গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
আলী শার আচমকা শিহরিত হয়ে উঠল। তার শিরা-উপশিরায় যেন বিদ্যুতের চমক খেলে গেল। সে পিঠে যেন নরম ও গােলাকার দু’টো বস্তুর চাপ অনুভব করল। সুলতানের নিশ্বাস উষ্ণ। আর শরীরও যেন ক্রমেই উষ্ণ হয়ে উঠছে স্পষ্ট বুঝতে পারল।
পরমুহুর্তেই বিন্দু বিন্দু ঘাম তার সারা গায়ে ফুটে উঠতে লাগল। আপন মনে বলল-“এবার আমার কম্ম ফতে হবে।' আলী শার সচকিত হয়ে স্বগতােক্তি করল-ইয়া আল্লাহ! এ কী তাজ্জব কাণ্ড! কোন পুরুষ মানুষের শরীর যে এমন নরম রােমাঞ্চকর হয় কস্মিনকালেও দেখিনি।
আলী শার উপায়ান্তর না দেখে মড়ার মত আড়ষ্ট হয়ে পড়ে রইল। শেষ পর্যন্ত সুলতান কোন পথ অবলম্বন করে ধৈর্য ধরে নজর রেখে চলা ছাড়া তার করারও তাে কিছু নাই। সুলতান উপুড় হয়ে নিশ্চল নিথর ভাবে আলী শার-এর পিঠের ওপর টানটান হয়ে শুয়ে পড়ে রইল। তারপরই ধীরে ধীরে তার পিঠ থেকে নেমে এল।
আলী শার এবার আরও তাজ্জব বনল। সে ভাবল সুলতানের যদি ওসব কোন ধান্দাই থাকত তবে এতক্ষণ এমন নির্জীবের মত তো শুয়ে থাকতে পারত না। কামােন্মাদনা অবশ্যই তার মধ্যে জাগত। তবে? তবে কি সুলতান পুরুষাঙ্গহীন? নাকি—না, আলী শার আর ভাবতে পারছে না।
আলী শার-এর পিঠ থেকে নামার পর সুলতান-এর মতিগতি পরিবর্তিত হতে দেখা গেল। এবার সে আলী শার’কে নিজের পিঠে তুলে নেয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করল।
আলী শার-এর পরিস্থিতি তখন একেবারেই সঙ্গীন হয়ে পড়ল। চরম অবস্থা বলা যেতে পারে। এমন চরমতম সঙ্কটেও কেউ পড়ে। তার নসীবেও এ-ও ছিল! সে প্রায় আর্তনাদ করে উঠল—“ইয়া আল্লা, এর পরিণতি যে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তুমিই জান! তার গা দিয়েও এবার ঘাম ঝরতে লাগল। ডরে তার কলিজা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবার উপক্রম হল।
সুলতান এবার আলী শার-এর ডান-হাতটিকে নিজের দু’হাতের মুঠোর মধ্যে নিয়ে মৃদু চাপ দিতে লাগল। আলী শার ফিন নতুন করে বিস্মিত হল। আবার সেই নরম’আর শক্ত’র ভাবনা তাকে পেয়ে বসল।
আলী শার নিজের হাতটিকে সুলতানের হাতের বন্ধন থেকে ছিনিয়ে আনতে গিয়েও পারল না। আদতে তার সাহসেই কুলালাে না। জানের মায়া সবচেয়ে বড় মায়া।
সুলতান এবার আলী শার-এর হাতটিকে আচমকা যেখানে নিয়ে গিয়ে স্থাপন করল তাতে তার সর্বাঙ্গে কেমন এক অবর্ণনীয় অনুভূতির উদয় হ’ল।।
