আরব্য রজনী পার্ট ১০২ (Arabyarajani Part 102)

গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
তাকে থামিয়ে দিয়ে বেগম মুচকি হেসে বলল—“ঠিক আছে, তােদের উভয়ের অত্যুগ্র আগ্রহকে চাপা দিয়ে কাল পর্যন্ত কিসসাটি ঝুলিয়ে রাখব না। ধৈর্য ধরে শুনুন জাঁহাপনা বলছি- 
আজব তামার জালার কিস্সা 
জাহাপনা, এ কথা তাে আমরা সবাই মানি আল্লাহ-ই সব বাদশাহের বাদশাহ। আর সব সুলতানের সুলতান। তার ওপরে কেউ নেই। তার মর্জিতেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় কার্য পরিচালিত হয়। কোন এক সময়ে এক মুলুকে এক খলিফা রাজত্ব করতেন, সেই মুলুকের নাম - 
এমন সময় প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় পাখিদের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ উনচল্লিশতম রজনী 
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার কিসসা শােনার অত্যুগ্র আগ্রহের শিকার হয়ে ব্যস্ত-পায়ে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কোনরকম ভূমিকার অবতারণা না করে সরাসরি কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন।

বেগম বললেন—“জাহাপনা, ওমিয়াদ বংশের খলিফারা কোন এক সময়ে দামাস্কাসের শাসক ছিলেন।
আবু আল-মালিক বিন সারবান ছিলেন ওমিয়াদ বংশের খলিফাদের মধ্যে একজন। জ্ঞানী-গুণীদের তিনি যারপরনাই শ্রদ্ধা ও সমীহ করতেন। স্বদেশ ও ভিন দেশের বিচিত্র সব কিসসা কাহিনী শােনার জন্য তিনি ছিলেন খুবই আগ্রহান্বিত। পর্যটক ও জ্ঞানী-গুণীরা তাকে কিসসা শুনিয়ে খুশী করতেন। তবে ডেভিডের লেড়কা সুলেমান-এর কিসসা শােনার জন্যই তিনি বেশী উৎসাহী ছিলেন।
সুলেমান-এর অতুলনীয় গুণাবলী আর তার বিচক্ষণতার কিসসা শুনতে পেলে তিনি রাতভর নির্ঘুম অবস্থায় বসে থাকতে পারতেন। আরও আছে। মরু-অঞ্চলের বল্গাহীন অত্যাচার তিনি যেভাবে দমন করে সেখানে শান্তি ও শৃঙ্খলা আনতে সক্ষম হয়েছিলেন আর জলে-স্থলে-আকাশপথে যেসব আফ্রিদি ও জিন উপদ্রব চালায় তাদের কী অসীম ধৈর্য, কৌশল ও শক্তি দিয়ে তিনি কজা করেছিলেন সেসব কিসসা বার বার শুনেও যেন তার দিল ভরত না।
এক সকালে খলিফা আবু আল-মালিক-এর দরবারে এক প্রখ্যাত ভূ-পর্যটক হাজির হলেন। তার নাম—তালিব-বিন-সাল। তিনি কিসসাপ্রিয় খলিফাকে রােজ কিসসা শুনিয়ে খুশী করতেন। সেগুলাের সঙ্গে তিনি আজব তামার জালার কিসসাটিও শুনিয়েছিলেন।
আজব তামার জালার কিসসাটি এমনই অত্যাশ্চর্যে ভরপুর যে, খলিফা তার কাহিনীটি বিশ্বাস করতে উৎসাহী হলেন না। কিন্তু কেন তার মনে অবিশ্বাস দানা বাঁধল? কালাে ধোঁয়ায় পূর্ণ ছিল কিসসার তামার জালাটি। আদতে এ ধোঁয়া নাকি আদৌ ধোঁয়াই নয়। এগুলাে দৈত্যদের গায়ের রােয়া। তাজ্জব বাৎ! এমন ব্যাপার স্যাপার বিশ্বাস করা সম্ভব?
খলিফার চোখের অবিশ্বাসের ছাপটুকু প্রত্যক্ষ করে তার দিলে বিশ্বাস স্থাপনের জন্য তালিব-বিন-সাল প্রসঙ্গক্রমে বললেন—“জাহাপনা, আপনি ধর্মাত্মা। আপনার দরবারে ঝুট কিছু
পেশ করা আমার পক্ষে অন্ততঃ সম্ভব নয়। ঝুট কিছু বলে আপনাকে ধোঁকা দেওয়ার সাহস ও ইচ্ছা কোনটিই আমার নেই।  যা বল্লাম, এর বিলকুল সাচ্চা।
বহু দিন আগের বাৎ। জিন একবার সুলেমান-এর বিরুদ্ধে জেহাদ ঘােষণা করেছিল। তাই তিনি ওই তামার জালাটিতে তাকে আটক করে শাস্তি দিয়েছিলেন। তারপর পশ্চিম-আফ্রিকার মঘরিব এর বাইরে বিলাপ সাগরের পানিতে তাকে সমেত জালাটিকে ফেলে দিয়েছিলেন। জালাটিকে পানিতে ফেলার আগে কিছু ধোঁয়া তা থেকে বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল। সে ধোঁয়াই আফ্রিদি দৈত্যের আত্মা। তা বাতাসের সঙ্গে মিশে সে ফিন নিজের অবয়ব ফিরে পায়।
এ বাৎ শুনে খলিফা তাজ্জব বনে গেলেন। এ-ও কি কখনও হতে পারে। ব্যাপারটিকে তাে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করা দরকার। তিনি চোখে-মুখে বিস্ময়ের ছাপটুকু অক্ষুন্ন রেখেই বললেন—শুধু কথায়ই হবে না, আমি আফ্রিদির ধোঁয়ায় ভরা কয়েকটা জালা দেখতে চাই। এরকমটা কি কখনও হতে পারে? এ ব্যাপারে তােমার কি মত, বল। সম্ভব হলে আমাকে সঙ্গে করে তুমি চল। আমি নিজের চোখে ব্যাপারটি দেখে চক্ষু কর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করে আসি।
-জাহাপনা, আপনি মিছে তকলিফ করতে যাবেন কেন? আপনার হুকুম তামিল করতে ব্যাপারটিকে এখানেই দেখানাের বন্দোবস্ত করা হবে। এ কোন সমস্যাই নয়। তবে এর জন্য আপনাকে কেবলমাত্র একটু তকলিফ করে একটি চিঠি লিখতে হবে। ব্যস, তারপর যা করার আমিই সব করব। চিঠিটি লিখবেন আপনারই অধীনস্থ মঘরিব অঞ্চলের শাসনকর্তা আমীর মুশার নামে। চিঠিতে লিখবেন—পাহাড় যেখানে শেষ হয়ে সমুদ্রে প্রবেশ করেছে তার লাগােয়া ছােট্ট একটি সমতল ভূমি রয়েছে। তারই গায়ে সাগরের বুকে তামার জালাগুলােকে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে। মুশা যেন সেগুলােকে পানি থেকে তুলে আপনার দরবারে পাঠিয়ে দেন। ব্যস, এটুকু লিখলেই চলবে।
খলিফা সুলেমান মঘরিব-এর শাসনকর্তা আমীর মুশা’কে একটি চিঠি লিখে তামার জালাগুলােকে পাঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন।
খলিফার চিঠি কোর্তার জেবে পুরে ভূ-পর্যটক তালিব-বিন সাল আমীর মুশার কাছে ছুটলেন।
আমীর মুশা তালিব বিন সালকে যথাযােগ্য আদর আপ্যায়ন প্রদর্শন করলেন। চিঠির বক্তব্য পড়ে বললেন—খলিফার হুকম। যখন হয়েছে তখন আমাকে অবশ্যই তা তামিল করতে হবে।
আমীর মুশা তার সেনাপতি আব্দ-অল-সামাদকে তলব করলেন। তামাম দুনিয়া ঢুঁড়ে বেড়িয়ে বহুৎ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন।
সেনাপতি আব্দ-অল-সামাদ আমীর মুশার তলব পেয়ে ছুটে এলেন।
আমীর মুশা তাকে বললেন—মহামান্য খলিফা জিনের আত্মা ভর্তি কয়েকটি তামার জালা চেয়ে জরুরী চিঠি পাঠিয়েছেন। ডেভিড-এর লেড়কা সুলেমান তামার জালাগুলােতে কয়েকটি জিনের আত্মা ভর্তি করে রেখেছিলেন। তারা সেখানে বন্দী হয়ে রয়েছে। সাগরের বুকে জালাগুলাে রয়েছে। তােমার ওপরে সেগুলােকে তুলে আনার দায়িত্ব দিচ্ছি। সাগর আর পাহাড় যেখানে মিশেছে সেখানে সাগরের পানিতে নাকি ডুবিয়ে রাখা হয়েছে। আমি তাে এ-অঞ্চল বহুৎ দিন শাসন করছি, কিন্তু এরকম বাৎ এর আগে কারাে মুখে শুনিনি। কিন্তু আমাদের মেহমান তালিব-বিনসাল সাগরের যে-অংশের উল্লেখ করছেন আমি এরকম কিছুও কোনদিন শুনেছি বলেও মনে হচ্ছে না। ফিন কোনপথে সেখানে যাওয়া যাবে তা-ও আমার কিছুই জানা নেই। আপনাকে কষ্ট দিয়ে নিয়ে আসার অর্থ হচ্ছে, আপনি তাে তামাম দুনিয়া ঢুঁড়ে বেড়িয়েছেন। তালিব-অল-বিন যে পাহাড়ের ব্যাপারে বলছেন তা আশা করি আপনার অবশ্যই জানা আছে, ঠিক কিনা?
–হ্যা জাহাপনা, পাহাড় যেখানে সাগরে মিশেছে আমি এক দমে সেখানে গিয়েছিলাম বটে। লেকিন এ বুড়া হাড্ডি নিয়ে একা সেখানে যেতে আমার আর সাহসে কুলােচ্ছে না। সাধ থাকলেও সাধ্য আমার নেই। বিশ্বাস করুন, পথ খুবই দুর্গম, এমন কি প্রচণ্ড তেষ্টায় গলা ভেজাবার মত পানিটুকু পর্যন্ত পাওয়া যাবে না।
সবচেয়ে বড় কথা, সেখানে যেতেই দু’সাল কয়েক মাহিনা সময় লেগে যাবে। ফিরে আসতে আরও বেশী সময় লাগবে। ফিন ফিরে আসা যাবে কিনা সে ব্যাপারেও কিছুমাত্র নিশ্চয়তা নেই। বরং সম্ভাবনা কম বলেই ধরে নিতে হবে।
জাহাপনা, সে-মুলুকে জীবন্ত আদমির নামগন্ধও নেই। পাখি যেমন ডালের গায়ে ঝুলে থাকে ঠিক তেমনি পাহাড়ের গায়ে গায়ে আদমি ঝুলে থাকে। আজ পর্যন্ত ভিন মুলুকের কেউ-ই সে দেশে যেতে পারে নি। সেনগরটির নাম “তাম্র নগরী”। তাজ্জব এক নগর বটে! কয়েক মুহূর্ত নীরবে ভেবে নিয়ে বুড়াে সেনাপতি সামাদ ফিন মুখ খুলল —“জাহাপনা, আজ পর্যন্ত আপনার কাছে আমি কিছু ছিপাই নি। আজও ছিপাব না। এইমাত্র আমি সে-পথকে দুর্গম বলেছি। তবে কেবলমাত্র দুর্গম বললেই যথার্থ বলা হবে না, মারাত্মক ভয়াবহ, অস্বাভাবিক বিপদ পায়ে পায়ে জড়িয়ে থাকে। সেখানে যেতে গিয়ে মাঝপথে একটি বিশাল মরুভূমি রয়েছে। আফ্রিদি দৈত্য আর জিন রাত্রি-দিন চব্বিশ ঘণ্টা সে পথ পাহারা দিচ্ছে।
আর জনবসতি ? আজ পর্যন্ত কোন আদমি সে-অঞ্চলে বসতি গড়ে তুলতে পারে নি।
বুড়াে সেনাপতি সামাদ এবার মেহমান ভূ-পর্যটক তালিব-বিনসালকে লক্ষ্য করে বলল সামাদ সাহাব, আফ্রিকার পশ্চিম প্রান্তটি আদমিদের কাছে যে নিষিদ্ধ তা নিশ্চয়ই আপনার জানা আছে? আজ অবধি কেবলমাত্র দু'আদমি সেখানে যেতে পেরেছিলেন। তাদের মধ্যে একজন ডেভিড-এর লেড়কা সুলেমান। আর দুসরা জোড়া সিঙ্গের আলেকজান্দার। জায়গাটি একেবারেই নীরবতার রাজত্ব। চারদিকে কেবল বালি আর বালি। বিস্তীর্ণ মরুভূমি। সেখানে গিয়ে দাঁড়ালে মালুম হবে বুঝি আপনি নীরবনিস্তব্ধ গােরস্তানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
আমীর মুশা এবার মুখ খুললেন—“সামাদ সাহাব, বিলকুল। সাচ্চা বাৎ। মাথার ওপরে ঘােরতর বিপদ। তবু সব কিছুকে উপেক্ষা করে সেখানে যেতেই হবে। এখন কথা হচ্ছে, আপনি যদি নিতান্তই যেতে আপত্তি করেন তবে আমাকেই রওনা হতে হবে। খলিফার কুম তামিল না করে উপায় নেই। এখন বিবেচনা করে দেখুন। 
–“কিন্তু যেতে হলে আমাকেই যেতে হবে। অন্য কারাে পক্ষে একাজ কিছুতেই সম্ভব নয়। আর পথ কেবলমাত্র আমারই জানা।
আমীর মুশা, দু'হাজার উট সঙ্গে নিয়ে নিল। এক হাজার খানা আর অন্য এক হাজার পানি বহন করবে। সে-মুলুকে জ্যান্ত আদমি টাদমি নেই বলে সৈন্য সামন্ত বেশী নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। যারা আছে তারা প্রেতলােকের বাসিন্দা। ছায়ার মত ঘুরে বেড়ায়। অস্ত্রশস্ত্র তাদের কাছে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। তাদের গায়েই লাগবে না। আর যদি ক্ষেপেই যায় তবে সৈন্য বা অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়াস বৃথা। তাছাড়া ফালতু লটবহরের ঝামেলা দেখলে তারা ভীষণ ক্ষেপে যেতে পারে। সব বন্দোবস্ত করে দিন। আল্লাহর নাম নিয়ে বেরিয়ে পড়ি।
এমন সময় প্রভাত হয়ে আসায় বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ চল্লিশতম রজনী 
রাত্রি একটু গভীর হতেই বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদএর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন-“জাহাপনা, বুড়াে সেনাপতি সামাদ বিদায় নিলে আমীর মুশার মুখ ডরে একেবারে চূণ হয়ে গেল। একদম ঘাবড়ে গেলেন, আল্লাহ ভরসা। তবু তার চাহিদা অনুযায়ী সব কিছুর বন্দোবস্ত করে দিলেন। | আমীর মুশা এবার সেনা বাহিনীর প্রধান সেনাপতি এবং বিভিন্ন বিভাগের সেনাপতিদের তলব করলেন। সবার উপস্থিতিতে নিজের ইচ্ছার বাৎ ব্যক্ত করে লেড়কা হারুণ’কে মসনদে অভিষিক্ত করলেন। ক'রে দায়িত্বমুক্ত হলেন। তার অনুপস্থিতিতে হারুণ-এর ওপরই রাজ্যের সার্বিক দায়িত্বভার অর্পিত হ’ল।
আমীর মুশা এবার সামাদ-এর চাহিদা অনুযায়ী সামানপত্র গােছগাছ করার কাজে মেতে গেলেন।
যাবতীয় ব্যবস্থাদি পাকা হয়ে গেলে আল্লাহর নাম নিয়ে শুভমুহূর্তে তারা পথে নামলেন।
দু'হাজার উট। বিশাল বাহিনী। দিনের পর দিন পথ পাড়ি দিতে লাগল। একের পর এক মাহিনা ক্রমেই পেরােতে লাগল। কয়েক মাহিনা চলার পর তারা মরুভূমির বালির রাজত্বে প্রবেশ করলেন।
এবার বিশাল বাহিনী মরুভূমির ওপর দিয়ে চলতে লাগল। নীরব-নিস্তব্ধ মরুভূমি। ঠিক যেন গােরস্তানের ওপর দিয়ে তারা এগিয়ে চলেছেন। প্রাণীর চিহ্ন মাত্রও নেই। এক বিকালে দিগন্ত জুড়ে এক টুকরাে ঘন কালাে মেঘের মত কি যেন দেখা গেল। কি? মেঘ? নাকি অন্য কিছু?
তারা উটের মুখ ওই কালাে দিকটির দিকে ঘুরিয়ে দিল। অফুরন্ত জিজ্ঞাসা আর আতঙ্ক নিয়ে তারা এগিয়ে চলল। কিছুদূর যেতেই ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে গেল। ওই কালাে বস্তুটি মােটেই মেঘ বা অন্য কিছু নয়। আকাশচুম্বী সুবিশাল এক মকান। ইস্পাতের দেয়ালে ঘেরা মকানটি। তার পরিধি কম করেও হাজার দশেক ফুট তাে হবেই। তার গম্বুজটি সিসের তৈরী। তার চারদিকে সুবিশাল কার্নিশ। হাজার হাজার কাক যাতে ভালভাবে বসতে পারে তার জন্যই এরকম ব্যবস্থা। আর ইয়া পেল্লাই চারটি থামের ওপর বিশালায়তন বাড়িটি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সব মিলিয়ে সে এক তাজ্জব ব্যাপার।
কুচকুচে কাকই সেখানকার একমাত্র বাসিন্দা। কাক ছাড়া অন্য কোন প্রাণীর চিহ্নমাত্রও দেখা যায় নি।
মকানটির প্রধান ফটকের সামনে অতিকায় একটি কালাে পাথরের ফলক। তার গায়ে রােমান হরফে খােদাই করা কয়েকটি ছত্র লেখা। সামাদ-ই কেবল রােমান হরফ পড়তে পারেন। তিনি পাথরের গায়ের লেখাটি পড়ে মুশা’কে তার অর্থ করে বুঝিয়ে দিলেন। 
কালাে পাথরটির গায়ের লেখাটির বক্তব্য হল—যাও, ভেতরে ঢুকে যাও। তবেই রাজাদের কিসসা কাহিনী জানতে পারবে। তারা আমার এ গম্বুজের ছায়ায় কিছু সময় বিশ্রাম করেই বাতাসে মিলিয়ে গেছে। খড়কুটোর মত মৃত্যুর ঝড়ের সঙ্গে উড়ে গিয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
মুশা বাণীটির অর্থ উপলব্ধি করার পর বহুৎ মর্মাহত হলেন। মুখ দিয়ে অস্পষ্ট স্বর বেরিয়ে এলে—“আল্লাহ ছাড়া আর কোন ভগবান নেই! আল্লাহ এক ও অভিন্ন।
মুশা কয়েক মুহূর্ত কালাে পাথরের সামনে বিমর্ষ মুখে দাঁড়িয়ে থেকে এক সময় চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এবার সদলবলে মকানটির ভেতরে ঢুকে গেলেন। ভেতরে ঢুকতেই কালাে গ্রানাইট পাথরের সুউচ্চ একটি মিনার তাদের সামনে পড়ল। তার চারদিকে কুচকুচে কালাে কাকের মেলা বসেছে যেন।
মিনারটির চারদিকে অসংখ্য সমাধি স্তম্ভ। পেল্লাই একটি স্তম্ভের গায়ে রােমান হরফে লেখা। যার মর্মার্থ হল—
বিকারের রােগীর মত যৌবনের উন্মত্ততা অতিবাহিত হয়েছে। তবু বহুৎ কিছুই আমি দেখেছি। যৌবনের বল-বীর্যের কথা কি কখনও মন থেকে মােছা যায়? যদিও আমি নির্দ্বিধায় মেনে নিচ্ছি, আজকে আমি ধুলােতে মিশে একাকার হয়ে গেছি। আজও আমি যেন যৌবনের উন্মত্ততার উচ্ছলতার ধ্বনি স্পষ্টই শুনতে পাচ্ছি। প্রবল বিক্রমে বিশাল শহরকে বার বার ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছি। ভীত-সন্ত্রস্ত নারী পুরুষরা ভয়ে বিষাদের শ্বাস ফেলে প্রতি মুহূর্তে। আমার রথের চাকায় রাজারাজড়াদের প্রাণনাশ করেছি। কোনরকম ক্ষমা কাউকেই কোনদিন করিনি। কিন্তু আজ? যৌবনের সে উন্মাদনা যেন খােয়াবের মত চোখের সামনে ভাসছে। আর বালির মৃত যাদুঘরে ফেনার অক্ষরের মত বালির চরের ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে। আমার সৈন্যসামন্ত ও যাবতীয় কেীশলকে ব্যর্থ করে দিয়ে মৃত্যু আমাকে বন্দী করে নিয়েছে। ওগাে পথিকবর শােন, কান পেতে শােন আমার মৃত্যু বাণী। আত্মার অপচয় কোরাে না।এ মাটি হয়ত কালই বলবে আমি তাকে আমার জঠরে আশ্রয় দিয়েছি। 
বুড়াে সামাদ কবিতার বক্তব্য তর্জমা করে করে মুশা আর তার সঙ্গী সাথীদের বুঝিয়ে দিতে লাগলেন। মুশার চোখে পানির ধারা। নেমে এল। আর ভাবতে লাগলেন-খােদাতাল্লার অভিসম্পাতে হতভাগ্যটিকে কী অন্তহীন কষ্টই না স্বীকার করতে হয়েছে।'
ব্যথিত মর্মাহত মুশা এবার এগিয়ে গিয়ে মিনারটির কাছে দাঁড়ালেন। সামাদ তার পাশে দাঁড়িয়ে কাঠের দরওয়াজার গায়ে সােনার পাতে রােমান হরফে লেখা আর একটি কবিতা পাঠ করতে
লাগলেন।
কবিতাটি পাঠ শেষ করে সামাদ এবার সেটি তর্জমা করে মুশাকে বুঝিয়ে দিতে গিয়ে বললেন
আমি সর্বশক্তিমান পরম পিতার নামে বলছি—তােমরা, যারা এখানে হাজির তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, ভুলেও যেন কেউ আরশির দিকে তাকিয়াে না। তােমাদের একটি নিঃশ্বাসই তাকে ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। মায়া, হ্যা, মায়ার ফাঁদ পেতেই তাে আদমিদের পা মচকে দেয়। আমার শক্তি সামর্থ্যের বাৎ কিছু বলছি শােন, দশ হাজার ঘােড়া আমার ছিল। বন্দী রাজারা ছিল তাদের সহিস। হারেমে সহস্রাধিক অনূঢ়া রাজকন্যা আমাকে খুশী করার জন্য সর্বদা চনমন করত। তামাম দুনিয়া থেকে আমি তাদের যােগাড় করেছিলাম। তাদের কুচগুলি ছিল মনলােভা। সৌন্দর্যের মূর্ত প্রতীক। পূর্ব আর পশ্চিম আমার পদানত হয়েছিল। আমি নিজেকে সর্বশক্তিমান ভেবেছিলাম। কিন্তু অচিরেই যিনি আদৎ সর্বশক্তিধর তার কাছ থেকে আমার তলব এল। | ওপরওয়ালার তলব পেয়ে আমি আমার কোষাগারের দরওয়াজা খুলে দিয়ে আমার অধীনস্থ সুলতানদের ডেকে বললাম, তােমরা ধনদৌলত যা কিছু আছে নিয়ে যাও আর বিনিময়ে আমাকে মাত্র একটি দিন আমার জানটিকে টিকিয়ে রাখ। তারা নীরবে অধােমুখে দাঁড়িয়ে রইল। মােউৎ এসে আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল আর দখল করল আমার মসনদ।
সামাদ কবিতাটির তর্জমা করা শেষ করলে সবাই ডুকরে ডুকরে কেঁদে বুক ভাসাতে লাগল।
অনেকক্ষণ ধরে কান্নাকাটির পর চোখের পানি মুছতে মুছতে একে একে সবাই ভেতরে ঢুকে গেল। অতিকায় সব হলঘর। আসবাবপত্র সবই সাজানাে গােছানাে। কিন্তু সবই ফাঁকা।
পর পর কয়েকটি কামরা ডিঙিয়ে তারা আরও বড় একটি কামরায় ঢুকে গেল। পেল্লাই একটি চন্দন কাঠের টেবিল।
( চলবে ) 

Post a Comment

0 Comments