আরব্য রজনী পার্ট ১২৭ (Arabya Rajani Part 127)

গল্পের পরবর্তী অংশঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।

ইশাক কিসসাটি এভাবে বলেছিলেন—এক রাত্রে আমি একদম মত্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরছিলাম। গলা পর্যন্ত সরাব পান করেছিলাম। পথে খুব প্রস্রাবের বেগ দিচ্ছিল। পুরাে তলপেট জুড়ে ব্যথা লাগছিল। রাস্তার ধারের এক প্রাচীরের পাশে বসে পড়তে বাধ্য হলাম। দীর্ঘ সময় ধরে শরীর থেকে পানি বের হওয়ায় নিজেকে খুবই হাল্কা বােধ হতে লাগল। প্রস্রাব সেরে উঠতে যাব অমনি ওপর থেকে কি যেন এক কঠিন বস্তুর আঘাত লাগল মাথায়। চোখে আন্ধার দেখতে লাগলাম। সচকিত হয়ে ঝট করে সামান্য সরে গেলাম।


একটু বাদে নিজেকে সামলে নিয়ে ওপরের দিকে চোখ ফেরাতেই দেখি প্রাসাদের ওপর থেকে কে যেন একটি কাঠের বাক্স রশি দিয়ে বেঁধে ওপরের তলা থেকে নামিয়ে দিয়েছে। সুদৃশ্য একটি বাক্স। বাক্সের ডালা নেই, খােলা। বাক্সটির ভেতরে চমৎকার নক্সাযুক্ত সুগন্ধী একটি আসন বিছিয়ে দেয়া হয়েছে। সেদিন সরাব একটু বেশীই গলায় ঢেলেছিলাম। নেশাও বেশ জাঁকিয়ে ধরেছিল। নেশার ঝোঁকে ঝোঁকে আমি কাঠের সেবাক্সটির ভেতরে বসে পড়লাম। আদতে আমার কাছে ব্যাপারটি খুবই মজাদার হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ব্যস, আমি বাক্সটির ভেতরে বসতে না বসতেই রশিতে টান পড়ল। বাক্সটি টানের চোটে ক্রমশ উপরে উঠে যেতে লাগল। আমি নির্বিকারভাবে বসেই রইলাম।

এক সময় বাক্সটি প্রাসাদটির বারান্দায় উঠে গেল। দাসী গােছের কয়েকটি লেড়কি আমাকে কুর্নিশ করল। কামরায় নিয়ে গিয়ে সুদৃশ্য আসনে বসতে দিল। আমি নিতান্ত বাধ্য লেড়কার মাফিক বাক্স থেকে বেরিয়ে সুরসুর করে কুর্শিটিতে বসলাম। লেড়কিগুলাে আমাকে বসিয়ে দিয়ে কামরা থেকে বেরিয়ে গেল। বেপাত্তা।

কিছু সময় আমি এক খালি কামরায় বসে রইলাম। তারপর চমৎকার পােশাক আশাকে সজ্জিতা একটি লেড়কি এসে আমাকে কামরা থেকে বের করে নিয়ে চল। কোথায় বা কেন আমি কিছুই জানি না। নীরবে তার পিছন পিছন চলাম। লেড়কিটি লম্বা বারান্দা দিয়ে সােজা এগিয়ে আমাকে নিয়ে সুসজ্জিত একটি কামরায় বসতে দিল।

আমার সরাবের নেশা ইতিমধ্যে একটু কমে এসেছে। আমি অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে কামরার সবকিছু দেখতে লাগলাম। যা কিছুই দেখি তাতে যেন মুষড়ে পড়তে লাগলাম।

এক সময় আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল—ইয়া আল্লাহ। আমাকে এরা কোথায় নিয়ে এল! তামাম দুনিয়ার দামী সব সামানপত্র যে এখানে জড়াে করা হয়েছে! এ তাে সাধারণ কোন আদমির মকান নয়। মালুম হচ্ছে, কোন আমীর-বাদশাহর বাসস্থল হবে। আমি কি সরাবের নেশায় বেহেড মাতাল হয়ে কোন আমীর ওমরাহের মকানে ঢুকে পড়েছি? ব্যাপারটি কি করে যে ঘটে গেল আমার দিমাকে আসছে না ছাই।'

একটু বাদেই দরওয়াজা ঠেলে প্রায় দশটি খুবসুরৎ লেড়কি কামরায় ঢুকল। সবার পরনেই বহুমূল্য ঝলমলে পােশাক পরিচ্ছদ। তার গায়ের আতরের খুসবুতে কামরা ভরে উঠল।

খুবসুরৎ লেড়কিরা কামরায় ঢুকতেই আমি কুর্শি ছেড়ে যন্ত্রচালিতের মাফিক তড়াক করে দাঁড়িয়ে সালাম জানালাম।

সবচেয়ে বেশী সুরৎ যে লেড়কিটির, দলের নেতৃস্থানীয়া বলে যাকে মালুম হ’ল সে আমার সামনে এগিয়ে এল। ঠোটের কোণে মিষ্টি মধুর হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বলল-“আমার নসীবের জোরেই আপনার মত একজনকে আমার কামরায় পেলাম। আপনি মুসাফির। আমার মেহমান। কিন্তু মালুম হচ্ছে যুগযুগান্তর ধরে আপনার সাথে আমার পরিচয়। কী তাজ্জব ব্যাপার। আপনি দাঁড়িয়ে কেন? বসুন। মেহেরবানি করে আসন গ্রহণ করুন।

আমি আসন গ্রহণ করলাম। সে-ও আমার পাশে প্রায় গা-ঘেষে বসল।

খুবসুরৎ লেড়কিটি মধুঝরা কণ্ঠে বলল—এত রাত্রে, এ-পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন কোথায় ?

আমি তার প্রশ্নের কি জবাব দেব ভাবছিলাম। কিন্তু আমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই সে আবার বলল—‘এপথে কোথায় যাচ্ছিলেন? ওই কাঠের বাক্সটিতেই বা বসতে গেলেন কেন, বলুন তাে? আমিই যে বাক্সটি দড়ি দিয়ে পথে নামিয়ে দিয়েছিলাম, আপনার জানা ছিল কি ?

-দেখুন আমি পথ দিয়ে যাবার সময় খুব জোর প্রস্রাব পায়। যাকে বলে হালৎ একদম বেসামাল হয়ে পড়েছিল। 

লেড়কিটি নির্বাক। নীরব চাহনি মেলে আমার বাৎ শুনতে লাগল। আমি বলে চললাম—প্রস্রাব সারার জন্য একটু আবডাল খুঁজতে গিয়ে আপনার প্রাচীরটি নজরে পড়ল। ব্যস বসে পড়লাম প্রস্রাব সারতে। ঠিক তখনই আপনার দোতলা থেকে দড়ি বাঁধা কাঠের বাক্সটি নেমে গেল। আমি তখন সরাবের নেশায় টলছি। বাক্সটি দেখে আমার মধ্যে বদমতলব চেপে গেল। গাট হয়ে তার মধ্যে বসে পড়লাম। তখনই রশিতে টান পড়ল। আমি ওপরে উঠে এলাম। খােদার কসম, এতে ভাল কি মন্দ হবে আমি কিছুই বিবেচনা করি নি। বিলকুল নেশার ঝোঁকে, মজা করার জন্যই আমার মধ্যে এ রকম দুর্বুদ্ধি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। আপনি গােসসা যদি করেনই সরাবের ওপর গােসসা করতে পারেন, আমার ওপর নয়। আমার কোনই কসুর নেই।

—“ছিঃ কসুর—গােস্সা এসব বলছেন কেন? আপনি আসাতে আমি বরং খুশীই হয়েছি। খুশীতে আমার দিল ডগমগ।

মালুম হচ্ছে আমি খােয়াব দেখছি। আপনারই জন্য আমি যুগযুগান্তর ধরে যেন পথ চেয়ে বসেছিলাম। আমি যেন একটু স্বস্তি পেলাম। ভাবলাম, খােদা ভরসা। খুশী হােক আর না হােক অন্ততঃ গােসসা করে নি।

খুবসুরৎ লেড়কিটি এবার বলল- “আপনার পেশা জানতে পারি কি?”

আমি এবার যেন আচমকা একটি ধাক্কা খেলাম। তার এ প্রশ্নের জবাব কিভাবে দেব, দিমাকে আসছিল না। আমি যে খলিফা অল মামুনের এর সভার গায়ক তা কি করে তার কাছে প্রকাশ করব, ভাবছিলাম। যদি কোনক্রমে বেফাঁস কিছু মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়, আমার পরিচয় জানতে পারে তবে সকাল হতে না হতেই তামাম শহরে হৈ চৈ পড়ে যাবে। তামাম আরব মুলুকে যে-গায়ক ইশক এর খ্যাতি সে এক লেড়কির কামরায় চোরের মত প্রবেশ করেছে—ইয়া খােদা—একদম কেলেঙ্কারী হয়ে যাবে।

আমাকে নীরব দেখে লেড়কিটি আবার প্রশ্ন করল। আপনার পেশা কি ।

তার মুখের বাৎ খতম হওয়ার আগেই আমি বলে উঠলাম, তাঁতী। তাঁত বুনে দিন গুজরান করি।

—“আপনার বাৎচিৎ তাে বহুৎ আচ্ছা। তাত বােনেন? আপনার আচরণ ও বাৎচিৎ শুনে কিন্তু আমার মালুম হয়েছিল, নির্থাৎ কোন বড় কবি। নইলে এরকমই কোন গুণী আদমি হবেন আপনি। বুনলেনই তাঁত, কবিতা টবিতা নিয়ে একটু আধটু মাথা নিশ্চয়ই ঘামান, কি বলেন? নামজাদা কোন কবির দু-চার ছত্র কবিতা নিশ্চয়ই জানা আছে, কি বলেন? —“তা অবশ্য কিছু জানি। তবে একেবারেই সামান্য

‘হােক গে, কিছু তাে অন্ততঃ জানেন। মেহেরবানি করে দু'চার ছত্র যদি বলেন-' আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলাম— না, তেমন কিছু জানা নেই। বড়ই শরমে ফেললেন। কাউকে শুনিয়ে খুশী করার মত সায়ের আমার জানা নেই। আমি কাজের ফাঁকে দু'-চার ছত্র পড়াশােনা করি মাত্র। তবে আপনি যদি মেহেরবানি করে দু’-একটি সায়ের শোনান।

আমার মুখের বাৎ কেড়ে নিয়ে সে এবার মুচকি হেসে বলল ‘শােনাব। জরুর শােনাব। আপনি আমার মেহমান। আমি যা কিছু জানি বিলকুল আপনাকে শােনাব।

এবার সে আমাকে নামজাদা কবিদের লেখা কতগুলি কবিতা আবৃত্তি করে শােনাল। সেগুলাের কয়েকটি প্রাচীন কবি জুহাইর, অল কাইস, আস্তার, ইমরু, তারাফা, কলুতুম এবং আমীর ইবন প্রভৃতির এবং সম্প্রতি কালের অল বাক্কাশী, আবু মুশার এবং আবু নবীশ-এর কবিতা। তার কবিতা আবৃত্তি করার ভঙ্গি ও কিন্নর কণ্ঠস্বর।

আজও আমার যেন কানে বাজে।

আমি বহুৎ আচ্ছা, বহুৎ আচ্ছা বলে পঞ্চমুখে তার প্রশংসা করতে লাগলাম।

লেড়কিটি এবার ঠোটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বলল- “আমি যা জানি তা তাে আপনাকে শােনালামই। বােধ করি এবার আপনার দ্বিধা-সঙ্কোচ কেটে গেছে? আশা করি এবার আপনার কণ্ঠের দু-চারটে কবিতা শুনতে পাব।

আমি জোর মিনতি জানাতে লাগলাম। কোনরকমে তার হাত থেকে এ ব্যাপারে রেহাই পাবার যত কৌশল জানা আছে কোনটিই প্রয়ােগ করতে কসুর করলাম না। মুখ কাচুমাচু করে বললাম-শরম, জড়তা বা দ্বিধার ব্যাপার স্যাপার জরুর নয়। আদতে আমার তেমন কিছু জানাই নেই শুনিয়ে আপনার মত শ্রোতাকে খুশী করতে পারি। তবে আপনার যখন কিছু শুনতে দিল চাইছে তখন কিছু বলছি। ভুলচুক কিছু হয়ে গেলে অনুগ্রহ করে শুধরে নেবেন। এবার আমার কবিতার ঝােলা থেকে দুটো কবিতা বেছে ফেললাম। সাধ্যমত শ্রুতিমধুর ও নির্ভুল উচ্চারণ যাতে না হয় সে রকম কোশিস করেই সে দুটো পাঠ করলাম।

কিন্তু আমার মতলবটি কার্যকরী হ’ল না। কবিতা পাঠ শেষ হতে না হতেই খুবসুরৎ লেড়কিটি উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে বলে উঠল—“আরে ব্বাস কী কণ্ঠ আপনার! কবিতা বলার কী চমৎকার ভঙ্গি! আর কী যে মাত্রাঙ্কন তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না! আপনি যে তাঁতিদের শিরােমণি, সন্দেহ নেই। আস্তাকুড়েও যে এমন সম্পদ থাকতে পারে আপনাকে না দেখলে বিশ্বাসই হত না!

এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

তিন শ’ পঁচাশিতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ কিসসাটির পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন -“জাহাপনা, গায়ক ইশাক তার কিসসার পরবর্তী অংশ বলছেন—খুবসুরৎ লেড়কিটি এবার বহুৎ কিসিমের খানা আর দামী সরাব দিয়ে আমার আপ্যায়ন করল।

সরাবের পাত্রটি হাতে তুলে দিয়ে বলল—এবার আপনার মুখ থেকে এ-বাঁদি দু’একটি কিসসা শুনতে আগ্রহী। আশা করি আমার এ সাধ অপূর্ণ রাখবেন না।

বহুৎ আচ্ছা, বলছি তবে শুনুন। আমি সরাব পান করতে করতে কয়েকটি হরেক কিসিমের কিসসা শােনালাম। কিসসা শুনে সে কখনও খুশীতে হাসল, কখনও আতঙ্কে শিহরিত হ’ল আবার কখনও বা বিমর্যমুখে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

আমি তাকে যে সব কিসসা শােনালাম বিলকুল সুলতান বাদশাহের দরবারের ঘটনা। সে তাজ্জব বনল। সামান্য এক তাতী হয়েও আমি কি করে খলিফার দরবারের এতসব ঘটনা জানতে পারলাম। এমন অসম্ভব কাজ কি করে আমার পক্ষে সম্ভব হ'ল।

আমি তার জিজ্ঞাসা নিরসনের জন্য বললাম- তাজ্জব বনার মাফিক বাৎই বটে। কিন্তু আমি বরাতগুণে খলিফার দরবারের এক কর্মীকে দোস্ত হিসাবে পেয়েছিলাম। তাই তাে সামান্য এক তাঁতি হয়েও আমার পক্ষে খলিফার দরবারের এতসব ভেতরের সমাচার জানা সম্ভব হয়েছে।

খুবসুরৎ লেড়কিটি আচমকা চোখের বাণ মেরে আমার কলিজায় জ্বালা ধরিয়ে দিল। লেড়কিটি মুখের হাসিটুকু অক্ষুন্ন রেখেই এবার বলল—“আপনাকে বহুৎ তকলিফ দিলাম। আর একটি মাত্র অনুরােধ রাখতে বলছি। আমার সঙ্গে যদি একটি গানা গান তবে বহুৎ খুশী হ’ব। আমার দিল চাইছে আপনার কণ্ঠের একটি গানা শুনি। আশা করি আমাকে হতাশ করবেন না।' 

গান গাওয়াই তাে আমার পেশা। কিন্তু এমন আনন্দঘন পরিবেশে গান গাওয়ার তিলমাত্র ইচ্ছাও আমার ছিল না। তাই বিষমুখে বললাম—‘গানা জানা থাকলে অবশ্যই আপনাকে খুশী করার কোশিস করতাম। আদতে গান শেখার সখ এক সময় আমার খুবই হয়েছিল। কিন্তু যখন বুঝলাম, গাধা ছাড়া আমার গানার সমঝদার আর কেউ-ই নেই তখন সে শখের জলাঞ্জলি দিয়ে দিলাম। গানার দুনিয়া থেকে সরে দাঁড়াবার জন্য মহল্লার সবাই ও ইয়ার দোস্তরাও আমাকে কম মিনতি জানায় নি। অনন্যোপায় হয়ে গানার সঙ্গে বিলকুল সম্পর্ক ছিন্ন করে দিলাম, ব্যস। গানার সঙ্গে জিন্দেগীর মত আমার আড়ি হয়ে গেল।

আমার বাৎ শুনে খুবসুরৎ লেড়কিটি তাে হেসে একদম খুন হবার উপক্রম হল। ইয়া খােদা! কী চমৎকার আদমি আপনি! কী মজার মজার যে বাৎচিৎ আপনি করতে পারেন যত ভাবছি ততই তাজ্জব বনছি!

–‘মেহেরবানি করে আমার বাৎ বিশ্বাস করুন, গানা আমার গলায় একদম আসে না। নইলে আপনার মাফিক এমন এক খুবসুরৎ লেড়কি অনুরােধ করার বহু আগেই দু-চারটে গান গেয়ে ফেলতাম। তার চেয়ে বরং আপনিই একটি গান শােনান। আপনার গলা বলে দিচ্ছে, আপনি এ বিদ্যায় বিশেষ পারদর্শিনী। আপনার গানার মধ্য দিয়ে আজকের রাত্রিটি অধিকতর আকর্ষণীয় হয়ে উঠুক। শুরু করুন সুন্দরী, আর দেরী সইছে না।

বিশ্বাস করুন, আমার ধারণা ছিল অন্য দশটি লেড়কিরা যেমন সাধারণ গান গায় সে-ও ঠিক তেমনিই দু’-একটি মামুলি গানা গাইবে। কিন্তু তার কিন্নর কণ্ঠের গান শুনে আমার দিমাক গড়বড় হয়ে যাবার জোগাড় হ’ল। মুলুকের জব্বর সব গায়করাও তার গানা শুনে চমকে উঠবে।

লেড়কিটি আমাকে বিস্মিত হতে দেখে খুশী হ’ল।

গানা শেষ করে সে আমাকে বলল –বলুন তাে গানটির রচয়িতা কে?

আমি বােকার মত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে কিছু না বােঝার বাহানা করে বললাম—না, আমার ঠিক জানা নেই।

–‘এ কেমন বাৎ শােনালেন সাহাব! এ গানার রচয়িতার নাম তাে তামাম দুনিয়ার ছেলে বুড়া কারােরই অজানা নয়। এর রচয়িতা কবি আবু নসাব, আর গেয়েছেন বিখ্যাত গায়ক ওস্তাদ ইশাক। 

আমি মুখের সেকাচুমাচু ভাবটুকু বজায় রেখেই বললাম—হ্যা, ওস্তাদ ইশাকের গান আমি শুনেছি বটে। কিন্তু তিনি আপনার কাছাকাছি যেতে পারবেন না। এমন কিন্নর কণ্ঠ তিনি কোথায় পাবেন, বলুন তাে?

‘খুব হয়েছে। আমাকে আর মিথ্যা স্তোকবাক্যে খুশী করতে হবে না। এতে গুণী আদমির মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করা হয়। তামাম দুনিয়া ঢুঁড়ে এলেও ওস্তাদ ইশাক-এর সমকক্ষ কাউকেই মিলবে না ।  আমি না বলে পারছি না আপনি ওস্তাদ ইশাকের গানা কোনদিনই শােনেন নি। নইলে এরকম বাৎ আপনার মুখ দিয়ে কোনদিনই বেরােত না।

কথাটি বলেই সে ফিন আর একটি গানা ধরল। আর গানা থামিয়ে মাঝে মধ্যে ওস্তাদ ইশাকের প্রতিভা সম্বন্ধে ব্যাখ্যা করে আমাকে সমঝিয়ে দিতে লাগল। তার কিন্নর কণ্ঠের দিল দবিয়া গানা আমার দিল ভরিয়ে দিল। সুখের রাত্রি, তাড়াতাড়ি গুজরান হয়ে যায়। তাই আমাদের সে রাত্রিটিও যেন চোখের পলকেই খতম হয়ে গিয়েছিল।

এক ক্রীতদাস জানাল, ভাের হয়ে এল বলে। এবার কেটে পড়তে হবে। নইলে পালাবার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। ভীষণ বেকায়দায় পড়তে হবে আমাকে।

অজ্ঞাত পরিচয় খুবসুরৎ লেড়কিটির সহজ সরল ও মিষ্টি মধুর আচরণ আমার বুকে স্থায়ী আস্তানা গাড়ল। যেন কতকালের আত্মিক সম্বন্ধ রয়েছে আমাদের মধ্যে। নিবিড় বন্ধনে বাঁধা পড়ে গেছি। আমরা তাই তাকে ছেড়ে আসতে আমার বহুৎ তকলিফ হচ্ছিল। সে-ও আমাকে সুকরিয়া জানাতে গিয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। 

আমি ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললাম—“আমি আপনাকে কতটুকু দিতে পেরেছি বলতে পারব না। কিন্তু বুক ভরে যেটুকু নিয়ে গেলাম। তা বিলকুল অতুলনীয়।

আরও বহুৎ কিছু বলার ছিল, শােনাবারও ছিল বহুৎ-ই। কিন্তু দিনের আলাে বেগড়া বাঁধাল। ফর্সা হয়ে আসায় আমি লম্বালম্বা পায়ে তার কামরা ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।

নিজের মকানে ফিরে ভােরের নামাজ সেরে বিছানায় আশ্রয় নিলাম। তামাম দিন ঘুমিয়ে কাটালাম। সন্ধ্যায় বিছানা ছেড়ে উঠলাম।

সাফ সুতরা পােশাক গায়ে চাপিয়ে প্রাসাদে হাজির হলাম। প্রাসাদের প্রধান রক্ষীর মুখে শুনলাম, খলিফা ভ্রমণে বেরিয়েছেন।

অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে লাগলাম। ফিন সে প্রাসাদের সামনে হাজির হলাম। অব্যক্ত এক নেশা আমার কাধে ভর করেছে। নইলে সে খুবসুরৎ লেড়কির প্রাসাদে যাওয়ার কোন দরকার ছিল?

আগের দিনের সে বাক্সটি ফিন রশির কাধে ভর করে নেমে এল। আমি মােহমুগ্ধের মত বসে পড়লাম।

সে-খুবসুরৎ লেড়কিটি আমাকে দেখেই আচমকা সরবে হেসে উঠল। হাসি থামিয়ে এক সময় বলল-“কি গাে সাহাব, এখানেই পাকাপাকি বন্দোবস্ত করার ইচ্ছা নাকি?

আমি আমতা আমতা করে ক্ষীণকণ্ঠে বললাম—তা হলেও খারাপ হয় না। আমি তাে আপনার মেহমান, মেহমানকে তিন দিন সেবাযত্ন করার বিধান রয়েছে। আজ তাে সবে দ্বিতীয় দিন। তৃতীয় দিন গুজরান হয়ে যাওয়ার পরও যদি হাজির হই তখন অবশ্যই দু'কথা শুনিয়ে দিতে পারেন।

আমরা তামাম রাত্রি গান, কবিতা ও কিসসা কাহিনীর মধ্য দিয়ে গুজরান করে দিলাম।

ভােরে আমি খুবসুরৎ লেড়কিটির কাছ থেকে বিদায় নেবার

( চলবে )

Post a Comment

0 Comments