গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
মুশা কবিতাটির দিকে সামাদ-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। সামাদ সােল্লাসে বলে উঠলেন-শােভন আল্লাহ! এ-মুলুকে যে দেখছি কবিতার ছড়াছড়ি। সামাদ এগিয়ে গিয়ে রােমান হরফে লেখা পাঠোদ্ধার করলেন। মুশাও অন্যান্যদের কাছে তার বিষয়বস্তু বললেন—“ওহে, শীঘ্র পিছন ফিরে দাঁড়াও। দেখতে পাবে, তােমার মােউৎ তােমার পিছনে দাঁড়িয়ে। নিমরড, আদম আর পারস্যের সুলতান তাকে দেখতে পেয়েছিল। আর ? আর দেখেছিল বিশ্বজয়ী বীর আলেকজান্দার। তাছাড়া কারুম, সাদাত এবং হামাম-ও তাকে দেখেছিল। তাদের ওপর কঠোর নির্দেশ হয়েছিল দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য। আর তাদের কাছে একটি প্রশ্নও করা হয়েছিল যা এ-দুনিয়ার কেউ-ই তাদের করতে পারে নি। ওহে, তােমরা শােন, আদমিদের মধ্যে জ্ঞানের বিকাশ ঘটাতে পারে একমাত্র মৃত্যুভয়।
- জিন্দেগীভর যা কিছু আচ্ছা কাম কাজ তুমি করবে এ-রক্তাক্ত জিন্দেগীতে তা-ই ফুল হয়ে আত্মপ্রকাশ করবে।
মুশা জেব থেকে এক চিলতে পাতলা চামড়া বের করে কবিতাটির আদ্যোপান্ত লিখে রাখলেন। মুশা এবার তার দলবল নিয়ে চাতালটির পাশ দিয়ে কয়েক কদম এগিয়ে একটি সুবিশাল কামরায় ঢুকে গেলেন। কামরাটির ভেতরের একটি ফোয়ারা দিয়ে ডাবের পানির মত স্বচ্ছ পানি হরদম বেরিয়ে আসছে। কামরার মেঝেতে আঁকাবাঁকা চারটি নালা দিয়ে ফোয়ারার পানি বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। নালা চারটির তল আলাদা আলাদা রঙ বিশিষ্ট। একটি পােখরাজের, একটি রক্তাভ পাথরের, একটি নীলকান্ত মণি আর সর্বশেষটি পান্নার মত সবুজ পাথর দিয়ে তৈরি। ফলে পানির রঙেও বিভিন্নতা স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। আর তাদের ছায়া পড়েছে শ্বেত পাথরের দেয়ালের গায়ে। সাগরের বুকে বিকালের বিদায়ী সূর্যের শেষ রক্তিম আভা পড়লে সাগরের পানি যেমন মনলােভা রঙ ধারণ করে কামরাটির দেয়ালগুলি যেন একই সৌন্দর্যমণ্ডিত হয়ে উঠেছে। কামরাটির ভেতরে দাঁড়িয়ে মুশা ও তার সহযাত্রীদের মালুম হতে লাগল তারা যেন বেহেস্তে পৌছে গেছে।
দ্বিতীয় দরওয়াজা দিয়ে ঢুকেই মুশা থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তার মুখ দিয়ে আচমকা বেরিয়ে এল ইয়া আল্লাহ! এখানে যে তামাম দুনিয়ার ধন দৌলত জড়াে করা হয়েছে!’ বাস্তবিকই চোখ ট্যাড়া হয়ে যাবার মত ব্যাপারই বটে। সে-কামরায় রাখা আছে সাবেক আমলের সােনা-রূপার মুদ্রা। আর ঢাই করা রয়েছে মণিমুক্তা, হীরা-জহরৎ | তাজ্জব ব্যাপার! এমন দামী দামী পাথর ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে, ভাবতেও উৎসাহ পাওয়া যায় না। কামরাটির ভেতরের একটি দরওয়াজা দিয়ে পাশের আর একটি কামরায় গিয়ে তারা দাঁড়ালেন। এখানে যেন পােশাক আশাকের দোকান সাজানাে হয়েছে। লেডকা-লেড়কিদের পােশাক থেকে শুরু করে বয়স্কদের হরেক কিসিমের বহুমূল্য পােশাকের বিচিত্র সমাবেশ। পােশাক ছাড়া সােনারূপার তৈরি বাসন কোসনও কামরার মেঝেতে পাহাড় করে রাখা হয়েছে।
মুশা চতুর্থ কামরাটিতে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলেন—এ যে দেখছি, বেহেস্তের ধন দৌলত এখানে, কামরাগুলিতে জড়াে করা হয়েছে। চোখ ধাঁধিয়ে যায়। লালসায় দিল্ রীতিমত চনমনিয়ে ওঠে।
মুশার হঠাৎ খেয়াল হ’ল, আর নয়, এবার ফেরা দরকার। তাবু ছেড়ে অনেকক্ষণ বাইরে কাটিয়েছেন। মুশা ও তার সহযাত্রীরা পিছন ফিরলেন, যে-পথে তাম্র নগরীতে প্রবেশ করেছেন সে-পথেই ফিরতে হবে।।
কয়েক পা এগােতেই মুশাফিন থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। প্রথম কামরাটিতে ফিরে আসার পরই দেখলেন, সােনার জরির কাজ করা বহুমূল্য সিল্কের পর্দা দিয়ে একটি দেয়াল সতর্কতার সঙ্গে ঢেকে দেয়া হয়েছে। কৌতূহলের শিকার হয়ে পর্দাটি উঁচু করতেই একটি দরওয়াজা নজরে পড়ল। ইয়া পেল্লাই একটি রুপাের তালা দরওয়াজাটির গায়ে ঝুলছে। মুশা এবং সামাদ—উভয়েই কঠোর সমস্যার মুখােমুখি দাঁড়িয়ে। তালাটি খােলা দরকার। কিন্তু কি করে সম্ভব? চাবি? চাবি কোথায়? সামাদ অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে চারদিকে তাকাতে লাগলেন।
কোন ফিকিরই করতে পারলেন না। তালাটা নাড়ানাড়ি করে তিনি তার গায়ে ছােট্ট একটি স্প্রিং দেখতে পেলেন। কৌতূহল হ’ল। সেটার গায়ে চাপ দিলেন। ব্যস, ছােট্ট একটি শব্দ করে তালাটি গেল খুলে।
তালাটি খুলতেই সবাই হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে গেলেন। সামনেই একটি মার্বেল পাথরের গম্বুজ দেখা গেল। তার গায়ে বহু রং বিশিষ্ট পাথর বসানাে রয়েছে। বাইরের আলাে তাদের গায়ে পড়ায় পুরাে গম্বুজটি ঝলমল করছে। ঠিক যেন বেহেস্তের সুরৎ।
কামরার মেঝেতে সােনার জরির কাজ করা কার্পেট বিছানাে। তার ওপরের ঠোটে দুটো রুবি বসানাে। একটি দর্শন পাখি। তার পাখার পালকগুলাে পান্নার তৈরি।
কামরাটির কেন্দ্রস্থলে সুদৃশ্য একটি বেদী। বেশ উঁচু। মুশা কয়েকজনকে নিয়ে তার ওপরে উঠে দাঁড়ালেন। মণি মুক্তোর কাজ করা এক চাঁদোয়ার তলায় একটি লেড়কি শুয়ে। পদ্মের পাপড়ির মত তার চোখ দুটো বােজা। নিদ যাচ্ছে। তার মাথায় মণি-মুক্তো, হীরা-জহরৎ বসানাে সুন্দর একটি মুকুট শােভা পাচ্ছে। মুক্তোর হারটি একেবারে তার কণ্ঠলগ্ন। খুবসুরৎ লেড়কিটির শিয়রে দুটো ক্রীতদাসী অদ্ভুত ভঙ্গীতে বসে। তাদের এক জনের হাতে চকচকে বর্শা আর দ্বিতীয় জনের হাতে একটি সুমসৃণ কৃপাণ।
লেড়কিটির পায়ের কাছে একটি শ্বেতপাথরের ফলক। তার গায়ে উৎকীর্ণ রয়েছে—তদমুর আমার নাম। আমি তামালকাইৎসের রাজকন্যা। এনগর আমার। এখানে যত ধন দৌলত রয়েছে সব তােমরা ইচ্ছা মত নিয়ে যেতে পার। যে এখানে আসবে বিলকুল ধন দৌলত তারই প্রাপ্য। কিন্তু খবরদার। আমার সুরতে মজে গিয়ে ভুলেও যেন আমাকে স্পর্শ কোরাে না। আমাকে স্পর্শ করলে সর্বনাশের চূড়ান্ত হয়ে যাবে, ইয়াদ রেখাে। নিদে অভিভূতা লেড়কিটিকে এক পলক দেখেই মুশার মধ্যে কেমন যেন এক অবর্ণনীয় ভাবান্তর ভর করেছিল। কিন্তু সাবধান বাণীটি পড়ামাত্র তিনি নিজেকে সামলে নিলেন।
মুশা এবার সামাদ-এর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। বললেন—এবার আমাদের ফিরে যেতে হবে। দুনিয়ার যা কিছু বিস্ময়কর বস্তু সবই তাে এক এক করে চাক্ষুষ করলাম। এ-দৃশ্য জিন্দেগীতে ভুলবার নয়।
এবার আমাদের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য সমুদ্রের ধারে গিয়ে আমাদের আকাঙিক্ষত জালাগুলােকে খুঁজে বের করতে হবে।
মুশা এবার সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বললেন—‘তােমরা খুশী মাফিক ধন দৌলত দিয়ে কোর্তার জেব ভরে নিতে পার। কিন্তু খুবসুরৎ ওই লেড়কিটিকে ভুলেও যেন কেউ স্পর্শ কোরাে না।
এমন সময় ভাের হয়ে আসছে দেখে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ ছেচল্লিশতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসাটির পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—“জাঁহাপনা, মুশা সবাইকে লেড়কিটির ব্যাপারে সতর্ক করে দিলেন।
মুশার বাৎ শুনে তালিব বিন-সাল এবার মুখ খুললেন—“হুজুর, " এ-খুবসুরৎ লেড়কিটিকে দামাস্কাসে নিয়ে গিয়ে খলিফাকে ভেট দিতে না পারলে আমার কলিজা ঠাণ্ডা হবে না। আমার দিল বলছে। ইফ্লিরে জালার বদলে এ-লেড়কিটিকে নিয়ে গিয়ে খলিফাকে ভেট দিতে পারলে তিনি হাজার গুণ খুশী হবেন। আর আপনি বলছেন কিনা—'
-না! লেড়কিটিকে কিছুতেই স্পর্শ করা যাবে না। ভুলেও যেন সে-কোশিস কোরাে না।
-“হুজুর, স্পর্শ করলে রাজকন্যা বরং খুশীই হবেন। এটুকুর জন্য তার আবার মনে করার কি আছে, মালুম হচ্ছে না তাে।'
কথা বলতে বলতে তালিব এক ঝটকায় রাজকন্যাকে কোলে তুলে নিলেন। ব্যস, মুহূর্তে এক কৃতদাসীর কৃপাণের আঘাতে তার মুণ্ডটি মেঝেতে পড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল। ধড় থেকে ফিনকি দিয়ে খুন বেরিয়ে এল।
কারবারটি এত দ্রুত ঘটে গেল যে, কেউ কিছু মালুমই করতে পারল না। মুশার মুখ দিয়ে আচমকা বেরিয়ে এল—ইয়া আল্লাহ! খুন!’ব্যস এক লাফে তিনি কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। সামাদ ও অন্যান্যরা তাকে অনুসরণ করলেন।
মুশা সহযাত্রীদের নিয়ে লম্বা লম্বা পায়ে সমুদ্রের ধারে ক্রমে থামলেন। কয়েকটি জেলেকে জাল নিয়ে কসরৎ করতে দেখলেন। তামাম তাম্র নগরী ঢুঁড়ে এখানে এসে মুশা যেন এবার স্বস্তি পেলেন। এরা—হ্যা, এরাই প্রথম কথা বল্ল।
মুশা জেলেদের বুড়াে সর্দারকে তলব করলেন। নেংটি পরা বুড়ােটি এগিয়ে এসে তাকে সালাম জানাল।
মুশা বললেন—“শােন, আমাদের খলিফা আব্দ-অল-মালিকএর হুকুম তামিল করতে আমাকে তােমাদের মুলুকে ছুটে আসতে হয়েছে। ধর্মপ্রচারক সুলেমান-এর আমলে কয়েকটি আফ্রিদি দৈত্যকে তামার জালার মধ্যে পুরে সাগরের পানিতে ছুঁড়ে দেয়া হয়েছিল। সেগুলােকে উদ্ধার করতে আমরা হন্যে হয়ে ছুটে এসেছি। এ ব্যাপারে আমি তােমাদের সাহায্যপ্রার্থী। মুহুর্তের জন্য নীরব থেকে তিনি এবার বললেন—“আর এক বাৎ, আমরা এখানে এসে তাজ্জব বনে গেছি। তামাম তাম্র নগরীর আদমিরা মুখে কুলুপ এঁটে রয়েছে, কেউ টু-শব্দটিও করছে না। ব্যাপার কি বল তাে?
—“হুজুর, সাগর পাড়ের জেলেরা আল্লাতাল্লার নির্দেশেই এখানে রয়েছে। আর আল্লাহর ধর্মপ্রচারকদের হুকুমও আমরা শিরে রাখি। তা নগরীর আদমিদের এ-হালৎ বহুৎ দিনই চলে আসছে। চলবেও শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত।
—ইফ্রিদি দৈত্যর জালার ব্যাপারটা?
-জালা! ইফ্রিদি দৈত্যের জালা পেতেও আপনাদের তকলিফ হবে না। বহুৎ ইফ্রিদি এখানে জালার মধ্যে রয়েছে। আমরা তােI মাঝে-মধ্যেই জালা থেকে ইফ্রিদি বের করে রসুইখানায় খানা পাকিয়ে খাই। যত ইফ্রিদি চান, দিয়ে দেব। কিন্তু খবরদার। খুব হুঁশিয়ার হয়ে কাজ করতে হবে। ঢাকনা খােলার সময় হাত দিয়ে জালার মুখটি আচ্ছা করে চেপে ধরে রাখবেন।
হুজুর জালা থেকে তাদের বের করার আগে কসম খাইয়ে নেবেন—ধর্মপ্রচারক মহম্মদের নির্দেশ আমরা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলব। ডেভিডের লেড়কা সুলেমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য আমরা প্রায়শ্চিত্ত করব, কসম খাচ্ছি।”
বুড়াে জেলে একটু দম নিয়ে এবার বলল—“হুজুর, খলিফা আব্দ-অল-মালিক’কে আমরা দুটো খুবসুরৎ লেড়কি উপহার দেব যাদের তুল্য লেড়কি তামাম দুনিয়া ঢুঁড়ে এলেও মিলবে না।
বুড়াে জেলে এবার ঝপ করে সাগরের পানিতে লাফিয়ে পড়ল। মুহূর্তে বারােটি তামার জালা তুলে এনে মুশা’কে বুঝিয়ে দিল। সবগুলাের গায়ে সুলেমানের মােহর অঙ্কিত।
বুড়াে ফিন ডুব দিল। পর মুহুর্তেই দুটো খুবসুরৎ লেড়কিকে নিয়ে ভুস করে ভেসে উঠল।
বাস্তবিকই লেড়কি দুটোর সুরতের তুলনা চলে না। মুখ তাে নয় যেন আশমান থেকে চাদ এনে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। বুক সমুন্নত। দেহের নিম্নাঙ্গের দিকে চোখ ফেরালে বুকের ভেতর কলিজার নাচানাচি শুরু হয়ে যায়। উরু নয় তাে যেন নিটোল কদলীকাণ্ড। আর নিতম্বের গড়নও বড়ই মনলােভা। আধ-ফোটা দুটো পদ্মের কুড়ি যেন চোখ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। চলার ভঙ্গি অনেকটা মছলির মাফিক। হেলে দুলে নেচে নেচে পথ পাড়ি দেয়। একটিবার হাসলেই যেন রাশি রাশি মুক্তো ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কণ্ঠস্বর কোকিলের স্বরকেও হার মানায়। তার হাসি আর কণ্ঠস্বর কানে গেলে নেশা লেগে যায়। কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার, কণ্ঠ দিয়ে স্বর বেরােয় ঠিকই, কোন ভাষাতেই তারা বাৎচিৎ করতে পারে না।
মুশা বুড়াে জেলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গিয়ে বলল—তােমার আচরণে আমি মুগ্ধ। তুমি যেভাবে আমাকে সাহায্য করেছ তার ঋণ কেবলমাত্র সুকরিয়া জানিয়েই শােধ করা যাবে না। সে কোশিসও আমি করব না।'
বুড়াে জেলেটি মুচকি হাসল। হাত কচলে নিবেদন করল—“হুজুর, আপনারা আমাদের মুলুকে মেহমান। আপনাদের খুশী করা তাে আমাদের অবশ্য কর্তব্য।
‘আমি তােমার কাছে একটি আব্দার রাখছি, তােমরা আমাদের মুলুক দামাস্কাসে চল। আমাদের মেহমান হয়ে কিছুদিন থেকে আসবে। আশা করি, দামাস্কাসের রূপ-সৌন্দর্য তােমার দিলকে খুশীতে ভরিয়ে তুলতে পারবে। যাবে?
বুড়াে জেলে মুহুর্তে তার সহকর্মীদের সঙ্গে চোখের ভাষায় পরামর্শ সেরে নিয়ে মুশার আমন্ত্রণ রক্ষা করার সম্মতি জানাল।
কাজ হাসিল। তামার জালা হাতে পাওয়া গেছে।
মুশা এবার তার দলবল আর জেলেদের নিয়ে দামাস্কাসের উদ্দেশে যাত্রা করলেন।
ফেরার পথে শেষবারের মত সবাই ফিন তাম্র নগরীতে প্রবেশ করল। মণি-মাণিক্য, হীরা-জহরৎ যে, যত পারল জেব বােঝাই করে নিয়ে নিল।
বেচারা তালিব বিন-মাল ! কামজ্বালায় জানটি খােয়াল। নিষ্প্রাণ তাম্র নগরীর বুকে তার প্রাণহীন ছিন্ন দেহটি পড়ে রইল।
মুশা সদলবলে দামাস্কাসে ফিরে এলেন। বহু আকাঙিক্ষত তামার জালাগুলিকে মুশা খলিফার সামনে হাজির করলেন। আর খলিফাকে দেয়া জেলেদের খুবসুরৎ লেড়কি দুটোকেও তার হাতে তুলে দিলেন।
খলিফা একটি তামার জালা কাছে টেনে নিলেন। একটি হাত দিয়ে জালার মুখটি চাপা দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে তার ঢাকানাটি খুলে ফেলেন।
চোখের পলকে জালার মুখ দিয়ে জমাট বাঁধা একরাশ ধোঁয়া বেরিয়ে এল। তা থেকে অতিকায় ইফ্রিদি দৈত্য আবির্ভূত হ'ল। দৈত্যটি ভয়াল দর্শন হলেও তার চোখে-মুখে ভীতির ছাপ সুস্পষ্ট। সে করজোড়ে খলিফাকে নিবেদন করল—‘হুজুর, মহাত্মা সুলেমান এর বিরুদ্ধে আমরা জেহাদ ঘােষণা করেছিলাম। কৃত অপরাধের জন্য আপনার কাছে আমি মার্জনা ভিক্ষা করছি। মেহেরবানি করে আপনি আমার জান রক্ষা করুন।'
মুহুর্তে কামরার ঘুলঘুলি দিয়ে ইফ্রিদি দৈত্যটি বেরিয়ে গেল। এভাবে একের পর এক ইফ্রিদি দৈত্য খলিফার কাছে কসম খেয়ে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
খলিফা এবার সাগরের লেড়কি দুটির দিকে চোখ ফেরালেন। এক ঝলক দেখেই তার চোখ দুটি ঝলসে যাবার জোগাড় হ’ল। সচকিত হয়ে সােজাভাবে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাদের রূপ-যৌবনে খলিফা যারপরনাই মুগ্ধ বেজায় খুশী। তারা কিন্তু বেশীদিন এ দুনিয়ায় থাকল না। কিছুদিনের মধ্যেই বেহেস্তে চলে গেল।
খলিফাকে খুশী করে মুশা জেরুজালেমের পথে পা বাড়ালেন। সেখানেই একদিন ধ্যান করতে করতে দেহ রাখলেন। কিসসা শেষ করে বেগম শাহরাজাদ চুপ করলেন।
বাদশাহ শারিয়ার উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে বলে উঠলেন—সত্যি তােমার কিসসা অতুলনীয়! এমন সব কিসসা জিন্দেগীতে শুনতে পাব বলে কোনদিন ভাবিনি।
বেগম বললেন—“জাঁহাপনা, এখনও এক প্রহর রাত্রি রয়েছে। আমার দিল চাইছে ইবন্ আল-মনসুর’-এর কিসসা আপনার দরবারে পেশ করি। তার জীবনে বহুৎ তাজ্জব ও দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটেছিল যা শুনলে আপনার দিল ভরে উঠবে।
দুঃসাহসিক ইবন্ আল-মনসুরের কিসসা
বাদশাহ শারিয়ার বেগমের কোলে মাথা রেখে কিসসা শােনার প্রস্তুতি নিলেন।
বেগম কিসসা শুরু করলেন—জাঁহাপনা, খলিফা হারুণ-অলরশিদ-এর মহানুভবতার কিসসা আপনার দরবারে পেশ করেছিলাম, আশা করি ইয়াদ আছে? প্রজাদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবই ছিল তার সবচেয়ে বড় ব্রত। কি করে প্রজাদের হিতসাধন করা যায় এ-চিন্তায় রাত্রে তার চোখে নিদ আসত না।
এক রাত্রে খলিফা পালঙ্কে শুয়ে অস্থিরভাবে সময় গুজরান করছিলেন। কিছুতেই চোখের পাতা দু’টি এক করতে পারছেন না। তখন অনন্যোপায় হয়ে এক ঝটকায় পালঙ্কের ওপর বসে পড়লেন।
কামরার বাইরে তার দেহরক্ষী মসরুর তরবারি হাতে পায়চারি করছে। খলিফা দেহরক্ষী মসরুর’কে তলব করলেন। মসরুর দরওয়াজায় দাঁড়িয়ে নতজানু হয়ে কুর্ণিশ করে হুকুমের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল।
খলিফা অসহায় দৃষ্টি মেলে তার দিকে তাকিয়ে বললেন—মসরুর, কিছুতেই যে নিদ আসছে না। কি করি বল তাে?
( চলবে )

0 Comments