আরব্য রজনী পার্ট ১১২ ( Arabya Rajani 112)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
তখনও কোন কোন ঘরে কিছু জিনিস রয়ে গেছে। এক এক করে নিয়ে আসা হচ্ছে। রাজকর্মচারীরা একটি ঘরে দুটো পাথরের থামের ওপর একটি সিন্দুক দেখতে পেল। আবলুশ কাঠের তৈরি। সিন্দুকের ডালা উঁচু করতেই একটি সােনার বাক্স তাদের নজরে পড়ল।
রাজকর্মচারীদের মনে সিন্দুকের সােনার বাক্সটির ব্যাপারে কৌতূহল হ’ল। তারা রাজাকে খবর দিল।
রাজা বুলুকিয়া খবর পেয়ে সে-ঘরে ছুটে এলেন। রাজার নির্দেশে সােনার বাক্সটির ঢাকনা খােলা হ’ল। বাক্সের ভেতরে চোখ বুলাতেই একটি সােনার পুঁথি নজরে পড়ল।
রাজা কৌতুহল বশতঃ পুঁথিটি বের করলেন। পাতা ওল্টাতেই চোখের সামনে ভেসে উঠল গ্রীক ভাষায় লেখা কয়েকটি ছত্র।

তাতে লেখা ছিল—যে জন মানুষ, জিন, পশু, পাখির রাজা ও প্রভু হতে চান তাকে একটি আঙটি পরতে হবে। ধর্মপ্রচারক সুলেমান এ আংটি পরেছিলেন। এখন তিনি সাত-সাগরের তীরে সমাধিস্থ। তার আঙুলে আটিটি এখনও রয়েছে।
এ-দৈব আঙটিটি আদি পুরুষ আদম বেহেস্তে পরতেন। বেহেস্ত থেকে তার পতন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি এটি ব্যবহার করেছেন।
আদম-এর কাছ থেকে দেবদূত গ্যাব্রিয়েল এটি পেয়েছিলেন। তারপর তিনি এটি মহাধার্মিক সুলেমানকে দিয়েছিলেন। সাত সমুদ্রের পার থেকে নির্দিষ্ট দ্বীপে যাওয়ার ক্ষমতা কোন নৌকোরই নেই। এক রকম যাদু-বৃক্ষরস আছে যা পায়ে মাখলে অনায়াসে সমুদ্র পার হওয়া যেতে পারে। কিন্তু বৃক্ষরসটি সহজে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। পাতালপুরীতে রানী যমলিকা রাজত্ব করেন। তার সাম্রাজ্যে এরকম গাছ জন্মায়। রানী ছাড়া অন্য কেউ এ-কথা জানেন না। রানী যমলিকা গাছ, লতা প্রভৃতির ভাষা বুঝতে পারেন। অতএব যে ব্যক্তি এ-দৈবজ্ঞ আংটিটি সংগ্রহ করতে আগ্রহী তাকে পাতালপুরী রানী যমলিকার রাজ্যে যেতে হবে।
এ-আঙটি যে জন হস্তগত করতে পারবেন তিনি কেবলমাত্র মানব জাতিরই নয় পশু-পাখির ওপরও প্রভুত্ব করবেন। তারপর যবনিকা প্রদেশে উপস্থিত হয়ে অমৃত পান করতে পারবেন। অমৃতপানে কেবলমাত্র যে অমরত্ব লাভ করা যায় তা-ই নয়, রূপযৌবনও তার দেহে স্থায়ী আসন গ্রহণ করবেন। 
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
       তিন শ’ ছাপ্পান্নতম রজনী 
রাত্রি গভীর হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসা শুরু করতে গিয়ে বলেন—‘জাহাপনা, পুঁথির বক্তব্য পাঠ করে রাজা বুলুকিয়া তার রাজ্যের বড় বড় পণ্ডিত, মেীলী, দরবেশ আর জাদুকরদের ডেকে পাঠান। রাজ দরবারে জরুরী সভা বসল। রাজা পুথির বক্তব্যের কথা গােপন রেখে উপস্থিত জ্ঞানী গুণীজনদের উদ্দেশ্যে বললেন- “আপনাদের মধ্যে এমন কি কেউ আছেন কি যিনি আমাকে পাতালপুরীতে রানী যমলিকা-র রাজ্যে পৌছে দিতে পারেন?
