তিনি খলিফাকে বললেন—“ধৈর্য ধরুন। দিমাক গরম করলে বিলকুল ব্যাপারটি ভেস্তে যাবে। আমি সব সমস্যার সমাধান করার ফিকির বের করছি। ক্রীতদাসটি আমার প্রস্তাব মানতে অস্বীকার করে কিছুমাত্রও কসুর করে নি। খলিফা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে কাজীর দিকে অপলক চোখে নীরবে তাকিয়ে রইলেন। কাজী ইউসুফ বলে চললেন—হ্যা, কোন কসুরই সে করে নি। কারণ, বাঁদীটি তাে তার শাদী করা বিবি। সে তালাক দিতে গররাজি হলে কিছুই করার নেই।
—“তবে এর প্রতিকার ?
–হ্যা, ইসলাম ধর্মে এর প্রতিকারের বিধানও রয়েছে। আপনি ধৈর্য ধরুন, আমি সব বন্দোবস্ত করছি। আপনাকে এখন একটি মাত্র কাজ করতে হবে।
–বলুন, কি করতে হবে আমাকে?
-“কিছুক্ষণের জন্য ক্রীতদাসটিকে আমাকে দান করে দিতে হবে। ব্যস, আমি তবেই মুহূর্তে বিলকুল সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারব।'
—বহুৎ আচ্ছা, আমি তবে একে আপনার হাতে তুলে দিলাম। কাজী এবার বাঁদীটিকে উদ্দেশ্য করে বলেন—“শােন, আমি এ-ক্রীতদাসটিকে তােমাকে দান করতে চাইছি, রাজী আছ?’
বাঁদীটি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল—জী হুজুর, আমি রাজী।
কাজী এবার লাফিয়ে উঠে সােল্লাসে বললেন—ব্যস, কাজ হাসিল! আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ। এতেই তােমাদের শাদী বাতিল হয়ে গেল।
—“তবে? ব্যাপার কি হল? এর ফয়সালা কি হ’ল হুজুর?’
-এবার থেকে তুমি আর এর শাদী করা বিবি রইলে না। সে তােমার নফর বনে গেল। ইসলামে এরকমই বিধান দেয়া আছে।
কাজী ইউসুফ এবার খলিফা হারুণ-অল-রসিদ-এর দিকে ফিরে বললেন—‘জাহাপনা, আমার বিচার সেরে ফেলেছি। এবার আপনি অনায়াসে বাঁদীটিকে রক্ষিতা করে প্রাসাদে নিয়ে যেতে পারেন।
কাজীর উপস্থিত বুদ্ধি ও বিচারের বিচক্ষণতায় মুগ্ধ হয়ে সােল্লাসে বলে উঠলেন—বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা! আপনার মত বিচক্ষণ বিচারক কেবলমাত্র আমার সুলতানিয়াতেই নয়, তামাম দুনিয়ায় আর একটি খুঁজে পাওয়া যাবে না।
খলিফা থলিভর্তি সােনার দিনার দিয়ে কাজী ইউসুফ’কে পুরস্কৃত করলেন। কাজী ইউসুফ ও খলিফার উদারতায় মুগ্ধ হয়ে বলল —“আপনার ওপর খােদাতাল্লার দোয়া বর্ষিত হােক। আপনি পরমায়ু লাভ করুন। ধর্ম, সততা ও ন্যায়পরায়ণতার প্রতি আস্থা রেখে সুখে প্রজা পালন করুন।
কাজীর নির্দেশে এক নফর তার বাক্সটি এনে সামনে রাখল। - কাজী পুরস্কার স্বরূপ লব্ধ মােহরগুলাে বাক্সটির মধ্যে পুরে ডালা বন্ধ করে দিলেন। এবার সেটি নিয়ে তিনি গাধার পিঠে উঠলেন। ফিরে গেলেন নিজের মাকানে।
কিসসা শেষ করে বেগম শাহরাজাদ বললেন-“জাহাপনা, ছােট্ট এ-কিসসাটির মাধ্যমে আইনের এক জটিল সমস্যার সমাধানের ফিকির জানতে পারা গেল।
আবু নবাস ও জুবেদার গােসলের কিসসা
বেগম শাহরাজাদ বললেন—জাহাপনা, শাদী আর তালাকের কিসসা তাে শুনলেন। এবার আবু নবাস ও জুবেদার গােসলের কিসসা বলছি, ধৈর্য ধরে শুনুন—খলিফা হারুণ-অল-রসিদ-এর চাচার বেটির নাম ছিল জুবেদা। খলিফা যুবতী জুবেদা’কে বহুৎ পিয়ার করতেন। তাকে খুশী করার জন্য একটি মনলােভা বাগিচা গড়ে দিয়েছিলেন। বাগিচার কেন্দ্রস্থলে বানিয়ে দিয়েছিলেন সুদৃশ্য একটি ছােট্ট প্রাসাদ। তারই পাশে ছিল চমৎকার একটি ফোয়ারা। আর একটি সায়রও ছিল বাগিচাটিতে। স্বচ্ছ নীল তার পানি।
রােজ বিকালে বেগম জুবেদা সামান্যমাত্র পােশাকে লজ্জা নিবারণ করে গাছের ছায়ায় ছায়ায় ঘুরে বেড়ান সায়রে সাঁতার কাটেন দিলভরা খুশী নিয়ে আর গােসল করেন এক অনাস্বাদিত খােশ মেজাজে।
বাগিচাটিকে প্রাচীর দিয়ে এমন ভাবে ঘেরাও করা যে, বাইরে থেকে আচমকা ভেতরে ঢুকে যাওয়া তাে দূরের কথা কেউ উঁকি ঝুঁকি দিয়ে ভেতরের দৃশ্য দেখতে পর্যন্ত পায় না। এক দুপুরের কিছু আগে বেগম জুবেদা বাগিচায় হাজির হলেন। বাইরে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড উত্তাপ। তামাম দুনিয়াটি যেন জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। বেগম জুবেদা বাগিচায় ঢুকে সায়রটির কাছে গেলেন। ওড়না, সালােয়ার ও কামিজ যা কিছু পরনে ছিল বিলকুল খুলে ফেললেন।
বেগম এবার বিবস্ত্র হয়ে সায়রের পানিতে নামলেন। হাঁটু সমান পানিতে গিয়ে দাঁড়ালেন। আদতে আর গভীরে যেতে তার ডর লাগল। কারণ, সাঁতারে তিনি তেমন পটু নন। তাই অনন্যোপায় হয়ে কোমরের কাছাকাছি পানিতে দাঁড়িয়ে বদনা ভরে পানি নিয়ে গায়ে মাথায় ঢালতে লাগলেন।
এদিকে খলিফা হারুণ-অল-রসিদ ইতিমধ্যে অতি সন্তর্পণে গুটিগুটি এসে পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। গােসলরতা বেগম জুবেদার বিবস্ত্র শরীরটিকে দেখার লােভ তিনি সম্বরণ করতে পারেন নি। তিনি ছােট্ট একটি গাছের ডাল ধরে তন্ময় হয়ে দাঁড়িয়ে চোখ ও দিলকে তৃপ্ত করতে ব্যস্ত। আচমকা গাছের সে-ডালটি মড়াৎ করে গেল ভেঙে। খলিফা যেন হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেলেন।
এমন সময় প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় পাখির আনাগােনা শুরু হয়ে গেল। ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ ঊনআশিতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসাটির অবশিষ্টাংশ শুরু করলেন—“জাহাপনা, আচমকা শব্দটি কানে যাওয়ামাত্র বেগম জুবেদা আতঙ্কিত হয়ে যন্ত্রচালিতের মাফিক ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন দিকে তাকালেন। ব্যস্ত-হাতে শরীরের নিম্নাঙ্গ ঢেকে আকস্মিক লজ্জা নিবারণের কোশিস করতে থাকেন। আর অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিমেলে অদৃশ্য লােভাতুর চোখের খোঁজ করতে লাগেন।
কিন্তু দুটো মাত্র হাত দিয়ে নিম্নাঙ্গ ও বক্ষ—উভয়কে এক সঙ্গে তাে আর চাপা দেয়া সম্ভব নয়। ফলে খলিফার চোখের সামনে সবই ধরা পড়ে যায়।
খলিফার দৃষ্টিতে লালসা মাখানাে রয়েছে পুরােদস্তুর। তার পক্ষে ইতিপূর্বে কোনােদিন বেগম জুবেদার এরকম বিলকুল বিবস্ত্র শরীর দেখা সম্ভব হয় নি। আজ তার সে বাঞ্ছা পূরণ হ’ল। আজই প্রথম তার বিবস্ত্র শরীর দেখে তিনি চোখ ও দিলকে তৃপ্ত করতে পারলেন।
খলিফা বিস্ময় ও বিমূঢ় অবস্থায় গাছের আড়ালে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে এক সময় আগের মতই সন্তর্পণে বাগিচা থেকে বেরিয়ে এলেন।
খলিফা চোখ ও দিলকে তৃপ্ত করে বাগিচা ছেড়ে বেরিয়ে এলেন বটে, কিন্তু তার কলিজার কামজ্বালা মাথাচঁড়া দিয়ে উঠল। তার শান্ত দিল ক্রমেই আনচান করতে লাগল। খলিফা কামজ্বালা ভুলে থাকার জন্যে গুনগুন করে গান গাইতে লাগলেন। কিন্তু বৃথা কোশিস। অব্যক্ত যন্ত্রণা তার কলিজাকে কুরে কুঁরে খেতে লাগল।
অশান্ত দিল নিয়ে তিনি নিজের কামরায় ফিরে এলেন। গুনগুন্ করে গানা ধরলেন
সাগরের পানিতে আমি হেরিলাম যারে - ব্যস, এ-পর্যন্তই। আর অগ্রসর হতে পারলেন না। গানটির পরবর্তী কলি রচনা করার জন্য তিনি প্রাণান্ত প্রয়াস চালাতে লাগলেন। কিন্তু বৃথা কোশিস। কিছুতেই পরবর্তী কলিটি বানাতে না পেরে তিনি এক নফরকে পাঠিয়ে তার সভাকবি আবু নসাব'কে তলব করলেন।
খলিফার তলব পেয়ে কবিবর হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। কবির দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি বললেন-“আবু, এ যে মহা সমস্যায় পড়া গেল দেখছি!’
আবু নসাব ভাবলেন, খলিফা কি না জানি সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছেন। মুখ কাচুমাচু করে বললেন— সমস্যাটি আমাকে খােলসা করে বলুন। আমি কোশিস করে দেখি, যদি কিছু করতে পারি।'
—“আমি একটি গানার প্রথম ছত্র রচনা করেছি। কিন্তু আর অগ্রসর হত পারছি না। আর দু’-একটি ছত্র তার সঙ্গে যােগ না করলে যে সেটি অসমাপ্ত রয়ে যায়।
—“ছত্রটি কি, বলুন তাে শুনি। –‘সাগরের পানিতে আমি হেরিলাম যারে।
-“জাঁহাপনা দেখুন তাে, গানাটির পরবর্তী ছত্রটি এভাবে দাঁড় করালে আপনার দিল খুশীতে নেচে ওঠে কিনা?
—বল, বল আবু, কি সে ছত্রটি ? —“সাগরের পানিতে আমি হেরিলাম যারে।
অকিনু ছবিটি তার হৃদয়-মাঝারে।।”
খলিফা উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে বলে উঠলেন—বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা আবু! আমি এতভাবে কোশিস করেও যাকে ভাষায় প্রকাশ করতে পারি নি তুমি এক মুহূর্তে তাকে ভাষার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুললে? আমি ঠিক এরকম কথাই ভাবছিলাম।
খলিফা হারুণ-অল-রসিদ কবি আবু নসাব’কে ইনাম দিয়ে খুশী করলেন।
বেগম শাহরাজাদ কিসসাটি শেষ করে চুপ করলেন। বেগমের ছােট বহিন দুনিয়াজাদ তার গলা জড়িয়ে ধরে ভাবাপ্লুত কণ্ঠে বলল—'বহিনজী, কী সুন্দর তােমার কিস্সা। এসব কিসসা ছােট হলেও কী সুন্দর। দিলে দাগ কাটার মতই প্রতিটি ঘটনা। এবার একটি জন্তু-জানােয়ারের কিসসা বল।
আজব গাধার কিস্সা
বেগম শাহরাজাদ তার বহিনের অনুরােধ রক্ষা করতে গিয়ে ‘আজব গাধার কিসসা'-টি শুরু করলেন।
এক সকালে এক রসিক আদমি একটি গাধার গলায় দড়ি পরিয়ে টেনে হিচড়ে বাজারের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। গাধাটি একদম নাদুসনুদুস। একটি ধূর্ত চোর গাধাটিকে দেখে লােলুপ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। সে তখনই মনস্থির করে ফেলল যে-কোন ভাবেই হােক গাধাটিকে সে চুরি করবেই। কিন্তু কিভাবে সে মতলবটিকে বাস্তবায়িত করবে?
সাকরেদটি বলল —এ আবার এমন কি কঠিন কাজ, গুরু ? ভাববার মত ব্যাপরাই নয় এটি। তুমি শুধু আমার সঙ্গে থাক। আর যা কিছু বিলকুল আমিই করব। দেখবে, গাধাটিকে আমি এমন এক ফন্দি করে গায়েব করে ফেলব যে, গাধার মালিক তাে দূরের কথা তুমিও কিছুই মালুম করতে পারবে না।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিনশ’ আশিতম রজনী
বাদশাহ শাহরিয়ার যথা সময়ে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসাটির অবশিষ্টাংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন- জাঁহাপনা, সে-চোর আর তার সাকরেদটি গাধাটির পিছন পিছন গুটি গুটি হাঁটতে লাগল। কারাের বাপের সাধ্যি ধরতে পারবে যে, তারা গাধাটিকে হাফিস করার কুমতলবে তার পিছু নিয়েছে।
কিছুক্ষণ বাদে এক সময় চোরের সাকরেদটি গাধার গলা থেকে রশির ফাসটি খুলে ফেলে ঝট করে নিজের গলায় পরে নিল। আর চোরটি গাধাটিকে নিয়ে বেপাত্তা হয়ে গেল।
চোরের সাকরেদটি গাধার গলার রশির ফাঁসটি নিজের গলায় পরে নিয়ে এমন কায়দায় চলতে থাকল যে, গাধার মালিক ব্যাপারটির তিলমাত্রও বুঝতে পারল না। সে আগের মতই রশির প্রান্তটি ধরে হাঁটতে হাঁটতে ভেবে চলেছে—গাধাটিকে কত দামে বেচলে তার মুনাফা কত হবে। আর গাধাটির কোন্ কোন্ গুণের কথা বলে তার প্রতি খরিদ্দারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার কোশিস করবে। একে বেচে অন্য একটি গাধা সে খরিদ করবে। চোরের সাকরেদটি যতই সতর্কতার সঙ্গে গাধার মালিকের পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলার কোশিস করুক না কেন, বার বার রশিটিতে টান পড়তে লাগল। ফলে গাধার মালিক পথ চলতে চলতে, পথের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই বলতে লাগল-- শয়তান গাধাটি একেবারে কুড়ের বাদশা। বসে বসে খেয়ে গতরটিকে এমন বানিয়েছে যে, আর নড়তে চড়তে চায় না! ঘা কতক পিঠে দিলে তবে হতচ্ছাড়াটি পাচালিয়ে চলে।
কিছু সময় বাদে চোরের সাকরেদটি দেখল, চোরটি গাধাটিকে নিয়ে চোখের আড়ালে, একদম বেপাত্তা হয়ে গেছে। তখন সে ঘাড় বাঁকিয়ে একদম সােজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। গাছের গুড়ির মাফিক। একদম নিশ্চল-নিথর।
গাধাটির মালিক সামনের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই রশিটির প্রান্ত ধরে সজোরে টানতে লাগল। আর ভাবল, এমন বে-আজব গাধা তাে আমার চৌদ্দপুরুষেও দেখি নি।
রশি ধরে টানাটানি করে তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বহুৎ কোশিস সে করল। কিন্তু এক চুলও নড়াতে পারল না। তখন রাগে গগস করতে করতে আচমকা পিছন ফিরে তাকাল। ব্যস, তার চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবার যােগাড়। এতই অবাক হয়ে পড়ে যেন মুখ দিয়ে তার রা-ও সরতে চাইছে না।
গাধাটির মালিক কোনরকমে একটু ধাতস্থ হয়ে বলল—“গাধা! ইয়া আল্লাহ! এ যে আমি! এ কী তাজ্জব ব্যাপার!
সে তার নিজের চোখ দুটোর ওপরও যেন আস্থা হারিয়ে ফেলল। অবিকল আদমির মাফিক হাত, পা, চোখ, কান মুখ—আদমি না হয়ে পারেই না। তবে? তবে কি নিদের ঘােরে সে খােয়াব দেখছে? তা-ই বা হবে কি করে? সে যে রশি হাতে পথের মাঝে দাঁড়িয়ে। এত বড় একটি জলজ্যান্ত ঘটনা কি আর মিথ্যা, খােয়াব হতে পারে। অন্য সব পথচারীদের মাফিক এরও তাে সব কিছু রয়েছে। তবে? গাধা গেল কোথায় ? গাধাটি পথ চলতে চলতে কি করে অবিকল আদমি বনে গেল?
গাধার মালিক হতভম্ভের মত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে চোরের সাকরেদটিকে প্রশ্ন করল—“তুমি কি? তুমি কি আদমি ?
-“হুজুর, আমি আদমি-টাদমি নই। আপনার গাধা আমি। সে কী হুজুর আপনি আমাকে একদম চিনতে পারেন নি ?'
ব্যাপার দেখে গাধার মালিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। তার চোখ দুটো মুহূর্তে ছানাবড়া হয়ে গেল। অনুচ্চকণ্ঠে বলে উঠল—এ কী ভুতুড়ে কাণ্ড! গাধা কথা বলছে! আদমির মাফিক কথা বলছে। গাধাটি।
চোরের সাকরেদটি করজোড়ে নিবেদন করল—“হুজুর, আমি পয়দা হওয়ার সময় গাধা ছিলাম না। আমি আদমির গর্ভে, আদমির বাচ্চা হয়েই পয়দা হয়েছিলাম। আমার নসীবই আমাকে গাধা বানিয়েছে। নসীবের ফেরেই আমি গলায় রশি পরেছি।
—সে কী হে! এ কী তাজ্জব বাৎ শােনাচ্ছ?'
-“ঠিকই বলছি হুজুর। আমি যখন গুড়াবাচ্চা ছিলাম তখন বহুৎ নটখট লেড়কা ছিলাম। মহল্লার সবাই আমার অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে পড়েছিল। ব্যস, বাধ্য হয়ে আমার আম্মা আমাকে অভিশাপ দিয়ে গাধা বানিয়ে দিল। সেই থেকেই আমি গাধা রয়ে গেলাম। এ আমার নসীবের ফের ছাড়া আর কি-ই বা হতে পারে?
আমি একদিন রশি ছিড়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লাম। তাতেও রেহাই পেলাম না। এক আদমি আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে বাজারে বেচে দিল। তারপর আপনি এক সময় আমাকে খরিদ করে নিলেন। ব্যস, আপনার ঘরে আটক হয়ে পড়লাম। মােট বয়ে দিন গুজরান করছি। এতদিন আমার মুখে ভাষা ছিল না। ফলে আমার দুঃখ-দুর্দশা আপনাকে জানানাে সম্ভব হয় নি। এখন ভাষা ফিরে পেয়েছি। আপনার কাছে আমার আজ একটি প্রার্থনা, মেহেরবানি করে আমাকে ছেড়ে দিন। আমি খালাস পেয়ে আমার আম্মার কাছে ফিরে গেলেই সবকিছুর সুরাহা হয়ে যাবে। আমার আম্মার গােসসা নির্ঘাৎ লােপ পেয়েছে। তিনি খুশী হয়ে আমাকে ফিন আদমির শরীর ফিরিয়ে দেবেন। বিলকুল আগের শরীর ফিরে পাব।'
চোরের সাকরেদটির বাৎ শুনে গাধার মালিক তাে একদম মাথায় হাত দিয়ে পথের মাঝে বসে পড়ল। গলা ছেড়ে বিলাপ জুড়ে দিল--“ইয়া খােদা! একী গুনাহ করলাম আমি! আমার যে দোজখেও জায়গা হবে না! না, আর এক মুহূর্তও তােমার গলায় আমি রশি রাখতে চাই না। এখনই ছেড়ে দিচ্ছি। আজই তুমি তােমার মকানে, তােমার আম্মার কাছে ফিরে যাও বেটা। এতেই যে গুস্তাকী হয়েছে খােদাতাল্লা তা মাফ করবেন কিনা জানি না। বেটা, তােমার গলার রশি খুলে দিচ্ছি।'
গাধার মালিক এভাবে হাপিত্যেশ করতে করতে চোরের সাকরেদটির গলা থেকে রশিটি খুলে দিল। নিজের কাজের জন্য ধিক্কার দিতে দিতে ঘরে ফিরে গেল। চোরের সাকরেদটি ছাড়া পেয়ে সােজা তার ওস্তাদের কাছে ফিরে গেল। এ-ঘটনার কয়েকদিন বাদে গাধার মালিক বাজারে গেল অন্য একটি গাধা খরিদ করার জন্য। গাধাটি হাতছাড়া হওয়ায় তার কাম কাজ একদম বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড় হয়েছে।
গাধার মালিকটি বাজারে ঢুঁড়তে ঢুঁড়তে হঠাৎ একটি গাধার দিকে বিস্ময় মাখানাে দৃষ্টিতে তাকাল। সে প্রায় চিল্লিয়ে উঠল—ইয়া আল্লাহ! এ যে আমার সেই গাধাটিই বটে! বেচার জন্য বাজারে হাজির করা হয়েছে। হ্যা, অবিকল সে-গাধাটিই বটে!
গাধার মালিকটি সে-গাধাটির দিকে তাকিয়ে অনুচ্চকণ্ঠে বলতে লাগল—“হতচ্ছাড়া নচ্ছারটি নির্ঘাৎ তার মাকে জ্বালাতন করে

0 Comments