গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
বুলুকিয়া তাে এক পায়ে খাড়া। এমন সুযােগ কোন পাগলেও তাে হাতছাড়া করবে না। দৈত্যরাজকে বললাম—“আপনি দয়া করে ব্যবস্থা করে দিলে আমি অবশ্যই আপনাদের রাজাকে দেখতে যাব।
দৈত্যরাজ আর কথা বাড়াল না। রাজা বুলুকিয়া এক জিনের কাধে চেপে আকাশ পথে চোখের পলকে রাজা সাঘর এর রাজ্যে পৌছে গেলেন ।
জিনটি বুলকিয়া’কে এক সমতলভূমিতে নামাল। স্থানটি জাঁকজমকপূর্ণ। সেখানকার নালাগুলি পর্যন্ত সােনা ও রুপাে দিয়ে বাঁধানাে। নালাগুলির গায়ে সারিবদ্ধ ভাবে কৃত্রিম গাছ দাঁড় করানাে। গাছগুলির পাতা পান্নার আর ফলগুলি চুনি দিয়ে তৈরি। আর সম্পূর্ণ সমতলক্ষেত্রটি সুদৃশ্য সবুজ মখমল দিয়ে মােড়া।
মখমলের একটি তাঁবুর ভেতর সােনার সিংহাসনের ওপরে | সুন্দর ভঙ্গিতে রাজা সাঘর অবস্থান করছেন।
রাজা সাঘর -এর ডানদিকে সােনার আসনে সামন্ত রাজারা বসে আছেন, তার বাঁ-দিকে বসেছেন উজির, নাজির, সেনাপতি আর জ্ঞানী-গুণীরা।
রাজা বুলুকিয়া আভূমিলুণ্ঠিত হয়ে রাজাকে অভিবাদন জানালেন। ভক্তি বিগলিত কণ্ঠে রাজার প্রশস্তি গাইলেন। রাজা সাঘর ঠোটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বুলুকিয়া'কে সাদর অভ্যর্থনা করে তার পাশের একটি সুদৃশ্য সােনার সিংহাসনে বসালেন।
বুলুকিয়া এবার নিজের কথা, ফুলের রস সংগ্রহ করে তা পায়ে যে সমুদ্র পাড়ি দেবার কাহিনী আদ্যোপান্ত বর্ণনা করলেন। কিছুই গােপন করলেন না। তার কথা শুনে তাে রাজা একেবারে স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন।
এবার তাবুর বাইরে মখমলের মেঝের ওপর একটি বিরাট কাপড় বিছিয়ে দেয়া হল। ভােজনের প্রস্তুতি চলেছে। কাপড় বিছানাে হয়ে গেলে একটি চীনামাটির অতিকায় গামলায় পঞ্চাশটি সিদ্ধ উটের মাংস। অন্য আর একটি অতিকায় গামলায় পঞ্চাশটি ভেড়ার মাথা আর অন্য আর একটি গামলায় পঞ্চাশটি ঝলসানাে উটের মাংস এনে মাঝখানে রাখা হ’ল। সবই গরম। ধোঁয়া উঠছে তখনও। তাছাড়া ফলের ব্যবস্থা তাে পাহাড় প্রমাণ। জিন আর অতিথি সবাইকে সােনার থালায় করে খাবার পরিবেশন করা হল। সবাই পেট পুরে খেল। ভােজপর্ব সম্পন্ন হয়ে গেলে রাজা সাঘর বুলুকিয়া’কে নিয়ে গল্প করতে বসলেন। মনখুলে গল্প বলা যাকে বলে।
রাজা সাঘর বললেন-“আমাদের কাহিনী নিশ্চয়ই আপনি এখনও শােনেন নি। আমি সংক্ষেপে আপনাকে বলছি। আপনার কাছে আমার একটি অনুরােধ রাখতে চাইছি।
রাজা বুলুকিয়া বলেন—অনুরােধ? কি সে অনুরােধ? আপনি বলুন, যদি আমার পক্ষে তা রক্ষা করা একান্ত অসম্ভব না হয় তবে নিশ্চয় -
–‘তেমন কিছুই না। আপনি মানব সমাজে ফিরে গিয়ে সাধ্যমত আমাদের কথা প্রচার করবেন। আমাদের কথা কারাে যেন অজানা না থাকে। ব্যস, আর কিছুই নয়।
–‘অবশ্যই প্রচার করব। আমার চেষ্টার কোনই ত্রুটি হবে না, কথা দিচ্ছি।
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিনশ’ যাটতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—“জাঁহাপনা, রাজা সাঘর তাদের কাহিনী বুলুকিয়ার কাছে বলতে শুরু করলেন—আল্লাহ আদিতে আগুন সৃষ্টি করেন। কিন্তু তামাম দুনিয়ার সাতটি জায়গা থেকে আগুনকে দূরে রাখলেন। কয়েক হাজার সাল অবধি তিনি এ কাজটি করেছিলেন। সবার আগে যে-জায়গাটিতে আগুন জমা রেখেছিলেন, তার নাম জাহান্নাম। ধর্মবিদ্রোহীদের মধ্যে যারা কৃতকর্মের জন্য অনুতাপ জ্বালায় জর্জরিত হবে না তাদের জন্যই এখানকার আগুন রক্ষিত।
আগুন রক্ষিত দ্বিতীয় অঞ্চলটির নামকরণ করা হয়েছে ‘লাজা'। এখানে উপসাগরের মত সুবিশাল গর্ত খুঁড়ে আগুন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। ধর্ম প্রচারক মহাত্মা মহম্মদ-এর উত্তরসুরীরা এ-আগুন ব্যবহার করবে। তাদের দোষ-ত্রুটিগুলােকে অন্ধকারে লুকিয়ে রাখার জন্যই এরকম ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে। কারণ তারা নিজেদের দোষ-ত্রুটি মেনে নিতে চাইবেন না।
জাহিন নামকরণ করা হয়েছে আগুন রক্ষিত তৃতীয় অঞ্চলটির। সম্পূর্ণ অঞ্চলটি একটি ফুটন্ত কড়াইয়ের মধ্যে অনবরত জ্বলছে। ম্যাগগ’ আর ‘গগ’-দের জন্য এটিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। চতুর্থ অঞ্চলটি ‘সইর’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানে আগুন সঞ্চিত রাখা হয়েছে এবলিস-এর জন্য। যে সব দেবদূত বিদ্রোহে লিপ্ত তিনি তাদের নেতা। তিনি তাদের সৈন্যাধ্যক্ষ ‘আদম’-এর কর্তৃত্ব মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন। এ অস্বীকৃতির মাধ্যমেই তিনি সর্বশক্তিমানের নির্দেশ পালন করেন নি।
পঞ্চম স্থানটির নামকরণ করেছিলেন ‘সাখুর। এ-অঞ্চলটি নির্ধারিত করা হয় ধর্ম বিদ্বেষী, অধার্মিক, মিথ্যাশ্রয়ী এবং আত্মম্ভরীদের জন্য। ষষ্ঠ স্থানটির নামকরণ করা হ’ল ‘হিৎসৎ'। এখানে মড়ক সৃষ্টি করা হ’ল। গুমােট পরিবেশ এখানকার প্রধান বৈশিষ্ট্য।
আর ‘হাওয়াই’ নামে চিহ্নিত করা হ’ল সপ্তম স্থানটিকে। এটিকে বিশেষ ভাবে সুরক্ষিত করার ব্যবস্থা করা হ’ল। আল্লাহর ওপর যাদের বিশ্বাস থাকবে তাদের জন্য এস্থানটিকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হ’ল। আবার ইহুদী আর খ্রীস্টান বেশী হয়ে গেলে এখানে রাখা হতে লাগল।
প্রথম অঞ্চল, যাকে জাহান্নাম আখ্যা দেয়া হয়েছে তার সত্তর হাজার আগ্নেয় পাহাড় রয়েছে। আর তাদের প্রত্যেকটির সত্তর হাজার করে উপত্যকা বিদ্যমান। আবার প্রত্যেক উপত্যকায় সত্তর হাজার নগর। প্রতিটি নগরে রয়েছে সত্তর হাজার বুরুজ। প্রত্যেক বুরুজে রয়েছে সত্তর হাজার বসতবাটী। আবার প্রত্যেক বাড়িতে সত্তর হাজার করে বেঞ্চ রক্ষিত। প্রতিটি বেঞ্চ সম্পূর্ণ পৃথক পৃথক। অপরাধের পৃথক পৃথক শাস্তির ব্যবস্থা আছে। আপনিও ইচ্ছা করলে নিজে গুণে দেখতে পারেন। কোনই অসুবিধা নেই।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে শান্তি ও নিপীড়ন কত প্রকার? এর উত্তর একমাত্র আল্লাহ-ই দিতে পারেন। যে-সাতটি অঞ্চলের উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক অঞ্চল হচ্ছে প্রথম অঞ্চল অর্থাৎ জাহান্নাম। তবে হ্যা, জাহান্নাম অঞ্চলটির অসহনীয় কষ্ট, নিপীড়ন প্রভৃতির দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলে বাকী ছয়টি অঞ্চলের ভয়ঙ্করতা সম্বন্ধে মােটামুটি ধারণা করে নিতে সক্ষম হবেন।
আগুন সম্বন্ধে আমি এত উৎসাহ নিয়ে আপনাকে বিষদ বিবরণ কেন দিলাম, বলতে পারেন? কারণ, আমরা জিনেরা যে অগ্নিসন্তান।
আর যা কিছু বললাম তা থেকে ও নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন যে, আমরা অগ্নিসন্তান।
এবার যা বলছি, ধৈর্য ধরে শুনুন—সৃষ্টিকর্তা আল্লা সর্বপ্রথমে সৃষ্টি করলেন দ ‘টি মাত্র জীব। তারা উভয়েই যে জিন আশা করি। - আর বলার দরকার নেই। তাদের একজনের নাম খালিত আর অন্যজনের নাম খলিত। আল্লাহ তাদের নিজের রক্ষী হিসাবে বহাল করলেন। তাদের মধ্যে খালিত সিংহের মত রূপ আর অন্যজনের অর্থাৎ খলিত-এর রূপ নেকড়ে বাঘের মত। সিংহ পুরুষ আর স্ত্রীলােক হ’ল নেকডে। খালিত নামে সিংহের পুরুষাঙ্গটির দৈর্ঘ্য কুড়ি গজ। আর খলিত অর্থাৎ নেকড়ের যৌনাঙ্গটির বিস্তৃতি একটি কচ্ছপের মত। আসলে তার যৌনাঙ্গটি যাতে খালিত-এর পুরুষাঙ্গ টিকে ধারণ করতে পারে সে-পরিমাণ মাপ বিশিষ্ট করেই আল্লাহ নির্মাণ করেছিলেন।
খলিত আর খালিত-এর মধ্যে একজনের গায়ের রঙ সাদা| কালের ছােপযুক্ত আর অন্যজনের সাদা-গােলাপী রঙ বিশিষ্ট।
আল্লাহ খলিত আর খালিত-এর মিলন ঘটিয়ে দিলেন। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠল। তাদের যৌন মিলনের মাধ্যমে পয়দা হ’ল হাজার হাজার সন্তান সন্ততি। তাদের মধ্যে ড্রাগন, কুমীর, বিভিন্ন প্রকার বিছা আর কুমীর ও সাপ সমেত যত সরীসৃপ। আর সে সঙ্গে হল এরকম আরও কয়েক কিসিমের জীব। এবার এসব জীবকে পাপীতাপীদের শাস্তি দেয়ার জন্য সাতটি অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়া হল। তারা দিব্যি নিজ নিজ কর্তব্য সম্পাদন করতে লাগল। আল্লাহ কিন্তু এতেই থেমে গেলেন না। খলিত আর খালিত’কে নির্দেশ দিলেন দ্বিতীয় বার সঙ্গমে লিপ্ত হতে। এবার পয়দা হ’ল সাতটি পুরুষ আর সাতটি নারী। তাদের একজনকে আল্লাহ বেছে নিয়ে নিজের কাছে রেখে দিলেন।
তারপর খলিত আর খালিত-এর একের পর এক মিলনের ফলে অগণিত প্রজন্ম পয়দা হ'ল। তাদের নেতাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশী সৌভাগ্যের অধিকারী তার নাম এবিলিস। পরবর্তীকলে তার নসীবের চরম দুরবস্থা লক্ষিত হয়েছিল। তার অঞ্চলের প্রত্যেকেই আল্লাহর বিরুদ্ধে জেহাদ ঘােষণা করেছিল। জেহাদের ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে যা ঘটে তার নসীবেও তা-ই ঘটল। এবিলিস ও তার অনুগামীদের ঠাই হ’ল দোজখে।
আর অন্য ছয়জন নওজোয়ান এবং অন্যান্য লেড়কিরা জেহাদের খাতায় নাম তাে লেখালই না বরং আল্লাহর নিতান্ত অনুগতের মত তাকে আন্তরিক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে লাগল। আমরা তাদের উত্তরসূরী।
আমাদের বংশের যাবতীয় তথ্য সংক্ষেপে আপনার কাছে তুলে ধরলাম।
আমরা খানাপিনা খুবই বেশী পরিমাণে ব্যবহার করি। তাই এখন খাদ্যদ্রব্য এমন ঢিবি করে জড়াে করা হয়েছে। আঁৎকে উঠতে পারেন বটে। কন্তু আমাদের প্রত্যেকের দৈনন্দিন খাদ্যের বরাদ্দের কথা শুনলে হয়ত আর বিস্ময়টুকু থাকবে না।
তবে বলেই ফেলি, কি বলেন? আমরা প্রত্যেকে প্রতিদিন দশটি উট, কুড়িটি ভেড়া দিয়ে খানা সারি। আর সে সঙ্গে বড় ডাবু-হাতে চল্লিশ হাতা করে ঝােলও উদরস্থ করি। ডাবু-হাতাটি পেল্লাই একটি গামলার মত।
আপনাকে আমাদের সম্বন্ধে অনেক খবরই দিলাম। এর ফলে মানব-সমাজে গিয়ে পরিচিত মহলের কাছে আমাদের সম্বন্ধে অন্ততঃ ধারণা তাে দিতে পারবেন। ফিন আপনার অপরিসীম উপকারও সাধন করতে পারবেন।
এবার কি বলছি ধৈর্য ধরে শুনুন। কাফে পর্বতের চূড়া থেকে এখানকার বরফ নেমে আসে। এবরফের অস্তিত্ব যদি না থাকত তবে সূর্যের প্রখর উত্তাপে জীব-জগৎ গাছপালা বিলকুল ধ্বংস প্রাপ্ত হত।
তামাম দুনিয়ার ভূ-ত্বকের সাতটি স্তর বর্তমান। এদের প্রত্যেকটি স্তরকে ঘাড়ে করে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক একজন পালােয়ান জিনি। একটি পাহাড়ের ওপর জিনি দাঁড়িয়ে। আবার পাহাড়টি দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি ষাঁড়ের ঘাড়ের ওপর। আর অতিকায় একটি মাছের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে ষাঁড়টি। ষাঁড়টিকে ঘাডে নিয়ে মাছটি হরদম সাঁতার কাটছে।
এবার কি বলছি শুনুন—অন্তঃহীন সমুদ্রের তলদেশ হচ্ছে দোজখের ছাদ। অতিকায় একটি সাপ দোজখের সাতটি ছাদকে মুখে আটকে রেখেছে। এভাবেই সে আটকে রাখবে অন্তিম বিচারের দিন পর্যন্ত। সেদিন সে দোজখ আর তার অধিবাসীদের আল্লাহর সামনে উগরে দেবে। তারপর শুরু হবে অন্তিম বিচার। বিচারান্তে আল্লাহ রায় দেবেন। তার আগ পর্যন্ত এভাবেই চলবে।
এমন সময় ভাের হয়ে আসছে দেখে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ একষট্টিতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাঁহাপনা, আমাদের এবং দুনিয়া পয়দা হওয়ার কাহিনী এরকম।
আমাদের সম্বন্ধে আরও কিছু তথ্য আপনার দরবারে পেশ করছি। আমাদের বয়স যেমন কমে না তেমনি বাড়েও না। আমরা কোনদিনই বার্ধক্য প্রাপ্ত হই না। জরার মত ব্যাধিও আমাদের থেকে তফাতে থাকে। দুনিয়ার তামাম আদমি পশু-পাখি ও কীট পতঙ্গ দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা? অনন্ত যৌবনের রূপ ও শক্তি অক্ষুন্ন রেখে চলেছি। আদতে অমৃত ফোয়ারার অমৃত যে আমরা পান করে চলেছি। খিচর সে ছায়ালােকে হরবখত পাহারা দিয়ে চলেছেন। খিচর তামাম ঋতুর পার্থক্য দূর করে একটি ঋতুতে পরিণত করে দিয়েছেন।
খিচর অন্তঃহীন হিম্মতের অধিকারী। তিনি নদীগুলিকে বাঁধ ভাঙার গতিদান করেছেন। গাছগাছালিকে সবুজ ক'রে রেখেছেন।
আর সূর্য অস্ত গেলে প্রকৃতির কোলে নিজেই গােধূলির আলাে নিজের হাতেই গড়ে তুলেছেন। গােধূলি-রূপালি গােধূলি !
জিনি এবার বলল -বুলুকিয়া, আপনি ধৈর্য ধরে আমার সব কথা শুনেছেন বলে আমি আপনাকে পুরস্কৃত করতে চাইছি। আমাদেরই এক জিন আপনাকে কাঁধে করে আপনার দেশে দিয়ে আসবে, রাজী তাে?’
—“রাজী বলতে রাজী! এমন সুযােগ পাগলেও তাে হাতছাড়া। করবে না।
এবার জিনদের বহুভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে বুলুকিয়া বিদায় নিলেন। তারপর এক পালােয়ান-জিন তাকে কাঁধে নিয়ে শূন্যে ভাসল। মুহুর্তে তাকে তার রাজ্যে পৌছে দিয়ে বিদায় নিল। বুলুকিয়া তার রাজ্যে পৌঁছলেন বটে, কিন্তু যেতে হবে রাজধানীতে, রাজপ্রাসাদে। এক সমাধিক্ষেত্রের ধার দিয়ে যাবার সময় তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। দেখলেন, এক নওজোয়ান এক সমাধির সামনে বসে বিলাপ করে কেঁদে চলেছে। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে তিনি চারদিকে তাকালেন। আর কাউকেই ধারে কাছে দেখতে পেলেন না। কৌতূহলের শিকার হয়ে এক পা দু’পা করে নওজোয়ানটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। জিজ্ঞাসা করলেন-বেটা, কি ব্যাপার তােমার, বল তাে? দুটো কবরের মাঝখানে বসে অনবরত কেঁদেই চলেছ, ব্যাপার কি বল তাে? আমার কাছে। তােমার ব্যথা-বেদনার কথা বল। আমি তােমার দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করার কোশিস করব।।
নওজোয়ানটি চোখ মুছতে মুছতে বলল ‘আপনি ঝুটমুট কেন আমার জন্য তকলিফ করতে যাবেন ?
—“তুমি বলই না, কি তােমার সমস্যা?
-না, থাক। আপনি ব্যস্ত হয়ে কোথায় যেন যাচ্ছিলেন। ঝুটমুট আপনার দেরী করিয়ে দিতে চাই না। আমার দুর্ভাগ্যের বােঝা আমি বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। আপনি যেখানে যাচ্ছিলেন চলে যান।
-একটা কথা তাে আগে বল, দুই কবরের মাঝখানে এভাবে বসে কাঁদছ কেন?
-নীরবতা, গােপনীয়তা রক্ষা করার জন্য। আমার কান্নার শব্দ যাতে বহুদূর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে অন্যের শান্তি ভঙ্গ না করে। আপনি নিজের কাজে চলে যান। আমি কোশিস করে দেখি চোখের পানিতে দুঃখের পাথরকে ভেজাতে পারি কি না।
-নসীব বড়ই মন্দ দেখছি! তােমার বিড়ম্বিত নসীবের ব্যাপার তাে আমাকে শুনতেই হবে। তােমার দুঃখ-দুর্দশা, শােক তাপের কাহিনী নির্দ্বিধায় আমার কাছে ব্যক্ত কর।
কথা বলতে বলতে বুলুকিয়া ক্রন্দনরত যুবকটির পাশে পাথরের ওপর বসলেন।
নওজোয়ানটির একটি হাত টেনে নিয়ে নিজের কোলের ওপর রাখলেন। তারপর নিজের জিন্দেগীর বিড়ম্বিত কাহিনী এক এক করে আদ্যোপান্ত তার কাছে বললেন। এবার বললেন—আমার নসীবের বিড়ম্বনার কিসসা তাে শুনলে। এবার তােমার দুঃখদুর্দশার কথা আমাকে বল। তােমার ব্যথা-বেদনা আশা-হতাশা অবশ্যই আমার মনে দাগ কাটবে।
নওজোয়ানটি এবার চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল—“ভাইয়া, আমিও এক রাজপুত্র, আমার বিড়ম্বিত জীবনের কিসসা আরও অত্যাশ্চর্য। আর তা শুনলে বেদনায় আপনার দিল ভরে উঠবে।
যুবকটি এবার তার কোর্তা দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল-“আমার জন্মভূমি কাবুল। সে দেশের সুলতান টিগমাস বানু-সালানাে-র ঘরে আমি পয়দা হয়েছি। আমার আব্বাজী আফগানিস্থানেরও শাসনকর্তা ছিলেন। তার রাজ্যে এবং প্রতিবেশী রাজ্যগুলিতে তার খুবই সুখ্যাতি ছিল। সবাই তাকে চোখের মণির মতই পিয়ার করে।।
( চলবে )

0 Comments