আরব্য রজনী পার্ট ১০৯ (Arabyarajani Part 109)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
আমি পিছন ফিরলাম। বুঝলাম তাদের কারােরই টু শব্দটিও করার উপায় নেই। অস্পষ্ট আওয়াজ শুনে মালুম হ'ল, তাদের একজনের ওষ্ঠদ্বয় অন্যজনের ওষ্ঠদ্বয়ের বন্ধনে জড়িয়ে পড়েছে।
আমি চৌকাঠ ডিঙিয়ে বেরিয়ে আসার উদ্যোগ নিলাম। পারলাম না। থমকে যেতেই হল।
বদর-এর কণ্ঠস্বর কানে এল—ওঃ হাে, আমি বসছি না। আগে আমাদের মধ্যে চুক্তি হবে তারপর বসাবসি।
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। দেখি, বুদুর তার মেহবুবের কানে মখ ঠেকিয়ে ফিসফিসিয়ে কি যেন বলছে।
জুবাইর বলল–বুঝেছি। অবশ্যই সেটি আজই সেরে ফেলতে হবে। ব্যবস্থা করছি।'
কিছুক্ষণের মধ্যেই সদর-দরওয়াজা দিয়ে কাজীকে ঢুকতে দেখলাম। সঙ্গে করে একজন সাক্ষীকেও নিয়ে এসেছে।

কাজী ব্যস্ত-হাতে সাদীর কবুলনামা লিখে ফেল্ল। দু’ জনকে হলফনামা পাঠ করানাে হল।
কাজী ও সাক্ষী বুদুর-এর কাছ থেকে এক হাজার করে দিনার বুঝে পেয়ে খুশী হয়ে বিদায় নিল।
কাজী বিদায় নিলে আমিও তৈরি হতে লাগলাম। হঠাৎ পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে আমীর জুবাইর আমার হাত থেকে কোর্তাটি ছিনিয়ে নিয়ে বলল —“দুঃখের দিনে পাশে থেকে চোখের পানি মুছিয়ে দিলেন আর সুখের দিনে দূরে সরে যাবেন সে কি হয় ইবন সাহাব?’
আমি আর জোরাজুরি করলাম না জাহাপনা, আপনিই বলুন, কবজি ডুবিয়ে শাদীর খানা কে-ই বা দু পায়ে ঠেলে দিতে উৎসাহী হয় ? 
পরের সকালে আমার বিদায় নেবার কথা। প্রস্তুতিও নেয়া শুরু করে দিয়েছি। আমীর জুবাইরকে বললাম—হঠাৎ একটি কৌতূহল মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।
-কৌতূহল? কিসের কৌতূহল, বলুন তাে ইবন্ সাহাব?’ 
—প্রথম দিন আপনার দরওয়াজায় পা দিয়েই দেখি, আপনি রেগে একেবারে কাই হয়ে রয়েছেন। কেন? 
জুবাইর গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রইল।
আমি বলে চললাম—আর এক প্রশ্ন—আপনাদের ছাড়াছাড়ি হওয়ার পিছনে কারণ কি ছিল? বুদুর-এর মতামত অবশ্য আমি আগেই জেনেছি। তার মুখে শুনেছিলাম, আপনি হঠাৎ-ই তার কামরা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন। সেই থেকে আমার কলিজাটি ছটফট করছে। সামান্য যে ঘটনাটিই আপনার চলে আসার প্রধান ও একমাত্র কারণ, নাকি অন্য কোন কারণ এর পিছনে ছিল? আমার বিশ্বাস, অন্য কোন কারণ নির্ঘাৎ এর পিছনে ছিল, বলুন? 
_ সে স্নান হেসে বলল—“আপনি প্রবীণ ও বিচক্ষণ ব্যক্তি। বুদুর এর সে-লেড়কিটি আজ গােরে গেছে। আমার গােসসাটুকুও সে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। আর আমাদের মধ্যে ভুল বােঝাবুঝি কি করে হ’ল তা আপনাকে বলতে আজ আর আমার কোন দ্বিধা নেই।
—“তবে বলুনই না, শুনি।
-“খুবই তুচ্ছ একটা ব্যাপার। আমি একবার বুদুর'কে নিয়ে নৌকো করে বেড়াতে গিয়েছিলাম। তার আর সেই লেড়কিটির কিছু কাম কাজ দেখে নৌকার বুড়াে মাঝি আমাকে বল্ল—‘হুজুর, গুস্তাকি মাফ করবেন। একটি বাৎ আপনাকে বলছি, যে বিবি তার স্বামীর চেয়ে বাদীকে বেশী পিয়ার করে, তাকে নিয়ে স্বামীর সঙ্গে রঙ্গ তামাশা করে, সে-বিবিকে কোন স্বামীর পক্ষে বরদাস্ত করা সম্ভব, বলুন? তারা একদিন আমার নৌকার গলুইয়ে জাপ্টাজাল্টি করে বসে মহব্বতের গানায় একেবারে মাতােয়ারা হয়ে পড়েছিল। কী সব কথা যে সে গানায় ছিল শুনলে আপনার গা ঘিন ঘিন করে উঠবে। আমারই গা-পিত্তি জ্বলে যাচ্ছিল হুজুর।
–“কি গান, কি কথা, বল তাে শুনি?'
–‘গানার মাধ্যমে বলা হয়েছিল—আমার কলিজায় যতটুকু উষ্ণতা ছিল সবই ক্রমে শীতল হয়ে গেছে। কারণ, আমার মেহবুব যে আর আগের মত নেই। তাই তার মহব্বৎ এখন গরল হয়ে দেখা দিয়েছে। সম্প্রতিকালে আমি মহব্বতের যা কিছু কায়দা কলম দেখাই না কেন তার অনেক অনেকই পরিবর্তন হয়ে গেছে। তার দিলটি এখন কেমন ভোতা ভোতা হয়ে গেছে, আর যা কিছু সবই বিলকুল কাদার মত তুলতুলে।
মাঝির মুখ থেকে তাদের কাণ্ডকারখানার বিবরণ শুনে আমার দিমাক খারাপ হয়ে গেল। শিরা-উপশিরায় খুন টগবগিয়ে উঠল। চোখে আন্ধার দেখতে লাগলাম। আপন মনে বলে উঠলাম—সাচ্চা বাৎ। এ-তো বরদাস্ত করা উচিত নয়, সম্ভবও নয়।
হন্তদন্ত হয়ে বুদুর-এর মকানে গেলাম। তারপর? তারপর যেদৃশ্য চোখের সামনে দেখেছি তা-তাে আপনিই আমাকে বলেছেন।
আমার শিরে খুন চেপে গেল। অনুচ্চ কণ্ঠে বললাম—“যা শুনেছি তা তবে ঝুটা নয়। মাঝির সন্দেহ মােটেই অমূলক নয়। থাক গে ইবন্ সাহাব, সে সব তাে এখন ইতিহাসের পাতায় উঠে গেছে। সেখান থেকে আর আমাদের দু জনের মধ্যে টেনে আনার ইচ্ছে নেই, উচিতও নয়। আমরা উভয়েই সে সব আজ দিল থেকে মুছে ফেলব।
এ পর্যন্ত বলার পরই ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ বাহান্নতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার অন্দর মহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসাটির পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—জাহাপনা, ইবন্ আল-মনসুর খলিফাকে বললেন আমীর জুবাইর তারপর আমার হাতে একটি দিনারের থলি গুজে দিয়ে বলল —আমাদের জন্য আপনি যা কিছু করেছেন তার মূল্য সামান্য অর্থ বা কৃতজ্ঞতা স্বীকারের মাধ্যমে পরিশােধ হবার নয়। তবু আপনি এটি ধরুন। আমাদের মাঝখানে আপনি এসে না পড়লে আমাদের উভয়েরই জিন্দেগী বরবাদ হয়ে যেত। এতে মাত্র তিন হাজার দিনার আছে গ্রহণ করে আমাদের ধন্য করুন। আমি প্রতিবাদ করতে পারলাম না। থলিটি হাতে নিয়ে, তাদের আশীর্বাদ করে বিদায় নিলাম।
–“ওরে ব্বাস! বিকট আওয়াজ যে! কিসের আওয়াজ ?' ইবন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে খলিফা আরামকেদারায় শরীর এলিয়ে দিয়ে নাক ডাকিয়ে নিদে বিভাের। হায় খােদা! খলিফা নিদ যাচ্ছেন আর ইবন্ তাঁকে কিসসা শুনিয়ে চলেছেন।
ইবন্ কামরা ছেড়ে নিজের জায়গায় গিয়ে আগের মতই গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল। কিসসাটি শেষ করে বেগম শাহরাজাদ চুপ করলেন।
মুহূর্তকাল পরে বেগম ফিন মুখ খুললেন—কী তাজ্জব বাৎ জাহাপনা, যে-কিসসা শুনে খলিফা হারুণ-অল-রসিদ নাক ডাকিয়ে নিদে বিভাের হয়ে পড়েছিলেন সে-কিসসা আপনার চোখে নিদ আনতে পারল না!
—“আমি যে ঠিক তার বিপরীত কোশিস চালিয়ে যাচ্ছি।
আমার চোখে যাতে নিদ না আসে সে-কোশিসের বাৎ সমঝাতে চাইছি। বাদশাহ শারিয়ার সরবে হেসে উঠলেন। বেগম শাহরাজাদও তার সঙ্গে হাসিতে যােগ দিলেন। হাসি থামিয়ে বাদশাহ শারিয়ার বললেন—“এবার তােমার মুখ থেকে আমরা একটি শিক্ষামূলক কিসসা শুনতে চাচ্ছি, কি বল দুনিয়াজাদ!
দুনিয়াজাদ হাততালি দিয়ে বলে উঠল—বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা! বহিনজী এখনই শুরু করে দাও। এখনও তাে রাত্রি অনেকই আছে। এর মধ্যে যতটুকু হয় বল।
বাদশাহ শারিয়ার এবার বললেন—এমন এক কিসসা বল যে সব লেড়কী স্বামীর দিলে কেবলমাত্র নারীদেহ ভােগের কামনা জাগিয়ে তােলে আর তাকে সুখ-ভােগের মধ্যে ডুবিয়ে রেখে গােরের দিকে টেনে নিয়ে যায়। পরিণামে তাদের কি শাস্তি হতে পারে তা-ও যেন কিসসার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। 

উজিরের লেড়কি ও কসাই ওয়ার্দার কিসসা 

জাঁহাপনা, কোন এক সময়ে কায়রাে নগরে ওয়াদা নামে এক নওজোয়ান বাস করত। তার একটি কসাইখানা ছিল। গােস্তর কারবারী। কায়রাে নগরেই ছিল তার গােস্তর দোকানটি।
একটি লেড়কি রােজ ওয়ার্দার দোকানে মাংস খরিদ করতে আসত। তার কেবলমাত্র মুখটিই নয়, পা থেকে মুখ অবধি রঙ ছিল বিবর্ণ, চকের মত ফ্যাকাসে। চোখ দুটোর দিকে তাকালেও তাকে বড়ই ক্লান্ত বােধ হত। কেমন যেন বিষন্ন, মনমরা। লেড়কিটি যখন গােস্ত খরিদ করতে আসত তখন ঝাকা নিয়ে কুলি তার পিছনে থাকত। সে দোকানে এলেই ভেড়ার সবচেয়ে মাংসল অংশ ও এক জোড়া রাং খরিদ করত। একটি করে সােনার ছােট মােহর দিয়ে রােজ দাম মেটাত। গােস্ত থাকত কুলিটির ঝুড়ির ভেতরে। তারপর সে ঘুরে ঘুরে বাজার থেকে হরেক কিসিমের সওদা খরিদ করত। লেড়কিটির বাইরের স্বভাবও ছিল তার চেহারার মত ম্যাড়ম্যাড়ে। প্রয়ােজন ছাড়া কারাে সঙ্গে দাঁড়িয়ে বাৎচিৎ করা ছিল তার স্বভাব বিরুদ্ধ কাজ।
লেড়কিটির দীর্ঘদিন ধরে একই রকমভাবে চলাফেরা, গােস্ত খরিদ করা আর সওদাপাতি কুলির মাথায় চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া—সব কিছু দেখে ওয়ার্দার মধ্যে কৌতুহলের উদ্রেক ঘটল। কিন্তু লেড়কিটি নির্বাক। কৌতুহল নিবৃত্ত করার উপায় কি? বাধ্য হয়ে ওয়ার্দাকে ধৈর্য ধরতেই হ’ল।
কিছুদিনের মধ্যে ওয়ার্দা অপূর্ব এক সুযােগ পেয়ে গেল। এক বিকালে লেড়কিটির সে কুলিকে তার দোকানের সামনে দিয়ে যেতে দেখল। হাঁক দিল। সে এগিয়ে এলে ওয়ার্দা তার হাতে একটি বড়সড় ভেড়ার মাথা দিয়ে বলল —“আমি ছাল ছাড়িয়ে একদম ঠিকঠাক করে দিয়েছি। রসুইকরকে বলবে, মাথাটি যেন গােটাই পাক করে। কুঁচিকুঁচি করলে স্বাদ থাকবে না।
কুলিটি ঘাড় কাৎ করে সম্মতি জানাল।
ওয়ার্দা একটু আমতা আমতা করে এবার আদৎ প্রসঙ্গটি পাড়ল—“ওহে মিঞা, তুমি রােজ যে-লেড়কিটির সঙ্গে বাজারে আস সে কে, বল তাে?' লেড়কিটি রােজ গােস্তর সঙ্গে একটি করে ভেড়ার অণ্ডকোষ নেয় কেন, বল তাে? আর একটি বাৎ, তাকে সব সময় যেন কেমন বিমর্ষ দেখায়।
‘জানার জন্য আপনার কলিজাটি খুবই ছটফট করছে, তাই ? তবে আমি তেমন কিছু জানি না। আপনি যখন গরীবকে ডেকে একটি ভেড়ার গােস্ত বকশিস দিলেন তখন যেটুকু জানি না বললে গুনাহ হবে। যা জানি বলছি—আমার মালকিন একদিন সওদাপাতি খরিদ করার পর ওই কোণার দিককার খ্রীষ্টানের দোকান থেকে খাওয়ার জন্য সরাব খরিদ করলেন। তারপর আমাকে সঙ্গে নিয়ে উজির সাহেবের বাগানবাড়িতে গেলেন। এক চিলতে কাপড় দিয়ে আমার চোখ দুটি বেঁধে দিলেন। আমাকে হাত ধরে টেনে একটি সিঁড়ির কাছে হাজির করলেন। আমাকে নিয়ে নিচে নেমে যেতে লাগলেন। কিছুটা নামতেই কে একজন আমার মাথা থেকে সওদার ঝুড়িটি তুলে নিয়ে একটি দিনার আমাকে দিল। আর চোখ বাঁধা অবস্থায় ফিন সিঁড়ি ভেঙে আমাকে ওপরে উঠিয়ে আনা হ’ল। আমি: ঝুড়ি ফেলেই ফিরে আসি।
—“আচ্ছা, এতগুলাে গােস্ত, মােমবাতি ও বাদাম প্রভৃতি রােজ তার কি কাজে লাগে?
—সে খবর আপনাকে দিতে পারব না হুজুর।
–‘ব্যস, এ-পর্যন্তই তােমার দৌড়? কিন্তু মিঞা, আমার কৌতূহল দমন করা তাে দূরের কথা এ যে দেখছি আরও হাজার গুণ বাড়িয়ে দিলে। 
কুলিটি ওয়ার্দাকে সালাম জানিয়ে বিদায় নিল। লেড়কিটির ব্যাপার নিয়ে ওয়ার্দা ভাবতে বসল। এমন কি রাতভর একই ভাবনায় ডুবে রইল।
পরের দিনও একই ঘটনা ঘটল। লেড়কিটি গােস্ত খরিদ করল। দাম মিটিয়ে দিয়ে কুলিটিকে নিয়ে চলে গেল।
ওয়াদা জেদ ধরল—যে করেই হােক ব্যাপারটির একটি হিল্লে সে করবেই। আর তা আজই করে ফেলবে। সে নজর রাখল কখন সে বাজার ছেড়ে যায়।
এক সময় সওদা সেরে লেড়কিটি বাজার থেকে বেরিয়ে যেতে লাগল। ওয়ার্দা ভেড়া জবাইয়ের একটি বড়সড় ভােজালি হাতে নিয়ে তার পিছু নিল। লেড়কিটি যাতে তাকে দেখতে না পায় এমন কায়দায় ও দূরত্ব বজায় রেখে রেখে সে গােপনে তাকে অনুসরণ করতে লাগল। উজিরের বাগিচার সামনে হাজির হ’ল লেড়কিটি। ওয়ার্দা একটি গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল সে বড় একটি রুমাল দিয়ে বেশ করে কষে কুলিটির চোখ দুটো বেঁধে দিল। তাকে নিয়ে কিছু দূর এগিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। কিছু সময় বাদে কুলিটি বেরিয়ে এল। তার চোখ খােলা। ওয়ার্দা খুবই সতর্কতার সঙ্গে লেড়কিটিকে অনুসরণ করতে লাগল। লেড়কিটি এগােতে এগােতে অতিকায় একটি পাথরের চাইয়ের কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। চারদিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে তাকাল। না, ধারে কাছে কেউ-ই নেই। লেড়কিটি এবার নিচের দিকে ঝুঁকল। পাথরের একটি বিশেষ জায়গায় হাত দিয়ে চাপ প্রয়ােগ করল। ব্যস, মুহুর্তে একটি গর্ত বেরিয়ে গেল। গর্তটির মুখেই একটি পাথরের সিঁড়ি। লেড়কিটি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। একেবারে ভো ভা।
ওয়ার্দা এবার পা টিপে টিপে সে গর্তটির কাছে গেল। পাথরটির গায়ে চাপ দিল। তারপরই সিঁড়ি। এবার কসাইয়ের জবানীতেই কিসসার পরবর্তী অংশ শােনা যাক। 
কসাই ওয়ার্দা বলল —গর্তের মুখে পাথরচাপা দিয়ে দেওয়া ভেতরে জমাটবাঁধা অন্ধকার দেখা দিল। নিজের হাতটিকে পর্যন্ত ভালভাবে দেখা যায় না। কোন্ দিকে যাব, কি করব চট করে ভেবে উঠতে পারলাম না। হঠাৎ দেখতে পেলাম মৃদু আলাের রেখা। হাল্কা আলােটুকু সম্বল করে পা টিপে টিপে এগােতে লাগলাম। বুকের ভেতরে অনবরত হাতুড়ির ব্যস্ততা।
সামান্য এগােতেই সামনে একটি দরওয়াজা পড়ল। তাতে কান ঠেসে ধরলাম। ভেতর থেকে হাসির রােল ভেসে এল।
দরওয়াজার গায়ে ছােট একটি ছিদ্র ছিল। সে-ছিদ্রপথে আলাে বেরিয়ে আসতে দেখলাম। আমি কৌতুহলের শিকার হয়ে ছিদ্রটিতে চোখ লাগিয়ে ভেতরের দৃশ্য দেখার চেষ্টা করলাম। অতর্কিতে সােজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। হ্যা, অবিকল সে-লেড়কিটির মতই বটে। ফিন ছিদ্রটিতে চোখ লাগালাম। নিঃসন্দেহ হলাম, সে-লেড়কিটিই তাে বটে।
আমার বুকের উত্তেজনা অনেকাংশে বেড়ে গেল।
আমি আবার ছিদ্রটিতে চোখ রাখলাম। তাজ্জব বনে গেলাম। দেখলাম, লেড়কিটি একেবারেই বিবস্ত্রা। চিৎ হয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে সে শুয়ে। আর একটি ইয়া গােদা বানর তার ওপরে উঠে কি যেন করছে। দলাইমালাই। একেবারে লদকালদকি করার মত ভাব।
নাকি করছেও তা-ই? ধুৎ ছাই, এমন ঘটনা কখনও ভাবা যায় ?
বানরটির মুখ কিন্তু অনেকটা মানুষের মুখের মত।
বানরটি এবার নিজের মুখটি নামিয়ে লেড়কিটির মুখের কাছে নিয়ে গেল। লেড়কিটি উত্তেজনায় তার ঠোট দুটোকে নিজের ঠোটের ওপর ঠেসে ধরল। তারপর মাথাটি বার বার এদিক-ওদিক কাৎ করে চারটি ঠোটকে হরদম ঘষাঘষি করতে লাগল।
বানরটি এবার যেন হিংস্র নেকড়ের মাফিক ক্ষেপে গেল। এক লাফে লেড়কিটির ওপরে চেপে গেল। তারপর উভয়ে উভয়কে শরীরের সবটুকু তাগদ নিঙড়ে দিয়ে জড়িয়ে ধরল। বানরটি এবার তার লােমশ শরীরটি দিয়ে লেড়কিটিকে প্রায় ঢেকে ফেলল ।
বানরটি এবার যেন অধিকতর উন্মাদদশা প্রাপ্ত হল। লেড়কিটির ওপর বার বার লাফালাফি দাপাদাপি শুরু করে দিল। আর লেড়কিটি ? সে তলে পড়ে তৃপ্তিতে-আবেগে-উচ্ছাসে বার বার কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। আরও কিছুক্ষণ অবর্ণনীয় উত্তেজনায় জাপ্টাজাল্টি, লাফালাফি, দাপাদাপি করে হাঁপাতে লাগল। একবার নয়। পর পর তিনবার বানরটি লেড়কিটির বুকের ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। লাফালাফি দাপাদাপি করল আর কিছুক্ষণ ধরে বিশ্রাম করল।
আমি ভাবলাম তিনবারেই বানরটির কম্ম ফতে হয়ে যাবে। কিন্তু আমার ধারণা ভুল—সম্পূর্ণ ভুল। অন্ততঃ দশবার তাে হবেই। ইয়া আল্লা! তাজ্জব ব্যাপার! বানরটি না হয় জানােয়ার—সবই সম্ভব। কিন্তু লেড়কিটি? এক রাত্রে পর পর দশবার সে যে কি করে বানরটির ধস্তাধস্তি বরদাস্ত করল আমার দিমাকে এল না।
( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments