আরব্য রজনী পার্ট ১০৮ (Arabyarajani Part 108)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
জুবাইর চিঠিতে আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। আর গতরাত্রে সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলায় আমি যে অসুবিধার  সম্মুখীন হয়েছিলাম তার জন্য মার্জনা ভিক্ষা করেছে। আমি জুবাইর-এর মকান থেকে বেরিয়ে পথে নামলাম।
যে কাজের দায়িত্ব নিয়ে আমি এত দূর এসেছিলাম তার ফয়দা কিছুই হল না। ব্যর্থ মনােরথ হয়ে বুদুর-এর প্রাসাদে হাজির হলাম। দেখি, সে আমারই পথ চেয়ে জানালায় দাড়িয়ে।। আমি প্রাসাদের ভেতরে ঢুকতে না ঢুকতেই বুদুর কয়েক কদম এগিয়ে এসে মুচকি হেসে বলে উঠল—ইবন্ সাহাব, ফয়দা কিছুই হ’ল না। ঠিক কিনা? বেকার হয়রান হবেন, আমি তাে জানতামই।
বুদুর-এর বাৎ শুনে আমি স্তম্ভিত হলাম।

সব শেষে বুদুর আমাকে তাজ্জব করে দিল, যখন সে আমার ও জুবাইর-এর মধ্যে যেসব বাৎচিৎ হয়েছে সবই অবিকল বলতে লাগল।
তার ব্যাপার স্যাপার দেখে আমি যেন একেবারে আশমান থেকে পড়লাম। মনে মনে বল্লাম-লেড়কিটি কি গণৎকার, নাকি যাদুমন্ত্র কিছু জানে? তা যদি না-ও হয় তবে সে আমার পিছনে নির্ঘাৎ গােয়েন্দা টোয়েন্দা কিছু লেলিয়ে দিয়েছিল।
আমি বললাম—ব্যাপার কি, এত সব তুমি জানলে কি করে ? কাছে পিঠে কোথায় গা-ঢাকা দিয়েছিলে নাকি?”
ম্লান হেসে সে আমার প্রশ্নের জবাব দিল—‘লুকিয়ে শােনার দরকার পড়ে না ইবন্ সাহাব। সাচ্চা মেহবুবার কাছে কোন কিছুই লুকানাে যায় না। আপনার কোন কসুরই নেই। সবই আমার নসীব।”
এক সময় চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আশমানের দিকে তাকিয়ে ফিন বলতে শুরু করল-“মহব্বতের দেবতা, আত্মার দেবতা—আল্লাহ, আমার দিলকে শক্ত করে বাঁধার শক্তি দাও! আমার জুবাইর যদি কোনদিন নিজের ভুল বুঝতে পেরে আমার দরওয়াজায় হাজির হয় তবে আমি মুখ ঘুরিয়ে থাকব। বুদুর আমার মেহনতের জন্য সুকরিয়া জানিয়ে আমাকে বিদায় দিল।
আমীর মহম্মদ-এর সাথে ভেট করলাম। তার মকানে দু’ রাত্রি কাটিয়ে ফিন বাগদাদে ফিরে এলাম।
পরের সালে আমি ফিন বসােরায় নগরে গেলাম।
জাঁহাপনা, কিসসা বলার মাঝে আপনাকে বলা হয় নি, আমীর মহম্মদ একবার আমার কাছ থেকে বহুৎ দিনার হাওলাৎ নিয়েছিল।
ফি বছর একবার করে বসােরায় গিয়ে তার কিস্তির দিনার নিয়ে আসতাম। সে সালে বসােরায় গিয়ে মনে করলাম কি, একবারটি বুদুর-এর প্রাসাদে গিয়ে মেহবুব মেহবুবার খবর নিয়ে আসি।
বুদুর-এর প্রাসাদের দরওয়াজায় পা দিতেই কলিজাটি আচমকা মােচড় মেরে উঠল। প্রাসাদের দরওয়াজা-জানলা সব বন্ধ। দরওয়াজার জাফরি ফাক করে সচকিত হয়ে ঝট করে সােজাভাবে দাড়িয়ে পড়লাম। আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল নতুন একটি স্মৃতিসৌধ। কবরের গায়ে কি সব লেখা। ছােট ছােট হরফ। দূর থেকে পাঠোদ্ধার করতে পারলাম না।
আমি চাপা আর্তনাদ করে উঠলাম—ইয়া আল্লাহ! লেড়কিটি শেষ পর্যন্ত বেহেস্তেই চলে গেল। অভিশপ্ত যৌবন! যৌবনের ভােগ-বাসনা অপূর্ণ রেখেই দুনিয়া ছেড়ে বুদুর চলে গেল! একটি তাজা ফুল অকালে ঝরে গেল!
এমন সময় ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ পঞ্চাশতম রজনী 
রাত্রি একটু গভীর হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—“জাঁহাপনা, আমি বিষন্ন দিল নিয়ে জুবাইর-এর মকানে ফিরলাম। তার মকানের কাছাকাছি আসতেই আমাকে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হ’ল। এখানে আর এক তাজ্জব ব্যাপারের মুখােমুখি হলাম। দেখি জুমাইর-এর মকান ভেঙেচুরে জমিনের সঙ্গে মিশে গেছে। সব ফাঁকা। চমৎকার বাগিচাটি—উধাও হয়ে গেছে। ধারে কাছে এমন কোন আদমি নেই যাকে জিজ্ঞাসা করে আদৎ ব্যাপারটি জেনে নিতে পারি। ইয়া আল্লাহ! এ কী কারবার। শেষ পর্যন্ত কি নওজোয়ানটিও গােরে চলে গেল। একটি কবিতা মনে পড়ে গেল। যার মর্মার্থ হল-  ‘দরওয়াজার গােবরাট দেখেই আমার চোখে পানির ধারা নেমে এল। সে-আতিথেয়তার শাহজাদা আজ কোথায় উধাও হয়ে গেল? আমার পাশাপাশি যারা বসত সে সব মেহমানরা কোথায় গেল? মাকড়সা প্রশ্ন করছে, আর তার জবাব দিচ্ছে বাতাস। 
আমি দুঃখ সহ্য করতে না পেরে ডুকরে কেঁদে উঠলাম। আচমকা আমার পিছনদিক থেকে এক বুড়াে বিকট স্বরে গর্জে উঠল –চুপ কর বেকুব কাহিকার! তাজ্জব বনলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, এক নিগ্রো ক্রীতদাস। 
আমি চোখ মুছতে মুছতে বললাম—‘গােসসা করছ কেন ভাইজান? আমার এক দোস্ত দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। তারই নাম করে একটু চোখের পানি ফেলছি।
—“দোস্ত? কে তােমার দোস্ত হে? –‘জুবাইর বিন উমাইর।
–‘ধৎ, যত্তসব অলক্ষুণে কথা! তিনি মরতে যাবেন কেন হে?! খােদার দোয়ায় তিনি বহাল তবিয়তেই আছেন।
বহাল তবিয়তে—তবে মকান, বাগিচা সব গেল কোথায় ? ‘মহব্বতের জন্য–‘ম-হ-ব্ব-ৎ? মহব্বতের জন্য?
--জী হা, মহব্বতের জন্য। জুবাইর জিন্দা আছেন বটে। তবে গােরে যেতে আর খুব বেশী দেরী নেই। ক্ষুধা-তৃষ্ণা বােধ নেই। বােধশক্তি মাঝে-মধ্যে ফিরে এলেও মুখফুটে খানা চাইতে পারেন না। তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে গেলেও পানি চাওয়ার হিম্মৎ টুকুও আজ আর তার নেই।'
–তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জুবাইর’কে গিয়ে বল মনসুর সাহাব দরওয়াজায় দাঁড়িয়ে।
ক্রীতদাসটি চট করে ভেতর থেকে ঘুরে এসে আমাকে সঙ্গে ক'রে নিয়ে গেল।
আমি কামরার ভেতরে ঢুকেই জুবাইর-এর মুখােমুখি হলাম। দেখি সে পালঙ্কের ওপরে আধ-শােয়া অবস্থায়। হাড্ডি কটি সার। কঙ্কালের মত নিশ্চল-নিথর। দরওয়াজার দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে। শরীরে এক ছিটে খুন আছে বলেও মালুম হ’ল না। 
আমি দরওয়াজায় দাঁড়িয়ে জুবাইরকে সালাম জানালাম। কুশলবার্তা জানতে চাইলাম। তার দিক থেকে কোন সাড়াই পেলাম না। নিগ্রো ক্রীতদাসটি আমার কানের কাছে মুখ এনে অনুচ্চকণ্ঠে বলল--কবিতা ছাড়া তিনি এখন কিছুই শুনতে পান না।'
তার কথাটি কানে যেতেই চমকে উঠলাম। ধরতে গেলে খুবই ঘাবড়ে গেলাম। মুহূর্তে নিজের অসহায় অবস্থা কাটিয়ে একটু স্বাভাবিক হতে পারলাম। একটি কবিতা আওড়াতে লাগলাম। কবিতাটির বিষয়বস্তু - 
বুদুর এখনও তােমার খুবলে খুবলে ক্ষতবিক্ষত আত্মাকে শিক্ষা দিয়ে চলেছে। অথবা তুমি তার নির্দেশ এখনও অনুভব করছ না? অথবা এখনও সে নির্ঘুম রাত্রি যাপন করে চলেছে। তুমি এক মূর্খ, নির্বোধ, নির্বোধ-প্রেমিক।
আমি নড়েচড়ে দাঁড়ালাম। হ্যা, কাজ হয়েছে। কবিতাতে কাজ হয়েছে। জুবাইর-এর নিশ্চল চোখের মণি দুটো সচল হ’ল। খুবই অনুচ্চ কণ্ঠে কোনরকমে উচ্চারণ করল—ইবন্ বিন-মনসুর। সালাম। আমার হালৎ তাে চোখের সামনেই দেখছেন। যা কিছু বিলকুল বিলিয়ে দিয়ে আজ আমি ভিখমাঙ্গা বনে গেছি। | আমি একই রকম অনুচ্চকণ্ঠেই জবাব দিলাম—“আমি কি আপনার কোন উপকারে লাগতে পারি?
-ইবন সাহাব, একমাত্র আপনার পক্ষেই আমার জানটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব। মেহেরবানি করে আমার একটি চিঠি যদি বুদুর-এর কাছে পৌছে দেন, আমার কথা তাকে বলেন তবে ধন্য হ'ব। একমাত্র আপনার পক্ষেই একাজ সম্ভব বলে আমি মনে করি।
--আপনার হুকুম তামিল করব আল্লাহর নামে কসম খাচ্ছি।
তাজৰ বনে গেলাম। আমার বাৎ তার কানে যেতে না যেতেই কাশচালিলতের মাফিক তড়াক করে পালঙ্কের ওপর বসে পড়ল। হাত বাড়িয়ে পাশ থেকে এক চিলতে কাগজ ও কলম টেনে নিয়ে লিখতে লাগল।
মেহবুব বুদুর,
মালুম হবে আমি হয়ত পাগল বনে গেছি। আমার দিমাক বিলকুল খতম। চোখের তারায় সুস্পষ্ট হতাশার ছাপ। জর্জরিত দিশেহারা। একসময় মালুম হয়েছিল মহব্বৎ বােকামি ছাড়া কিছু নয়। ধারণা ছিল, এর মত সহজ-সরল-হাল্কা আর কিছুই নেই। কিন্তু তােমার অদৃশ্য জবরদস্ত মহব্বতের জোয়ারে ক্রমে বিপর্যস্ত হতে হতে আজ আমার দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। মহব্বৎকে একদিন খড় কুটোর মত তুচ্ছ জ্ঞান করে দু পায়ে ঠেলে দিয়েছিলাম। আজ কিন্তু স্পষ্ট মালুম হচ্ছে মহব্বৎ সাগরের মত অতল এবং অনন্ত তার বিস্তৃতি। আমার কলিজা আজ টুকরাে টুকরাে। তােমার সান্নিধ্য ছাড়া তাে আমার কলিজা স্বাভাবিকতা ফিরে পাবে না। আমাকে তােমার বুকে টেনে নাও। অতীতে তােমার মহব্বতকে অবমাননা ও তাচ্ছিল্য জ্ঞান করার জন্য আমি আভূমি-লুষ্ঠিত হয়ে মার্জনা ভিক্ষা করছি। মেহেরবানি করে আমার কসুর মাফ করে দাও। | বুদুর আমার, একবারটি ভেবে দেখ তাে একদিন আমাদের উভয়ের মধ্যে মহব্বতের কী দুর্নিবার আকর্ষণই না ছিল! তােমার বিরহ আমাকে গােরে যাবার জন্য প্রেরণা জোগাচ্ছে। আমার জান খতম হয়ে এল বলে। তুমি এত নিষ্ঠুর হতে পার না, পারবে না আমার নিশ্চিন্ত বিশ্বাস—ইতি—
আমি আমীর জুবাইর-এর চিঠি জেবে নিয়ে পথে নামলাম।
বুদুর কোথায়, কি তার বর্তমান হালৎ কিছুই আমার মালুম নেই।
বুদুর-এর মকানে ঢুকে সােজা তার বৈঠকখানার দরওয়াজায় হাজির হলাম। ভেতরে উঁকি দিতেই আমার কলিজা তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। দেখি, বুদুর দশটি বাদী পরিবেষ্টিত হয়ে কামরার মেঝেতে বসে। তার তবিয়ৎ, মেজাজ মর্জি আগের চেয়ে ঢের, ঢের শরিফ। তার চোখে-মুখে বুকে যৌবনের জোয়ার। হেসে হেসে বাদীদের সঙ্গে মজলিশে মেতেছে নাকি? ভাবতে লাগলাম—তবে সেদিন কার কবর দেখেছিলাম? 
আমাকে দরওয়াজায় দেখেই একগাল হেসে অভিনন্দন জানাতে গিয়ে বুদর বলল—কী নসীব আমার! আসুন—ভেতরে আসুন। দ্বিধা-সঙ্কোচের কোনই কারণ নেই।
-খােদাতাল্লার দোয়া তােমার ওপর বর্ষিত হােক। –কি ব্যাপার, সকালে বৈঠকখানায় চুপচাপ বসে আমার মুখের-বাৎ কেড়ে নিয়ে বুদুর বলল —সেই যে সেই লেড়কিটি, মারা গেছে। বাগিচায় তার গাের দেয়া হয়েছে। তার দু চোখের কোল বেয়ে পানির ধারা নেমে এল।"
--‘সবই খােদাতাল্লার মর্জি। পরম করুণাময় তার আত্মার মঙ্গল করুন।দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি বল্লাম-লেড়কিটি তােমাকে বহুৎ পিয়ার করত, তুমিও তাকে পিয়ার ঢেলে দিয়েছিলে। তার জন্য তােমার চোখের পানি তাে ঝরবেই।
-হ্যা, লেড়কিটিকে আমি বহুৎ পিয়ার করতাম, ঠিকই।
পরিস্থিতিটি একটু সামাল দিয়ে নিয়ে আমি জেব থেকে আমীর জুবাইর-এর চিঠিটি বুদুর-এর হাতে তুলে দিয়ে বললাম—শােন, তােমার বিরহে তার হালৎ আজ একেবারেই শােচনীয়। মােউতের সাথে পাঞ্জা লড়ে চলেছে। তােমার মতামত শােনার জন্য এখনও জানটিকে টিকিয়ে রেখেছে।
চিঠিটির ওপর এক ঝলক চোখ বুলিয়ে নিল। ম্লান হাসল। ঠোটের কোণে হাসির রেখাটুকু অক্ষুন্ন রেখেই সে বলল —“সে তাে গত সালেরই ব্যাপার তাই না, আমার চিঠিটি পড়ে সে পরম বিতৃষ্ণায় ছিড়ে ফেলেছিল? এরই মধ্যে আমার বিরহে একেবারে গােরে যাবার মত হালৎ হয়ে গেল! যাক গে, আমার উদ্দেশ্য ফলপ্রসু হয়েছে। আমার নীরবতায় সে হতাশায় জর্জরিত হয়েছে। তাকে কাছে ফিরে পাবার জন্য আমি সব রকম কোশিস করেছিলাম। কিন্তু প্রতিবারই সে বিতৃষ্ণায় আমাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। তবুও হাল ধরে রেখেছিলাম। _ এ পর্যন্ত বলতে না বলতেই ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ' একান্নতম রজনী
বেগম শাহরাজাদ পরের রজনীতে কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাহাপনা, ইবন্ বিন্ মনসুর খলিফা হারুণ-অল-রসিদ’কে কিসসা শােনাচ্ছে। সে এবার বল্ল তুমি ঠিকই করেছ। সে যে জঘন্য কসুর করেছে তাকে হাল্কা চোখে বিচার করে অল্পেতে ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না। তবে এ-ও সাচ্চা বাৎ ক্ষমা আদমির চরিত্রের এক মহৎ গুণ। আমি এ-ও বলছি, এমন এক প্রাসাদোপম বিশাল মকানে নিঃসঙ্গ অবস্থায় পড়ে থেকে তােমার কি-ই বা ফয়দা? আর তার জান যদি খতমই হয়ে যায় তবে কি আর তুমি শান্তি পাবে, বল? তুমি কি জিন্দেগীভর অনুশােচনায় দগ্ধে মরবে না?
বুদুর চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল–হ্যা, আপনার বাৎ-ই সাচ্চা। আমি তার চিঠির জবাব জরুর দেব।
বুদুর কাগজ-কলম নিয়ে চিঠি লিখতে বসল।
জাহাপনা, তার সে-চিঠির ব্যাপারে আপনাকে কি যে বলব, মালুমই হচ্ছে না। কী চমৎকার তার লেখার ভঙ্গি, কী চমৎকার তার ভাব, কী চমৎকার যে তার ভাষা আপনাকে বলে বুঝাতে পারব না। যাকে বলে ভাব—ভাষা আর আবেগে একেবারে মাখামাখি অবস্থা। আপনার দরবারের সবচেয়ে বড় কবি বা লেখকও হয়ত এমন একটি চিঠি দাঁড় করাতে পারবেন না। আর আমার পক্ষে তাে চিঠির বক্তব্য হুবহু বলা সম্ভবই নয়। তাই বাধ্য হয়ে তার বক্তব্য আর আমার ভাষা মিলিয়ে ঝুলিয়ে আপনার দরবারে পেশ করছি - 
মেহবুব,
আমাদের উভয়ের মধ্যে যে কেন ছাড়াছাড়ি হয়েছিল তা সাধ্যাতীত কোশিস করেও আমার পক্ষে জানা সম্ভব হয় নি। অতীতে এমন কোন কসুর হয়ত হয়েছিল যার ফলে আমাদের উভয়ের মধ্যে বিচ্ছেদের প্রাচীর গড়ে উঠেছিল। তবে ভরসা এটুকুই যে, সে-অতীতের আজ মৃত্যু ঘটেছে। মেহবুব আমার, তুমি আমার বুকে কবে ফিরে আসবে তারই প্রতীক্ষায় আমি পথ চেয়ে বসে থাকব। তােমার খুবসুরৎ গালে আমার চোখ দুটো ডুবিয়ে দিয়ে আমি পরম শান্তিতে নিদ যাব। আমার চোখ থেকে সেই কবে নিদ উধাও হয়েছে, তুমি কি জান? এবার আমি সুখে নিদ যেতে পারব শুনেই আমার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে, খুশীতে দিল ডগমগিয়ে উঠছে। জিন্দেগীর যাবতীয় তেষ্টা যে-পানীয় মেটাতে পারে তুমি এলে উভয়ে একত্রে তা পান করব। কি গাে, রাজী তাে? আর পান করে করে যদি বেহেড মাতালও হয়ে পড়ি তবু কেউ কিছু বলবে না, বলার কেউ নেই। এ-মুহূর্ত থেকে তােমার পথ চেয়ে বসে থাকাই আমার একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়াল।
আমি বুদুর-এর হাত থেকে চিঠিটি নিয়ে কোর্তার জেবে গুজতে খুঁজতে বললাম—“তােমার চিঠি অবশ্যই জীবনীশক্তি ফিরিয়ে এনে চাঙা করে তুলবে। আর দুঃখ-যাতনা দিল থেকে বিলীন করে দেবে।
আমি চৌকাঠ ডিঙতে যাব অমনি বুদুর আমার কোর্তার কোণা ধরে হাল্কা টান দিল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম।
বুদুর কাতর দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল —ইবন সাহাব, মেহেরবানি করে এমন বন্দোবস্ত করবেন যাতে আজই আমরা বেহেস্তের রাত বানিয়ে ফেলতে পারি—তাকে বলবেন। আমি হাঁফাতে হাঁফাতে আমীর জুবাইর-এর দরওয়াজায় হাজির হলাম। দেখি সে দরওয়াজা খুলে, কুর্শি পেতে বসে অপলক চোখে পথের দিকে তাকিয়ে।
চিঠিটি পড়ামাত্রই তার চোখ দুটো চিকমিকিয়ে উঠল। পর মুহুর্তেই চোখের কোল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। খুশীর অশ্রু। আবেগে-উচ্ছ্বাসে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল। মালুম হ’ল কি যে বলবে, আর কি-ই বা করবে ভেবে ওঠাই তার পক্ষে মহাসমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর পারল না। এক সঙ্গে জোয়ারের পানির মত আনন্দের কাছে নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। কুর্শি থেকে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। ব্যস, সংজ্ঞা হারিয়ে একেবারে শক্ত কাঠ হয়ে গেল।
ক্রীতদাসীরা পানির বদনা নিয়ে ছুটে এল। চোখে-মুখে ঘন ঘন পানির ছিটা পড়তে লাগল। চোখ মেলে তাকাল এক সময়। আমার মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। এতবড় কামরাটি বিলকুল নীরব নিস্তব্ধ। এক সময় সে-ই নীরবতা ভঙ্গ করল—ইবন সাহাব, চিঠিটি কি তার নিজের হাতেই লেখা ?
—হাতে ছাড়া আর কিসে লিখবে? ইচ্ছা করেই আমি এমন একটি খাপ ছাড়া উত্তর তার দিকে ছুঁড়ে দিলাম।
আমার মুখের বাৎ ফুরাতে না ফুরাতেই পর্দার আড়ালে কার যেন পায়ের শব্দ শােনা গেল। মালুম হ’ল কেউ যেন পায়ে মল পরে হাঁটছে।
আমার ধারণা বিলকুল ঠিক। মুহূর্তের মধ্যে বুদুর পর্দা ঠেলে আমাদের কামরায় ঢুকে পড়ল। জাহাপনা, সে যেন এক বেহেস্তের দৃশ্য। আপনাকে আমি বলে বুঝাতে পারব না।
আমীর জুবাইর যন্ত্রচালিতের মত তড়াক করে লাফিয়ে সােজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। দুই কপােত কপােত বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে এসে পরস্পরের কণ্ঠলগ্ন হয়ে পড়ল। আমার উপস্থিতির কথা আবেগ-উচ্ছ্বাসের জোয়ারে তাদের মন থেকে মুছে গেল। শরম টরম তাদের দিল থেকে সে-মুহুর্তের জন্য অন্ততঃ উবে গিয়েছিল।
আমি পিছন ফিরলাম। বুঝলাম তাদের কারােরই টু শব্দটিও করার উপায় নেই।
( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments