গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ গল্পের প্রথম পর্ব পড়তে সার্চ মেনুতে ১ লিখে সার্চ করুন ।
ডাঁটার মাথায় পানির ওপরে যে পদ্মফুল ফুটে থাকে তখন তার যে সুরৎ চোখে পড়ে তার চেয়ে আচ্ছা কিছু দুনিয়ায় আছে কি? আর যে-বাঁশী যুবতী লেড়কির দিলে দোলা লাগায়, মাতােয়ারা করে তােলে, শুনেছ কি? মাতােয়ারা করা বাঁশী, ইয়েলাে গাছে শাখা-প্রশাখা আর পদে ডাটা সবই তাে সরু, হালকা আর কম ওজন বিশিষ্ট, ঠিক কিনা?
আমি রােগা, হালকা। তাই তাে আমি লম্বা-লম্বা পায়ে হনহনিয়ে চলতে সক্ষম। ব্যাপারটি কী আরামদায়ক, ভাবতে পার? জমিনের ওপর সােজাভাবে আমি হাঁটি। কোনরকম জড়তা প্রকাশ পায় না। কচ্ছপের মত গড়িয়ে গড়িয়ে চলাফেরা আমার ধাতে সয় না, পারিও না। তাই তাে মেদবহুল মোটাসােটা আদমিদের দেখলে আমার শরীর ঘুলায়, মাথা ঝিমঝিম করে। আর একটি বাৎ বিবেচনা করে দেখ তাে—কোন লেড়কি তার মেহবুবকে পেয়ার মহব্বৎ করতে গিয়ে কি বলে—মেহবুব আমার, কলিজা আমার, হাতির মত ইয়া তাগড়াই তােমার শরীরটার সুরৎ কী অস্বাভাবিক! নইলে, তােমার শরীরে পর্বতপ্রমাণ মেদের স্তুপ আমার দিলকে কেড়ে নিয়েছে। আমি তােমার সুরতের সাগরে সাঁতার কাটতে পেরে ধন্য, জিন্দেগীকে ধন্য জ্ঞান করছি—কোন মরদকে কখনও এরকম সব বাৎ বলতে শুনেছিস, বল তাে?
তারা কিন্তু এ কিসিমের বাৎ কখনই বলে না। উপরন্তু তারা আবেগভরে বলে-“আহা, তােমার কোমর কী সরু! তােমাকে একেবারে হাতের মুঠোয় ধরে নেয়া সম্ভব। ঠিক যেন সিংহীর মত কোমর তােমার। আর পেঁজা তুলাের মত নরম তােমার দেহপল্লবটি। পাখি যেমন ডানা মেলে হাল্কা ভাবে উড়ে বেড়ায় তুমিও ঠিক তেমনি অবলীলাক্রমে ঘুরে বেড়াতে পার। আর সামান্য খানা পেলেই তােমার উদর পূরণ হয়ে যায়। তােমার রাঙা গাল দু’টিতে চুমু খাওয়ার সৌভাগ্য হলে বেহেস্তবাসের সুযােগকেও সহজেই আমি ত্যাগ করতে পারি। আবেগে-উচ্ছ্বাসে অভিভূত হয়ে বলে—মেহবুবা, তােমার হাল্কা বাহুলতা দুটো দিয়ে তুমি যখন আমাকে আলিঙ্গন কর এক অনাস্বাদিত আবেশে আমার দিল তখন ভরপুর হয়ে ওঠে। তােমার হাসি ? তােমার মতই তােমার হাসিও হাল্কা। সবচেয়ে বড় কথা, তুমি শোলার মত হাল্কা বলেই না তােমাকে আমার বুকের ওপর তুলে নিতে কিছুমাত্র তকলিফও হয় না ।
আমার মেহবুবা, আমার অনাবৃত হাঁটুর ওপরে তােমার শরীরটিকে পশমী চাদরের মতই মনে হয়। আহা মরি মরি! কী যে সুখ তােমার মধ্যে কী দিয়ে বুঝাবাে, বল তাে?
ওগাে, নাদুসনুদুস বাঁদরমুখী, তাের এমন হতকুৎসিৎ মুখ কি কোনদিন কোন পুরুষের কলিজায় আগুন জ্বেলে দিতে পেরেছে? , পারে নি, পারবেও না। একমাত্র মেদহীন ছিপছিপে লেড়কিরাহ পুরুষদের দিমাক খারাপ করে দিতে পারে। আর তাদের নিজেদের পায়ে লুটিয়ে দিতে পারে। আঙুরলতা যেমন কোন অবলম্বনকে জড়িয়ে ওপরে উঠে যায় তেমনি মরদরাও আমাকে জড়িয়ে বিকশিত হতে উৎসাহী হয়ে পড়ে, আমাকে চুম্বন করতে করতে মাতােয়ারা হতে থাকে। আর হুজুর কি এমনিতেই আমাকে বেহেস্তের হুরী বলে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর-সােহাগে আমার দিল ভরিয়ে তােলেন?
এমন সময় পূর্ব-আকাশের রক্তিম ছােপ প্রভাত ঘােষণা করল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ সাঁইত্রিশতম রজনী
রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন - ‘জাহাপনা, বেহেস্তের হুরী তার বক্তব্যের রশি টেনে ধরে বলল—'আমার প্রসঙ্গ আর নয়। তার চেয়ে বরং তাের নাদুসনুদুস শরীরটি সম্বন্ধে দু-চার কথা বলি। ওরে মেদের ভাণ্ড, সাচ্চা বাৎ বলবি। তুই যখন থপ থপ করে পথ পাড়ি দিস তখন তুই কি নিজের মেদ থলথলে আর গােস্তর পুটুলিটিকে নিজের চোখে দেখতে পাস? অবশ্যই না। আমরা কিন্তু পাই, তাের হালৎ দেখে আমাদের মায়া হয়, শোকে ভেঙে পড়ি। তাের হাঁটার কী বাহার! নিতম্বের থলথলে গােস্ত যেন জমিনে হুমড়ি খেয়ে পড়তে চায়। হাঁসের মত বিশ্রী কায়দায় নিতম্ব হেলিয়ে দুলিয়ে পথ চলিস। কিন্তু দেমাক পুরােদস্তুর। হাতীর মত ঝুড়ি ঝুড়ি খানা লাগে। তুই যতই চিল্লিয়ে মাৎ করিস না কেন সম্ভোগের সময় মরদকে কি এতটুকুও তৃপ্তি দিতে পারিস? থাম্বার মত দুই উরু, আর গামলার মত ভুড়ি। এই তিনের ফাঁকে গুহার খোঁজ করতে করতেই মরদের কম্ম ফতে হয়ে যায়। ইয়েটিয়ে করার আর সুযােগ পায় না, পাবেই বা কি করে? পুরুষাঙ্গ যে দিশেহারা হয়ে আদৎ জায়গার হদিস পায় না। আর গুহার খোঁজ পেলেও তাে কাজ কিছু হবার নয়। তাের ভুড়ির গুততা খেয়ে ছিটকে বেরিয়ে আসবে। কোন সুখের লােভে মরদরা তাের কাছে আসতে উৎসাহী হবে, বল তাে?
আদতে বাজারে বিকোবার মত কোন গুণই তাের মধ্যে নেই, তবে একমাত্র হ্যা, কষাইদের কাছে, গােস্ত বিক্রেতাদের কাছে তাের কদর একটু-আধটু হতে পারে বটে। খ্যাক খ্যাক করে যখন হাসিস তখন কানের পর্দা ছিড়ে যাবার জোগাড় হয়। আর তােবা তােবা! তাের ফুলাে ফুলাে গালে চুমু? অসম্ভব। কোন মরদই চুমু খাওয়ার জন্য ঠোট এগিয়ে নিতে উৎসাহী হবে না।
তাের হাতে মরদ দেবে ধরা? ছা-ছা! থাম্বার মত তাের ওই হাত দুটোতে ধরা দিতে কেউ-ই উৎসাহী হবে না। দমকা বাতাসের মত তাের নিঃশ্বাস বয়। তার ধাক্কা সামাল দেবার মরদ কে আছে, বলতে পারিস? আর ঝর্ণার মত সর্বদা তাের শরীর থেকে ঘাম ঝরেই চলেছে। কী দুর্গন্ধ! ঠেলে বমি বেরিয়ে আসতে চায়। যখন নিদ যাস তখন ভােস ভােস করে তাের নাক ডাকে। কলিজায় কাঁপন ধরিয়ে দেয়। একটু নড়াচড়া করলেই কামারের হাঁপরের মত তাের হাইফাই শুরু হয়ে যায়। উটের মত থপ থপ করে যখন পথ চলিস তখন আচমকা তাের পায়ের তলায় কেউ পড়ে গেলে জান খতম হয়ে যাবে। ওরে গােস্তর পুটুলি, তাের গায়ে সর্বদা উৎকট গন্ধ লেগেই থাকে। আর কেনই বা থাকবে না? আদতে গােসল করার সময় শরীরের সব কটি অংশে তাের হাত যে পৌছােতেই পারে না। উৎকট গন্ধের আর দোষ কি, বল?' মােদ্দা কথা সামনের দিক থেকে তােক দেখলে মনে হয় একটি হাতি বুঝি দাঁড়িয়ে রয়েছে, পাশ থেকে দেখলে উট বলে ভ্রম হয় আর পিছন থেকে ঠিক যেন এক ভিক্তি।
বেহেস্তের হুরীর বাৎ শুনে আলী সরবে হেসে উঠে বলল —‘শােভন আল্লাহ! কী মারাত্মক ব্যাপার! বহুৎ আচ্ছা মন্তব্য করেছ তােমরা। যাও, তােমরা নিজ নিজ জায়গায় চলে যাও।
আলী-র নির্দেশে এবার সােনালী লেড়কি মেহেরুন্নেসা আর বাদামী রঙ বিশিষ্টা শোলা এগিয়ে এল। প্রসঙ্গ শুরু করতে গিয়ে আগে সােনালী লেড়কিটি বলল—আমার গায়ে দিনের-আলােকে ধরে রেখেছি। কোরাণে বহুৎ জায়গাতেই আমার রঙের উল্লেখ দেখা যায়। আল্লাহ-ও বলেছেন, সােনালি হলুদ রঙ আমার বহুৎ পছন্দ। আল্লাহর দোয়ায় আমার গায়ের রঙ উজ্জ্বল ঝলমলে রােদের মত। আমার রঙ ভেল্কী জানে। সােনালি হচ্ছে রঙের মধ্যে একেবারেই সেরা। সূর্যচাঁদ-তারা আমার রঙ নিয়েই মনলােভা হয়ে উঠেছে। সােনালি পীচ আর আপেল কার না দিলে দাগ কাটতে পারে ? দুনিয়ার যত দামী পাথর সবাই আমার গায়ের রঙ নিয়েই মনমৌজী হয়ে উঠেছে। শস্য পাকলে আমার গায়ের রঙই তাে ধারণ করে।
সােনালি ফসলে ক্ষেতে ক্ষেতে রূপের হাট বসে যায়। তাই তো শরৎকাল সবার দিল জয় করতে পারে। কেন? আমার গায়ের রঙে চারদিক ছেয়ে যায় বলেই তাে। সূর্যের উত্তাপ গাছের পাতাগুলােকে সােনালি বর্ণ দান করে।
আমার বাৎ না হয় ছাড়াই দিলাম। তাের কথা, তাের বাদামি রঙের ব্যাপারে এবার কিছু বলে নিচ্ছি যেকোন বাদামি সামগ্রীর দাম অপেক্ষাকৃত কম। রঙই তার জন্য দায়ী। ছ্যাঃ ছ্যাঃ কী বিদঘুটে তাের রঙ। কেউ-ই এরঙটিকে আদর করে কাছে টেনে নেয় না।
এমন কোন আচ্ছা গােস্ত হয় কি যার রঙ তাের গায়ের মত বাদামি? কী বিতিকিচ্ছিরি রঙ তাের। আদতে তুই ফর্সা নস, আবার কুচকুচে কালােও নয়। দুনিয়ার আদমিরা এদের প্রশংসায় একেবারে পঞ্চমুখ। প্রশংসার ছিটেফোটাও তাের নসীবে জোটে না।
সােনালী লেড়কি মেহেরুন্নেসাকে আলী থামিয়ে দিয়ে শােলাকে তার মতামত ব্যক্ত করার নির্দেশ দিল।
শােলা ঠোটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলল । সে হাসলে যেন মুক্তো ছিটকে ছিটকে বেরােতে লাগল। ঘাড় মধুর মত, বাদামী তার গায়ের রঙ। চেহারাও বড়ই চমৎকার। তার শরীরের সব কটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আল্লাতাল্লা যেন নিখুঁতভাবে গড়ে তুলেছেন। তার কোমরের গড়ন সাগরের ঢেউয়ের মত। যেন হরদম দুলতেই থাকে। কালাে মেঘের মত এক গােছা কোঁকড়ানাে চুল মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত নেমে এসেছে। মুহূর্তের জন্য মৌন থেকে তারপর বলল —খােদাতাল্লাকে বহুৎ বহুৎ সুকরিয়া যে, তিনি আমাকে এক বস্তা গােস্ত দিয়ে থলথলে করে, পেকাঠির মত লিকলিকে বা প্রতিবন্ধী করে দুনিয়ায় পাঠান নি। শ্বেতী রােগীর মত ফ্যাকাশে সফেদ বা কামলা রােগীর মত হলদে বা কয়লার মত কুচকুচে কালাে রঙের প্রলেপ গায়ে দিয়ে দুনিয়ায় পাঠান নি। বিভিন্ন রঙ মিলিয়ে মিশিয়ে তিনি আমার গায়ের রঙ বানিয়েছেন যা যে কোন রঙকেই টেক্কা দেয়ার হিম্মৎ রাখে। তিনি যে কত বড় কারিগর এর মাধ্যমেই মালুম হয়।।
দুনিয়ার তাবড় তাবড় কবিরা আমার মত লেড়কির দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন। আমার রঙের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে তারা হাজার হাজার বন্দনাগীতি লিখেছেন। ভাষা ও ছন্দের বুলি উজাড় করে দিয়েছেন সেসব কবিতার প্রতিটি ছত্রে।
এমন সময় প্রাসাদ সংলগ্ন বাগিচায় পাখিরা ভােরের পূর্বাভাষ ঘােষণা করল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
তিন শ’ আটত্রিশতম রজনী
প্রায় মাঝ রাত্রে বাদশাহ শারিয়ার বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় এলেন। বেগম কিসসার পরবর্তী অংশ শুরু করলেন—জাহাপনা, সােনালী লেড়কি শােলা বলে চলল -
শােন, তাের গায়ের রঙকে রঙ বলে মেনে নেয়ার আগেই যেন আমার মৃত্যু হয়। ওটিকে তাে আমি কোন রঙ বলেই মনে করি না। তাের হলদে রঙ আদতে মৃত্যুর প্রতীক। সবুজ পাতার পরিণতি হলুদ রঙ ধারণ করার অর্থই হচ্ছে মৃত্যুকে বরণ করে নেয়া। তাই বলতেই হয় হলুদ মৃত্যুর প্রতীক।
হরিতাল আর গেরিমাটি উভয়ের রঙই হলুদ। এরা দাওয়াই তৈরির কাজে লাগে। আর তা দিয়ে যে দাওয়াই হয় তা গায়ে মাখলে রােম নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সবুজ ঘাস তাে খুবই নরম, তাই নয়? কিন্তু শুকিয়ে গেলে গরু-ছাগল বিতৃষ্ণায় মুখ ঘুরিয়ে রাখে। | দোজখের হলুদ রঙের জাকুম গাছের নাম শুনেছ তাে? তাতে ডাকু, খুনী আর শয়তানদের শির ঝুলিয়ে রাখে। তাতে এক কিসিমের তামাটে ফল হয় যা বিলকুল তাের মুখের মত। কবিরা তাের মত লেড়কিদের মুখের কথা ভেবেই সখেদে বলেছেন, ‘খােদাতাল্লার দোয়ায় আমি একটি বিবি পেয়েছিলাম। তার রঙটি হলদে ছিল। তখন থেকেই আমি শিরের দরদ নিয়ে ভুগে ভুগে সারা হচ্ছি। একবার আমি তাকে বলেছিলাম, খুব হয়েছে, এবার আমরা যে-যার রাস্তা খুঁজে নেই। ব্যস, ঝগড়ার সূত্রপাত। আর তাতেই আমাকে দাঁতগুলি খােয়াতে হয়েছে। ওরে ব্বাস! ভাবলে এখনও আমার খুন ঠাণ্ডা হয়ে আসে। [ আলী তার বাৎ শুনে তাে হেসে জমিনে একদম গড়াগড়ি যাবার উপক্রম হল। বাকি চার লেড়কিকেও কাছে ডাকেন, প্রত্যেককে সমান দামের পােশাক ও অলঙ্কারাদি উপহার দিয়ে খুশী করে।
বসােরার মহম্মদ কিসসা শেষ করে এবার বলল-জাহাপনা এ-ই হচ্ছে ছয় লেড়কির কিসসা কিসসা শুনে আল সামনের বাদশা খুশী হলেন। মামুদ’কে আগ্রহ প্রকাশ করে বললেন—ওই ছয় লেড়কির ঠিকানা তােমার জানা আছে? এক কাজ কর, ওই ছয় লেড়কির পাত্তা লাগাও। তাদের মালিকের মকানে যাও। তাকে জিজ্ঞেস করে এসাে, আমার কাছে তাদের বেচবে কিনা?
মহম্মদ বলল-জাহাপনা, হয়ত আপনার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে না । কারণ, আলী ওই লেড়কি ছয়টিকে নিজের জানের চেয়েও বেশী পেয়ার মহব্বৎ করে।
—তবু তুমি যাও। প্রতি লেড়কি পিছু দশ হাজার—মােট ষাট হাজার দিনার নিয়ে যাও। আলীকে গিয়ে বােল যে, আমি ওই লেড়কি ছয়টিকে খরিদ করতে আগ্রহী।
বাদশাহকে কুর্ণিশ করে বসােরার মহম্মদ ষাট হাজার দিনার কোর্তার জেবে পুরে আলীর মকানে হাজির হ’ল। বাদশাহের অভিপ্রায়ের সমাচার দিয়ে সে আলীর হাতে ষাট হাজার দিনারের
পুটলিটি তুলে দিল। একে স্বয়ং বাদশাহের অভিপ্রায়। তার ওপর নগদ যাট হাজার প্রতি লেড়কি পিছু দশ হাজার দিনার। তার কলিজাটি নাচানাচি শুরু করে দিল। আর চোখের মণি দুটো চক চক করতে লাগল। কিন্তু লেড়কিগুলিকে সে বড়ই পেয়ার করে। পেয়ার আর লােভ এই দুয়ের দ্বন্দ্বে কিছুক্ষণ ভােগার পর অর্থলােভই জয়ী হ’ল। শেষ পর্যন্ত দিনারের পুঁটুলিটি জেবে পুরে তার কলিজার সমান লেড়কি ছয়টিকে বসােরার মহম্মদের হাতে তুলেই দিল।
বসােরার মহম্মদ লেড়কি ছয়টিকে বাদশাহের সামনে হাজির করলে তিনি তাে তাদের গায়ের রঙ দেখে রীতিমত ভিমরি খাবার জোগাড়। তাদের দৈহিক লাবণ্য ও রঙের মধ্যে সাদৃশ্য তাে নেই-ই বরং বৈসাদৃশ্য পুরাে দস্তুর। আবার প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও ঢঙের আধার। বাদশাহ তার বাঞ্ছিত লেড়কিদের পেয়ে খুশীতে একেবারে ডগমগ হয়ে উঠলেন।
লেড়কিগুলােও নাচা-গানা দেখিয়ে, কবিতা শুনিয়ে আর কিসসা বলে বাদশাহকে খুশীর সায়রে ডুবিয়ে রাখল। রঙতামাশায়ও তার মনকে কম ভরিয়ে তুলল না।।
এদিকে হতভাগ্য আলী লেড়কি ছয়টিকে হাতছাড়া করে বিমর্ষভাবে নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করতে লাগল। অনুশােচনার জ্বালায় জর্জরিত হ’ল। তারা যে তাকে অফুরন্ত আনন্দ দান করত সে তুলনায় ষাট হাজার দিনার তাে খুবই নগণ্য। সে নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগল। এক সময় তার হালৎ এমন হ’ল যে, জান ধরে রাখাই তার পক্ষে মুশকিল হয়ে দাঁড়াল।
এক সকালে আলী কাগজ-কলম নিয়ে বসল। নিজের মর্ম বেদনার কথা উল্লেখ করে একটি চিঠি লিখে ফেলল । চিঠির বক্তব্য—আমার বিমর্ষ হৃদয় ওই ছয়টি পদ্মের পাপড়ির মত লাবণ্যময়ীকে চুম্বন করার জন্য ডানা মেলে উড়ে যেতে চায়। তারা যে আমার তৃষ্ণার ঠাণ্ডা পানি, আমার বাঁচার রসদ, আর আমার দৃষ্টিশক্তির আধার, আমার জান—আমার সর্বস্ব। সেই উপহারের বিনিময়ে আমি আমার চোখ দুটোকে মুদ্রিত করে দিতে কুণ্ঠিত হ'ব । আমার এ-চোখ দুটো দিয়ে সেই লেড়কি ছয়টিকে দেখতে অত্যুগ্র আগ্রহী। তারাই যে আমার প্রাণ-প্রদীপের তেল, কামনার অবলম্বন আর আমার জানকে টিকিয়ে রাখার উষ্ণতা জোগাতে পারে। কিন্তু প্রদীপে যার তেল নেই, সেখানে তাে বাতি জ্বলতে পারে না।
বাদশাহ অল মামুন-এর হাতে পত্রটি পৌছলাে। বাদশাহ যথার্থই উদার হৃদয়। আলীর মর্মবেদনায় তিনি ব্যথিত হলেন। ছয়টি লেড়কীকে তলব করলেন। তাদের প্রত্যেককে প্রচুর উপহার সামগ্রী ও নগদ দশ হাজার দিনার দিয়ে আলীর মকানে পাঠিয়ে দিলেন। আলী হারানাে রত্নদের ফিরে পাওয়ার খুশীতে তার দিল নেচে উঠল। তাদের বুকে জড়িয়ে ধরে কলিজা ঠাণ্ডা করল। বাদশাহ লেড়কিদের হাতে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন যে ষাট হাজার দিনার দিয়ে তিনি তাদের খরিদ করেছিলেন তা মকুব করে দিয়েছেন। আলী বাদশাহের উদারতায় মুগ্ধ হ’ল। খুশীতে তার দিল উঠল ভরে। জিন্দেগীর শেষ দিন পর্যন্ত সে তার ছয় রূপসীদের নিয়ে আনন্দে মেতে ছিল।
বেগম শাহরাজাদ এবার বললেন—জাঁহাপনা, ছয়টি লেড়কির কিসসা তাে শুনলেন। এর পর আপনাকে আজব তামার জালার কিসসা শােনাব। আপনার দরবারে আজ পর্যন্ত যত কিসসা পেশ করেছি তাদের মধ্যে এ-কিসাটি সবচেয়ে সেরা বলেই আমার বিশ্বাস।
দুনিয়াজাদ তার বহিনজীর গলা জড়িয়ে ধরে আবেগ ভরে বলে উঠল—বহিনজী তাড়াতাড়ি তােমার কিসসা শুরু কর।
-আজ নয় বহিন। যদি কাল পর্যন্ত জান টিকে থাকে— বাদশাহ শারিয়ার বেগমের রক্তিম গালে আলতাে করে একটি টোকা দিয়ে বললেন—কাল পর্যন্ত আমাদের ধৈর্য ধরে বসে থাকতে হবে বলছ কি! ভাের হতে এখনও অনেক দেরী। কাল নয়, আজই শুরু কর। দুনিয়াজাদ আব্দার করল—‘হা-হা, বহিনজী, আজই —যতটা হয় বল। বাকীটুকু—'
তাকে থামিয়ে দিয়ে বেগম মুচকি হেসে বলল—“ঠিক আছে, তােদের উভয়ের অত্যুগ্র আগ্রহকে চাপা দিয়ে কাল পর্যন্ত কিসসাটি ঝুলিয়ে রাখব না। ধৈর্য ধরে শুনুন জাঁহাপনা বলছি।
( চলবে )

0 Comments