আরব্য রজনী পার্ট ১১৮ ( Arabya Rajani Part118)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
তারা এবার আড় চোখে আমার মুখের দিকে তাকাতে শুরু করল। তারা যেন আমাকে বিদ্রুপ করছে এরকম তাদের চোখের চাহনি। - আমি তখন বিলকুল কৌতূহলের শিকার হয়ে পড়েছি। শরম টরম ভুলে গিয়ে লেড়কি তিনটিকে জিজ্ঞাসা করলাম—“তােমরা কারা গাে রূপসীরা? বেগমের মত সুরৎ তােমাদের। বল না গাে, তােমাদের পরিচয় কি?  আমার নাম জানশাহ। সুলতান টিগমাস এর বেটা আমি। তিনি বানু-শাহলান এবং কাবুলের অধিপতি।

তাদের মধ্যে সবচেয়ে কম উমর এবং সুরৎ যার বেশী সে লেড়কিটি আমার প্রশ্নের জবাব দিল—“আমরা তিন বহিন। বাদশাহ নসর-এর বেটি। হীরার প্রাসাদে তিনি বাস করেন। খুশী মাফিক গােসল করার জন্য আমরা রােজ এখানে আসি। আজও একই উদ্দেশ্যে এসেছি।
–‘আমাকে কি তােমাদের মােটেই পছন্দ হচ্ছে না? জরুর পছন্দ হয়েছে, তাই না? তবে এসাে না আমার সঙ্গে দিল্ খােলসা করে আনন্দ স্ফুর্তি করবে। কি গাে, রাজী?’
-“কি যে বল জানশাহ, যুবতী লেড়কি কখনাে নওজোয়ানের সহিত খেল কুদ করতে, আনন্দ ফুর্তি করতে পারে ? আমাদের সম্বন্ধে আরও ভালভাবে জানতে উৎসাহী হলে আমাদের প্রাসাদে চল। আব্বাজীর সাথে বাৎচিৎ করবে। যাবে কি?  
ব্যস, আমার কলিজায় দাগা দিয়ে লেড়কিটি তার দু’ বহিনকে নিয়ে ডানা মেলে উড়ে গেল। তারা তাে আমার প্রতি বিদ্রুপের দৃষ্টি হেনে হাসতে হাসতে ডগমগিয়ে চলে গেল। বুলুকিয়া ভাইয়া, আমার তখন যে কী হালৎ বুঝিয়ে বলতে পারব না। আমার কলিজায় কে যেন আচমকা গরম লােহার সেঁকা দিয়ে দিল। আমার সব কিছু বিলকুল জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে যেতে লাগল। জানা ছিল না, দুনিয়ায় এমন কোন্ ঠাণ্ডা পানি আছে যা দিয়ে আমার বুকের জ্বালা নেভাতে পারি। আকস্মিক মনােকষ্ট আর হতাশায় আমি মেঝেতে লুটিয়ে পড়লাম। ব্যস, সংজ্ঞা লােপ পেয়ে গেল। যখন সংজ্ঞা ফিরে পেলাম তখন চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি, পাখিদের অধিনায়ক বুড়ােটি আমার শিয়রে বসে চোখে-মুখে গুলাবের পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে।
বুড়াে ঠোটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বলল -“কি গাে এ বুড়ােটির নিষেধ না শােনার ফল তাে হাতেনাতেই পেয়ে গেলে, কি বল? তােমাকে তাে এ-নিষিদ্ধ কামরায় প্রবেশ করতে বার বার বারণ করেছিলাম, পাত্তা দাও নি। এখন ঠেলা সামলাও।
পারলাম না। কেবল হরদম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলাম।
-তােমার এ হালৎ কেন হয়েছে এবার আমার মালুম হ’ল। কবুতরের সাজে লেড়কিরা কামরায় এসেছিল, তাই না? তারা কখন সখন গােসল করতে এখানে হাজির হয়।
আমি চোখের পানি মুছতে মুছতে বল্লাম—আপনার অনুমান অভ্রান্ত। হ্যা, তিনটি খুবসুরৎ লেড়কি কামরায় ঢুকে গােসল সারছিল। মেহেরবানি করে আমাকে বলুন, কোথায় আছে হীরার প্রাসাদ ? কোথায়, কোনদিকে গেলে তার দেখা পাব। আর লেড়কি তিনটির আব্বা নর-এর সাথে মােলাকাৎ হতে পারে কিভাবে, আমাকে বলে দিন।
–‘ইয়া খােদা! বলছ কি তুমি নওজোয়ান ! খবরদার ভুলেও সেখানে যাওয়ার কোশিস কোরাে না!
–“কিন্তু আমি যে—'।
—“তুমি বাদশাহ নসর-এর সম্বন্ধে বিলকুল আন্ধারে আছ। সে জিনদের বাদশাহ। প্রবল পরাক্রমশালী। তুমি কি উন্মাদ হয়েছ?
তুমি ভেবেছ, তােমার সঙ্গে সে তার লেড়কির শাদী দেবে? না, কখনই দেবে না। ইয়া পেল্লাই সব পাখি এখানে আসবে। আমি ব’লে দেব তােমাকে যেন তােমার নিজের মুলুকে পৌছে দিয়ে আসে। ঝুটমুট কেঁদো না। চোখ মােছ, দিলকে শক্ত কর।
—“কিন্তু ওই খুবসুরৎ লেড়কিদের বাৎ বিনা আমি যে আর ভাবতেও উৎসাহ পাচ্ছি না। আপনি বিশ্বাস করুন। তাদের না পেলে আমার জান খতম হয়ে যাবে। জিন্দেগী একদম বরবাদ হবে। আপনি আমার জন্য বহুৎ করেছেন। আর একটিমাত্র অনুরােধ রক্ষা করলে জিন্দেগীভর আপনার কেনা গােলাম হয়ে থাকব। আমি নিজের মুলুকে ফিরতে নারাজ। আমার আপনজনদের কাছে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছাও আমার কিছুমাত্র নেই। একবার, মাত্র একবার তাদের দু'চোখ ভরে দেখতে চাই। আপনি মেহেরবানি করে বন্দোবস্ত করে দিন।
ব্যস, আর দেরী নয়, বুড়াের পায়ে লুটিয়ে পড়লাম। তার পায়ে শির ঠেকিয়ে টান টান হয়ে শুয়ে থাকলাম।
লেড়কিটি রজনীগন্ধার মাফিক সফেদ। দেখতেও আধফোটা। রজনীগন্ধার মাফিকই বটে। তার সুরৎ দেখে চোখের পিপাসা কিছু মিটলেও তার খুসবু তাে পরখ করা হ’ল না। তার ছোঁয়াটুকু পর্যন্ত জুটল না। না পেলে আমার জিন্দেগী বরবাদ হয়ে যাবে।” অভিমান মিশ্রিত আব্দারে বুড়াের দিকে নরম করার কোশিস করতে লাগলাম।
এমন সময় প্রাসাদ সংলগ্ন উদ্যানে পাখিদের ডানা ঝটপটানি শুরু হয়ে গেল। বেগম শাহরাজাদ তার কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ আটষট্টিতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বেগম বললেন—“জাহাপনা, জানশাহ বুলুকিয়া’কে কিসসা শােনাতে গিয়ে এবার বলল -বুলুকিয়া ভাইয়া, তােমাকে আর কি বলব, আমি বুড়াের পায়ে পড়ে আকুল হয়ে কেঁদেকেটে বারবার আমার ইচ্ছা প্রকাশ করতে লাগলাম।
—বহুৎ আচ্ছা, লেড়কিটিকে তুমি আলবৎ পাবে। তােমার কলিজার আগুন যখন তাকে ছাড়া নিভবে না তখন যা-যা বলি শােন। আর যদি আমার পরামর্শ অনুযায়ী চল তবে তুমি তাকে লাভ করতে পারবে। ওই কামরার দরওয়াজার আড়ালে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকবে। তারা গােসল সারতে ফিন আসবে। ডানা খুলে পানিতে নামবে। তুমি চুপি চুপি তাদের ডানগুলাে লুকিয়ে ফেলবে। গােসল সেরে তােমার কাছে ডানাগুলাে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য অনুরােধ জানাবে। তখন বিবস্ত্র হয়ে আদর সােহাগের মাধ্যমে তােমাকে খুশী করার কোশিস করবে, তুমি কিছুতেই সেগুলাে দেবে না। তুমি সাফ কথা জানিয়ে দেবে, আগে মিঞা ফিরে আসুক তারপর ফেরতের ব্যাপারে ভেবে দেখা যাবে। খবরদার, কোনক্রমে তােমার দিলকে দুর্বল করে দিয়ে যদি ডানাগুলি হাত করতে পারে তবে আর ভুলেও এমুখো হবে না। আমি ফিরে তােমার বাসনা পূরণের যা কিছু বন্দোবস্ত করতে হয় করব।
পাখিদের অধিনায়ক বুড়ােটি বিদায় নিলে আমি দরওয়াজার আড়ালে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। তাদের হাসাহাসি আর বাৎচিৎ আমার কানে গেল। মালুম হ’ল তারা আসছে। তারা উড়তে উড়তে এসে জলাশয়ের পাশে বসল। যে-লেড়কিটি সেদিন আমার সঙ্গে দু’-চারটি বাৎচিৎ করেছিল। সে তার বহিনদের বলল –বহিনজী, ধারে কাছে কেউ গা-ঢাকা দিয়ে নেই তাে সেদিন যে লোকাটি এখানে এসে পড়েছিল, সে কোথায়, কি হ'ল, বলতে পারিস ?'
---“তার জন্য তােকে ভাবতে হবে না সানসা। ঝুটমুট দেরী করিস নে। এখন আয় পানিতে নেমে মৌজ করে কেলি করা যাক।
তারা নিজ নিজ জানা খুলে পানিতে নেমে গেল। আমি সতর্ক দৃষ্টি রেখে চলেছি । কখন তারা গোসল করতে করতে অতিকায় গামলাটির মাঝখানে চলে যায়। বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হ’ল না। একটু বাদেই তারা কেলি করতে করতে গামলাটির মাঝখানে চলে গেল। ব্যস, আমি একলাফে এগিয়ে গিয়ে ছোট লেড়কিটির সালােয়ার-কামিজ নিয়ে নিলাম। সে-তাে আমার কারবার দেখে চিল্লিয়ে গলা ফাটাতে লেগে গেল। জলের ওপর কেবলমাত্র মুখটি ভাসিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এল। কাতর মিনতি জুড়ে দিল। বিবস্ত্র খুবসুরৎ লেড়কিটি শরমে একেবারে এতটুকু হয়ে যাবার জোগাড়। চোখে-মুখে কাতর মিনতির ছাপ ফুটিয়ে তুলল। 
না, এত সহজে আমিও গলবার পাত্র নই। নিজের দিলকে শক্ত করে বাঁধলাম। একদম নরম হওয়া চলবে না।
তারপর আমি তার ডানা দুটো শিরের ওপরে তুলে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে ধেই ধেই করে নাচতে লেগে গেলাম।
ছােট লেড়কিটি আমার গুণগান গেয়ে মন গলাবার কোশিস করতে গিয়ে বলল-“তুমি এক নওজোয়ান। গণ্যমান্য আদমিও বটে। তােমার জ্ঞান-বুদ্ধি সাগরের সমান। কিন্তু অন্যের সামানপত্রে কি করে যে হাত দিলে, তাজ্জব হচ্ছি।”
-“ওখান থেকে নয়। আগে পানি থেকে উঠে এসাে তারপর আমার সঙ্গে বাৎচিৎ বল।
‘জরুর তােমার সঙ্গে বাৎচিৎ বলব। কিন্তু বিবস্ত্র অবস্থায় তাে আর ওঠা সম্ভব নয়, বিবেচনা কর। আগে আমার সালােয়ার কামিজ তাে দেবে। ওগুলাে গায়ে চাপিয়ে তবে তাে পানি ছেড়ে উঠব। তারপর মৌজ করে তােমার সঙ্গে বাৎচিৎ করব। তুমি আমাকে তখন খুশীমত সােহাগ কোরাে।
–তুমি আমার কলিজা, আমার দিল। তুমি দুনিয়ার সেরা সুন্দরীদের মধ্যে অন্যতমা—অনন্যা। তােমাকে না পেলে আমার জান টিকিয়ে রাখা দায়। তাই তােমার পােশাকগুলাে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তা করলে তাে ব্যাপারটি নিজের হাতে নিজের বুকে ছােরা বসানাের সামিল কাজ হবে। সুন্দরী, আমার দোস্ত পাখিদের অধিনায়ক ফিরে না আসা পর্যন্ত তােমার সালােয়ার কামিজ ফিরে পাবে না। এবার লেড়কিটি তার বহিনজীর দিকে ফিরে অনুচ্চ কণ্ঠে প্রায় ফিসফিসিয়ে কি যেন বল্ল। তারপর আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল —“তােমার হাতে তাে কেবলমাত্র আমার সালােয়ার-কামিজই রয়েছে। তবে তুমি একটু অন্যদিকে চোখ ফেরাও যাতে আমার বহিনজীরা তাদের পােশাক গায়ে চাপিয়ে নিতে পারে। তারপর তাদের পােশাক থেকে কয়েকটি পালক ছিড়ে আমাকে দেবে। তা দিয়ে আমি শরীরের গােপন স্থানগুলিকে আড়াল করে পানি থেকে উঠব। মেহেরবানি করে— 
আমি মুচকি হেসে বললাম-“এ কাজ অবশ্য করা যেতে পারে। এই নাও আমি আবডালে চলে যাচ্ছি। বলতে বলতে আমি মসনদটির আড়ালে গিয়ে ঘাপটি মেরে বসে রইলাম।
এবার বড় বহিন দুটো পানি থেকে উঠে নিজেদের পােশাক গায়ে ছাপিয়ে নিল। তারপর তাদের পােশাক থেকে কয়েকটি পালক ছিড়ে ছােট বহিনটিকে দিল। সে শরীরের গােপন স্থানগুলাে কোনরকমে ঢেকে ঢুকে আমাকে লক্ষ্য করে বলল -হ্যা, এবার বাইরে বেরিয়ে এসাে।
আমি একলাফে মসনদটির আড়াল থেকে বেরিয়ে ছােট লেড়কিটির ওপর ঝাপিয়ে পড়লাম। তার গালে, ঠোটে—সর্বাঙ্গে হরদম চুমু খেতে লাগলাম। তবে পােশাকটিকে তার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে রেখে দিয়েছি। সে আমাকে বহুৎ আদর সােহাগ জানাতে লাগল। আমার ভূয়সী প্রশংসা করে পােশাকটি হাতাবার ধান্দা করে। জব্বর খােসামােদ। না, আমি কিছুতেই নরম হচ্ছি না। মিঠা বাৎ বলে আমার দিলকে ভেজাতে পারবে না। এক ঝটকায় তাকে কোলে নিয়ে মসনদটির ওপর বসে পড়লাম। তার পক্ষে ধান্দা করা মােটেই সম্ভব হ’ল না।
আমার বাহুবন্ধন থেকে পালাবার জো নেই। আন্দাজ করে নিল। সানসা এবার আমার কামনায় সাড়া দিল। হাত দুটো দিয়ে আমার গলা ধরে ঝুলে পড়ার জোগাড় হ’ল। আদরে সােহাগে আমার কলিজাটি একেবারে ভিজিয়ে দিল। আমার গালে হরদম চুমু খেতে লাগল। নিজের ঠোট দুটোকে আমার ঠোঁটের ওপর চেপে ধরে বারবার ঘষতে লাগল। নিবিড় হতে হতে এক সময় যেন উভয়ে মিলেমিশে এক হয়ে গেলাম। কিছু সময় বাদে পাখিদের অধিনায়ক বুড়াে ফিরলেন। তাকে দেখেই আমরা ঝট করে পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম।
আমি মসনদ থেকে উঠে তার কাছে গেলাম। বুড়াে বলেন—‘বেটি, এ-লেড়কাটি কি তােমার পছন্দ? এ কিন্তু তােমার মহব্বতে একেবারে মাতােয়ারা। আমি খুশীই হয়েছি। জানশাহ বংশ মর্যাদায় খুবই উঁচু। তার বাৎ শুনে তােমার আব্বা বাদশাহ নর খুশীই হবেন। মালুম হচ্ছে, তােমাদের শাদীতে তিনি প্রতিবন্ধকতা করবেন না। এর আব্বা আফগানিস্তানের সুলতান, টিগমাস তার নাম। তােমার আব্বার কাছে এর কথা বলবে। তাকে রাজী করানাের দায়িত্ব তােমার। আমি বিশ্বাস করি, তুমি বুঝিয়ে বললে তিনি অমত করবেন না।
—“আপনার হুকুম আমি শিরে তুলে নিলাম।
—“আমার সামনে কসম খাও যে, তুমি তাকে স্বামীত্বে বরণ করে নেবে। আর জিন্দেগীভর তার কণ্ঠলগ্না হয়ে কাছাকাছি পাশাপাশি থাকবে।
বুড়াে এবার আমার মেহবুবার শিরে হাত রেখে আশীর্বাদ করে বললেন-“পরম পিতা করুণাময় খােদাতাল্লাকে ধন্যবাদ জানাই। তারই অভিপ্রায়বশতঃ তােমাদের মিলন ঘটল। তােমরা সুখে জিন্দেগী কাটাও। তােমাদের মধ্যের বাঁধার প্রাচীর দূর করে দিয়ে উভয়ে উভয়কে মহব্বতের জালে জড়িয়ে নাও।
সানসা ঘাড় কাৎ করে বুড়াের পরামর্শ মানার সম্মতি জানাল। | বুড়াে এবার বললেন—জানশাহ্, তার সালােয়ার কামিজ প্রভৃতি যা কিছু পােশাক আছে ফিরিয়ে দাও। এ কথা দিয়েছে কখনও তােমার কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেবে না।
সানসার বহিনরা তাদের আব্বার কানে ব্যাপারটিকে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদায় নিল। 
বুড়াে এবার আমাদের নিয়ে সুসজ্জিত একটি কামরায় হাজির হলেন।
বহিনরা চলে গেলে সানসা এবার ফলমূল কেটে আমাদের খানাপিনার বন্দোবস্ত করল। তার শিষ্টতা ও সৌজন্যবােধ আমাকে মুগ্ধ করল। একটি রাজকন্যার যেমন আচরণ হওয়া দরকার তাদের কোনটিরই ঘাটতি তার মধ্যে লক্ষিত হয় নি।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ উনসত্তরতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর পড়তে না পড়তেই বাদশাহ শারিয়ার। বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—“জাহাপনা, জানশাহ রাজা বুলুকিয়ার কাছে তার কিসসা বলছে বুলুকিয়া ভাইয়া, রাত্রির আন্ধার নেমে আসার কিছু বাদেই আমি সানসা’কে নিয়ে একটি কামরায় চলে গেলাম। আমরা উভয়ে উভয়কে নিভৃতে পেয়ে খুশীতে ডগমগ হয়ে উঠলাম। অনাবিল আনন্দ-খুশীতে ভরে উঠল আমাদের দিল । কি করে যে আমরা এতবড় একটি রাত্রি গুজরান করে দিলাম মালুমই হ’ল না। সুখের রাত্রি তাে, পলকে ফুরিয়ে যায়।
ভােরে সানসার ডাকে চোখ মেলে তাকালাম। আমার চোখ দুটো থেকে নিদ কাটানাের জন্য কপালে ছােট্ট করে দুটো চুমু খেল। তারপর বলল —“কি গাে, আমার আব্বাজীর কাছে যেতে হবে, খেয়াল নেই? ওঠ, তৈরী হয়ে নাও। আমাদের বিদায় জানাতে পাখিদের অধিনায়ক বুড়াে সদর-দরওয়াজা পর্যন্ত এগিয়ে এলেন। আমি এবং সানসা তাকে সালাম ও বহুভাবে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে এলাম।
সানসা আমাকে তার পিঠে চাপিয়ে নিয়ে দিব্যি বাতাসের বেগে উড়ে চলল। চোখের পলকে আমরা হীরা প্রাসাদে পৌছে গেলাম।
সদর-দরওয়াজার সামনে ক’টি জিন অধীর প্রতীক্ষায় রয়েছে। আমাদের আগমনবার্তা প্রাসাদে পৌছে দেবার জন্যই তারা কষ্ট করে এখানে দাঁড়িয়ে।
রাজা নর সানসার আব্বা। জিনরা তাকে নেতা বলে মান্য করে। আমাকে দেখে, পরিচয় পেয়ে মহাখুশী হলেন। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। একটি হীরের মুকুট নিজে হাতে আমার মাথায় পরিয়ে দিলেন। আমার মত পাত্রকে লেড়কি পছন্দ করায় তার আম্মা তাে একেবারে খুশীতে ডগমগ। তিনি তাে লেড়কিকে কতগুলাে হীরেই উপহার দিয়ে বসলেন।।
আমার শ্বশুরালয়ের দিনগুলি বেশ খােশ মেজাজেই কাটতে লাগল। নিজের মুলুকের জন্য এক সময় দিল বড়ই ছটফট করতে লাগল। আমার শ্বশুর রাজা নর-এর কাছে প্রস্তাব দিলাম, এবার বিবিকে নিয়ে আমি নিজের মুলুকে ফিরে যেতে চাই। আমার আব্বা আর আম্মাকে তাে তাদের বেটার বউ দেখাতে হবে। রাজা ও রানী উভয়েই হাসিমুখে আমার প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন। তবে কথার ফাঁকে আমার কাছ থেকে একটি প্রতিশ্রুতি তারা আদায় করে
( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments