘন্য এক কাজ কার সহ্য হয় ? তাই সবাই ক্ষেপে গিয়ে তাকে ঘা কতক দিয়ে দিল। কাবাহ আমিরের সামনে হাজির করল। তিনি সুলতানেরও সুলতান। মুলুকের সর্বময় কর্তা। স্বয়ং সুলতানও তার কথায় ওঠেন বসেন।

কাবাহ-আমির সবকিছু শুনে হুকুম দিলেন—একে ফাঁসির দড়িতে লটকে দেয়া হােক।

এমন সময়ে ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

তিন শ’ সাতাশিতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ কিসসাটির পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাহাপনা, কাবা-আমিরের মুখে ফাঁসির হুকুমের বাৎ শুনে সে-বে-শরম আদমিটি তড়াক করে তার পায়ের ওপর পড়ে গিয়ে কেঁদে কেটে বল্ল-হুজুর, আপনি ধর্মের রক্ষক, আপনিই আল্লাহর পয়গম্বর। আপনি মেহেরবানি করে আমার জান রক্ষা করুন।

‘জাহাপনা, আমার সব বাৎ আগে শুনুন। দু’টি কাজ-এ আমি নিযুক্ত। পয়েলা নম্বর-রাস্তার ময়লা আবর্জনা সাফাই করা আর দুসরা কশাইখানা থেকে ভেড়ার নাড়িভূঁড়ি কুড়িয়ে কাড়িয়ে সাফ সুতরা করে সেগুলাে বেচা।

জাহাপনা, এক সকালে আমি কসাইখানা থেকে এরকম নাড়িভূড়ি কুড়িয়ে গাধার পিঠে চাপিয়ে পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি একদল আদমি ছুটতে ছুটতে আমার দিকে আসছে। সবার মুখেই ভীতি ও আতঙ্কের ছাপ। তাদেরই পিছন পিছন একদল ক্রীতদাস লাঠিসােটা নিয়ে তেড়ে আসছে। ব্যাপার দেখে আমি তাে বিলকুল হতভম্ভ। একজনকে পাশ দিয়ে ছুটে যেতে দেখে জিজ্ঞাসা করলাম—ব্যাপার কি হে?’ 

আদমিটি ছুটতে ছুটতেই বল্ল-হারেমের জেনানা’রা এ-পথ দিয়ে যাবে। তাই রাস্তা সাফ করছি। কোন আদমিই থাকবে না। ইয়া আল্লাহ! তার বাৎ শুনেই আমার তাে কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবার জোগাড় হ’ল। এখন উপায়? লুকাই কোথায় ? উপায়ান্তর না দেখে গাধাটিকে একধারে দাঁড় করিয়ে নিজে একটি মকানের দিকে মুখ ক’র পাথরের মাফিক দাঁড়িয়ে পড়লাম। রেহাই নেই। দু’জন মস্তান গােছের আদমী আমাকে আচমকা পিছন দিক থেকে জাপটে ধরে ফেলল। আর ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, একটি ইয়া তাগড়াই নিগ্রো আমার গাধাটিকে নিয়ে চলে যাচ্ছে।

অন্য দিকে ঘাড় ঘােরাতেই নজরে পড়ল প্রায় ত্রিশটি লেড়কি আমার দিকে ইয়া বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে। অপলক তাদের ‘চাহনি। চোখের তারায় বিস্ময়। তাদের মধ্যে একটি তাে খুবসুরৎ একদম বেহেস্তের হুরী। এমন সুরৎ কোন লেড়কির থাকতে পারে আমার অন্ততঃ জানা ছিল না।

নিগ্রো দুটো আমাকে পিঠমােড়া করে বেঁধে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলল। আমি বার বার বললাম, আমি দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে খাড়া ছিলাম। পাত্তাই দিল না। আমার পক্ষ নিয়ে কয়েকজন পথচারী নিগ্রো দুটোর দিকে তেড়ে এল—একী তাজ্জব ব্যাপার! এ-আদমীর কসুর কি এ কী জুলুম! এর নােকরিই তাে পথ সাফ সুতরা করা! পথ ছেড়ে যাবেই বা কোথায়? আর দেওয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকায় হারেমের কোন জেনানার দিকেই তাে নজর দিতে পারে নি। এমন নির্দোষ আদমির ওপর জুলুম চালালে খােদাতাল্লা ক্ষমা করবেন ? 

নিগ্রো দুটো তাদের বাৎ কানেই তুলল না। আমাকে নিয়ে চলল । 

আমি ভাবলাম আমার গাধার পিঠে রাখা নাড়িভূঁড়ির গন্ধে হয়ত কোন জেনানার উল্টি এসে থাকবে। সে কসুরের কারণেই হয়ত আমাকে পাকড়াও করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। খােদাতাল্লাই আমার উদ্ধারের একমাত্র ভরসা। আমাদের সামনে পথ চলেছে হারেমের জেনানার দল। কিছুটা পথ আমাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে গিয়ে সুবিশাল এক প্রাসাদের আদালত কক্ষে দাঁড় করাল। আমি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি নিঃসন্দেহ, হয় গর্দান যাবে নয়তাে শূলে চড়াবে। জান আমার খতম হচ্ছেই। আমার পরিবারের কেউ আমার হালৎ জানতেও পারবে না। তাজা আদমিটি মকান থেকে কাজে গেল, আর ফিরল না । ব্যস, এটুকুই। আমার লাশের হদিশও কেউ পাবে না।

আমি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে হাপুস নয়নে কাঁদতে লাগলাম। কিছু সময় বাদে এক আদমি আমাকে সঙ্গে নিয়ে হারেমে ঢুকল। আমাকে দেখেই তিনটি জেনানা বলল—তােমার ওই জব্বর বাদশাহী সাজপােশাক খুলে ফেল হে। আমি তাে হতভম্ব। যন্ত্রচালিতের মাফিক আমার কোর্তা পাৎলুন খুলে একদম উলঙ্গ হয়ে গেলাম। তারা আমাকে হামামে নিয়ে গিয়ে গরম পানি ছােবড়া দিয়ে রগড়ে আমার সাধের ময়লার আস্তরণ তুলতে গেলাে। আচ্ছা করে গােসল করিয়ে এক দম সাফসুতরা করে ফেলল। এবার খুসবুওয়ালা পানিতে আমাকে চুবিয়ে নিল।

গােসল করিয়ে জেনানা তিনটি আমাকে পাশের কামরায় নিয়ে গিয়ে সােনার জরিয়ের নয়া কোর্তা-পাৎলুন পরিয়ে দিয়ে একদম নবাব বাদশাহ বানিয়ে দিল। এমন দুঃখের মধ্যেও মুহূর্তের জন্যে হলেও চিকানাই পােশাকের দিকে তাকিয়ে খুশীতে আমার দিল নেচে উঠল। পথে ঝাড় চালিয়ে যে-আদমি জঞ্জাল সাফা করে বেড়ায় আর ভেড়ার নাড়িভূড়ি ঘাটাঘাটি করে তার গায়ে এমন বাহারের পােশাক চাপলে খুশী হওয়াই তাে স্বাভাবিক।

এমন সময় প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় শালিকের কিচিরমিচির শুরু হয়ে গেল। ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

তিন শ’ অষ্টআশিতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ কিসসাটির পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাহাপনা, ঝাড়ুদার ও ভেড়ার নাড়িভূঁড়ির কারবারী তার কিসসা বলে চলেছে—আমাকে তাে দামী ও চিকনাই সাজ পােশাক পরিয়ে বিলকুল আমীর-বাদশাহ বানিয়ে দেয়া হল।

সাজগােছ করিয়ে আমাকে শাদীর পাত্রের মাফিক তােয়াজ করতে করতে নিয়ে গিয়ে সুসজ্জিত একটি কামরায় নিয়ে গেল, মখমলের চাদর বিছানাে পালঙ্কের ওপর বসিয়ে দিল।

রাস্তায় লেড়কিদের ভিড়ের মধ্যে যাকে বেহেস্তের হুরী বলে মালুম হয়েছিল সেই পালঙ্কের এক পাশে আধ-শােয়া অবস্থায় রয়েছে দেখলাম। কেবলমাত্র অতি মিহি, একদম ফিনফিনে একটি সেমিজ তার গায়ে।

খুবসুরৎ লেড়কিটি আমার দিকে আচমকা চোখের বাণ মারল। কারবার দেখে আমি যেন আশমান থেকে জমিনে পড়লাম।

আমি স্থবিরের মাফিক বসে রইলাম। কি করব, কি করা উচিত ভেবে পাচ্ছি না। লেড়কিটি এবার চোখে ইশারা করে আমাকে তার কাছে এগিয়ে, গা-ঘেঁষে বসতে বল। বাদীরা খানাপিনা সাজিয়ে দিয়ে গেল। খিদেয় আমার পেটের মধ্যে আগ্নেয়গিরির দাপাদাপি চলছে। লেড়কিটি মাত্র একবার বলাতেই আমি থালা থেকে খানা তুলে গিয়ে ঝটপট উদরে চালান দিতে মেতে গেলাম। ভাবলাম, আগে পেটের জ্বালা তাে নেভাই নসীবে যা আছে তা-তাে হবেই।

হরেক কিসিমের সরাবের বােতল সাজানাে। পেয়ালা ভরে সরাব গলায় ঢালতে লাগলাম। সরাবের এমন খুসবু জিন্দেগীতে পাই নি। লেড়কিটিও গলা পর্যন্ত সরাব গিলল। আমাদের উভয়ের চোখের তারায় গােলাবী নেশার ছােপ ফুটে উঠল। লেড়কিটি আচমকা এক হেঁচকা টানে আমাকে একদম তার বুকের ওপর তুলে নিল। আমি বিলকুল মিশে গেলাম তার তুলতুলে

( চলবে )

Post a Comment

0 Comments