গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
মুশা তাবুর সামনে বসে গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন, এ পরিস্থিতিতে কি করা কর্তব্য। অসুবিধা যতই হােক না কেন ভেতরে ঢোকার ফিকির কিছু না কিছু তাে বের করতেই হবে।
সকাল হওয়ার অনেক আগেই মুশা তালিব বিন আর সামাদকে নিয়ে পাহাড়ের ওপরে উঠে ব্যাপারটি সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হওয়ার জন্য পা-বাড়ালেন। সৈন্যদের ওপর তাবু ও সামানপত্রের দায়িত্ব দিয়ে গেলেন। কিস্সাটির এ-পর্যন্ত বলা হতে না হতেই প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় পাখিদের কিচির মিচির শুরু হয়ে গেল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ তেতাল্লিশতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাহাপনা, তাবু থেকে বেরিয়ে মুশা তার সহযাত্রী দু’ জনকে নিয়ে নসীব সম্বল করে পাহাড়ের ওপর উঠে গেলেন।
চারিদিকে জমাটবাধা অন্ধকার। কালাে বােরখায় সর্বাঙ্গ ঢেকে পাহাড়টি মােউতের মত নিশ্চল-নিথরভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গাছের ফাঁক দিয়ে আলাে এসে পড়ায় অনেকখানি জায়গা ধীরে ধীরে দৃশ্য হয়ে উঠল। চাঁদের আলােয় তাম্ৰনগরীর অনেকখানি অংশও আলােকিত হয়ে উঠেছে। মুশা ও তার সঙ্গীরা নগরীর ভেতরের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন। কি দেখতে পেলেন তারা? এক স্বপ্নময় জগৎ যেন তাদের চোখের সামনে আচমকা এসে হাজির হল। চাদের আলােয় তারা নগরের অভ্যন্তরের বড় বড় মকান দেখতে পেল। সুবৃহৎ ইমারত বললেও এতটুকু বাড়িয়ে বলা হবে না। আর তাদের গম্বুজগুলােও কম মনলােভা বলে মনে হ’ল না। কী সুন্দর যে তাদের গঠনভঙ্গী তা ভাষায় বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়। নগরের কেন্দ্রস্থল দিয়ে এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে একটি খাল। তার দু’ ধারে ছােট-বড় পাকা মকান আর গাছ।
নগরটিকে ঘিরে রেখেছে যে তামার উঁচু ও মজবুত প্রাচীর তা সাগর পর্যন্ত গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
নগরীর এক পাশে বিস্তীর্ণ গােরস্থান। রাত্রির নিস্তব্ধতা আর চাঁদের হাল্কা আলােয় সেটিকে মৃতের স্তুপের মতই মালুম হচ্ছে। আদমি বা জানােয়ারের চিহ্নও নেই। এমন কি কোন রাতজাগা পাখিও ধারে-কাছে কোথাও আছে বলে মুশা-র মালুম হ’ল না। ইয়া পেল্লাই সব ইমারত, পাকা মকান, খাল, প্রাচীর, সমুদ্র আর গােরস্তান—কোথাও কোন আদমির চিহ্নও মুশা বা তার সহযাত্রীদের নজরে পড়ল না। এমন কি পেঁচা, বাদুর বা অন্য কোন কিসিমের রাতজাগা পাখিও এর মৃত্যুপুরী তাম্র নগরীতে বেঁচে আছে বলে মুশার মালুম হ’ল না।
অভিশপ্ত তাম্র নগরীর অন্তহীন নীরবতার কথা ভাবতে ভাবতে মুশা তার সহযাত্রীদের নিয়ে পাহাড় থেকে নেমে এলেন। প্রাচীরের গায়ে এসেই মুশা থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ইতিমধ্যেই ভােরের আলাে একটু একটু করে ফুটতে শুরু করেছে। তিনি দেখলেন, প্রাচীরের গায়ে একটি কবিতা উৎকীর্ণ রয়েছে। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিমেলে চারদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই দেখতে পেলেন, একটি নয় চার চারটি কবিতা প্রাচীরের গায়ে চিত্রের মত উৎকীর্ণ করে রাখা হয়েছে।
মুশা সামাদ-এর দিকে ঘাড়-ঘুরিয়ে তাকাতে না তাকাতেই তিনি এক এক করে কবিতা পাঠ করতে লাগলেন।
সামাদ প্রথম কবিতাটি পাঠ করে সেটি তর্জমা করে বুঝাতে গিয়ে বললেন-“ওহে, তােমরা কেবল ভবিষাং ভবিষ্যৎ করে অস্থির হচ্ছ। কিন্তু নিষ্ঠুর মৃত্যু আর শূন্যতার হাহাকার তােমাদের বিলকুল সঞ্চয়কে বরবাদ করে দিচ্ছে। মালুম আছে কি? সবার ওপরে এক মালিক বসে রয়েছেন। তিনিই সেনা বাহিনীকে টিকিয়ে রেখেছেন। বাদশাহের জন্য ছােট্ট একটি অন্ধকার কুঠুরী নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন
-উফ! ইয়া আল্লাহ! মুশা, বুকের বেদনা, কলিজার জ্বালা চেপে রাখতে পারলেন না। কী নির্মম-নিষ্ঠুর! আত্মা অবিনশ্বর। আল্লাতাল্লার চোখে দুনিয়ার সবকিছুই সমান। আত্মাকে তাে নিদের ঘােরে দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আজ বা কাল—যেদিনই তােক তার ঘুম ভাঙবেই—জাগবেই।
সামাদ বিশ্বাস কর, কবিতাটির প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ আমার বুকের ভেতরে গাঁথা হয়ে গেল। সামাদ এবার দ্বিতীয় কবিতাটি পাঠ করে তার বিষয়বস্তু মুশা’কে বুঝিয়ে দিতে গিয়ে বললেন—“ওহে, তােমরা হাত দিয়ে চোখ দুটোকে চাপা দাও কেন? তুমি এ-পথে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে কেন খেলা কর? তােমাকে তাে এমনই আর একটি ঠিকানায় পৌঁছে দেবে। সে বাদশারা আজ কোথায় গেল? জোয়ান মরদগুলিই বা আজ কোথায় ? আজ ইরাকের হুজুর আর ইস্পাহানের সম্রাটই বা কোথায় গেল?
সামাদ এ-কবিতাটি তর্জমা করে বুঝিয়ে দিলে মুশা আবেগে উচ্ছাসে অভিভূত হয়ে বলে উঠলেন—‘শােভন আল্লাহ! বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা! | সামাদ এবার তৃতীয় কবিতাটির ওপর চোখ বুলাতে লাগলেন। পড়া শেষ হলে এটিকেও তিনি তর্জমা করে মুশা’কে বুঝিয়ে দিতে গিয়ে বললেন-“ওহে, আন্ধার পথে এক অপরিচিত আদমিকে তুমি দেখছ, তাকে তুমি ডাকলে, সে মােটেই দাঁড়াল না। তােমার জিন্দেগীও ঠিক একই রকম। সে এখন ভারত ও চীনের সম্রাটের সঙ্গে ভেট করার জন্য ছুটে চলেছে। নুবিয়া ও সিনহার সম্রাটের সঙ্গে তার ভেট করা খুবই জরুরী। তারা তাে তােমার মতই কোন দমকা বাতাসে পাহাড়ের চূড়া থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ছে। সামাদ কবিতাটির তর্জমা শেষ করতে না করতেই মুশা বিকট স্বরে চিল্লিয়ে উঠলেন—“কোথায় ? কোথায় গেলেন সিনহা আর নুবিয়ার সম্রাট ? বিলকুল খতম। বিলকুল খতম হয়ে গেছে। প্রবল ঝড়ের বেগে নিচে গড়িয়ে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
সামাদ এবার চতুর্থ বা শেষ কবিতাটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কৌতূহলী চোখের মণি দুটোকে কবিতার ছত্রগুলির ওপর সােৎসাহে চোখ বুলিয়ে নিলেন। তারপর কবিতাটিকে তর্জমা করে দিতে গিয়ে বললেন—“ওহে, মােউৎ তােমার কাঁধের ওপর চেপে বসেছে। তােমার সরাবের পেয়ালা আর তােমার মেহবুবার স্তনদ্বয়ের দিকে ততােধিক উৎসাহের সঙ্গে তাকিয়ে রয়েছে। তুমি দুনিয়ার চালাক-চতুরদের ফেলা জালে আটক হয়েছ। আর মাকড়সারূপী শূন্যতা তােমার পিছনে ওৎপেতে রয়েছে। যাদের আকাঙক্ষা পাহাড়ের চূড়ার মত উঁচু ছিল আজ তারা কোথায় ? যারা একদিন পাচার মত গােরস্তানের বাসিন্দা ছিল আজ তারা ইমারতে সুখী জীবন যাপন করছে।
সামাদ কবিতাটি তর্জমা করে মুশা’কে বুঝিয়ে দিলেন। ইতিমধ্যেই মুশার কলিজা গলে পানি হয়ে চোখ দুটোর কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি আপন মনে বলতে লাগলেন—“ওগাে, জন্ম-মৃত্যুর নিয়স্তা, আজ না হােক কাল যখন জান নেবেই তবে আর ঝুটমুট আদমির জন্ম দিয়ে দুনিয়ায় পাঠালে কেন? আমাদের আদৎ ঠিকানা তাে একমাত্র আল্লাতাল্লাই জানেন। এ প্রশ্নের জবাব একমাত্র তারই জানা আছে। আমাদের একমাত্র কাজ কেবল তার হুকুম তামিল করা আর তার নামগান করা।
মুশা এবার সঙ্গীদের নিয়ে ব্যথিত-মর্মাহত দিল নিয়ে তাবুতে ফিরে এলেন।
ভােরের আলাে ফুটে উঠতে না উঠতেই সৈন্যদের দুটো বহুৎ লম্বা মই বানাতে হুকুম দিলেন। তাদের বললেন—মই বানিয়ে আমরা তামার প্রাচীরে উঠব। আর দ্বিতীয় মইটি প্রাচীরের ভেতরে নামিয়ে দিয়ে নগরে নেমে যাব।
মুশার নির্দেশে সৈন্যরা মই তৈরির তােড়জোর শুরু করে দিল। জঙ্গল থেকে গাছের ডাল কেটে নিয়ে এল। সেগুলােকে টুকরাে টুকরাে করে কেটে পাঁজা করল। কাপড় লম্বালম্বা করে ফালা করল। এবার কাপড়ের ফালা আর কোমর বন্ধনী এক সঙ্গে করে পাকিয়ে ইয়া লম্বা লম্বা দড়ি তৈরি করে ফেলল। উটের কিছু লাগামও এ কাজে ব্যবহার করল। ব্যস, তৈরি হয়ে গেল মুশা-র আদিষ্ট দুটো মই। সদ্য তৈরি মই দুটো নিয়ে যাওয়া হ’ল তামার প্রাচীরের কাছে। বহুৎ কসরৎ করে প্রাচীরের গায়ে একটি মই ঝুলিয়ে দেয়া হল। জবরদস্ত বন্দোবস্ত। আল্লাহর নাম নিয়ে মুশা সবার আগে দড়ির মই বেয়ে তামার প্রাচীরের ওপর উঠে গেলেন। তারপর সামাদ ও অন্যান্যরা এক এক করে মই বেয়ে উঠে প্রাচীরের ওপর গিয়ে বসল। কিসসার এ-পর্যন্ত বলতে না বলতেই ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ চুয়াল্লিশতম রজনী
পরের রাত্রে বাদশাহ শারিয়ার যথা সময়ে বেগম শাহরাজাদ এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—‘জাঁহাপনা, তাম্র নগরীর প্রাচীরে ওঠার আগে মুশা কয়েকজন সৈন্যকে তাবু ও অন্যান্য সামানপত্র দেখভাল করার জন্য তাবুতে রেখে গিয়েছিলেন।
মুশা সহযাত্রীদের নিয়ে প্রাচীরের ওপর দিয়ে হেঁটে দুটো বুরুজের কাছে গিয়ে থামলেন। দুটো তামার দরওয়াজা দিয়ে বুরুজ দুটোকে আটকে দেয়া হয়েছে।
দরওয়াজার পাল্লার ওপরে একটি মূর্তি—অশ্বারােহীর মূর্তি। নিরস্ত্র অশ্বারােহী। মূর্তিটির বেদীর গায়ে রােমান হরফে খােদাই করা রয়েছে। দুটিমাত্র ছত্র। সামাদ ছত্র দু’টি পড়ে মুশাকে তর্জমা করে বুঝিয়ে দিলেন—‘আমার নাভির গায়ে একটি পেরেক আছে, দেখ। তার মাথায় আলতাে করে বারাে বার চাপ দাও। | মুশা ব্যস্ত-পায়ে মূর্তিটির কাছে এগিয়ে গিয়ে পর পর বারাে বার পেরেকটির মাথায় চাপ দিলেন। ব্যস, ঠিক যেন ভােজবাজির খেল। চোখের পলকে দরজার পাল্লা দুটো দু' ধারে সরে গিয়ে ফাক হয়ে গেল।
অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি মেলে তাকাতেই মুশার চোখের সামনে লাল গ্রানাইট পাথরের একটি সিড়ি চোখের সামনে ভেসে উঠল। সিডিটি সােজা নিচের দিকে নেমে গেছে।
মুশা সদলবলে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে সুবিশাল একটি কামরায় হাজির হলেন। কামরাটির দরওয়াজার সামনে কয়েকজন সশস্ত্র প্রহরী দেখে তাদের মালুম হ’ল বুঝি পাহারা দিচ্ছে। আর অস্ত্র ? তাদের একহাতে চকচকে তরবারি আর অন্য হাতে একটি করে ধনুক।
মুশা এগিয়ে গিয়ে প্রহরীদের উদ্দেশ্যে বললেন-“আমরা তােমাদের মালিকের সঙ্গে বাৎচিৎ করতে চাই। আশা করি তােমরা আমাদের পথরােধ করবে না।
তাজ্জব ব্যাপার! তার কথার জবাব দেয়া তাে দূরের কথা। প্রহরীরা সামান্য নড়াচড়াও করল না। এমনকি চোখের মণি পর্যন্ত অচঞ্চল রয়ে গেল।
মুশা ভাবলেন-“ব্যাপার কি? এরা কি তবে আরবি ভাষায় অনভিজ্ঞ ? তাই আমার বক্তব্য বুঝতে না পেরে নিশ্চল নিথর ভাবেই নির্বিকার চিত্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে?
মুশা মুখে হতাশার ছাপ এঁকে সামাদ’কে বলেন-“আমি হেরে গেছি। এবার আপনি কোশিস করে দেখুন যদি কোন হিল্লা করতে পারেন। দুনিয়ার যত ভাষা আপনার রপ্ত রয়েছে এক এক করে সব কটি ভাষা ব্যবহার করে দেখুন। যদি এদের মুখ থেকে বুলি ফোটাতে পারেন।
সামাদ প্রথমে গ্রীক ভাষায়, তারপর ক্রমান্বয়ে হিব্রু, হিন্দু, ইথিওপিয়ান, সুদানিজ এবং সব শেষে পারশিয়ান ভাষায় তাদের সঙ্গে বাৎচিৎ করার কোশিস করলেন। ব্যর্থ প্রয়াস। কেউ-ই মুখ খুল না।
মুশার নির্দেশে সামাদ এবার দুনিয়ায় যত কায়দায় অভিবাদন প্রচলিত রয়েছে এক এক করে সব ক'টি মৌনী প্রহরীদের সামনে প্রয়ােগ করলেন। উদ্দেশ্য তাদের পছন্দ মাফিক কোন অভিবাদন করা হলে তখন তার অবশ্যই পাল্টা অভিবাদন করে সৌজন্যবােধের পরিচয় দেবে। কিন্তু এতেও কোনই ফয়দা হ’ল। না।
ফালতু নষ্ট করার মত সময় তাদের নেই। তাই প্রহরীদের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে মুশা তার দলবল নিয়ে ফিন হাঁটা জুড়লেন। তিনি কয়েক পা এগিয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলেন, প্রহরীরা নির্বিকার। এমন কি তাদের চোখ-মুখেরও কোন পরিবর্তন হয় নি। পথ পাড়ি দিতে দিতে সামাদ বললেন—“দেখুন, জিন্দেগীতে আমি বহুৎ মুলুকে ঢুঁড়ে বেড়িয়েছি। কিন্তু কোথাও এমন তাজ্জব ব্যাপারের মুখােমুখি আমি হইনি, বিশ্বাস করুন। আমাদের এতগুলাে আদমিকে একেবারে বেকুব বানিয়ে দিল! আল্লাহ ভরসা।
কিছুক্ষণ হাঁটাহাটি করে মুশা ও তার সহযাত্রীরা বাজারে হাজির হলেন। দোকান সব হাঁ করে খােলা। সামানপত্রও সাজানাে রয়েছে দোকানে দোকানে। সওদা করার জন্য খরিদ্দারও রাস্তায় বহুৎ। কিন্তু এখানেও ওই তাজ্জব ব্যাপার। সবাই নির্বাক। নিশ্চলনিথরভাবে দোকানে ও পথের এখানে-ওখানে দাঁড়িয়ে।
মুশা-র কাছে ব্যাপারটি এমন মালুম হ’ল যে, তাদের পরদেশী ভেবে স্থানীয় লােকগুলাে থমকে গেছে। তারা চলে গেলেই ফিন স্বাভাবিক হয়ে উঠবে, হাঁটা চলা করবে। কেনাকাটাও শুরু করবে। অথবা তাদের আকস্মিক অনধিকার আগমনের বিরুদ্ধে মৌনব্রতের মাধ্যমে তাম্র নগরীর আদমিরা এভাবে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ধ্যৎ ছাই—মুশা আর ভাবতে পারছেন না। তার মাথা ঝিম ঝিম করছে।
মুশা ফিন পথে নামলেন। তার সহযাত্রীরা তাকে অনুসরণ করে চললেন। পথের দু ধারে মকানগুলির দশাও একইরকম। উভয় দিকে সারিবদ্ধভাবে ছােট বড় মকান আর ইমারতগুলাে দাঁড়িয়ে। কতগুলাে তাে মনমৌজী কারুকার্যমণ্ডিত। চোখ ফেরানােই দায়। পথেও আদমির মেলা। কেউ যাচ্ছে, কেউ বা বিপরীত দিক থেকে ফিরছে এরকম ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। ব্যাপারটি এমন যে কেউ যেন যাদুমন্ত্রবলে তাদের দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এমন কি বাকশক্তিও কেড়ে নিয়েছে।
মুশা যে তার দলবল নিয়ে পথ চলেছেন তাতে যেন পথচারীদের কিছুমাত্রও ভ্রক্ষেপ নেই। আহ্বানও নেই, বিসর্জনও নেই। তাদের আগমনে কেউ খুশী নয়, বিরাগভাজনও নয়। পথের দু' ধারে দোকানীরা নিজ নিজ পসরা সাজিয়ে বসে। সবই আছে। কিন্তু কারাে কোনরকম চাঞ্চল্য নেই, একের সঙ্গে অন্যের বাক্যালাপও বন্ধ। বাজারের শেষ প্রান্তে এক জায়গায় এসে মুশা থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তার সামনে অতিকায় একটি তামার চাদর। তার গায়ে সূর্যের কিরণ পড়ে ঝিকমিক করছে পুরাে বাজারের চত্বরটি। তারই অদূরে একটি বিশালায়তন ইমারৎ। শ্বেতপাথরে মােড়া। ইমারতটির দু ধারে দুটো অতিকায় কেল্লা সদম্ভে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে। তামা দিয়ে তৈরি। তার উচ্চতা এত বেশী যে, তার শীর্ষদেশ দেখতে গেলে কাধে মাথা ঠেকে যায়। কেল্লাটির গায়ে পাখাওয়ালা বিচিত্রসব পশুর ছবি উৎকীর্ণ করা। ইমারৎটির সদর দরওয়াজায় সশস্ত্র প্রহরী সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে। কালাে হাতে বিচিত্র ঢঙের তরবারি, কালাে ইয়া লম্বা হাতলযুক্ত বর্শা। এ মুশা কৌতুহলের শিকার হয়ে আল্লাতাল্লার নাম নিয়ে তার দল বল নিয়ে ইমারতটির সদর-দরওয়াজা দিয়ে ভীত-সন্ত্রস্তভাবে ভেতরে ঢুকে গেলেন।
ভেতরে ঢুকেই তারা বিশাল একটি চাতাল দেখতে পেলেন। তার কেন্দ্রস্থলে বহুবর্ণ পাথর দিয়ে তৈরী একটি চত্বর দেখলেন। চাতালটিকে একটি দুর্গের অংশ বিশেষ বলেই মালুম হ’ল। তার দেয়ালের গায়ে হরেক কিসিমের অস্ত্রপাতি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
চাতালটির ওপর অসংখ্য আদমি বসে সৈন্যদের কুচকাওয়াজ দেখছে। সবার চোখেই আগ্রহ। কিন্তু চোখের মণি নিশ্চল।।
তাজ্জব ব্যাপার। মুশার সঙ্গী সশস্ত্র সৈন্যদের দেখে কুচকাওয়াজরত সৈন্যদের মধ্যে সামান্যতম প্রতিক্রিয়াও লক্ষিত হ’ল না। কেউ তাদের পথরােধ করল না। এমন কি কেউ ডেকে জিজ্ঞেসও করল না—তােমরা কারা। পরদেশী। কোন মুলুকে তােমাদের ঘর?
মুশা তাজ্জব বনে গেলেন। কি বলবেন, কি করবেন সহসা কিছুই ভেবে উঠতে পারলেন না।।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ পঁয়তাল্লিশতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম বাদশাহকে যথােচিত সম্ভাষণ সেরে কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—“জাঁহাপনা, সুবিস্তীর্ণ চাতালটির গায়ে রােমান হরফে একটি কবিতা উৎকীর্ণ করা রয়েছে।
মুশা কবিতাটির দিকে সামাদ-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। সামাদ সােল্লাসে বলে উঠলেন-শােভন আল্লাহ! এ-মুলুকে যে
( চলবে )

0 Comments