গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
আমার আব্বাজী আফগানিস্থানেরও শাসনকর্তা ছিলেন। তার রাজ্যে এবং প্রতিবেশী রাজ্যগুলিতে তার খুবই সুখ্যাতি ছিল। সবাই তাকে চোখের মণির মতই পিয়ার করে।।
আমার আব্বাজীর অধীনে সাতজন সামন্ত রাজা রাজত্ব করতেন। তাদের প্রত্যেকের রাজ্যে একশোটি করে শহর ছিল। আর দুর্গ ছিল এক শ'টি করে।
আমার আব্বাজীর অধীনে ছিল একশ’ জন দুর্ধর্ষ যােদ্ধা আর এক শ’ অসম সাহসী ঘােড়সওয়ার।
খােরাসানের সুলতান বাহরােয়ান-এর আদরের বেটি ছিলেন আমার আম্মা।
—সবই তাে বললে, কিন্তু এখন পর্যন্ত তােমার নিজের নামটি তাে বললে না?
ম্লান হেসে যুবকটি বলল —আমার নাম জানশাহ। আমার আব্বার আগ্রহ-উৎসাহে আমার মধ্যে শৈশব ও বাল্যের দুরন্তপনার দিনগুলাে থেকেই বিদ্যার্জনের প্রতি বিশেষ প্রবণতা দেখা গেছে। তাছাড়া ঘােড়ায় চড়া আর অস্ত্র চালনাতেও তামাম সুলতানিয়তে আমার তুল্য দ্বিতীয় কেউ-ই ছিলেন না। ঘােড়ার পিঠে চেপে দূর দূরান্তে পাড়ি জমান আর শিকারে যাওয়াও ছিল আমার একটি বিশেষ ঝোক।।
আমার আব্বাজী একদিন আমাকে এবং তার অনুচর বর্গকে নিয়ে শিকার করতে গেলেন। বন-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে আমি তিনদিন ধরে তাজ্জব সব খেল দেখছিলাম।
তৃতীয় দিন সন্ধ্যার কিছু আগে আমরা তাবুতে বসে যখন বিশ্রাম করছি তখন একটি হরিণ শাবক তিড়িং তিড়িং করে লাফাতে লাফাতে আমার সামনে হাজির হ’ল। ব্যস, তারপরই সে ছুট দিল। আমি মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে সাতজন সৈন্য নিয়ে তার পিছু নিলাম। তাকে অনুসরণ করে এক নদীর তীরে এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ভাবলাম এবার তাকে ঘিরে ফেলা সম্ভব হবে।
হরিণটি কিন্তু হাল ছেড়ে দিল না। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার আমাদের দিকে তাকিয়েই ঝুপ করে পানিতে ঝাপিয়ে পড়ল। উর্ধ্বশ্বাসে সাঁতরে ওপারে যাবার কোশিস করতে লাগল।
আমাদের ঝোক আরও বেড়ে গেল। হরিণটির পিছন পিছন পানিতে ঝাপ দিতে যাব অমনি একটি-নৌকো দেখতে পেয়ে তাতে চাপলাম। একজন সৈন্যের ওপর আমাদের সাতটি ঘােড়ার দায়িত্ব দেয়া ছিল।
নদীতে স্রোত ছিল যথেষ্টই। ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের 'নৌকা তরতর করে ছুটে মাঝনদীতে এসে পড়ল।
অনেক আগেই সন্ধ্যা হয়েছে। রাত্রির আন্ধার তখন প্রকৃতিকে ঢেকে ফেলেছে। ঘুটঘুটে আন্ধারে আমাদের নৌকা যে কোথায়, কোনদিকে ছুটে চলেছে আমাদের জানা ছিল না। নদীর স্রোতের মধ্যে পড়ে সারা রাত আমরা হারা উদ্দেশ্যে এগিয়ে চলছিলাম।
খােদা ভরসা, আমরা কোন দুর্ঘটনার কবলে পড়লাম না নইলে পাহাড়ের গায়ে নৌকা আচমকা ধাক্কা খেলে নির্ঘাৎ আমাদের সাতজনেরই সলিল সমাধি হয়ে যেত।
স্রোতে ভাসতে ভাসতে আমাদের নৌকা ভােরের আগে আগে এক জায়গায় গিয়ে ভিড়ল। হাতের কাছে ডাঙা পেয়ে আমরা সঙ্গে সঙ্গে নৌকা থেকে নেমে এলাম। আল্লাহর মেহেরবানি না থাকলে সে যাত্রায় আমাদের জান কিছুতেই রক্ষা পেত না।
এদিকে ঘটে গেল আর এক কাণ্ড। যে-সৈন্যটির কাছে। আমাদের ঘােড়াগুলাে জিম্মা রেখে এসেছিলাম সে আমাদের ফিরতে দেরী দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। রাত্রিও পেরিয়ে যাচ্ছে দেখে সে ব্যাপারটি আমার আব্বাজীর কানে তুলল।
আব্বাজী তাে নিঃসন্দেহ, নির্ঘাৎ আমাদের সলিল সমাধি হয়ে গেছে। হতাশা আর শােকে মুহ্যমান হয়ে তিনি মাথা থেকে রাজমুকুট নিজে হাতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠলেন। আব্বাজী সেনাপতিকে তলব করলেন। আমার তল্লাশী করতে চারদিকে দূত ছুটল। যথাসময়ে আমার আম্মার কাছেও খবর গেল। তিনি উন্মাদিনীর মাফিক বুক চাপড়ে কাঁদতে লেগে গেলেন। মুখ আঁচড়ে ক্ষত বিক্ষত করে দিলেন। দু’হাতে চুল ছিড়তে লেগে গেলেন, টেনে হিচড়ে পােশাক আশাক ছিড়ে টুকরাে টুকরাে করে ফেললেন। সব শেষে শােকবস্ত্র পরিধান করলেন। অতএব আমার আব্বা আর আম্মা উভয়েই নিঃসন্দেহ, আমি আর ইহলােকে নেই।
আদতে আমরা তাে আর ইহলােক ত্যাগ করিনি। বরং বহাল তবিয়তেই রয়েছি। নৌকো থেকে নেমে ভেতরের দিকে এগােতে লাগলাম। সামনে পড়ল ছােট একটি নদী। খুবই মনলােভা তার দু’ তীরের সৌন্দর্য। নদীটির পাড় ধরে হাঁটাহাঁটি করতে গিয়ে হঠাৎ তাজৰ এক ব্যাপার চোখে পড়ল। দেখি, এক আদমি তীরে বসে নদীর পানিতে পা দুটো ডুবিয়ে রেখেছে। আপন খেয়ালে পা দুটোকে থেকে থেকে দোলাচ্ছে। আমরা গুটি গুটি তার কাছে গিয়ে দাড়ালাম। সালাম জানিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, মেহেরবানি করে বলবেন কি আমরা এখন কোথায় আছি?
সত্যি বিচিত্র চরিত্রের আদমিই বটে। আমাদের অভিবাদনের জবাব তাে দিলই না এমন কি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালও না। আগের মতই নির্বিকার উদাসীনভাবে বসে পা দুলিয়েই চলল ।
আমরা এবার বল্লাম এ-জায়গাটির নাম মেহেরবানি করে বলবেন কি?'
মরা জন্তু-জানােয়ারের ওপরে হামলা চালাবার পূর্ব মুহূর্তে শকুন যেমন বিকট স্বর করে সে ঠিক তেমনি স্বর করে চিল্লিয়ে উঠল।
তার এরকম অভাবনীয় আচরণে আমার কলিজাটি আতঙ্কে অকস্মাৎ যেন ডিগবাজী খেয়ে গেল। আর আমার মুখটি ফুটা বেলুনের মত চিপসে গেল।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ বাষট্টিতম রজনী
রাত্রি একটু গভীর হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—“জাহাপনা, রহস্যজনক আদমিটি বিকট স্বরে চিল্লিয়ে তড়াক করে দাঁড়িয়ে পড়ল। আদমিটির দিকে চোখ পড়তেই আমার বুকের মধ্যে ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল। শিরা-উপশিরায় খুন ঠাণ্ডা হতে শুরু করল। কোন আদমির শরীরটি দু'ভাগ। কোমর থেকে কারাে শরীর একেবারে দু’ টুকরাে দেখলেও ঠিক থাকতে পারে এমন শক্ত কলিজা ক'জনের থাকে?
রহস্যজনক আদমিটির শরীরের ওপরের অংশটি আমার দিকে ধেয়ে আসতে লাগল। আর নিচের অংশটি ছুটে চলল বিপরীত দিকে। আরও ঘাবড়ে গেলাম। যেন দেখলাম তার মতই আরও অসংখ্য আদমি ঝর্ণার ধার দিয়ে আমার দিকেই তেড়ে আসছে।
চোখের পলকে রহস্যজনক আদমিটি আমার তিনজন সঙ্গীকে সাঁড়াশীর মত দু'হাতে আঁকড়ে ধরে ফেলল। ব্যস, শুরু করে দিল পৈশাচিক কাণ্ড। গােগ্রাসে তাদের কামড়ে কামড়ে খেতে লাগল।
তার কারবার দেখে আমার হালৎ এমন হয়ে গেল যে, আমি যেন আর আমার মধ্যে নেই।
আমি দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে এক লাফে নৌকাটির ওপরে গিয়ে পড়লাম। পর মুহূর্তেই আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার জীবন্ত তিন সহযাত্রী।
পানিতে ডুবে দম বন্ধ হয়ে জান দিতে রাজী আছি। কিন্তু রাক্ষসদের হাতে ? ও ব্বাস! ভাবলেই শরীর একেবারে অবশ হয়ে আসতে লাগল।
নৌকাটিকে সামান্য ঠেলে ভেতরের দিকে দিতেই স্রোতের টানে তরতর করে এগিয়ে চলল । যে কোন উপায়ে রাক্ষসগুলাের হাত থেকে আমাদের জান বাঁচাতেই হবে।
সামান্য এগিয়েই মালুম হ’ল আমরা বুঝি দোজখের ওপর দিয়ে চলেছি। তাকিয়ে দেখি, নদীর তীর ধরে বাতাসের বেগে ছুটে আসছে হাজার হাজার ঊরু আর ঠ্যাঙের মিছিল। আমাদের ধরার চেষ্টাতেই তাদের এরকম ছুটোছুটি। আশমানের দিকে তাকিয়ে আমি আকুল আর্তনাদ করে উঠলাম—ইয়া আল্লাহ! এ কী বিপর্যয়ের মুখে আমাদের ঠেলে দিলে!'
ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখি ঠ্যাঙ আর উরুগুলি আমাদের দিকে ছুটে আসছে আর দেহগুলি আমার সঙ্গীদের দিয়ে উপবাস ভঙ্গ করতে ব্যস্ত।
আল্লাহ-ই যেন মেহেরবানি করে আমাদের জান রক্ষার ফিকির করে দিয়েছেন। নইলে স্রোতের বেগ এমন প্রবল কি করেই বা হ’ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নৌকাটি আমাদের নিরাপদ দূরত্বে পৌঁছে দিল। এবার যেন কলিজায় জল এল।
এবার উদ্ভুত ব্যাপারটি নিয়ে ভাববার মত মানসিকতা ফিরে পেলাম। ভাবলাম, রাক্ষসগুলাের তাে পুরাে পেট নেই। পেটের মাঝখান থেকে কাটা। তবে তারা আমাদের সঙ্গীদের খেয়ে রাখছে কোথায় ? ভেবে কূল কিনারা পেলাম না। তবে আমাদের তিনজন হতভাগাকে যে হারাতে হয়েছে এ বিষয়ে তাে সন্দেহের কিছুমাত্রও অবকাশ নেই। আমরা সবাই আশমানের দিকে দু হাত তুলে তাদের জন্য শােক প্রকাশ করলাম। আল্লাতাল্লার কাছে চোখের পানি ফেলে ফেলে তাদের আত্মার মঙ্গল কামনা করতে লাগলাম। পুরাে ব্যাপারটি একেবারে যেন চোখের পলকে ঘটে গেল। সে বীভৎস নারকীয় দৃশ্য স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ না করলে কাউকে বলে বা কিতাবে লিখে বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়।
রাত্রি কাটল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে নৌকার ওপরেই। পরদিন একটু বেলা হতেই আল্লাহ-ই যেন নদীর এক বাঁকের মুখে আমাদের নৌকাটির দাঁড়াবার বন্দোবস্ত করে দিলেন। আল্লাহকে সুকরিয়া জানাতেই হল।
আমরা নৌকা থেকে নামলাম। ক্ষিদেতে পেটের ভেতরে নাড়িভুড়িগুলাে যেন দাউদাউ হাউ হাউ করে জ্বলছে। যা হােক কিছু দিয়ে জ্বালা নেভাতেই হবে। পথশ্রমে ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ক্লান্ত-অবসন্ন পায়ে নদীর তীর ছেড়ে আমরা এগােতে লাগলাম। বেশী খোঁজাখুঁজি করতে হ’ল না। হাতের নাগালের মধ্যেই বাহারী ও সুমিষ্ট ফলের গাছ পেয়ে গেলাম। রাক্ষসগুলাের মতই আমরা গােগ্রাসে ফল খেয়ে উদর পূর্তি করে নিলাম। তারপর গণ্ডুষভরে নদীর ঠাণ্ডা পানি পান করলাম। ব্যস, দিল ও জান যেন ফিন পুরাে দস্তুর মত তরতাজা হয়ে উঠল। নদীর তীর থেকে কিছুদূর পর্যন্ত আমার সঙ্গী সাথীরা হাঁটাহাঁটি করে এল। সন্দেহজনক কোন কিছুই তাদের নজরে পড়ল না। তবে মার্বেল পাথরের এক বিশালায়তন প্রাসাদ নাকি দেখে এসেছে। তার চারদিক ঘিরে বাগিচা। বাগিচার এক ধারে একটি সায়র। তারা প্রাসাদটির ভেতরেও ঢুকেছিল। একটি বিশাল কামরায় সুদৃশ্য। একটি শূন্য মসনদ আর তার দু পাশে সারিবদ্ধভাবে সাজানাে কতগুলাে আসন।
তাজ্জব ব্যাপার। বাগিচায় তাে দূরের কথা প্রাসাদটিতে পর্যন্ত জীবিত বা মৃত কোন প্রাণীর চিহ্ন মাত্রও নজরে পড়ল না। আমার সঙ্গী সাথীরা প্রাসাদটি তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখল, একটি টিকটিকি বা পিপড়ে পর্যন্ত চোখে পড়ল না। প্রাসাদ থেকে সবাই ফিরে এলে আমরা নিঃশঙ্কচিত্তে প্রাসাদটিতে গিয়ে মাথা গোঁজলাম। বিশালায়তন কামরাটিতে ঢুকেই আমি মসনদে বসে পড়লাম। আমার সঙ্গীরা বসল আমার ঠিক সামনের আসনে। প্রচণ্ড দুঃখের মধ্যেও হাসি পেল। আমি
মসনদে বসে, আমি যেন একদম বাদশাহ বনে গেলাম।
তাজ্জব ব্যাপার তাে, মসনদটিতে বসামাত্র আমার আব্বা, আম্মা আর ভাই বহিনের বাৎ স্মৃতির পটে এক এক করে ভেসে উঠতে লাগল। আমার দু চোখের কোল বেয়ে পানির ধারা নেমে এল। আমার সহযাত্রীরাও ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল। | আমরা যখন মনমরা হয়ে কোনরকমে সময় গুজরান করছি, ঠিক তখনই একেবারেই অপ্রত্যাশিত কাণ্ড ঘটে গেল। কামরার বাইরে ভীষণ তর্জন গর্জন শুরু হয়ে গেল। সমুদ্র ক্ষেপে গেলে যেমন বুকে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী গর্জনের উদ্ভব হয়, অবিকল সেরকম গর্জন শুনতে পেলাম। মালুম হ’ল অবাঞ্ছিত আওয়াজটি ক্রমেই কামরাটির দিকেই এগিয়ে আসছে। আতঙ্কে আমাদের মুখ শুকিয়ে উঠল।। " আমার সঙ্গীদের একজন সাহসে ভর করে উঠে গিয়ে ব্যাপারটি দেখার জন্য সবে আসন ছেড়ে উঠেছে অমনি একদল বিভিন্ন উমরের বাঁদর হৈ-হট্টগােল করতে করতে কামরায় উঠে এল। উজির, নাজির, পাত্রমিত্র প্রভৃতি বুড়াে মত একটি বানর সবার আগে আগে ছিল। তার চলাফেরা আদব কায়দা দেখে মনে হল সে-ই উজির।
আমি তাে ধরতে গেলে পৌনে মরা হয়ে গেলাম। গলা শুকিয়ে কাঠ। কলিজা ঠাণ্ডা। ভাবলাম, রাক্ষসদের হাত থেকে আব্বার দেয়া জানটি রক্ষা পেলেও এবার নির্ঘাৎ খতম হয়ে যাব। বানর হলে কি হবে রীতিমত দৈত্যাকার সবার চেহারা। কারাে চেয়ে কেউ কমতি নয়। আর কিছুরই দরকার পড়বে না, ইয়া পেল্লাই পেল্লাই নখগুলি দিয়ে একটি আঁচড় বসালেই জিন্দেগী একদম বরবাদ হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। উজির বানরটি কিন্তু ঘরে ঢুকেই আমাকে অবাক করে দিল। নতজানু হয়ে আমাকে কুর্নিশ করে মানুষের মত দিব্যি কথা বলল
—“আল্লাহর অশেষ কৃপা বলে আপনাকে আমরা কাছে পেয়েছি। আমি ও আমার সহকর্মীরা একমত হয়ে আপনাকে আমাদের সুলতান বলে মেনে নিচ্ছি। আমি তাে তখন বিস্ময়ের সাগরে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছি। তার কথায় হাসব, নাকি কাদব ভেবে পাচ্ছিনে।
উজির-বানরটি এবার বলল—“আর আপনার সঙ্গী তিনজন আমাদের সেনাবাহিনীর তিন প্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করলে আমরা ধন্য হব। আমরা তার কথা নির্বিবাদে মেনে নিলাম।
আমাদের সম্মতি পেয়ে তাদের সে কী আনন্দ হ’ল তা ভাষায় বুঝানাে সম্ভব নয়। তারা কচি হরিণের মাংস দিয়ে আমাদের খানা পিনার বন্দোবস্ত করল। সেকী আপ্যায়ন, একেবারেই অপ্রত্যাশিত।
খানাপিনার পাট মেটানাের পর উজির সবিনয় নিবেদন রাখল—“জাহাপনা, আমাদের সেনাবাহিনী আপনাদের অভিবাদন জানানাের জন্য বাইরে অপেক্ষা করছে। মেহেরবানি করে একবারটি বাইরে গেলে তারা বড়ই খুশী হবে।
আমি এবং আমার তিন সঙ্গী সাথী উজিরের সঙ্গে প্রাসাদের বাইরে গিয়ে সেনাবাহিনীর অভিবাদন গ্রহণ করার জন্য এগােতে লাগলাম। পথে উজির আমাকে বল্ল-জাঁহাপনা, আমাদের সৈন্যরা যুদ্ধের সাজে সজ্জিত। তৈরি হয়ে আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে।
আমি মুখ খুললাম—‘যুদ্ধ? কিসের যুদ্ধ? কাদের সঙ্গেই বা যুদ্ধ?
—“আমাদের পুরনাে শত্রু প্রেতের রাজ্যের সঙ্গে যুদ্ধ। আমরা যথাসম্ভব কম সময়ের মধ্যে বানর-সৈন্যদের অভিবাদনের ব্যাপারটি সেরে ফিরে এলাম। আমাদের বিশ্রাম করার সুযােগ দিয়ে উজির ও অন্যান্য সবাই বিদায় নিল।
বিশ্রাম ? আমাদের বিশ্রাম তাে শিকেয় উঠে গেছে। এখন কিভাবে বানরদের এ-ফাঁদ থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় সে চিন্তাতেই দিমাক খারাপ হয়ে যাবার জোগাড়। আমরা একান্তে নিজেদের পরিস্থিতি নিয়ে গােপন আলােচনায় বসলাম। কি করে এ-মুলুক ছেড়ে পালানাে যাবে তা-ই আমাদের একমাত্র আলােচ্য বিষয়। পালানােই যে আমাদের একমাত্র বাঁচার রাস্তা সে-বিষয়ে আমরা একমত। প্রাসাদের পিছনের দিকে একটি খিড়কি দরওয়াজার খোঁজ পাওয়া গেল। আমরা সেটির সদ্ব্যবহার করলাম। গুটি গুটি বেরিয়ে লম্বা পায়ে নদীর তীরে চলে এলাম। হতাশ হতে হ’ল। আমাদের একমাত্র সম্বল নৌকাটি যথাস্থানে নেই। নির্ঘাৎ কেউ সরিয়ে ফেলেছে। ফুসফুস নিঙড়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। ‘খােদাতাল্লা তােমার এ কী মর্জি!
আমরা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে যতদূর দৃষ্টি যায় নৌকোটির খোঁজ করলাম। না, নৌকোর চিহ্নও কোথাও নেই। অনন্যোপায় হয়ে কারাগার স্বরূপ প্রাসাদটিতেই ফিরে এলাম।
শরীর ও দিল উভয়ই ক্লান্ত। আর জেগে থাকা সম্ভব হ’ল না। গভীর নিদে ডুবে গেলাম।
সকালে চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি বৃদ্ধ উজির-বানরটি দরওয়াজায় দাঁড়িয়ে। আমাকে চোখ মেলে তাকাতে দেখেই কুর্নিশ করে নিবেদন করল—জাহাপনা, সৈন্যরা প্রস্তুত। যুদ্ধের যাবতীয় বন্দোবস্ত পাক্কা। এখন শুধুমাত্র জাঁহাপনার হুকুম হলেই প্রেতদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করা যেতে পারে।
তার বাৎ চুকতে না চুকতে ই দেখলাম, কয়েকজন অতিকায়।
( চলবে )

0 Comments