রাজার বাসনার কথা শুনে উপস্থিত সবাই মহাপণ্ডিত অ্যাফান এর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন। যাদুবিদ্যাও তার রপ্ত রয়েছে। জ্যামিতি ও মহাকাশ বিজ্ঞানেও তার যথেষ্ট দখল।
রাজার অনুরােধে মহাপণ্ডিত অ্যাফান সম্মত হলেন, তাকে রানী যমলিকার প্রাসাদে পোঁছে দেবেন।
রাজা বুলুকিয়া পরিব্রাজকের পােশাকে নিজেকে সজ্জিত করে তুললেন। রাজ্য রক্ষার দায়িত্ব বর্তাল বৃদ্ধ উজিরের উপর।
অ্যাফান রাজাকে নিয়ে পথ পাড়ি দিতে দিতে এক বিস্তীর্ণ প্রান্তরে উপস্থিত হলেন। তিনি বললেন—'এবার আমাদের যাদুবিদ্যার সাহায্যে বাঞ্ছিত পথ খুঁজে নিতে হবে। বৃদ্ধ পণ্ডিত অ্যাফান এবার নিজের চারদিকে একটি গণ্ডি আকলেন। ঠোট কাপিয়ে, অনুচ্চকণ্ঠে কি সব মন্ত্র আওড়ালেন। মন্ত্র পাঠ শেষ হতে না হতেই একটি পাতালে যাওয়ার পথ বেরিয়ে গেল।
অ্যাফান এবার বললেন--“মহারাজ, এ-পথে দু' জন তাে এক সাথে যেতে পারে না। চেষ্টা করে দেখি, পথটিকে যদি প্রশস্ত করা যায়।  
বৃদ্ধ পণ্ডিত এবার পাতালপুরীর পথটির চারদিকে গণ্ডী কেটে আবার মন্ত্র আওড়ানাে শুরু করলেন। অবিশ্বাস্য তার মন্ত্রের গুণ। মুহূর্তে পথটি বেশ প্রশস্ত হয়ে গেল। বৃদ্ধ পণ্ডিত এবার রাজাকে নিয়ে পাতাল পুরীতে হাজির হলেন। হাঁটতে হাঁটতে এ-সরােবরটির ধারে গিয়ে উভয়ে দাঁড়ালেন।
আমি মহাপণ্ডিত অ্যাফান এবং রাজা বুলুকিয়া'কে সাদর অভ্যর্থনা জানালাম।
তারা তাদের আমার সাম্রাজ্যে আসার উদ্দেশ্যের কথা আমাকে জানালেন। হাসিব তুমি তাে একটু আগে নিজের চোখেই দেখেছ, চারটি সর্পকন্যা একটি অতিকায় গামলায় আমাকে বহন করে এখানে নিয়ে এসেছে। আমি তাদের সেদিন এভাবেই পান্না পাহাড়ে এনেছিলাম। পথের ধারের গাছগাছালি তাদের সঙ্গে কত কথাই না বলেছিল।
আমরা একটি ঝােপের ধার দিয়ে যাবার সময় থােকা থােকা লাল ফুল নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল, আমাদের রস কী চমৎকার! এ রস পায়ে মেখে মানুষ অনায়াসে সাগর পাড়ি দিতে পারে। আমি মুচকি হেসে অতিথিদের বললাম—এটিই আপনাদের বাঞ্ছিত গাছ। প্রয়ােজনমত এর রস সংগ্রহ করে নিন।
মহাপণ্ডিত অ্যাফান ব্যস্ত-হাতে সে-গাছের রস নিঙরে একটি পাত্র ভর্তি করলেন। আমি বললাম-“মহাজ্ঞানী অ্যাফান, দয়া করে বলবেন কি, এরস আপনাদের কোন্ মহৎ কাজে লাগবে?
        অ্যাফান বললেন-“মহামান্যা রানী সাত সমুদ্রের ধারে একটি দ্বীপ রয়েছে। সেখানে মহাধার্মিক সুলেমান-এর কবর। তার হাতে একটি আঙটি রয়েছে যেটি আমাদের একান্ত বাঞ্ছনীয়। সে দৈব আঙটিটির অবিশ্বাস্য ক্ষমতা বলেই তিনি সমস্ত জীবজগতের ওপর প্রভুত্ব স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
আমি চোখ দুটি কপালে তুলে সবিস্ময়ে বলে উঠলাম অসম্ভব। সুলেমান-এর আংটি আজ পর্যন্ত কেউ পরতে পারে নি, ভবিষ্যতেও পারবে না। আপনারা এরকম বাঞ্ছা মন থেকে মুছে ফেলুন।
পণ্ডিত অ্যাফান নীরবে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। 
রানী এবার বুলুকিয়ার দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বললেন—তুমি এ কী পাগলের খেলায় মেতেছ? তােমার এই তাে বয়স। সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, মন থেকে এরকম অসম্ভব পরিকল্পনা মুছে ফেল।
রানীর কথায় রাজা বুলুকিয়ার মুখে হতাশার ছাপ ফুটে উঠল।
রানী তাঁকে প্রবােধ দিতে গিয়ে বললেন-হ্যা, তুমি মন থেকে এরকম অসম্ভব পরিকল্পনা মুছে ফেল। আমি বরং তােমাকে একটি গাছ দেখিয়ে দিচ্ছি যার পাতার রস তােমাকে অনন্ত যৌবন দান করবে।
আমাকে অবাক করে দিয়ে তারা বাঞ্ছিত পাতার রস নিয়ে চলে গেল ।  
রানী এবার বললেন--শােন হাসিব, সাগরের ওপর দিয়ে তারা কিভাবে দুঃসাহসিক অভিযানে প্রবৃত্ত হয়েছিল তা তােমায় ব্যক্ত করছি, শােন মহাপণ্ডিত অ্যাফান রাজা বুলুকিয়া'কে নিয়ে স্বদেশে ফিরে গেলেন। তারপর সে-ফুল ও পাতার রসের পাত্রটি হাতে নিয়ে সমুদ্রের ধারে এসে দাঁড়ালেন। সে-রস আচ্ছা করে পায়ে মাখলেন। এবার সাগর পাড়ি দেবার জন্য জলে নামলেন। হাঁটা শুরু করলেন। মহানন্দ। হবে না-ই বা কেন? অথৈ সমুদ্রের বুক দিয়ে দিব্যি পায়ে হেঁটে যেতে পারলে কার না খুশীতে মনে দোলা লাগে? এক সময় সাশ্রয় করার জন্য তারা দৌড় লাগালেন। তিন দিন আর তিন রাত্রি মহানন্দে কাটিয়ে তারা একটি চমৎকার দ্বীপে হাজির হলেন।
রাজা বুলুকিয়া কৌতূহলী চোখ মেলে চারদিকে মনলােভা দৃশ্য দেখতে দেখতে বললেন—এ-ই নিশ্চয়ই বেহেস্ত। আমরা এখন বেহেস্তেই অবস্থান করছি।' 
এমন সময় প্রাসাদ সংলগ্ন উদ্যানে পাখিদের আনাগােনা শুরু হয়ে গেল। বেগম শাহরাজাদ ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে কিস্সা বন্ধ করলেন।
        তিন শ’ সাতান্নতম রজনী 
সারাদিন রাজকার্যের মধ্যে লিপ্ত থাকার পর রাত্রে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, প্রকৃতিদেবী যেন দ্বীপটিকে নিজের মনের মত করে গড়ে তুলেছেন? রূপ, রস আর গন্ধ উজাড় করে তিনি দ্বীপটিতে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কোথাও কোনরকম কার্পণ্য করেন নি। পণ্ডিত অ্যাফান আর রাজা বুলুকিয়া দ্বীপটির এখানে-ওখানে ঘুরে ঘুরে মনােরম প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী দেখতে লাগলেন। এক সময় সূর্যদেব পশ্চিম-আকাশের গায়ে আশ্রয় নিল। আকাশের গায়ে রক্তিম ছােপ। তারই আভা দ্বীপটির ওপরে পড়ায় মনে হ’ল বাস্তবিকই তারা যেন স্বর্গরাজ্যেই বিচরণ করছেন।
এক সময় দ্বীপের বুকে শুরু হয়ে গেল আলাে-আঁধারীর খেলা। তারপরই নেমে এল সন্ধ্যার অন্ধকার।
এবার পণ্ডিত অ্যাফান যেন সম্বিৎ ফিরে পেলেন। অজানা অচেনা দ্বীপ। কোথায় কোন বিপদ ওৎ পেতে রয়েছে, কে বলতে পারে।
উপায়ান্তর না দেখে বৃদ্ধ পণ্ডিত অ্যাফান রাজা বুলুকিয়াকে নিয়ে একটি উঁচু গাছে উঠে পড়লেন। গাছের মােটা ডালের সঙ্গে উভয়ের দেহ শক্ত লতা দিয়ে জড়িয়ে নিলেন। নইলে ঝিমিয়ে পড়ে গেলে কম্ম একেবারে ফতে হয়ে যাবে।
রাত্রি একটু গভীর হতে না হতেই ক্লান্তিতে তাদের চোখের পাতা বন্ধ হয়ে এল। এমন সময় আচমকা বিকট একটি আওয়াজ কানে যেতেই তারা সচকিত হয়ে উঠলেন। গাছের গােড়া থেকে বিকট আওয়াজটি ভেসে আসছে। এবার তারা বুঝতে পারল দ্বীপটির নিচ থেকে কে প্রচণ্ড জোরে পুরাে দ্বীপটিকেই বার বার ঝাকুনি দিচ্ছে। সমুদ্রের বুক থেকে বুঝি বিশাল দেহী কোন দৈত্য উঠে আসছে। অতিকায় একটি পাথর তার মুখে। অগ্নিপিণ্ড দাউ দাউ হাউ হাউ করে জ্বলছে। তারই আলােকচ্ছটায় সম্পূর্ণ দ্বীপটিতে আলাে ছড়িয়ে পড়ল। একেবারে আলােয় আলােয় আলােময় হয়ে উঠেছে।  না, একটি দৈত্য নয়। তার পিছন পিছন আরও কয়েকটি দৈত্য একই রকম জ্বলন্ত পাথর মুখে নিয়ে ওপরে উঠে এল।
দৈত্যরা দ্বীপে উঠে আসতে না আসতে অগণিত হাতী, সিংহ, বাঘ, নেকড়ে আর হায়না প্রভৃতি পশু তাদের কাছে আনন্দে ছুটে এল। সারা রাত্রি দৈত্য ও পশুরা মিলে দ্বীপটি তােলপাড় করে আনন্দ করল। সকাল হতে না হতেই প্রথমে দৈত্যরা চলে গেল তাদের নিশ্চিন্ত আশ্রয়স্থল সমুদ্রের অতল গহূরে। আর পশুরা গভীর বনের দিকে পা বাড়াল।
এরকম একটি অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখে অ্যাফান আর বুলুকিয়া-র পিলে চমকে উঠল। তারা সুড় সুড় করে গাছ থেকে নেমে ব্যস্তহাতে সে-ফুলের রস পায়ে মাখতে লাগলেন। ওরে ব্বাস! যমের দক্ষিণ দুয়ারে আর এক মুহূর্তও নয়।
তারা আবার সমুদ্রে নামলেন। দ্রুতপায়ে হেঁটে দ্বিতীয় সমুদ্র অতিক্রম করতে লাগলেন। _ হাঁটতে হাঁটতে তারা সুউচ্চ পর্বতের কাছে এসে উপস্থিত হলেন। ছােট বড় নুড়ি পাথরে পূর্ণ একটি উপত্যকা তাদের নজরে পড়ল। পাথরগুলি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ধরনের।
উপত্যকায় শুটকি মাছের ছড়াছড়ি। জোয়ারের সময় সমুদ্রের জলের সঙ্গে মাছ ভেসে এসে আর ফিরে যেতে পারে নি। তারা শুটকি মাছ খেয়ে দিন কাটালেন।
দুপুর গড়িয়ে বিকাল হ'ল। ক্রমে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এল উপত্যকা জুড়ে। অ্যাফান আর বুলুকিয়া পাশাপাশি দুটো প্রায় সমতল পাথরের চাই বেছে নিলেন। ইচ্ছা, এঁদের ওপরে শুয়ে বসে কোনরকমে রাত্রি কাটিয়ে দেবেন।
তারা পাথরের চাই দুটোতে বসতে না বসতেই অকস্মাৎ এক বিকট গর্জন তাদের কানে এল। সে কী গর্জন পিলে চমকে দিল। তারা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন, অতিকায় একটি বাঘ গর্জন করতে করতে তাদের দিকে এগােচ্ছে। দৌড়ে পালাবার জো নেই। উপায়ান্তর না দেখে পায়ের তলায় ফুলের রস বুলিয়ে উভয়ে সমুদ্রে ঝাপিয়ে পড়লেন। এরকম একটি অদ্ভুত দৃশ্য দেখে বাঘ বাবাজীর তাে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার উপক্রম। সে ভাবল, এ আবার কেমন ভূতুড়ে কাণ্ড রে বাবা! তার বুকের ভেতরে ফুসফুস নাচানাচি শুরু করে দিল। আর দেরী নয়। সে পিছন ফিরে, লেজ গুটিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। অ্যাফান ও বুলুকিয়া এবার তৃতীয় সমুদ্র পাড়ি দিয়ে চলেছে। এক সময় ঈশান কোণে কালাে মেঘ দেখা দিল। পর মুহুর্তেই উঠল ভীষণ ঝড়। ঝড়ের সে কী বেগ! তাদের বুঝি উড়িয়ে নিয়ে গিয়েই ফেলবে। সমুদ্র পাগলা হাতির মত ক্ষেপে উঠল। অতিকষ্টে তারা সমুদ্রের ওপর দিয়ে হেঁটে পথ পাড়ি দিতে লাগল। তীব্র ঝড় আর সমুদ্রের অনবরত আস্ফালনকে অগ্রাহ্য করে কতক্ষণ পথ চলা সম্ভব।
বহু কষ্টে পথ পাড়ি দিয়ে শেষ রাত্রে তারা এসে পৌছল সুন্দর একটি দ্বীপে। পাড়ে পৌছে সমুদ্রের ধারের একটি ঝাকড়া গাছের তলায় তারা শুয়ে পড়ল। ফুরফুরে বাতাসে ঘুমিয়ে পড়ল। যখন ঘুম ভাঙল তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে। সূর্য গুটিগুটি আকাশের গা-বেয়ে অনেক ওপরেই উঠে গেছে। তারা ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে হাঁটতে বনের দিকে গেল। গাছে গাছে রঙ-বেরঙের পাকা ফল ঝুলছে। শুকনো একটি ডাল দিয়ে আঘাত করে কিছু পাকা ফল পেড়ে তারা গলা পর্যন্ত ঠেসে খেয়ে নিল। ফলগুলি খুবই মিষ্ট ও সুস্বাদু।
ফলগুলি সত্যি অদ্ভুত চরিত্রের। চিনির আধিক্যের জন্য তাদের প্রত্যেকটির বাইরে মিছরির মত শর্করা জমাট বেঁধে রয়েছে। রাজা বুলুকিয়া এমন অদ্ভুত চরিত্রের ফলগুলি দেখে আনন্দে নাচানাচি শুরু করে দিলেন। তিনি অ্যাফান’কে বললেন—এমন বিচিত্র আকৃতি ও রঙ বিশিষ্ট ফলের রাজ্য ছেড়ে যেতে মন সরছে না । এখানে আর কদিন থেকে গেলে কেমন হয়, বলুন তাে? ফলের লােভের ফাঁদে পড়ে রাজা বুলুকিয়া হাবুডুবু খাচ্ছেন দেখে অ্যাফান হেসে ফেললেন। হাসতে হাসতেই বললেন—‘বেশ তো দিন দশেক থেকে প্রত্যেকটি ফলের স্বাদ গ্রহণ করে তবেই না হয় এ-দ্বীপ ছেড়ে যাত্রা করা যাবে। তারা সেখানে রয়েই গেল। দশম দিন সকালে তারা আবার পায়ে ফুলের রস মাখতে শুরু করল।
এবার তারা চতুর্থ সাগরে নামলেন। আবার শুরু হ’ল অবিশ্রান্ত হাঁটা এক নাগাড়ে চারদিন চাররাত্রি পর তারা ছােট একটি দ্বীপে এসে থামলেন। পুরাে দ্বীপটি জুড়ে কেবলই সাদা বালি। চারদিক শুধুই বালি আর বালি। বিভিন্ন জাতের সরীসৃপের আড্ডা এখানে। তারা বালির নিচে বাসা করে থাকে।
সরীসৃপগুলাে ডিম পাড়ার জন্য বাইরে বেরিয়ে আসে। সূর্যের আলােয় ডিম পাড়ে। তারা ডিমে তা দিতে দিতে রােদ পােহায়। গাছের চিহ্নমাত্রও নেই। একে থাকা-খাওয়ার সুখ আদৌ নেই। তার ওপর সরীসৃপের কামড়ে প্রাণ সংশয়ের সম্ভাবনা। বাধ্য হয়ে তারা পায়ে ফুলের রস মাখতে লেগে গেলেন। সমুদ্র পেরিয়ে ডাঙায় পা দিলেই রসের গুণ নষ্ট হয়ে যায়।
তারা আবার সমুদ্রে নামলেন, এবার তারা এগিয়ে চলেছেন পঞ্চম সমুদ্রের ওপর দিয়ে। মাত্র একদিন-এক রাত্রে তারা পঞ্চম সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ফেললেন।
সকালে সূর্য ওঠার আগেই তারা অদ্ভুত একটি দ্বীপে উঠলেন। এখানে কেবল পাহাড় আর পাহাড়। পাহাড়গুলাের মাথায় জমাট বাঁধা সােনা। সূর্যের আলােয় ঝলমল করছে। পাহাড়ের পাদদেশে অসংখ্য গাছ। প্রায় প্রতিটি গাছে হলুদ রঙের ফুল। খুবই উজ্জ্বল তাদের রঙ। তারার মত অনবরত জ্বলে আর নেভে। পাহাড় আর অদ্ভুত চরিত্রের গাছগুলি দ্বীপটিকে যেন এক স্বপ্ন রাজ্যে পরিণত করেছে। এমন অকল্পনীয় সৌন্দর্য ইতিপূর্বে চোখে দেখা তাে দূরের কথা দেখতে পাবে বলে তারা স্বপ্নেও কোনদিন ভাবেন নি।
( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments