সহস্র এক আরব্য রজনী পার্ট ১২১ (Arabya Rajani Part 121)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।

বেগম শাহরাজাদ বললেন—জাহাপনা, কিসসাটি ছােট হলেও আশাকরি আপনার দিলে খুশীর আমেজ আনতে পেরেছে, কি বলেন?'

বাদশাহ বললেন-‘সে আর বলতে! এরকমই আর একটি কিসসা শােনার জন্য আমার দিল আনচান করছে। আশাকরি আর একটি চটকদার কিসসা বলে তুমি আমাকে খুশী করবে।


দুনিয়াজাদ তার বহিন শাহরাজাদ-এর গলা জড়িয়ে ধরে বলল–বহিনজী, তােমার কিসসা কী সুন্দর! আর তােমার বলার কায়দাও খুবই চমৎকার। এখনও রাত্রি অনেকই আছে। আর একটি কিসসা শুরু কর।

শিক্ষক ও ছাত্রের কিসসা 

কিছুক্ষণ বিরতির মাধ্যমে একটু দম নিয়ে বেগম শাহরাজাদ আবার বলতে শুরু করলেন—উজির বদর অল-দিন ছিলেন ইয়েমানের সুবেদার। তার এক খুবসুরৎ ছােট ভাই ছিল। তার রূপের জেল্লায় সবার চোখে ধাঁধা লেগে যেত।

বদর-অল-দিন তার ভাইয়ের ব্যাপারে খুবই ভাবিত ছিলেন, তাঁর মনে সর্বদা আশঙ্কা হ'ত এই বুঝি কেউ তার ভাইয়ের দিকে কু-নজরে তাকাচ্ছে, নজর দিচ্ছে।

আবার সঙ্গদোষের ব্যাপারেও বদর-অল-দিন-এর কম খুঁতখুতানি ছিল না। বলা তাে যায় না কোন্ কু-সংসর্গে পড়ে ভাইটি তার গােল্লায় যাবে। এরকম সব ভাবনার বশীভূত হয়ে তিনি তার খুবসুরৎ ভাইটিকে প্রতি মুহুর্তে চোখে চোখে রাখতেন। কোনক্রমে চোখের আড়াল হলেও তাকে মনের আড়াল করতেন না মুহূর্তের জন্যও।

বদর অল-দিন তার ছােট ভাইটিকে কারাে সঙ্গে মেলামেশা করতে দেয়া তাে দূরের কথা এমন কি পাঠাভ্যাস করতে মক্তবে মৌলভী সাহেবের কাছে পর্যন্ত পাঠাতেন না। তাই বলে তাকে অকাট মূৰ্থ করেও রাখেন নি। এক সুদক্ষ ও সুপণ্ডিত মৌলভীকে তার গৃহ-শিক্ষকরূপে নিযুক্ত করেছিলেন। বদর অল-দিন-এর খুতখুতানি চরম পর্যায়ে পৌছল যখন দেখা গেল তিনি এক নিভৃত কক্ষে মৌলভীর কাছে ছােট ভাইয়ের বিদ্যানুশীলনের বন্দোবস্ত করলেন। সে কক্ষে কারাে প্রবেশাধিকার তাে ছিলই না এমন কি তিনি নিজেও সচরাচর যেতেন না।

নসীবের খেল কে রােধ করতে পারে ? নসীবের চাকা সময় মত ঠিক ঘুরে গেল। কিছুদিন যেতে না যেতেই বুড়াে মৌলভী সাহেব খুবসুরৎ কিশােরটির মহব্বতে পড়ে গেল। তার বুড়াে হাড়ে যৌবনের শক্তি ফিরে এল। শুরু হয়ে গেল ভেল্কি । তার কলিজা চনমনিয়ে উঠল। দিল জুড়ে শুরু হ’ল বসন্তের হিল্লোল।

মৌলভী নিজের দিলকে শান্ত রাখতে বহুৎ কোশিস করেছিল। কিন্তু খােদাতাল্লার মর্জি ; এ যে হতেই হবে।

মৌলভী নিজেকে আর সংযত রাখতে না পেরে একদিন কিতাব সরিয়ে রেখে বলে উঠল—“শােন, মহব্বত কখন যে কার মধ্যে পয়দা হয় তা খােদাতাল্লাও বােধকরি জানেন না। নইলে তােমাকে দেখার পর থেকে আমার দিল এমন চন্মনিয়ে উঠবে কেন? কোন লেড়কার সুরৎ বুড়াে হাড়ে এমন মহব্বতের জোয়ার বইয়ে দিতে পারে এ যে কল্পনারও অতীত।

বদর অল-দিন-এর কিশাের ভাইটি চোখে-মুখে বিস্ময়ের ছাপ একে নীরবে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।

বুড়াে মৌলভী ব’লে চলল —“তােমাকে দেখার পর থেকে আমার কলিজার জ্বালা শুরু হয়ে গেলাে। তােমাকে কাছে না পেলে আমার জিন্দেগী বিলকুল বরবাদ হয়ে যাবে। তােমাকে আমার চাই-ই চাই।'

বুড়াে মৌলভীর বাৎ শুনে বদর অল-দিন-এর কিশাের ভাই বিস্মিত ও বিচলিত হয়ে পড়ল। মৌলভী বলল—“চুপ করে থেকো না, কিছু তাে বল। আমি তাে বললামই, তােমাকে ছাড়া আমার জিন্দেগী বরবাদ হয়ে যাবে।

-“কিন্তু তা কি করে সম্ভব, মালুম হচ্ছে না। আমার ভাইজান হরবখত আমাকে চোখে চোখে রাখেন। তার চোখে ধুলাে দিয়ে আমি কি করে যে আপনাকে খুশী করব, দিমাকে আসছে না মৌলভী সাহাব।

–কই পরােয়া নাহি। ফিকির আমি ভেবেই রেখেছি 

–“ফিকির? কি সে ফিকির?”

রাত্রে তােমার ভাইজান যখন গভীর নিদে আচ্ছন্ন থাকবে তখন তুমি চুপিসারে ওদিককার ছাদে চলে আসবে। আমি তােমার অপেক্ষায় দেওয়ালের ধারে দাঁড়িয়ে থাকব। তােমার গলা শুনতে পেলেই আমি দেওয়ালের ওপর উঠে পড়ব। তারপর তােমার হাত ধরে দেওয়াল টপকে— 

বুড়াে মৌলভীর মুখের কথা ছিনিয়ে নিয়ে বদর অল-দিন-এর ভাই সবিস্ময়ে বলে উঠল-দেওয়াল টপকে ? ওরে ব্বাস!

—তা নিয়ে তােমাকে কিছু ভাবতে হবে না। আমি-ই তােমাকে নিয়ে দেওয়াল টপকে ওধারে নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত করব। কাকপক্ষীও টের পাবে না।

এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিস্সা বন্ধ করলেন।

তিন শ' পঁচাত্তরতম রজনী 

বেগম শাহরাজাদ কিসসাটির পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, মৌলভীর প্রস্তাবে লেড়কাটি সম্মতি জানাতে গিয়ে বলল—বহুৎ আচ্ছা, আপনার মতলব অনুযায়ীই কাজ হবে।

পরদিন সন্ধ্যার আন্ধার নামতে না নামতেই লেড়কাটি ঘুমের বাহানা করে শুয়ে রইল। চোখ বন্ধ করে শিকে লেগে পড়ে রইল।

সন্ধ্যার কিছু বাদে তার বড়ভাই বদর অল-দিন কাম কাজ মিটিয়ে ঘরে ফিরল। ছােট ভাইয়ের কামরায় দরওয়াজায় দাঁড়িয়ে ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখল, সে ঘুমােচ্ছে। ডাকাডাকি না করে নিজের কামরায় চলে গেল।

লেড়কাটির সাধ্যমত যতখানি সম্ভব কম শব্দ করে বিছানায় উঠে বসল। ধীরে ধীরে চৌকি থেকে নামল। পা টিপে টিপে কামরা থেকে বেরিয়ে ছাদের একধারে এসে দাঁড়াল। মুখে ছােট্ট করে সঙ্কেত দিল।

বুড়াে মৌলভী আগেভাগেই প্রাচীরের ধারে অপেক্ষা করছে, নচ্ছারটি তাকে নিয়ে প্রাচীর টপকে ওধারে নিয়ে গেল। ব্যস, হাত ধরে তাকে নিয়ে গিয়ে তার নিজের কামরায় হাজির হল।

মৌলভী হরেক কিসিমের ফলমূল আর দামী ও সুন্দর খুসবুওয়ালা সরাব কামরায় সাজিয়ে রেখেছিল। আর আনন্দফুর্তির যাবতীয় উপকরণও জড়াে করা ছিল।

মৌলভী কামরার মেঝেতে একটি মাদুর বিছিয়ে লেড়কাটিকে নিয়ে বসল। জানালা দিয়ে চাঁদের কিরণ মাদুরটির ওপর লুটোপুটি খাচ্ছে।

তারা হাসি-আনন্দের মধ্যে প্রথমে ফলমূল খেতে লাগল। তারপর সরাবের বােতলের মুখ খুলে মৌলভী লেড়কাটিকে দিল। আর নিজেও খেল গলা পর্যন্ত। মৌলভী এবার খেউর গােছের মহব্বতের গান ধরল। জানালা দিয়ে ফুরফুরে বাতাস বইছে, চাদের কিরণ তাদের ওপর আছাড় খেয়ে পড়ছে। আর সে সঙ্গে সরাবের মদিরতা তাে রয়েছেই। সব মিলিয়ে তারা যেন এক মায়াময় স্বপ্নাচ্ছন্ন লােকে বিচরণ করতে লাগল। মিষ্টি-মধুর আবেশের জোয়ারে মৌলভী আর লেড়কাটি ভাসতে ভাসতে যেন এক স্বপ্নাচ্ছন্ন লােকের পথে দ্রুত এগিয়ে যেতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ কাটল। আরও বহুক্ষণই হয়ত এভাবেই তারা কাটিয়ে দিত। কিন্তু একটি আকস্মিক ঘটনায় তাদের মহব্বতের সাগরে ভাটা দেখা দিল। ব্যাপারটি হ’ল-বদর অল-দিন নিজের কামরায় আরামে গা এলিয়ে দিয়ে বিশ্রাম করছিল। হঠাৎ তার দিল চাইল ছােট ভাইয়ের সঙ্গে কিছু বাৎচিৎ করবে। তার কামরার দরওয়াজায় এসে ভেতরে উঁকি দিতেই তার শির যেন আচমকা ঘুরে গেল। কামরা ফাঁকা। খালি বিছানা পড়ে রয়েছে। সে প্রথমে তার নাম ধরে ডাকাডাকি করল। কোনই সাড়া পেল না। সব কামরা তন্নতন্ন করে খুঁজল। কোন হদিসই মিল না। আরও কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে পাত্তা না পেয়ে হতাশ হ'ল। বদর অল-দিন হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। সে খুঁজতে খুঁজতে ছাদে এল। হাঁটতে হাঁটতে ছাদের সে-জায়গাটিতে এসে দাঁড়াল। হঠাৎ তার নজরে পড়ল প্রাচীরের ওধারে এক কামরায় তার ভাই সরাবের পেয়ালা হাতে মৌলভীর সঙ্গে হাসাহাসি ঢলাঢলিতে মেতে রয়েছে। মহব্বতের জোয়ারে উভয়েই ভেসে চলেছে। 

এমন সময় হঠাৎ মৌলভীর ছাদের দিকে নজর যায়। ইয়া আল্লাহ! এ যে স্বয়ং উজির বদর অল-দিন! তাদের দিকেই মুখ করে দাঁড়িয়ে। তার মাথায় যেন আশমান ভেঙে পড়ার জোগাড় হ’ল।

মৌলভী সচকিত হয়ে মহব্বতের গানার সুরের বদলে এক উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সুর ভজতে শুরু করল। উজির বদর অল-দিন যেন মুহূর্তের মধ্যে গানার মধ্যে ডুবে গেল। তন্ময় হয়ে গানার তালে তালে মাথা নাড়াতে লাগল। আর বার বার ‘তােফা তােফা’ বলে বাহবা দিতে লাগল।

উজির তার ভাইকে মৌলভীর কামরায় সরাবের পেয়ালা হাতে দেখেও খারাপ কিছু ভাবার অবকাশ পেল না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভাবাপ্লুত কণ্ঠে বার বার ‘তােফা তােফা’ আর ‘বহুৎ আচ্ছা বহুৎ আচ্ছা' বলে সেখান থেকে বিদায় নিল। সে মনে মনে বলল-“ভাইকে এমন সুন্দর গানার তালিম দেয়ার বন্দোবস্ত করে মেীলভী ভালই করেছে। এমন শিক্ষাগুরু হাজারে একজন মেলে কিনা সন্দেহ।

উজির বিদায় নিলে মৌলভী ফিন নিজমূর্তি ধারণ করল। কিশােরটিকে নিয়ে মহব্বতের খেলায় মেতে উঠল।

আজব বটুয়ার কিসসা 

মৌলভী ও খুবসুরৎ লেড়কার কিসসা শেষ করে বেগম শাহরাজাদ বললেন—“জাহাপনা, এবার আপনাকে আজব বটুয়ার কিসসা শোনাচ্ছি।

একরাত্রে খলিফা হারুণ-অল-রসিদ নির্জন রাত্রি গুজরান করছিলেন। শত কোশিস করেও কিছুতেই দু’চোখের পাতা এক করতে পারছিলেন না। এক নিদারুণ অস্থিরতার মধ্যে প্রায় মাঝরাত্রি পর্যন্ত গুজরান করে এক সময় উজির জাফর’কে তলব করলেন।

খলিফার তলব পেয়ে উজির জাফর হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। খলিফা চোখে-মুখে হতাশার ছাপ এঁকে বললেন—জাফর, কি করি বল তাে, কিছুতেই দু’চোখের পাতা এক করতে পারছি না! অবশিষ্ট রাত্রিটুকু যাতে ভালভাবে গুজরান করতে পারি তার বন্দোবস্ত কর।

জাফর হাত কচলে নিবেদন করল—জাহাপনা, আলী নামে আমার এক জিগরী দোস্ত রয়েছে। সে বহুৎ মজাদার কিসসা জানে যা শুনলে আপনার দিল্ চাঙা হয়ে উঠবে। তবে তাকে এখনই তলব দাও। তার কিসসা শােনার জন্য আমি অত্যুগ্র আগ্রহী।

খলিফার নির্দেশে উজির সে কি কথককে তার সামনে হাজির করলেন।

খলিফা বললেন—“জাফর-এর মুখে শুনলাম, তুমি নাকি বহুৎ আচ্ছা কিসসা বলতে পার। আর তােমার কিসসা শুনলে নাকি চোখে নিদ জড়িয়ে আসে। সত্য কি? তাই তােমাকে গভীর রাত্রে ডেকে এনে তকলিফ দিতেই হ’ল। এমন এক কিসসা ফাঁদ যা শুনলে আমার চোখে নিদ আসতে পারে। 

‘জাহাপনার আদেশ শিরােধার্য। হুকুম করুন, কোন্ কিসিমের কিসসা আপনি শুনতে আগ্রহী? আপনি কি কোন মনগড়া কিসসা, নাকি আমি নিজের চোখে দেখেছি এরকম কোন ঘটনা শুনতে চাইছেন?

—“শােন, যে-ঘটনার সঙ্গে তােমার নিজের যােগসাজস রয়েছে। এরকম কোন কিসসা শুরু কর।

খলিফা হারুণ-অল-রসিদ-এর নির্দেশে আলী কিসসা শুরু করল—জাহাপনা, আমার একটি দোকান রয়েছে। এক সকালে আমি দোকানে বসে, এক গাট্টাগােট্টা কালাে নিগ্রো দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। সেখানে দাঁড়িয়েই সে দোকানের সামানপত্র দেখতে লাগল।

কিছুক্ষণ বাদে সেই নিগ্রোটি দোকানে ঢুকে হরেক কিসিমের সামানপত্রের দরদস্তুর করতে লাগল। কথার ফাকে টুক করে একটি বটুয়া তুলে নিল। ব্যাপারটি আমার নজর এড়াল না। সে ভাবল, আমি বুঝি তার কাণ্ডটি মােটেই লক্ষ্য করি নি। এক সময় নিগ্রোটি ঝট করে দোকান থেকে বেরিয়ে লম্বা লম্বা পায়ে হাঁটা জুড়ল। এমন এক বাহানা করল, ব্যাপার যেন কিছুই নয়।

আমার পক্ষে আর হাত-পা গুটিয়ে চুপ করে বসে থাকা সম্ভব হ’ল না। এক লাফে দোকান থেকে বেরিয়ে তার কোর্তার কলার চেপে ধরে বললাম—“হতচ্ছাড়া কহিকার, আমার বটুয়া নিয়ে পালাচ্ছিস যে বড়। দিয়ে যা—আমার বটুয়া দিয়ে যা।

সে জাত সাপের মত একেবারে ফোস করে উঠল—‘বটুয়া ? এ তাে আমারই বটুয়া। এর ভেতরে তাে আমারই সামানপত্র রয়েছে।

এরকম একটি বাৎ শুনলে কার দিমাক ঠিক থাকতে পারে, বলুন জাঁহাপনা? আমি গর্জে উঠলাম—এখনও বলছি, ভাল চাস তাে আমার বটুয়া দিয়ে দে। নইলে চিল্লিয়ে লোক জড়াে করব বলে দিচ্ছি। বাধ্য হয়ে করলামও তা-ই। সবাইকে ডেকে বললাম-মুসলমান ভাইসব, তােমরা শােন—এ বিধর্মীটি আমার দোকান থেকে বটুয়াটি চুরি করে নিয়ে ভেগে যাচ্ছে। আমার বাৎ শুনে ব্যবসায়ীরা বলল, তাকে কাজীর কাছে নিয়ে গিয়ে বিচারের বন্দোবস্ত করতে। 

আমি কয়েকজন দোকানীর সাহায্যে হতচ্ছাড়া নিগ্রোটিকে টেনে হিচড়ে কাজীর কাছে নিয়ে গেলাম। আমি কিছু বলার আগেই কাজীকে সে সালাম জানিয়ে বলতে লাগল—‘হুজুর খােদাতাল্লার দোয়ায় আপনি দয়ার পূজারী ন্যায়পরায়ণ ধর্মাবতার। আপনার দরবারে আমি নিবেদন রাখছি। এ বটয়াটি আমার। আর এর ভেতরে যেসব সামানপত্র রয়েছে তা-ও আমার। কদিন আগে বটুয়াটি এক জায়গায় হারিয়ে গিয়েছিল। আজ হদিস পেয়ে আমি আমার বটুয়াটি দোকান থেকে নিয়ে নিয়েছি।'

–তােমার বটুয়া হারিয়ে গিয়েছিল? কাজী প্রশ্ন করলেন।

—“গতকাল হারিয়ে গিয়েছিল হুজুর। বটুয়াটির চিন্তায় আমি গতরাত্রে দু’চোখের পাতা এক করতে পারি নি।

‘বহুৎ আচ্ছা। এক কাম কর, বটুয়াটি আমার সামনে রাখ। তারপর এর ভেতরে কোন্ কোন্ সামানপত্র রয়েছে তার ফর্দ, বানিয়ে আমার কাছে জমা দাও।' কাজী হুকুম দিলেন।

নিগ্রোটি এক নিশ্বাসে ব'লে চলল ‘হুজুর, বটুয়াটির ভেতরে দুটো স্ফটিকের কাজললতা রয়েছে। কাজল পরানাের দুটো কাটা, দুটো চমৎকার সরবতের গ্লাস, একটি রেশমি রুমাল, দুটো চিরাগবাতি, দুটো কুর্শির কুশান আর রয়েছে দুটো বড় বড় চামচ, দুটো পানির বােতল, দুটো গালিচা, একটি থালা, মুখ ধােবার গামলা দুটো, রসুইখানার শিক একটি, পানি রাখার কলসি দুটো, দুটো মদের পাত্র, দুটো মাদী কুত্তা, দুটো অন্তঃসত্ত্বা বিল্লি, দুটো গাধা, চালরাখার পাত্র একটি, জেনানাদের শােবার ঘরের সামানপত্র কিছু, দুটো গাই, দুটো বাছুর, দুটো ষাঁড়, দুটো দৌড়বাজ মােষ, দুটো সিংহ, একটা সিংহী, দুটো খেকশিয়াল, একটা বড়সড় উট, দুটো ভেড়া, উটের বাচ্চা দুটো, আরাম কেদারা দুটো, মাদী ভালুক একটি আর রয়েছে একটি সুবিশাল প্রাসাদ।

কাজী ইয়া বড় বড় চোখ করে বিচারপ্রার্থী নিগ্রোটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখের তারায় বিস্ময়ের ছাপ।

নিগ্রোটি বলে চলল—“হুজুর, প্রাসাদটির ভেতরে রয়েছে পেল্লাই দুটো দরবার কক্ষ, দুটো সামিয়ানা, দুটো সবুজ তাবু, দুটো দরওয়াজাওয়ালা রসুইখানা আর রয়েছে কুর্দ নিগ্রোদের একটি দল। হুজুর, বটুয়াটির ভেতরে যেসব সামানপত্র রয়েছে বলে দাবী করছি, সবকিছুরই মালিক একমাত্র আমি।

এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা

( চলবে )

Post a Comment

0 Comments