গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
বহুৎ আচ্ছা সব খানা খেতে দিল। সরাবও দিল এক বােতল। আমার খানাপিনা মিটে গেলে বুড়াে কোর্তার জেব থেকে বেশ বড়সড় একটি থালা টেনে বের করল। গুনে গুনে এক হাজার দিনার আমার হাতে তুলে দিল। আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরখ করে নিলাম। জাল নয়।
বুড়াের কাণ্ডকারখানা দেখে আমার কাণ্ড তাজ্জবই মনে হচ্ছিল। সে এবার এক নফরকে কাছে ডাকল। তাকে দিয়ে আমার জন্য এক পরস্ত নতুন পােশাক আনাল। তার নির্দেশে সেগুলাে গায়ে চাপিয়ে নিলাম।
এবার যে-লেড়কিটি আমার প্রাপ্য হবে তাকেও সামনে আনিয়ে আমাকে দেখিয়ে দিল। আমার কোনরকম ধন্দ যেন না থাকে।
আমি তাজ্জব বনে গেলাম। আমাকে কি কাজ করতে হবে তা বলার নাম নেই। কিন্তু আমার প্রাপ্যটুকু সে আগেভাগেই বুঝিয়ে দিল।
আমি বুড়ােটিকে দেখছি আর তাজ্জব হয়ে তার কাণ্ডকারখানার ওপর নজর রাখছি।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ তেষট্টিতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর শুরু হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার অন্দর মহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—‘জাহাপনা, বুড়ােটি আমাকে সাজিয়ে গুজিয়ে, গায়ে গুলাবের আতর ছিটিয়ে লেড়কিটির কামরায় পাঠিয়ে দিল।
দেখলাম, লেড়কিটি পালঙ্কের ওপর মনলােভা ভঙ্গিতে আমার অপেক্ষায় বসে। ব্যাপার দেখে আমি যেন একদম আশমান থেকে জমিনে পড়ে গেলাম। ইয়া আল্লাহ! এ যে বেহেস্তের হুরী! বুড়াে আমাকে প্রসঙ্গক্রমে বলেছিল, লেড়কিটি একদম আনকোরা, কুমারী। কোন মরদ একে স্পর্শ করতে পারে নি। সহবাসের মাধ্যমে বুঝলাম, বুডোের বাৎ একদম সাচ্চা। তিনদিন তিনরাত্রি কামরার মধ্যেই আমরা কাটিয়ে দিলাম। ফলে খানাপিনা যা কিছু বিলকুল লেড়কিটির সঙ্গেই আমাকে সারতে হল। চতুর্থ দিন ভােরে বুড়াে আমাকে তলব করল। আমি কাছে গিয়ে বুড়ােকে সালাম জানালাম।
বুড়াে তার অনুজ্জ্বল চোখ দুটো মেলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল —তােমার পাওনা গণ্ডা আগামই পেয়ে গেছ, কি বল ?
আমি ঘাড় কাৎ করে বললাম—জী হুজুর।
—“যাক, এখন তবে কাজ করতে পারবে, কি বল ?
--“কিন্তু কি কাজ তার বিন্দু বিসর্গও তাে আমার জানা নেই। তবু কাজ না করে তাে রেহাই নেই। কি কাজ আমাকে করতে হবে, মেহেরবানি করে বলুন।
বুড়াে ইশারায় দু’জন ক্রীতদাসকে তলব করল। তারা আমাকে নিয়ে দুটো খচ্চরের কাছে হাজির হ’ল। লাগাম বাঁধা খচ্চর। তাদের একটির পিঠে একজন আগেভাগেই বসে। আদমিটি আমাকে অন্য খচ্চত্রটির ওপর বসতে নির্দেশ দিল। গুছিয়ে গাছিয়ে বসতে না বসতেই হতচ্ছাড়া খচ্চর দুটো লেজ তুলে ছুটতে শুরু করে দিল। একেবারে জোর কদমে ছােটা যাকে বলে। লাগাম ধরে কোনক্রমে নিজেকে সামলাতে পারলাম। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এক নাগাড়ে ছুটেই চললাম। এক সময় এমন বেখাপ্পা জায়গায় পৌছলাম যে-জায়গাটি একেবারেই খাড়াই। মানুষই কেবল নয়, কোন জন্তুর পক্ষেও এরকম একটি পাহাড়ে ওঠা সম্ভব নয়।
অনন্যোপায় হয়ে খচ্চরের পিঠ থেকে নামতেই হ’ল। আমার সঙ্গীটি আমার দিকে একটি ছুরি এগিয়ে দিয়ে বলল—এটি দিয়ে তােমার খচ্চরটির ভুড়ি ফাসিয়ে দাও। কাজ শুরু করে দাও। এরই মাধ্যমে তােমাকে কাজ শুরু করতে হবে।
আমি কোনরকম প্রশ্ন না করেই কাজে লেগে গেলাম। ছুরি দিয়ে ভুড়ি ফাঁসিয়ে দিতে না দিতেই খচ্চরটি ইহলােক ত্যাগ করল।
আমার সঙ্গীটির দ্বিতীয় নির্দেশ—‘খচ্চরটির লাশ থেকে ছাল ছাড়িয়ে নাও।
আমি এবারও কোন প্রশ্নের অবতারণা না করেই তার হুকুম । তামিল করে ফেললাম।
সে এবার বলল –চামড়াটি পেতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়। তারপর আমি চামড়াটির চারদিকে সেলাই করে দিচ্ছি।
আমি এবারেও নিঃশব্দে তার হুকুম তামিল করলাম। চামড়াটি পাথরের ওপর বিছিয়ে চটপট শুয়ে পড়লাম। চিৎ হয়ে শুলাম।
সে এবার আমার গায়ে সূচ না ফোটে এরকম কৌশলে হাত চালিয়ে সেলাই করতে লেগে গেল। সেলাই করার কাজ অব্যাহত রেখেই সে বলল —যা বলছি, শােন—এখনই একটি অতিকায় বাজ পাখি এসে চামড়া সমেত তােমাকে নখ দিয়ে আঁকড়ে ধরে তার বাসায় নিয়ে যাবে। ওই যে দুর্গম পাহাড় দেখতে পাচ্ছ তার মাথায় তার বাসা।
আমি স্থবিরের মত নিশ্চল-নিথর ভাবে তার বক্তব্য শুনতে লাগলাম। আমার প্রাণপাখি বুঝি বাজপাখির ছোঁয়া পাওয়ার আগেই খাঁচাছাড়া হয়ে যাবে।
সে এবার বলল —ইয়াদ রেখাে, আকাশে ওড়ার সময় একদম নড়াচড়া করবে না। যদি আমার বাৎ না মেনে নড়াচড়া কর তবে বাজ পাখিটি ভয় পেয়ে নখের বাঁধন আলগা করে দেবে ছেড়ে। আশমান থেকে ধপাস করে পড়বে একেবারে জমিনে। ফলে কি হবে আশা করি বুঝতেই পারছ?
আমি ঘাড় কাৎ করে তার কথার জবাব দিলাম।
সে বলে চলল —বাজপাখিটি পাহাড়ের চূড়ায় পৌছে তােমাকে ছেড়ে দেয়া মাত্র এ-ছুরিটি দিয়ে চামড়া কেটে বাইরে বেরিয়ে আসবে। পাখিটি আচমকা তােমাকে দেখতে পেয়ে ডরে তফাতে ভেগে যাবে। এবারই তােমাকে আসলি কাজটি সেরে ফেলতে হবে। কাজটি হচ্ছে, পাহাড়ের ওপরে দেখবে মূল্যবান সব পথরের ছড়াছড়ি। তুমি সে সব পাথর ওপর থেকে গড়িয়ে নিচে', ফেলতে থাকবে। পাথর ফেলে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসবে। আমার বাৎ তােমাকে সমঝাতে পেরেছি কি ?
আমি আগের মতই ঘাড় কাৎ করলাম।
সে সবশেষে মুচকি হেসে বল্ল—“নিচে নেমে আসার পরই তােমার ছুটি। আমরা ফিন খচ্চরের পিঠে চেপে এখান থেকে ফিরে যাব। ঠিক আছে তাে?
ইহুদীটি সেলাই ফোড়াই সেরে আমার কাছ থেকে সরে গিয়ে আবডালে দাঁড়িয়ে রইল।
সেলাই শেষ হতে না হতেই হেঁচকা একটি টান অনুভব করলাম। বুঝতে পারলাম, বাজপাখি নখে চেপে ধরে আমাকে শূন্যে তুলে নিয়েছে। অনুভব করলাম, আমি আকাশ পথে উড়ে চলেছি। আমি মড়ার মত শিটকে লেগে পড়ে রইলাম। মালুম হ’ল আমাকে শক্ত কিছুর ওপর নামিয়ে দিয়েছে। আশমান থেকে ছেড়ে দেয় নি। আছাড় খেয়ে পড়লে হালৎ অন্য রকম হত। শক্ত পাথরের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। খােদাতাল্লাকে সুকরিয়া জানাতেই হ’ল। এবার ইহুদীটির নির্দেশ অনুযায়ী ছুরি চালিয়ে চামড়াটি কাটার কাজে লেগে গেলাম।
চামড়া কেটে আমি বাইরে বেরিয়ে আসতেই বাজপাখিটি আচমকা বিকট স্বরে চিল্লিয়ে তফাতে চলে গেল। আমি এবার সে-আসলি কাজে লেগে গেলাম। পান্না, চুনি আর হরেক কিসিমের বহুমূল্য সব পাথর ব্যস্ত-হাতে জড়াে করতে লেগে গেলাম। এবার ঠেলে ধাক্কে পাথরের স্তুপটি গড়িয়ে নীচে ফেলতে শুরু করলাম। সে সব ইহুদীটির কাছে চালান হয়ে গেল।
তাদের কাজ তাে মিটল। এবার আমি পাহাড় থেকে নিচে নামব, তারপর মজুরির অর্থ নিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়াব।
ব্যাপারটি খুবই সহজভাবে বলা গেল বটে। কিন্তু পাহাড় থেকে নামতে গিয়ে বুঝলাম, কী কঠিন সমস্যার মুখােমুখি আমি দাঁড়িয়ে। নিচের দিকে তাকাতেই আমার কলিজাটি যেন আচমকা একটি ডিগবাজী খেয়ে গেল। গলা শুকিয়ে একেবারে কাঠ কী করে নামা যাবে? চুড়ার পরেই বিশাল কার্নিশ । কার্নিশের পর থেকে একদম খাড়াই। চারদিকে একবার চক্কর মারলাম। না, নামবার কোন ফিকিরই বের করতে পারলাম না। একটি পাথরের চাই আঁকড়ে ধরে নীচের দিকে উঁকি দিয়ে যা দেখলাম তাতেই পুরাে ব্যাপারটি আমার মালুম হ’ল। দেখি ইহুদীটি আমার জোগান দেয়া পাথরগুলাে বস্তা বােঝাই করে খচ্চরটির পিঠে চাপিয়ে দিয়েছে। এবার নিজেও চাপল তার ওপর। ব্যস, লম্বা লম্বা পায়ে খচ্চরটি এগিয়ে চলল শহরের দিকে। আমি আর্তনাদ করে ওঠলাম—“ইয়া আল্লাহ! আমি কি তবে এ-নির্জন-নিরালা পাহাড়ের বুকে নির্বাসিত হলাম!
আমি চড়ার একটি পাথরের টুকরাের ওপর বসে আতঙ্ক ও হতাশায় আকুল হয়ে কাদতে লাগলাম।
এক সময় খােদাতাল্লার নাম নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। মনকে শক্ত করে বাঁধলাম। নসীবে যা আছে তা তাে হবেই। এবার হাঁটা জুড়লাম। কোশিস করে দেখি যদি নিচে নামার কোন ধান্দা বের করতে পারি।
না, আমি পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ে যাই নি। খােদাতাল্লার দোয়ায় জব্বর রক্ষা পেয়ে গেছি। এক নাগাড়ে দু’মাহিনা ধরে আমি পর্বতটির চূড়ায় চক্কর মেরে বেড়ালাম।
সবশেষে এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তেই হ'ল। দেখি, সামনে একটি নদী পাহাড়ের গা বেয়ে কুল কুল রবে নিচে নেমে গেছে। বয়ে চলেছে উপত্যকার ওপর দিয়ে। খােদাতাল্লা যেন অকৃপণ হাতে এ-জায়গাটিকে গড়ে তুলেছেন। নদীর তীর ধরে হরেক কিসিমের ফুল আর ফলের গাছ। গাছে গাছে পাকা ফলের বাহার। খিদেতে পেটের মধ্যে আগুন জ্বলছে। ব্যস্ত হাতে কয়েকটি ফল ছিড়ে হালুম হালুম করে উদরে ঢুকিয়ে দিলাম। গণ্ডুষ ভরে বু নদীর ঠাণ্ডা পানি তুলে গলা ভেজালাম। আমি এবার কিছুটা সতেজ হতে পারলাম। নদীর পাড় ধরে এগিয়ে চললাম। কিছুদূর যেতে না যেতেই আচমকা থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হ’ল। কোন্ অদৃশ্য শক্তি যেন আমার পা দুটোকে পাথরের সঙ্গে শক্ত করে আটকে দিয়েছে। এমন অভাবনীয় একটি ব্যাপার আচমকা চোখের সামনে দেখলে তাজ্জব না বনে তাে উপায় নেই। পাহাড়ের গায়ে একটি সুবিশাল মকান প্রাসাদ। সামনেই প্রাসাদের সদর-দরওয়াজা। সেখানে একটি পাথরের বেদীর ওপরে এক বুড়াে বসে ঝিমােচ্ছ। আমার পায়ের শব্দে সচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। যন্ত্রচালিতের মত উঠে সে আমার পথ আগলে দাঁড়ালেন। প্রথমে ভেবেছিলাম দ্বাররক্ষীটক্ষী কেউ হবে। তার হাতের চুনির তৈরি রাজদণ্ডটি আমার ভুল ভাঙিয়ে দিল। তিনি নির্ঘাৎ রাজা।
আমি নতজানু হয়ে কুর্নিশ জানালাম। রাজার মুখে হাসির ছােপ ফুটে উঠল। আমাকে সস্নেহে পাশে বসালেন।
আমি তার আসনের মুখােমুখি অন্য একটি পাথরের আসনে। জড়ােসড়াে হয়ে বসে পড়লাম।
রাজা বললেন—“বেটা, এখানে কখন এসেছ? কোথেকেই বা এসেছ? কই, তােমার আগে তাে এখানে কোন আদমি আসে নি। কোথায় যাওয়ার দিল আছে, বল তাে?'
এমন মধুর আচরণ, এমন সহৃদয়তা এমন অন্তরঙ্গ বাৎচিৎ বহুকাল শুনতে পাই নি। আমার ভেতরে দুঃখ-দুর্দশা-হতাশা যা কিছু রয়েছে বিলকুল বুড়াে রাজার কাছে ঢেলে দেবার জন্য বড়ই
উৎসুক হয়ে পড়লাম।
বুড়াের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে আমি শিশুর মত কান্না জুড়ে দিলাম। বুকের জমাটবাঁধা দুঃখ-হতাশা আর কথার চাপে আমি ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগলাম। শেষে আমার হালৎ এমন হয়ে পড়ল যে, আর কিছু বলার মত ক্ষমতাই আমার রইল না। কেবলই ফোপাতে লাগলাম। বুড়াে অধিকতর সহানুভূতির স্বরে বলল —“বেটা, ঝুটমুট কেঁদে কি-ই বা ফয়দা হবে? তােমার দুঃখ-বেদনায় আমার বুকের পাঁজর ভেঙে গুড়িয়ে যেতে চাইছে। বুড়াে আমাকে নিয়ে সুসজ্জিত একটি কামরায় গেলেন। একটি সুদৃশ্য বহুমূল্য আসনে নিজে উপবেশন করলেন। পাশের একটি আসনের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে আমাকে বসতে বললেন। আমি আসন গ্রহণ করে আমার করুণতম কাহিনী আদ্যোপান্ত বললাম।
আমি নিজের দুঃখ-দুর্দশার কাহিনী বুড়াের কাছে উজাড় করে ঢেলে দিলাম। তারপর আচমকা প্রশ্ন করে বসলাম-“আচ্ছা, এ প্রাসাদ, অগাধ ধন দৌলত—এসব কার? এসবের মালিক কে, মেহেরবানি করে বলবেন কি ?
—এসব বাৎ জানার জন্য তােমার বুঝি খুব কৌতূহল হচ্ছে ? বলছি তবে শােন, বহু দিন আগে সুলতান সুলেমান এ-ইমারত তৈরি করেছিলেন। তাঁরই হুকুমে আমি পাখিদের অধিনায়কত্ব করে চলেছি। তামাম দুনিয়ার পাখি তার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য জিন্দেগীতে একবার না একবার আসবেই। তুমি কি তােমার মুলুকে ফিরে যেতে চাও?
-“আপনার সাথে মােলাকাৎ যখন হয়েই গেছে তখন আর মুলুকে ফেরার জন্য আমি মােটেই ভাবিত নই।'
‘সাচ্চা বাৎ। তুমি যদি নিজের মুলুকে ফিরতে চাও তবে আমাকে বােল, কোন একটি পাখিকে বলে দিলেই যেখানে, যতদূরেই হােক তােমাকে পৌছে দিয়ে আসবে। আর শােন, এ ইমারতকে নিজের বলেই জ্ঞান করবে। তােমার খুশী মাফিক যেকোন কামরায় প্রবেশ করতে পারবে। কিন্তু কেবলমাত্র একখানা কামরায় ভুলেও যেন ঢােকার কোশিস কোরাে না। এবার এক গােছা চাবি আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন—এর মধ্যে একটি সােনার চাবি আছে, সেটি দিয়ে সে-বিশেষ কামরাটি খােলে।
চাবির গােছাটি আমার হাতে গুঁজে দিয়ে পাখিদের অধিনায়ক বুড়ােটি কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
আমি কৌতুহল বশতঃ সােনার চাবি দিয়ে যে কামরাটি খােলে তার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম। কৌতূহল যথেষ্টই রয়েছে বটে। কিন্তু কামরাটিকে স্পর্শ করতেই দিল চাইল না।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ চৌষট্টিতম রজনী
বেগম শাহরাজাদ পরের রজনীতে কিসসার অবশিষ্ট অংশটুক শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাহাপনা, পাখিদের অধিনায়ক বুড়াে জানশাহকে যে কামরায় যেতে নিষেধ করে দিয়েছে সে-কামরার প্রসঙ্গে সে রাজা বুলুকিয়া’কে বলছে—কামরাটির দরওয়াজায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর আমার কৌতুহল ক্রমেই অদম্য হয়ে উঠতে লাগল। শেষে একসময় কৌতুহল এতই মাথাচাড়া দিয়ে উঠল যে, তাকে দাবিয়ে রাখা আমার পক্ষে খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়াল। বুড়াের নিষেধ আর আমার যুক্তি মুহুর্তে নস্যাৎ হয়ে গেল। আমি হেরে গেলাম। এক সময় তালাটির গায়ে সােনার চাবিটি লাগিয়ে আল্লাতাল্লার নাম স্মরণ করে চাবিতে মােচড় মেরে বসলাম।
দরওয়াজা খুলে অজ্ঞাত নিষিদ্ধ বস্তুর দুর্নিবার আকর্ষণে এক লাফে কামরার ভেতর ঢুকে গেলাম।
কামরার ভেতরে আমি তাে একেবারে তাজ্জব বনে গেলাম। কয়েক কিসিমের চমৎকার কিছু সামগ্রী ছাড়া ডর-ভয়ের মত কিছুই নজরে পড়ল না।
কামরাটির কেন্দ্রস্থলে অতিকায় একটি রুপাের গামলা। তাতে একটি ফোয়ারা। গামলার চারদিকে কতগুলি সােনার পাখি বসানাে। সুবিশাল একটি চুনি কেটে কেটে একটি সিংহাসন বানিয়ে গামলাটির গায়ে রক্ষিত হয়েছে। এমন সব মজাদার দৃশ্য দেখে | খুশীতে আমার দিল ভরে উঠল।
আমি খুশীতে ডগমগ দিল নিয়ে সিংহাসনটিতে বসে পড়লাম। তার মাথার ওপরে একটি লাল সিল্কের চাঁদোয়া টাঙানাে। মৌজ করে সিংহাসনটিতে বসলাম। চোখ বন্ধ করে খুশীটুকু পুরােপুরি উপভােগ করার কোশিস করতে লাগলাম। কয়েক মুহূর্ত পরে চোখ মেলে তাকিয়েই আমি একদম তাজ্জব বনে গেলাম। ভাবলাম, আমি কি জেগে, নাকি খােয়াব দেখছি? বুলুকিয়া ভাইয়া, তুমি বিশ্বাস করবে না। দেখলাম গামলার পানিতে তিনটি খুবসুরৎ লেড়কি গােসল করছে। বিলকুল বেহেস্তের হুরীর মাফিক দেখতে।
আমি নিজেকে সংযত রাখতে পারলাম না। এক লাফে সিংহাসনটি থেকে নেমে একেবারে গামলাটির গা-ঘেঁষে গিয়ে দাঁড়ালাম। আচমকা চিল্লিয়ে উঠলাম—ওগাে, আমার বেহেস্তের হুরীরা! খুবসুরৎ লেড়কিরা— ব্যস, লেড়কিরা আমাকে দেখামাত্র পালকের সাহায্যে নিজ নিজ গােপন স্থানগুলােকে ঢেকে ফেলার ব্যর্থ প্রয়াস চালাতে লাগল। তারা এবার আড় চোখে আমার মুখের দিকে তাকাতে শুরু
( চলবে )

0 Comments