আলী শার চমকে উঠে স্বগতােক্তি করল—এ কী! এ তাে পরুষ নয়। কিছুতেই পুরুষ হতে পারে না। অন্ধকার আকাশে আচমকা বিদ্যুতের ঝিলিকের মত তার কাছে ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে গেল। সুলতান পুরুষ নয়—কিছুতেই পুরুষ নয়। তার পুরুষাঙ্গের খোঁজ করতে যাওয়া নিষ্ফল প্রয়াস ছাড়া কিছুই নয়। মুহূর্তে কিভাবে, কি করে যে কি হয়ে গেল আলী শার কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। কেমন যেন উগ্র কামনা তাকে পুরােপুরি গ্রাস করে ফেলল। নিজেকে হারিয়ে ফেলল। নিজেকে বশীভূত রাখার ক্ষমতা তার মধ্য থেকে নিঃশেষে উবে গেল।
সুলতানের ছদ্মবেশ জুমুরদ-এর ওপর থেকে যেন দমকা বাতাস উড়িয়ে নিয়ে গেল। আলী শার-এর কাছে এবার সে তার মেহবুব জুমুর্যদ হয়ে ধরা দিতে গিয়ে সশব্দে হেসে উঠল। ঠিক এরকমই এক পরিস্থিতির জন্য সে এতক্ষণ কঠিন পরীক্ষায় লিপ্ত হয়েছিল। সে এবার হাে হাে করে হাসতে হাসতে আলী শার'কে জড়িয়ে ধরল। হাসি থামিয়ে এবার বলল—“কি গাে, তুমি আমাকে চিনতেই পারলে না! আমিই যে তােমার প্রাণেশ্বরী জুমুর্যদ, এত কিছুর পরও বােঝ নি! হায় আমার নসীব! আমি তবে এতদিন কার বিরহে হরবখত চোখের পানি ঝরিয়েছি।
আলী শার জুমুরদ-এর কথাটি শােনামাত্রই আবেগে-উচ্ছ্বাসে অভিভূত হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল—“তােমার নসীবের চেয়েও আমার নসীবই বেশী মন্দ জুমুরদ। নইলে তুমি আমাকে প্রথম দর্শনেই চিনে ফেলতে পেরেছ। আর আমি? আমি তােমাকে চিনতে পারলাম এইমাত্র, এত কিছু ঘটে যাওয়ার পর। কিন্তু পিয়ারী, আমি অবাক হচ্ছি কি করে এতক্ষণ নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিলে! কথা বলতে বলতে সে তার মনময়ূরীকে বার বার চুম্বন করতে লাগল। আলী শার এবার চুম্বনে-সােহাগে জুমুরদ-এর দিল ভরিয়ে দিল।
জুমুরদ তার আবেশে জড়ানাে ডাগর ডাগর চোখ দুটো মেলে আলী শার-এর গালে নিজের গাল উন্মাদের মত বুলাতে বুলাতে ক্ষীণ কণ্ঠে উচ্চারণ করল- “কি হে নওজোয়ান, কই, এবার তাে আর আড়ষ্ট হচ্ছ না, সঙ্কোচে অনবরত না-না বলে পিছিয়ে যাচ্ছ না ।
আলী শার যেন এখন আর নিজের মধ্যে নেই, সম্পূর্ণরূপে নিজের আয়ত্তের বাইরে চলে গেছে। সে একেবারে কামােন্মাদ নেকড়ের মত জুমূর্যদ-এর ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। এক ঝটকায় নগ্নপ্রায় জুমুরদ’কে কোলে তুলে নিল। এবার? এবার তার দেহটিকে নিয়ে সে যে কি করবে, কি করলে অধিকতর আনন্দ পাবে বুঝে উঠতে পারল না।
এদিকে জুমুরদ-এর অবস্থাও সঙ্গীন। কামােন্মাদিনী। কামজ্বালা তার ভেতরটিকে কুরে কুঁরে খাচ্ছে। সে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে আলী শার-এর হাতে সঁপে দিল। সে তার শরীরটিকে যদি ছিড়ে খুঁড়ে একাকার করে দেয় দিক। তাকে একেবারে শেষ করে দিক। সে আর পারছে না। কলিজার জ্বালা নিভতে পারে একমাত্র আলী শার-এর পেশীবহুল কঠিন হাত দুটোর নিষ্পেষণের মাধ্যমেই। হাল্কা আদরে-সােহাগে নয়, পুরুষের নির্মম নিষ্পেষণই আউরতের একান্ত কাম্য। এরই জন্য যৌবনের জোয়ারলাগা দেহটি নিয়ে অধীর প্রতীক্ষায় তারা প্রহরের পর প্রহর কাটায়।
আলী শার এবার কামজ্বালায় জর্জরিতা উলঙ্গ প্রায় জুমুর্যদকে পালঙ্কের ওপর দুম করে শুইয়ে দিল। তারপর? তারপর অবশিষ্ট রাত্রিটুকু তারা দলন, পেষণ আর সম্ভোগের মাধ্যমে কলিজার জ্বালা নেভানাের প্রয়াসে লিপ্ত রইল।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ একত্রিশতম রজনী
গভীর রাত্রে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলে, বেগম তার কিসসার অবশিষ্ট অংশটুকু শুরু করলেন –‘জাহাপনা, আলী শার এবং জুমুরদ ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্ঘুম রাত্রি যাপন করতে লাগল।
এদিকে সুলতানের কামরায় নওজোয়ান আলী শার প্রবেশ করার পর থেকে দুই খােজা ভৃত্য খুবই কৌতূহলাপন্ন হয়ে উঠেছিল। তারা কৌতূহলের শিকার হয়ে সুলতানের কামরার দরজা থেকে সরতে পারল না। তারপর এক সময় বন্ধ-দরওয়াজার ফাক ফোকর দিয়ে বিচিত্র সব শব্দ ভেসে আসায় তাদের কৌতূহল আরও অনেকাংশে বেড়ে গেল। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল—“উভয়েই তাে মরদ। নওজোয়ান। তবে কামরার ভেতর থেকে এরকম রহস্যজনক শব্দ ভেসে আসছে কেন? তারা খােজাখুঁজি করে দরজার গায়ে সূক্ষ্ম একটি ছিদ্র আবিষ্কার করল! তাতে একজন চোখ লাগিয়েই চমকে উঠে ঝট করে এক পা সরে এল। কাপা কাপা গলায় স্বগতােক্তি করল—‘শােভন আল্লাহ! এ কী কাণ্ড সুলতান নওজোয়ানটি দেখছি কুস্তি শুরু করেছে। একজন অন্যজনকে জব্বর এক কুস্তির প্যাচ কষে একেবারে পটকান দিয়ে দিয়েছে। এবার বুকের ওপর চেপে বসেছে। লাফিয়ে ঝাপিয়ে তাকে কব্জা করার জন্য একেবারে ক্ষেপে গেছে। ফিন মুখের কাছে মুখ নামিয়ে আনছে সে। গালে কামড়ে দেবে নাকি! এ যে কুস্তীর রীতি বহির্ভূত কাজ। খােদা মেহেরবান! আমাদের সুলতান কি তবে নওজোয়ানটির কাছে হেরে যাচ্ছেন? তলে পড়ে পড়ে মার খাচ্ছেন, অসহায়ভাবে তার লম্ফঝম্ফ বরদাস্ত করে চলেছেন। খােদা মেহেরবান। আমাদের সুলতানকে এবার নওজোয়ানটির ওপরে তুলে দাও, জিতিয়ে দাও। তার এভাবে নওজোয়ানটির তলে পড়ে মার খাওয়া মানে তাে আমাদের, তামাম সুলতানিয়তের আদমিদের মুখে চুণ-কালি মাখানাের সামিল।”
তবে ব্যাপারটি তারা নিজেদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখল। আদতে তারা নিজেরাই রহস্যভেদ করবে, পরিকল্পনা করল।
ভাের হ’ল। জুমুরদ অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশী বেলা করেই শয্যা ত্যাগ করল। দরওয়াজা খােলার আগে সে নিজেকে আবার সুলতানের ছদ্মবেশে সজ্জিত করে নিল।
সুলতানের সভাসদরা যথা সময়ে এক এক করে উপস্থিত হ'ল। সুলতান জুমুরদ উপস্থিত সবাইকে লক্ষ্য করে বলল -“আপনাদের সঙ্গে আমার একটি জরুরী আলােচনা রয়েছে। আমি যে-পথে এসেছিলাম সে-পথেই এখান থেকে বিদায় নিতে চাচ্ছি। আপনাদের কাছ থেকে আমি এতদিন যে আন্তরিকতা ও সহানুভূতি পেয়েছি তার জন্য সামান্য কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে আপনাদের ছােট করার তিলমাত্র ইচ্ছাও আমার নেই। হ্যা, যেকথা বলতে চাচ্ছি, আপনারা অন্য কাউকে মসনদে বসিয়ে সুলতানিয়তের শাসন ভার অর্পণ করুন।
উপস্থিত সভাসদরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে নীরবে পরস্পরের মুখের দিকে তাকাতে লাগল। সবার মুখে বিস্ময়ের ছাপ।
সুলতান জুমূর্যদ বলে চলল —“হ্যা, আমি বিদায় নিচ্ছি। আগন্তুক নওজোয়ান দরবেশের সঙ্গেই আমি এ-সুলতানিয়ৎ ছেড়ে চলে যাওয়ার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। যেতে যে আমাকে হবেই।' জুমূর্যদ যখন বিদায় নেবার জন্য উন্মুখ, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে তখন শত অনুরােধেও তাকে আটকে রাখা সম্ভব নয়। পরদেশী যদি নিজের মুলুকে যেতে চায় তাকে আটকে রাখার কোশিস করলেই বা সে শুনবে কেন? কয়েকজন খােজা ভৃত্য উটকে সাজিয়ে প্রাসাদের প্রধান ফটকে এনে দাঁড় করাল। দু’জন খােজা সুলতানের সঙ্গে যাবে। তারা তৈরী হয়ে এল।
সুলতান জুমূর্যদ এবং দরবেশের ভেকধারী আলী শার এবার সভাসদ ও অন্যান্য রাজকর্মচারীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সুসজ্জিত উটের পিঠে চাপল। আর খােজা ভৃত্য দু'জন দুটো গাধার পিঠে চেপে জুমূর্যদ ও আলী শার-এর পিছন পিছন চলল। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে, কঠোর তকলিফ সহ্য করে আলী শার তার বিবি জুমূর্যদ’কে নিয়ে খােরামান নগরে নিজের মকানে পৌছে গেল। আলী শার ফিরে আসার আগেই সে বুড়িটি বেহেস্তে চলে গেছে। সে কিন্তু নিজের জানের চেয়েও তাকে বেশী পিয়ার মহব্বৎ করত।
আলী শার বুড়ির জন্য শােক করল। কান্নাকাটি করে বহুৎ চোখের পানি ঝরাল। তার গােরস্থানে চমৎকার একটি স্মৃতিসৌধ বানিয়ে দিল। আলী শার তারপর বহুৎ সাল তার বিবি জুমুর্যদকে নিয়ে সুখেশান্তিতে ঘর করল। কিছুদিনের মধ্যে তাদের একটি লেড়কাও পয়দা হয়েছিল। তাদের সংসার আনন্দ ও সুখময় হয়ে উঠেছিল। তাদের একজন চিরবিদায় গ্রহণ করলে তাদের সুখ ও আনন্দ ভেঙে গেল।
বেগম শাহরাজাদ এবার বললেন—“জাহাপনা, এই হ’ল আলী শার ও তার বিবি জুমুরদ-এর কিসসা। এবার আপনার দরবারে যে কিসসা পরিবেশন করব তা এর চেয়ে কম জমজমাট ও চিত্তাকর্ষক নয়। বিচিত্র চরিত্রের ছয়টি লেড়কিকে ঘিরে সে-কিসসাটি গড়ে উঠেছে। তাদের চরিত্র, তাদের চলাফেরা আর মতিগতি বাস্তবিকই বৈচিত্র্যে ভরপুর। তারা এক একজন অসাধারণ কবিত্বশক্তির অধিকারী। আমি হলফ করে বলতে পারি, এমন অনন্য কবিত্বশক্তির পরিচয় আপনি অন্য কারাে কাছ থেকেই পান নি।
দুনিয়াজাদ তার বহিনজীর গলা জড়িয়ে ধরে আগ্রহ প্রকাশ করে বলল–বহিনজী, তােমার কিসসা বাস্তবিকই অসাধারণত্বের দাবী রাখে। আর দিলে অভাবনীয় দোলা দেয়। তােমার মুখ থেকে ছয় লেড়কির কিসসা শােনার জন্য আমার দিল ছটফট করছে। কিসসা শুরু কর।”
বাদশাহ শারিয়ারও এবার নয়া কিসসা শােনার জন্য যথেষ্ট আগ্রহ প্রকাশ করলেন।
ছয় লেড়কির কিস্সা
বাদশাহ শারিয়ার এবং বহিন দুনিয়াজাদ-এর অত্যুগ্র আগ্রহে বেগম শাহরাজাদ বিচিত্র চরিত্রের ছয় লেড়কির কিসসাটি শুরু করলেন ‘জাহাপনা বাদশাহ আল-মাসুন-এর কথা আপনার ভাল জানা না থাকলেও তার নামটি হয়ত শুনে থাকবেন। আমি যে মহা ধার্মিক মাসুন-এর বাৎ বলতে চাইছি আশা করি আপনি বুঝতে পারছেন।
বাদশাহ মাসুন একদিন তার পারিষদবর্গকে নিয়ে দরবারে বসে ছিলেন। পারিষদবর্গের মধ্যে উজির, নাজির, আমীর, ওমরাহরা সবাই তখন দরবারে হাজির। কিছুক্ষণের মধ্যেই সভাকবি বসােরার মহম্মদও হাজির হ’ল। এবার ষোলকলা পূর্ণ হ’ল। মহম্মদ বাদশাহের খুবই প্রিয়পাত্র, কাছের মানুষ। বাদশাহের কাছাকাছি পাশাপাশি থেকে তাকে খুশীতে ভরপুর করে রাখা মহম্মদ-এর কাজ।
সভাকবি মহম্মদ দরবারে হাজির হলে সুলতান তাকে একটি কিসসা বলার ফরমাশ দিলেন। মহম্মদ মুচকি হেসে বলল —‘জাহাপনা, কিসসা শােনাতে হবে? বহুৎ আচ্ছা। আপনার দরবারে এখন যে-কিসসা পেশ করব তা অবশ্যই কারাে মুখ থেকে শােনা নয়। মনগড়া কিসসাও নয়। আমি নিজের চোখে দেখেছি এমন এক ঘটনা আপনার দরবারে পেশ করছি।
বাদশাহ বললেন—“তা-তো আমার দেখার দরকার নেই। আমি শুধু চাই, কিসসাটি যেন আমার শােনা না থাকে। তার ঘটনা যেন আমার দিলে দাগ কাটতে পারে আর সবাই শুনে তারিফ করে। কিসসা শুরু করতে গিয়ে মহম্মদ বলল —“জাহাপনা, অলইয়াম নামক নগরে এক ধনী আদমি বাস করত। তার নাম ছিল আলী। লােকটি আমার সুপরিচিত ছিল। সে নিজের মুলুক অলইয়াম ছেড়ে এক সময় বাগদাদে এসে বাস করতে থাকে। জিন্দেগীকে পুরােপুরি উপভােগ করার যা কিছু বন্দোবস্ত থাকা দরকার কোন কিছুরই ত্রুটি সে রাখেনি। আলী বাগদাদে জীবনকে পুরােপুরি উপভােগ করতে পারবে আশা করে অল-ইয়াম নগরের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বেচে দিয়ে সে বাগদাদে এসে স্থায়ী আস্তানা গড়ে তুল।
আলীর হারেমে ছয়টি খুবসুরৎ বাঁদী ছিল। বাদী ছয়টি ছিল বৈচিত্র্যে ভরপুর। তাদের যে কেবল মনলােভা সুরৎই ছিল তা নয়, গুণের দিক থেকে তারা প্রত্যেকে অসাধারণত্বের দাবী রাখত। সবচেয়ে বড় কথা, তারা প্রত্যেকে ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রকৃতির। একের সঙ্গে অন্যের চারিত্রিক মিলের চেয়ে অমিলই ছিল পুরােদস্তুর। ফিন লেড়কি ছয়জনের সুরতের কথায় ফিরে আসা যাক। সত্য বলতে কি ছয়জনই যেন ছয়টি বেহেস্তের হুরী। খােদাতাল্লার মর্জিতে বেহেস্ত ছেড়ে জমিনে এসে যেন তারা হাজির হয়েছে। ফিন তাদের মধ্যে কে যে সবচেয়ে সুরতের দাবীদার তা নির্বাচন করা ছিল বাস্তবিকই কঠিন সমস্যা। লেড়কিদের মধ্যে প্রথমটি ছিল খুবই ফর্সা। দুধে-আলতায় তার গায়ের রঙ। দ্বিতীয়টির রঙ বাদামী। মনপছন্দ। তৃতীয়টি সুস্বাস্থ্যের অধিকারিণী। একহারা চেহারা ছিল চতুর্থ লেড়কির। পঞ্চমজনের রঙ সােনালী। পীতাভও বলা চলে। আর আবলুস কাঠের মত কুচকুচে কালাে রঙ ছিল ষষ্ঠ লেড়কিটির। ছয়জনকে পাশাপাশি দাঁড় করালে কে যে সবচেয়ে সুরতের অধিকারিণী বাছাই করা বাস্তবিকই বহুৎ মুশকিলের ব্যাপার। এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ বত্রিশতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর শুরু হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার অসমাপ্ত কিসসাটির পরবর্তী অংশ শােনার অত্যুগ্র আগ্রহ নিয়ে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় হাজির হলেন। বেগমের কোলে শির রেখে আধ-শোয়া অবস্থায় পালঙ্কে শরীর এলিয়ে দিয়ে বাদশাহ কিসসা শােনার জন্য তৈরি হলেন। বেগম আঙুল দিয়ে আলতােভাবে বাদশাহের চুলে বিলি কাটতে কাটতে কিসসা বলতে লাগলেন—জাহাপনা, আলীর হারেমের বাঁদী ছয়জন যে কেবলমাত্র তাদের গায়ে রূপের ছটাই বসিয়েছিল তা নয়, গুণের বিচারেও তারা দুনিয়ার সবচেয়ে সেরা লেড়কির সঙ্গে টেক্কা দিতে পারত। সাহিত্য-শিল্পকলা, সঙ্গীত নৃত্যশিল্প, অসাধারণ বিদ্যা, অগাধ পাণ্ডিত্য ও অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ছিল তাদের বিশেষ বিশেষ গুণ।
আলী ছয়টি লেড়কিকেই বহুৎ আদর সােহাগ করত। সে তাদের আদর করে ছয়টি আলাদা আলাদা নামে সম্বােধন করত।
আলী ফর্সা লেড়কিটিকে বদরুন্নেসা বলে সম্বােধন করত। শোলা নামে সম্বােধন করত বাদামী রঙের লেড়কিটিকে। যে সুস্বাস্থ্যের অধিকারিণী সে-লেড়কিটিকে বদর-এ কামিল বলে
( চলবে )

0 Comments