গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
আমি এবার তাের কালাে রূপের কথা কিছু বলছি—কালাে ? গােরস্থানের কাকের গায়ের রঙ কালাে। লেখার কাজে যে-কালি ব্যবহার করা হয় তার রঙও তাে কালােই বটে, কামরায় কামরায় যে ঝুল পড়ে তার রঙ? সে-ও তাে কালােই হয়ে থাকে, ঠিক কিনা? কাক কালাে। কিন্তু সে কি আচ্ছা গান গাইতে সক্ষম, বল ?
এক কবি সফেদ আর কালােকে পাশাপাশি রেখে বহুৎ আচ্ছা এক কবিতা লিখেছেন যার বিষয়বস্তু হ’ল বাদশাহের অর্থ দিয়ে একটি মুক্তা খরিদ করা সম্ভব কিন্তু এক শিলিঙ দামে এক বস্তা কয়লা বিক্রি হয়ে যায়। সফেদ মুখ আর সফেদ পাখা দিয়ে বেহেস্তটাকে চিনে নাও, তা যদি না হত তবে তাে স্বর্গের অস্তিত্ব কিছুই থাকত না। বাস্তবে নয়, কেবলমাত্র নামের মধ্যেই বেহেস্ত ও চাপা পড়ে থাকত। তােমরা যদি আমাকে বলতে বল তবে আমি একটিমাত্র কথার মাধ্যমেই আমার বক্তব্যকে পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিতে পারি—যাকে আমরা দোজখ সম্বােধন করি সে তাে কেবলমাত্র কালােই বটে।
মহাধার্মিক নােওয়ার একটি কিসসা শোনাচ্ছি—নােওয়ার দুই লেডকা। তাদের একজনের নাম—হাম আর দ্বিতীয়জনের নাম সাম।
নােওয়া একদিন লেড়কা দুটোকে শিয়রে বসিয়ে নিদ যাচ্ছিলেন। | নােওয়া যখন নিদে পুরােদমে বিভাের তখন আচমকা ঝােড়াে বাতাস বইল। বাতাসে তার কাপড় উঠে গেল। বাতাসে কাপড় উঠে যাওয়ায় নােওয়ার পুরুষাঙ্গ বেরিয়ে পড়ে। হাম এ দৃশ্য দেখে বেদম হাসাহাসি শুরু করে দিল। সে কী হাসি! দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম।
ইতিহাস বলে নােওয়া দুনিয়ার দ্বিতীয় পুরুষ। তার জিন্দেগীর বিচিত্র সব কিসসা তাে আর কারাে অজানা নয়। কাপড় উড়ে গিয়ে তার পুরুষাঙ্গ বেরিয়ে পড়ার ব্যাপারটি প্রত্যক্ষ করে সাম কিন্তু একদম হাসাহাসি করল না।
সাম তার আব্বার ধর্মবােধ এবং সুখ্যাতির বিবরণ কিছু কিছু জ্ঞাত ছিল। তাই সে নিঃশব্দে তার কাপড় গােছগাছ করে পুরুষাঙ্গটি ঢেকে দিল। এর মধ্যেই তার নিদ গেল টুটে।
নােওয়া চোখ মেলে তাকিয়েই হামকে হাসাহাসি করতে দেখলেন। তিনি তাকে অভিসম্পাত দিলেন। আর সাম-এর মুখে গাম্ভীর্যের ছাপ দেখে তিনি প্রীত হয়ে তাকে আশীর্বাদ করলেন।
আব্বার মুখ থেকে অভিসম্পাত বাক্য নির্গত হওয়ায় হাম-এর মুখ একেবারে চূণ হয়ে গেল। আর সাম-এর মুখ অধিকতর সফেদ ও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
পরবর্তীকালে সাম-এর বংশধররা হলেন মহাযােগী, ধর্মযাজক, ধর্মপ্রচারক এবং রাজা।
আর অভিসম্পাত লাভ করে হাম পড়ল মহাফাঁপরে। সে তার কালাে মুখটিকে লােকচক্ষুর আড়ালে রাখার উদ্দেশ্যে ঘর-সংসার ফেলে ভেগে গেল। তার বংশে পয়দা হ’ল কালাে ও বীভৎস নিগ্রোরা। তার বংশে কোন যােগী, ধর্মগুরু বা দেবদূত পয়দা হয় নি। এসব বাৎ কেবলমাত্র জ্ঞানীরাই নয় ছােট-বড় সব আদমিরই জানা আছে।
আলীর নির্দেশে বদরুন্নেসা মৌন হ’ল। কৃষ্ণকায়া লেড়কিটি উঠে দাঁড়িয়ে তার বক্তব্য পেশ করতে লাগল। সে স্বাভাবিক স্বরেই বক্তব্য শুরু করল—“বদরুন্নেসা, তুই কিছু জানিস না। কিছু না জানলে বলবিই বা কি করে, ঠিকই তাে।
তোকে কোরাণের বক্তব্য আগে শােনাচ্ছি—আল্লাতাল্লা গভীর রাত্রে শপথ নিতেন। তবে এরকম কথা জোর দিয়ে বলা যায় যে, তিনি দুপুরে মােটেই শপথ নিতেন না। মাঝ-রাত্রিটিকে তিনি সবচেয়ে বেশী পছন্দ করতেন কেন, জানিস কি? কারণ, মাঝরাত্রিটি যে কালাে নয় রে, সফেদ।
কালাে চুল সম্বন্ধে কিছু বলছি শােন—‘কালাে চুল কার প্রতীক, বল তাে? জেনে রাখ, যৌবনের প্রতীক তাে কালাে ছাড়া কিছু নয় রে। আর সফেদ? সফেদ চুল? সফেদ চুল বার্ধক্যের প্রতীক। বার্ধক্যে ভােগ আর কামনা বাসনা খতম হয়ে যায়। তখন যবনিকা পতনের অপেক্ষা। কিসসার এ-পর্যন্ত বলতে না বলতেই ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ' পঁয়ত্রিশতম রজনী
রাত্রি গভীর হওয়ার আগেই বাদশাহ শারিয়ার কিসসা শােনার অত্যুগ্র আগ্রহ নিয়ে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—“জাহাপনা, কৃষ্ণকায়া লেড়কিটি ব’লে চলল - শােন ভাই, কালাে যদি রঙের মধ্যে সেরা নাই হবে তবে আল্লাতাল্লা কেন আমাদের কলিজা ও চোখের মণির ওপরে কালাে রঙের প্রলেপ দিয়ে দিয়েছেন?
কালাে রঙের পক্ষ অবলম্বন করে এক প্রখ্যাত কবি বহুৎ আচ্ছা বক্তব্যের অবতারণা করেছেন কালাে দেহের ভেতরে আগুন জ্বেলে রাখা আছে। আর তাদের শিরা-উপশিরায় ভােগ-বাসনা বিদ্যমান। কালাে দেহে যৌবনের চাঞ্চল্য লক্ষিত হয়। আর সফেদ ? সে-তাে ডিমের খােলারই সামিল। আল্লাহ, এরকম দেহ নিয়ে দুনিয়ায় জিন্দা থাকার তিলমাত্র ইচ্ছাও আমার নেই। খােলাটিকে পেয়ার করাই তাে কঠিন সমস্যার ব্যাপার। যদি তা-ই হ'ত তবে আমি জানটিকে টিকিয়েই রাখতে পারতাম না। মৃতের ঢাকনার সফেদ কাপড় দেখলেই আমার গা-পিত্তি জ্বলে যায়। সফেদ চুলওয়ালার মহব্বৎ তাে কবরখানার বিলাপ ছাড়া কিছু নয়।
আরও বলছি শােন কখন অভিন্নহৃদয় বন্ধুরা এক জায়গায় মিলিত হয়, জানিস? রাত্রে।
মেহবুব আর মেহবুবা কার খোঁজ করে বলতে পারিস?- ছায়াকে। কিন্তু কেন ছায়াকে খুঁজে বেড়ায়, জানিস কি? আরে, ছায়ার রঙ যে কালাে। তাদের ব্যাপার স্যাপার নিয়ে যাতে দিনের আলাে মাথা ঘামাতে না পারে সেজন্যই তাে রাত্রির অন্ধকার তাদের আড়াল করে রাখে। নিরাপদ আশ্রয় সৃষ্টি করে তাদের পেয়ার মহব্বতের সুযােগ করে দেয়। দিনের আলােয়, এসব করতে গেলে তাে তুই-ই পঞ্চমুখে কুৎসা প্রচারের কাজে মেতে যাবি।
আরে, একটি ব্যাপার তাে খুবই সাধারণ—ফুলশয্যার রাত্রি শেষ হয়ে গেলে নবদম্পতি কি ব’লে অনুতাপ জ্বালা প্রকাশ করে। তা-ও কি জানা নেই ? বলে—হায়রে আমার নসীব! এত তাড়াতাড়ি রাত্রি ফুরিয়ে ভাের হয়ে গেল! আচ্ছা বল তাে, কেন এরকম বলে আক্ষেপ করে? রাত্রিকে বহুৎ পছন্দ করে বলেই না তাদের মুখ দিয়ে এরকম মন্তব্য বেরােয়। না, বেশী বলার ইচ্ছা নেই। জ্ঞানীরা তাে বলেনই—বেশী বাক্য ব্যয় না করে অল্প কথাতেই বেশী যুক্তি খাড়া করা যায়। ওরে, এবার কি বলছি, ধৈর্য ধরে শােন। কালাের প্রশংসা আর বেশী করতে চাই না। তবে জেনে রাখ, যত রঙ আছে তাদের মধ্যে কালােই একমাত্র খাটি রঙ। আর যা কিছু সবই মেকী।
এবার কালাের সুখ্যাতি রেখে তাের কথা শুরু করা যাক। আমি কালাে রঙ নিয়ে পুরুষের দৃষ্টি যত আকর্ষণ করতে পারি তার এক অংশও তাের পক্ষে সম্ভব হয় না।
তাের সফেদ রঙের কথা যদি বলতেই হয় তবে বলছি—শােন, তাের সফেদ রঙটি তাে কুষ্ঠের মতই দুরারােগ্য একটি ব্যাধি। কী উৎকট গন্ধ-কারই বা অজানা, বল তাে।।
আরে, একটু আগে তুই নিজেকে তুষারের সঙ্গে তুলনা করছিলি। ঠিক কিনা ?
মেহবুব-মেহবুবা তাই তাে তুষারটিকে বরবাদ করে দিয়েছে দোজখেতে কিভাবে? দোজখের নাম শুনিস নি? নিশ্চয় শুনেছিস তাই না? দোজখে পাপিষ্ঠাদের শাস্তি দেয়ার জন্য তুষার জমিয়ে রাখার বন্দোবস্ত করা হয়। কী যে ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডা সে আর বলার নয়। হাড়মাস ঠাণ্ডায় একেবারে জমে যাওয়ার উপক্রম। আমরা আগুনকে ভয়ঙ্কর বলে থাকি। কিন্তু দোজখের ঠাণ্ডা আগুনের চেয়েও ভয়ঙ্কর। আর তার রঙ? বরফেরই মত সফেদ। তাইতেই তাে মেহবুব-মেহবুবারা ঠাণ্ডাটিকে একেবারে বরবাদ করে দিয়েছে। বদরুন্নেসা, তুই তাে আমাকে লেখার কালির সঙ্গে তুলনা করলি, তাই তাে? বহুৎ আচ্ছা, আমার একটি বাতের জবাব দে তাে? আল্লাহ-র যত বাৎ কি দিয়ে লেখা হয়েছে, বল তাে শুনি? কেবলমাত্র আমি কেন ? দুনিয়ার সব্বাই স্বীকার করবে, কালাে কালি দিয়েই। তােকে আরও বলি কস্তুরি, মৃগ নাভি কাকে বলে? তার গুণ তাের জরুর জানা আছে? আর রঙটি কি? তামাম দুনিয়ার আদমি এর জবাবে একই বাৎ বলবে—কালাে।
কালাের গুণকীর্তন করতে গিয়ে এক নামজাদা কবি যে মন্তব্য করেছেন তা হল—যে মৃগনাভি সর্বোৎকৃষ্ট বলে গণ্য হয় তা কিন্তু কালাে। আর পচা নাসপাতির রঙ? সে-তাে সাদা। যে চোখের মণির সাহায্যে দুনিয়ার জৌলুস তুমি দেখতে পাও, তার রঙ ? সে-ও তাে কালােই বটে। ফিন অন্ধদের চোখ তাে ধবধবে সাদা। কালাের অনুপস্থিতির জন্য তাদের চোখের সামনে থেকে সবকিছু বেপাত্তা হয়ে যায়।
আলী সােল্লাসে বলে উঠল-বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ আচ্ছা! বহুৎ বড়িয়া সব যুক্তির অবতারণা করে তােমরা নিজ নিজ বক্তব্যকে জোরদার করে তুলেছ। আর এরই ফলে তােমাদের বাকযুদ্ধ সার্থকতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তােমাদের বহুৎ, বহুৎ তারিফ না করে আমি পারছি না।
আলীর নির্দেশে দ্বিতীয় দল এবার সামনে এসে দাঁড়াল। এবার মুখােমুখি হ’ল ধুমসাে মােটা বদর-এ-কামিল আর পেকাঠির মাফিক লিকলিকে লেড়কিটি।।
আলীর হুকুমে মােটাসােটা বদর-এ-কামিল তার বক্তব্য শুরু করার জন্য তৈরি হ’ল। শুরু করার মুখেই সে এক বিশ্রী কাণ্ড করল। দুম করে সালােয়ার, কামিজ বিলকুল খুলে একেবারে বিবস্ত্র হয়ে গেল। বিবস্ত্রা বদর এ-কামিল এবার চারদিকে ঘুরে ঘুরে তার সব অঙ্গগুলি দেখাল। সবার আগে দেখাল গােড়ালি ও কবজি। তারপর ইয়া পেল্লাই মােটা, হাতির পায়ের মত উরু ও পায়ের গােছার দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সবেগে সম মাদ্যত থলথলে স্তনযুগলের নিচে খুবসুরৎ তার উদরটিকে দেখাল। এবার সমাদ্যত, পরিসরমর্দন স্তনযুগলের প্রতি সবার নজর ফেলার প্রয়াস চালাল। এর ফল কি হ'ল? লেড়কিটি বিবস্ত্র হয়ে মৃদু মৃদু তরঙ্গের সৃষ্টি করে সে আলীকে কামলােভাতুর করে তুলল। তার কামনার আগুনে মুঠো মুঠো ধূলাে ছিটিয়ে উত্তেজনায় ভরপুর করে তুলল তাকে।
এবার বিবস্ত্র অবস্থাতেই ধুমসাে লেড়কিটি লিকলিকে লেড়কিটির মুখােমুখি গিয়ে খাড়া হ’ল। কটাক্ষ করল।
এমন সময় ভােরের পূর্বাভাষ পেয়ে বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ ছত্রিশতম রজনী
সে রাত্রে বাদশাহ শাহরিয়া অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন।
বেগম বাদশাহকে যথােচিত সম্ভাষণ করে পালঙ্কে বসালেন। তিনি বেগমের কোলে শির রেখে কিসসা শােনার জন্য প্রস্তুতি নিলেন। বেগম আঙুল দিয়ে তার চুলে বিলি কাটতে কাটতে কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করতে গিয়ে বললেন—“জাঁহাপনা, ইয়া পেল্লাই মােটা বদর-একামিল লিকলিকে বেহেস্তের হুরীর মুখখামুখি দাঁড়িয়ে তার মেদবহুল শরীরটির সমর্থনে বক্তব্য শুরু করল—শােন গাে বেহেস্তের হুরী, খােদাতাল্লার মেহেরবানিতে পাহাড়, পর্বত, টিলা আর গুহা যা কিছু দেখছ সর্বত্রই স্থূলত্বের ছড়াছড়ি। আর তাদের গায়ে যেন তুলতুলে নরম ঘাস আর লতাপাতার গালিচা বিছিয়ে দেয়া হয়েছে। খােদাতাল্লার নরম জিনিসের প্রতিই সবচেয়ে বেশী আকর্ষণ। আর আমার শরীরে যে মেদের বিচিত্র সমারােহ দেখতে পাচ্ছ। তা কিন্তু আল্লাহ তার পছন্দ মাফিকই আমার হাড়-মাসে লেপে দিয়েছেন। আর তারই অপার করুণায় আমার শরীরে পদ্মের সুমিষ্ট খুসবু আর মধুর মনলােভা বাসনা নির্গত হয়। আমার গায়ে যে মাংসপিণ্ডের সমারােহ দেখতে পাচ্ছ তা-ও তারই একান্ত ইচ্ছার ফসল। আর আমার শরীরের তাগদ? সে-ও তাে তারই দোয়াতেই লাভ করেছি। এক থাপ্পড়ে শত্রুকে ধরাশায়ী করার হিম্মৎ আমার মধ্যে সঞ্চিত রয়েছে। ওগাে আমার পেকাঠি সুন্দরী, জ্ঞানীগুণী আদমিরা এ সম্বন্ধে কি মত পােষণ করেন, জান কি? তাদের মতে জিন্দেগীতে তিনটি উপায়ে প্রকৃত আনন্দ উপভােগ করা যেতে পারে, যেমন—গােস্তর ওপর চড়ে সুখভােগ কর, গােস্ত নিয়ে খেলায় মাত আর গােস্ত খেয়ে তাগদ বাড়াও।
বিলকুল সাচ্চা বাৎ। নাদুসনুদুস লেড়কিদের দেখলে কার দিলটি না চনমনিয়ে ওঠে, বল তাে? তুমিই বল তাে ঘন ঘন চড়াই উৎরাই দেখলে কেউ কি মুখ ঘুরিয়ে নেয়, নাকি মুখ ঘুরিয়ে থাকতে পারে?
জান কি, আল্লাহ তুলতুলে নরম জিনিস কত পছন্দ করেন? তাই তাে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন মেদবহুল মােটাসােটা মেষ শাবক আর বাছুরকে কোরবানি দেয়ার জন্য, জানিস তাে?
সালােয়ার কামিজ খুলে বিবস্ত্র হয়ে, আল্লাতাল্লার দেয়া পােশাকে আমি তোের মুখখামুখি দাঁড়িয়ে, চেয়ে দেখ। ভাল করে লক্ষ্য করলে স্বীকার করতে বাধ্য হবি, আমার শরীরটি যেন বহু এক বাগিচা। প্রকৃতির বাগিচা। বুকের দিকে নজর দে, কেমন নিটোল দুটো ডালিম শােভা পাচ্ছে। গাল দুটোতে যেন দুটো রক্তাভ পীচফল শােভা পাচ্ছে। আর আমার কোমরের নিচের দিকটায় নজর দে, দেখ, কী সুন্দর এক তরমুজ যেন ফলে রয়েছে।
জানিস কি, তিতির পাখি ইজরাইলের পাট চুকিয়ে মিশরে পাড়ি জমিয়েছে। তার ফলে ইজরাইলের লেড়কা-লেড়কিরা পরম উপাদেয় তিতিরের গােস্তের স্বাদ থেকে বঞ্চিত। কী মর্মান্তিক ব্যাপার ভেবে দেখ তাে। ওগাে বেহেস্তের হুরী, একটি তিতির থেকে কতখানি গােস্ত মেলে, জানা আছে কি? আর তার স্বাদ ? তার স্বাদের ব্যাপারে কিছুমাত্র ধারণাও কি তাের রয়েছে? তার গা থেকে এত বেশী গােস্ত মেলে বলেই না সবাই তার সমাদর করে, ঠিক বালাই নি?
কষাইখানায় গিয়ে গােস্তর দাম দিয়ে কেউ কি শুধু এক ঝােলা হাড্ডি খরিদ করে কখনও ফিরে আসে? এমন এক তাজ্জব ব্যাপার তুই দেখেছিস, নাকি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিস? কসাই তার
পেয়ারের খদ্দেরদের জন্য গােস্তওয়ালা টুকরােগুলাে আগেভাগে লুকিয়ে রাখে।
ওরে বেহেস্তের স্ত্রী, কেবলমাত্র আমিই নই, বহুৎ সব কবিও আমার মত সুদেহী, মেদবতী লেড়কিদের গুণকীর্তন করতে গিয়ে যা বলেছেন তা হল—তার হাঁটুর গড়ন, হাঁটুর লাবণ্য একবারটি চেয়ে দেখ! তার সুডৌল নিতম্বদ্বয়ের ভারে ভূমিতে কম্পন অনুভূত হচ্ছে। স্থূলকায়ারা কামনা-বাসনার রাণী। তার জঙঘাদ্বয়ের কম্পনে জমিনে মৃদু মৃদু কম্পনের সৃষ্টি হচ্ছে। এরূপ প্রত্যক্ষ করে আমার দিল ভরে উঠল, খুশী উপচে পড়ছে। আর এরই মাধ্যমে আমার জিন্দেগী সার্থকতায় পরিপূর্ণ বলে জ্ঞান করছি। আমি না-ই বা বলতে গেলাম। তুই নিজেই তাের হাড্ডিসার তুলতুলে চেহারার দিকে একবারটি চোখ ফেরা। যেন এক দাঁড়কাক ঘাড় বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে। তাের মুখের দিকে তাকালে কার মধ্যে খুশীর সঞ্চার হয়, বল তাে? তাের বুকের দিকে তাকালে কার কার মধ্যে পুলকের সঞ্চার হয়, বলতে পারিস? তাের শরীরের হাড্ডিগুলাে কী শক্ত! কোন মরদ যদি ভুল করে তােকে আলিঙ্গন করে বসে তবে তার কী দশা হবে, ভেবে দেখ তাে। খােদার নামে কসম খেয়ে বলতে পারি, সে-বেকুফ নির্ঘাৎ জখম হয়ে চিল্লিয়ে উঠবে।
বেহেস্তের হুরী, তাের মত লেড়কিকে দেখে এক বিখ্যাত কবি বলেছেন—খােদা মেহেরবান কখনও যেন হাড্ডিসার রােগার ওপর চড়তে না হয়। রােগা লেড়কিরা বড়ই আনাড়ী। তাই তাদের ডর লাগে, তাদের বুকে তিলমাত্র আরামও যদি পাই তবে সকালে বিছানা ছেড়ে উঠে আমার শিরা-উপশিরাগুলি খুণহীন হয়ে পড়েছে। ইয়া আল্লাহ! রক্ষা কর।'
আলী এগিয়ে গিয়ে বলল —বহুৎ আচ্ছা—বহুৎ আচ্ছা! অনেক বলেছ, আর নয়। এবার তুমি নিজের জায়গায় যাও।
বেহেস্তের হুরী এবার মুখর হ’ল। তার উমর অন্য পাঁচজনের মধ্যে সবার চেয়ে কম। সে নাদুসনুদুস লেড়কিটির দিকে আড় চোখে তাকিয়ে তার বক্তব্য শুরু করল—আমার দিকে তাকা। আমার এ-দেহটি কার অপার করুণার ফসল, বলতে পার? আল্লাহই আমাকে তার নিজের রুচি ও মর্জি মাফিক তৈরি করেছে। তাকে হাজার কুর্ণিশ জানাই।
আকাশচুম্বী ইয়েলাে গাছ যখন বাতাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দোল খায় সে দৃশ্য কি চোখের সামনে কোনদিন দেখেছ? তা বাস্তবিকই দিলকে দোলা দেয়।
ডাঁটার মাথায় পানির ওপরে যে পদ্মফুল ফুটে থাকে তখন তার যে সুরৎ চোখে পড়ে তার চেয়ে আচ্ছা কিছু দুনিয়ায় আছে কি? আর যে-বাঁশী যুবতী লেড়কির দিলে দোলা লাগায়, মাতােয়ারা করে তােলে, শুনেছ কি?
( চলবে )

0 Comments