আরব্য রজনী পার্ট ১০৭ (Arabyarajani Part 107)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
বাসােরাহ শহরের সবচেয়ে নামজাদা জহুরী। বহুৎ খাতির ছিল তার। বহুৎ সাল মােলাকাৎ নেই। মালুম হচ্ছে তিনি আর এ দুনিয়ায় নেই। আচ্ছা, তার কোন লেড়কা বা লেড়কি … 
লেড়কির চোখ দুটোর কোণায় এবার পানির বিন্দু দেখা দিল। চোখ মুছতে মুছতে আমার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে সে বলল–আপনার খেয়াল যখন পুরােদস্তুর আছে, আপনি যখন তার জিগরী দোস্ত তখন আর আপনার কাছে বলতে বাধা নেই। তার একটি লেড়কি আছে। বুদুর তার নাম। সে-ই তার স্থাবর অস্থাবর বিলকুল সম্পত্তির মালিক।' তার মুখের ওপর চোখের মণি দুটোকে বার কয়েক বুলিয়ে নিয়ে এবার নসীব ঠুকে প্রশ্নটি দিলাম ঠুডে–বু-দুর? তবে কি তুমিই সে বুদুর ?
–হ্যা, আপনার অনুমান অভ্রান্ত। আমিই বুদুর।

—তাই তাে আমি এতক্ষণ বে-শরমের মত নাকাবের ফাক দিয়ে তােমার মুখটিকে বার বার দেখার কোশিস করছিলাম। মালুম হচ্ছিল, তুমি বিরক্ত হচ্ছ, তবু না তাকিয়ে পারছিলাম না। তােমার কলিজা জুড়ে কী যে দুঃখ! কিন্তু প্রাসাদতুল্য এ-মকান, অগাধ ধন দৌলত তাে বিলকুল তুমি একাই ভােগ করছ। তােমার দুঃখ কোথায়, আমার কাছে খােলসা করে বল তাে। আল্লাতাল্লার বােধহয় এটিই মর্জি। সেজন্য তিনি হয়ত আমাকে এখানে টেনে এনেছেন। তােমার দুঃখ-যন্ত্রণা আমি লাঘব করে দেব, বল কি সমস্যা তােমার ?
—“আপনি যতই আপনজন হন না কেন, আমার গােপন ব্যাপার কেন আপনার কাছে ফাস করতে যাব? আপনাকে আমি চিনি না। নাম-ধাম বিলকুল অজানা। কোন কিসিমের আদমি আপনি তা-ও আমার জানা নেই।
-নাম? আমার নাম ? ইবন্ আল-মনসুর। দামাস্কাসে আমার ঘর। খলিফা হারুণ-অল-রসিদ-এর আমি বহুৎ পিয়ারের আদমি। দোভী দিয়ে তিনি আমার কলিজা খরিদ করে নিয়েছেন। আমি থামতে না থামতেই বুদুর সােল্লাসে বলে উঠল—“থামুন! থামুন! আর দরকার নেই। আপনাকে সেবা করার সুযােগ দিয়ে আমাকে ধন্য করুন। কুর্শি এগিয়ে দিয়ে বলল বসুন, এখানে বসুন। তারপর আরও দু-চারটে মামুলি বাৎচিৎ হ’ল। তারপর বুদুর আমাকে নিয়ে অন্দর মহলের একটি কামরায় গেল।
কামরাটির জানালা খুললেই চমৎকার বাগিচাটি।
খানাপিনা সারতে সারতে বুদুর চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—আমার মুখে তকলিফের ছাপই আপনাকে আমার ব্যাপারে ভাবিয়ে তুলেছে, এবার মালুম হ'ল। বলব, আপনার কাছে কিছু ছিপাব না। তবে খােদার কসম, একটি শর্ত কিন্তু মানতে হবে। আমি যা কিছু আপনাকে বলব, কারাে কাছে ভুলেও ফাস করতে পারবেন না, রাজী?' 
আমি ঘাড় কাৎ করে তার কথায় সম্মতি জানালাম। 
-তবে বলছি, শুনুন আমার নসীবের বিপর্যয়ের কাহিনী । তার কাহিনী শুরু হওয়ার মুখে বাঁদী আমার থালায় ক গােলাপ জাম দিল।
আমি তার মুখে যে কাহিনী শুনলাম তার সারাংশ আদতে আমার জীবনেরই কিসসা—যখন মহব্বতের জালে জড়িয়ে পড়লাম তখন আমার কলিজা, আমার মেহবুব কাছ থেকে বহুৎ দূরে চলে গেছে। বুদুর এটুকু বলেই থেমে গেল। চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল । ওড়না দিয়ে চোখ মুছতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। 
‘তােমার সুরৎ অতুলনীয়। যার সঙ্গে তােমার মহব্বৎ হয়েছিল তার সুরৎ-ও অবশ্যই আকর্ষণীয়ই ছিল। তার কি নাম বল তাে?
—“আপনার অনুমান অভ্রান্তই বটে। তার সুরৎ খুবই আকর্ষণীয় ছিল। আর তার নাম জুবাইর বিন উমাইর। একজন সম্ভ্রান্ত আমীর। তামাম বসােরাহ বা ইরাকে তার মত খুবসুরৎ নওজোয়ান আর দ্বিতীয়টি নেই।
–তােমার মহব্বতের কথা কিছু বলবে কি?
—মহব্বতের কথা? সে তাে বহুৎ, বহুৎ কথা। আমরা ক্রমে একে অন্যের কাছে এগিয়ে আসতে আসতে একেবারেই ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলাম। তারপর খুবই সামান্য একটি কারণে আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। মাত্র ছােট্ট একটি সন্দেহ-ই এর জন্য দায়ী।
–‘শোভন আল্লাহ! হায় আল্লা এ কী শুনছি! তােমার মত লেড়কীকে সন্দেহ ধুৎ! আচমকা দমকা বাতাসে পদ্মফুল কাদায় গড়াগড়ি খেতে পারে, তাই বলে তাকে সন্দেহ করা চলে? যত্তসব— আর যদি সন্দেহের মধ্যে কিছু সত্যতা থেকেও থাকে তবু তাে তােমার মুখের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেই সব সন্দেহ ধুয়ে মুছে যাবার কথা।
—তা-ও ফিন কোন পুরুষের টুরুষের ব্যাপার হলেও না হয় হ'ত। নিছকই একটি লেড়কিকে দিয়ে তার সন্দেহ।
–‘তাজ্জব ব্যাপার! লেড়কিকে নিয়ে সন্দেহ!’ 
‘আলবাৎ। এই যে লেড়কিটিকে দেখছেন, স্রেফ একে নিয়ে তার ছিল সন্দেহ।
‘খােদাতাল্লার করুণা তােমার ওপর বর্ষিত হােক। কোন আদমি টাদমি নয়-ই, শয়তানও এরকম বাৎ বিশ্বাস করতে উৎসাহী হবে না। বিতিগিচ্ছিরি কাণ্ড তাে! এক লেড়কির সাথে দুসরা এক লেড়কির মহব্বৎ—ধ্যৎ! বল তাে, এরকম অদ্ভুত একটি সন্দেহ। তার ভেতরে দানা বাঁধল কি করে?
--- লেড়কিটি গােসল করার সময় আমার গায়ে সাবান মাখিয়ে দেয়। গােসল হয়ে গেলে চুল বেঁধে দেয়। সালােয়ার কামিজ হাতে তুলে দেয়। মােদ্দা কথা, তখন সে আমার গায়ে গায়ে থাকে। একদিন গােসলের শেষে সে আমার চুল আঁচড়ে দিচ্ছিল। আমার গা তখন একটিমাত্র তােয়ালে দিয়ে ঢাকা ছিল। গরমের হাত থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য সে হঠাৎ আমার গা থেকে তােয়ালেটি সরিয়ে ফেলে। চুলবাঁধা সেরে আমাকে বেমালুম জড়িয়ে ধরল। দু’গালে চুমু খেল। তারপর বলল —আমি মরদ হলে দেখিয়ে দিতাম মহব্বৎ কি করে করতে হয়।
-তারপর? তারপর কি হল?
–‘তারপর সে আমাকে ফিন জড়িয়ে ধরল। নানা কৌশলে আমাকে চটকা-চটকি করতে লেগে গেল। উমর কমতি তাে, কতটুকু কায়দা কৌশলই বা তার জানা আছে। যা-ই হােক, সে যখন আমার শরীরটিকে নিয়ে পুরােদস্তুর মজে রয়েছে ঠিক তখনই আমার মেহবুব আমীর দরওয়াজা ঠেলে কামরায় ঢুকল। আমাদের দু’জনকে জাপ্টাজাপটি করতে দেখে সে নিঃশব্দে কামরা ছেড়ে চলে গেল। এক টুকরাে কাগজ পেলাম। তাতে লেখা যে মহব্বৎ কাউকে হাতে তুলে দেওয়া যায় না, সেই মহব্বৎ আমাদের উভয়কে খুশী করতে পারে।
আমি ব্যস্ত হয়ে সালােয়ার কামিজ গায়ে চাপিয়ে কামরার বাইরে এলাম। ততক্ষণে সে ভো ভা—পালিয়েছে। ব্যস, সেই দেখাই আমাদের শেষ দেখা।
–‘এক বাৎ, তােমাদের শাদী হয়েছিল কি?
