গল্পের পরবর্তী অংশ ঃ
ফলে হালৎ এমন দাঁড়াল যে, তিনি আমার পরামর্শ ছাড়া এক পা-ও নড়েন না।
সুলতানের আদর যত্ন সত্ত্বেও আমার দিল কিছুতেই ওই সাগরে ঘেরা দ্বীপের মধ্যে আটকা পড়ে থাকতে চাইল না। কিছুদিন যেতে না যেতেই আমার যেন দম আটকে আসতে লাগল। অস্থির হয়ে পড়লাম। আপন মুলুকে ফেরার চিন্তা আমার সর্বক্ষণের সাথী হয়ে দাঁড়াল। একদিন এক জাহাজ ভিড়ল। আমি ক্যাপ্টেনের কাছে ছুটে গেলাম। তার সঙ্গে ভাব জমালাম। কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করলাম—কাপ্তেন সাহাব, বাগদাদ কোন দিকে? এখান থেকে জাহাজে ক’ দিন লাগে?
ক্যাপ্টেন বিমর্ষমুখে বলে–হ্যা, শুনেছি বটে, বাগদাদ নামে এক মুলুক আছে। লেকিন আমি কোনদিন যাইনি। কোন দিকে, কত দূর তা-ও বলতে পারব না।
আমি বিলকুল হতাশ মানি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবি, আপন মুলুকে ফেরা বুঝি আমার নসীবে নেই। জাহাজের কর্মীরা তামাম দুনিয়া চষে বেড়ায়। তারাই যদি বলতে না পারে তবে কার ওপর আর ভরসা করা যাবে।
নিতান্ত অনন্যোপায় হয়ে, মৃতপ্রায় অবস্থায় সে দ্বীপে আমি দিন গুজরান করতে লাগলাম।
একদিন সুলতানের দরবারে হাজির হলাম। দেখি এক অপরিচিত আদমি সুলতানের সঙ্গে বাৎচিৎ করছে। সুলতান আমার সঙ্গে পরিচয় করে দিতে গিয়ে বললেন—‘বেটা, ইনি আমাদের মেহমান। হিন্দুস্তান থেকে এসেছেন। সে মুলুকেরই আদমি। আমি প্রসঙ্গক্রমে জিজ্ঞাসা করলাম—জী, হিন্দুস্তানের অধিবাসীরা কোন ধর্মের উপাসক ?
–“হিন্দুধর্ম। হিন্দুরা বহুৎ বর্ণে বিভক্ত। তবে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ই শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়। ক্ষত্রিয়রা বীর যােদ্ধা। যুদ্ধবিগ্রহই তাদের একমাত্র পেশা। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনকেই তারা ধর্মের অঙ্গ জ্ঞান করে। আর ব্রাহ্মণরা? তারা পণ্ডিত। পূত পবিত্র জীবন যাপন তাদের ধর্মের প্রধান অঙ্গ। পূজা পাঠ, শাস্ত্র আলােচনা, শাস্ত্র রচনা। প্রভৃতির মাধ্যমে তারা দিন গুজরান করে। মদ্যকে তারা অপবিত্র জ্ঞান করে। মদ্য পান তাে দূরের কথা স্পর্শও করে না। ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয় ছাড়া সেখানে আরও বাহাত্তরটি নিম্নবর্ণের মানুষের বাস। তাদের জীবন যাত্রার প্রণালী ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের চেয়ে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।
হিন্দুস্তানী মেহমানটির বাৎ শুনে আমি তাে তাজ্জব বনে গেলাম। যেন সদ্য আশমান থেকে জমিনে পড়েছি। একই মুলুকে, একই ধর্মে এত ভাগ যে কল্পনাও করা যায় না। আমি হিন্দুস্তানে কোনদিন যাই নি। তবে তার লাগােয়া মুলুক কাবুলে একবার গিয়ে কিছুদিন ছিলাম ।
একদিন বন্দরে এক বিশালায়তন জাহাজ ভিড়ল। আমি কর্তব্যের তাগিদে এগিয়ে গেলাম। জাহাজের সমানপত্র পরীক্ষা নিরীক্ষা করলাম। তারপর ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞাসা করলাম-ব্যাস, আর কিছু নেই?
--আছে বটে। কিন্তু সেসব সামানপত্রের মালিক জাহাজে নেই। তাই আমার পক্ষে দেখানাে বা বিক্রী করা সম্ভব নয়।
-মালিক সঙ্গে নেই? কেন? সে বা তারা কোথায়? সামানপত্র আছে, মালিক নেই—এ কেমন? '
--“তারা আসার পথে ডুবে গেছে। খােদাতাল্লাই জানেন তাদের কে জিন্দা আছে আর কে জিন্দা নেই। কথাটি বলেই ক্যাপ্টেন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এবার বলল-“কি আর করা যাবে, বাগদাদে গিয়ে তাদের ওয়ারিশের কাছে সামানপত্র ফেরৎ দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।'
ক্যাপ্টেনের বাৎ শুনে আমার সর্বাঙ্গে বিদ্যুতের চমক অনুভব করলাম। কলিজাটি নাচানাচি শুরু করে দিল। নিজেকে কোনরকমে সামলে সুমলে জিজ্ঞাসা করলাম—তাদের কি নাম নিশ্চয়ই আপনার জানা আছে?
-হ্যা। একজনের নাম সিন্দবাদ'
ক্যাপ্টেন তারপর আর কি কি বলেছিল কিছুই আমি শুনিনি। মাথাটি চক্কর মেরে উঠল। চোখে কেমন অন্ধকার দেখতে লাগলাম।
এক সময় নিজেকে একটু সামলে নিয়ে কাপা কাপা গলায় বললাম-আমাকে চিনতে পারছেন না? ভাল করে লক্ষ্য করে দেখুন তাে চিনতে পারছেন কিনা? আমিই সেই নসীব বিড়ম্বিত সিন্দবাদ । অতিকায় তিমি মাছের পিঠের ওপর হাঁটাচলা করছিলাম আমরা কয়েকজন। সে আগুনের ছোঁয়া পেয়ে মােচড়ামুচড়ি দিতেই কে যে কোথায় ছিটকে পড়লাম, হদিস মিলল না। কয়েকজন হুটোপাটা করে জাহাজে উঠল। আমি আর পেরে উঠলাম না। এক সময় অতিকায় তিমিটি ভূঁস করে জলে তলিয়ে গেল। ব্যস, আমার হালৎ শােচনীয় হয়ে পড়ল। কোনরকমে একটি গাছের গুড়ি পেয়ে আঁকড়ে ধরলাম। চৌদ্দ পুরুষের নসীব ভাল যে, কোনরকমে জানে বেঁচে গেলাম।
এবার আমি ক্যাপ্টেনের কাছে কাঠের গুড়িটি অবলম্বন করে কিভাবে এ দ্বীপে এসে পৌছেছি তা হুহু সবিস্তারে বর্ণনা করলাম।
ক্যাপ্টেন বিস্ময় মাখানাে দৃষ্টিতে নীরবে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি বলে চললাম—এখানকার সুলতান মিরজান আমাকে খুবই পেয়ার করেন।
কিসসার এ পর্যন্ত বলার পর ভাের হয়ে এল। বেগম শাহরাজাদ কিসসা বন্ধ করলেন।
দু' শ’ চুরানব্বইতম রজনী
গভীর রাত্রে বাদশাহ শারিয়ার অন্দরমহলে বেগম শাহরাজাদ| এর কামরায় এলেন। বেগম তার কিসসা শুরু করতে গিয়ে বললেন
---‘জাহাপনা, সিন্দবাদ কুলী তার নসীবের কথা জাহাজের ক্যাপ্টেনের কাছে ব্যক্ত করছে।
সে এবার বলল —আমার বাৎ শুনে ক্যাপ্টেন বিদ্রুপাত্মক ভঙ্গিমায় হেসে উঠল। এক সময় হাসতে হাসতেই বলল -সাহাব জব্বর মতলব এঁটেছ দেখছি। তােমার মত মিথ্যাচারী জিন্দেগীতে দেখি নি। আমি তখন নিজের চোখে দেখেছিলাম, যারা জাহাজে উঠতে পারে নি তারা তিমিটির সঙ্গে সঙ্গে দরিয়ার পানিতে ডুবে গেছে। আর তুমি আমাকে আহাম্মক ভেবেছ নাকি হে? আমাকে বুঝাতে চাইছ, তুমি জিন্দা রয়ে গেছ! তাজ্জব বাৎ শােনালে সাহাব! কি করে যে তুমি আমাকে এমন বেকুব ঠাওরালে, অবাক মানছি!'
আমি যেন একেবারে আকাশ থেকে পড়লাম। আপন মনে বলে ওঠলাম-হায় খােদা, তুমিই একমাত্র ভরসা।' এবার ক্যাপ্টেনের দিকে ফিরে বল্লাম—“কিন্তু আমি আপনার বিশ্বাস স্থাপন করতে পারি।
ক্যাপ্টেন কৌতূহল মিশ্রিত জিজ্ঞাসার ছাপ চোখে মুখে এঁকে আমার মুখের দিকে তাকাল।
আমি বল্লাম-“হ্যা, আমি-ই যে সিন্দবাদ তার জ্বলন্ত প্রমাণ দিতে পারি। জাহাজে আমার সহযাত্রী যারা ছিল তাদের অনেকেই তাে জিন্দা আছে। তাদের তলব করে এখানে জড়াে করুন। ব্যস, তবেই দেখবেন, প্রমাণ হয়ে যাবে, আমি-ই সিন্দবাদ।
ক্যাপ্টেনের তলব পেয়ে জাহাজের যাত্রী ও কর্মীরা ছুটে এল।। তারা আমাকে দেখেই সােল্লাসে জড়িয়ে ধরল। রীতিমত নাচানাচি জুড়ে দিল। আমিই যে সিন্দবাদ এ বিষয়ে ক্যাপ্টেনের আর কোনই দ্বিধা রইল না। সে-ও আমাকে সানন্দে জড়িয়ে ধরল। আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সবিস্ময়ে বলল —“তােমার কাহিনী শুনে মালুম হচ্ছে, তােমার দ্বিতীয় জন্ম হয়েছে।
ক্যাপ্টেন এবার যাবতীয় সামানপত্র আমার হাতে তুলে দিল। ব্যস, আর দেরী নয়। গাট্টিগুলাে নিয়ে বাজারে হাজির হলাম। চড়া দামে সব বিক্রি হয়ে গেল। আশাতীত মুনাফা হল।
সুলতান মীরজান-এর আন্তরিকতার কথা ভুলিনি। আগেভাগেই সবচেয়ে ভাল কিছু সামানপত্র তার জন্য বেছে রেখেছিলাম। দরবারে গিয়ে কুর্ণিশ সেরে সামানপত্র তার পায়ের কাছে রাখলাম। সুলতান আমাকে কাছে টেনে নিলেন। আবেগ-মধুর স্বরে বলতে লাগলেন—“বেটা, পেয়ার-মহব্বৎ-ই আদৎ। পিয়ারমহব্বৎ-ই একমাত্র জিন্দা থাকে। আবার এসব বহুৎ খারাপ চিজও বটে। এরা যেমন মুখে হাসি ফুটিয়ে তােলে তেমনি চোখের পানিও ঝরায়।
আমি বুঝলাম, সুলতানের চোখের পাতা ভিজে উঠেছে, কণ্ঠস্বর ভারী। কথা বলতে বলতে তিনি নিজের গলার বহু মূল্য রত্নহারটি খুলে আমার গলায় পরিয়ে দিলেন। চোখের পানি মুছে আমাকে দু হাতে জড়িয়ে ধরলেন।
সুলতানের মহব্বতের সাক্ষর রত্নহারটি আমি কোনদিন বিক্রি করতে পারি না। আমীর-ওমরাহ অনেকেই হাজার হাজার দিনার দাম দিতে চেয়েছে। তবু আমি দিল্ থেকে কিছুমাত্রও উৎসাহ পাই নি। সুলতানের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। তারপর আমার প্রথম আশ্রয়দাতা সে-গুহাবাসী দোস্তের কাছে গেলাম। চোখের পানি ঝরিয়ে সে আমাকে বিদায় দিল।
আমাদের জাহাজ নােঙর তুলল ।
একনাগাড়ে জাহাজ চালিয়ে, দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে আমাদের জাহাজ বসরাহ বন্দরে ভিড়ল।
আমার দিল নেচে উঠল। বাগদাদের কাছাকাছি চলে এসেছি। এবার সহজেই বাগদাদে পৌছে যাব।
জাহাজ ছাড়ল। মাত্র দু’দিন জাহাজ চালিয়ে ক্যাপ্টেন বসরাহ বন্দরে নােঙর করল। সেখান থেকে বাগদাদ।
আমি আত্মীয়-দোস্তদের কাছে ফিরে গেলাম। সবাই আমাকে কাছে পেয়ে খুব খুশী হ’ল। আমি অর্থকড়ি খুইয়ে পথের ভিখারী হলে যে সব দোস্ত কেটে পড়েছিল তারাও এক এক করে আবার কাছে ঘেষতে লাগল। মধুর সন্ধান পেলে মৌমাছিরা তাে কাছে ভিড়বেই। আমার জীবনে ফিন বসন্ত এল। খুশীতে মসগুল হয়ে পড়লাম। সিন্দবাদ নাবিক এবার সিন্দবাদ কুলীকে লক্ষ্য করে বলল‘ এ-ই হ’ল আমার সমুদ্রযাত্রার প্রথম কিসসা।”
সিন্দবাদ নাবিক এবার সিন্দবাদ কুলীর হাতে কিছু সােনার মােহর দিয়ে বলল —এগুলাে তােমার কাছে রাখ। কাল সুবহে আবার আসবে, আমার সমুদ্রযাত্রার দ্বিতীয় কিসসা তােমাকে শোনাব। তােমার ব্যবহার, বিশেষ করে তােমার গানা আমার দিল জয় করে নিয়েছে। কাল সকালে আসা চাই, ভুলে যেয়াে না যেন।
কোর্তার জেবে মােহরগুলাে রাখতে রাখতে সিন্দবাদ কুলী বলল —‘খােদা মেহেরবান। আপনার ওপর খােদার আশীর্বাদ রয়েছে। আপনার মহব্বতের দাম আমি মাথা পেতে নিলাম। কাল জরুর আসব। সিন্দবাদ নাবিককে কুর্ণিশ করে সিন্দবাদ কুলী কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
প্রাসাদের বাইরের বাগিচায় গাছে গাছে পাখিদের কিচিরমিচির শুরু হয়ে গেল। বেগম শাহরাজাদ বুঝলেন, ভাের হয়ে এল বলে। তিনি এবার কিসসা বন্ধ করলেন।
সিন্দবাদ নাবিকের দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রার কিসসা
দু’শ’ পঁচানব্বইতম রজনী
বেগম শাহরাজাদ-এর কামরায় বাদশাহ শারিয়ার প্রবেশ করলেন। বেগম শাহরাজাদ বললেন—“জাঁহাপনা, সিন্দবাদ কুলী সকালে নিদ থেকে উঠে সিন্দবাদ নাবিকের মকানে হাজির হল। গৃহকর্তার বহুৎ ইয়ার-দোস্ত ইতিমধ্যেই সেখানে হাজির হয়েছে। নাস্তা সারতে সারতে সিন্দবাদ নাবিক তার দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রার কিসসা শুরু করল–প্রথম সমুদ্রযাত্রা সেরে ঘরে ফিরে আনন্দফুর্তির মধ্যেই দিন গুজরান করতে লাগলাম। কিন্তু একনাগাড়ে সুখ-আনন্দ—কোন কিছুই ভাল লাগে না। নিরবচ্ছিন্ন আনন্দের মধ্যে আমার দিল হাঁপিয়ে উঠল। আবার জাহাজে উঠে দরিয়া পাড়ি দেবার জন্য দিল ছটফট করতে লাগল। বাঁধাছাঁদা ফিন শুরু করলাম। ইতিমধ্যেই বাজার থেকে বহুমূল্য সামানপত্র খরিদ করে ঘর বােঝাই করে ফেলেছিলাম। সবই ভিন দেশের বাজারের চাহিদার দিকে নজর দিয়ে খরিদ করা। দশবারােটি বড় বড় গাট্টি তৈরি হ’ল।
ঠিক তখনই আমার এক জিগরী দোস্ত সন্ধান নিয়ে এল, একটি জাহাজ বিক্রি আছে। পুরানাে জাহাজ। কিন্তু তার হালৎ এখনও বহুৎ আচ্ছা। দেখলে-মালুম হয়,একেবারে আনকোরা। দরদস্তুর হয়ে গেল। দর একটু বেশীই হ’ল। তবু চোখ কান বুজে খরিদ করে ফেললাম। এবার যেসব সওদাগরদের সঙ্গে আমার খাতির ও জানপহচান রয়েছে তাদের পাত্তা লাগালাম। বললাম, আমি জাহাজ নিয়ে ভিন দেশে বাণিজ্য করতে যাচ্ছি, ইচ্ছা করলে তােমরাও আমার সঙ্গে যেতে পার।
আমার ডাকে সওদাগররা সাড়া দিল। তারা সমানপত্র নিয়ে এসে জাহাজে উঠল।
জাহাজের নােঙর তুললাম। জাহাজ দরিয়ার ঢেউয়ের তালে তালে নাচতে নাচতে এগিয়ে চলল ।
এক এক করে দ্বীপে জাহাজ ভেড়ালাম। জাহাজ ঘাটে আদমির মেলা বসে গেল। সওদা খরিদ করতে এসেছে। আমাদের চকচকে ঝকঝকে সমানপত্র দেখে সবাই যেন হুমড়ি খেয়ে পড়তে লাগল। উতলা হবে না-ই বা কেন? এমন সওদা তাদের চৌদ্দপুরুষেও দেখেনি। এক একটি সওদা এমন চড়া দামে বিক্রি হতে লাগল যাতে আমাদের প্রত্যেকের জেবই মুনাফায় ভরে উঠতে লাগল।
জাহাজ আবার বন্দর ছাড়ল। দু’দিন-দু’ রাত্রি বাদে সুন্দর একটি দ্বীপে জাহাজ ভেড়ালাম। পাহাড়ে ঘেরা সবুজে ঢাকা দ্বীপ। কী যে তার প্রাকৃতিক শােভা তা ভাষার মাধ্যমে কাউকে সমঝানাে সম্ভব নয়।
আমি জাহাজ থেকে নেমে পায়ে পায়ে এগিয়ে চল্লাম সবুজ দ্বীপটির এক-পেয়ে পথ ধরে। কিছুদূর যেতেই চমৎকার এক ঝর্ণা নজরে পড়ল। পাথরের গায়ে আছাড় খেয়ে খেয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে তার পানি নিচে নেমে আসছে। এক নজর দেখলেই চোখ দুটো জুড়িয়ে যায়। আপন মনে বলে উঠলাম—‘খােদাতাল্লার কী অপূর্ব সৃষ্টি! খােদাতাল্লার মর্জি কোথায় যে কি রূপ নিয়ে প্রকাশ পেয়েছে ভাবলে অবাক মানতে হয়।
ঝর্ণার পাড় ধরে আমি গুটিগুটি আরও কয়েক পা এগিয়ে গেলাম। সামনে সারি সারি ফলের গাছ। কী তাদের গড়ন আর কী বিচিত্র রঙ। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। একটি শুকনাে ডাল দিয়ে আঘাত করে গােটা চারেক ফল পাড়লাম। কী যে তাদের স্বাদ বলে বুঝানাে যাবে না। মনে হ’ল বেহেস্তের বাগিচার ফল মুখে দিয়েছি। তারপর নেমে গিয়ে গণ্ডুষ ভরে ঝর্ণার ঠাণ্ডা পানি খেলাম। দিল জুড়িয়ে গেল। এবার প্রায়-সমতল একটি পাথরের ওপর শরীর এলিয়ে দিয়ে একটু জিরিয়ে নিতে লাগলাম। ভাবলাম, একটু বাদে জাহাজে ফিরে যাব। ফুরফুরে বাতাসে কখন যে দু চোখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, মালুমই হয় নি।
চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি সূর্য পশ্চিম-আশমানের গায়ে হেলে পড়েছে। যন্ত্রচালিতের মত এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে পড়লাম।
লম্বা লম্বা পায়ে হাঁটতে লাগলাম জাহাজ ঘাটের দিকে। জাহাজঘাটে পৌছেই আমার চক্ষুস্থির হয়ে গেল। দেখি ঘাট কোথায় ? জাহাজ উধাও। হতাশ দৃষ্টিতে দরিয়ার দিকে তাকালাম। ভো ভা। জাহাজের চিহ্নও নজরে পড়ল না।
আমি আর্তনাদ করে উঠলাম—“হায় আল্লাহ! এ কী করলে! আমাকে নির্জন দ্বীপে নির্বাসিত করে, আমারই জাহাজ নিয়ে আমার সওদাগর দোস্তরা উধাও হয়ে গেল।
নির্জন-নিরালা দ্বীপে আমি নির্বাসিত হলাম। জেব ফাঁকা। একটি কানাকড়িও আমার সঙ্গে নেই। নামমাত্র অর্থকড়ি যা কিছু সম্বল সবই ওই জাহাজে। আমার সঙ্গী সাথীদের কি যে মতলব। কিছুই আমার দিমাকে এল না। তাজ্জব মানতেই হল। আমার চোখ দুটো বেয়ে পানির ধারা নেমে এল। আশমানের দিকে মুখ-তুলে আর্তনাদ করে উঠলাম—‘খােদা মেহেরবান, কি তােমার মর্জি, তুমিই জান! কিন্তু এ কী কঠিন পরীক্ষায় ফেললে আমাকে! এ কী নসীবের ফেরে পড়লাম! প্রথম সমুদ্রযাত্রায় তােমার দোয়াতেই আমার জান রক্ষা পেয়েছিল। এবার ফিন তুমিই নিজে হাতে আমার জান নেয়ার মতলব করেছ!’ আমার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি গড়াতে লাগল। উন্মাদের মত গলা ছেড়ে বিলাপ জুড়ে দিলাম। কখনও বদ্ধ উন্মাদের মত মাথার চুল টানি, কখনও কপাল চাপড়াই আবার কখনও বা পাথরে মাথা ঠুকতে লাগলাম—হায় খােদা, এ কী কাণ্ড তােমার!
( চলবে )

0 Comments