গাধার মালিকটি সে-গাধাটির দিকে তাকিয়ে অনুচ্চকণ্ঠে বলতে লাগল—“হতচ্ছাড়া নচ্ছারটি নির্ঘাৎ তার মাকে জ্বালাতন করে মেরেছে। বাধ্য হয়ে তার আম্মা তাকে ফিন গােসসা করে গাধা বানিয়ে দিয়েছে। অসম্ভব। এমন শয়তানকে ফিন কিছুতেই খরিদ করে ঘরে নিয়ে যাব না।' রাগে-দুঃখে-বিতৃষ্ণায় গাধাটিকে লক্ষ্য করে বার কয়েক থুক ফেলে সে অন্য একটি গাধার দিকে এগিয়ে গেল। দরদস্তুর করে সেটিকে খরিদ করে ঘরে ফিরল।
কিসসা শেষ করে বেগম শাহরাজাদ চুপ করলেন। কিছু সময় বাদে বাদশাহ শারিয়ার-এর অত্যুগ্র আগ্রহে আর একটি কিসসা শুরু করার জন্য তৈরী হলেন।
জুবেদার কিসসা
বেগম শাহরাজাদ বললেন—জাঁহাপনা, এবার আপনাকে জুবেদার কিসসা’ শােনাচ্ছি। জুবেদা ছিলেন খলিফা হারুণ-অল রসিদ-এর খাস বেগম।
এক দুপুরে খলিফা আচমকা বেগম জুবেদার কামরায় হাজির হলেন।
খলিফা বেগমের পালঙ্কের কাছে যেতেই বিছানার চাদরের গায়ে একটি অবাঞ্ছিত দাগের দিকে তার নজরে পড়ল। টাটকা অথচ ফ্যাকাসে দাগ। সেদিকে নজর পড়তেই খলিফার চোখে-মুখে হতাশার ছাপ ফুটে উঠল। সামান্য একটি দাগ তার মেজাজ মর্জি একদম বিগড়ে দিল।
ব্যাপারটি দেখে খলিফার শিরে যেন মুহুর্তে খুন চেপে গেল। তিনি বেশ রাগত স্বরেই বলে উঠলেন—এ কি জুবেদা! ব্যাপার কি? চাদরে এ কিসের দাগ?
জুবেদা খলিফার অঙ্গুলি নির্দেশিত দাগটির দিকে তাকিয়েই আঁৎকে উঠলেন। তবু নিঃসন্দেহ হবার জন্য প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে অবাঞ্ছিত সে-দাগটি পরীক্ষা করতে লাগলেন। কোন সুরাহা করতে না পেরে নাকটিকে নামিয়ে নিয়ে তার গন্ধ শুকলেন। তারপর ফ্যাকাসে মুখ বললেন-“জাহাপনা, গন্ধ শুকে মালুম হচ্ছে, পুরুষের বীর্যের দাগ।
খলিফা গুলিখাওয়া শেরের মত গর্জে উঠলেন—‘পুরুষের বীর্য! একী আজব কারবার! আমি কিছুতেই ভেবে উঠতে পারছিনা বেগম, দুপুরে তােমার বিছানায় তাজা বীর্য কি করে পড়তে পারে! বেগম জুবেদা অবাঞ্ছিত দাগটির দিকে নীরবে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
খলিফা বলে চললেন-“তােমার বিছানায় তাজা বীর্যের দাগ। আমাকে যারপরনাই বিচলিত করছে জুবেদা। প্রায় এক সপ্তাহ বাদে আমি তােমার কামরায় এলাম। তবে তাজা বীর্য কি করে এল ?
-জাহাপনা, আপনি কি আমাকে অন্যরকম সন্দেহ করছেন? আপনিই বলুন, আপনার অবিশ্বাসের পাত্রী হওয়ার মত কাজ আমি কোনদিন করেছি, নাকি করা সম্ভব? আপনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার মত প্রবৃত্তি আমার কোনদিনই ছিল না, আজও নেই।
-“কিন্তু...তবে একি করে সম্ভব হ’ল?’
—“আপনি কি ভাবছেন, আমি পরপুরুষের শয্যাসঙ্গিনী হয়েছিলাম? আপনার চোখে ধুলাে দিয়ে আমি ব্যাভিচারে লিপ্ত হয়েছি?
—“কি জানি জুবেদা, কিছু ভাবতে পারছি না আমি। —“আপনি তবে আমাকে সন্দেহ করছেন?
আমিও তা-ই ভাবছি। আমার দিমাক ঠিক কাজ করছে না। কাজী ইউসুফকে তলব করছি। তিনি বিচক্ষণ আদমি। বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ বিচারক হিসাবে তার যথেষ্ট নাম ডাক রয়েছে। অবাঞ্ছিত দাগটি সম্বন্ধে তিনি কি মন্তব্য করেন আমাকে অবশ্যই জানতে হবে।
জুবেদা নীরব চাহনি মেলে খলিফার দিকে তাকিয়ে রইলেন। খলিফা বলে চললেন—“শােন জুবেদা, তুমি আমার চাচার লেড়কি। আমার শাদী করা বেগমের মর্যাদা তুমি লাভ করেছ। আমার বংশের নামযশ রক্ষায় তােমার ভূমিকাও কম নয়। কাজী বিচার করে যদি তােমাকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেন তবে তােমার গুস্তাকির শাস্তি তােমাকে আমি দিতে বাধ্য হব।'
খলিফার তলব পেয়ে কাজী ইউসুফ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। খলিফার মুখে সবকিছু শুনে তিনি একলাফে তড়াক করে বিছানায় উঠে গেলেন।
অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে দাগটির দিকে তাকিয়ে কাজী তার ঠিক কেন্দ্রস্থলে তর্জনি স্থাপন করলেন। মুহূর্তকাল বাদে তর্জনিটি চোখের সামনে নিয়ে গেলেন। বার কয়েক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। না, ফয়সালা করতে পারলেন না। এবার তর্জনিটিকে নাকের একদম গা-ঘেঁষে নিয়ে গেলেন। গন্ধ শুকলেন বার বার। সবশেষে রায় দিতে গিয়ে স্পষ্টভাষায় ব্যক্ত করলেন—“জাঁহাপনা, আমি নিঃসন্দেহ, এ-নির্ঘাৎ আদমির বীর্যের দাগ।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ একাশিতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর শুরু হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসাটির পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—জাঁহাপনা,কাজী নির্দ্বিধায়ই বললেন, আদমির বীর্যই বটে। আর একদম তাজা। আদমির দেহ থেকে সদ্যই বেরিয়েছে জাঁহাপনা।
—“আদমির বীর্য? তাজা? সদ্য বেরিয়েছে? কিন্তু কি করে এমন এক অসম্ভব কাণ্ড সম্ভব হ’ল আমার দিমাকে আসছে না তাে। আমি সাতদিন বাদে বেগমের এ-কামরায় এসেছি। দাগটি আমার চোখে পড়েছে আমি বিছানা স্পর্শ করার আগেই। | কাজী ইউসুফ বিচক্ষণ ও পাকা বৃদ্ধির ধারক। তিনি নিঃসন্দে।। হলেন, এতে বেগম সাহেবা তার ওপর বিলকুল চট যাবেন। পাগ যারই হােক না কেন, বেগমের চক্ষুশূল হলে পরিণাম কি যে হবে তা তার অনুমান করতে অসুবিধা হল না। তিনি বেগমকে বাঁচার ফিকির বের করে নিজের মঙ্গল বিধানের কাজে মন দিলেন। অন্যথায় বেগমের ক্রোধ জিন্দেগী বরবাদ করে দিলেও তাজ্জব বনার কিছু নয়।
কাজী ইউসুফ অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিমেলে এবার কামরাটির ছাদের ওপর চোখ বুলাতে লাগলেন। ছাদের গায়ে একটি বাদুড়কে ঝুলে থাকতে দেখে খুশীতে তার দিল ভরে উঠল। মুখে দেখা দিল হাসির ঝিলিক। এবার খলিফার দিকে তাকিয়ে বললেন-জাহাপনা। একটি তরবারির বন্দোবস্ত করে দিতে পারেন?
খলিফা মুহূর্তের জন্য কাজীর মুখের দিকে তাকালেন। ব্যাপার অনুমান করতে না পেরে এক নফরকে একটি তরবারি নিয়ে আসতে হুকুম করলেন। কাজী তরবারি দিয়ে এক কোপে বাদুড়টিকে দ্বিধা বিভক্ত করে ফেললেন।
রক্তাপ্লুত মড়া বাদুরটির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে কাজী এবার বললেন- ‘জাহাপনা, বিছানার চাদরের গায়ের ওই বীর্যের দাগ এরই বীর্য থেকে পয়দা হয়েছে। বাদুড়ের বীর্য অবিকল আদমির বীর্যের মাফিক।
খলিফা বিস্ময় মাখানাে দৃষ্টিতে কাজীর মুখের দিকে তাকালেন।
কাজী এবার বললেন—জাহাপনা, আমাদের হেকিমি বিদ্যার কিতাবে লেখা আছে— বাদুড়ের বীর্য, আর আদমির বীর্যের বিলকুল মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
—“কিন্তু অহেতুক বীর্যপাত
খলিফার মুখের বাৎ মিলিয়ে নিয়ে কাজী বললেন—‘অহেতুক হতে যাবে কেন জাহাপনা, আমার বিশ্বাস, বেগম সাহেবা একটু আগে যখন গভীর নিদে আচ্ছন্ন ছিলেন তখন তার অজান্তে বাদুড়টি তার ওপর চড়াও হয়েছিল, ব্যস, তারই প্রমাণ রয়ে গেছে বিছানার চাদরের গায়ে। আমি এর জান নিয়ে তার প্রাপ্য শাস্তি দিয়েছি।
কাজী ইউসুফ-এর বাৎ শুনে খলিফা নিঃসন্দেহ হলেন, জুবেদা নির্দোষ, নিরপরাধিনী। যে ব্যপারে তার অজান্তে ঘটে গেছে তার জন্য তার প্রতি দোষারােপ করা নির্বুদ্ধিতা ছাড়া কিছু নয়। খলিফার মুখে হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল। তার চেয়ে বেশী খুশী হলেন বেগম সাহেবা জুবেদা।
কাজীর বিচক্ষণতার পুরস্কার স্বরূপ খলিফা বহুমূল্যের ইনাম দিলেন। তার চেয়ে ঢের, ঢের বেশী মূল্যের রত্নালঙ্কারে কাজী সাহাবকে তুষ্ট করলেন। আর হরেক কিসিমের খানা আর দামী সৱাব দিয়ে নৈশ ভােজ সেরে তবে নিজের মকানে ফিরে যাবার উদ্যোগ নিলেন।
বেগম শাহরাজাদ কয়েকটি ফল নিজে হাতে কেটে কাজীকে খেতে দিলেন। কাজীর খাওয়া হলে জিজ্ঞাসা করলেন—'এদের মধ্যে কোন্ ফলটি সবচেয়ে আচ্ছা, বলুন তাে কাজী সাহাব।'
কাজী আমতা আমতা করে বললেন—বেগম সাহেবা, আপনার এ-প্রশ্নের জবাব দেওয়া আমার পক্ষে বড়ই সমস্যার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, সব কিসিমের ফলই তাে এখন আমার উদরে অবস্থান করছে। একটির গুণগান করলে বাকীরা ব্যাজার হবে। বিদ্রোহ করবে। ব্যস, গর হজমের যন্ত্রণা আমাকে পােহাতে হবে।
কাজীর মন্তব্য শুনে খলিফা ও বেগম উভয়েই সরবে হেসে উঠলেন।
বাদশাহ শারিয়ার স্বীকার করলেন, খলিফা অল্প সময়ের জন্য হলেও বেগম জুবেদাকে সন্দেহ করেন। আর তাঁর এ-কাজ অবশ্যই উচিত হয়নি।
জেলের কিসসা
বেগম শাহরাজাদ জুবেদার কিসসাটি শেষ করে অন্য আর একটি কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, এবার আপনাকে জেলে সিরিনের কিসসা শােনাচ্ছি। লােকমুখে শােনা যায় পারস্যের সুলতান খুসরাও খুবই মছলি প্রিয় ছিলেন।
সুলতান খুসরাও এক সকালে তার খুবসুরৎ বেগমকে নিয়ে প্রাসাদের ছাদের ওপর বসে খােশ মেজাজে বাৎচিৎ করছিলেন। এমন সময় এক বুড়াে জেলে কিছু মছলি নিয়ে প্রাসাদের সদর দরওয়াজায় হাজির হল।
জেলেকে দেখতে পেয়ে সুলতান ছাদ থেকে নেমে এলেন।
বুড়াে জেলেটি একটি বেশ বড়সড় মছলি সুলতানকে দেখাল।
উজিরকে, চার হাজার দিরহাম দাম মিটিয়ে দিয়ে মছলিটি খরিদ করে নেবার হুকুম দিলেন।
এক মছলির দাম চার হাজার দিরহাম—সুলতানের এরকম উদারতায় বেগম মােটেই খুশী হতে পারলেন না। তিনি সুলতানকে একটি মাত্র মছলির জন্য এত ইনাম দিতে বার বার নিষেধ করলেন। যুক্তি দেখালেন, ভবিষ্যতে যে কেউ কিছু বেচতে আসবে সে-ই এরকম আশমান ছোঁয়া ইনাম আশা করবে।
–“কিন্তু বেগম সাহেবা, আমি একবার যা স্বেচ্ছায় দান করে ফেলেছি তা কি আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় ? নাকি উচিত। যা হয়ে গেছে তা নিয়ে মেজাজ খারাপ করা ঠিক নয়।'
বেগম সিরিন প্রবল আপত্তি তুলে বললেন তােমার ইজ্জতে বাঁধছে? বহুৎ আচ্ছা, আমিই বন্দোবস্ত করছি।
-বন্দোবস্ত ? কি বন্দোবস্ত-
তাকে থামিয়ে দিয়ে বেগম বললেন -“এমন বন্দোবস্ত করব। যাতে একূল ওকূল দু'কূলই রক্ষা হতে পারে। জেলের কাছ থেকে | দিরহামগুলাে ফেরৎ নেব, আবার আপনার ইজ্জতও খােয়া যাবে না।
–“কিন্তু কিভাবে, বলবে কি?
–‘একটি চমৎকার মতলব আমার মাথায় এসেছে। 'তুমি জেলেটিকে শুধাও, তার মছলিটি মরদানা নাকি জনানা। সে জবাব দেবে হয় পুরুষ নয়তাে জনানা—এই তাে? যদি বলে পুরুষ তবে সঙ্গে সঙ্গে বলবে, তােমার মছলি নিয়ে যাও। পুরুষ মছলি আমি খাইনা। আর যদি বলে জনানা তবু বলবে নিয়ে যাও, কারণ দর্শাবে, আমি জনানা মছলি খাইনা। এতেই তােমার উদ্দেশ্যে সিদ্ধ হয়ে যাবে।
বেগম সাহেবাকে খুশী করার জন্য সুলতান উপায়ান্তর না দেখে জেলেকে তলব করলেন।
জেলে এগিয়ে এলে সুলতান বললেন—“ওহে, মছলি তাে তােমার কাছ থেকে রাখলাম, কিন্তু মছলিটি কি পুরুষ, নাকি জনানা, বল তাে? সুলতানের প্রশ্নটি কানে যেতেই জেলেটি প্রথমে খুবই হকচকিয়ে গেল। মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে তার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলল —জাঁহাপনা, আমার মছলিটি পুরুষও নয়, জনানাও নয়।'
সুলতান চোখ দুটো কপালে তুলে বললেন-'এ কী অদ্ভুত বাৎ শােনালে হে। পুরুষ নয়, জনানাও নয় অজব বাৎ নয় কি ?
---“জাহাপনা, বাৎটিকে সাচ্চা জ্ঞান করবেন। আমার মছলিটি আদতে একটি ক্লীব।
-ক্লীব।' জেলের বাৎ শুনে খলিফা তাে খুশীতে একদম ডগমগ হয়ে পড়লেন। পুরুষও নয়, জনানাও নয় এমন অত্যাশ্চর্য একটি মছলি খরিদ করতে পেরেছেন দেখে তিনি তাে আত্মহারা হয়ে পড়ার জোগাড় হলেন।
ব্যস, আর দেরী নয়। সুলতান উজিরকে হুকুম দিলেন, জেলেকে চার হাজারের বিনিময়ে আট হাজার দিনার দিয়ে দেওয়া হােক।
বুড়াে জেলে চার হাজার দিরহামের মছলি আট হাজার দিরহাম দাম বুঝে পেয়ে নিজের মকানের দিকে পা বাড়াল।
প্রাসাদের সদর দরওয়াজা পেরােবার আগেই দিরহামের থলিটির মুখ আলগা হয়ে দিনার মাটিতে ছড়িয়ে পড়ল। সে হামাগুড়ি দিয়ে একটি একটি করে দিরহাম কুড়িয়ে থলিতে ভরতে লাগল। কিন্তু শেষ দিরহামটি হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগল। সুলতান খুসরাও এবং তার বেগম সিরিন ছাদের ওপর বসে ব্যাপারটি দেখে সােল্লাসে প্রায় নাচানাচি জুড়ে দিলেন।
এমন সময়ে পূব-আকাশে রক্তিম ছােপ ফুটে উঠল। ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ বিরাশিতম রজনী
বেগম শাহরাজাদ কিসসাটির পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-জাহাপনা, ব্যাপারটি লক্ষ্য করুন, লােকটি ধরতে গেলে চার হাজার দিরহাম ফোকটাই-ই পেয়ে গেল। কিন্তু একটি মাত্র দিরহাম খুঁজে না পেয়ে কেমন উন্মাদের মত ছুটাছুটি করছে, একবারটি দেখুন।
সুলতান বললেন-“একদম সাচ্চা বাৎ। বুড়াে জেলেটি কিপটের একশেষ। ঠিক আছে, আমি তাকে তলব করছি।”
সুলতানের তলব পেয়ে জেলেটি ফিরল।
সুলতান বললেন-“কি হে, তুমি এমন কঞ্জুস কেন বল তাে? একটি মাত্র দিরহামের মায়াও ছাড়তে পারলে না। তােমার দিল যেন আদমির নয়, চিড়িয়ার। মাত্র তাে একটি দিরহাম। খুঁজে যদি না-ই মেলে তবে তােমার এমন কি লােকসান হ'ত বল তাে? তােমার প্রাপ্যের চেয়ে ঢের বেশী দিরহামই তাে পেয়েছ। একটি দিরহাম কোন গরীব ভিখমাঙ্গই না হয় কুড়িয়ে পেত। তাতে এমন কি ক্ষতি তােমার হত?
বুড়াে জেলে কুর্নিশ সেরে বলল —“খােদা মেহেরবান।। জাঁহাপনা, একটি মাত্র দিরহাম খােয়া গেলে আমার যে বহুৎ লােকসান হত তা নয়, সাচ্চা বাৎ। মাত্র একটি দিরহামের জন্য এত সময় ও ধৈর্য নষ্ট করা সঙ্গত নয় তা আমারও অজানা নয়। আদতে অন্য এক কারণে আমি এমন হন্যে হয়ে দিরহামটি তল্লাসী চালাচ্ছিলাম। এ যে সুলতানের কাছ থেকে পাওয়া ইনাম। এর বিচার অর্থের মাপকাঠি দিয়ে করা সম্ভব নয়। এর এক একটি দিরহাম আমার কাছে এক লাখ সােনার মােহরের চেয়েও বেশী।
বুড়াে জেলের বাৎ শুনে সুলতান তাে খুশীতে একদম ডগমগ হয়ে গেলেন। এ-আদমি দানের মর্যাদা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। এরকম জ্ঞানী আদমি লাখে একটি মেলে কিনা সন্দেহ। তিনি খাজাঞ্চিকে ডেকে হুকুম দিলেন—‘জেলেকে আরও বার হাজার দিরহাম ইনাম দিয়ে দাও। আর প্রাসাদে ও প্রাসাদের বাইরে সর্বত্র ঘােষণা করে দাও-জনানার বাৎ শুনে কেউ যেন আর কোন কাজ করতে উৎসাহীনা হয়। তাদের পরামর্শে চললে যে কোন লােকসান সাধারণ লােকসানের থেকে চারগুণ হতে বাধ্য।
ইবন অল কবিবীর কিসসা
জেলের কিসসা শেষ করে বেগম শাহরাজাদ এবার ‘ইবন অল কবিবীর কিসসা শুরু করলেন। বেগম বললেন—জাহাপনা, এক মাঝরাত্রে খলিফা হারুণ-অল-রসিদ নির্জন অবস্থায় সময় কাটাচ্ছিলেন। বহুৎ কোশিস করলেন তবু কিছুতেই দু’চোখের পাতা এক করতে পারলেন না। শেষ পর্যন্ত অস্থিরচিত্ত খলিফা এক সময়

0 Comments