গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
খলিফা অসহায় দৃষ্টি মেলে তার দিকে তাকিয়ে বললেন—মসরুর, কিছুতেই যে নিদ আসছে না। কি করি বল তাে? -“জাহাপনা, হয়ত কোন ভাবনা চিন্তায় দিমাক গরম হয়ে গেছে। দিমাক ঠাণ্ডা না থাকলে নিদ আসবে কি করে?
-“সবই তাে বুঝলাম। কিন্তু এখন উপায় কি করি, বল?
‘জাহাপনা, বাইরে বহুৎ ঠাণ্ডা বাতাস, একটু পায়চারি করলে স্বস্তি আসতে পারে। দিমাকও ঠাণ্ডা হবে। তবেই দেখবেন দু’ চোখের পাতা এক হয়ে আসবে। বাগিচায় গাছের ফাঁকে ফাঁকে খুসবুর মেলা বসে গেছে। ফুরফুরে বাতাস। মাথার ওপরে আশমানে তারার খেলা। আর ইয়া বড় চাদ আশমান-দুনিয়া সব কিছু পাহারা দিচ্ছে। চলুন জাহাপনা, বাগিচায় একটু পায়চারি করে আসবেন, কলিজা ঠাণ্ডা হবে।
–‘ধৎ! এসবে আজ আর দিল নেই মসরুর।
-“ছাড়ান দিন তবে। এক কাজ করা যাক জাহাপনা, আমি প্রাসাদের হারেমে যেসব খুবসুরৎ বাঁদী রয়েছে তাদের খবর দিচ্ছি, তৈরি থাকতে। আপনি তাদের মধ্যে থেকে কোন একজনকে নিয়ে রাত্রিটুকু কাটিয়ে দিন।
–না, এসবেও আজ আমার রুচি নেই মসরুর।
—“তবে আপনার দরবারে যেসব জ্ঞানী-গুণী আদমি রয়েছেন তাদের কাউকে আপনার নাম করে তলব করছি।।
–না, না মসরুর তাতেও আজ আমার রুচি নেই, দিল টানছে।
–‘জাহাপনা, প্রাসাদের ভাড়ারে দুনিয়ার সবচেয়ে আচ্ছা আচ্ছা সরাব জড়াে করা রয়েছে। হুকুম হলে আমি দৌড়ে গিয়ে---
‘সরাব? অসম্ভব! সরাবে আমার দিল ঠাণ্ডা হবার নয়। অন্য কোন ফিকির তােমার জানা থাকলে চলতে পারে।
এমন সময় প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচার গাছে গাছে পাখির কিচির মিচির শুরু হয়ে গেল। ভােরের পূর্বাভাষ। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ সাতচল্লিশতম রজনী
রাত্রি একটু গভীর হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগমের কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—জাঁহাপনা, মাসরুর কোন যুক্তি দিয়েই যখন খলিফা হারুণ অল রসিদকে তুষ্ট করতে পারল না তখন বিরক্ত হয়ে বলে উঠল—জাঁহাপনা, কিছুতেই যখন আপনার দিল নেই তবে আমার গর্দান নামিয়ে নেবেন? তবে হয়ত আপনার দিল শান্ত হবে, স্বস্তি পাবেন।
মসরুর-এর বাৎ শুনে খলিফা সরবে হেসে উঠলেন। তারপর এক সময় হাসি থামিয়ে বললেন—বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা বাৎ বলেছ মসরুর! বলা যায় না, একদিন হয়ত তােমার গর্দান নামানাের জরুরৎ হতেও পারে।
মহর্তকাল নীরবে ভেবে খলিফা এবার বললেন-“মসরুর, তােমার গর্দান নেবার ব্যাপারটি এখন চাপা থাক। তুমি বরং এক কাজ কর। একটু ঘুরে এস। যার সান্নিধ্য আমার দিলকে আনন্দ দান করতে পারে এরকম কোন আদমির দেখা পেলে তাকে আমার কামরায় নিয়ে এসাে।
খলিফার হুকুম তামিল করতে দেহরক্ষী মসরুর তার দিল খুশী করার মত লােক খুঁজতে গিয়ে প্রাসাদ তােলপাড় করল। শেষ পর্যন্ত মখ ব্যাজার করে খলিফার কামরার দরওয়াজায় এসে ফিন দাঁড়াল। তাঁকে নিজের ব্যর্থতার কথা জানাল।।
খলিফা সক্রোধে বলেন—“তাজ্জব ব্যাপার দেখছি! এমন কাউকেই মিল্ল না যে আমার অস্থির দিলকে ঠাণ্ডা করতে পারে!
—জাঁহাপনা, তামাম প্রাসাদ ঢুঁড়ে বুড়াে হতচ্ছাড়াটিকে ছাড়া আর তেমন কারােরই দেখা মিলল না।
-বুড়াে হতচ্ছাড়া! কে ? সে কে বল তাে। –‘জাঁহাপনা, ইবন্ আল-মনসুর।
—“ইবন্ আল? কোন্ ইবন্ আল, বল তাে। দামাস্কাসের ইবন্ আল-মনসুর ?
–‘জী জাহাপনা। হতচ্ছাড়া সে-শয়তানটির হদিসই পেলাম।'
–‘মসরুর, দেরী কোরাে না, নিয়ে এসাে। বুড়াে ইবন্ আল’কে আমার তলব দাও। খলিফার হুকুম তামিল করতে মসরুর ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল। কয়েক মুহুর্তের মধ্যেই ইবন আল’কে তার সামনে হাজির করল।
খলিফা বললেন—ইবন্ আল সাহাব, আপনার মুখ থেকে দুঃসাহসিক কোন কাহিনী শােনার জন্য আমার দিলে চাঞ্চল্য বােধ করছি। . বুড়াে ইবন্ আল নতজানু হয়ে খলিফাকে কুর্ণিশ ক'রে বললেন—‘জাহাপনা, আপনার হুকুম আমি অবশ্যই তামিল করব। লেকিন একটি বাৎ, কোন কিসিমের কিসসা আপনি শুনতে চাইছেন?'
তার কথার তাৎপর্যটুকু বুঝতে না পেরে খলিফা নীরব চাহনি মেলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।'
ইবন আল বিচক্ষণ আদমি। তিনি খলিফার মানসিক হালতের বাৎ বিবেচনা করে বললেন—জাঁহাপনা, আমি জানতে চাইছি, আমি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছি এরকম কোন বাস্তব ঘটনা, নাকি অন্য কারাে মুখ থেকে শােনা কিসসা শুনতে আপনি বেশী উৎসাহী?
‘কানে শােনা কিসসা নয়, নিজের চোখে দেখেছেন এরকম কোন কিসসাই আপনি মেহেরবানি করে আমাকে শােনান। চোখে দেখা ঘটনা দিলের ওপর বহুৎ দাগ কাটে।
–তবে শুনুন জাঁহাপনা। আমার অনুরােধ কিসসা শােনার সময় মেহেরবানি করে দিলকান-চোখ বিলকুল সজাগ রাখবেন।
জাহাপনা, আমি আপনার দয়ায় প্রাসাদে ঠাই পেয়েছি বটে। এখানেই দিন গুজরান করে চলেছি। তবে এ-ও অবশ্যই শুনে থাকবেন, আমি হর সালই দিন কয়েকের জন্য সােরাহ-তে যাই। আপনার নায়েব মহম্মদ আল-হামানী সেখানে বসবাস করেন। আদতে তারই সঙ্গলাভের প্রত্যাশায় বসােরাহ-তে ছুটে যাই।
আমি এক সাল তার প্রাসাদে গেলাম। প্রাসাদের সদর দরওয়াজার কাছে পৌছে দেখি আল-হামামী সাহাৰ ঘােড়ার পিঠে বসে। পূছতাছ করে জানতে পারলাম, শিকারে যাচ্ছেন।
আমাকে দেখেই আল-হামামী উচ্ছাস প্রকাশ করে বলে উঠলেন-“এসাে—চলে এসাে ইবন-আল।
আমি মুখ কাচুমাচু করে জবাব দিলাম—‘মাফ করবেন। ঘােড়ার পিঠে আমি চাপছি না। ঘােড়ার পিঠে চাপলেই আমার গা ঘুলায়, শির টলতে থাকে। আমি গাধার পিঠে চেপে যেতে পারি, রাজী?'
গাধার পিঠে চেপে শিকারে যাবার কথা শুনে আল-হামামী তাে হাসতে হাসতে ঘােড়ার পিঠ থেকে পড়ে যাবার জোগাড় হয়েছিলেন। হাসি থামিয়ে এক সময় বললেন-“মালুম হ’ল, শিকারে যাবার মন নেই তােমার। তবে প্রাসাদেই থেকে যাও। আমি ফিরে আসা পর্যন্ত অবশ্যই থাকবে কিন্তু, ইয়াদ থাকে যেন।
আল-হামামী আমাকে প্রাসাদে রেখে শিকারে চলে গেলেন। আমি আল-হামামী'র অনুপস্থিতিতে তার মেহমান হয়ে প্রাসাদে বাস করতে লাগলাম। একদিন ভাবলাম, যতবার এখানে এসেছি প্রতিবারই প্রাসাদেই দিন গুজরান করি। বড় জোর প্রাসাদের লাগােয়া বাগিচায় কয়েক চক্কর মারি। কিন্তু বসােরাহ শহরটিকে ঘুরে ঘুরে দেখা হয়ে ওঠেনি। এখন আমি একা, অপূর্ব সুযােগ। ঘুরে ঘুরে সব কিছু না দেখলে শেখা যায় না। আমি প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে হারা উদ্দেশ্যে বসােরাহ নগরের পথে পথে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। খুশিতে আমার দিল্ চাঙা হয়ে উঠতে লাগল। জাঁহাপনা, প্রায় সত্তরটি বড় রাস্তা তামাম বসােরাহ শহরকে ঘিরে রেখেছে। সবগুলােই লম্বায় প্রায় আড়াই শ' মাইল।
একবার আমি একদম একা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম।
ব্যস, এক সময় যেন দারুন চক্করের মধ্যে পড়ে গেলাম। রাস্তা হারিয়ে ফেললাম। পথচারীরা আমাকে বােকা হাঁদা ঠাওরায় সেজন্য কাউকে জিজ্ঞাসা করতেও শরমে বাঁধল। আমি অস্থির হয়ে হাঁটছি তাে হাঁটছি। মাথার ওপরে জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড সূর্যও যেন আমার সঙ্গে রেষারেষি করে তাপ বিকিরণ করে চলেছে। ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেলাম। কোর্তা-চোস্ত বিলকুল ভিজে জবজবে। কিন্তু গলা শুকিয়ে একদম কাঠ। তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাবার উপক্রম।
পানির খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। এক সময় এক গলি দিয়ে চলতে গিয়ে প্রাসাদোপম একটি মকান নজরে পড়ল। পেল্লাই মকান। তার গায়ে এক চিলতে বাগিচাও রয়েছে দেখলাম।
আমি এক পা-দু’পা করে বাগিচার মধ্যে ঢুকে গেলাম। বাগিচার চারদিকে মার্বেল পাথরের বেদী। বসার বন্দোবস্ত। আমি এগিয়ে গিয়ে একটি বেদীর ওপরে বসে পড়লাম। গাছের হিমেল বাতাস পেয়ে সবে বেদীটির ওপর শরীর এলিয়ে দিয়েছি অমনি মালুম হ’ল কে যেন গান গাইছে। লেড়কির কণ্ঠ। বহুৎ বড়িয়া গানা—একদম মন-মৌজী। দিলকে পাগল করে দেবার মত গানাই বটে। তার সে-গানার বক্তব্যটুকু আমার এখনও স্পষ্ট ইয়াদ আছে জাহাপনা—‘আমার দিল থেকে চঞ্চল হরিণটি যখন বিদায় নিল তখন তার স্থান দখল করে বসল দুঃখ আর হতাশা। কেন সে আমাকে ত্যাগ করল? কুমারী লেড়কিরা যাতে আমাকে পেয়ার মহব্বত করে সেরকম ছলনার আশ্রয় তাে আমি কোনদিনই নেই নি, তবে?
সে গানার বক্তব্যে আমার দিল রহস্যের গন্ধ খুঁজে পেল। ফিন ভাবলাম লেড়কিটির সুমিষ্ট কণ্ঠের মাফিক তার সুরৎ-ও যদি মনলােভা হয় তবে তামাম দুনিয়ায় এ-ই হবে অনন্যা।
আমি শ্বেত পাথরের বেদী ছেড়ে উঠে পড়লাম। প্রাসাদোপম মকানটির দরওয়াজায় হাজির হলাম। বহুমূল্য রেশমী কাপড়ের পর্দাটি সামান্য ফাক করে দেখার কোশিস করলাম। বৃথা কোশিস। কিছুই নজরে পড়ল না।
আচমকা পিছন ফিরতেই বাগিচার ঠিক কেন্দ্রস্থলে দু'টি লেড়কিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। সুরৎ দেখে মালুম হ’ল তাদের মধ্যে একজন নির্ঘাৎ বাদী। আর দ্বিতীয় লেডকিটিই গানা গেয়েছিল। দিমাক খারাপ করে দেওয়ার মত সুরৎ-ই বটে। লেড়কি দু'টিকে দেখে একটি কবিতা আমার দিলে ভেসে উঠল, যার মমার্থ হচ্ছে-‘লেড়কিটির চোখের কোণে ব্যাবিলনের আগুন জ্বলছে। তার ঘাড়ের ওপরে যুঁই ফুলের মত সফেদ একটি বাতি। তার সে-সুরৎ-কে রাত্রির আন্ধার অভিনন্দন জানায়। তার উন্নত স্তন দুটি কী নরম, তুলতুলে। আহা মরি মরি! স্তন দুটিকে বুঝি পরম স্নেহে নিটোল করে গড়ে তােলা হয়েছে। ফিন এমনও হতে পারে, স্তন দুটি পরম স্নেহের ছােয়ায় দলা পাকানাে সফেদ গােস্তর পিণ্ড।’
জাহাপনা, বিশ্বাস করুন, তার সে-সুরৎ চোখের সামনে দেখে আমার পক্ষে আর নিজেকে সংযত রাখা সম্ভব হল না ।
আমি তখন নিজেকে হারিয়ে, উন্মাদের মত চিল্লিয়ে উঠেছিলাম—‘শােভন আল্লাহ! যদি পারতাম তবে আমি তাকে আমার চোখ দুটি দিয়ে গিলে ফেলতাম। ইয়া আল্লাহ, এত সুরও তােমার দুনিয়ায় আছে?'
আমার কণ্ঠ শুনে লেড়কিটি ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। আচমকা পরপুরুষের মুখােমুখি হওয়ায় ঝট করে নাকাবটি টেনে মুখটিকে আড়াল করে দিল।
আমার এরকম বেশরম আচরণ দেখে লেড়কিটি ক্ষেপে একেবারে লাল হয়ে গেল। বাঁদীটিকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিল।
বাঁদীটি হিংস্র বাঘিনীর মাফিক আমার ওপর ঝাপিয়ে পড়ার উপক্রম হ’ল। দাঁত-মুখ খিচিয়ে বলে উঠল—‘বে-শরম বেতমিস কহিকার, শুনি তােমার মতলবটি কি? অচেনা-অজানা আদমির মকানের অন্দর মহলে ঢুকতে তােমার শরম লাগল না? অচেনা লেড়কির দিকে নজর বুলাতে চোখ দুটো কাঁপল না ? চুল-দাড়ি তাে পেকে একেবারে সফেদ হয়ে গেছে। দু’দিন বাদে গােরে যাবে। বেআক্কেল কাহিকার! লেড়কিদের সুরৎ দেখার যদি এতই লালচ তবে আগে কোথায় ছিলে নাগর আমার? এখন বুড়া হাড্ডি নিয়ে সুরৎ-
রূপসীটির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই আমিও বেশ চড়া স্বরেই জবাব দিলাম—“হা,–হ্যা, বুড়া তাে হতেই চলেছি। উমর লুকোবার তো আর কোন ফিকির নেই যে, কমিয়ে টমিয়ে যা হােক কিছু একটা বলে দেব। আর লালচ আর শরম টরমের ব্যাপার বল। তবে সেটা অবশ্য স্বীকার করতেই হবে।
–আঃ কী আমার রসের নাগর রে! বে-শরম কাহিকার! লাজ নেই তাের?'
এমন সময় ভাের হয়ে আসছে দেখে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ আটচল্লিশতম রজনী
সে রাত্রে বাদশাহ শারিয়ার একটু আগেই অন্দর মহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। কিসসার পরবর্তী অংশটুকু শােনার জন্য তার দিল্ খুব অস্থির হয়ে পড়েছিল বলে আর তর সইছিল না। বেগম মুচকি হেসে কুশল বার্তাদি সেরেই কিসসা শুরু করলেন—“জাহাপনা, মনসুর বলল —আমার মেজাজ দেখে লেড়কিটি দু'কদম এগিয়ে এসে আমার একেবারে মুখােমুখি দাঁড়াল। তেমনি খেক খেক করে বলল–তােমার ওই সফেদ চুলের চেয়ে বেশী শরমের কী-ই বা থাকতে পারে? চুল সফেদ হয়েছে, শরমও তােমার দিল থেকে একদম খতম হয়ে গেছে। তা না হলে শরম টরমের মাথা খেয়ে অচেনা আদমির প্রাসাদের হারেমে ঢুকতে দিল নেচে ওঠে?
—'খােদার কসম। আর যা-ই বল আমার পাকা দাড়ির কথা বলে বার বার খােটা দিয়াে না বলে রাখছি। আর এখানে ঢুকে পড়ার ব্যাপারটির সঙ্গে লজ্জা শরমের কি সম্পর্ক থাকতে পারে, তা-ও তাে বুঝছি না।
—“তবে এখানে কেন এলে, সাচ্চা বলবে?
-তেষ্টা পেয়েছে। তেষ্টায় ছাতি পর্যন্ত ফেটে যেতে চাইছে। এক বদনা পানি পেলে—
আমাকে বক্তব্য শেষ করতে না দিয়েই লেড়কিটি এবার বল্ল—“তুমি যখন পানির জন্য তকলিফ ভােগ করছ, পানি দিচ্ছি।
এক পরিচারিকাকে ডেকে এক গ্লাস সরবৎ আনাল। আমার হাতে দিল। আমি সঙ্গে সঙ্গে গ্লাস উপুর করে সবটুকু পানি গলায় চালান দিয়ে দিলাম। চমৎকার খুসবু বেরলাে সরবতের গ্লাস থেকে।
আমি সরবতের গ্লাসটি বাঁদীর হাতে দিতে গিয়ে খুবসুরৎ লেড়কিটির দিকে আড়চোখে তাকাতে লাগলাম। ব্যাপার তাে আদতে একই। সরবৎ আর সুরতের সুধা। কিছুমাত্রও ফারাক আছে বলে সে-মুহুর্তে অন্ততঃ মনে করি নি।
বাঁদী সুন্দরী এবার একটি তােয়ালে আমার হাতে তুলে দিল মুখ মােছার জন্য। আল্লাহকে সুকরিয়া জানাতেই হ’ল। কারণ আরও কিছুটা সময় কাটানাের ফিকির হ’ল। আমি তােয়ালেটি দিয়ে ধীরে সুস্থে মুখ মুছি আর আড়চোখে আমার দিল কা পঞ্জিটির সুরৎ দেখি। মুখ থেকে তােয়ালেটিকে নামিয়ে আনলাম গলায়। সেখানে তােয়ালেটি বুলিয়ে আরও কিছুটা সময় গুজরান করে দিলাম। তারপর তােয়ালে চলে গেল ঘাড়ে। কিছু সময় সেখানেও তােয়ালে বুলালাম। সব শেষে হাত মােছার বাহানা করলাম। এবার? উপায়ান্তর না দেখে তােয়ালেটিকে ফিরিয়ে দিতেই হ'ল।
তেষ্টার পানি পেয়ে গেছি। তােয়ালের ব্যাপারও মিটে গেছে। এবার কামরা ছাড়তেই হয়। নইলে আমার ছালই হয়ত ছাড়াবার বন্দোবস্ত হয়ে যাবে। সব কিছু বুঝেও কামরা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারলাম না। একই জায়গায় মুখ বুজে দাঁড়িয়ে রইলাম। মুখ বন্ধ বটে, আমার চোখ দুটো কিন্তু খােলা, শরম টরমের মাথা খেয়ে বার বার খুবসুরৎ লেড়কিটির দিকে তাকানাের কাজ অব্যাহতই রাখলাম।
আমি নসীব সম্বল করে কামরা ছেড়ে বেরােলাম না। ব্যাপার বেগতিক দেখে খুবসুরৎ লেড়কিটি এগিয়ে এসে বলল —“কি মিঞা, কাজ তাে মিটল এবার পথ দেখতে হয় যে। চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমি বললাম-“হ্যা, যেতে তাে হয়ই। আর আমার হাতেও বহুৎ জরুরী কাজ রয়েছে।
—“তবে আর দেরী কেন, এবার—
–“কিন্তু একটি চিন্তা আমার কলিজাটিকে খুবলে খুবলে খাচ্ছে। তাই তাে এতটুকু স্বস্তি পাচ্ছিনে।
–‘চিন্তা? কলিজা খুবলে খুবলে খাচ্ছে ? কিসের চিন্তা ? কার জন্য চিন্তা?
–“দেখুন, আমরা যদি প্রতিটি ব্যাপারকে উল্টো দিক থেকে বিচার করতে বসি তবে আখেরে কি দাঁড়াবে? বিচ্ছিন্ন সব ঘটনাকে এক সঙ্গে জুড়ে দিলেই বা তার পরিণাম কি হতে পারে, ভেবে পাচ্ছি নে!
–দেখুন মিঞা, সরবৎ গলায় ঢেলে বুঝি এখন বড় বড় ব্যাপার মাথায় উঁকি দিতে শুরু করেছে? নােংরামি আর গুণাহের ফল আমাদের ভােগ করতেই হয়, কিন্তু এমন কি হাল হ'ল যে, আমার কামরায় বসেই তার ফয়সালা করতে হবে। নিজের মুশকিল আসান করতে গিয়ে আমাকে কেন ঝুটমুট ভােগাচ্ছেন, বলুন তাে?”
-না, মানে—মানে এ মকানের মালিক আমার খুব পরিচিত। ছিল। বয়সের পার্থক্য একটু-আধটু যা ছিল আমরা আমল দিতাম না । এক জিগরী দোস্তের মকানে বসে বাৎচিৎ করতে করতে তিনি আমাকে বােধহয় এ মকানটির বিবরণই দিচ্ছিলেন। কামরাটির সর্বত্র চোখ বুলিয়ে নিয়ে ফিন বলতে শুরু করলাম—হ্যা-হ্যা, এবাড়িটির বাৎ-ই আমাকে সেদিন তিনি বলছিলেন বটে। খােদার কসম, তিনি আমার জিগরী দোস্ত ছিলেন।
–‘জিগরী দোস্ত? বহুৎ আচ্ছা বাৎ! এবার বলুন তাে মিঞা এ মাকানের মালিকের নাম কি ছিল?
‘মালিকের নাম? তার নাম আলি বিন মহম্মদ। খুব বড় জহুরী। বাসােরাহ শহরের সবচেয়ে নামজাদা জহুরী। বহুৎ খাতির ছিল তার। বহুৎ সাল মােলাকাৎ নেই। মালুম হচ্ছে তিনি আর এ
( চলবে )

0 Comments