আরব্য রজনী পার্ট ১০৩ (Arabyarajani Part 103)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।

পর পর কয়েকটি কামরা ডিঙিয়ে তারা আরও বড় একটি কামরায় ঢুকে গেল। পেল্লাই একটি চন্দন কাঠের টেবিল।  টেবিলটির কেন্দ্রস্থলে ছােট্ট একটি কবিতা খোদাই করা।
সামাদ কবিতাটি পাঠ করলেন। তারপর সেটিকে তর্জমা করে মুশা ও অন্যান্যদের বুঝিয়ে দিতে গিয়ে বললেন - 
কবিতাটির মমার্থ হচ্ছে—কত সব কুচক্রী রাজারাজড়াই না এ টেবিলের চারদিকে ঘিরে বসে থাকত। আর তাদের সঙ্গে কানা রাজারাও বসত। এখন? এখন তারা সবাই আন্ধারে শায়িত। এখন আর কারাে ওঠার ক্ষমতা নেই। আর দেখতে পায় না কেউ।

মুশা স্তম্ভিত হয়ে যান। কবিতার অর্থ কিছুই তার বােধগম্য হয় না। কি এর অর্থ? উদ্দেশ্যই বা কি? শেরওয়ানীর জেব থেকে এক টুকরাে চামড়া বের করে তিনি তাতে কবিতাটি লিখে নিলেন।
মুশা এবার সহযাত্রীদের নিয়ে প্রাসাদ ত্যাগ করলেন। ফিন তাম্র নগরীর উদ্দেশে পা বাড়ালেন।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ' একচল্লিশতম রজনী 
রাত্রি একটু গভীর হতে না হতেই বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসাটির পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাহাপনা, মুশা তার সহযাত্রীদের নিয়ে এক নাগাড়ে প্রায় তিনদিন পথ চলার পর তৃতীয় দিন সন্ধ্যার কিছু আগে অত্যাশ্চর্য এক বস্তুর মুখােমুখি হ’ল। ঘােড়সওয়াররাও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। কয়েক পা এগিয়ে যেতেই ব্যাপারটি পরিষ্কার হ’ল। সেটি একটি অতিকায় মূর্তি। ঘােড়সওয়ারের মূর্তি।
ঘােড়সওয়ারটির ডান হাতে সুদীর্ঘ একটি লােহার তরবারি। তরবারি সমেত হাতটি কোর্তার ওপরে তুলে দেয়া রয়েছে।
বিকালের বিদায়ী সূর্যের শেষ রক্তিম আভার কিছুটা তরবারিটির ওপর পড়ায় সেটিকে রক্তবর্ণ দেখাচ্ছে। এক পা-দু পা করে তারা মূর্তিটির একেবারে গা-ঘেঁষে দাঁড়াল। লােহার তরবারিটি ছাড়া বেদী, ঘােড়া ও ঘােড়সওয়ার সবই তামার পাতে মােড়া। মূর্তিটির বেদীর গায়ে একটি কবিতা উৎকীর্ণ করা রয়েছে। লেখার ঢঙঢঙ দেখলেই কলিজাটি মােচড় মেরে ওঠে।
সামাদ অনুচ্চকণ্ঠে কবিতাটি পাঠ করলেন। তারপর মুশা ও অন্যান্যদের কাছে তা তর্জমা করে শােনাতে গিয়ে বললেন-এর মর্মার্থ হচ্ছে ‘হে পথিকবর, এ-নিষিদ্ধ মুলুকে এসে যদি তুমি পথভ্রষ্ট হয়ে পড় তবে শরীরের সবটুকু শক্তি নিঙড়ে আমার গায়ে ধাক্কা মার। ধাক্কার ফলে আমার মুখটি যেদিকে ঘুরবে সেদিকই হবে তােমার পথ।
কবিতার নির্দেশ অনুযায়ী মুশা সর্বশক্তি নিয়ােগ করে রহস্যময় মূর্তিটির গায়ে এক ধাক্কা দিলেন। ব্যস, মূর্তিটি সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে গেল। তারা যে-পথ ধরে যাচ্ছিল তার ঠিক বিপরীত দিকে মুখ করে সেটি দাঁড়িয়ে পড়ল।
সামাদ এবার বুঝলেন, তিনি ভুল পথ ধরে চলছিলেন। এবার মূর্তিটির নির্দেশিত পথে তারা এবার পা বাড়ালেন।
মাইলের পর মাইল অতিক্রম করে তারা এগিয়ে চলেছেন। দিনের পর দিন রাতের পর রাত তারা এক নাগাড়ে পথ পাড়ি দিয়ে চলেছে। পথের দু ধারে কেবল বালি আর বালি। জীবন্তপ্রাণী, ৩ গাছপালা, ঝােপঝাড় তাে দূরের কথা এক টুকরাে সবুজ ঘাসও তাদের নজরে পড়ল না। 
এক মাহিনা কেটে গেল। তবু তাদের পথ চলার বিরাম নেই। একদিন এক কুচকুচে কালাে পাথরের এক পাহাড়ের সামনে এসে তারা থামলেন। কৌতূহলী চোখ মেলে তারা অদ্ভুতদর্শন পাহাড়টিকে দেখতে লাগলেন। এক জায়গায় এসে তাদের দৃষ্টি থমকে গেল। দেখলেন, পাহাড়ের গায়ে অদ্ভুত এক প্রাণী শেকল দিয়ে বাঁধা। এরকম কোন প্রাণী তারা জিন্দেগীতে দেখেন নি। তা-ও আবার শেকল দিয়ে শক্ত করে বাঁধা।
বাস্তবিকই তাজ্জব ব্যাপারই বটে। প্রাণীটির অর্ধেক মাটির তলায় পোঁতা, বাকিটুকু ওপরে—দৃশ্য। কে যে অদ্ভুত এ প্রাণীটিকে এখানে, এ-অবস্থায় রেখে গেছে তার হদিস পাওয়া সম্ভব নয়। তবে মনে হ’ল একে শাস্তি দেয়ার জন্যই এভাবে মাটির তলায় পুঁতে রাখা হয়েছে। কারণ প্রাণীটির ওপরের দৃশ্য অংশটুকু দৈত্যাকৃতি। কলিজা শুকিয়ে যাবার মতই ভয়ঙ্কর তার রূপ। তার ওপর কালাে দুটো ডানাও বীভৎসতাকে আরও বেশী করে ফুটিয়ে তুলেছে। আর হাত চারটি। সিংহের মত নখরযুক্ত ইয়া পেল্লাই সব থাবা। মুখের সম্মুখ ভাগ, না পুরাে মাথাটিই গাধার মত। ইয়া লম্বা ও
কোকড়ানাে চুলগুলাে বাতাসে অনবরত উড়ছে। চৌবাচ্চার মত চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। কপালেও ইয়া বড় একটি চোখ। আরও আছে। মাথার দু'পাশের ইয়া লম্বা শিং দুটোর দিকে চোখ পড়লেই বুকের মধ্যে থরহরি কম্প শুরু হয়ে যায়। চিতাবাঘের মত তার চাহনিতে সুস্পষ্ট হিংস্রতার ছাপ। কুচকুচে কালাে জীবটির শরীরটি সব মিলিয়ে যেমন অতিকায় তেমনি ভয়ঙ্করও বটে।
মুশা তার সঙ্গীসাথীদের নিয়ে অদ্ভুত জীবটির কাছাকাছি যেতেই সে এমন তর্জন গর্জন শুরু করে দিল যে, মনে হল এই বুঝি শেকল ছিড়ে ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শেকলটিকে ছেড়ার জন্য সে প্রাণান্ত প্রয়াস চালিয়ে যেতে লাগল। খােদা ভরসা। কালাে পাথরের গায়ে সাক্ষাৎ মােউৎটিকে বেঁধে না রাখলে নসীবে যে কি ছিল তা একমাত্র খােদাতাল্লাই জানেন।
কোনক্রমে শিকলটি ছিড়তে পারলে আর দেখতে হতাে না। শিং দিয়ে গুঁতিয়েই সবার দফা রফা করে দিত। কিন্তু শেকলটি ছিড়তে না পেরে আশমান-জমিন কাপিয়ে তর্জন গর্জন শুরু করে দিল।
ভয়ঙ্কর সে-জন্তুটির আস্ফালন দেখে ভয়ে মুশার সঙ্গী সাথীদের গলা পর্যন্ত শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাবার উপক্রম হ’ল।।
মুশা চোখের তারায় আতঙ্কের ছাপ এঁকে সামাদ’কে জিজ্ঞাসা করলেন-“দৈত্যটির ব্যাপার কিছু আপনার জানা আছে?'
--‘না। তবে তাকে জিজ্ঞেস করলে হয়ত সে নিজেই বলতে পারে। ঠিক আছে। আমিই জিজ্ঞেস করছি।' দু' পা এগিয়ে গলা ছেড়ে বলতে লাগলেন—“আল্লাতাল্লা দুনিয়ার যাবতীয় দৃশ্য-অদৃশ্য সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা। আর তােমাকেও তিনিই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাতাল্লার নামে তােমাকে আমার ক’টি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য বলছি। মেহেরবানি করে জবাব দাও। তুমি কে? এখানে কেন ও কতদিন ধরে এরকম শাস্তি ভােগ করছ?
সামাদ-এর প্রশ্নগুলি শুনেই দৈত্যটি কুত্তার মত চিল্লিয়ে উঠল। তারপর বিচিত্র এক স্বরে বলতে লাগল—“আমার নাম দাহিশ বিন আল-আমাশ। ইব্রিস-এর এক ইফ্রিত আমি। জিনের আব্বা। আর আমি এখানে কেন! অদৃশ্য এক শক্তি বলে আমাকে এখানে বেঁধে এ-হালৎ করে দিয়েছে। আবহমান কাল ধরে আমাকে এরকম কঠোর শাস্তি ভােগ করতে হবে।
কোন এক সময়ে সাগরের রাজা এ-মুলুকের শাসনকর্তা ছিলেন। লাল পাথরের তৈরি একটি মূর্তি তাম্র-নগরীর পাহারায় নিযুক্ত ছিল। তার দেখভালের দায়িত্ব আমার ওপর বর্তেছিল। আমার বাসস্থলও তারই ভেতরে ছিল। আমার দৈববাণী শােনার বাসনা নিয়ে দুনিয়ার বহুৎ মুলুক থেকে আদমি এখানে জড়াে হ'ত।
সমুদ্রের রাজার এক সামন্তরাজ ছিলাম আমি। একবার ডেভিড এর লেডকা সুলেমান-এর এক ফরমানের বিরুদ্ধে বহুৎ দিন জেহাদ ঘোষণা করেছিল। জিনদের সর্দার ছিলেন সমুদ্রের ওই রাজা। আদতে তিনি জিনদের সর্দার আদৌ ছিলেন না। একদিন তাদের মালিকের সঙ্গে সমুদ্রের রাজার যুদ্ধ বেঁধে যায়। রাজা আমাকে প্রধান সেনাপতি করে যুদ্ধে পাঠান।
যুদ্ধটি কিন্তু অহেতুক বাঁধে নি। খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক কারণকে মত করেই উভয় পক্ষ যুদ্ধে সামিল হয়েছিল। আমি সংক্ষেপে সে কারণটি তােমাদের কাছে পেশ করছি। 
সমুদ্রের রাজার এক খুবসুরৎ লেড়কি ছিল। দুনিয়ার তামাম অনেকে তার সুরতের খ্যাতির প্রচার হয়ে যায়। সুলেমানও তা শুনলেন। সুলেমান-এর হারেমে বহুৎ বিবি ছিল। ফিন আর একটি বিবির সংখ্যা বাড়াবার জন্য তিনি অস্থির হয়ে পড়লেন।
সমুদ্রের রাজার খুবসুরৎ লেড়কিটিকে শাদী করার জন্য প্রস্তাব দিয়ে সুলেমান দূত পাঠালেন। শাদীর প্রস্তাব ছাড়াও তিনি দূতকে দিয়ে আরও দুটো প্রস্তাব দিলেন। প্রস্তাবটি হ’ল লাল পাথরের মূর্তিটিকে ভেঙে ফেলার জন্য অনুরােধ। আর দ্বিতীয় প্রস্তাবটি ছিল, আল্লাহ ছাড়া দ্বিতীয় কোন ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই। আল্লাহ এক এবং অভিন্ন। আর সুলেমানই হলেন আল্লাহর প্রেরিত একমাত্র ধর্মপ্রচারক। প্রস্তাব দুটো তাকে মেনে নিতে হবে। সুলেমান-এর প্রস্তাব পাওয়ার পরই সমুদ্রের রাজা তার উজিরনাজির ও অন্যান্য পারিষদদের তলব করলেন। আমাকেও সেখানে হাজির হতে হয়। সমুদ্রের রাজা আমাদের উদ্দেশ্যে তাকালেন—সুলেমান-এর চিঠিতে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তিনি প্রকারান্তরে আমাকে সতর্ক করে দিয়েছেন। শাসিয়েছেন। তার প্রথম বক্তব্য তার সঙ্গে আমার লেড়কির শাদী দিতে হবে। আর দ্বিতীয় প্রস্তাব জিনদের সৈন্যাধ্যক্ষ দাহিশ বিন আল-আমাশ যে লাল পাথরের মূর্তির ভেতরে অবস্থান করে সেটিকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। আপনাদের পরামর্শ চাচ্ছি, এ-প্রস্তাব কি আমি মেনে নেব?’ 
বৃদ্ধ উজির তার মধ্যে সাহস সঞ্চার করতে গিয়ে বললেন--‘সুলেমানকে ডরাবার কিছুমাত্রও কারণ নেই। এবার আমাকে দেখিয়ে বললেন—‘আমাদের সৈন্যরা ওর মত সাহসী ও শক্তিশালী।
আমি গর্জে উঠলাম—‘জাঁহাপনা একটিবারমাত্র হুকুম দিন, আমি দূতটিকে আচ্ছা করে ঘা কতক দিয়ে তার মুলুকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এতে সুলেমান তার চিঠির জবাব পেয়ে যাবেন।  
" রাজা এক কথাতেই রাজী হয়ে গেলেন। ব্যস, আর দেরী নয়। হতচ্ছাড়া দূত মশাইকে আচ্ছা করে দাওয়াই দিয়ে দিলাম। দূত বেচারা মারধাের খেয়ে, অপমানের জ্বালা বুকে নিয়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে তার প্রভু সুলেমান-এর কাছে ফিরে গেল।
সুলেমান দূতের মুখে আমাদের আপ্যায়নের বহরের বাৎ শুনে রেগে একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন। সেনাধ্যক্ষকে তলব দিলেন। চারদিকে সাজসাজ রব পড়ে গেল। সৈন্যদের মধ্যে জ্যান্ত
আদমি, জিন আর পশু-পাখিও ছিল বেশ কিছু সংখ্যক। জল-স্থল অন্তরীক্ষ তিনটি দলে সৈন্যরা ভাগ হয়ে গেল। পশুরাও চারটি সারিতে ভাগ হয়ে গেল। মাথার ওপরে চক্কর মারতে লাগল পেল্লাই পেল্লাই সব পাখি। তারা শ্যেন দৃষ্টিতে আমাদের সৈন্যদের ওপর নজর রেখে চলল। কেউ কেউ গুপ্তচরের কাজে লিপ্ত রইল।
পাখিরাই যুদ্ধ ক্ষেত্রে আমাদের সৈন্যদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সন্ত্রাসের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। তারা আচমকা তীরবেগে নেমে এসে আমাদের সৈন্যদের কামড়ে-আঁচড়ে নাস্তানাবুদ করে দিতে লাগল। আরও আছে। বহু সৈন্যের চোখের মণি গেলে দিল। সে এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার!
সুলেমান? তিনি ডানদিকে উজির আসাব বিন বারখিয়া’কে এবং বাঁ-দিকে ইফ্রিতদের অধিপতি দিমিব্যাত’কে নিয়ে বীরবিক্রমে যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর মােকাবেলা করতে চললেন। চারটি ইয়া বড় হাতি তার সােনার রথটিকে বিকট আওয়াজ তুলে টেনে নিয়ে চলল । তুমুল যুদ্ধ চলতে লাগল।
বিদ্রোহী জিনদের পরিচালনার দায়িত্ব আমার ওপর বর্তেছিল। আমার হুকুম পেয়ে জিনরা বীরবিক্রমে যুদ্ধ করে চলল। তারা আমাদের প্রতিপক্ষ জিনদের ওপর প্রচণ্ড আক্রোশে আক্রমণ চালাতে লাগল।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ বিয়াল্লিশতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর পড়তে না পড়তেই বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসাটির পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—জাহাপনা, যুদ্ধ যখন পুরােদমে চলছে তখন আমার ইচ্ছা ছিল, নিজে হাতে সুলেমান’কে খতম করি।
আমি লম্ফঝম্ফ করতে করতে কাছাকাছি এগােতেই সুলেমান আগ্নেয় পর্বতের মত ইয়া বড় হাঁ করে আগুনের গােলা ছুঁড়তে শুরু করে দিল।
আমি আচমকা সুলেমান-এর ওপর লাফিয়ে পড়ার ধান্দায় ঊর্ধ্বাকাশে উঠে গিয়েছিলাম। কিন্তু আগুনের গােলাটি আমাকে সুড়সুড় করে নিচে নামিয়ে আনল। আগুনে আমার সর্বাঙ্গ জ্বলতে লাগল। আর দম বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হল।
এরকম পরিস্থিতিতে কতক্ষণ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যায়। তােমরাই বল? আমি তবু দমে যাই নি। কিন্তু আমাদের সৈন্যর চেয়ে সুলেমান-এর সৈন্য সংখ্যা এতই বেশী ছিল যে, পিছিয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের আর গত্যন্তর রইল না। অনন্যোপায় হয়ে আমি সৈন্যদের পিছু হঠার হুকুম দিলাম।
আমার হালও ইতিমধ্যেই কাহিল হয়ে পড়ল। বাধ্য হয়ে এবার পালিয়ে জান বাঁচাবার ফিকির খুঁজতে লাগলাম। না, হ’ল না? পালাতে পারলাম না। জ্যান্ত আদমি, জিন আর পশু-পাখি দিয়ে সুলেমান আমাকে পাকড়াও করে ফেলল । অনেকে জান দিল, কেউ কেউ পশুর পায়ের তলায় পড়ে অসহায়ভাবে পিষ্ট হল। সবচেয়ে আতঙ্কের কারণ হ’ল ইয়া বড় বড় পাখিরা। তারা আমাদের সৈন্যদের চোখ গেলে দিতে লাগল। এরকম সব সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করে কাহাতক টিকে থাকা সম্ভব, বল? আমি প্রায় তিন মাহিনা পালিয়ে পালিয়ে বেড়ালাম। কিন্তু আর শেষ রক্ষা করতে পারলাম না। ধরা দিতেই হ’ল, এ কালাে পাহাড়টির গায়ে বেঁধে রেখে আমাকে শাস্তিদানের ব্যবস্থা করল।
আর আমার সৈন্যদের? তাদের ধোঁয়ায় রূপান্তরিত করে ইয়া পেল্লাই সব, জালায় বন্দী করে রাখল। ধোঁয়া ভর্তি জালাগুলােকে সুলেমান-এর নির্দেশে সমুদ্রে ফেলে দেয়া হ’ল। সেগুলাে ঢেউয়ের ধাক্কায় ধাক্কায় তা নগরীর প্রাচীরের গায়ে এসে আটকা পড়ে যায়। সেই থেকে সেগুলাে সেখানেই সাগরের তলায় ডুবে রইল। আমাদের যুদ্ধবন্দী অন্য সৈন্যদের কি যে হাল হয়েছে তা আমার জানা নেই। কারণ, আমি তাে নসীবের ফেরে এখানে এরকম চরম দুর্গতির মধ্যে দিন গুজরান করে চলেছি।
তােমরা যদি তাম্র নগরীতে প্রবেশ কর তবে কারাে না কারাে সঙ্গে মােলাকাৎ হবেই। তবে তারা নির্ঘাৎ আমার মতই বন্দী-জীবন যাপন করছে আর অনবরত চোখের পানি ঝরিয়ে চলেছে।'
কিসসা শেষ করে ভয়ঙ্কর সে-দৈত্যটি আচমকা গা-ঝাড়া দিয়ে এমন বিকট স্বর করে চিগিয়ে উঠল যে, পাহাড় সমেত পুরো অঞ্চলটি যেন থরথরিয়ে কেঁপে উঠল।
দৈত্যটির মর্মন্তুদ কাহিনী শুনে মুশার বােধ হয় দিলটি একটুআধটু নরমও হয়েছিল। কিন্তু আচমকা এরকম বর্বরের মত আচরণ করায় তার দয়া-মায়া নিঃশেষে উবে গেল।
মুশা তার সহযাত্রীদের নিয়ে তাম্র-নগরীর উদ্দেশে পা বাড়ালেন।
এক সময় তাম্র নগরী চোখের সামনে ফুটে উঠল। কিন্তু সেখানে পৌছবার আগেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। অন্ধকারের বুকে সব কিছু বিলকুল চাপা পড়ে গেল।
মুশা সহযাত্রীদের সঙ্গে শলা পরামর্শ করে স্থির করলেন ভােরের আলাে ফুটে উঠলে তবেই তাম্র নগরীর প্রবেশ দ্বার অতিক্রম করবেন।
সবাই পথশ্রমে ক্লান্ত। শরীর টলছে। পথের ধারেই সবাই সারিবদ্ধভাবে শুয়ে পড়ল। ব্যস, কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই একদম বিভাের হয়ে নিদ যেতে লাগল।
পুর্ব-আকাশের গায়ে রক্তিম ছােপ দেখা দিতেই মুশা সবাইকে ডাকাডাকি করে তুলে দিলেন।
শুরু হ’ল ফিন হাঁটা। কিছু পথ যেতেই তারা তাম্র-নগরীর প্রবেশ দ্বারের খোঁজ করতে গিয়ে হতাশ হয়ে পড়লেন। কোথায় প্রবেশদ্বার? সব যে ভো-ভা! দ্বার তাে দূরের কথা এমন কোন ফাক ফোকরও চোখে পড়ল না যেখান দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে বুকে হেঁটে কোনরকমে ভেতরে ঢুকে যেতে পারেন। তাজ্জব বনে গেলেন। এতবড় একটি নগরী। অথচ কোন প্রাণীর চিহ্নও ধারেকাছে কোথাও দেখতে পেলেন না। জীবন্ত প্রাণী ভেতরে থাকলে একটু-আধটু শব্দটব্দ হত—তা-ও শােনা গেল না। মুশা এত সহজে দমবার পাত্র নন। দলবল নিয়ে সারাদিন প্রাচীরের চারদিকে দিয়ে হাঁটা হাঁটি করলেন। 
বৃথা চেষ্টা। বিকাল হ’ল। সূর্য পশ্চিম-আকাশের গায়ে একটু একটু করে আত্মগােপন করতে লাগল। শুরু হ’ল আলাে-আঁধারীর খেল । ক্রমে নেমে এল সন্ধ্যার অন্ধকার। একটু বাদেই জমাটবাঁধা আন্ধার নেমে এল প্রকৃতির বুকে। তাঁবু খাটানাে হ’ল। তারপর সবাই বিভাের হয়ে নিদ্ যেতে লাগল। একমাত্র মুশা জেগে রইলেন। মুশা তাবুর সামনে বসে গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন, এ পরিস্থিতিতে কি করা কর্তব্য। অসুবিধা যতই হােক না কেন ভেতরে
( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments