বহুৎ কোশিস করলেন তবু কিছুতেই দু’চোখের পাতা এক করতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত অস্থিরচিত্ত খলিফা এক সময় তড়াক করে লাফিয়ে বিছানায় বসে পড়লেন। গলা ছেড়ে চিল্লিয়ে উঠলেন—‘মাসরুর! মাসরুর!
খলিফার দেহরক্ষী মাসরুর হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে কুর্নিশ করে আদেশের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে হাে-হাে করে হাসতে লাগল।
খলিফা তাে মাসরুর-এর কাণ্ড দেখে তাজ্জব বনে গেলেন। প্রায় ধমকের সুরে বললেন—ব্যাপার কি ? হঠাৎ তােমার এমন হাসির উদ্রেক হ’ল কিসে? তােমার কি দিমাক টিমাক খারাপ হয়ে গেছে? নইলে এমন করে হাসার অর্থ কি?
খলিফার ধমক খেয়ে মাসরুর হাসি থামিয়ে অপ্রতিভ হয়ে নিতান্ত অপরাধীর মাফিক বিমর্ষমুখে দাঁড়িয়ে রইল।
সে করজোড়ে নিবেদন করল—‘জাঁহাপনা, আমার কসুর হয়েছে, মাফ করবেন। আদতে আপনার কোন ব্যাপারে আমি এমন করে হাসাহাসি করি নি। অন্য একটি ঘটনা হঠাৎ ইয়াদে আসায় আমি হাসি দমিয়ে রাখতে পারি নি।
—“ঘটনাটি কি, বল তাে।
—“আমি গতকাল বিকালে টাইগ্রীস নদীর ধারে ঢুঁড়তে গিয়েছিলাম। সেখানে দেখি বেশ কিছু আদমি ইবন অল কবিবীর নামে এক ভাঁড়কে ঘিরে হাসি তামাশা দেখছে আর সবাই হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে।
–তাই বুঝি? তবে তাে তার হাসির কিসসা শুনতেই হয় মাসরুর। এক কাম কর, সে রসিকটিকে আমার সামনে হাজির কর। তার হাসির ঝােলা থেকে কিছু পেলে আমার দিল একটু আধটু হালকা হতে পারে। এমন কিসসা চোখের পাতায় নিদ চলে আসাও অসম্ভব নয়। খলিফার হুকুম তামিল করতে তাঁর দেহরক্ষী মাসরুর ছুটল ভাড় ইবন কবিবীর-এর খোঁজে।
মাসরুর তাকে বহুত তাল্লাসী চালিয়ে বের করল। তাকে খলিফার কামরার সামনে হাজির করল। কামরার দরওয়াজায় দাঁড়িয়ে সে কবিকে দিয়ে হলফ করিয়ে নিতে গিয়ে বলল - শােন, আমার জন্যই আজ তুমি খলিফার প্রাসাদে আসতে পারলে। তােমার বরাত খুলে গেল। এক কাম কিন্তু তােমাকে করতে হবে। সব কিসসা শুনিয়ে খলিফার কাছ থেকে যে বকশিস পাবে তার বখরা কিন্তু আমাকে দিতে হবে। মােট চার ভাগ হবে। তিন ভাগ আমার প্রাপ্য আর এক ভাগ তুমি নেবে, রাজী?’ ভাঁড় কবিবীর চোখের মণি দুটোকে প্রায় কপাল পর্যন্ত তুলে নিয়ে বলে উঠল—“ইয়া আল্লা! তিন ভাগ তুমি নেবে? আমার এক ভাগ মাত্র। বকশিসের অর্থ আধাআধি ভাগ হবে। মাসরুর দেখল বেশী কচলাকচলি করতে গেলে দেরী হয়ে যাবে, খলিফা গােসসা হবেন। আধাআধি ভাগেই সে রাজী হয়ে গেল।
মাসরুর ভাড় কবিবীরকে খলিফার সামনে হাজির করল। খলিফা তাকে দেখে বলল-“কি হে, তুমি খুব হাসি-মস্করার মাধ্যমে হাসাতে পার। বহুৎ আচ্ছা সব হাসির কিসসা জান। আমাকে কিছু হাসির কিসসা শুনিয়ে দিল খুস করে দাও দেখি। ইয়াদ রেখাে, তােমার কিসসা যদি আমার দিলকে খুশী করতে না পারে, হাসির উদ্রেক ঘটাতে না পারে তবে কিন্তু তােমার বরাতে ইনাম জুটবে চাবুকের ঘা।
খলিফার বাৎ শুনে ভাড়ের তাে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে যাবার জোগাড় হ'ল। তার মাথায় যত কিসসা ছিল, লেকিন এখন সব ভােজবাজীর মত, বিলকুল উধাও হয়ে গেল। বহুৎ কোশিস করল। কিন্তু কিছুই ইয়াদে আনতে পারল না। সব যেন কেমন তালগােল পাকিয়ে, জট বেঁধে যেতে লাগল। তার বুকের ভেতরে কামারের হাঁফর চলতে থাকে। কোর্তা-পাৎলুন ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে ওঠে। গলা দিয়ে ঘাম পর্যন্ত বেরােতে চায় না। ভাঁড় কবিবীরের কারবার দেখে খলিফা চটে যান। চিল্লিয়ে ওঠেন, কোই হ্যায়? এ আদমীকে এক শ’ ঘা চাবুক লাগাও! চাবুকের ঘা খেয়ে এর মগজ সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এক ঘাতক খলিফার হাঁক ডাক শুনে চাবুক হাতে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল।
খলিফা গর্জে উঠলেন—একে চাবুক মার। গুণে গুণে ঠিক এক শ’ ঘা চাবুক চালাবে।' ঘাতক ভাঁড় কবিবীরকে এক ঝটকায় মেঝেতে ফেলে দিয়ে একের পর এক চাবুক মারতে লাগল। ত্রিশ ঘা চাবুক খেতেই ভঁড়টি করজোড়ে নিবেদন করল—জাহাপনা, আমার প্রাপ্যটুকু বুঝে পেয়েছি। এর পরেরটুকু আপনার দেহরক্ষী মাসরুর-এর প্রাপ্য।
—“তার মানে? মাসরুর-এর প্রাপ্য হতে যাবে কেন?
--জাহাপনা, কামরায় ঢােকার আগে আমাদের মধ্যে কড়ার হয়েছিল, আপনি যে বকশিস দেবেন তার দু’ভাগ নেবে মাসরুর, আর মাত্র একভাগ আমার প্রাপ্য।
-বহুৎ আচ্ছা! মাসরুর’কে তলব কর। মাসরুর’কে হাজির করা হ’ল। খলিফার নির্দেশে এবার তার পিঠে চাবুকের ঘা পড়তে লাগল।
চাবুক চলাকালীন এক সময় খোঁজা সরদার এগিয়ে এসে বলল, জাহাপনা, ওকে আর নয়। এবার আমার পিঠে চাবুক মারা হােক। বাকী চাবুকের ঘা আমার প্রাপ্য।
ব্যাপার স্যাপার দেখে খলিফা হারুণ-অল-রসিদ তাে হাসতে হাসতে একদম লুটোপুটি খাবার জোগাড় হলেন। হরদম হেসেই চললেন। হাসতে হাসতে তার দিলে যা কিছু বিষাদ ছিল ধুয়ে-মুছে বিলকুল সাফ হয়ে গেল।
খলিফার কামরায় উজির জাফরের ডাক পড়ল। জাফর এল। খলিফা হাসতে হাসতে বলেন—এদের তিনজনকে বকশিস স্বরূপ এক হাজার দিনার করে দিয়ে দাও। বেগম শাহরাজাদ কিসসা শেষ করে চুপ করলেন।
মৌলভী ও এক জেনানার কিসসা
বাদশাহ শারিয়ার-এর বিশেষ আগ্রহে বেগম শাহরাজাদ এবার ‘মৌলভী ও এক জেনানার কিসসা শুরু করলেন—এক ছন্নছাড়া নওজোয়ান ছিল। তার বহু দিনের ধান্দা অন্যের ওপর দিয়ে নিজের খাওয়া পরা চালিয়ে নেয়া। তার মধ্যে বিদ্যা শিক্ষার গন্ধও ছিল না। এক সময় তার মাথায় ফন্দি এল কিছু রােজগারপাতি করা দরকার। অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে দিন গুজরান করা কঠিন সমস্যা হয়ে দেখা দিল। অনেক ভেবেচিন্তে ফন্দি আঁটল—সে একটি মাদ্রাসা খুলে বসবে। এতে অর্থোপার্জন তাে হবেই, উপরি লাভ সমাজে খাতির প্রতিপত্তি। এ কাজে তার সবচেয়ে বড় সহায়ক হ’ল তার বড় বড় বাৎচিৎ আর ভারিক্কি চালচলন। এ দুটো গুণকেই তাে মূলধন করে সে এতদিন বহাল তবিয়তে সমাজের বুকে দাপটের সঙ্গে টিকে রয়েছে। নওজোয়ানটি একদিন সত্যি সত্যি একটি মাদ্রাসা খুলে একদা মৌলভী সেজে বসে গেল।
মৌলভীর ভারিক্কী চালচলন আর বাৎচিতে লেড়কাদের আব্বা আম্মারা সহজেই মজে গেল। তারা তাদের লেড়কাদের নির্দ্বিধায় মৌলভীর মাদ্রাসায় পাঠাতে লাগল। মৌলভী তাে বিলকুল নিরক্ষর। পেটে কালির অক্ষর বলতে কিছুই নেই। তাই একটি পাকা বেতই তার শিক্ষাদানের একমাত্র উপকরণ অবলম্বন হয়ে দাঁড়াল।
মৌলভীর মাদ্রাসায় পড়াশােনার পাঠ একদমই নেই। ছাত্ররা কিতাব স্লেট প্রভৃতি বাড়ি থেকে নিয়ে মাদ্রাসায় আসে। নিজেরা যা পারে চিল্লাচিল্লী করে পড়ে। ছুটি হলে ফিন কিতাবটিতাব গোছগাছ করে বাড়ি ফিরে যায়। মৌলভী সাহাব একটি টুল পেতে গ্যাট হয়ে কামরার মাঝখানে অত গম্ভীর হয়ে বসে থাকে। লেড়কারা কিছু জানতে চাইলে এমন চোখ বড় করে তাকায় যে ডরে তাদের কাপড়ে চোপড়ে হয়ে যাবার উপক্রম হয়। ব্যস, এ পর্যন্ত। এর পরেও জানতে চাওয়ার উৎপাত আর কোন্ লেড়কার থাকতে পারে? কিছুদিনের মধ্যেই মাদ্রাসা একদম জমজমাট হয়ে উঠল। ফলে মৌলভীর অর্থাগমের পরিমাণও চড়চড় করে বেড়ে যেতে লাগল।
একদিন ঘটল এক মজার ঘটনা। গ্রামেরই এক জেনানা একটি চিঠি নিয়ে মৌলভীর কাছে এল। জেনানাটি লেখাপড়া জানে না। মৌলভীকে দিয়ে চিঠিটি পড়িয়ে নেয়ার আশায়ই তার মাদ্রাসায় আসা।
চিঠিটি হাতে নিয়ে মৌলভী যেন একদম অথৈ পানিতে পড়ে হাবুডুবু খেতে লেগে গেল। এখন কোন্ ফন্দি করে ব্যাপারটিকে এডানাে যায় সে ভাবতে লাগল। কোন ফিকিরই বের করতে পারল না। তার সর্বাঙ্গ দিয়ে ঘাম ঝরতে লাগল। কোর্তা-পাৎলুন ভিজে জবজবে হয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে। মৌলভী উপায়ান্তর না দেখে নানা বাহানা করে মাদ্রাসা ছেড়ে বেরিয়ে যাবার ধান্দা করল। কিন্তু পারল না। পারবেই বা কি করে? জেনানাটি যে ছিনে জোঁকের মত তার গায়ে গায়ে আকড়ে রয়েছে।
জেনানাটি হাতের চিঠিটি তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল—‘খােদাতাল্লা, আপনার মঙ্গল করবেন। আমার স্বামী পাঁচ মাস পরদেশে কাটাচ্ছে। এতদিন পর সে এই প্রথম আমাকে চিঠি লিখেছে। আপনি মেহেরবানি করে চিঠিটি পড়ে দিন মৌলভী সাহাব।
‘শােন, চিঠিটি পড়ে দেব এ আর বেশী কথা কি ? কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমার হাতে একদম সময় নেই। গত কাল আসতে পার নি?”
—“চিঠিটি যে আজকেই এসেছে মৌলভী সাহাব, গত কাল আসব কি করে, আপনিই বলুন? মৌলভী খেকিয়ে উঠে বলল—“আজকেই এসেছে মৌলভী সাহাব। তার আরও আগে আসতে কি হয়েছিল? যাক গে, তুমি চিঠিটি নিয়ে পরে এক সময় এসাে, কথা দিচ্ছি পড়ে দেব। এখন একদম সময় নেই। দুপুরে নামাজের সময়। কাউকে এখন বিরক্ত করতে আসা কি উচিত? এখনই মসজিদে যেতে হবে। তুমি বরং পরেই এসাে।'
জেনানাটি ফুফিয়ে ফুফিয়ে কেঁদে এবার বল্ল—“আমি আর আমার দিকে ঠাণ্ডা রাখতে পারছি না।
-বল্লম তাে পরে এসাে। এখন আমার একদম সময় নেই।
—মেহেরবানি করে আপনি চিঠিটি পড়ে শুধু বলুন—আমার মরদ, আমার স্বামীর তবিয়ৎ আচ্ছা আছে তাে? এখন কোথায় আছে, কি করছে, বলে দিন। আমি ফিরে যাব। আপনাকে আর মােটেই বিরক্ত করব না।
কথা বলতে বলতে জেনানাটি হাতের চিঠিটি একরকম জোর করেই মৌলভীর হাতে গুঁজে দিল।
মৌলভী একদম জালে আটকা পড়ে গেল। উপায় নেই। যা হােক একটি ফন্দি করে জেনানাটির ফাঁদ থেকে বেরােতেই হবে।
মৌলভী চিঠিটির ভাঁজ খুলল। উল্টো করে চিঠিটি হাতে ধরল। এবার শুরু করল তার ফন্দি অনুযায়ী কাজ। এবার মুহূর্তকাল ধরে ঠোট দুটো বার বার নাড়িয়ে চিঠির বক্তব্য পড়ার বাহানা করল। এবার চিঠির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই পড়ার বাহানার সঙ্গে চোখ, মুখ ও হাতের বিচিত্র সব ভঙ্গি করতে লাগল। আর? কখনও চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য কপালে তুলে নেয়। চোখে-মুখে বিষাদের ছাপ ফুটিয়ে তােলে, কপালে করাঘাত করে, টুপি খুলে হাতে নেয়, চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার কখনও মৃদু স্বরে ইয়া আল্লাহ বলে ওঠে।
মৌলভীর ভাবগতিক দেখে চিঠির মালিক লেড়কিটির তাে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার জোগাড় হয়ে ওঠে। সে ধরেই নিল ব্যাপার মােটেই সুবিধের নয়। তার স্বামী হয়ত আর দুনিয়ায় নেই, গােরে আশ্রয় নিয়েছে।
জেনানাটি এবার ডুকরে কেঁদে উঠে বলে-“মৌলভী সাহাব, আমার কপালে আগুন লেগেছে, তাই না? যা ঘটেছে সাচা বলুন। আমার কাছে কিছু ছিপাবেন না। আল্লাহর কসম, যা ঘটেছে আমাকে বলুন। মৌলভী চিঠিটি হাতে নিয়ে নীরব চাহনি মেলে জেনানাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
জেনানাটির কান্নার বেগ আরও অনেকাংশে বেড়ে গেল। সে হাতের পিঠ দিয়ে চোখ রগড়াতে রগড়াতে এবার বলল —মৌলভী সাহাব, মুখে এভাবে যদি কুলুপ এঁটে থাকবেন, আমি তবে আমার পােশাক আশাক ছিড়ে ফেলব?’
‘ফেল। ছিড়েই ফেল।
–‘আমি কি তবে কপালে করাঘাত করব?’
কর। জোরসে করাঘাত কর।
–‘আমি কি গলা ছেড়ে বিলাপ জুড়ে দেব? গলা ছেড়ে কাদব?”
-দাও। কাঁদো।
-“ইয়া খােদা! আমার নসীবে এ-ও ছিল ?’ জেনানাটি গলা ছেড়ে কাঁদতে কাঁদতে মৌলভীর কাছ থেকে বেরিয়ে গেল। উন্মাদিনীর মাফিক সালােয়ার-কামিজ ছিড়তে লাগল। পােশাক আশাক ছিড়তে ছিড়তে, চুল ছিড়তে ছিড়তে জেনানাটি উর্ধ্বশ্বাসে বাড়ির দিকে ছুটতে লাগল।
জেনানাটি বাড়ির উঠানে গিয়েই ধড়াস করে আছাড় খেয়ে পড়ে গেল। কেঁদে কেঁদে উঠোনে লুটোপুটি খেতে লাগল। মহল্লার জেনানা-পুরুষ বালবাচ্চা সবাই ছুটোছুটি করে এল ব্যাপার জানার জন্য।
জেনানাটির কান্নার মাধ্যমেই সবাই বুঝতে পারে, তার কপালে আগুন লেগেছে। নসীব বিরােধিতা করেছে। তার স্বামী দুনিয়া ছেড়ে বেহেস্তে চলে গেছে।
সবাই সাধ্যমত প্রবােধ বাক্যে তাকে ঠাণ্ডা করার কোশিস করল। বৃথা চেষ্টা। স্বামীহারা অভাগিনীকে প্রবােধবাক্যে শান্ত করা যায় না।
ভিড়ের মধ্যে মহাল্লারই একজন শিক্ষিত আদমি উপস্থিত হয়েছে। সে ক্রন্দনরতা জেনানাটির হাত থেকে চিঠিটি নিয়ে চোখের সামনে ধরল। দু'ছত্র পড়েই তাে তার চক্ষুস্থির। সে বলল—“তােমার স্বামী মারা গেছে এমন বাৎ কে বলল তােমাকে?
জেনানাটি তখন কেঁদে উঠোনে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
সে-আদমিটি এবার প্রায় ধমকের স্বরে বলল —কে এমন বাৎ তােমাকে বলেছে, বল তাে? কাকে দিয়ে চিঠিটি পড়িয়েছিলে? কই কারাে ইন্তেকাল ঘটেছে এমন কোন বাৎ-ই তাে চিঠিতে নেই।
আমি চিঠির বক্তব্য পড়ে শােনাচ্ছি। শােন, শেষ পর্যন্ত শুনে যদি তােমার কান্নাকাটি করতেই হয় তখনই কোরাে। শােনাে, পড়ছি।
“ওগাে, চাচার লেড়কি, তােমাকে আমার মহব্বৎ জানাই। আমি এখানে বহুৎ আচ্ছা আছি। হপ্তা দু'-এর মধ্যেই মুলুকে ফিরছি। কতদিন হয়ে গেল তুমি আর আমি মিলিত হই নি। লেফাফাটির ভেতরে একখণ্ড শনের বহুৎ আচ্ছা কাপড়া তােমাকে ইনাম পাঠালাম। খােদাতাল্লা তােমার ভালই করুন।”
চিঠিটি পড়া শেষ হলে জেনানাটি সে-আদমির হাত থেকে চিঠিটি ছোঁ মেরে নিয়ে নিল। মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে সে ফিন মাদ্রাসার দিকে ছুটতে লাগল।
জেনানাটি মাদ্রাসার দরওয়াজা দিয়ে ঢুকেই একেবারে মৌলভীর মুখােমুখি হয়ে গেল।
জেনানাটিকে দেখেই তাে মৌলভীর মুখ একদম চুন। সে মৌলভীকে সরাসরি প্রশ্ন করে—“আমি আপনার কোন পাকাধানে মই দিয়েছি যে, আপনি আমাকে এমন এক ধোঁকা দিলেন? আমার স্বামী তাে বহাল তবিয়তেই আছে। সে আমাকে এক খণ্ড কাপড়া ইনাম পাঠিয়েছে। আর আপনি বলেন কি না তার ইন্তেকাল ঘটে গেছে।
মৌলভী মুখ কাচুমাচু করে বল্ল-“কিছু মনে কোরাে না। তখন আমি ব্যস্ত ছিলাম, জানই তাে। দিমাক আমার ঠাণ্ডা ছিল না। চিঠির পাতায় কি পড়েছি, কি তােমাকে শুনিয়েছি কিছুই আমার ইয়াদ নেই। তােমার খবর শুভ তিনি মুলুকে ফিরছেন জানতে পেরে আমিও কম খুশী হইনি। বহুৎ খুশী হয়েছি খুশীতে আমার দিল বিলকুল ভরে উঠেছে।
কিসসাটি শেষ করে বেগম শাহরাজাদ চুপ করলেন।
বাক্সবন্দী খলিফার কিস্সা
মৌলভী ও জেনানার কিসসাটি শেষ করে বেগম শাহরাজাদ বুঝতে পারলেন রাত্রি শেষ হতে এখন অনেক দেরী।
বেগম বাক্সবন্দী খলিফার কিসসা' নামে অন্য একটি শুরু করলেন—জাহাপনা, এখন যে কিসসাটি আপনার দরবারে পেশ করছি সেটি প্রখ্যাত কালােয়াতি গায়ক ইশাকের মুখ থেকে কোন এক সময় শুনেছিলাম। ইশাক কিসসাটি এভাবে বলেছিলেন—এক রাত্রে আমি একদম মত্ত অবস্থায় বাড়ি ফিরছিলাম। গলা পর্যন্ত সরাব পান করেছিলাম।

0 Comments