-শাদী বলতে যা বােঝায় তা আমাদের অবশ্যই হয় নি। মহব্বৎ-ই ছিল আমাদের দু' জনের বন্ধনের মূল সূত্র। একই সঙ্গে এক বিছানায় আমরা রাত্রি গুজরান করতাম।'
-আমি কি একবার কোশিস করে দেখতে পারি ? দেখাই যাক না যদি তােমাদের ভুল বােঝাবুঝির অবসান ঘটাতে পারি, কি বল?” 
আমার বাৎ শুনে বদর-এর দু' চোখের কোণে পানি দেখা দিল। চোখ মুছতে মুছতে বলল —“আপনি কোশিস করতে চাইলে আমি আপত্তি করব না। তবে খেয়াল রাখবেন, আমাদের দু'জনের পথ এখন আলাদা আলাদা দিকে বয়ে গেছে। ইয়াদ রাখবেন, যে আদমির দিল পাষাণ সেরকম এক আদমির উপকার করতে আপনি প্রয়াসী হচ্ছেন। আমি একটি চিঠি লিখে দিচ্ছি, মেহেরবানি করে আপনি সেটি আমার মেহবুবা জুবাইর-এর হাতে তুলে দেবেন। আর আপনার ইচ্ছাকে কার্যকরী করার কোশিস করবেন। ব্যস, আর কি-ই বা আমার বলার থাকতে পারে, বলুন?
বুদুর এবার খস্ খস্ করে একটি চিঠি লিখে আমার হাতে দিল। চিঠির বক্তব্য-মেহবুব আমার, বিরহ-জ্বালা আর কতদিন আমাকে সইতে হবে, বল তাে? তোমার অনুপস্থিতির বেদনা আমার রাতের নিদ কেড়ে নিয়েছে। বহু দিন আগে তুমি আমার কাছ থেকে দূরে সরে গেছ। স্বপ্নে তােমাকে দেখলেও আজ চেনা সম্ভব নয়।
আমাকে ফেলে দরওয়াজা খুলে তুমি ভেগে গেছ। মহল্লার আদমিরা কত কিছুই না সুযােগ বুঝে বলাবলি করে। আমার গায়ে কালি দেয়। তােমার কাছে আমি কী যে কসুর করেছি, এখনও আমার কাছে স্পষ্ট নয়। দিল থেকে তােমার দ্বিধা ঝেড়ে মুছে ফেল। তখন দেখবে, আমাদের পুনর্মিলনের ব্যাপারটি ভাবতে কেমন উৎসাহ জাগে। আমরা দুই-ই মিলে ফিন এক হয়ে গেলে খােদাতাল্লা আমাদের দোয়াই করবেন। তার মর্জিও তা-ই। আর দূরে সরে থেকো না। ইতি-তােমার মেহবুবা বুদুর।
কিসসার এ পর্যন্ত বলা হতে না হতেই ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ উনপঞ্চাশতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসাটির জের টানতে গিয়ে বললেন-“জাহাপনা, বুদুর তার মেহবুব জুবাইর-এর চিঠিটি এবং এক হাজার দিনার আমার কুর্তার জেবে পুরে দিল। আমি ওজর আপত্তি জানালাম। ধােপে টিকল না।  এমনও বললাম, তার পরলােকগত পিতার প্রতি কর্তব্য সম্পাদ করতে গিয়ে কাজটি করে দেয়া আমার অবশ্য কর্তব্য। এ খরচাপাতির প্রশ্নই ওঠে না।
আমি এবার জুবাইর বিন উমাইর-এর মকানে হাজির হলাম। তার আব্বার সাথে আমার যথেষ্ট হৃদ্যতার সম্পর্ক ছিল। আজ সে মৃত। জুবাইর তখন শিকার করতে বনে বনে ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছে। অপেক্ষা করতেই হল।
জুবাইর ফিরে এলে আমি আমার নাম, ধাম ও অন্যান্য পরিচয় দিতেই সে খুবই ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তার অনুপস্থিতিতে আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে বলে বহুভাবে অনুশােচনা প্রকাশ করতে লাগল। আর তার মাকানে কম-সেকম এক দিনের জন্য আতিথ্য গ্রহণ করার জন্য একদম ঝােলাঝুলি করতে লাগল।
জাহাপনা, নওজোয়ানটিকে আগুনের টুকরা বললে হয়তাে ঠিক বলা হবে না, দাবানল বলাই সঙ্গত। লেড়কিটি কেন মর্ম বেদনায় ভুগছে তা এবার বিলকুল মালুম হ'ল। অপলক চোখে তাকে দেখতে লাগলাম।
জুবাইর আমাকে এক রকম জোর করেই তার মকানে সেদিন রেখে দিল। দুপুরে খানাপিনা সারতে গিয়ে তাজ্জব বনে গেলাম। হাজার কিসিমের খানার বন্দোবস্ত। গলা পর্যন্ত ঠেসে খানা সারলাম। আর সরাব ? কী যে তার স্বাদ আর খুসবু আপনাকে বলে বুঝাতে পারব না।
জাহাপনা, মেহেরবানি করে আমার প্রতি অবিচার করবেন না। আপনি হয়তাে ভাবছেন খানাপিনা আর জুবাইর-এর আদর আপ্যায়নে মজে গিয়ে আমি আদৎ ব্যাপারটিই ভুলে গিয়েছিলাম। তা কিন্তু মােটেই না। খানার টেবিলে বসে, খানা সামনে রেখে আমি জুবাইরকে বললাম—‘খানা শুরু করার আগে আমি খােদার নামে কসম খেয়ে বলছি, আপনার কাছে একটি প্রার্থনা রাখব। আপনি যতক্ষণ না সেটি মঞ্জুর করেন ততক্ষণ আপনার আয়ােজিত চর্বচোষ্যলেহ্যপেয় খানা আমি ছুঁয়েও দেখব না।'
–“মঞ্জুরের প্রশ্ন তাে আগে নয়। সবার আগে তাে আপনার প্রার্থনার কথা আমার জানা দরকার। তবে এটুকু অন্ততঃ জানবেন, আপনি আমার মেহমান, আপনাকে খানা ফেলে উঠে যেতে দিচ্ছি না। অতএব আপনার প্রার্থনা মঞ্জুর হবে বলেই ধরে নিতে পারেন।
আমি তার কাছ থেকে অভয় পেয়ে কোর্তার ভেতরের জেব থেকে বুদুর-এর দেয়া চিঠিটি বের করে তার হাতে গুঁজে দিলাম।
চিঠির ভাজ খুলে চোখের সামনে ধরতেই জুবাইর-এর মুখে ক্রমে লাল ছােপ ফুটে উঠতে লাগল।
মুহুর্তের মধ্যে জুবাইর-এর চোখ-মুখ হিংস্র চিতার মাফিক হয়ে উঠল। চিঠিটি টুকরাে টুকরাে করে ছিড়ে মেঝেতে ফেলে দিল। তারপর প্রচণ্ড আক্রোশে পা দিয়ে সেটিকে মেঝেতে ঘষতে ঘষতে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—‘মান্যবর ইবন আল-মনসুর, আপনি আমাকে যা হুকুম করবেন আমি হাসিমুখে মেনে নেব। কিন্তু আমার সনির্বন্ধ অনুরােধ, মেহেরবানি করে এ-চিঠিটির ব্যাপারে কিছু বলে আমাকে উত্যক্ত করবেন না। আমি চিঠির জবাব দিচ্ছি না। আপনাকেও কিছু বলার ইচ্ছে নেই।
আমি তার বাৎ শুনে খানার টেবিল ছেড়ে উঠে আসতে যাব অমনি সে আমার হাত চেপে ধরল। অনুরােধের স্বরে বলল।
—“আপনি আমার মেহমান—'বক্তব্য শেষ না করে সে মুহূর্তকাল নীরবে কাটিয়ে বিষন্নকণ্ঠে বলল—কেন যে আমি তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে এসেছি তা শুনে নিরপেক্ষভাবে বিচার করলে, নিজেকে আমার জায়গায় দাঁড় করালে দেখবেন, আমাকে জোর করার ইচ্ছা আপনার মধ্য থেকে উবে গেছে। ফিন যদি এও ভেবে থাকেন যে, আপনিই প্রথম তার চিঠি ও অনুরােধ নিয়ে আমার কাছে হাজির হয়েছেন, তবে অবশ্যই ভুল করবেন। আপনাকে আগে কিছু বলতে হবে না। সে আমাকে কি বলতে চেয়েছে আমি সবই আপনাকে বলে দেব। এবার সে তার বক্তব্য পেশ করতে লাগল।
জাহাপনা, আমি তাজ্জব বনে গেলাম। নওজোয়ান জুবাইর বিলকুল ঘটনা আমাকে বলে দিল। " আমি তার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম। জুবাইর এবার আচমকা আমার হাত দুটি জড়িয়ে ধরে বলল—“আপনি কেন যে ফালতু এর মধ্যে নিজেকে টেনে আনতে উৎসাহী হচ্ছেন, বুঝছি না! মেহেববানি করে নিজেকে গুটিয়ে নিন। আমার মেহমান হয়ে যতদিন দিল চায় থেকে যান। আপনার সেবাযত্ন করে যাতে নিজেকে ধন্য করতে পারি তা-ই করুন।
জাঁহাপনা, বিশ্বাস করুন, জুবাইর-এর আচরণে আমি যেন ক্রমেই কেমন বদলে যেতে লাগলাম। তার আতিথ্য গ্রহণ না করে আমার পক্ষে কিছুতেই চলে আসা সম্ভব হ’ল না।
জুবাইর আমাকে রীতিমত তােয়াজ টোয়াজ করেই তার মকানে রাখতে লাগল। আমিও তার আপ্যায়নে যারপরনাই খুশী।
একদিন খানাপিনার টেবিলে বসে বলব কি বলব না ভাবতে ভাবতে কথাটি বলে ফেললাম—“আপনি এত সব বন্দোবস্তের মাধ্যমে আমাকে খুশী করতে প্রাণান্ত প্রয়াস চালাচ্ছেন। কিন্তু একদিনও নাচা-গানার আয়ােজন তাে করলেন না। আমার বাৎ শােনামাত্র তার মুখটি অকস্মাৎ চকের মত ফ্যাকাসে হয়ে গেল। এক সময় চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল —“দেখুন, ওসব বহু দিন আগেই আমার কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। তবে আপনি আমার মেহমান, আপনি উৎসাহী হলে বন্দোবস্ত করতেই হয়।
আমি মতামত ব্যক্ত করার আগেই সে এক ক্রীতদাসীকে গানা গাইতে ফরমাশ দিল। গাওয়া গানটির মর্মার্থ হল “সরাবের বােতল আর পেয়ালা তো সঙ্গেই রয়েছে। তুমি কি এখনও সে সুধা পান করনি ?... যে যাতনা আমাদের খুশী করে, যে চুম্বন আমাদের কলিজাকে ঠাণ্ডা করে, যে চুম্বন আমাদের নিঃস্ব রিক্ত করে দেয়, আমাদের বিরক্তির উদ্রেক করে তার স্বাদ কি তুমি পাও নি?  যে গুলাব আন্ধারে পুড়ে খাক হয়ে যায় তার খুসবু তুমি কি আজও পাও নি?'
গানা খতম হতে না হতেই জুবাইর আচমকা কুরশি থেকে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। সংজ্ঞা লােপ পেল।
গাইয়ে ক্রীতদাসীটি বিষমুখে জুবাইর-এর দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই আমার প্রতি অভিযােগ করল-“হুজুর, এর জন্য আপনিই পুরােপুরি দায়ী। আমি বহু দিন ওঁকে গান গেয়ে শােনাই নি। বিষাদের গান শুনলেই ওর কলিজায় আগুন জ্বলে যায়। ব্যস, তারপরই ওঁর সংজ্ঞা লােপ পায়।
আমি বাস্তবিকই বিমর্ষ হয়ে পড়লাম। নিজেকে বড়ই অপরাধী বােধ হতে লাগল। ক্রীতদাসীটি তাকে বিরক্ত করতে বারণ করল। তারপর আমাকে সঙ্গে করে আমার থাকার কামরায় পৌছে দিয়ে গেল।
সকাল হ’ল। আমি বিদায় নেবার জন্য তৈরি হতে লাগলাম। এক নফর আমার কামরার দরওয়াজায় এসে দাঁড়াল। সালাম জানিয়ে একটি চিঠি আর এক হাজার দিনারের একটি পুঁটুলি আমার হাতে গুঁজে দিল। জুবাইর চিঠিতে আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। আর গতরাত্রে সে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলায় আমি যে অসুবিধার
( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments