আরব্য রজনী পার্ট ১১৬ (Arabyarajani Part 116)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ  গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
তার বাৎ চুকতে না চুকতে ই দেখলাম, কয়েকজন অতিকায় চারটি কুকুর ধরে নিয়ে আসছে।
প্রাসাদের সদর-দরওয়াজায় তাদের নিয়ে অপেক্ষা করছে আমাদের বাহক। কুকুরের পিঠে চেপে আমাদের যেতে হবে। এতক্ষণ কলিজায় ছিটেফোঁটা পানি যা-ও ছিল এবার সেটুকুও উবে গেল। আমাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোন দামই নেই। কুকুর তৈরি। অতএব কুকুরের পিঠেই চাপতে হ’ল।
আমাদের পিঠে নিয়ে কুকুরগুলাে আগে আগে চলল। কারণ, আমাদের তাে সৈন্যদের নেতৃত্ব দিতে হবে। আমাদের ঠিক পিছনেই উজির। বানর-সৈন্যের দলপতি। আর তার পিছনে কিচির মিচির, ঘঁৎ ঘোঁৎ বিচিত্র সব আওয়াজ করতে করতে চলছে লক্ষাধিক সশস্ত্র বানর সৈন্য।

পুরাে একটি দিন আর রাত্রি আমরা চলেছি কুচকাওয়াজ করতে করতে চলার যেন আর বিরাম নেই। উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে অবশ্যই নয়। কেন চলেছি তা তাে জানাই আছে। কোথায় ? কোন দিকে আর কি রূপ নিয়ে আমাদের শত্রু পক্ষ রয়েছে তা আমাদের মালুম না থাকলেও বুড়াে উজির অবশ্যই জানে।
এক সময় আমরা সুবিশাল একটি কালাে পাহাড়ের কাছে এসে থামলাম।
বুড়াে উজির বলল -জাহাপনা, হতচ্ছাড়া প্রেতগুলাে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ঘাপটি মেরে রয়েছে। আমাদের দেখেই তারা কিলবিল করে বেরিয়ে এল। ইয়া আল্লাহ! কী বিতিকিচ্ছিরি চেহারা। দেখলেই গা ঘিনঘিন করে। আতঙ্কে দম বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হল। তামাম দুনিয়ায় এমন ভয়ঙ্কর দর্শন কোন কিছু থাকতে পারে বলে আমার অন্তত জানা ছিল না। কারাে যাঁড়ের মত মাথাটিকে উটের মত ধড়ের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। কারাে ধড়ে হায়নার মাথা, কারাে বা কেবল মাথাটি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, ধড় বলতে কিছুই নেই, জিন্দেগীতে যেসব সুরৎ দেখব বলে কল্পনাও করতে পারি নি তা-ই চোখের সামনে দেখতে হচ্ছে। দেখতে হচ্ছে বললে ঠিক বলা হবে না। দেখতে আমাদের বাধ্য করছে।
আমাদের সাজোয়া বাহিনী দেখে শত্রু সৈন্যরা কিল বিল করে পাহাড় ছেড়ে নেমে এল। ব্যস, শুরু করে দিল পাথর-বৃষ্টি। লাখ লাখ বললে ঠিক বলা হবে না, কোটি কোটি বললেও যথার্থ বর্ণনা হবে না—অগণিত পাথর উড়ে এসে আমাদের ওপর পড়তে লাগল। আমাদের সৈন্যদের হিম্মৎ মালুম হ’ল যখন দেখলাম তাদের পাথর কুড়িয়ে তাদের লক্ষ্য করে হরদম পাথর ছুঁড়ছে।
আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ উভয়ই এক সময় রীতিমত জোরদার হয়ে উঠল। যুদ্ধ ছড়াতে ছড়াতে এক সময় বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ল। আমি এবং আমার তিন সঙ্গী পরিস্থিতির মােকাবেলা করতে গিয়ে অনবরত তীর ছুঁড়তে লেগে গেলাম। কাজ হচ্ছে। বেশ কয়েকটি শত্রুসৈন্যকে ঘায়েল করে ফেললাম। আমাদের যুদ্ধ কৌশল ও তৎপরতায় একের পর এক শত্রু সৈন্য কুপােকাৎ হয়ে পড়ছে দেখে আমাদের সৈন্যদের সে কী উল্লাস!
একদল তাে দু বাহু তুলে ধেই ধেই করে নাচতে শুরু করে দিল। সে সঙ্গে তাদের নিজস্ব স্বর ও কায়দায় চিল্লাচিল্লি তাে রয়েছেই। খােদা মেহেরবান। আমরা যুদ্ধে জয় লাভ করলাম। পরাজিত সৈন্যরা চাচা আপন জান বাঁচা ক'রে উর্ধ্বশ্বাসে পালাতে লাগল। আমরা বিজয়ী। এত সহজে তাদের রেহাই দেয়া হবে না। আমরা তাদের তাড়া করলাম।
সবার আগে আগে আমরা চারজন কুকুরের পিঠে চেপে চলেছি। কুকুরগুলাের সে কী দৌড়। দুনিয়ার কোন কুকুর যে এত তাড়াতাড়ি দৌড়তে পারে তা আমার অন্ততঃ ধারণা বহির্ভূত। দৌড়দৌড়, আর দৌড়! দৌড়তে দৌড়তে কুকুরগুলাের জিভ বেরিয়ে লালা ঝরতে লাগল।
কুকুরগুলাে দৌড়ে দৌড়ে কাহিল হয়ে পড়েছে। তাদের কিছু সময় অন্ততঃ বিশ্রাম দেয়া দরকার। নামলাম। সামনে মুখ তুলতেই দেখি, সুউচ্চ এক পাহাড়।
আমাদের সৈন্যরা ও উজির যখন যুদ্ধ জয়ের আনন্দে লাফালাফি মাতামাতি করতে ব্যস্ত ঠিক তখনই আমরা চারজন শত্রু সৈন্যকে ধাওয়া করার অছিলায় কুকুরের পিঠে চেপে পালাতে শুরু করেছিলাম। ফলে আমাদের দিকে কারাে নজরই ছিল না।
আমরা পাহাড়টির পাদদেশে কুকুরের পিঠ থেকে নামলাম। গাছের সঙ্গে লাগাম দিয়ে শক্ত করে বেঁধে বিশ্রাম করতে দিলাম। এবার নিজেদের হালৎ নিয়ে ভাববার সুযােগ পেলাম। পিছন ফিরে ব্যাপারটি সম্বন্ধে আঁচ করে নিতে চাইলাম, বানর বা প্রেত কারােরই নজর আমাদের দিকে ছিল না। ফলে কারাে টিকির দেখাও পাওয়া গেল না। ব্যস, বিলকুল নিশ্চিন্ত।
লক্ষ লক্ষ বানর সৈন্য আর প্রেতের চোখের সামনে দিয়ে আমরা দিব্যি বেপাত্তা হয়ে গেলাম। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলাম।
পাহাড়টির গা ধরে সামান্য হাঁটাহাঁটি করতেই পাহাড়ের গায়ে কয়েক ছত্র লেখা নজরে পড়ল। তার বক্তব্য হল—
ওহে কয়েদী, নসীব তােমাকে বানরদের রাজা বানিয়ে দিয়েছিল। তাদের হাত থেকে অব্যাহতি পেতে গিয়ে তুমি যদি উদভ্রান্তের মত ছুটোছুটি করে থাক তবে তােমাকে মুক্তির পথ বাৎলে দিচ্ছি। 
‘শােন, তােমার সামনে দুটো পথ খােলা। অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত পথটি তােমার ডানদিকে এগিয়ে গেছে। সমুদ্রের উপকূলে গিয়ে সেটি থেমেছে। মরুভূমির ভেতর দিয়ে পথটি এগিয়ে গেছে। রাক্ষস, দৈত্য-দানাে আর জিনে মরুভূমিটি ছেয়ে আছে।
‘আর অন্যপথটি চলে গেছে বাঁ-দিক দিয়ে। এ-টি অপেক্ষাকৃত লম্বা। চারমাস এক নাগাড়ে পাড়ি দিলে তবে পথটি পেরােতে পারবে। একটি উপত্যকার ভেতর দিয়ে পথটি এঁকে বেঁকে এগিয়ে
গেছে। উপত্যকাটি পিপড়ের উপত্যকা নামে চিহ্নিত। দ্বিতীয় পথটি ধরে হেঁটে যদি কোনরকমে পিপডের সংস্রব এড়াতে পার তবে তােমার নসীবকে এড়াতে পারবে। আর এভাবেই তুমি অগ্নি পর্বতের পাদদেশে পৌঁছে যেতে সক্ষম হবে। সে অঞ্চলটিতে ইহুদীদের একাধিপত্য।
আমি ডেভিড-এর লেড়কা সুলেমান। আমি তােমার মুক্তির ফিকির বাৎলে দিলাম।
আমরা বাঁ-দিকের রাস্তা ধরে কুকুর বাহনদের পিঠে চেপে পথ পাড়ি দিতে লাগলাম। এ রাস্তা ধরে হাঁটলেই ইহুদীদের রাজ্যে পৌছতে হবে। আর পথে পড়বে পিপড়ের উপত্যকা। পুরাে একটি দিনও আমরা পথ চলি নি। ব্যস, আমাদের বুকের ভেতর ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল। পিছন থেকে তুমুল কোলাহল কানে ভেসে আসতে লাগল। মাটি পর্যন্ত যেন থরথর করে কাপতে লাগল। হ্যা, যা ভেবেছিলাম, ঠিক তা-ই। হাজার হাজার বানর সৈন্য আমাদের ধাওয়া করে এগােচ্ছে। সবার আগে সেই বুড়াে গােদা উজির। ইয়া আল্লাহ! এ যে সর্বনেশে কাণ্ড ঘটতে শুরু করেছে। পালাবার আর কোন ফিকির খুঁজে বের করতে পারলাম না। আমরা বানরসৈন্যদের হাতে অসহায়ভাবে বন্দীত্ব বরণ করে নিতে বাধ্য হলাম। সবার সে কী বিশ্রী স্বরে চিৎকার চেঁচামেচি! কলিজা শুকিয়ে যাবার উপক্রম হল।
উজির-বানর এগিয়ে এল। যুদ্ধে জয়লাভের জন্য নতজানু হয়ে আমাদের কুর্নিশ করল। বহুভাবে অভিনন্দন জানাতে লাগল।
দীর্ঘদিন পর বানররা প্রেতদের সঙ্গে লড়াই করে জয়লাভ করতে পেরেছে। যুদ্ধজয়ের আনন্দ, আমাদের সক্রিয় সহযােগিতা প্রভৃতি উল্লেখ করে উজির ছােট্ট একটি ভাষণই দিয়ে দিল। আমাদের ঘিরে রীতিমত সভা শুরু হয়ে গেল। যদিও প্রতি মুহুর্তে আমাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হচ্ছে তবু আমাদের মধ্যে যারপরনাই বিরক্তির সঞ্চারই শুধু নয় গােসসায় গা পিত্তি রীতিমত জ্বলতে লাগল। দাঁতে দাঁত চেপে সব বে-আদপি নির্বিবাদে হজম করতে লাগলাম।
যা ভেবেছিলাম কার্যতও হ’ল ঠিক তাই। আমাদের ঘেরাও করে ফিন প্রাসাদে নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত হ’ল। তারা চিল্লিয়ে চারদিক কাপাতে কাপাতে আমাদের প্রাসাদে নিয়ে যেতে লাগল। উজির বলল—“রাজ্যে নিয়ে গিয়ে আমরা তােমাদের অভিষেকের বন্দোবস্ত করব। প্রজারা খুশীতে মাতবে। খুশীর ফোয়ারা ছুটবে তামাম রাজ্য জুড়ে। আমরা কয়েক পা যেতে না যেতেই ঘটে গেল একদম অবিশ্বাস্য এক কাণ্ড। আচমকা তামাম উপত্যকাটি আড়াআড়ি এক বিশাল ফাটলের সৃষ্টি হ’ল। ইয়া আল্লাহ। এ কী সর্বনেশে কাণ্ড! পিপড়ে কাতারে কাতারে ইয়া বড় বড় পিপড়ে সে-ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল। ব্যস, চোখের পলকে বানর সৈন্য আর পিপড়ের মধ্যে তুমুল লড়াই শুরু হয়ে গেল। উফ সে যে কী। ভয়ঙ্কর বিতিকিচ্ছিরি লড়াই, চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করা যায় না। পিপড়েগুলাের পা গুলাে এক একটি গাঁইতির মত। আর দাঁত তাে নয় যেন এক একটি সাঁড়াশি আটকে দেয়া হয়েছে। তারা দুটো পা দিয়ে এক একটি বানরকে আঁকড়ে ধরে দাঁত দিয়ে পেট চিরে নাড়িভুড়ি বের করে দিতে লাগল। | বানররাও নিশ্চেষ্ট হয়ে হাত-পা গুটিয়ে পিপড়েদের হাতে মার খেতে রাজী নয়। তারা দল বেঁধে এক একটি পিঁপড়ের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে তাদের পাগুলাে ধরে টেনে দু টুকরাে করে দিতে লাগল। তুমুল লড়াই। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে শুরু হয়ে গেল তুলকালাম কাণ্ড। জিন্দেগীতে এমন ভয়ঙ্কর লড়াই দেখি নি। ব্যাপার দেখে আমাদের চোখ ট্যারা হয়ে যাবার জোগাড়।
আমাদের মধ্যে ফিন পালাবার ধান্দা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। আমাদের বাহন কুকুর চারটি তৈরি। তারা যুদ্ধে মেতে থাকতে থাকতে আমরা বহু দূরে চলে যেতে পারব।
শত কোশিস করেও আমাদের চারজনের পালিয়ে যাওয়া সম্ভব হ’ল না। তাদের এখানে ফেলে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম। আমরা যখন পালাবার ফিকির খুঁজছি ঠিক তখনই চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ল আমার সঙ্গী তিনজন। ইয়া বড় বড় পিঁপড়ে তাদের জেঁকে ধরল। টেনে হিঁচড়ে খাবলে খুবলে তাদের একেবারে দফারফা করে দিল। তাজা খুনে জবজবে হয়ে গেল তাদের শরীর।
এবার আমি একা, একেবারেই একা। এতদিন প্রয়ােজনে পরস্পরের মধ্যে আলােচনা-পরামর্শের মাধ্যমে ফন্দি-ফিকির করে জান রক্ষার উপায় বের করতে পেরেছি। এখন আর শলাপরামর্শ করার মত আমার পাশে আর কেউ-ই রইল না। যা কিছু করার আমাকে একাই করতে হবে।
আমার সঙ্গীদের আত্মার সদগতির জন্য প্রার্থনা করে আমি বিষগ্নমনে চুপিচুপি কুকুরের পিঠে চেপে বসলাম।
আমার বিশ্বস্ত বাহন কুকুরটি আমাকে পিঠে নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলল। ছুটতে ছুটতে সে আমাকে নিয়ে একটি নদীর পাড়ে এসে দাঁড়াল। এবার নদী পেরােবার পালা। কুকুর এ কাজে অচল। বাধ্য হয়ে আমি এবার কুকুরটির গায়ে বার কয়েক হাত বুলিয়ে আদর করে দিলাম ছেড়ে। এবার আমি একেবারেই একা, নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লাম।
কুকুরটিকে বিদায় দিয়ে আমি নদীতে নামলাম। সাঁতরে নদী পার হলাম। এবার আর আমার দিলে তিলমাত্রও আতঙ্ক নেই।
‘বানর বা পিপড়ে কারাে ডরেই কুঁকড়ে থাকতে হবে না।
এবার আমি পয়দলে পথ পাড়ি দিতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে আমি পর্বতের গায়ে লেখা সুলেমান-এর বর্ণিত ইহুদীদের রাজ্যে হাজির হলাম। একটি ব্যাপার সে শিলালিপিতে উল্লেখ করা নেই যা পরবর্তীকালে আমি প্রত্যক্ষ করেছি। ব্যাপারটি হচ্ছে, একটি নদী খালি পায়ে হেঁটে পেরােতে হয়। কই, এর কথা তাে লিপিতে উল্লেখ ছিল না। পুরাে একটি সপ্তাহ আমাকে নদীটির পাড়ে গালে হাত দিয়ে বসে অলসভাবে কাটাতে হয়েছে। বিশেষ একটি দিনে সেটি পার হওয়া সম্ভব হয়েছিল। পরে লােকমুখে শুনেছি, প্রতি শনিবার নদীটিতে পানি থাকে না। সেদিন ইহুদিদের খানাপিনার আসর বসে। নদীতে পানি থাকলে যাতায়াতের তকলিফ হয়।
নদীর ধার থেকেই নগরের সীমানা শুরু। আমি শহরের পথে হাঁটতে হাঁটতে নগরবাসী কাউকে দেখলাম না। রাস্তার ধারে সারিসারি ছােট বড় মকান। প্রথম যে বাড়িটি পেলাম সেটিতেই বরাত ঠুকে ঢুকে পড়লাম। ভেতরে ঢুকতেই বিশালায়তন একটি কামরায় কয়েকজনকে গােল হয়ে বসে থাকতে দেখলাম। ভাবলাম, নসীবের ফের কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। আমি ভীত-সন্ত্রস্ত পায়ে গােল হয়ে বসে থাকা লােকগুলাের কাছে গিয়ে নতজানু হয়ে সালাম জানালাম। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বল্লাম—“আমার নাম জানশাহ্। সুলতান টিগমাস আমার আব্বা। তিনি বানু সালাম এবং কাবুলের সুলতান। বহুৎ ঝড়ঝঞ্জা কাটিয়ে, বহুৎ হামলা-হুজ্জতি পুহিয়ে আমি এখানে আসতে পেরেছি। আমি ক্ষুধায় বড়ই কাহিল হয়ে পড়েছি। মেহেরবানি করে কিছু খানা দিয়ে আমার জান বাঁচান। আর একটি বাৎ, আমার আব্বার সুলতানিয়ৎ কোনদিকে তা-ও আমাকে বলে দিন। আমার কথার জবাব কেউ-ই দিল না। আমার মুখের দিকে সবাই অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে নীরবে তাকিয়ে রইল। শেষমেশ একজন ইঙ্গিতে আমাকে বুঝিয়ে দিল—“আগে খানাপিনা সার, পরে তােমার সমাচার শােনা যাবে। এখন কোন কথাই বােলাে না। এবার তর্জনীর সাহায্যে একটি খানার থালা দেখিয়ে দিল। ' আমি মুহূর্তমাত্র দেরী না করে থালাটি হাতে তুলে নিলাম। গােস্ত খুবই উপাদেয় করে পাক করা গােস্ত। এমন সুস্বাদু গােস্ত জিন্দেগীতে জিভে ঠেকানাে সম্ভব হয় নি। পাশেই দামী সরাবের বােতল আর পেয়ালা। পেয়ালায় সরাব ঢালতেই খুসবুতে কামরা ভরে গেল। গােস্ত আর সরাব দিয়ে গলা পর্যন্ত ঠেসে নিলাম।
আমার খানাপিনা মিটলে সে-দলপতি গােছের আদমিটি আমার কাছে এগিয়ে এল। এতবড় একটি কামরায় নিচ্ছিদ্র নীরবতা বিরাজ করছে। দলপতি এবারও মুখ খুলল না। ইঙ্গিতে ইশারায় আমাকে বলল---কে ? কখন? আর কোথায় ?
আমিও ইঙ্গিতে তার কাছ থেকে জেনে নিলাম-“আমি কি এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব?
লােকটি আগের মত ইঙ্গিতেই আমার প্রশ্নের উত্তর দিল - পার। কিন্তু কেবলমাত্র তিনটি কথার মাধ্যমে উত্তর দিতে হবে।' 
আমিও ইঙ্গিতে জবাব দিলাম-কারবারীর দল, কাবুল, কখন ? 
দলপতি ইঙ্গিতেই জবাব দিল-“জানি না।
এবার আমাকে আগের মতই ইঙ্গিতে বলল -‘খানাপিনা হয়েই গেছে। যাও, এবার মানে মানে সরে পড়।
আমি আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকতে উৎসাহ পেলাম না। সালাম জানিয়ে গুটি গুটি বেরিয়ে পড়লাম।
আমি কামরা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। এ কী ঝকমারিতে পড়া গেল! দেখি সবাই ইশারায় ব্যস্ত। সবাই সাহায্য করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। _ আমি অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে চোখের মণি দুটো তাদের প্রত্যেকের ওপর একবারটি বুলিয়ে নিয়ে দেখতে লাগলাম, সাহায্য করার মত চেহারার অধিকারী কে। মুখ দেখলেই আদমির হিম্মৎ সম্বন্ধে মােটামুটি ধারণা করে নেয়া যেতে পারে। এমন সময় আচমকা কে যেন চিল্লিয়ে উঠল।
এক হাজার স্বর্ণ মুদ্রা রােজগার করার ইচ্ছা থাকলে আমার সাথে এসে পড়। স্বর্ণমুদ্রার সঙ্গে ফাউ স্বরূপ একটি ক্রীতদাসীও পাবে। কেবলমাত্র এক প্রহর কাজ করে দিলেই পেতে পারি। এদিক-ওদিক চক্কর মেরে কোন ফয়দা হবে বলে বােধ হচ্ছে না । তাই যে-আদমিটি চিল্লাচিল্লি করছিল সােজা তার কাছে চলে গেলাম। কোনরকম জিজ্ঞাসাবাদ না করেই বললাম-“কি কাজ করতে হবে, বলুন? আমি আপনার কাজ করে দিয়ে এক হাজার স্বর্ণমুদ্রা আর লেড়কিটিকে পেতে চাচ্ছি। সে আর টু-শব্দটিও করল না। আমার হাত ধরে পাশের একটি মাকানে গিয়ে ঢুকল। আমীর আদমির মকান, এক নজরে দেখেই ঠাহর করে নিলাম। দেখি, এক বুড়াে সামনে বসে। বুড়ােটিকে কুির্নিশ সেরে লােকটি বলল—“একজনকে পাওয়া গেছে, নিয়ে এসেছি। মালুম হচ্ছে পরদেশী গায়ে তাগদ আছে। পরিশ্রমী। এক নাগাড়ে তিন মাস খাটা এর পক্ষে কোন সমস্যাই নয়। আমার চিল্লাচিল্লিতে একমাত্র এ-ই সাড়া দিয়েছে। বুড়াে তার নিস্তেজ চোখের মণি দুটো মুহুর্তের জন্য আমার ওপর বুলিয়ে নিয়ে পাশে বসাল। বহুৎ আচ্ছা সব খানা খেতে দিল। সরাবও দিল এক বােতল। আমার খানাপিনা মিটে গেলে বুড়াে কোর্তার জেব
( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments