আরব্য রজনী পার্ট ১১৩ (Arabya Rajani Part 113)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
এমন অকল্পনীয় সৌন্দর্য ইতিপূর্বে চোখে দেখা তাে দূরের কথা দেখতে পাবে বলে তারা স্বপ্নেও কোনদিন ভাবেন নি। অ্যাফান বললেন-'এর নাম সােনালি ফুলের দ্বীপ। অতি প্রাচীনকালে নাকি সূর্যের একটি টুকরাে খসে এ-দ্বীপে পড়েছিল। সে টুকরােই হচ্ছে এ-দ্বীপটি।'
দিনের মতই সারারাত্রি চলে এখানে আলাের রােশনাই। তারা আলাের খেলা দেখে দেখে সারাটি রাত্রি দিব্যি কাটিয়ে দিলেন।

সকাল হল। আবার তারা পায়ে রস মাখার উদ্যোগ নিলেন। প্রফুল্লচিত্তে তারা আবার সমুদ্রে নামলেন। এই সমুদ্র তারা আবার অনবরত হেঁটে চললেন। হাঁটাহাঁটিতে ক্লান্তি আসে সত্য। কিন্তু মনের অদম্য উৎসাহের কাছে তা নস্যাৎ হয়ে যায়।
এমন সময় ভাের হয়ে আসায় বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ আটান্নতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসা শুরু করলেন—“জাহাপনা, মহাপণ্ডিত অ্যাফান ও বুলুকিয়া ষষ্ঠ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে চলেছেন। দীর্ঘ সময় হাঁটাহাঁটির পর তারা এক মনলােভা বেলাভূমিতে পৌছলেন। দ্বীপটি জুড়ে ঝােপ ঝাড় আর জানা-অজানা সব গাছের বিচিত্র সমারােহ।
সমুদ্রের পাড়ে একটি পাথরের ওপর বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবার পর তারা দ্বীপের ভেতরের দিকে পা বাড়ালেন।
এতক্ষণ বেশ হাসিখুশী মন নিয়েই তারা চলছিলেন। কিন্তু এবার আনন্দ আতঙ্কের রূপ নিল। আরে ব্বাস! গাছে গাছে এসব কি ঝুলছে? ফল তাে নয়। তবে? মানুষের মাথা। অগণিত মানুষের মুণ্ড। তাদের মুখের অভিব্যক্তি আবার ভিন্নতর। কারাে সঙ্গে কারাে মিল নেই। কেউ মুখ গােমড়া করে রয়েছে, কেউ খিলখিল করে হাসছে, কারাে মুখে মিটিমিটি হাসি, আবার কেউ বা অঝােরে কেঁদে চলেছে।
গাছ থেকে কিছু কিছু মুণ্ডু পাকা ফলের মত খসে পড়ছে। তাতেও অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষিত হচ্ছে। মাটিতে পড়ামাত্র সেগুলাে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছে।
আজব ফল তাে? অ্যাফান ও বুলুকিয়া আজব ফলগুলির ধারে কাছে ঘেঁষতে সাহস পেলেন না।
উপায়ান্তর না দেখে তারা বন থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটি পাহাড়ের আড়ালে প্রায় সমতল বেলাভূমিতে মুখ গােমড়া করে বসে রইলেন।
ক্লান্তিতে তাদের চোখের পাতা জুড়ে আসছে। চোখ বন্ধ করে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় কাটাতে লাগলেন। এক সময় রােমাঞ্চকর এক শব্দ কানে যেতেই সচকিত হয়ে চোখ মেলে তাকালেন। দেখেন, সাগরের বুক থেকে পরমা সুন্দরী এক কন্যা উঠে ছন্দময় ভঙ্গিমায় এগিয়ে আসছে। তার পায়ের মল জোড়া অদ্ভুত স্বরের সৃষ্টি করে চলেছে।
একটি নয় আরও একটি অপরূপা উঠে এল সমুদ্র ছেডে বেলাভূমিতে। তার পায়েও মল। এভাবে একের পর এক অপরূপার আবির্ভাব ঘটতে ঘটতে মােট বারােটি সাগরকন্যা বেলাভূমি বেয়ে উঠে বেলাভূমি ধরে এগিয়ে আসছে। তাদের রূপের জৌলুসে পুরাে দ্বীপটিই যেন মুহুর্তে ঝলমলিয়ে উঠল। কাকে ছেড়ে কাকে ধরি ? প্রত্যেকের রূপই সমান। চোখ ফেরানাে দায়। রূপের আভায় চোখ ঝলসে দেয়।
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তারা বেলাভূমিতে হাসাহাসি করল, গান গাইল, নাচল—আরও কত কী যে ছলাকলা করলে বলে বুঝানাে যাবে না।
ঘণ্টা খানেক পরে তারা আবার বিচিত্র ভঙ্গিতে হেঁটে সমুদ্রে নামল, শুরু হ’ল জলকেলি। সে-ও এক মনােরম দৃশ্য।
বনের দিকে চোখ ফেরাতেই আর এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠল। বনের গাছগুলি যেন প্রতি মুহুর্তেই লাফিয়ে লাফিয়ে লম্বা হয়ে যাচ্ছে। অচিরেই তারা চাদ পর্যন্ত পৌছে যাবে। চাদকে ঢেকে ফেলবে। এক সময় গাছের ছায়া তাদের গায়ে এসে পড়ায় তারা সচকিত হয়ে সােজা ভাবে, একেবারে মেরুদণ্ড সােজা করে বসে পড়ল। এতক্ষণ সাগর কন্যাদের নাচের মধ্যে ডুবে ছিলেন। এদিকে কিছুমাত্রও খেয়াল ছিল না। আবার কোন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মুখােমুখি হতে হবে আশঙ্কায় তারা আবার পায়ে ফুলের রস মেখে নিলেন।
এবার অ্যাফান ও রাজা বুলুকিয়া সপ্তম সমুদ্রে নামলেন।
সপ্তম সমুদ্রেই তাদের বেশী সময় লেগে গেল। পায়ের তলায় ফুলের রস। অতএব শােয়া বা বসার প্রশ্নই ওঠে না। এক নাগাড়ে দু' মাস হাঁটাহাঁটি করে তারা শেষ পর্যন্ত একটি দ্বীপে এসে পৌছলেন।
মহাপণ্ডিত অ্যাফান ও রাজা বুলুকিয়া তাদের বহু বাঞ্ছিত দ্বীপের মাটিতে পা রাখলেন। দীর্ঘ পথশ্রমের ক্লান্তি তাদের মুখ থেকে মুহূর্তে মুছে গিয়ে ফুটে উঠল হাসির ঝিলিক।
নথিটিতে দ্বীপটির যে-বর্ণনা দেয়া আছে দ্বীপটি অবিকল সে রকমই বটে। এই সপ্ত সমুদ্রের দ্বীপ। এখানকার পবিত্র ভূমিতে মহাধার্মিক সুলেমান-এর দেহ সমাধিস্থ করা হয়েছে। চির শান্তিতে তিনি শায়িত। আর তার আঙুলে রয়েছে সে বহু আকাঙিক্ষত আঙটিটি।
দ্বীপের পবিত্র মাটিতে তারা পদস্পর্শ করলেন। ভারী সুন্দর দ্বীপটির শােভা। দ্বীপ জুড়ে ফুল আর ফলের গাছ। গাছে গাছে অসংখ্য ফুল ফুটে রয়েছে। ফলগুলিও দেখতে খুবই মনলােভা। চোখ জুড়িয়ে যায়। বনের গায়েই ছােট্ট একটি পাহাড়। পাহাড়ের গা-বেয়ে নেমে এসেছে চমৎকার একটি ঝর্ণা।
দীর্ঘ ছ’ মাস সমুদ্র পথ পাড়ি দিয়ে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। কাঁচা মাছের সাহায্যে উদর পূর্তি করেছেন। ফলে হাতের কাছে এমন স্বচ্ছ মিষ্টি জল আর গাছে গাছে ঝুলে থাকা পাকা ফল দেখে। তাদের পক্ষে লােভ সম্বরণ করা সম্ভব হল না।।
বুলুকিয়া হাত বাড়িয়ে একটি পাকা আপেল ছিড়তে গেলেন। ব্যস, মুহূর্তে ঘটে গেল এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড। বিশালাকৃতি এক দৈত্য অতর্কিতে তার সামনে এসে দাঁড়াল। বাজখাই গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “খবরদার গাছে হাত দিলে দু টুকরাে করে ফেলব।'
বুলুকিয়া সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু গেড়ে বসে করজোড়ে নিবেদন করলেন—“প্রভু দৈত্যরাজ, আমার প্রতি মুখ তুলে তাকান। আমরা দু’টি প্রাণী ক্ষিদে-তেষ্টায় মরণাপন্ন। আপনি আমাদের এ-আপেল খেতে বারণ করছেন কেন?
–‘শােন তােমরা যদি ভুলে গিয়ে থাক তবে আমার কি-ই বা করার আছে, বল? তােমরা মানব সন্তান। তােমাদের আদি পিতা আদম আল্লাহর নিষেধ অগ্রাহ্য করে আপেল খেয়েছিল, মনে নেই তােমাদের ? তােমরা তাে আবার আল্লাহকে মান না। তার বিরুদ্ধে যখন তখন বিদ্রোহে সােচ্চার হয়ে ওঠ। তাই আমি সর্বক্ষণ এ গাছটিকে আগলে রাখি। আমি একে কর্তব্য বলেই মনে করি। এ
 গাছের ফলে কেউ হাত দিলে আমি তাকে সঙ্গে সঙ্গে দু' টুকরাে করে ফেলি।
–‘অপরাধ নেবেন না দৈত্যরাজ। আমাদের খিদে মেটাবার উপায় কিছু তাে বলে দিন।
–এখান থেকে পালাও। এতবড় দ্বীপ, খুঁজে দেখ গে—খাবারের অভাব হবে না। কিন্তু এ-গাছের ফল অবশ্যই পাবে না।
অ্যাফান আর বুলুকিয়া দৈত্যের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবার হাঁটতে লাগলেন। হাঁটতে হাঁটতে দ্বীপের ভেতরের দিকে এগােতে লাগলেন। পথের ধারে বহু ফলগাছ। পেট পুরে ফল খেলেন। পাকা ফল আর ঝর্ণার জল দিয়ে শরীরকে একটু চাঙা করে আবার হাঁটা জুড়লেন। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় তারা একটি গুহার সামনে হাজির হলেন। মহাধার্মিক সুলেমান-এর কবর এখানেই রয়েছে। তারা গুটি গুটি গুহাটির মধ্যে ঢুকে গেলেন। তারা যতই এগােচ্ছেন গুহাটির জ্যোতি ততই বাড়ছে। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তারা হেঁটেই চলেছেন। এ কী ব্যাপার, গুহাটির কি শেষ বলে কিছু নেই!
আরও কিছুটা পথ হেঁটে তারা বিশালায়তন একটি ঘরে প্রবেশ করলেন। পুরাে ঘরটিই যেন কেবলমাত্র হীরা দিয়ে তৈরি। হীরা কেটে কেটে ব্যবহার করা হয়েছে। দেয়াল, ছাদ ও মেঝে সব দিক থেকেই অত্যুজ্জ্বল জ্যোতি বেরােচ্ছে। তারা ধীর পায়ে ঘরে ঢুকে গেলেন। আশ্চর্য ব্যাপার। তাদের মনে কোনরকম বােধ নেই, কোন অনুভূতিও নেই। ঘরটির কেন্দ্রস্থলে সুদৃশ্য একটি সােনার পালঙ্কে ডেভিড-এর পুত্র সুলেমান শায়িত। তার গায়ে সবুজ মুক্তার জামা। তার সর্বাঙ্গ (থকে এক অভাবনীয় অত্যুজ্জ্বল জ্যোতি বেরােচ্ছে। দিব্য জ্যোতি। চিরনিদ্রায় শায়িত সুলেমান-এর ডান হাতের তর্জনিতে রাজা বলকিয়ার বহু আকাঙিক্ষত সে-যাদু আঙটির দ্যতি। সুলেমান-এর আঙটি পরা হাতটি তার বুকের ওপর অদ্ভুত ভঙ্গিতে রাখা আছে। আর বাঁ-হাতটি সামান্য প্রসারিত। হাতে শােভা পাচ্ছে রাজদণ্ড। তার মাথায় একটি চুনি জ্বলজ্বল করছে।
অ্যাফান আর বুলুকিয়া বিস্ময়বিমূঢ় অবস্থায় বহু সময় ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। নিশ্চল-নিথর তাদের দেহ, চোখের পলক পর্যন্ত পড়ছে না। কতক্ষণ যে তারা এখানে, এভাবে দাঁড়িয়ে, তারাই জানেন না। হয়ত পর পর কয়েকটি দিন-রাত্রিই পেরিয়ে গেছে। অ্যাফান এগােতে সাহস পেলেন না। বুলুকিয়া এক সময় অ্যাফান-এর কানের কাছে মুখ দিয়ে অনুচ্চকণ্ঠে বললেন—'অনেক ঝড় ঝাপ্টা সহ্য করে, অনেক বিপদ তুচ্ছ করে, হাজারাে ফাড়া কাটিয়ে আমরা এখানে আসতে পেরেছি। এত কাছে এসে, একটুর জন্য ফিরে যাব? অসম্ভব। অ্যাফান জিজ্ঞাসুদৃষ্টি মেলে তার মুখের দিকে তাকালেন।
বুলুকিয়া বলে চললেন——‘মুখের আতঙ্কের ছাপটুকু দেখেই আমি আপনার মনের অবস্থা সম্বন্ধে অনুমান করে নিতে পারছি। ঠিক আছে, ঠিক আছে আপনি এখানেই অপেক্ষা করুন। আমি একাই এগিয়ে যাচ্ছি। আপনাকে যে মােহিনী মন্ত্রটি শিখিয়ে দিয়েছিলাম, মনে আছে তাে?' অ্যাফান নীরবে ঘাড় কাৎ করে প্রশ্নের উত্তর দিলেন। 
বুলুকিয়া এবার বললেন—“আমি যখন আংটিটি খুলতে শুরু করব তখন আপনি সে-মােহিনী মন্ত্রটি অনুচ্চ কণ্ঠে আবৃত্তি করবেন। খবরদার, উচ্চারণ যেন মােটেই ভুল না হয় মনে থাকবে তাে?
অ্যাফান এবারও মৌন থেকেই ঘাড় কাৎ করলেন। বুলুকিয়া এবার সিংহাসনের দিকে এগােবার জন্য পা-বাড়াতে যাবেন অমনি অ্যাফান তার হাত চেপে ধরলেন। বললেন—“আমি যাচ্ছি, আপনি বরং মােহিনী মন্ত্রটি পাঠ করুন। অ্যাফান এবার মহাপুরুষের সিংহাসনটির দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে চললেন, এদিকে বুলুকিয়া অনুচ্চ কণ্ঠে হলেও স্পষ্ট উচ্চারণ করে করে মােহিনী মন্ত্রটি পাঠ করতে লাগলেন। সিংহাসনটির একেবারে গা-ঘেঁষে তিনি দাঁড়ালেন ! বুকের মধ্যে কে যেন অনবরত হাতুড়ি পিটে চলেছে। এবার কাঁপা কাঁপা হাত দুটো বাড়িয়ে মহাপুরুষ সুলেমান-এর আঙুলটি ছুঁলেন। ধীরে ধীরে চাপ প্রয়ােগ করলেন। আংটিটি খােলার জন্য বার বার চেষ্টা করতে লাগলেন। এদিকে রাজা বুলুকিয়া আতঙ্কে রীতিমত কাপতে লাগলেন, অভাবনীয় এক আতঙ্ক তার মধ্যে ভর করেছে। আতঙ্কে মােহিনী মন্ত্র পাঠ করতে গিয়ে গুলিয়ে ফেললেন, একেবারেই উল্টো পাল্টা হয়ে গেল। আগে শক্তমন্ত্র এবং পরে আহ্বান মন্ত্র বলার কথা। কিন্তু ঘাবড়ে গিয়ে তিনি আহ্বানমন্ত্র বলে ফেলেন আগে। এ ভুল মারাত্মক। এ ভুল ভয়ঙ্কর, সঙ্গে সঙ্গে ভুলের ফলও পাওয়া গেল। এরই ফলে ঘরটির ছাদ থেকে এক ফোটা তরল হীরা বৃদ্ধ অ্যাফানএর ঠিক ব্রহ্মতালুতে পড়ল। ব্যস, তার সর্বাঙ্গ দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। সে কী আগুন! মুহুর্তে তার শরীরটি ভস্মে পরিণত হয়ে গেল। ছাইটুকু মহাত্মা সুলেমান-এর পায়ের কাছে পড়ে রইল।
বুলুকিয়া হঠাৎ যেন সম্বিৎ ফিরে পেলেন। কঁপা কাঁপা গলায় উচ্চারণ করতে লাগলেন-“ছিঃ ছিঃ এ কী পাপ কাজ করতে এসেছি আমি। লােভের বশীভূত হয়ে আমি শেষ পর্যন্ত দেবতার ঘরে ডাকাতি করতে এসেছি। এ পাপ আমি কোথায় রাখব।' নিজের প্রতি ধিক্কার দিতে দিতে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার জন্য বুলুকিয়া পিছন ফিরলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে বৃদ্ধ অ্যাফান-এর ভস্মরাশির দিকে মুহুর্তের জন্য তাকালেন। শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন। এবার উন্মাদের মত দৌড়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। বুলুকিয়া উর্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে সমুদ্রের ধারে এসে দাঁড়ালেন। কিন্তু এখন উপায়! সে দৈব রস কোথায় পাবেন? রসভর্তি পাত্রটি তাে অ্যাফান-এর হাতে ছিল। সে তাে সেটি নিয়েই মহাত্মা সুলেমান-এর পালঙ্কের কাছে গিয়েছিলেন। তার নশ্বর দেহের সঙ্গে রসের ভাণ্ডটিও তাে ভস্মীভূত হয়ে গেছে। তিনি দিগন্ত বিস্তৃত উত্তাল উদ্দাম সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আতঙ্ক ও হতাশায় উন্মাদের মত চেঁচিয়ে উঠলেন--'হায়! আমার বরাতে এ-ও ছিল!'
এমন সময় ভাের হয়ে এল, বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ উনষাটতম রজনী
রাত্রি একটু গভীর হতেই বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদএর কামরায় এলেন। বেগম কিসসা শুরু করলেন—“জাহাপনা, রাজা বুলুকিয়া সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে উন্মাদের মত আর্তনাদ করতে লাগলেন। দুঃখে ও হতাশায় নিজের চুল ছিড়তে লাগলেন।
রাণী যমলিকা কি বলতে গিয়ে এবার বললেন—“আমি তাকে অনেক করে বারণ করেছিলাম এমন দুঃসাহসিক অভিযানের পথে পা না বাড়াতে। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দেবেই। সে যে যাবেই। তাকে যে যেতেই হবে। 
বুলুকিয়ার বিপদের কথা আর বলার নয়। তিনি একা, একেবারেই নিঃসঙ্গ। চোখের জল ফেলে ফেলে একা নির্জননিরালা দ্বীপে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। লােভে পাপের সঞ্চার হয়, আর পাপই মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে। বুলুকিয়ার পরিস্থিতি এখন এরকমই হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক সময় ধূলাের ঝড় উঠল। ধূলােয় সমস্ত দ্বীপটিই যেন মুহূর্তে ঢাকা পড়ে গেল। বুলুকিয়া ঝড়ের মধ্যে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়লেন। ঝড়ের শোঁ-শোঁ শব্দের সঙ্গে কোলাহল শােনা গেল। বজ্রপাত হলেও বুঝি এত জোরে শব্দ হয় না। বর্শা, তরবারি, ঢাল প্রভৃতির শব্দ আর্তনাদের মত তার কানে ভেসে এল। আতঙ্কে সে থরথরিয়ে কাঁপতে লাগল।
ধুলাের ঝড় থেমে গেল। হঠাৎ অগণিত আফ্রিদি দৈত্য, জিন ও প্রেতাত্মারা মাটি খুঁড়ে উঠতে লাগল। বিকট আর্তনাদ শুরু করা দিল সবাই মিলে। ঠিক যেন নরকপুরীতে বুলুকিয়া দাঁড়িয়ে। তিনি দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করলেন। পারলেন না। কোন্ অদৃশ্য শক্তি যেন তার পা দুটোকে মাটির সঙ্গে শক্ত করে আটকে দিয়েছে। ঠিক সে মুহুর্তেই বিকট দর্শন কে একজন এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল। অপার্থিবদের দলের পাণ্ডা। সে জিজ্ঞাসা করল—“তুই কে? আমরা বছরে একবার করে মহাত্মা ডেভিড-এর পুত্র সুলেমান-এর সমাধিক্ষেত্র দেখতে আসি। কিন্তু তুই কে? কি করেই বা এখানে এলি ?
ভীত সন্ত্রস্ত বুলুকিয়া বার কয়েক ঢােক গিলে কাঁপা কাঁপা গলায় কোনরকমে উচ্চারণ করলেন—‘অপার্থিব দলের প্রধান, আমার নাম বুলুকিয়া। বানু ইজরায়েলের শাসক আমি। সমুদ্রযাত্রা করতে গিয়ে পথ ভুল করে এখানে হাজির হয়েছি।
—হুম্! তাই বুঝি? পথ ভুল করে এখানে এসে পড়েছিস?”
–হ্যা, ঠিক তা-ই। কিন্তু আপনি কে? আপনার সঙ্গে অন্যান্যরাই বা কারা ?
—“আমরা? আমরা নিজেদের জান বিন জান-এর উত্তরসূরি বলে মনে করি, সাঘর আমাদের রাজা। প্রবল পরাক্রান্ত রাজা তিনি। তার রাজ্য থেকে এখানে এসেছি। সাঘর শ্বেতভূমির রাজা, কোন এক সময় আদ্-এর ছেলে সাদ্দাদ সে-দেশ শাসন করতেন।
‘সাঘর -এর শ্বেতভূমি কোথায়, কোন দিকে দয়া করে বলবেন কি?
—সে রাজ্যটা কাফ পাহাড়ের পিছনে অবস্থিত। এখান থেকে পঁচাত্তর মাস ধরে এক নাগাড়ে হেঁটে তবে কোন মানুষ সেখানে পৌছতে পারে। আর আমরা? চোখের পলকে সেখানে পৌছে যেতে পারি।
–তাই বুঝি? আমার মত মানুষের পঁচাত্তর মাস
—“হ্যা। তবে তােমার কথা স্বতন্ত্র। তুমি একজন রাজার ছেলে রাজা। তুমি যদি যেতে চাও তবে তােমাকে আমরা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারি।'
—“কিন্তু আমি তাে আপনাদের মত বাতাসের কাধে ভর দিয়ে পথ পাড়ি দিতে পারব না। তবে কি করে আমাকে আপনাদের সঙ্গে নিয়ে যাবেন?
–কেন? আমাদের কেউ তােমাকে পিঠে করে বইবে। আগে তুমি মনস্থির কর আমাদের সঙ্গে যেতে আগ্রহী কি না?' 
বুলুকিয়া তাে এক পায়ে খাড়া। এমন সুযােগ কোন পাগলেও তাে হাতছাড়া করবে না। দৈত্যরাজকে বললাম—“আপনি দয়া করে ব্যবস্থা করে দিলে আমি অবশ্যই আপনাদের রাজাকে দেখতে যাব।
( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments