এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ' ছিয়াত্তরতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ গল্পের অবশিষ্টাংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাহাপনা, আলী এবার বলল - কাজী আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিলেন--এবার বল, তােমার অভিযােগ কি ?
আমি কি বলব, ভেবে পাচ্ছিলাম না। কারাে মুখ থেকে এমন সব তাজ্জব বাৎ শুনলে দিমাক ঠিক থাকতে পারে, আপনিই বলুন জাহাপনা ? কিছুক্ষণের মধ্যে নিজেকে একটু সামলে নিয়ে আমি কাজীকে বললাম-“হুজুর, খােদাতাল্লার দোয়ায় আপনার খ্যাতি ও প্রতিপত্তি বাড়িয়ে দেবেন। হুজুর, আমার বটুয়াটিতে একটি সভাকক্ষের ভাঙাচোরা সামানপত্র রয়েছে, আর বিশালয়াতন একটি প্রাসাদও রয়েছে। কিন্তু রসুইখানা বা তার কোন ভাঙাচোরা অংশ নেই। আর একটি বড়সড় কুত্তার খোয়াড়, আর বালবাচ্চার লিখাপড়া করার মাদ্রাসা রয়েছে একটি। একদল দাবাড়ু, একদল পল্টন, ডাকাতদের ঘাঁটি একটি, একটি জাদরেল সেনাপতি, পুরাে বাগদাদ আর বসরাহনগর, আদের বেটা আমির সাদ্দাস-এর এক প্রাচীন ইমারত, পাঁচটি খুবসুরৎ লেড়কা, বারােটি কুমারী লেড়কী, এক হাজার মরুসর্দার, আর একটি কামারশালা রয়েছে আমার এ বটুয়াটির মধ্যে। আপনি পরীক্ষার মাধ্যমে আমার বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করে দেখতে পারেন। আমি হুজুরের কাছে বটুয়াটি দাবী করছি।
আমার বক্তব্য শেষ হতে না হতেই হতচ্ছাড়া নিগ্রোটি কপাল চাপড়ে কাঁদতে লাগল। সে কান্নার ফাঁকে বলল—‘হুজুর, বটুয়াটি যে আমার তা অনেকেই জানে। আর একটি বাৎ, একটু আগে আমি যে সামানপত্রের ফর্দা হুজুরের দরবারে পেশ করেছি সেগুলাে ছাড়াও কিছু সামানপত্র বটুয়াটির মধ্যে রয়েছে। সেগুলাে হ’ল-দশটি অতিকায় গম্বুজ, দুটো বে-দখল নগর, চারজন দাবাড়ু, বাচ্চা ঘােড়া দুটো, একটি মাদী ঘােড়া, দুটো বড়সড় রসায়নাগার, টাটুঘােড়া দুটো, পাল খাওয়া ঘােড়া একটা, উচ্ছন্নে যাওয়া ছােড়া দুটো, দুটো খরগােস, বাঁদীদের দালাল দুটো, একজন ল্যাংড়া, একজন জ্যোতিষী, একজন অন্ধ, অসাড় লােক দু' জন, ফকির দু’জন, নাবিকভর্তি এক জাহাজ, একজন জাহাজের ক্যাপ্টেন, পাঠান ধর্মযাজক একজন, একজন কাজী আর সমাজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা একজন প্রভৃতি। আর দু’জন সাক্ষীও রয়েছে যারা সাক্ষ্যদান করবে আমিই বটুয়াটির মালিক।
কাজী ফিন আমার দিকে তাকালেন। বললেন-শােন, এর জবাবের বিরুদ্ধে তােমার কোন বক্তব্য থাকলে বলতে পার।
খলিফা হারুণ-অল-রসিদ-কে লক্ষ্য ক'রে আলী এবার বলল-“জাহাপনা, নচ্ছার নিগ্রোটির বাৎ শুনে আমার দিমাক গরম হয়ে গেল। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে কাজীর প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বল্লাম—‘আল্লাতাল্লা আমাদের কাজীকে আরও নিরপেক্ষ বিচারের বুদ্ধি জোগান। হুজুর, আমি আগে যেসব সামানপত্রের কথা বলেছি, যা আমার বটুয়াটির ভেতরে রয়েছে বলে দাবী করেছি সেগুলাে ছাড়াও কিছু সামানপত্র তাতে রয়েছে। সে সব সামানপত্রের কথা এক এক করে বলছি। ধৈর্য ধরে শুনুন ধর্মাবতার বটুয়াটির ভেতরে রয়েছে পুরাে একটি সেনাবাহিনীর পােশাক আশাক, এক সহস্র লড়াকু ঘােড়া, কিছু মাথাব্যথার দাওয়াই, লেড়কি প্রিয় আদমি একদল, একটা হরিণের খােয়াড়, একদল সুসজ্জিত ছােড়া, আঙুর ক্ষেত, ডুমুর ও আপেলের বাগিচা, ফুল ও ফলের গাছের বাগিচা একটা, নবদম্পতি, বেশ কিছু সংখ্যক ভীরু আদমি, একদল কর্মরত আদমিসহ বিশাল একটি শস্যক্ষেত্র। হামাম থেকে বেরিয়ে আসা খুসবুযুক্ত বাতাস, দুর্গন্ধময় বাতকর্ম, বেশ কিছু সংখ্যক নিশান, বিশজন সুগায়িকা, বিশটা নাচনেওয়ালী, একটা বড়সড় মসজিদ, কতগুলি হামাম, এক শ’ বণিক, পঞ্চাশটা ভাড়ার, বংশীবাদক নিগ্রো একটা আর দামিয়েটা, গাজা ও শাবন নগর তিনটা আর পুরাে কুফা নগরটা, ইস্পাহানের মাঝামাঝি অংশের সম্পূর্ণ ভূখণ্ড, সুলেমান-এর সুমুফীজ আমুশিরবান প্রাসাদের কক্ষ প্রভৃতি।
জাঁহাপনা, সামানপত্রের ফিরিস্তি দিয়ে আমি বললাম-খােদাতাল্লা কাজী সাহাবকে দীর্ঘজীবী করুন। এইমাত্র যেসব সামানপত্রের বাৎ আমি বল্লাম তা ছাড়া আমার এবটুয়াটির ভেতরে দাড়ি কামাবার ক্ষুর, একটি শবাধার এবং শবাচ্ছাদনের বস্ত্রও বটুয়াটির মধ্যে রয়েছে। আমি ফিন বলছি ধর্মাবতার, বটুয়াটি আমার, একদম আমার নিজস্ব। আমার বাৎ শেষ হলে কাজী একবার আমার মুখের দিকে পরমুহূর্তে নচ্ছার নিগ্রোটির দিকে তাকালেন। এক সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠলেন—“ইয়া আল্লাহ! তােমরা উভয়েই মিথ্যাবাদী শয়তান। আইন কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এখানে মস্করা করতে এসেছ। আর তা যদি না হয় তবে এ বটুয়াটি কোন এক অলৌকিক সামগ্রী।
জাহাপনা, হতচ্ছাড়া নিগ্রোটি এবং আমি—উভয়েই নীরব চাহনি মেলে কাজীর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম।
কাজী এবার হাত বাড়িয়ে বটুয়াটি তুলে নিলেন। তার মুখ খুললেন, তার ভেতর থেকে কতগুলাে জলপাইয়ের বিচি আর কমলা রঙ বিশিষ্ট একটি বড়ি বের করে আনলেন।
ব্যাপার দেখে কাজী তাে একদম ঘাবড়ে গেলেন। আমি ব্যস্ত হয়ে বলে ফেল্লাম—‘ধর্মাবতার, এবটুয়া আমার নয়। নির্ঘাত এ-নিগ্রোরই বটুয়া। আপনি একেই বটুয়াটি দিয়ে দিন। এর ওপর আমার কোন দাবী নেই। আমি এর মালিকানার দাবী তুলে নিচ্ছি। কথা বলতে বলতে আমি কাজীর কামরা ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।
আলীর কিসসাটি শুনে খলিফা হারুণ অল রসিদ তাে হেসে লুটোপুটি খাওয়ার জোগাড়। খুশী হয়ে খলিফা আলীকে হরেক কিসিমের ইনাম দিয়ে বিদায় দিলেন।
কিসসা শেষ করে বেগম শাহরাজাদ বললেন—জাহাপনা, এর চেয়েও বহুৎ মজাদার কিসসা আমার জানা আছে। আপনার হুকুম হলে আমি এবার খলিফা হারুণ-অল-রসিদের মহব্বতের কিসসা শুরু করতে পারি।
বাদশাহ শারিয়ার অত্যুগ্র আগ্রহ প্রকাশ করে বলেন-‘বেগম সাহেবা, এখন রাত্রি অনেকই আছে। তুমি কিসসা শুরু কর।'
খলিফা হারুণ-অল-রসিদের মহব্বতের কিসসা
বেগম শাহরাজাদ কিসসা শুরু করলেন—“জাঁহাপনা, খলিফা হারুণ-অল-রসিদ এক রাত্রে তার দুই খুবসুরৎ যুবতী মেহবুবাকে দুইপাশে শুইয়ে সুখে রাত্রি গুজরান করছেন। যুবতীদের একটি কুফার আর অন্যটি মদিনার লেড়কি। উভয় জনানাকেই খলিফা খুবই পিয়ার করতেন। দুই জনানাকে নিয়ে খলিফা তাে সে-রাত্রে শুলেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল তিনি কাকে সম্ভোগ করবেন। কারণ এক সঙ্গে দু’জনকে তো আর খুশী করা সম্ভব নয়। একজনকে খুশী করার কোশিস করলে অন্যজনের মুখ ভার হবে, এতে তাজ্জব হওয়ার কিছু নেই।
বহু চিন্তা ভাবনা করে খলিফা মনস্থির করলেন, যে-লেড়কি তাকে খুশী করতে পারবে তিনি তাকেই সে-রাত্রিটি পুরস্কার দেবেন।
খলিফার অভিমত জানতে পেরে মদিনার লেড়কিটি খলিফার হাত টিপতে শুরু করে দিল। এদিকে কুফার লেড়কিটিও চুপ করে বসে রইল না। সে খলিফার পা টেপার কাজে মেতে গেল। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, সে-ই বেশী সুযােগ লাভ করল।
কুফার লেড়কিটি খলিফার পায়ের পাতা টিপতে টিপতে হাত হাঁটু পর্যন্ত তুলে আনল। তারপর ? হাত দুটো ক্রমেই ওপরের দিকে তুলতে লাগল, ওপরে—আরও ওপরে তুলতে তুলতে হাতদুটোকে একেবারে নিষিদ্ধ অঞ্চলে চালান দিয়ে দিল।
জব্বর কৌশল, এ-কৌশলকে কাজে লাগিয়েই সে মদিনার লেড়কিটিকে টেক্কা দিয়ে দিল। কুফার লেড়কিটি খলিফার কলিজায় আগুন জ্বেলে দেয়, আর খুনে জাগিয়ে তােলে মাতন। সে যেন আশমানের চাদকে হাতের মুঠোয় পেয়ে গেল।
কুফার লেড়কিটির সাফল্য দেখে মদিনার লেড়কিটি চমকে উঠে বলে—এ কী তাজ্জব কাণ্ড করলে তুমি। তুমিই যে বাজী মাৎ করে দিলে!’
কথা বলতে বলতে মদিনার লেড়কিটি কুফার লেড়কিটিকে সজোরে এক ধাক্কা দিয়ে পালঙ্ক থেকে নিচে নামিয়ে দেয়। কুফার লেড়কি ব্যাপার দেখে তাজ্জব বনে যায়। সে মর্মাহত হয়ে বলে কাজটি কিন্তু ঠিক করলে না। এরকম জবরদস্তি করে তুমি গলতিই করেছ। আমার প্রাপ্য ধন তুমি ছিনিয়ে নিলে, মুখের গ্রাস জবরদখল করার কোশিস করছ!
এবার কুফার লেড়কিটি মদিনার লেড়কিটির ওপর সক্রোধে ঝাপিয়ে পড়ল। ব্যস, শুরু হয়ে গেল রীতিমত ধস্তাধস্তি। কেউ-ই কমতি নয়। একবার মদিনার লেড়কিটি কুফার লেড়কির বুকের ওপরে চেপে সমানে কিল-চড় মারতে থাকে। পর মুহুর্তেই কুফার লেড়কিটি এক ঝটকায় মদিনার লেড়কির ওপরে উঠে যায়। মদিনার লেড়কিটি তলে পড়ে সমানে তর্জন গর্জন করতে থাকে—আমার জিনিস আমি কিছুতেই ছাড়তে নারাজ। তুমি আরম্ভ করতে পার বটে, কিন্তু আমি একেবারে নিকেষ করে ছাড়ব, বলে দিচ্ছি।
এদিকে খলিফা হারুণ-অল-রসিদ নীরবে তাদের ধস্তাধস্তি ও বাকযুদ্ধ দেখছিলেন। ব্যাপারটি তার কাছে রীতিমত উপভােগ্যই হয়ে উঠেছিল। এবার তিনি মনস্থির করলেন, তাদের উভয়কেই তিনি খুশী করবেন। কারাে সাধ অপূর্ণ রাখবেন না।
কিসসাটি শেষ করে বেগম শাহরাজাদ বললেন—জাহাপনা, এবার আপনাকে এর চেয়ে চমকপদ ও অপেক্ষাকৃত বড় একটি কিসসা শােনাব।
নওজোয়ান ও মাঝ বয়সী মরদের কিসসা
বেগম শাহরাজাদ কিসসা শুরু করলেন—জাহাপনা, কোন এক সময়ে দুই জনানার মধ্যে ঝগড়া বেঁধেছিল। একদম তুমুল ঝগড়া।
তাদের ঝগড়ার বিষয়—মহব্বতের ব্যাপারে নওজোয়ান, নাকি মাঝবয়সী মরদ বেশী আকর্ষণীয়।
আবু অল-আইনা এক সময় কিসসাটি বলেছিল—‘এক গােধূলি বেলায় আমি গুটি গুটি ছাদের ওপর উঠে গিয়েছিলাম। একটু মুক্ত বাতাস খাওয়াই ছিল আমার একমাত্র উদ্দেশ্য। আমি অন্যমনস্ক ভাবে ছাদের ওপর পায়চারি করতে করতে হঠাৎ শুনতে পেলাম পাশের বাড়ির ছাদের দিক থেকে দুই জনানার কণ্ঠের ঝগড়ার আওয়াজ ভেসে আসছে। তাদের কণ্ঠস্বর ক্রমেই চড়তে লাগল।
জনানা দুটো আমার মহল্লারই, দুই প্রতিবেশীর বিবি। তাদের স্বামী থাকা সত্ত্বেও উভয়েরই একজন করে মেহবুব রয়েছে। এরকম হওয়ার পিছনে যুক্তি এই যে, তাদের যৌবন এখনও রয়ে গেছে। কিন্তু তাদের স্বামী রত্ন দুটিই বুড়াে হয়ে পড়েছে। কর্মক্ষমতা বলতে যা বুঝায় তা তিলমাত্রও তাদের আর অবশিষ্ট নেই। জনানা দুটোর মধ্যে একজনের মেহবুব নওজোয়ান। একদম তরতাজা। আর অন্যজনের মেহবুবটি মাঝ বয়সি মরদ। তবে শক্ত সামর্থ্য। কামকাজের ক্ষমতা, এখনও পুরােমাত্রায় রয়েছে। তারা এমন তুমুল বাকবিতণ্ডা জুড়ে দিয়েছে যে, কেউ তাদের বাৎচিৎ শুনছে কিনা সে হুঁসও হারিয়ে ফেলেছে।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিস্সা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ সাতাত্তরতম রজনী
রাত্রি একটু গভীর হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বলেন—জাঁহাপনা, আবু অল-আইনা এবার বল-কোন্দলরতা জনানা দুটোর মধ্যে একজন চিল্লিয়ে বলতে লাগল, আচ্ছা বহিনজী, তােমার মেহবুবের মুখে তাে ইয়া বড় বড় দাড়ি, মুখ একেবারে ভরতি। এরকম বিশ্রী একটি ব্যাপারকে তুমি কি করে বরদাস্ত কর, বল তাে? এমন কোন মরদকে চোখের সামনে দেখলে কারাে দিলে মহব্বতের জোয়ার বইতে পারে ? ইয়া আল্লা, বিদঘুটে চেহারার আদমিটির গোঁফের চুল যখন তােমার ঠোট দুটোর ফাক দিয়ে ভেতরে ঢুকে যায়, তখন ? আর সে তােমাকে আদর-সােহাগ করতে করতে হঠাৎ যখন তােমাকে চুম্বন করে বসে তখন তােমার গাল দুটোতে চিড় ধরে না? তাজ্জব ব্যাপার বহিনজী। কি করে যে তুমি এসব বে-আদবি বরদাস্ত কর। ভেবে পাই না!
ভাল চাও তাে এখনও সময় আছে, আমার বাৎ শােন—তােমার মেহবুবটিকে পাল্টাও | আমার মেহবুব কেমন খুবসুর নওজোয়ান দেখছ না? গায়ে তাগদও খুব। তুমিও এমনই একটি লেড়কাকে পাকড়াও কর। তার রক্তাভ তুলতুলে গালে চুমু খেলে খুশীতে দিল ভরে যাবে। তার নরম নরম ঠোট দুটোকে মুখে পুরে নিয়ে রাতভর চুষলেও সাধ মিটবে না। তােমার মেহবুবের বেড়ানাে গাল দেখবে তখন আর মােটেই রুচবে না। আরও হরেক কিসিমের মনলােভা বস্তু তার মধ্যে খুঁজে পাবে যা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। সে মহব্বতের সুখ কি ছােবড়ার মত দাড়ি মুখাে আদমিটি তােমাকে দিতে পারবে? অবশ্যই না।
দ্বিতীয় জনানাটি এবার কলকল করে উঠল—“তােমার মত বােকা-হাদী দ্বিতীয়টি আর নেই। তােমার দিমাকে বুদ্ধি-বিবেচনার লেশমাত্রও নেই। আর রুচি কি জিনিস তা তাে জানই না। একটি গাছ কখন চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠে? যখন সে শাখা-প্রশাখা আর পাতায় ভরে ওঠে তখনই তাকে মনলােভা বােধ হয়। শসার স্বাদ কখন বাড়ে? যখন তার খােসা দড় হয়। দাড়িহীন টেকো আদমির চেয়ে কদাকার আদমি আর কেউ হতে পারে না। দাড়ি-গোঁফ তাে মরদদের শােভা বৃদ্ধি করে যেমন জনানার শােভা বৃদ্ধি করে কোমর ছাড়িয়ে নেমে আসা চুলের গােছা। এত কিছু শােনার পরও তুমি কি বলবে, দাড়ি বা গোঁফের রেখা দেখা দেয় নি এমন কোন কচি কাচাকে আমার মরদ হিসাবে পাকড়াও করতে ? তুমি এমন কিছু বাৎলাচ্ছ, কচি এক লেড়কার বুকের তলায় শুতে না শুতেই আমার কামজ্বালায় পানি ঢেলে দিতে ? ধৎ, তাদের আবার হিম্মৎ আছে নাকি? ওপরে উঠতে না উঠতে নামার জন্য ছটফটানি শুরু করে দেয়। ব্যস, খেল খতম। বিলকুল এলিয়ে পড়ে। আমার বাৎ শােন, নিজেকে বঞ্চিত কোরাে না। তােমার মেহবুবকে ছেড়ে অন্য কাউকে ধরা আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়। তার মত তাগদ আর দম কচিকাচারা পাবে কোত্থেকে? একবার ওপরে উঠলে আর তাকে নামায় সাধ্য কার ? আর কলা কৌশল? আলাদা, একদমই আলাদা। তার আলিঙ্গন, তার চুম্বন, তার সম্ভোগ-কৌশল, সবই যেন বেহেস্ত থেকে কুড়িয়ে আনা। আর আরাম? ওরে ব্বাস, কলিজা বিলকুল ঠাণ্ডা হয়ে যায়! দিল চনমনিয়ে ওঠে! এসব বাৎ শুনে তাে নওজোয়ানের মেহবুবটি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাবার জোগাড়। সে চোখ দুটো কপালে তুলে বলল —“তাই বুঝি ? আমি স্বীকার করছি, আজ তােমার কাছ থেকে এক নতুন শিক্ষা লাভ করলাম।
শসা ও শাহজাদার কিস্সা
নওজোয়ান ও মাঝবয়সী মেহবুব-এর কিসসাটি শেষ করে বেগম শাহরাজাদ এবার শসা ও শাহজাদা’ নামে আর একটি কিসসা শুরু করেলেন—“জাঁহাপনা মুইন ইবন জাইদ নামে এক আমীর ছিল। একদিন সে সঙ্গী সাথীদের নিয়ে শিকারে বেরল।
নিজের মাকান ছেড়ে বহুৎ পথ পাড়ি দিয়ে সে মরুপ্রান্তরের কাছাকাছি পৌছে গেল। এমন সময় দেখতে পেল গাধার পিঠে চড়ে এক আরব তার দিকেই আসছে। আরবটি তার কাছাকাছি আসতেই মইন বলল—‘সালাম আরব ভাইয়া, তারপর কোথায় চলেছেন এমন ব্যস্ত হয়ে ? আপনার দেখছি, কি যেন একটি সামান কাপড় দিয়ে জড়িয়ে রেখেছেন। কি ? ওটি কি, বলুন তাে?”
—“আমার জমিনে আচ্ছা শসা ফলেছে। আমীরের কাছে চলেছি। তাকে কিছু শসা দিয়ে আসব ভেবেছি।
-“তাই বুঝি ?
–“জী হুজুর। জমিনের প্রথম ফসল আমির মুইনকে নিবেদন করে তবে নিজে ও পরিবারের সবাই মুখে তুলব।
আরবটি এর আগে কোনদিন নিজের চোখে আমীর মুইনকে দেখেনি। ফলে তাকে চিনতে পারার প্রশ্নই ওঠে না। সে এবার বলল –‘তামাম সুলতানিয়তে তার মত মহানুভব আদমি আর দ্বিতীয়টি নেই। তাই আমার বিশ্বাস, তাকে শসাগুলি ভেট দিলে খুশী হয়ে প্রচুর দিনার বকশিস দেবেন।
‘তাই বুঝি ? তুমি এর বিনিময়ে কত দাম পাবে ভাবছ?’
-তােবা-তােবা! দাম বলছেন কি সাহাব, ইনাম-বকশিস বলুন।
–‘তা-ই হবে। কত ইনাম আশা করছ, বল তাে?'
‘অন্তত হাজার সােনার দিনার তাে বটেই। --এক হাজার কিন্তু খুবই বেশী হয়ে যাচ্ছে। –তা-ই যদি বলেন, আমি তখন বলব, অন্তত পাঁচশ তো।

0 Comments