আরব্য রজনী পার্ট ৯৯ (Arabyarajani Part 99)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।

আলী ফর্সা লেড়কিটিকে বদরুন্নেসা বলে সম্বােধন করত। শোলা নামে সম্বােধন করত বাদামী রঙের লেড়কিটিকে। যে সুস্বাস্থ্যের অধিকারিণী সে-লেড়কিটিকে বদর-এ কামিল বলে সম্বােধন করত, একহারা চেহারার লেড়কিটির নাম দিয়েছিল বেহেস্তের হুরী। সােনালী যার গায়ের রঙ তার নাম মেহেরুন্নিসা আর কাজল সম্বােধন করত কুচকুচে কালাে লেড়কিটিকে। 

আলী বাগদাদে এসে স্থায়ী জীবনযাপনে উৎসাহী হ’ল। জায়গাটি তার পছন্দ মাফিকই হ’ল বটে। পছন্দ হওয়ার মত জায়গাই বটে। কারণ, তামাম দুনিয়ার আদমির মুখে মুখে তখন বাগদাদের নাম ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছে। সেখানকার বাতাস থেকে শুরু করে খানাপিনা পর্যন্ত সব কিছুতে আলাদা এক বৈশিষ্ট্য সবার নজর কাড়ত। দিলকে উতলা করে দিত। 
এক সকালে আলী তার ছয় বাদীকে কাছে ডাকল। উদ্দেশ্য তাদের নিয়ে এক সঙ্গে খানাপিনা গানাবাজনা আর রঙ্গতামাশা করে দিলটিকে একটু চাঙা করে নেবে।
আলীর তলব পেয়ে বাঁদীরা ছুটে এল। তার হুকুম তামিল করতে গিয়ে হাসি-মস্করা আর রঙ্গ-তামাশা শুরু করল সবাই মিলে। আলী তাদের রঙ্গরসে মজে গেল।
এক সময় আলী সরাবের পেয়ালা হাতে নিয়ে বদরুন্নেসার কাছে এসে বলল—“পিয়ারী, তােমার কণ্ঠের মধুঝরা গান শােনার জন্য আমার দিল বিলকুল অস্থির হয়ে উঠেছে। মনমৌজী এক গানা, শুরু কর যাতে আমাদের দিল সরাবের নেশার চেয়ে মশগুল হয়ে ওঠে।
বদরুন্নেসা মুচকি হেসে বলল —জাহাপনার যা হুকুম। কথা বলতে বলতে সে বীণাটি হাতে তুলে নিল।
খুবসুরৎ লেড়কি বদরুন্নেসার মিষ্টি মধুর কণ্ঠ আর চমৎকার গানায় আলীর মেজাজ শরিফ হয়ে উঠল।
গানা শেষ করে বদরুন্নেসা নতজানু হয়ে আলীকে কুর্ণিশ করল।
আলী বাস্তবিকই মহাখুশী হ’ল। মেজাজ রীতিমত শরিফ। গানা শেষ হলেও গানার কথা ও সুর তার কানের মধ্যে প্রতিনিয়ত ধ্বনিত হতে লাগল। এ যেন অকথিত এক অনুভূতি। বােঝা যায় বটে, বােঝানাে যায় না কাউকে।
আলী সরাবের পেয়ালাটিতে ছােট্ট করে একটি চুমুক দিল। তারপর সেটিকে লেড়কিটির দিকে এগিয়ে দিল।
লেড়কিটি তার হাত থেকে পেয়ালাটি নিল। এক চুমুকে সরাবটুকু সাবাড় করে দিয়ে খালি পেয়ালাটি ফিন তার হাতে ফিরিয়ে দিল। তারপর নতজানু হয়ে কুর্ণিশ করে এক পাশে সরে দাঁড়াল।
আলী ফিন সরাবের বােতল হাতে তুলে নিল। পেয়ালা ভরে সরাব নিল।
সরাবের পেয়ালাটি নিয়ে আলী এবার বাদামী রঙের লেড়কি, শোলার কাছে গেল। ঠোটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল । মুখে হাসির রেখাটুকু অক্ষুন্ন রেখেই বলল-“মেহবুবা শােলা, তােমার গানা তাে বহুৎ আচ্ছা। গলার কাজ ও সুরজ্ঞানও তােমার আচ্ছাই। আর উচ্চারণ বিলকুল নিখুত। তােমার গানা দিল থেকে দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেয়। তােমার মন পছন্দ গানা একটি শােনাও মেহবুবা।
শোলা নতজানু হয়ে কুর্ণিশ করে বলল —জাঁহাপনা, আপনার দিলে রঙ ধরানােই তাে আমার কাজ। আপনাকে খুশী করতে পারলে আমি নিজেকে ধন্য জ্ঞান করব।
-“হ্যা, হ্যাঁ —শুরু কর সুন্দরী। বড়িয়া এক গানা লাগাও যাতে আমার দিল খুশীতে ভরে ওঠে।
শােলা মুচকি হেসে আলীকে কুর্ণিশ করল। মুখের হাসির রেখাটুকু অক্ষুন্ন রেখেই বীণাটি হাতে তুলে নিল। ভাবাবেগে আপ্লুত হয়ে এবার কিন্নর কণ্ঠে গানা শুরু করল। কী সুর! কী মধুমাখা তার কণ্ঠ। হঠাৎ করে শুনলে মনে হবে বেহেস্তের কোন হুরী বুঝি তন্ময় হয়ে সুর সাধনা করে চলেছে।
আলী চোখ দুটো বন্ধ করে ভাবের সাগরে ডুবে গেল। সে যেন খােয়াবে দেখা এক গানার মজলিসে সামিল হয়েছে। শােভন আল্লা! সুরের কী মধুর আলাপ! আলীর মনে হ’ল সে যেন এ দুনিয়ার কেউ নয়। বেহেস্তের গানের মজলিসে বসে সুর-তালছন্দের মাধ্যমে দিলকে চাঙা করে নেয়ার জন্য উন্মনা।
আলী ভাববিমুগ্ধ দিল নিয়ে সরাবের পেয়ালাটিকে ধীরে ধীরে ঠোটের কাছে তুলে নিল। আনমনা ভাবে পেয়ালায় চুমুক দিল। তারপর পেয়ালাটি শোলার দিকে বাড়িয়ে দিল। শােলা ফিন ঠোটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল। নতজানু হয়ে আলীকে কুর্ণিশ করল। ধীরে ধীরে পেয়ালাটিকে ঠোটের কাছে নিয়ে গেল, এক চুমুকে পেয়ালাটি খালি করে আলীর হাতে তুলে দিল।
আলী শূন্য পেয়ালাটি নিয়ে দু’ কদম এগিয়ে গিয়ে বােতল থেকে সরাব ঢেলে পেয়ালাটি পূর্ণ করে নিল।
এবার পিছন ফিরে এগিয়ে গেল বদর-এ-কামিল-এর কাছে। মুচকি হেসে তাকে বলল —“পিয়ারী, তােমার বপুটি সাধারণের তুলনায় একটু বেশী রকমই স্থুলকায়। তা হােক গে। সুরতের ঘাটতি একটু-আধটু কম থাকলে তাকে গুণ দিয়ে ঢেকে দেয়া যেতে পারে। গুণের বিচারে তুমি তাে অনন্যা। এখন একটি গান গেয়ে আমার দিলকে খুশী করার কোশিস কর।
আলীর ফরমাশ অনুযায়ী গান গাওয়ার জন্য বদর-এ-কামিল নিজেকে তৈরি করে নিতে লাগল। ফিন ছােট্ট করে হাসল। হাতে বীণাটি তুলে নিল। অভিজ্ঞ-নরম আঙুলের ছোঁয়া পেয়ে নির্জীব তারগুলাে যেন মুহূর্তে সজীব হয়ে উঠল।
সুরের মূর্ছনায় আলীর দিল অকস্মাৎ চাঙা হয়ে উঠল। ক্রমে ভাবের সাগরে তলিয়ে যেতে লাগল। হাজির হ’ল এক স্বপ্নাচ্ছন্ন জগতে। সেখানে কেবলই যেন খুশী আর আনন্দের এক নয়া দুনিয়া।
বদর-এ-কামিল-এর সুর-তাল-ছন্দ যেন পাথরের বুকেও ভাবের বন্যা বইয়ে দিতে পারে।
আলী দীর্ঘ সময় যেন মায়াময় এক নয়া দুনিয়ার বাসিন্দা হয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মত বসে রইল। বদর-এ-কামিল গানা থামাল।
আলী ধীরে ধীরে সম্বিৎ ফিরে পেল। সরাবের পেয়ালাটি ঠোটের কাছে তুলে আলতাে করে এক চুমুক দিল। পেয়ালার সরাবে গলাটি ভিজিয়ে নিল। এবার অবশিষ্ট সরাব সমেত পেয়ালাটি বদর-এ-কামিল-এর দিকে এগিয়ে দিল। সে নতজানু হয়ে আলীকে ফিন কুর্ণিশ করল। তারপর অপূর্ব এক ভঙ্গিতে পেয়ালাটি ঠোটের কাছে তুলে নিয়ে এক মুহূর্তে বিলকুল সরাব পান করে নিল। বদর-এ-কামিল-এর চোখের তারায়ও খুশীর প্রলেপ।।
আলী ফিন সরাবের বােতলটি থেকে এক পেয়ালা সরাব ঢেলে নিল। ধীর কদমে এগিয়ে গেল বেহেস্তের হুরীর দিকে। হাত দু’তিন দূরে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। এবার মৃদু হেসে তাকে ফরমাশ করল-“পিয়ারী, তােমার কণ্ঠে আছে মিঠা সুরের বাহার। তােমার মিষ্টি-মধুর গানা পাথরের বুকেও ফুল ফোটাতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, তােমার নামই তাে তােমার যথার্থ পরিচয় বহন করছে। আমার দিলে সাগরের ঢেউ বইয়ে দিতে পারে এমন এক গানা তােমার কাছ থেকে আমি প্রত্যাশা করি। আশা করি তুমি আমার বাঞ্ছাপূরণ করতে সক্ষম হবে।
বেহেস্তের হুরী মুচকি হাসল। নতজানু হয়ে আলীকে কুর্ণিশ করল। তার কিন্নর কণ্ঠ দিয়ে বেরিয়ে এল যেন, এক অনাস্বাদিত সঙ্গীতলহরী। সে সঙ্গে বীণার তার ঝনঝনিয়ে উঠল গানের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে। গানা তাে নয় যেন পাহাড়ের বুক থেকে কুলকুলরবে নেমে আসছে চঞ্চল ঝর্ণা। আলীর বুকে খুশীর জোয়ার। বারবার বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা! বলে আলী গানার তারিফ করতে লাগল।
আলী ফিন সরাবের পেয়ালাটি ঠোটের কাছে তুলে নিল। ছােট্ট করে একটি চুমুক দিয়ে কিছু সরাব গলায় পুরে নিল। পরম তৃপ্তির ছাপ ফুটে উঠল তার চোখে মুখে।
আলী এবার অবশিষ্ট সরাবটুকু সমেত পেয়ালাটি বেহেস্তের হুরীর দিকে এগিয়ে দিল।
বেহেস্তের হুরী সরাবের পেয়ালাটি এক নিঃশ্বাসে সাবাড় করে দিল। ফিন নতজানু হয়ে আলীকে কুর্ণিশ করল। মুখে মৃদু হাসি। ফুটিয়ে তুলে তার হাতে পেয়ালাটি ফিরিয়ে দিল। আলী ফিন বােতল থেকে সরাব ঢেলে নিল। এবার ধীর-পায়ে এগিয়ে গেল সােনালী লেড়কিটির দিকে। তার মুখােমুখি গিয়ে দাঁড়াল।
এমন সময় ভাের হয়ে আসতে দেখে বেগম শাহরাজাদ কিসসা। বন্ধ করলেন।
তিন শ’ বত্রিশতম রজনী
রাত্রি গভীর হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসাটির পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—জাঁহাপনা, আলী সরাব ভর্তি পেয়ালাটি হাতে নিয়ে সােনালী লেড়কিটির মুখখামুখি গিয়ে দাঁড়াল। মেহেরুন্নেসা তার নাম। 
আলী বলল—সুন্দরী মেহেরুন্নেসা তােমার কী সুরৎ। গায়ের রঙ কাচা সােনার মত—যেন ফুটন্ত এক চাপা ফুল। আমার দিল একটি মহব্বতের গান শােনার জন্য বড়ই উতলা হচ্ছে। তুমি একটি মহব্বতের গান গেয়ে আমার অশান্ত দিলকে শান্ত কর। এমন এক গানা শােনাও যাতে দুনিয়াকে আমার কাছে অসার জ্ঞান হয়। আর যেন মহব্বতকেই একমাত্র সার বলে মনে হয়। এমন এক মহব্বতের গানায় তুমি দিল উজাড় করে ঢেলে দাও সুন্দরী।
মেহেরুন্নেসা আলী-র হুকুম তামিল করতে বীণাটি হাতে তুলে নিল। তুলল সুরের ঝঙ্কার। তারপর বেহাগের সুরের সঙ্গে কণ্ঠ মেলায়। কোটিদেশ দুলিয়ে, পৃষ্ঠ নাচিয়ে একের পর এক গানার কলি গেয়ে চলল ।
আলীর দিলটি সঙ্গীতের মূচ্ছনায় কেমন যেন উদাস-ব্যাকুল হয়ে উঠল। তার দিলের দরওয়াজা ধীরে ধীরে খুলে গেল। তার মধ্যে সে জাগিয়ে তুলল অফুরন্ত প্রাণচাঞ্চল্য আর অবর্ণনীয় উচ্ছাস-আবেগ।
আলী সরাবের পাত্রটি ঠোটে তুলে নিল। মৃদু এক চুমুক দিল। তারপর দু’পা এগিয়ে গিয়ে সেটিকে মেহেরুন্নেসার হাতে তুলে দেয়। ভাবাপ্লতা মেহেরুন্নেসা এক চুমুকে পূর্ণ পেয়ালাটি শূন্য করে ফিন আলীর হাতে ফিরিয়ে দিল। আলী পেয়ালাটি ফিন পূর্ণ করে এবার ধীর-পায়ে এগিয়ে গেল কৃষ্ণকায়ার কাছে। আলী তাকে লক্ষ্য করে বলল—“পিয়ারী, তােমার গাত্রবর্ণ কৃষ্ণভ্রমরের মত হলে কি হবে তােমার দিলটি যে তুষারশুভ্র। তুমি যেন এ দুনিয়ার দুঃখ, বেদনা ও হতাশার প্রতীক। কিন্তু চোখের তারায় মায়া-কাজল মাখানাে। কাছে টানার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। তােমার মুখের দিকে তাকালে দুনিয়ার অস্তিত্বের কথা আমার দিল থেকে উবে যায়। তােমার কণ্ঠের মন-মাতানাে একটি গানা শােনার জন্য আমার দিল যারপর নাই চঞ্চল হয়ে পড়েছে। একটি দিব্বাহার গান শােনাও সুন্দরী।
কৃষ্ণকায়া এবার আলীর হুকুম তামিল করতে গিয়ে আলতাে করে বীণাটি হাতে তুলে নিল। শুরু করল বেদনাঘন এক করুণ গান। গানটির দু’-এক কলি শােনার পরই তার ভেতরে অদ্ভুত এক রােমাঞ্চ জাগাল। দুঃখের মধ্যেও যে, এমন এক অবর্ণনীয় মাদকতা থাকতে পারে আলীর অন্তত তা আগে জানা ছিল না।
ভাবাচ্ছন্ন আলী এবার সরাবের পেয়ালাটি ঠোটের কাছে তুলে নিয়ে ছােট্ট করে একটি চুমুক দিল। তারপর সেটি তুলে দিল কৃষ্ণকায়ার হাতে।
কৃষ্ণকায়া লেড়কিটি সরাবের পেয়ালাটি হাতে নিয়ে নতজানু হয়ে আলীকে কুর্ণিশ করল। এবার এক চুমুকে সরাবের পেয়ালাটি নিঃশেষ করে খালি পাত্রটি ফিন আলীর হাতে ফিরিয়ে দিল।
ছয়টি খুবসুরৎ লেড়কিই এবার এক সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। আলীকে কুর্ণিশ করল। সবার মুখেই হাসির ঝিলিক। খুশীর ফোয়ারা। আলীর দিল ও কম আনন্দিত নয়। সােল্লাসে সে বলল-“তােমাদের সবার গানাই আচ্ছা হয়েছে। সবার গানাই আমার দিলে খুশীর আমেজ এনে দিয়েছে। 
বাঁদী লেড়কিরা সমস্বরে বলল—তা-ও কি হয়? সবার গানা আচ্ছা হতে পারে? লেকিন কিছু না কিছু হেরফের তাে হতেই হবে। আপনি দিল খােলসা করে বলুন, কার গানা, কার বীণার ঝঙ্কার সবচেয়ে আচ্ছা হয়েছে!
আলী এবার বাস্তবিকই মহাফাপরে পড়ল। কঠিন সমস্যা। এসমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় কি? কূল রাখি না, রাই রাখি ? কাকে ছেড়ে কাকে ধরি—সমস্যাই বটে। বাস্তবিকই সবারই বীণার ঝঙ্কার, গানার ছন্দ আর সুর সমান। কণ্ঠের বিচারেও কেউ কারাে থেকে কমতি নয়।
তবু আলী ভাবল, সমস্যার উদ্ভব যখন হয়েছে তখন তা থেকে নিজেকে মুক্তো তাে হতেই হবে। ফিন অবিচারও কোন বাঁদীর ওপর করা ঠিক হবে না। আলী এবার ব্যাপারটি নিয়ে ভাবতে বসল। চোখ দুটো বন্ধ করে প্রত্যেকের গানা আলাদা আলাদা করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার করার কাজে লিপ্ত হ’ল। কয়েক মুহূর্ত নীরবে প্রতিটি গানার বিচার বিশ্লেষণ করল। এক সময় হতাশদৃষ্টিতে তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল —“অসম্ভব! একেবারেই অসম্ভব। তােমাদের কাউকেই আমি বেশী খুশী করতে অপারগ। আমার অসহায় অবস্থার কথা বিবেচনা করে তােমরা সবাই আমার গা-ঘেঁষে এসে দাঁড়াও। আমাকে আদর সােহাগ কর। বাঁদী লেড়কিরা এগিয়ে এসে আলীকে নানাভাবে আদর সােহাগ করতে লাগল। ঠিক যেন এক সােহাগের তীব্র প্রতিযােগিতা। আলী এক সময় অসহায়ভাবে বলল—‘খােদাতাল্লা’কে অশেষ সুকরিয়া যে, তােমাদের মত সর্বগুণান্বিতা লেড়কিদের আমি কাছে পেয়েছি। তােমাদের পেয়ে আমি বাস্তবিকই গর্বিত, মহাখুশী। লেকিন কোন একজনকে বেছে নিয়ে তাকে শ্রেষ্ঠত্বের স্থান দেয়া সম্ভব নয়। তাই সে বিচারের ভার তােমাদের ওপরই আমি অর্পণ করছি। তােমরা প্রত্যেকেই তাে কোরাণ ও অন্যান্য কিতাব পাঠ করে জ্ঞানার্জন করেছ। পুরানাে কিসসা কাহিনীও বহুৎ জান। এবার আমি তােমাদের দুজন-দু’জন করে ভাগ করে দেব। তাদের একজন নিজের সুরতের বর্ণনা দেবে আর দ্বিতীয়জন নিজের গুণাবলী আমাদের সবার সামনে ব্যক্ত করবে অর্থাৎ তােমরা পরস্পর প্রতিপক্ষের বাদী। উপযুক্ত যুক্তির অবতারণা করে তােমার যুক্তি খণ্ডন করবে।
বাঁদী লেড়কিরা এবার যেন কেমন বিস্মিত হ’ল। জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে আলীর মুখের দিকে তাকাল। শেষের কথাটি খােলসা করে বলার জন্য অনুরােধ করল।
আলী হেসে বল্ল—“আমি বলতে চাইছি কি, একজন কোন একটি ব্যাপারকে আচ্ছা বলে প্রতিপক্ষ তার প্রতিবাদ করবে। তার বক্তব্যকে খণ্ডন করে নিজের বিরুদ্ধ বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করবে। অর্থাৎ কেউ কোন কিছুকে নিকৃষ্ট বললে অন্য জনকে তাকেই উক্তৃষ্ট প্রতিপন্ন করতে হবে। তবে হ্যা, সবাই ইয়াদ রাখবে, কোন অশালীন আচরণ বা উক্তি প্রয়ােগ করা চলবে না। আর প্রয়ােজনে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তােমার বক্তব্যকে জোরদার করতে পারবে। বাধা নেই।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ চৌত্রিশতম রজনী 
রাত্রি গভীর হতে না হতেই বাদশাহ বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসা শুরু করলেন—জাহাপনা, আলীর প্রস্তাবে সবাই সম্মতি দিল।
ফর্সা আর কৃষ্ণকায়ার জুড়ি সবার আগে বলতে উঠল। বদরুন্নেসা কৃষ্ণকায়ার মুখােমুখি দাঁড়িয়ে তার বক্তব্য শুরু করল - শােন কৃষ্ণকায়া, ফর্সা বা উজ্জ্বল রঙের ব্যাপারে কবিদের মতামত হচ্ছে—আলাে ফর্সা, চাঁদের কিরণ ফর্সা আর বীর্যবানপুরুষেরা ফর্সা হয়ে থাকে। আর নসীব যদি আচ্ছা হয় তবে ফর্সা আদমির কপাল দিয়ে যেন আলাের ঝলকানি ফুটে বেরােয়। তাই তাে প্রখ্যাত এক কবি তার এক কবিতার মাধ্যমে মতামত ব্যক্ত করেছেন—‘খােদাতাল্লা পয়দা করার সময় লেড়কিটিকে মুক্তার ফেনা দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন। তারপর তার অপরূপ দেহটিকে মেদিগাছ ভিজিয়ে গড়ে তুলেছিলেন। সফেদ গােলাপও কিছু সঙ্গে নিয়েছিলেন। সবশেষে তিনি এক অত্যুজ্জ্বল আর পান্থপাদপও তার সঙ্গে যােগ করেছিলেন। এবার বলছি সফেদের প্রসঙ্গে কোরাণের বক্তব্য—মুশার হাতে একবার কুষ্ঠরােগ আক্রমণ করেছিল। আল্লাহ তাকে বলেন মুশা, তােমার ব্যাধিগ্রস্ত হাতটি জেবের মধ্যে ঢুকিয়ে দাও। দেখবে, হাতটি মুহূর্তে সফেদ হয়ে যাবে। পবিত্র হয়ে উঠবে। যা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল ফিন ভরে যাবে।
আমাদের ধর্মগ্রন্থে সফেদের ব্যাপারে বলা হয়েছে—মুখাবয়ব যাদের সফেদ আল্লাহ কেবল তাদের প্রতিই করুণা প্রদর্শন করে থাকেন।
আরও আছে কমলাফুল। দিনের আলাে ও ভােরের আশমানের শুকতারাও তাে বিলকুল সফেদই বটে। মােদ্দা কথা হ’ল আমার গায়ের রঙই সব রঙের সেরা। আমার এরকম চোখ ধাঁধানাে সুরৎ তাে গায়ের রঙের জন্যই লাভ করেছি। আমার মত যাদের গায়ের রঙ তারা যেকোন পােশাক পরলেই সমানভাবে সুরতের প্রকাশ ঘটে।
বেহেস্তের যে তুষার দুনিয়ার জমিনে নেমে এসেছে তার রঙ-ও তাে সফেদই বটে। ধর্মাশ্রয়ী আদমীরা শিরে যে-ফেজ ব্যবহার করেন তার রঙ তাে সফেদ, ঠিক কিনা?
আমার নিজের গুণগান আর করতে চাই না।
আমি এবার তাের কালাে রূপের কথা কিছু বলছি—কালাে ? গােরস্থানের কাকের গায়ের রঙ কালাে। লেখার কাজে যে-কালি ব্যবহার করা হয় তার রঙও তাে কালােই বটে, কামরায় কামরায় যে ঝুল পড়ে তার রঙ? সে-ও তাে কালােই হয়ে থাকে,

( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments