আরব্য রজনী পার্ট ১১৯ (Arabya Rajani Part 119)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।

রাজা ও রানী উভয়েই হাসিমুখে আমার প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন। তবে কথার ফাঁকে আমার কাছ থেকে একটি প্রতিশ্রুতি তারা আদায় করে নিলেন বছরে একবার করে তাদের লেড়কিকে নিয়ে হীরা প্রাসাদে কাটিয়ে যেতে হবে। আমাদের বিদায় মুহূর্ত উপস্থিত। রাজা নসর-এর নির্দেশে ইয়া তাগড়াই পুরুষ-জিন আমাদের কাধে নিয়ে শূন্যে উডে চলল। আমাদের পরিচর্যার জন্য সঙ্গে চলল কয়েকটি মেয়ে-জিন। তারা বাতাসের চেয়েও দ্রুত গতিতে উড়ে দু সালের পথ মাত্র দু'দিনে পাড়ি দিয়ে আমাকে কাবুলে নিয়ে হাজির হল।


আমার আব্বা ও আম্মা বেটার বউ সানসাকে দেখে মহাখুশী হলেন। আমাদের শাদী হয়েছে শুনে তাে আনন্দে-উচ্ছাসে আবেগে তারা কেঁদেই ফেললেন। শুধু কি এ-ই? আমার আম্মা তাে অপ্রত্যাশিত অনাবিল আনন্দ সইতে না পেরে সংজ্ঞাই হারিয়ে ফেললেন। তার হালৎ দেখে সানসা একদম হকচকিয়ে গেল। সে উৎকণ্ঠিতা হয়ে তার চোখে-মুখে হরদম গুলাব পানি ছিটাতে লাগল। তার পরিচর্যা সার্থক হয়েছে, আম্মা সংজ্ঞা ফিরে পেলেন।

কেবলমাত্র আমার আব্বা আর আম্মাই নন, উজির নাজির থেকে শুরু করে অন্যান্য সভাসদরা তাে আমার আশা ছেডেই দিয়েছিলেন। এমন কি প্রজারা পর্যন্ত নিঃসন্দেহ হয়ে পড়েছিল, আমার মৃত্যু হয়েছে। এ-পরিস্থিতিতে আমার আগমন, তার ওপরে একেবারে বিবিকে সঙ্গে করে সুলতানিয়তে হাজির হওয়ায় রাজ্যের সর্বত্র খুশীর জোয়ার বয়ে চল্ল। তামাম সুলতানিয়তের প্রজারা কয়েকদিন ভরে কবজি ডুবিয়ে খানাপিনা সারল। গুলাব পানি আর সরাবের বন্যা বয়ে গেল। আর নাচা-গানা আনন্দ-স্ফুর্তি তাে রয়েছেই।

আমার আব্বা সানসার ইচ্ছাতে উপহারস্বরূপ চমৎকার একটি বাগিচা গড়ে দিলেন। বাগিচার কেন্দ্রস্থলে চমৎকার একটি মকান বানিয়ে দিলেন আমাদের বসবাসের জন্য। সেখানে মহা খুশীতে আমরা দিন গুজরান করতে লাগলাম।

দেখতে দেখতে এক সাল ঘুরে এল। সানসার আব্বার কাছে আমি যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলাম তা পালন করার জন্য জিন-এর কাঁধে চেপে আমরা হীরা প্রাসাদের উদ্দেশে যাত্রা করলাম। কে জানত এ-যাত্রাটি আমাদের দুষ্টগ্রহের মাফিক কাজ করবে।

আমরা যাত্রা পথে দিনভর জিনের কাঁধে চেপে শূন্যে পথ পাড়ি দিতাম। আর রাত্রি কাটাতাম গাছের নিচে বিশ্রামের মাধ্যমে। এক সন্ধ্যায় আমরা এক নদীর ধারে নামলাম।

নদীর টলটলে পানি দেখে সানসা গােসল করার ইচ্ছা প্রকাশ করল। আমি বহুভাবে তাকে বারণ করলাম। একেবারে হীরাপ্রাসাদে গিয়ে গােসল করার পরামর্শ দিলাম, সে পাত্তাই দিল না। তার এত জিদ যে, আর বলার নয়। আমার নিষেধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সে নদীতে গােসল সারতে গেল। কেবলমাত্র সেই নয় অন্যান্য জিনরাও তার দেখাদেখি নদীর পাড়ে পােশাক আশাক বেখে নদীর পানিতে ঝাপিয়ে পড়ল। তারা পানি তােলপার করে গােসল সারছিল। এমন সময় সানসা বিকট স্বরে চিল্লিয়ে উঠল ৷ তাকে পাজাকোলে করে পানি থেকে পাড়ে তােলা হল। আমি উন্মাদের মত তার নাম ধরে ডাকাডাকি করলাম। ধাক্কা দিলাম ঘন ঘন। তাজ্জব বনে গেলাম। তার দিক থেকে কোন সাড়া পাওয়া তাে দুরের কথা সে সামান্য নড়ল চড়লও না। একদম খতম। বিষাক্ত সাপের কামড়ে তার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেছে।

আমি শোকে-দুঃখে একদম ভেঙ্গে পড়লাম। সংজ্ঞা হারিয়ে ফেললাম। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় বেশ কয়েকদিন গুজরান করলাম। আমি জিন্দা থেকেও যেন মরে গেছি। কিন্তু মৃত্যু আমার হ’ল না। তেখন কেন যে বেঁচে গিয়েছিলাম, পরে আফশােষ হতে লাগল। আদতে আমার নসীবের ফেরেই টিকে গিয়েছিলাম। নসীব আমার বিরােধিতা করেছিল। সানসার শােককে সামলাতে আমি তার গােরের ওপর স্মৃতিস্তম্ভ বানালাম। আর আমার জন্য অন্য একটি। এখন পথ চেয়ে দিন গুজরান করছি, কবে মােউত এসে আমাকে নিয়ে যাবে। তার পাশেই আমি চিরনিদ্রায় শায়িত হ'ব। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছি আমার মেহবুবা কবে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেবে, কাছে টেনে নেবে। নিজের মুলুক থেকে বহুদূরে নির্জন-নিরালা গােরস্তানে আমি দুঃখের দিনগুলি গুজরান করছি। আমার নসীবই আমাকে এখানে টেনে নিয়ে এসেছে।

কিসসা বলতে বলতে নওজোয়ান জানশাহ আচমকা আর্তনাদ করে দু'হাতে মুখ ঢাকল—বুলুকিয়া ভাইয়া।

বুলুকিয়া চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন—“জানশাহ ভাইয়া, আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বলছি, তােমার কিসসা আমার দুঃসাহসিক কাহিনীগুলাে থেকে ঢের তাজ্জব ও আশ্চর্যজনক। আমার কিসসা তােমার কিসসাকে টেক্কা দেবে। এবার আমার গায়ে-মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বুলুকিয়া বলল –“ভাইয়া। খােদাই একমাত্র ভরসা। তার নামগান কর, মনেপ্রাণে স্মরণ কর।

একমাত্র তিনিই পারবেন তােমার অশান্ত দিলকে শান্ত করতে। তাকে দিল থেকে মুছে ফেলা ছাড়া শান্তির আর কোন পথ নেই। ওঠ—উঠে দাঁড়াও। দিলকে শক্ত করে বাঁধ। এমন সময় পূব-আকাশে ভােরের সঙ্কেত দেখতে পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

তিন শ সত্তরতম রজনী

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন- জাহাপনা, বুলুকিয়া পত্নীহারা জানশাহ’কে নানাভাবে প্রবােধ দিতে লাগলেন। বহভাবে কত কোশিস করলেন তাকে। নিজের সুলতানিয়তে নিয়ে যাবার জন্য। ব্যর্থ প্রয়াস। সে কিছুতেই গােরস্তান ছেড়ে অন্যত্র যেতে নারাজ। এত জেদ ! তার জেদ এতই প্রবল যে, তাকে চোখে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ না করলে শুধুমাত্র কথার মাধ্যমে হুবহু তার বর্ণনা দেয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।

শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে বুলুকিয়া নিজের সুলতানিয়তের দিকে পা বাড়ালেন।

ব্যস, বুলুকিয়া-র আর পাত্তা মেলে নি। তুমি এখানে হাজির হয়েছ, তার কথা আর ইয়াদ নেই। তবু ক্ষীণ আশা, সে ফিরে এলেও আসতে পারে। তুমি কিন্তু আমাকে ফেলে রেখে চলে যেয়ে কয়েক সাল এখানে থাক। তােমার সঙ্গলাভ করে জিন্দেগীকে খুশীতে ভরিয়ে নেই। বহুৎ কিসসা আমার জানা আছে বটে। বুলুকিয়া-র দুঃখ-যন্ত্রণার কিসসা যাদের মাঝে নিতান্তই জোলাে বলে মালুম হবে। তােমার মত আচ্ছা শ্রোতা পেয়ে আমি সাচমুচ খুশী।

পাতালপুরীর রানী কিসসা শােনাল। খানাপিনা সারা হ'ল। নাগিনী কন্যারা বহুৎ আচ্ছা নাচা-গানা করল। কম হ’ল না।

সবাই এবার রানীর গ্রীষ্মকালীন নিবাসের উদ্দেশে যাত্রা করবে। পূর্ণ-উদ্যমে সামানপত্র গােছগাছ করা হতে লাগল। ব্যাপার দেখে হাসিব-এর কলিজা শুকিয়ে যাবার জোগাড় হ'ল। ইয়া আল্লাহ এদের সঙ্গে যেতে হবে! সে আম্মা আর বিবিকে বহুৎ পিয়ার মহব্বৎ করে। তাদের সংস্রব ছেড়ে আর কতদিন কাটাবে?

বুকে জোর করে সাহস সঞ্চয় করে সে বল্ল-“রানী আমি একজন কাঠুরিয়া। আপনি মেহেরবানি করে আমাকে সঙ্গদান করে আমার জিন্দেগীকে সার্থকতায় পরিপূর্ণ করে তুলেছেন। আমার আম্মা, বিবি সবই বর্তমান। তাদের কাছে ফিরে যেতে না পারলে ভেবে ভেবে তারা হয়ত জানই খতম করে দেবেন। তাছাড়া এভাবে টিকে থাকা আমার পক্ষেই বা কি করে সম্ভব, মালুম হচ্ছে না।

আমার শােকে-তাপে তাদের জান খতম হওয়ার আগে আমি ঘরে ফিরে যেতে চাচ্ছি। খােদার দোহাই, আমাকে এবার যেতে দিন। তবে আমার জিন্দেগীভর আফশােষ থাকবেই, আপনার মনমৌজী কিসসাগুলাে শােনার সুযােগ পেয়েও হাতছাড়া করতে হ’ল। হাসিব বিদায় নেয়ার জন্য উন্মুখ, রানী বুঝতে পারলেন। আর এ-ও বুঝলেন, সে ঠিকই বলেছে।

রানী অনন্যোপায় হয়ে বললেন—বহুৎ আচ্ছা, তােমার বিবি আর আম্মার কাছে তুমি ফিরেই যাও, আমি বাধা দেব না। তবে তােমার মত এমন এক একনিষ্ঠ শ্রোতা বিদায় নিচ্ছে ভেবে আমি মর্মাহত। কিন্তু তুমি যদি আমাকে কথা না দাও যে, জিন্দেগীতে, কোনদিন হামামে গােসল করবে না, তবে তােমাকে আমি ছাড়ব না । যদি কোনদিন প্রতিশ্রুতি ভুলে হামামে গােসল কর তবে কিন্তু সেদিনই তােমার জান খতম হয়ে যাবে। 

এরকম একটি অত্যাশ্চর্য প্রতিশ্রুতির কথা শুনে হাসিব তাজ্জব বনে যায়। তবু সে প্রতিশ্রুতি দিল।

রানী হাসিব'কে বিদায় জানালেন। সবে ভােরের আলাে একটু একটু করে উঁকি দিতে শুরু করেছে।

হাসিব তার বাড়ির দরওয়াজায় করাঘাত করল। দরওয়াজা খুলে তাকে সামনে দেখেই তার আম্মা আনন্দ-উচ্ছ্বাসে অভিভূতা হয়ে গলা ছেড়ে কেঁদে উঠল। কান্না শুনে তার বিবি ছুটে এল। এতদিন পর স্বামীকে কাছে পেয়ে আদর সােহাগ করতে লাগল। তাদের বাড়িতে খুশীর বন্যা বয়ে গেল।

হাসিব-এর সঙ্গে যেসব প্রতিবেশী জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়েছিল তারা তাকে মধুর গর্তে ফেলে পালিয়ে এসেছিল। ফিরে এসে তার আম্মা আর বিবিকে বলেছিল, হাসিব বাঘের পেটে গেছে। তারা চোখের পলকে এক একজন আমীর বনে গেছে। কেউ বাজারে দোকান খুলে বসেছে, কেউ বা সওদাগরী কারবার করে দিনারের পাহাড় গড়ে তুলেছে।

হাসিব চুপটি করে কিছুক্ষণ ভাবল। এক সময় মুখ খুলল। বলল —“আম্মা, কাল সকালে তুমি একবারটি বাজারে যাবে।

তার আম্মা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তাকাল। হাসিব বলল –হ্যা,। বাজারে গিয়ে তুমি প্রচার করে দেবে, আমি ফিরে এসেছি।

তার আম্মা করলও তাই। বাজারে গিয়ে চাউর করে দিল, হাসিব ফিরে এসেছে।

সে সব কাঠুরেগণ ব্যাপার সুবিধার নয় অনুমান করে পরিস্থিতিটিকে সামাল দেবার জন্য বলল—‘হাসিব ফিরে আসার খবর পেয়ে আমরা খুবই খুশী হয়েছি। আমরা যাব, তার এতদিনের যা কিছু ঘটনা শুনব।' তারা হাসিব-এর মায়ের হাতে তার জন্য বহুমূল্য রেশমী কাপড়, আর বুটিদার কিংখাব নিজেদের দোকান থেকে উপহারস্বরূপ দিয়ে দিল।

হাসিব-এর সাথে ভেট করতে যেতে হবে। দোকানীরা দোকান বন্ধ করে তার মকানে যাবার আগে এক সাথে মিলিত হ’ল। ছােটখাট এক বৈঠকের মাধ্যমে স্থির করল তারা প্রত্যেকে মধুবিক্রির অর্থ থেকে কিছু অংশ তাে হাসিব’কে দেবে সে সঙ্গে বাঁদী আর বাড়ির অংশও তাকে দেবে।

হাসিব-এর মকানে পৌছে দোকানীরা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরল। তার হাতে চুম্বন করে অনুশােচনার স্বরে বলল-“ভাই হাসিব, কাজটি গলতিই হয়ে গিয়েছিল। আমাদের মাফ করে দাও।

তােমার জন্য কিছু উপহার এনেছি, নিতেই হবে। তার অংশ তে তােমারও প্রাপ্য। যদি না নাও তবে বুঝব, তুমি আমাদের ক্ষমা করতে পার নি।

হাসিব ভাবল, মিছে ক্ষোভ জমিয়ে রেখে ফয়দাই বা কি? এতে প্রতিবেশীদের সাথে তিক্ততা বৃদ্ধি ছাড়া ফয়দা কিছুই হবার নয়। তাদের উপহার গ্রহণ করে বল্ল-সাচ্চা বাৎ, যা হবার তা তো হয়েই গেছে। দেয়ালে হাজার মাথা ঠুকলেও তা তাে আর ফেরার নয়।

দোকানীরা আনন্দ করতে করতে বাড়ি ফিরল। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে লাভের বখরা পেয়ে হাসিব একটি বড়সড় দোকান খুলে বসল। শহরে একটি চমৎকার মকানও বানাল।

হাসিব একদিন এক হামামের পাশ দিয়ে হেঁটে চলেছে। হামামের মালিক তাকে সালাম জানিয়ে একবারটি তার হামামে পদার্পণ করার জন্য বার বার অনুরােধ জানাতে লাগল। সুন্দর সব আরামদায়ক ব্যবস্থাদির উল্লেখ করে একবারটি পরীক্ষা করার জন্য তাকে বিশেষ অনুরােধ করতে লাগল। 

হাসিব বলল —“আমাকে মাফ করবেন। আমি এক জনের কাছে কসম খেয়েছি, কোনদিন হামামে ঢুকব না।

হামামের মালিকটি নাছােড়বান্দা। তবু তাকে বার বার অনুরােধ করতে লাগল। এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।

তিন শ' একাত্তরতম রজনী 

পরদিন রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বেগম শাহরাজাদ কিসসার জের টেনে বললেন—“জাঁহাপনা, হাসিব কসম খেয়েছে সে কোনদিনই হামামে ঢুকবে না এমন তাজ্জব বাৎ এমন অদ্ভুত কসমের ব্যাপার হামামের মালিক বিশ্বাসই করতে পারল না। বিশ্বাস করার মাফিক ব্যাপারও তাে নয়।

হামামের মালিক বেশ একটু অভিমানের স্বরেই বলল বুঝেছি, কসম টসম কিছু নয়। আদতে আমাকে এড়িয়ে যাবার একটি ফিকিরমাত্র। মেহেরবানি করে বলবেন কি, আমি আপনার কাছে এমন কি কসুর করলাম যার ফলে আপনি আমার অনুরােধ। সরাসরি উপেক্ষা করে অপমান করলেন?

—সে কী তাজ্জব বাৎ ভাইয়া! আমি তাে বলছি কসম - তাকে থামিয়ে দিয়ে হামামের মালিক এবার বল –“ঠিক আছে, আপনি যা ভাল বুঝেছেন, করলেন। আমিও খােদাতাল্লার নামে কসম খাচ্ছি, আমার হামামে আপনাকে যদি ঢােকাতে না পারি তবে আমি ঘরে যে তিনটি বিবি পুষছি তাদের তালাক দিয়ে দেবাে।’ 

হাসিব প্রমাদ গুণল। বলল —এ কী ফেরে পড়া গেল! 

সে এবার বলল -'কেন ঝুটমুট গােসসা করছ ভাইয়া? আমি খােদাতাল্লার নামে কসম খেয়ে বলছি, তােমাকে যা বলেছি তার একটি অর্থও ঝুটা নয়।'

হাসিব ভাবল, হামামের মালিক কসম খেলে, তার তিন বিবিকে তালাক দিলেও তার কিছুই করার নেই। মুশকিল যতই হােক না কেন তার পক্ষে হামামে গােসল করা বা হাত-পা ধােয়া পর্যন্ত সম্ভব নয়। অনন্যোপায় হয়ে সে তার নিজের পথে পা বাড়াল।

ব্যস, আর দেরী নয়। হামামের মালিক আচমকা এক লাফে তার ঘাড়ে গিয়ে পড়ল। হাত চেপে ধরে বল্ল—“আপনি ফিরে গেলে আমাকে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতেই হবে, তিন-তিনটি বিবিকে তালাক দিয়ে একদম ফকির বনে যেতে হবে। আমি কসম খেয়ে বলছি, হামামে গােসল করার জন্য আপনাকে কোন তকলিফ ভােগ করতে হলে আমি তার জন্য দায়ী হ’ব। তবু আপনি একবারটি হামামে ঢুকুন।

তাদের ধস্তাধস্তিতে রাজপথে পথচারীদের ভিড় জমে গেল। তারা ব্যাপার শুনে হাসিবকে পীড়াপীড়ি করতে থাকে একবারটি হামামে ঢুকে মালিককে কসম রক্ষার সুযােগ দেবার জন্য।

হাসিব কিছুতেই রাজী হ’ল না। তার জেদ দেখে পথচারীদের কয়েকজন নওজোয়ান রেগে গেল। তারা জোর করে হাসিব-এর কোর্তা-পাতলুন খুলে নিয়ে রীতিমত টানতে টানতে হামামে ঢুকিয়ে দিল। জোর করে চেপে ধরে বদনায় করে পানি তুলে তাকে গােসল করিয়ে দিল।

হামামের মালিক শপথ রক্ষা হওয়ায় বেজায় খুশী হল। উৎসাহী পথচারী নওজোয়ানরা হাসিবকে গােসল করিয়ে ফিন কোর্তা-পাৎলুন পরিয়ে দিল।

হাসিব হামাম থেকে বিষমুখে বেরিয়ে পথে নামার উদ্যোগ নেয়। পারল না, মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। তার হালৎ ক্রমে সঙ্গীন হয়ে পড়তে লাগল। গলা শুকিয়ে কাঠ। ক্রমে কলিজা পর্যন্ত শুকিয়ে আসতে লাগল। ঘাড় থেকে মেরুদণ্ড বেয়ে হিমেল স্রোত বার বার মাজা পর্যন্ত নেমে যেতে লাগল। অভাবনীয় ব্যাপার। এক সময় গলা দিয়ে রা-পর্যন্ত করতে পারছেনা, এমন হাল হয়ে গেল। এক সময় হালৎ এমন শােচনীয় হয়ে পড়ল যে, কি করণীয় কিছুই তার মালুম হচ্ছে না।

হাসিব কি যেন বলার কোশিস করল। পারল না। ঠোট দুটো কেবল তিরতির করে কাঁপতে লাগল।

কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটে গেল। রাজার সশস্ত্র সিপাহীরা হামামটি ঘিরে ফেলল । তারা হাসিব-এর কোর্তার কলার ধরে টেনে হিঁচড়ে রাজপ্রাসাদের দিকে নিয়ে চলল। ব্যাপার দেখে হাসিব তাে একেবারে আশমান থেকে জমিনে পড়ল।

রাজপ্রাসাদে এনে সিপাহীরা হাসিব’কে বৃদ্ধ উজিরের সামনে হাজির করল। উজির তারই জন্য উদ্বেগ উৎকণ্ঠার সঙ্গে অপেক্ষা করছিলেন। উজির দু’হাত বাড়িয়ে হাসিবকে পা থেকে তুলতে তুলতে সিপাহীদের ধমকে উঠলেন—তোদের কি কোন কাণ্ডজ্ঞানই নেই। বললাম, সসম্মানে নিয়ে আসবি। আর তােরা কিনা—তােব তােবা!’ উজির হাসিব'কে কুর্ণিশ করলেন। অনুতাপের স্বরে অনুরােধ করলেন—“হুজুর মেহেরবানি করে আপনাকে যে একবারটি সুলতানের দরবারে যেতে হবে।

হাসিব ভাবল, নসীবে যা আছে তা তাে আর খণ্ডন করা যাবে না। বাধ্য হয়ে উজিরের সঙ্গে সুলতানের দরবারের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল।

হাসিব উজিরের পিছন পিছন প্রাসাদের বিশালায়তন এক কামরায় প্রবেশ করলেন। সেখানে সুদৃশ্য এক পালঙ্কে সুলতান শায়িত। রেশমী কাপড় দিয়ে তার মুখ ঢাকা। সুলতানের পালঙ্ক থেকে অদূরে নাজির ও অন্যান্য সভাসদরা দাঁড়িয়ে। আর রয়েছে উন্মুক্ত তরবারি হাতে কয়েকজন গাট্টাগােট্টা ভয়ালদর্শন জহ্লাদ ।

কামরাটির চারদিকে একবারটি চোখ বুলাতেই হাসিব-এর দিমাক ঘুরে গেল। ডরে কলিজা ঠাণ্ডা হয়ে যাবার জোগাড়। সে ভাবল, মােউৎ আর বেশী দূরে নেই। প্রতিশ্রুতি ভাঙার ফল এবার তাকে হাতেনাতে পেতে হবে।

হাসিব এবার পালঙ্কের ওপর আছাড় খেয়ে পড়ে বিলাপ পেড়ে |

( চলবে )

Post a Comment

0 Comments