আরব্য রজনীর গল্প পার্ট ১১১ ( Arabyarajani Part 111)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
ড্যানিয়েল-এর সহধর্মিণী নীরব চাহনি মেলে স্বামীর মুখের দিকে হতাশ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
ড্যানিয়েল বলে চললেন-“যা বলছি ধৈর্য ধরে শােন- আমার মৃত্যুর পর আমার যাবতীয় পুঁথিপত্র ও পাণ্ডুলিপি যথাস্থানে থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। প্রয়ােজনের সময় তােমার গর্ভের সন্তান হয়ত সেগুলাে হাতের কাছে পাবে না। 

ড্যানিয়েল কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে বসে গেলেন। সারা জীবনে যা কিছু শিখেছেন, চলার পথে যা কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন সবই সংক্ষেপে লিখে গােছগাছ করে যাবেন, ঐকান্তিক ইচ্ছা। মাত্র কয়েক পৃষ্ঠার মধ্যেই তার অগাধ পাণ্ডিত্য ও জ্ঞানের কথা লিপিবদ্ধ করে যেতে চান।  বড়ই কঠিন কাজ। সারা জীবনে অর্জিত তার অগাধ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের মূলকথা এবং পাঁচ হাজার পাণ্ডুলিপির সার সংক্ষেপ প্রভৃতি মাত্র কয়েকটি পাতার মধ্যে লিপিবদ্ধ করা কি যে-সে কাজ নাকি ? 
কাজটি অসম্ভব, অসাধ্য হলেও সম্ভব করলেন। লেখা শেষ হয়ে গেলে বার বার পড়ে দেখলেন, এর চেয়েও সংক্ষিপ্ত করা যাবে কিনা। না, আর সম্ভব নয়। আর সংক্ষিপ্ত করার কোন রাস্তাই নেই। সব মিলিয়ে লেখা দাঁড়াল পাঁচ পাতা।
, পাঁচ পাতাতেও ড্যানিয়েল সন্তুষ্ট থাকতে পারলেন না। আবার প্রয়াস শুরু করলেন। মাত্র পাঁচটি পাতা নিয়ে নাড়াচাড়া করলেন পুরাে একটি বছর। হ্যা, পরিশ্রম ফলপ্রসূ হয়েছে। একটিমাত্র পাতার মধ্যে তার বক্তব্যকে তিনি লিখে ফেললেন।
ড্যানিয়েল বুঝতে পারলেন, ক্রমেই হাতছানি দিয়ে তার দিকে মৃত্যু এগিয়ে আসছে।
মৃত্যু শিয়রে বুঝতে পেরে ড্যানিয়েল তার যাবতীয় পাণ্ডুলিপি বস্তাবন্দী করে সাগরের জলে ফেলে দিয়ে এলেন। তার এরকম কাজের পিছনে উদ্দেশ্য ছিল, কেউ যাতে সেগুলাে আবিষ্কার করতে সক্ষম না হয়।
সবই তাে বস্তাবন্দী করে সাগরের জলে বিসর্জন দিয়ে এলেন। কিন্তু তার একমাত্র পুত্রের জন্য কি রাখলেন? হ্যা, রেখেছেন তাে বটেই। কি? কি সেটি ? ওই একটি কাগজ।
ড্যানিয়েল-এর সহধর্মিণী পূর্ণ-গর্ভবতী হলেন। চলাফেরা করা তো দূরের কথা ওঠাবসা করাও তার পক্ষে কষ্টকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল।
ড্যানিয়েল সহধর্মিণীর কাছে গেলেন। তাকে বললেন, শােন —আমার দিন ঘনিয়ে এসেছে। পরমেশ্বর আমাকে সস্তান দিয়েছেন। কিন্তু আমার বরাতে হয়ত আর তার মুখ দেখা হ’ল না। পরম করুণাময়ের সে অভিপ্রায় থাকলে এমনটি হবে কেন? আমি পূর্বপুরুষ হিসেবে তার জন্য, আমার উত্তরসূরীর জন্য কেবলমাত্র একটি কাগজ রেখে গেলাম।
তােমার গর্ভের সন্তান বড় হয়ে যখন সবকিছু বুঝতে শিখবে। পৈত্রিক সম্পত্তি দাবী করবে তখন তুমি আমার হয়ে তার হাতে এ কাগজটি দিও।
তােমার গর্ভের সন্তানটি যদি এ কাগজের লেখা পড়ে এর মর্মার্থ উদ্ধার করতে পারে তবে তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হবে। সে তার সময়ের সবচেয়ে পণ্ডিত ব্যক্তি বলে পরিচিত হতে পারবে।
ড্যানিয়েল-এর প্রৌঢ়া সহধর্মিণী ছলছল চোখ দুটো মেলে ঘাড় কাৎ করল। ড্যানিয়েল এবার বলল —“আর একটি কথা মনে রেখাে। তােমার গর্ভজাত সন্তানের নামকরণ কোরাে হাসিব।
কথা ক’টি কোনরকমে শেষ করেই ড্যানিয়েল শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। তার অবিনশ্বর আত্মা অনন্ত সুন্দরলােকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করল।
ড্যানিয়েল-এর শেষকৃত্যে বহু জ্ঞানী-গুণী, নগরের বহু সম্রান্ত ব্যক্তি ও শিষ্য-শিষ্যারা চোখের জল ফেলে শেষবারের মত তাকে বিদায় জানিয়ে গেলেন।
ড্যানিয়েল দেহ রাখার পর কিছুদিন যেতে না যেতেই তার সহধর্মিণী একটি পুত্র সন্তান প্রসব করলেন। ফুটফুটে দেবশিশুর মত রূপ-সৌন্দর্যের আকর হয়ে জন্মগ্রহণ করল নবজাতকটি। পরলােকগত পিতার শেষ ইচ্ছানুযায়ী শিশুর নামকরণ করা হ’ল হাসিব'। জ্যোতিষী এলেন। বিচিত্র সব আঁকজোঁক কেটে শিশুর ভাগ্য গণনা করা হল। বিচারের ফলাফল জানাতে গিয়ে জ্যোতিষী বললেন—সন্তান দীর্ঘজীবি হবে বটে। কিন্তু তার একটি ফাড়া আছে। তার বিদ্যা বুদ্ধি হবে, জ্ঞান অর্জন করবে। নাম যশ লাভ করবে প্রচুর। কিন্তু যদি ফাড়াটি কেটে যায়। শিশু হাসিব-এর ভাগ্যগণনা করে বৃদ্ধ জ্যোতিষ তার পুঁথিপত্র বােগলে নিয়ে বিদায় নিলেন। 
হাসিব দিন দিন বাড়তে লাগল। পাঁচ বছর বয়সে বিদ্যালয়ে পাঠান হ’ল। শত চেষ্টা করেও তাকে লেখাপড়া শেখানাে গেল না। বইপত্র রেখে পেশাগত ব্যবসায় লাগিয়ে দেয়া হল। কিন্তু হাসিব সবকিছু ছেড়ে ছন্নছাড়ার মত ওখানে-ওখানে ঘুরে দিন কাটাতে লাগল। ছেলে না শিখল লেখা-পড়া, না করে কাজকর্ম। বিধবা মা ছেলের মতিগতি দেখে কেঁদে আকুল হন।
প্রতিবেশী হিতাকাঙক্ষীরা হাসিব-এর মাকে পরামর্শ দিল, ছেলেকে বিয়ে থা দিয়ে ঘরে টুকটুকে একটি বৌ এনে দিলে তার সংসারে মন বসবে।
হাসিব-এর মা সবার পরামর্শ অনুযায়ী ছেলের বিয়ে দিলেন। টুকটুকে একটি বৌ ঘরে এল। কিন্তু কার্যত ফলাফল শূন্য। হাসিব যা ছিল তা-ই রয়ে গেল।
হাসিবদের পাড়ায় কিছু কাঠুরে থাকে। জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে এনে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালায়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ হাসিব-এর মাকে পরামর্শ দিল, একটি কুড়ুল, কিছু দড়ি আর একটি গাধা কিনে ছেলেকে তাদের সঙ্গে জঙ্গলে কাঠ কাটতে পাঠাবার জন্য।
হাসিব-এর মা প্রতিবেশী কাঠুরেদের পরামর্শ অনুযায়ী সব কিছু জোগাড় করে দিল। মায়ের কথায় হাসিব রাজী হয়ে গেল। কাঠুরেদের সঙ্গে কুড়ুল কাঁধে নিয়ে, গাধার পিঠে চেপে হাসিব জঙ্গলে কাঠ কাটতে গেল।
গভীর জঙ্গলে পাহাড়, ঝর্ণা আর বিচিত্র সব গাছগাছালি দেখে হাসিব-এর মন মজে গেল। সে কাঠকাটার কাজে লেগে রইল। রােজই জঙ্গলে যায়। কাঠ কেটে গাধার পিঠে চাপিয়ে বাড়ি নিয়ে আসে। রােজগার হতে লাগল।
এক দুপুরে হাসিব সহকর্মীদের সঙ্গে জঙ্গলে কাঠ কাটছে। এমন সময় বৃষ্টি শুরু হল। ভীষণ বৃষ্টি। সে সঙ্গে-ঝড় আর বজ্রপাত তাে রয়েছেই। সবাই একটি গুহায় গিয়ে মাথা গুজল।
গুহার ভেতরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। তারা আগুন জ্বেলে ঠাণ্ডার হাত থেকে অব্যাহতি পাবার ব্যবস্থা করল। হাসিব-এর ওপর দায়িত্ব পড়ল আগুনে কাঠ যােগান দেয়া।
হাসিব গুহার মুখে গিয়ে কুড়ুল দিয়ে কাঠ চেরাই করতে গেলে তার হাত থেকে হঠাৎ কুড়ুলটি ছিটকে গিয়ে কয়েক হাত দূরে পড়ে। গম্ভীর একটি আওয়াজ হ’ল। অস্বাভাবিক আওয়াজটি হাসিব-এর মনে কৌতূহলের সঞ্চার করল। তার মনে হল জায়গাটি যেন ফাঁকা।
হাসিব অন্য একটি কুড়ুল নিয়ে মাটি খুঁড়তে লেগে গেল। কিছুটা খোঁড়াখুঁড়ির পরই একটি পাথরের চাই তার চোখে পড়ল।
ব্যস্ত হাতে পাথরটি তুলে ফেলল। তার ঠিক তলায় একটি তামার ঝুড়ি দেখতে পেল। ঝুড়িটি বেশ বড়সড়ই। 
কিসসার এ পর্যন্ত বলতে না বলতেই ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ পঞ্চান্নতম রজনী 
বেগম শাহরাজাদ কিসসা শুরু করলেন—জাহাপনা, হাসিব কৌতূহলী মন নিয়ে সহকর্মীদের কাছে গেল। রহস্যজনক আওয়াজটির কথা বল। সবাই দৌড়ে গেল। তামার ঝুড়িটি তুলতেই চোখের সামনে একটি গর্ত দেখা দিল। একটি সুড়ঙ্গ।
হাসিব মাটিতে শুয়ে পড়ে গর্তটিতে মাথা ঢুকিয়ে ভেতরে উকি দিতেই তার চক্ষু স্থির হয়ে যাবার উপক্রম হ’ল। দেখল, পাশাপাশি কয়েকটি জালা সাজানাে রয়েছে।
কোন সিড়ি নেই। জালাগুলােকে ওপরে তুলে আনতে হলে গলায় দড়ি বেঁধে তুলতে হবে। হাসিব এর আর তর সইছে না। দড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল। কুড়ুল দিয়ে একটি হাড়ির গায়ে আঘাত করতেই ভেঙে গেল। জ্বালার ভেতর থেকে গল গল করে মধু বেরােতে লাগল।
কাঠুরেরা মধু বা এরকম কোন কিছুর কথা ভাবে নি। তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল নিশ্চয়ই সােনার মােহরটোহর জালাগুলাের মধ্যে রয়েছে। একটি জালায় তাে মধু পাওয়া গেল। কাঠুরেদের হতাশ করল। বাকীগুলােতে কি আছে দেখা দরকার। গলায় দড়ি বেঁধে এক এক করে সব কটি জালা ওপরে তুলে আনা হল। এদিকে কাঠুরেদের মাথায় দুর্বুদ্ধি চাপল। তারা হাসিব’কে আর গর্ত থেকে তুলল না। সে থাকলে জালার ভেতর থেকে যা-ই উদ্ধার করা হােক না কেন তাকে ভাগ দিতে হবে। অহেতুক তাকে গর্ত থেকে তুলে এনে মালের ভাগীদার বাড়াবার দরকারও তাে নেই। হাসিব গর্তের ভেতরে মরে পড়ে থাকলেই বা ক্ষতি কি?
কাঠুরেরা বাজারের কাছাকাছি এসে এক যুবককে হাসিব-এর মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিল। সে গিয়ে তাকে বলল —‘হাসিব যখন জঙ্গলে কাঠ কাটছিল তখন তার গাধাটি হঠাৎ কোথায় চলে যায়। হাসিব হন্যে হয়ে গাধার খোঁজে জঙ্গলে ছুটোছুটি করতে লাগল। ঠিক তখনই ভীষণ ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। আমরা দৌড়ে গিয়ে হাতের কাছে একটি গুহা পেয়ে তাতে ঢুকে পড়ি। কিছুক্ষণের মধ্যে গাছের ফাক দিয়ে দেখি একটি ইয়া তাগড়াই বাঘ এসে তােমার ছেলে হাসিব আর তার গাধাটিকে মেরে ফেলল। আমরা কুড়ােল নিয়ে কাছে যাওয়ার আগেই বাঘটি হাসিব-এর টুটি চেপে ধরে গভীর জঙ্গলে ঢুকে গেল।
সদ্য পুত্রহারা বিধবা হাসিব-এর মা সবকিছু শুনে বুক চাপড়ে কান্নাকাটি করল। পুত্রহারা বিধবার কান্না আল্লাতান্নার কানে পৌছবে কিনা, কে জানে?
এদিকে কাঠুরের জালাগুলােকে বাজারে নিয়ে গেল। সৰ কটিতেই মধু ভর্তি। বিক্রি করে মূনাফা পিটল। সবাই বাজারে একটি করে দোকান খুলে চুটিয়ে ব্যবসা করতে লাগল। এদিকে অদৃষ্ট বিড়ম্বিত হাসিব গুহার মধ্যে পড়ে মৃত্যুর জন্য অধীর প্রতীক্ষায় প্রহর গুণতে লাগল। অনেক কেঁদেছে। চেঁচিয়ে গলা ফাটিয়েছে। কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসে নি। সে অনন্যোপায় হয়ে মেঝেতে মাথা ঠুকতে লাগল। মনস্থ করল আত্মহত্যা করে এ যন্ত্রণা ও হতাশার হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করবে । 
হাসিব হঠাৎ দেখতে পেল ইয়া বড় একটি কাঁকড়া বিছে তার দিকে ধেয়ে আসছে। সে কুড়ােলটি দিয়ে তাকে দু টুকরাে করে দিল। হাসিব এবার কাঁকড়া বিছেটি যেদিক থেকে এল সেদিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে তাকাল। ক্ষীণ একটি আলাের রেখা তার নজরে পড়ল। হাসিব দৌড়ে গিয়ে কুড়ুল দিয়ে সজোরে ঘা মারল। ব্যস, দরজাটি একটু ফাক হয়ে গেল। বার কয়েক জোরে জোরে ঘা মারতে দরজাটি ভেঙে গেল। হাসিব এক লাফে ভেতরে ঢুকে গেল। দেখল, একটি বিশালায়তন চাতাল। ওধারে একটি আলাে জ্বলছে। সামান্য এগােতেই ইস্পাতের একটি দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজায় ঝুলছে ইয়া বড় একটি রূপাের তালা। পাশেই একটি সােনার চাবি।
হাসিৰ চাৰি ঘুরিয়ে তালা খুলল। দরজা খুলে ভেতরে উঁকি দিতেই তার চক্ষুস্থির হয়ে গেল। চমৎকার একটি সরােবর। মাথার ওপরে খােলা আকাশ। পায়ের তলায় পান্নার পাহাড়।
সরােবরের চারদিকে বারাে হাজার শ্বেতপাথরের আসন। আর এক ধারে মনলােভা কারুকার্য মণ্ডিত একটি সিংহাসন। এমন সময় হাসিব দেখতে পেল পান্নার পাহাড়ের গা-বেয়ে একটি শােভাযাত্রা আসছে। কেউ হেঁটে আসছে না। বাতাসের কাধে ভর দিয়ে সবাই শূন্যে ভেসে তার দিকে এগােচ্ছে। একদল মহিলা সবাই পরমা সুন্দরী। মিছিল আরও কিছুটা এগােতেই হাসিব আরও আশ্চর্য হ'ল। মিছিলকারী মহিলাদের কারাে পা নেই। কোমরের নিম্নাংশ সরীসৃপের মত লম্বাটে। তাই বাধ্য হয়ে সরীসৃপের মত পথ চলে। এরা সর্পকন্যা। গ্রীক ভাষায় গান গাইছে সবাই। রানীর গুণকীর্তন। চমৎকার তাদের গলা। চমৎকার গানটির সুর।।
চারজন সর্পকন্যা উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু রানীর এখনও দেখা মেলে নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যাপারটি পরিষ্কার হ’ল। সর্পকন্যাদের মাথায় একটি গামলা রয়েছে। তার মধ্যে বসে তাদের রানী।
সর্পকন্যারা রানীকে এসে সিংহাসনে বসাল। হাসিব ইতিমধ্যেই আড়ালে গিয়ে গা-ঢাকা দিয়ে দিয়েছে।
এবার মিছিল করে অন্যান্য সর্পকন্যারা এল। শ্বেতপাথরের বেদীর ওপর সবাই বসল।
হাসিব রানীর নজর এড়াতে পারে নি। রানী তাকে ইঙ্গিতে কাছে ডাকল। সে বলীর পাঠার মত কাঁপতে কাঁপতে রানীর সামনে হাজির হল। রানী মুচকি হেসে তাকে পাশে বসালেন। মৃদু হেসে, সুরেলা কণ্ঠে রানী এবার বললেন—‘আগন্তুক যুবক, তুমি আমাদের অতিথি। মন থেকে ভয়-দ্বিধা-সঙ্কোচ ঝেড়ে ফেলে দাও। আমার নাম যমলিকা। তােমার নাম কি ? তুমি কিভাবে এসরােবরের তীরে এলে? আমার বাস মাউন্ট কাফে। প্রতি শীতে আমি প্রজাদের নিয়ে এখানে কাটাই। কয়েক মাস বাস করি। 
হাসিব রানীর কাছ থেকে অভয় পেয়ে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠল। সে এবার রানী যমলিকার প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বললেন—“আমার নাম হাসিব। পরলােকগত ঋষিতুল্য পণ্ডিত ড্যানিয়েল-এর পুত্র। আমার জন্মের আগেই আমার পিতা ইহলােক ত্যাগ করেছেন। আমি আমার পিতার মত জ্ঞানী ও সুপণ্ডিত হয়ে উঠতে পারতাম। আর কিছু না হােক একজন বণিক বা ব্যবসায়ী তাে হতে পারতাম। বাল্য ও কৈশােরে পড়াশুনা না করে বন্ধুদের সঙ্গে খেলে বেড়িয়েছি। অদৃষ্টগুণে একজন কাঠুরে হয়ে উঠলাম। চার দেয়ালে বন্দী থাকা আমার প্রকৃতি বিরুদ্ধ। আমার ইচ্ছা, আমার মৃত্যুর পর যেন আমার কবরের ওপর কেউ স্মৃতিসৌধ গড়ে না দেয়। 
রানী হাসিব-এর জীবনকাহিনী শুনে খুবই খুশী হ’ল। সে এক সর্পকন্যাকে কিছু খাবার দাবার এনে হাসিব’কে দিতে বললেন। সর্পকন্যাটি সঙ্গে সঙ্গে কিছু উপাদেয় খাবার এনে হাসিব’কে দিল। রানী বললেন—‘হাসিব, তুমি আমাদের অতিথি। দীর্ঘসময় সুড়ঙ্গের মধ্যে বন্দী ছিলে। নিশ্চয়ই খিদে-তেষ্টা পেয়েছে। এগুলাে দিয়ে আগে ক্ষুধা নিবৃত্ত করে সুস্থ হয়ে নাও।
হাসিব গােগ্রাসে খাবারগুলাে খেতে লাগল।
রানী এবার বললেন—“তুমি যতদিন খুশী আমাদের অতিথি হয়ে এখানে থাকতে পার। তােমার কোন অনিষ্টই কেউ করবে না। অন্তত এক সপ্তাহ এখানে থাক। আমি তােমাকে গল্প শুনিয়ে খুশী করব। আনন্দ-উচ্ছাসে তােমার মন-প্রাণ ভরিয়ে দেব। তুমি মানবদেশে ফিরে যাবার পর গল্পগুলাে তােমার উপকারে লাগবে বলেই আমার বিশ্বাস।

        বুলুকিয়ার কিস্সা 

রানী যমলিকা গল্প বলবেন। গল্প শােনার অত্যুগ্র আগ্রহ নিয়ে রানীর প্রজারা নিজ নিজ আসনে তৈরি হয়ে বসল। তাদের অতিথি হাসিব-এর মুখেও উৎসাহের ছাপ।
রানী গল্প শুরু করলেন—শােন, পুরাকালে কোন এক দেশে বানু-ইসরায়েল নামে এক রাজা রাজত্ব করতেন। তার একমাত্র পুত্রের নাম ছিল, বুলুকিয়া।
একদিন বৃদ্ধ রাজা বুলুকিয়া'কে ডেকে বললেন—“আমার মৃত্যুর পর তুমিই সিংহাসনে বসবে। কারণ, তুমিই সিংহাসনের একমাত্র উত্তরাধিকারী। সিংহাসনে বসে প্রথমেই তােমাকে একটি কর্তব্য সম্পাদন করতে হবে। কাজটি হচ্ছে, রাজপ্রাসাদের যাবতীয় সম্পত্তির একটি করে আলাদা আলাদা ফর্দ তৈরি করবে। আর একটি নির্দেশ রইল—ভালভাবে পরীক্ষা না করে প্রাসাদের কোন জিনিস বাইরে যেতে দেবে না।
রাজার মৃত্যু হ’ল। রাজপুত্র বুলুকিয়া সিংহাসনে বসলেন। বুলুকিয়া সিংহাসনে বসার পর পরলােকগত পিতার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চললেন। রাজা প্রাসাদের যাবতীয় জিনিসপত্র বিশালায়তন একটি ঘরে জড়াে করল। প্রত্যেকটি জিনিসের আলাদা আলাদা ফর্দ তৈরি করার ব্যবস্থা করা হল।
তখনও কোন কোন ঘরে কিছু জিনিস রয়ে গেছে। এক এক করে নিয়ে আসা হচ্ছে। রাজকর্মচারীরা একটি ঘরে দুটো পাথরের
( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments