আরব্য রজনী পার্ট ১২০ (Arabya Rajani Part 120)

গল্পের পরবর্তী অংশঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।

হাসিব এবার পালঙ্কের ওপর আছাড় খেয়ে পড়ে বিলাপ পেড়ে কাঁদতে লাগল—“আমি কিছুই জানি না। আমার কোন কসুরই নেই। আমাকে জোর করে ধরে - 

উজির তাকে আর বলতে দিলেন না। ভব্যসভ্যভাবে তাকে তুলে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলl —“হুজুর, আপনি ড্যানিয়েল-এর বেটা। আমাদের সুলতানকে আপনি রক্ষা করবেন বলে আমরা অধীর অপেক্ষায় রয়েছি। সুলতান কুষ্ঠ ব্যাধিতে আক্রান্ত, কুষ্ঠ তার সর্বাঙ্গ ছেয়ে ফেলেছে। আমরা নিশ্চিন্ত জানি, আপনি ড্যানিয়েলএর বেটা বলেই তার রােগ নিরাময় করতে পারবেন।


-“একমাত্র আপনার দ্বারাই সুলতান কারজাদানের জান রক্ষা পেতে পারে। নাজির, সভাসদ ও জল্লাদরা সমস্বরে বলে উঠল।

ব্যাপার দেখে তাে আতঙ্কে হাসিব-এর জান খাচা ছাড়া হবার জোগাড়। ক্ষীণ এবং কাপা কাপা গলায় বলল—“আপনারা এসব কী বলছেন! আমি বাস্তবিকই কোন কেউকেটা নই। খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে বলছি—আমি খুবই সামান্য এক আদমি। সিপাহীরা ভুল করে আমাকে এখানে হাজির করেছে।

সে এবার উজির-এর দিকে অসহায় দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে বলল ‘আমার আব্বার নাম ড্যানিয়েল, অবশ্য সত্য। কিন্তু আমি এক অকাট মূর্খ । পেটে কালির অক্ষর বলতে, কিছুই নেই। আমার আম্মা বহুৎ কোশিস করেছিলেন আমাকে পণ্ডিত করে তুলবেন। আখেরে ফয়দা কিছুই হয় নি। বাধ্য হয়ে একটি খচ্চর, কুড়ুল আর কিছু দড়ি খরিদ করে জঙ্গলে কাঠ কাটতে পাঠান। আমি কাঠুরে বনে গেলাম।

বৃদ্ধ উজির বাধা দিয়ে বললেন—“কেন ঝুটমুট নিজের ক্ষমতা ছিপাতে চাইছেন মালিক। তামাম দুনিয়া ঢুঁড়ে এলেও আপনার মত দ্বিতীয় একটি হেকিম মিলবে না। 

হাসিব এবার কেঁদেকেটে বলল —“উজির সাহাব, আমাকে এ কী বিপাকে ফেললেন? বিমারি ইলাজ এবং নিদান সম্বন্ধে কিছুমাত্র জ্ঞানও যে আমার নেই। সুলতানের বিমারির ইলাজ করে আমি কিভাবে তাকে সারিয়ে তুলব, বলুন তাে।

-“ঝুটমুট বাজে ধান্দা করে কোন ফয়দা হবে না। আমরা জানি, সুলতানের বিমারি সারার ফন্দি ফিকির আপনার ভালই কজা করা আছে। ঝটপট কাম কাজ শুরু করে দিন।

—কী আছে আমার হাতে, জানিই বা কি? মেহেরবানি করে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বড় কোন একজন হেকিমকে তলব করুন।

–কেন যে ঝুটমুট ঝামেলা বাড়াচ্ছেন আমার দিমাকে আসছে না। আপনি বিমারির ইলাজ করতে পারেন, নিদান দিতেও পারেন। কারণ, পাতালপুরীর রানীর সাথে আপনার পরিচয় ও খাতির আছে।

হাসিব নির্বাক। এর কি জবাব দেবে, হঠাৎ করে সে গুছিয়ে উঠতে পারল না।

উজির এবার বললেন—“পাতালপুরীর রানীর কুমারী দুগ্ধ পান করলে অথবা মলমের মত ক্ষতস্থানে মাখলে যেকোন কঠিন বিমারী সেরে যেতে পারে।

এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

তিন শ’ বাহাত্তরতম রজনী 

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসা শুরু করলেন—‘জাহাপনা, হাসিব এর এবার মালুম হ’ল ; প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে হামামে ঢােকার ফলেই তার নসীব এমন করে বিগড়ে গেছে।

হাসিব এবার উন্মাদের মত চিল্লিয়ে ওঠে—“কি বললেন আমার মালুম হচ্ছে না! ওরকম কুমারী লেড়কির দুধ আমি জিন্দেগীতে কোনদিন দেখি নি। আর পাতালপুরীর রানীর সাথে পরিচয় থাকা তাে দূরের কথা আমি তার নামও কোনদিন শুনিনি। 

উজিরের কণ্ঠস্বরে এবার ক্ষোভ প্রকাশ করলেন—“দেখুন, আপনার বাৎ যে কতখানি অসত্য তা আমি এখনই প্রমাণ করে দিতে পারি। আপনি পাতালপুরীর রানীর কাছে কিছুদিন যে ছিলেন তা আমি ভালই জানি। হাসিব জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকাল।

—“কি করে বুঝলাম, তাই না? প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যারাই রানীর কাছাকাছি অবস্থান করেছেন তাদের সবার পেটের চামড়া বিলকুল কালাে বনে গেছে। রানীর হামামে গােসল না করলে পরে কারাে পেটের চামড়া এমন কালাে হতে পারে না। একটি কিতাব পড়ে এসব ব্যাপার আমি শিখেছি। আপনাকে যে হামাম থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে সেখানে আমার গুপ্তচর হরবখত পাহারা দিচ্ছে। যারাই গােসল করে তাদের পেটের চামড়ার ওপর নজর রাখাই তাদের কাজ। আপনার পেটের চামড়া কালাে দেখতে পেয়ে তারা খবর দেয়। সিপাহী পাঠিয়ে আমি আপনাকে এখানে নিয়ে আসি। ধান্দা ছেড়ে কাজে লাগুন।

–হতে পারে আপনার বাৎ বিলকুল সাচ্চা, তবুও আমি বলছি, আমি রানীর হামামে গােসল করা তাে দূরের কথা চোখেও কোনদিন তাকে দেখি নি।

উজির এবার আচমকা এক হেঁচকা টানে হাসিব-এর পরণের তােয়ালেটি খুলে দিল। ব্যস, কুচকুচে কালাে পেটটি দৃশ্যমান হয়ে উঠল।

হাসিব কাদো কাঁদো স্বরে বলল —“বিশ্বাস করুন, আমার পেটের এরকম রঙ নিয়েই আমি পয়দা হয়েছি। কোন হামামে গােসল করার ফলে এমনটা হয় নি।

হাসিব রানীর কাছে শপথ করেছিল, রানী কোথায় থাকেন ভুলেও কারাে কাছে ফাস করবে না। তাই বার বার দৃঢ়তার সঙ্গে এমন কসম খেয়ে বলতে লাগল, রানীর সান্নিধ্যে যায় নি।

উজিরের নির্দেশে দু'জন জল্লাদ হাসিব’কে পিঠমােড়া করে বেঁধে ফেলে। তার পায়ের তলায় হরদম আঘাত করতে থাকে। ভাবল, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে হামামে গােসল করার জন্যই এবার তাকে জান খােয়াতে হবে। বেদম প্রহার। অসহ্য যন্ত্রণা। বাধ্য হয়ে বলল সব কথা সে কবুল করবে।

প্রহার বন্ধ করা হ'ল। দামী পােশাক পরিয়ে দেয়া হ’ল। তাকে ঘােড়ায় চাপিয়ে, নিজে অন্য একটি ঘােড়ায় চেপে উজির হাসিব'কে নিয়ে চললেন। সঙ্গে তার সশস্ত্র সৈন্য। ঘােড়া ছুটিয়ে তারা সে ভাঙা বাড়িটির সামনে হাজির হলেন। রানী যমলিকার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাসিব এ বাড়িটি থেকেই যাত্রা করেছিল।

উজির কিতাব পড়ে কিছু কিছু যাদুবিদ্যা রপ্ত করেছিলেন। তার কিছু এবার ব্যবহার করল। ধূপের মত কি যেন পােড়ালেন। অনুচ্চ কণ্ঠে কেবলমাত্র ঠোট দুটো নাড়িয়ে কি সব মন্ত্র আওড়ালেন। আর হাসিবকে দরজায় দাঁড় করিয়ে দিলেন যাতে রানী একমাত্র তাকেই দেখা দেন। মুহূর্তে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হ’ল। বাড়িঘর, সামানপত্র বিলকুল কেঁপে উঠল। যে-যেদিকে পারল ছিটকে পড়ল। চারটি সর্পকন্যার ন্যায় কাঁধে চেপে, গামলার মধ্যে বসে রানী এসে দেখা দিলেন। ,

রানীর নিশ্বাসে আগুন ছিটকে ছিটকে বেরােচ্ছে। রানীর চোখ দুটোতেও আগুনের হল্কা। গম্ভীর মুখে বললেন—'তুমি আমার কাছে কসম খেয়েছিলে, ইয়াদ নেই? 

‘মহারানী মেহেরবানি করে আমার কসুর নেবেন না। আমার কোন কসুর নেই। এবার উজিরের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলল -“যা কিছু বিলকুল ও-ই করেছে।

‘জানি, কিছুই আমার অজানা নয়। তাই তােমাকে কোনরকম শাস্তি দেয়ার ইচ্ছা আমার নেই। যা কিছু সবই তােমাকে দিয়ে জোর করে করিয়েছে। তবে সুলতানের দুরারােগ্য ব্যাধির নিরাময় হওয়াও দরকার। তুমি আমার কাছ থেকে দুধ নিতে এসেছ, দেব। সুলতানের বিমারির ইলাজ করবে, সেরে যাবেন। 

হাসিব সবিস্ময়ে রানীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। রানী ইশারায় তাকে কাছে ডাকলেন। কানে কানে বললেন—‘দুধ আমি দেব। কি করে ব্যবহার করবে, বিলকুল কানে কানে বলে দিচ্ছি। আমি একটি দুধের পাত্রে লাল চিহ্ন এঁকে দিচ্ছি, এতে সুলতানের বিমারি সারবে। আর দ্বিতীয়টি দিচ্ছি উজিরের জন্য। তােমাকে বেদম প্রহার করেছে, তাই না?

হাসিব ঘাড় কাৎ করল। রানী বলে চললেন—‘সুলতানের বিমারি সেরে গেছে দেখে উজির আমার দুধ পান করার জন্য অস্থির হয়ে পড়বে। তার যাতে বিমারি না হয় সে জন্যই এত আগ্রহান্বিত হবে। তখন দ্বিতীয় পত্রের দুধটুকু তাকে পান করতে দিও।

দুধের পাত্র দুটো হাসিব’কে বুঝিয়ে দিয়ে রানী অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

রাজপ্রাসাদে পৌছে হাসিব রানীর পরামর্শ অনুসারে কাজ করল। প্রথম পাত্রটির দুধ সুলতানকে পান করাল। ব্যস, তার দেহের ক্ষতগুলি যাদুমন্ত্রের মাফিক মিলিয়ে যেতে লাগল। পুরানাে খসখসে চামড়ার পরিবর্তে নতুন চামড়া গজাতে শুরু করে। ব্যাপার দেখে উজিরের দিল একদম চনমনিয়ে উঠল। সে-ও দুধপান করতে আগ্রহান্বিত হয়ে পড়লেন। নিজে হাতেই দ্বিতীয় পাত্রটিকে গলায় ঢেলে দিলেন। বিলকুল দুধ পান করলেন।

দুধ পেটে যাওয়া মাত্র উজিরের পেট ফুলতে ফুলতে ঢাক হয়ে যেতে লাগল। একটু বাদেই দুম্ করে বিকট এক আওয়াজ তুলে তার পেট ফেটে গেল।

উজিরের জান খতম হয়ে গেল। হাসিব-এর ওপর অত্যাচারের পরিণামে তাকে জান খােয়াতে হল। সুলতান বিমারিমুক্ত হয়ে ফিন রাজ্যশাসনে মন দিলেন। হাসিব এর জন্যই সুলতানের পক্ষে রােগমুক্ত হওয়া সম্ভব হয়েছে। তাই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ নিজের মসনদের পাশে অন্য একটি আসনে তার বসার বন্দোবস্ত করলেন।

সুলতান-এর বৃদ্ধ উজির মারা গেছেন। উজিরের শূন্যপদ পূরণ করা দরকার। সুলতান প্রসন্ন হয়ে হাসিব'কে সে-পদে বহাল করলেন।

সুলতানের নির্দেশে হাসিব-এর উজিরের পদে নিযুক্তির ব্যাপারটি ঢেঁড়া পিটিয়ে সর্বত্র জানিয়ে দেওয়া হল।

পারিষদদের স্পষ্ট ভাষায় সুলতান জানিয়ে দিলেন ‘তােমরা আমাকে যে-সম্মান প্রদর্শন করবে নতুন উজির হাসিব’কেও সেরকম সম্মানই প্রদর্শন করবে। তার কিছুমাত্র অসম্মান কেউ করলে কঠোর শাস্তি পেতে হবে।

এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

তিন শ’ তিয়াত্তরতম রজনী 

শাহরাজাদ বলেন—হাসিব-এর মায়ের কাছে এক টুকরাে কাগজ পেল। তাতে লেখা ছিল—সব শিক্ষাই মূল্যহীন। কারণ সময়মত আল্লাহই মানুষকে যাবতীয় শিক্ষা দিয়ে তৈরি করে দেবেন।' বেগম শাহরাজাদ কিসসা শেষ করে এবার বললেন—জাঁহাপনা, এই হ’ল ড্যানিয়েল-এর পুত্র হাসিব ও পাতালের রানী যমলিকার কিসসা।

বেগম কিসসা শেষ করতে না করতেই বাদশাহ শারিয়ার আচমকা চিল্লিয়ে উঠলেন—“আমার ক্লান্তি ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। আমার মানসিক পরিস্থিতি যদি এভাবে উত্তরােত্তর বেড়েই চলে তবে কিন্তু তার পরিণাম ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে দেখা দেবে। তখন তােমার ধড়, মুণ্ডু এক সঙ্গে থাকবে না, ইয়াদ রেখাে।

বাদশাহের কথায় দুনিয়াজাদ-এর বুকের মধ্যে হঠাৎ যেন ধড়াস করে উঠল। মুহূর্তে ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। বেগম শাহরাজাদ-এর চোখে-মুখেও উদ্বেগের ছাপ সুস্পষ্ট হয়ে উঠল। নিজের মনকে শক্ত করে বেঁধে স্বাভাবিক কণ্ঠেই বলল—যা-ই হােক জাঁহাপনা, অবশিষ্ট রাত্রিটুকু কাটিয়ে দেবার কথা চিন্তা করে এবার আপনাকে কয়েকটি মজাদার কিসসা শোনাচ্ছি।

হাসি মস্করাপ্রিয় হারুণ-অল রসিদ 

বেগম শাহরাজাদ কিসসা শুরু করলেন—“জাহাপনা, খলিফা হারুণ-অল-রসিদ এক রাত্রে বাগদাদের পথে ঘুরছিলেন। তাঁকে সঙ্গদান করছিলেন তার উজির বারমাকী, প্রিয় গায়ক ওস্তাদ আবু ইশাক এবং কবি নবাস প্রভৃতি। খলিফা হারুণ-অল রসিদ তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় নগরের এক প্রান্তে পৌঁছে গেলেন। বসরাহ বন্দর থেকে একটি পথ বাগদাদ নগরীতে এসে মিশেছে।

খলিফা এক সময় লক্ষ্য করলেন, এক বুড়াে গাধার পিঠে চেপে নগরের দিকে আসছে।

খলিফা উজির জাফর’কে বললেন-“জাফর এক কাজ কর তাে, লােকটি কেন গাধার পিঠে চেপেছে জিজ্ঞেস করে এসাে তাে।

জাফর তখন বুঝতেই পারল না খলিফা লােকটির ব্যাপারে এত উৎসাহী কেন? নইলে লােকটি গাধার পিঠে চেপে কোথায় চলেছে তা নিয়ে তার মাথাব্যথা তাে থাকার কথা নয়। খলিফার আদেশ পালন করতেই হয়। তাই সে সামান্য এগিয়ে গিয়ে বলল-“ওহে মিঞা, কোথায় চলেছাে? আসছই বা কোথা থেকে ?

—“আসছি বসরাহ থেকে, আর বাগদাদ নগরেই চলেছি।”

–তােমার এই বয়স। বুড়াে হয়েছ। এমন দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে বাগদাদে যাবার কারণ কি? 

-এর-ওর মুখে শুনেছি, বাগদাদ নগরীতে নাকি অনেক বড় বড় হেকিম রয়েছে। এরকম কারাে খোঁজেই আমার দীর্ঘপথ পাডি দিয়ে আসা।

—“তােমার কোন্ বিমারি, বল তাে?

—‘চোখের বিমারি। বহুৎ তকলিফ হচ্ছে। কোশিস করে দেখি যদি কারাে কাছ থেকে আচ্ছা সুরমা জোগাড় করতে পারি। দেখা যাক, কি হয়।

—“বিমারির আরাম হবে কি না তা তাে আল্লাতাল্লার হাত। তবে আমি তােমাকে এমন জব্বর এক সুরমা বানিয়ে দিতে পারি যা চোখে লাগালে এক রাত্রের মধ্যে তােমার চোখের বিলকুল বিমারির আরাম হয়ে যাবে। আর এর ফলে তােমার অর্থেরও বহুৎ সাশ্রয় হবে।

বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ বড়িয়া বাৎ! আল্লাহ ছাড়া এর ইনাম আর কারাে পক্ষেই দেয়া সম্ভব নয়। বুড়াে স্বগতােক্তি করল। 

বুড়াে কথাটি অনুচ্চ কণ্ঠে বললেও জাফর-এর কানে ঠিকই গেল। খলিফার কাছে এগিয়ে গিয়ে ইঙ্গিতে ব্যাপারটি ব’লে এসে ফিন বুড়াের দিকে এগিয়ে এলেন। বুড়ােকে লক্ষ্য করে এবার বললেন—“শােন মিঞা, তােমার বাৎচিৎ আমাকে মুগ্ধ করেছে। তাই যেচে তােমার উপকার করতে চাইছি। তবে শােন, তােমাকে আমার দাওয়াই বাৎলে দিচ্ছি। এক কাজ করবে—তিন ছটাক নাকের প্রশ্বাস নেবে, সূর্যের রশ্মি তিন ছটাক তাতে মেশাবে, চাদের কিরণ তিন ছটাক ও তিন ছটাক চিরাগের আলাে মিশিয়ে নেবে। তারপর সে মিশ্রণ একটি তলাহীন হামাম দিস্তায় ভাল করে ঘেঁটে ঘুটে মিশিয়ে ফেলবে। তারপর মিশ্রণটি মুক্ত বাতাসে কিছুক্ষণ, রেখে দেবে। একনাগাড়ে তিনমাস সেগুলােকে হাওয়া খাওয়াবে। তিন মাস বাদে সে মেশানাে মশলাগুলােকে আচ্ছা করে দলাই মালাই করবে। ব্যস, এবার সেগুলােকে একটি পিরিচে ভরে রেখে দেবে। তারপর মশলা সমেত পিরিচাটকে আরও তিন মাস ধরে কড়া রোদে শুকোবে। তবেই দেখবে তােমার দাওয়াই তৈরী হয়ে গেছে।

এবার কি বলছি শােন মিঞা-পিরিচে যে সুরমা তৈরী করা হল তাকে এক রাত্রে তিন শ' বার চোখে লাগাবে। খােদাতালার যদি তোমার ওপর দোয়া থাকে তবে দেখবে, এক রাত্রেই তােমার যাবতীয় বিমারির আরাম হয়ে গেছে।'

জাফর-এর বাৎ শুনে বুড়াে তাে কৃতজ্ঞতায় একেবারে গলে গেল। সে গাধার পিঠে বসেই জাফরকে সালাম জানাতে লাগল। ভাবাপ্লত কণ্ঠে বার বার বলতে লাগল—“জী, আপনার মত হেকিম দ্বিতীয়টি আর নেই। আপনার দাওয়াইয়ের দাম কিভাবে শােধ করব, ভেবে পাচ্ছিনে।

–“ঠিক আছে, সে সব পরে বিবেচনা করা যাবে। যে সব সামানপত্রের কথা বললাম তা আগে জোগাড় করার কাজে লেগে যাওয়া দরকার।'

–তবে হুজুর মেহেরবানি করে আমার দাওয়াই বানাবার বন্দোবস্ত করুন। একটু হাত চালিয়ে করবেন। নইলে হয়ত উধাও হয়ে যাবে। আমি খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে বলছি, নিজের মুলুকে ফিরে গিয়ে আপনার জন্য খুবসুরৎ একটি বাঁদী পাঠিয়ে দেব। কী সুরৎ তার, দেখলে দিমাক খারাপ হয়ে যাবে। আর কিছু না হােক, তার লালচে তুলতুলে নিতম্ব দেখলেই আপনি মূচ্ছা যাবার জোগাড় হবেন। আর লেড়কিটি এমন সুন্দর সুর করে কাঁদতে পারে, দেখবেন আপনার ওই ফ্যাকাশে মুখটিকে থুথুতে একেবারে মাখামাখি করে দেবে, আর উলুখাগড়ার বনের মত দাঁড়িগুলােকে ভিজিয়ে একদম জবজবে করে দেবে।

কথা ক’টি বলতে বলতে বুড়াে তার গাধার লাগামে টান দিল। গাধাটি তাকে নিয়ে থপ থপ করে এগিয়ে চলল তার গন্তব্যস্থলের দিকে। ব্যাপার দেখে খলিফা হারুণ-অল-রসিদ তাে হেসে গড়াগড়ি যাবার জোগাড়।

জাফর-এর হালৎ তখন সঙ্গীন। কোন কথা বলার মত অবস্থা-ই তার নয়। রীতিমত অপ্রস্তুতে পড়ল। তার মুখ দিয়ে রা পর্যন্ত বেরল না। লজ্জায় একেবারে এতটুকু হয়ে গেল।

কবিবর আবু নবাস কিন্তু সম্পূর্ণ অন্যরকম ভাব দেখাল। সে এগিয়ে গেল জাফর-এর দিকে। বিজ্ঞের মত জাফর’কে বারবার ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে লাগল।

ছোেট্ট একাহিনীটি শুনে বাদশাহ শারিয়ার-এর মুখে খুশীর ঝিলিক ফুটে উঠল। বেগম শাহরাজাদ বললেন—জাহাপনা, কিসটি ছােট হলেও আশাকরি আপনার দিলে খুশীর আমেজ আনতে পেরেছে,

( চলবে )

Post a Comment

0 Comments